“ঐ মাকসুইদ্যা!” এবার গলা চড়ানোটা কাজ দিয়েছে। বন্ধুমহলে লুলামী আর বেওকুফীর জন্য বিখ্যাত মাকসুদ ঘাড় ঘুরিয়েই আমাকে দেখতে পায়। ট্রেনের দুলুনি সামলে দু’পাশের সীটে হাত রেখে ঘুরে দাঁড়ায়।
“আরে রাসেইল্যা!” একগাল হাসি নিয়ে মাকসুদ এসে দাঁড়ায় আমার সীটের পাশে।
ঢাকা থেকে সুবর্ণ এক্সপ্রেসে চট্টগ্রাম ফিরছি। এতক্ষণ ফেসবুকে চ্যাট করছিলাম। ল্যাপটপের লিড বন্ধ করে এবার উঠে দাঁড়িয়ে ওর সাথে হাত মেলাই। আজ প্রায় তিন বছর পর মাকসুদের সাথে দেখা। কোলাকুলি শেষে মাকসুদ আরেকবার তার বুদ্ধির ঝিলিক দেখায়, “চিটাং যাচ্ছস?”
হায় রে বলদ!!!
একথা সেকথার পর সে বলে, “আচ্ছা ঐদিন তুই আমার ওয়ালে ঐটা কী পোস্ট করসস?”
“কী?”
“চোখের মধ্যে পেরেক ঢুকানোর ছবিটা, আবার নীচে লিখসস, ‘চোখ সামলা, নাইলে হান্দায়া দিমু…’ ?”
“ঐ শালা, ঐটা আমি দেই নাই। আমার আগের অ্যাকাউন্ট হ্যাক হইসিল তো, জানিস না? ঐটা ডিঅ্যাক্টিভেট করে নতুন অ্যাকাউন্ট খুলসি তো!”
“বলিস কী? কখন?”
“এই তো, এক দেড়মাস হচ্ছে। এখন তো আবার সবাইকে নতুন করে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাচ্ছি। নতুনটাতে আমার আই ডি সূর্যের অন্ধকার।”
“হে হে হে … কস্কি মমিন? এই নাম কই পাইলি? আমারে রিকোয়েস্ট পাঠাইসস?”
“ম্ম্ম্… না বোধহয়, আচ্ছা, চেক কইরা পাঠায়া দিমু নে…”
“তো তোর অ্যাকাউন্ট হ্যাক করলো কে?”
“সেইটা জানলে তো কথা-ই ছিল না। ধইরা রাম প্যাদানী দিতাম!”
“পাসওয়ার্ড চেঞ্জ করি দেখসস?”
“তিনবার করসি। কাজ হয় নাই। তারপর পার্মানেন্টলি ডিঅ্যাক্টিভ।”
“রিপোর্ট করসস?”
“করসি; তুইও করিস।”
“ঠিকাছে। আচ্ছা দোস্ত, ডিঅ্যাক্টিভ করসিলি কখন?”
“ঐ যে, একমাস আগে!”
“ক্যাম্নে কি? আমার ওয়ালে তো ঐটা এক সপ্তা আগে আসছে।”
“হুঁ, শুধু তোর ওয়ালে না, আরো অনেকের ওয়ালেই উল্টাপাল্টা জিনিষ গেছে। হ্যাকার শালা ধুরন্ধর! ডিঅ্যাক্টিভ অ্যাকাউন্ট থেকে পাব্লিকরে জ্বালাইতেছে!”
“ডিঅ্যাক্টিভ থেকে কেমনে জ্বালাবে?”
“কি জানি? পরশু তো রুমী ফোন কইরা আমারে যে ঝাড়ি!”
“ক্যান?”
“ওর ওয়ালে নাকি একটা ন্যুড মাইয়ার ছবির সাথে ওর ফেস এডিট করে নীচে আবার লিখে দিসে, নিজের ভবিষ্যৎ দেখো।”
“অবুক! হ্যাকার তো আস্তা *@%#* এ না দেখি!!!”
“আর কইস না! মাইনষ্যেরে কৈফিয়ৎ দিতে দিতে শেষ!”
“হে হে … ভাল মুসিবতে পড়সস!”
“হুম” এবার প্রসঙ্গ পাল্টাই, “তুই ওইদিকে কই যাস?”
“এইতো, হাঁটি আর কি”
“বুচ্ছি, খাসলত বদলায় নাই তোর।”
“ও মা, এইখানে খাসলতের কী হইল?”
“মাইয়া দেখস?”
“মাইয়া তো দেখার জিনিষ, তাই দেখি।”
“ধুর শালা!”
“চা খাবি?”
“উইথ মালবোরো।”
“চল।”
রেল স্টেশন থেকে ট্যাক্সিতে বাসায় ফেরার সময় বুদ্ধিজীবি আদনানের ফোন।
“কি রে রাসেল, তোর রুচি এত নীচে নামল কবে থেকে?”
“কি রে বাপ! কথা নাই, বার্তা নাই, ঝাড়ি দ্যাস ক্যান?”
“ঝাড়ি খাওয়ার মত কাজ করলে ঝাড়ি খাবি না? এইসব কী লেখস উল্টাপাল্টা?”
“কী লিখি মানে? কী লিখসি? কোথায়?”
“আমার ওয়ালে!”
“তোর ওয়ালে? কখন?”
“এক ঘন্টা আগে।”
“এক ঘন্টা আগে তো আমি ট্রেনে ছিলাম। তোর ওয়াল পাব কই?”
“তুই এক ঘন্টা আগে আমার ওয়ালে আমার একটা ছবি এডিট করে দিসস না?”
“না তো!”
“মিথ্যা কথা বলিস ক্যান? আমার মাথার খুলি ফেটে ব্রেন ছিটকে ছড়াই পড়তেসে – এরকম ছবি দিয়ে লিখসস, নিজের মৃত্যুদৃশ্য দ্যাখ! তুই ফ্রেন্ড হিসেবে ফাইজলামী করতে চাইলে আমার সাথে কর। তুই জানিস না, আমার ফ্যামিলির লোকজনও আমার ফ্রেন্ডলিস্টে আছে, এইসব ছিটগ্রস্থ কাজকারবার ওদের সামনে না করলে হয় না?”
“আজিব! এক ঘন্টা আগে তো আমি নেট থেকেই ডিসকানেক্ট ছিলাম। তো এইসব দেব কোত্থেকে? আচ্ছা, ঐটা কি আমার আগের অ্যাকাউন্ট থেকে আসছে?”
“আগের মানে? তোর কয়টা অ্যাকাউন্ট?”
“ওহ্ দোস্ত, তোকে বলা হয় নাই, আমার আগের অ্যাকাউন্ট হ্যাক হইসে, নতুন আরেকটা খুলসি, ওখান থেকে তোকে আজই রিকোয়েস্ট পাঠাব। তুই বরং আমার অ্যাকাউন্টটা ব্লক করে রিপোর্ট করে দে।”
“তো এইটা তোর আগেই জানানো উচিৎ ছিল।”
“স্যরি দোস্ত, ভুল হই গেসে!”
“ওক্কে, বাই!”
ভালই জ্বালাতন দেখি!
বাসায় ফিরে ফ্রেশ হয়ে খেতে বসলাম। মা’র সাথে টুকটাক কথা হচ্ছিল। খাওয়া প্রায় শেষের দিকে। তখন আবার মোবাইল বেজে উঠল।
“হ্যাঁ জাফর, কী হইসে?”
“তোর ব্লাড এ বি পজিটিভ না?”
“হ্যাঁ, ক্যান?”
“তাত্তাড়ি মেডিক্যালে আয়, ক্যাজুয়াল্টিতে। হিমেইল্যার অ্যাক্সিডেন্ট হইসে।”
“বলিস কী? কখন? কীভাবে?”
“এই তো আধ ঘন্টা আগে। ক্লাব থেকে বাসায় যাচ্ছিল, কার মারি দিসে। বাম পা-টা মনে হয় গেসে!”
“আচ্ছা, আমি এখনই আসতিসি!”
দীর্ঘ ট্রেন ভ্রমণের ধকল নিয়ে ছুটলাম চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে।
ও টি’র বাইরে দাঁড়িয়ে আছি। প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়েছে হিমেলের। বাম পায়ের হাঁটুর ইঞ্চি তিনেক নীচে হাড় ভেঙে পুরো আলাদা হয়ে গিয়েছিল। ডাক্তার নাকি বলেছেন, জোড়া লাগানো সম্ভব হবে না। হিমেলের মা আর আপা কান্নাকাটি করছেন। খুব খারাপ লাগছে। দুই সপ্তা পরই আমাদের একসাথে বান্দরবন যাওয়ার প্ল্যান ছিল। তাজিনডং-এ ট্র্যাকিং এর আইডিয়াটা হিমেলেরই ছিল। অথচ সে-ই আর আগের মত করে হয়ত হাঁটতেও পারবে না।
আমরা, হিমেলের বেশ ক’জন বন্ধু সিঁড়ির রেলিঙে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে নানা কথা আলাপ করছিলাম। হঠাৎ কামরুল বলে বসে, “রাসেল, তুই তোর হ্যাকারকে জ্যোতিষ ব্যবসায় নামতে বল, শাইন করবে।”
“মানে?”
“মনে আছে, শাহানার ওয়ালে কান্নার ছবি দিয়ে লিখসিল, তুই আজীবন কাঁদবি। পরশু শুনলাম, ওর নাকি বিয়া ঠিক হইসে, ওদের ওয়র্ড কমিশনারের শালা নাসিরের সাথে। ঐ ব্যাটা নাকি এর আগে দুইটা বউ পিটাই মারসে। এবার শাহানার সিরিয়াল পড়ল।”
মনটা আরও খারাপ হয়ে গেল। শাহানার বাবা মারা গেছেন অনেক আগে। এটা নিশ্চয়ই তার শকুনী মামাদের কীর্তি। আফসোস, তা-ও যদি সে দেখতে শুনতে মোটামুটি ‘সুন্দরী’ ক্যাটাগরীতে পড়ত, তাকে উদ্ধারের জন্য হয়ত কোন না কোন হিরো ফিল্মী স্টাইলে পয়দা হয়ে যেত। অল্প কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া, অসুন্দর মুখের নারীর পরাজয় যত্রতত্র।
“এইরাম হইলে তো আমার খবর আছে!” জাফর বেশ গম্ভীর। “শাহানার কান্না আর হিমেলের ল্যাংড়া হওয়া, দুইটাই যখন ফলে গেছে, তাইলে আমার এতিম হওয়ার তো সমূহ সম্ভাবনা!” গম্ভীর মুখে এরকম ঠাট্টা করা জাফরের পক্ষেই সম্ভব।
আমি ভাবছি অন্য কিছু। প্রায় এক দেড়মাস আগে যে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট আমি স্থায়ীভাবে ডিঅ্যাক্টিভেট করলাম, যে কোন হ্যাকার, নির্দিষ্ট সময় পরপর, বিভিন্ন বন্ধুর ওয়ালে এরকম হুমকি মার্কা ছবি পোস্ট করে কীভাবে? এ-ও কি সম্ভব? বন্ধুদের মধ্যে তৌহিদ আছে, গ্রামীন ফোনে আই টি সেক্টরে। টেকনিক্যাল লাইনের লোক – ওর সাথে আলাপ করতে হবে।
রাত তিনটে নাগাদ একতা ঝুপড়ি দোকান থেকে চা সিগ্রেট খেয়ে বাসায় ফেরার জন্য রওনা দেব কি না ভাবছি, হঠাৎ একটা দুলুনী। আমার মনে হল, ক্লান্তির জন্যই বোধহয়, মাথাটা একটু ঘুরছে। কিন্তু, আবার। আমরা অবাক হয়ে একে অন্যের মুখ চাওয়া চাওয়ি করছি। মাকসুদ হেসে বলে, “ভূমিকম্প গেল না?” যেন খুব খুশির খবর!
আবার দুলুনি – এবার বেশ জোরে। কামরুল বলে ওঠে, “হ্যাঁ তো!” সুড়ুরুপ করে সশব্দে চায়ে শেষ চুমুক দিয়ে আদনান বলে, “ভূমিকম্প হইসে তো কী হইসে? আমরা রাস্তার উপরেই আছি। এদিকে কোন বড় বিল্ডিংও নাই।”
“হ্যাঁ, কিন্তু বাসায় সবাই ঘুম” বলতে বলতে জাফর মোবাইল বের করে, “সাবধান করে দেয়া দরকার।”
আমি জিজ্ঞেস করি, “তোরা থাকবি এখানে? আমি খুব টায়ার্ড। আমি বাসায় জাইগা…”
আদনান বলে, “আমিও চলে যাব। চল রাসেল, তোকে নামিয়ে দিই।”
সবার সাথে হাত মিলিয়ে আমি আদনানের ইয়ামাহায় চেপে বসি। মাকসুদ, কামরুল আর জাফর তখন মেডিক্যালের দিকে রওনা দিয়েছে।
মধ্যরাতে ফাঁকা রাস্তায় উড়ে চলেছি। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। লোডশেডিং এর জন্য চারপাশটা ভীষণ অন্ধকার। হোন্ডার হেডলাইটের তীব্র আলো অন্ধকার চিরে অস্থির ছুটছে সামনে। অল্প স্বল্প কথা হচ্ছে আদনানের সাথে। খুব উসখুস করলেও রুমীর কথা জিজ্ঞেস করতে পারছি না। রুমী আমাদের বন্ধুবৃত্তেরই একজন, আদনানের প্রাক্তন প্রেয়সী। প্রাক্তন, কারণ, মাত্র মাস ছয়েক আগে ওদের ব্রেক আপ হয়ে গেছে। রুমীর সাথে এখনও আমাদের টুকটাক যোগাযোগ আছে। শুধু কপোত কপোতীই নিজেদের মাঝে অভিমানের দেয়াল তুলে রেখেছে। অনেক চেষ্টা করেও পেটে গুড়গুড় করতে থাকা কথাটা চেপে রাখতে পারলাম না, “রুমীর খবর জানিস?”
“নাহ্!” আদনানের গলায় বিরক্তি, নাকি অনীহা, ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না।
“শুনলাম, ও নাকি রাশেদ ভাইয়ের ফার্মে জয়েন করসে, ভাল স্যালারি।”
“শালী প্রস একটা… !”
আমার রাগ লাগল ব্যাপারটা। অনেক ছেলেই ব্রেক আপের পর প্রাক্তন প্রেমিকা সম্পর্কে এরকম নোংরা কথা বলে শান্তি পায়, অথবা সান্ত্বনা খোঁজে। কিন্তু আদনানের মত রুচি-কৃষ্টি-কালচার ইত্যাদির ধ্বজাধারী কারও কাছ থেকে এটা আশা করা যায় না।
“এক্স গার্লফ্রেন্ড মানেই প্রস, তাই না?” খোঁচাই দিলাম তাকে।
“মোটেও না, সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার জন্য কষ্ট আছে, কিন্তু তাই বলে রুমীকে আমি কখনো অশ্রদ্ধা করি নাই। কিন্তু রাশেদ ভাই কী জিনিস, সেটা তুই জানিস না। দেবজানি আপুর যে ছবিগুলো নেটে পাওয়া গেসিল, ওগুলা রাশেদ ভাইয়েরই কীর্তি। লোকটা পর্ণগ্রাফীর দালাল। রুমীকে সবই বলসিলাম। ও হয় চোখে ঠুলী পড়ে আছে, নয়তো সব জেনে শুনে বুঝে নিজেকে বিক্রী করে দিসে!”
আদনানের কথায় ঝাঁজ স্পষ্ট। এবার আমার দিকে ফিরে বলে, “ও এমন কোন বেকুব না যে রাশেদ ভাই ওর চোখে ঠুলী পড়াতে পারবে। ব্রেক আপের আগে থেকেই রাশেদ ভাই ট্রাই মারতেসিল। এখন বুঝছি ও কেন আমাকে ড্যাম্প করসে। ও প্রস না, প্রসের চেয়েও জঘন্য … …”
“আ – দ – না – আ – আ – ন … …” আমি সামনে তাকিয়ে চীৎকার করে উঠি। উল্টোদিক থেকে জেট বিমানের গতিতে একটা একচোখা ট্রাক ছুটে এসেছে।
আমার সামনে, ঠিক এক ফুট সামনে, আদনানের হেলমেটবিহীন মাথা, ট্রাকের বাম্পার …
আমি ছেঁচড়ে গেলাম রাস্তায় … …
ট্রাকের চাকার নীচে আদনানের থ্যাঁতলানো খুলি, আর ছিটকে পড়া মগজ … …
তারপর, সব অন্ধকার!
******* *********** *************** ************* ********
যখন খুব ছোট ছিলাম, হাড় জিরজিরে শরীরের ওপর ঢাউস থ্রী কোয়ার্টার প্যান্ট আর স্যান্ডো গেঞ্জি চাপিয়ে, নাকের তরল নোলক হাতের উল্টো পিঠে কিছুক্ষণ পর পর মুছতে মুছতে মহল্লার মাঠে ছুট দিতাম বড়দের ফুটবল খেলায় ‘বলবয়’ এর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাওয়ার আনন্দময় আশায়, তখন ব্যাপারটা বেশ সহনীয় ছিল। কিন্তু এখন কেমন যেন অস্বস্তি লাগছে। কিছুক্ষণ পরপর গলার তাবিজটার স্থান পরিবর্তন করছি। কিছুক্ষণ চামড়ায় লেগে থাকলেই কেমন যেন চুলকানি পাচ্ছে। তাবিজেই যদি রোগ সারে, তাহলে হাসপাতালে পড়ে থাকার মানেটা কী বুঝলাম না! বড় খালা এইমাত্র আমার কপালে চুমু খেয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলেন। মশিউর সাহেবের অনুরোধ। মশিউর সাহেব ডি বি’র লোক। আজ থেকে দুই দিন আগে, যেদিন তাঁর সাথে আমার প্রথম সাক্ষাৎ হয়, তিনি নিজের পরিচয় দেয়ার সাথে সাথে আমার পানির টাঙ্কির কথা মনে পড়ে গিয়েছিল। জানি, অযৌক্তিক, তবুও। ঐদিন আমাকে মাত্রই আই সি ইউ থেকে কেবিনে নিয়ে আসা হয়েছিল। প্রথমে ভেবেছিলাম, আদনানের ব্যাপারে জানতে চাইবেন। জ্ঞান ফেরার পর থেকে আদনানের কথা ভেবে আই সি ইউ-তে খুবই বিষণ্ণ সময় কাটছিল। কিন্তু ডি বি পুলিশ মশিউর সাহেব সামান্য সৌজন্যমূলক কুশল বিনিময়ের পর আমাকে অবাক করে দিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন, শাহানা আমার কেমন বন্ধু।
দুর্ঘটনার চারদিন পর, সেদিন কেবিনে মশিউর সাহেবের কাছ থেকেই জানতে পারি শাহানার আত্মহত্যার খবর। মাথাটা ফাঁকা হয়ে গিয়েছিল সাথে সাথে। পরে তাঁর কাছ থেকেই জানতে পারি, শাহানার বিয়ে ঠিক হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু শাহানা সেটা মেনে নিতে পারেনি। এ নিয়ে তার মা এবং মামাদের সাথেও নাকি কিছুটা কথা কাটাকাটি হয়েছিল। কিন্তু মা আর বড় মামার ধমকের মুখে সে শেষ পর্যন্ত চুপসে যায়। বিয়ের ঠিক দু’দিন আগে, গায়ে হলুদের রাতে, মানে ঐ দুর্ঘটনার দুই দিন পর, যখন আমি আই সি ইউতে, তখন শাহানা এই আত্মঘাতী পথ বেছে নেয়। কিন্তু আমাকে কেন জিজ্ঞাসা? উত্তর জানতে পেরে আমি বিহ্বলতার চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে যাই। তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, আমি নাকি শাহানার ফেসবুক ওয়ালে একটা একটা ফাঁসিতে ঝোলা মেয়ের ছবি দিয়ে ক্যাপশন দিয়েছিলাম – দ্য সল্যুশন! এটাকে পুলিশ আত্মহত্যার অন্যতম প্রভাবক হিসেবে দেখছে। আবার সেই হ্যাকার!!
এই কয়দিনের মধ্যে অবশ্য আমি মশিউর সাহেবকে আমার ফেসবুক সংক্রান্ত সমস্যা বিস্তারিত জানিয়েছি। তিনি কতটুকু বিশ্বাস করেছেন কে জানে! তবে এটুকু আশ্বস্ত করেছেন, তাঁরা এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় টেকনিক্যাল সাপোর্ট নিয়ে ব্যাপারটা খাতিয়ে দেখবেন। আগে হ্যাকারের কাণ্ডকীর্তি কাকতালীয় মনে হলেও, এখন আর তা বলা যাচ্ছে না। আমার অস্থির লাগতে থাকে। ভয়ও চেপে ধরতে থাকে ক্রমশ। দেশের পুলিশ বিভাগের লোকজনের টেকনিক্যাল বিষয়ে জ্ঞানের ওপর ব্যাপক সন্দেহ থাকায় আমার কেবলি মনে হতে থাকে, শেষমেষ আমাকেই অপরাধী বানিয়ে পানির টাঙ্কিতে ডুবিয়ে মারবে না তো? আমার বাবা উকিল এবং বিভিন্ন প্রভাবশালী লোকের কাছে এরই মধ্যে ছোটাছুটি শুরু করে দিয়েছেন। পুলিশে ছুঁলে নাকি বত্রিশ ঘা – আমার এই ঘা-সর্বস্ব শরীরে আরও বত্রিশটা ঘা এর জায়গা হবে কিনা, বুঝতে পারছি না।
“আপনি ঠিক কবে আপনার আগের অ্যাকাউন্ট ডিঅ্যাক্টিভেট করেছিলেন, মনে আছে?” আবারও সেই একই প্রশ্ন। বারবার একই প্রশ্ন করার পেছনে পুলিশের উদ্দেশ্য থাকে অ্যালিবাই যাচাই করে কথার ফাঁক ফোঁকর খুঁজে অপরাধী পাকড়াও করা। এই বিষয়টা যে হলিউড মুভি দেখতে দেখতে হালের ফেসবুক জেনারেশনের ছেলেমেয়েদের জানা হয়ে গেছে, সে খবর সম্ভবত ইনি রাখেন না। প্রায় আধঘন্টা সওয়াল জওয়াব চলে। বেশীরভাগ পুরনো প্রশ্ন। একসময় আমি বিরক্ত হয়ে বলি, “যে সময় শাহানার ফেসবুকে ছবিটা যায়, তার দুই দিন আগে থেকে রোড অ্যাক্সিডেন্টের কারণে আমি আই সি ইউতে – এরপরও কেন আমাকে সন্দেহ করা হচ্ছে?”
এবার মশিউর সাহেবের কন্ঠ কঠিন শোনায়, “প্রথমত, আমি একবারও বলিনি যে, আপনি সাসপেক্ট। আপনার কেন একথা মনে হল? দ্বিতীয়ত, তদন্ত চলাকালে আমি কাকে কেন সন্দেহ করব, তার কৈফিয়ৎ দিতে আমি বাধ্য নই। তৃতীয়ত, আপনার অনুপস্থিতিতে আপনার হয়ে যে কেউ কাজটা করতে পারে। সুতরাং, আমি চাইলে আপনাকে সন্দেহের তালিকায় প্রথমেই রাখতে পারি। এক্ষেত্রে আপনি কোন প্রশ্ন করতে পারেন না।”
আমি চুপসে যাই। তর্ক বাড়িয়ে লাভ নেই। অযথা ঝামেলাই বাড়বে শুধু।
আরও দুই দিন পর আমাকে হাসপাতাল থেকে ডিসচার্জ দেয়া হয়। এই ক’দিনে আমার কোন বন্ধুর সাথেই আমার দেখা বা কথা হয়নি। আদনান আর শাহানার জন্য খুব মন খারাপ থাকলেও, কোনভাবেই আমাদের বন্ধু বা ওদের পরিবারের কারও সাথেই যোগাযোগ করতে পারছিলাম না। আমার মোবাইল ফোন তো দুর্ঘটনার সময়ই গেছে; পরেও কেউ আমাকে মোবাইল ব্যবহার করতে দেননি। অবশ্য দিলেও খুব একটা লাভ হত না, কারো নম্বরই তো মুখস্থ নেই। প্রযুক্তি শুধু মানুষের শরীরকেই নয়, মস্তিষ্ককেও অলস করে দিয়েছে।
বাসায় ফেরার পর বুঝতে পারি, চরম ফ্যাকড়ায় পড়ে গেছি। ঐদিন মেডিক্যাল থেকে বেরুবার পর যে ভূমিকম্প হয়েছিল, তখন আরও একটা ঘটনা ঘটে গেছে। জাফরের বাবা মা ভূমিকম্প টের পাওয়ার সাথে সাথে তাঁদের নয়তলার অ্যাপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে, নীচে নামার জন্য বোকার মত লিফটে চাপেন। ঐ লিফট দড়ি ছিঁড়ে পড়ে যায়। দু’জনের কাউকেই বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
এখানেই শেষ নয়, ঐ রাতেই ক্যাজুয়াল্টি বিভাগে কোন এক ইউ পি চেয়ারম্যান আহত অবস্থায় ভর্তি হন। এক পর্যায়ে চেয়ারম্যানের লোকজনের সাথে হাসপাতালের কর্মচারীদের তর্কাতর্কি সংঘর্ষে রূপ নেয়। মাকসুদ ওখানে দাঁড়িয়ে লাইভ অ্যাকশন দেখছিল। হঠাৎ কোত্থেকে কে যেন তাকে একটা কাঠের তক্তা দিয়ে বেমক্কা আঘাত করে/ বাড়ি মারে। তক্তায় লেগে থাকা পেরেক ঢুকে যায় তার চোখে।
কী ভয়াবহ একটা রাত!
কে এই হ্যাকার?
আমি দিশাহীন বোধ করি!
কেউ একজন আমার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট হ্যাক করেছে। ওখান থেকে সে আমার বিভিন্ন বন্ধুর ওয়ালে ভয়াবহ সব ভবিষ্যদ্বাণী করছে, আর সেগুলো ফলেও যাচ্ছে! এই লোক শুধু হ্যাকারই না, হয়ত, মোটামুটি আধ্যাত্মিক ক্ষমতারও অধিকারী! আমি দু’চোখে অন্ধকার দেখছি!!!
.
“এইটাতো খুবই ন্যাচারাল যে, তোকে সন্দেহ করতেসে” তৌহিদ চিন্তিত ভঙ্গীতে বলে।
“আরে, একটা অ্যাকাউন্ট আমি দেড়মাস আগে পার্মানেন্টলি ডিঅ্যাক্টিভেট করলাম …”
“ঐটা নামেই পার্মানেন্ট। তুই যে কোন সময় চাইলে ঐটাকে রিঅ্যাক্টিভেট করতে পারবি।”
“মানে?”
“তুই জিমেইল বা হটমেইল বা যেটার ওপর বেসিস করে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট করসিলি, সেটা ব্যবহার করে খুব সহজেই আগের অ্যাকাউন্ট ফের চালু করা যাবে।”
বাসায় ফেরার এক সপ্তা পর তৌহিদের সাথে যোগাযোগ হয়। আজ সে আসার পর তাকে সব সব ঘটনা খুলে বলি। ইতিমধ্যে পুলিশ আর ডি বি আমার, আমার বাবার আর মায়ের নাকের পানি চোখের পানি এক করে ফেলেছে। মশিউর সাহেব টেকনিক্যাল সাপোর্ট নেয়ার কথা বললেও, সেটা তাঁরা আদৌ নিয়েছেন কিনা, ঠিক বুঝতে পারছি না। বারবার একই প্রশ্ন, একই সন্দেহের মুখোমুখি হতে হতে রাগ-ভয়-অস্থিরতা আর কষ্টের মিলিত চাপে, মাঝে মধ্যে ভীষণ ভেঙে পড়ি, বাচ্চাদের মত কান্না পেয়ে যায়। তৌহিদ আসায়, মনে হল বিশাল একটা আশীর্বাদ পেয়ে গেছি!
“তার মানে হ্যাকারও সেটা চালু করতে পারবে?”
“যদি হ্যাকার তোর মেইল অ্যাকাউন্ট হ্যাক করে, তাহলে। তুই তোর আগের মেইল অ্যাকাউন্ট কী করসস?”
“কী করব? ঐটা দিয়ে নতুন অ্যাকাউন্ট খোলা যাচ্ছিল না, তাই তাই নতুন একটা জিমেইল অ্যাকাউন্ট করে, তারপর নতুন ফেসবুক অ্যাকাউন্ট করি। আগেরটার আর কোন খবর নিই নাই।”
“তুই বললি না, তিনবার পাসওয়ার্ড বদলানোর পরও অ্যাকাউন্ট হ্যাক হইসিল?”
“হ্যাঁ।”
“তার মানে হ্যাকার ব্যাটা এখনও তোর মেইল অ্যাকাউন্ট ইউজ করতেসে। ঐটা ইউজ করে, ইচ্ছামত তোর আগের ফেবু অ্যাকাউন্ট রিঅ্যাক্টিভ করে, তার কাজ সেরে আবার ডিঅ্যাক্টিভ করে দেয়।”
“তো ওকে ট্রেস করার কোন উপায় আছে?”
“সেটা ডিপেন্ড করে হ্যাকারের কোয়ালিটির ওপর।”
“মানে? আমি বলতে চাচ্ছি, আই পি অ্যাড্রেস দেখে তো ট্রেস করা যেতে পারে। যত বড় হ্যাকারই হোক, নিজের আই পি কি লুকাতে পারবে?”
“কাঁচা হ্যাকার হলে পারবে না। কিন্তু ঝানু হ্যাকার হলে আই পি হাইড না শুধু, এমনকি ফেক আই ডি-ও কপি করে ইউজ করতে পারবে!”
“মানে কি? বুঝলাম না …”
“মনে কর, আমি সেই হ্যাকার। এখন, আমি তোর পি সি থেকে তোর ঐ আগের অ্যাকাউন্টটাতে লগ ইন করে অন্যের ওয়ালে উল্টাপাল্টা যা করার, করে দিয়ে আসলাম। এখন, অন্যের ওয়ালের ঐ অ্যাক্টিভিটির পেছনের আই পি যদি খুঁজতে যায়, দেখবে অ্যাড্রেস রুমানীয়া বা পাপুয়া নিউ গিনির কোন কোন আই পি – ঠিক যেভাবে আমি এখানে সেট করে দিসি। কারসাজীটা এখানেই, এমনকি হ্যাকার মামা যদি তোর আই পি জানে, তাহলে তোর আই পি-টাই কপি করে ইউজ করতে পারে – অসম্ভব না।”
“তাহলে তো তাকে ধরার কোন উপায়ই থাকল না!”
“একদম নাই, তা বলা যাবে না, সম্ভাবিলিটি কিছু আছে। মনে কর, অন্তত একবারও যদি সে ভুল করে আই পি লুকানোর কাজটা না করে, তাহলে তার নিজের আই পি অন্তত একবার হলেও কাজ করবে।
খবর বিভাগঃ
বাংলা কৌতুক
