বৃহস্পতিবার, জুন ১৫, ২০১৭

কালিয়াকৈরে বনের সরকারি জমিতে ঘর তুলে কোটি টাকার বাণিজ্য, বহাল তবিয়তে মোতালেব!

রক্ষক হয়েও ভক্ষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন গাজীপুরে বন বিভাগের বেশিরভাগ কর্মকর্তা। যে কারণে এখানে বন বিভাগের গাছপালা ধ্বংস হওয়াসহ দেদার জমিও বেহাত হচ্ছে। এ সুবাদে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হচ্ছেন দুর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তারা। দুর্নীতির টাকায় তাদের জীনবযাপনের চিত্রও পাল্টে গেছে। তারা এক মাসে যা খরচ করেন তা তাদের সারা বছরের বেতনের চেয়েও বেশি। এজন্য এ শ্রেণীর কর্মকর্তারা লোভনীয় চাকরিস্থল হিসেবে গাজীপুর বন বিভাগ ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে চান না। উপর মহলে মাসোয়ারা দিয়ে বছরের পর বছর একই জেলায় চাকরি করছেন। যাদেরই একজন রেঞ্জ কর্মকর্তা মোতালেব হোসেন। পাহাড়সম দুর্নীতির অভিযোগ মাথায় নিয়ে তিনি দীর্ঘ ২১ বছর ধরে গাজীপুরে বন বিভাগের বিভিন্ন অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এ সুবাদে ঘুষ-দুর্নীতি ছাড়াও নানা অপরাধের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েছেন। সখ্য গড়ে তুলেছেন ভূমিদস্যু ও কাঠ পাচারকারীদের সঙ্গে। মোতালেবের মতো এ কাতারে আরও অনেকে এমন কুখ্যাতি অর্জন করেছেন।
স্থানীয় এলাকাবাসী জানান, অবস্থাদৃষ্টে যেন মনে হয় দুর্নীতিবাজ বন কর্মকর্তা মোতালেব হোসেন গাজীপুরে টাকার খনির সন্ধান পেয়েছেন। বনের জমিতে ঘর তুলে ও বনের জমি দখলে নিতে সহায়তা করে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। এসব টাকার ভাগ নিয়মিত বন বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তাদেরও পকেটে চলে যায়। আর এসব ঘুষ-দুর্নীতির জোরেই তিনি শীর্ষ কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে এখানে প্রায় ২ যুগ ধরে টিকে আছেন। এর মধ্যে শুধু আড়াই বছর ছিলেন গাজীপুরের বাইরে। তিনি কালিয়াকৈরের চন্দ্রা বিটে দু’বার বিট কর্মকর্তা ছিলেন। দ্বিতীয় মেয়াদে থাকাকালীন অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে তিনি সাময়িক বরখাস্ত হয়েছিলেন। তা সত্ত্বেও অবৈধ টাকার জোরে ফিরে পেয়েছেন চাকরি। শুধু তাই নয়, তাকে পদোন্নতিও দেয়া হয়।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শরীয়তপুর জেলার বাসিন্দা বন কর্মকর্তা মোতালেব ফরেস্ট বিভাগের একজন গার্ড হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। পরে তিনি ফরেস্টার, ডেপুটি রেঞ্জার থেকে রেঞ্জার হিসেবে পদোন্নতি পান। অভিযোগ রয়েছে, তার পদোন্নতির নেপথ্যে রয়েছে বিপুল অংকের টাকার লেনদেন। বছরের পর বছর ধরে গাজীপুরে বন বিভাগের বিভিন্ন রেঞ্জে চাকরি করার ফলে এখানে তিনি নিজেকে সুরক্ষায় শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন। এ নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে প্রতি মাসে আয় করছেন লাখ লাখ টাকা। তার উল্লেখযোগ্য অপরাধের মধ্যে রয়েছে বনের কাঠ বিক্রি, বনের জমি ভাড়া দেয়া, বনের জমিতে ঘর তুলে তা থেকে মাসোয়ারা আদায়, বিভিন্ন কারখানা ও রিসোর্টের সঙ্গে আঁতাত করে বনের জমি পাইয়ে দেয়া এবং মিথ্যা মামলার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় করা। আর এভাবেই তিনি গাজীপুর বন বিভাগের সব প্রকার অপকর্মের মূল হোতা হিসেবে জনমনে স্বীকৃতি পেয়েছেন।
সম্প্রতি কালিয়াকৈরের জোড়া পাম্পের পেছনে বনের জমিতে ১১৩টি ঘর তৈরি করা হয়েছে। প্রতিটি ঘর থেকে নেয়া হয়েছে ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা করে। নতুন বিট অফিসার হারুন অর রশীদ এসব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের জন্য বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কাছে আবেদন করলেও মোতালেব হোসেন ফাইলটি উপরে না পাঠিয়ে তার কাছে আটক রেখেছেন।
এদিকে অবৈধভাবে বনের জমি ছেড়ে দিয়ে বন দখলে সহায়তার অন্যতম অভিযোগ রয়েছে রেঞ্জার মোতালেব হোসেনের বিরুদ্ধে। তিনি বিভিন্ন কলকারখানা ও রিসোর্টের কাছে বনের জমি দখল করিয়ে দিতে সহায়তা করছেন। কালামপুর এলাকায় একটি কারখানার বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণের কাজ চলছে। বনের জমি দখল করে কাজ চললেও কিছুই বলছে না বন বিভাগ। এ কারখানা থেকে কয়েক কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে বলে জানা গেছে। ঘুষের বিনিময়ে একটি অ্যালুমিনিয়াম কারখানার অভ্যন্তরে বনের কয়েক বিঘা জমি চলে গেছে। যে কারণে সেখানে বহুতল ভবন নির্মাণ করলেও কোনো পদক্ষেপ নেননি রেঞ্জ কর্মকর্তা মোতালেব হোসেন। অভিযোগ রয়েছে, কারখানা মালিকের কাছ থেকে মোটা অংকের ঘুষ নিয়ে তিনি পুরো বিষয়টি দেখেও না দেখার ভান করছেন। এছাড়া ডিমারগেশনের নামে একটি রিসোর্টকে দুই বিঘা জমি পাইয়ে দিয়েছেন রেঞ্জার মোতালেব। এখানেও লেনদেন হয়েছে কয়েক লাখ টাকা।
আরও জানা যায়, কালিয়াকৈর রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা হিসেবে যোগদানের পর মোতালেব হোসেন তৎকালীন মৌচাক বিট কর্মকর্তা মীর বজলুর রহমানের সঙ্গে যোগ দিয়ে দুর্নীতির পসরা সাজিয়ে বসেন। তাদের নানা অপকর্মের প্রতিবাদে উপজেলার রাখালিয়াচালা এলাকাবাসী ঝাড়– মিছিল করেন। এ ঘটনার পর বজলুর রহমান বদলি হয়ে যান কাপাসিয়ায় রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জের সূর্য নারায়ণপুর বিটে। মীর বজলুর বদলি হয়ে যাওয়ায় ওই বিটের লোকজনের মাঝে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসে।
জানা গেছে, রেঞ্জ ও বিট কর্মকর্তাসহ সব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন ঢাকা বিভাগীয় বন কর্মকর্তা বখতিয়ার নূর সিদ্দিক ও এসিএফ সালেক প্রধান। সে সময় সালেক প্রধানের বিরুদ্ধে এলাকাবাসী বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করে। ছবিসহ পোস্টারিং করে বিচার দাবি করা হয়।
এদিকে মৌচাক বিট এলাকায় বজলুর রহমান চলে যাওয়ার পর যোগদান করেন আবদুল আহাদ। কিন্তু ঘুষ-দুর্নীতিতে তিনিও তার চেয়ে পিছিয়ে নেই। বরং আরও বেশি বেপরোয়া। এলাকায় প্রতিদিন বনের জমিতে ঘর উঠছে। প্রতিটি ঘর বাবদ তিনি নির্ধারিত হারে গুনে গুনে ঘুষের টাকাও বুঝে নিচ্ছেন। জানা গেছে, সদ্য বদলি হওয়া বিট কর্মকর্তা মীর বজলুর রহমান, তার দুই সহযোগী বেলায়েত হোসেন ও আবদুল মান্নানের বিরুদ্ধে একটি ধর্ষণ মামলা রয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ (সংশোধনী ২০০৩)এর ৯(১)/৩০। কালিয়াকৈর থানায় যার মামলা নং-৩৪(৪)১৬ তারিখ -২০-০৪-১৬।

শেয়ার করুন