‘পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি এ জীবন মন সকলি দাও
তার মত সুখ কোথাও কি আছে আপনার কথা ভুলিয়া যাও।’
অন্যের ব্যথায় সমব্যথী হওয়া এবং পরের বিপদে সহযোগিতার হাত প্রসারিত করা
একটি মহৎ গুণ। এক ধরনের নেকীর কাজ। হিতৈষী মনোভাব ও
সহমর্মিতার গুণ ছাড়া মানবিকতা ও মহানুভবতার বিকাশ পূর্ণতা পায় না।
আমি তিনবেলা পেট পুরে খেতে পারি। একাধিক
পদের তরকারি ছাড়া আমার খাবার রোচে না। বিচিত্র স্বাদ আস্বাদন ছাড়া আমার রসনা তৃপ্ত
হয় না। বাসার নৈশ প্রহরী কুকুরকে নিত্য টাটকা গোশত খাওয়াই। দুই বেলা শাহী খাবার খেতে
দেই। শ্যাম্পু ছাড়া ওর গোসল হয় না। অথচ পাশের বস্তিতে খাবার না পেয়ে অবোধ শিশুরা
চিৎকার করে কাঁদে। জঠরজ্বালা সইতে না পেরে কত বনী আদম পথের ধারে উপুড় হয়ে কাতরায়। ফল-ফ্রুটস
খেতে খেতে আমার আদরের দুলালের অরুচি ধরে যায়। অথচ বাড়ির বুয়ার অভুক্ত সন্তানদের
মুখে মৌসুমী ফলটি পর্যন্ত ওঠে না। ক্ষুদে মাছির লঘু পদভার পড়ামাত্র সুডৌল আপেল,
রসে টইটুম্বর আঙ্গুর ও টসটসে কমলা ওরা প্রায়শই নিক্ষেপ করে ডাস্টবিনে। অথচ এরা
পঁচা ও উচ্ছিষ্ট ফল খাওয়ার জন্য ইতর প্রাণীর সঙ্গে যুদ্ধ করে ডাস্টবিনে। ফ্যাশন
বদলের সঙ্গে সঙ্গেই আমার মেয়ের শীতবস্ত্র আর গ্রীষ্মের পোশাক বদল হয়। অথচ অদূরের
গাঁয়েই কি-না শীতবস্ত্রের অভাবে গরীবের প্রাণ যায়।
এসব তো বিবেক বা মানবতার পরিচায়ক নয়। অমানবের চেয়ে
মানব শ্রেষ্ঠ কেন? প্রাণের কারণে? কেবল বুদ্ধির কারণে? মোটেও না। প্রাণের
বৈশিষ্ট্যে মানুষ ও জীব-জন্তু প্রায় অভিন্ন। মানুষ বুদ্ধিমান জীব বলে অন্য সব
জীবজন্তু একেবারে বুদ্ধিহীন নয়। বরং বুদ্ধির সঙ্গে বিবেক এবং আপন চাহিদার সঙ্গে
মানবিকতার সংশ্লেষই অন্য সব জীব-জন্তুর ওপর মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব এনে দিয়েছে। ইসলাম
এ কারণে মানব সমাজে এমন বৈষম্য ও প্রভেদের কোনো সুযোগ রাখে নি। ইসলাম মানুষকে
সর্বোচ্চ মানবিকতা, পরহিতৈষণা, সহমর্মিতা ও মহানুভবতার শিক্ষা দিয়েছে। এ উদ্দেশ্যে
আল্লাহ তাঁর নবীকে প্রেরণ দয়া ও সহমর্মিতার প্রতীক হিসেবে। আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন,
﴿وَمَآ أَرۡسَلۡنَٰكَ إِلَّا رَحۡمَةٗ لِّلۡعَٰلَمِينَ ١٠٧﴾ [الأنبياء: ١٠٧]
‘আর আমি
আপনাকে সৃষ্টিকুলের জন্য রহমত হিসেবেই প্রেরণ করেছি।’ {সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত :
১০৭}
অনাহারীর কষ্টের ভাগিদার হতে এবং জনমদুখী বান্দার দুঃখে
সমব্যথী হতে আল্লাহ তা‘আলা রমযানের সিয়াম ফরয করেছেন। দুঃখীর অভাব মোচনে যাকাত ফরয
ও সাদাকুল ফিতর ওয়াজিব করেছেন। একই উদ্দেশে সালাত, সিয়াম ইত্যাদির ফিদইয়া ও
লে‘আনের বিধান এবং কসম ইত্যাদির কাফফার বিধান প্রবর্তন করেছেন। দান-সদকা ও অন্যের
জন্য খরচে উদ্বুদ্ধ করে অনেক আয়াত নাযিল হয়েছে। যেমন :
ক. আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿مَّن ذَا ٱلَّذِي يُقۡرِضُ ٱللَّهَ قَرۡضًا حَسَنٗا فَيُضَٰعِفَهُۥ
لَهُۥ وَلَهُۥٓ أَجۡرٞ كَرِيمٞ ١١﴾ [الحديد: ١١]
‘এমন কে আছে যে, আল্লাহকে উত্তম করয
দেবে? তাহলে তিনি তার জন্য তা বহুগুণে বৃদ্ধি করে দেবেন এবং তার
জন্য রয়েছে সম্মানজনক প্রতিদান।’ {সূরা আল-হাদীদ, আয়াত : ১১}
খ. আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿مَّن ذَا ٱلَّذِي يُقۡرِضُ ٱللَّهَ قَرۡضًا حَسَنٗا فَيُضَٰعِفَهُۥ
لَهُۥٓ أَضۡعَافٗا كَثِيرَةٗۚ وَٱللَّهُ يَقۡبِضُ وَيَبۡصُۜطُ وَإِلَيۡهِ تُرۡجَعُونَ
٢٤٥﴾ [البقرة: ٢٤٥]
‘কে আছে, যে আল্লাহকে উত্তম ঋণ দেবে, ফলে তিনি তার জন্য বহু গুণে বাড়িয়ে দেবেন? আর
আল্লাহ সংকীর্ণ করেন ও প্রসারিত করেন এবং তাঁরই নিকট তোমাদেরকে ফিরানো হবে।’ {সূরা
আল-বাকারা, আয়াত : ২৬১}
গ. আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿مَّثَلُ ٱلَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمۡوَٰلَهُمۡ فِي سَبِيلِ
ٱللَّهِ كَمَثَلِ حَبَّةٍ أَنۢبَتَتۡ سَبۡعَ سَنَابِلَ فِي كُلِّ سُنۢبُلَةٖ مِّاْئَةُ
حَبَّةٖۗ وَٱللَّهُ يُضَٰعِفُ لِمَن يَشَآءُۚ وَٱللَّهُ وَٰسِعٌ عَلِيمٌ ٢٦١﴾ [البقرة: ٢٦١]
‘যারা আল্লাহর পথে তাদের সম্পদ ব্যয় করে, তাদের
উপমা একটি বীজের মত, যা উৎপন্ন করল সাতটি শীষ,
প্রতিটি শীষে রয়েছে একশ’ দানা। আর আল্লাহ যাকে চান তার
জন্য বাড়িয়ে দেন। আর আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ।’ {সূরা
আল-বাকারা, আয়াত : ২৬১}
ঘ. আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿إِنَّ ٱلۡمُصَّدِّقِينَ وَٱلۡمُصَّدِّقَٰتِ وَأَقۡرَضُواْ
ٱللَّهَ قَرۡضًا حَسَنٗا يُضَٰعَفُ لَهُمۡ وَلَهُمۡ أَجۡرٞ كَرِيمٞ ١٨﴾ [الحديد: ١٨]
‘নিশ্চয় দানশীল পুরুষ ও দানশীল নারী এবং যারা আল্লাহকে উত্তম
করয দেয়, তাদের জন্য বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়া হবে এবং তাদের জন্য রয়েছে
সম্মানজনক প্রতিদান।’ {সূরা আল-হাদীদ, আয়াত : ১৮}
ঙ. আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿فَٱتَّقُواْ ٱللَّهَ مَا ٱسۡتَطَعۡتُمۡ وَٱسۡمَعُواْ وَأَطِيعُواْ
وَأَنفِقُواْ خَيۡرٗا لِّأَنفُسِكُمۡۗ وَمَن يُوقَ شُحَّ نَفۡسِهِۦ فَأُوْلَٰٓئِكَ
هُمُ ٱلۡمُفۡلِحُونَ ١٦ إِن تُقۡرِضُواْ ٱللَّهَ قَرۡضًا حَسَنٗا يُضَٰعِفۡهُ لَكُمۡ
وَيَغۡفِرۡ لَكُمۡۚ وَٱللَّهُ شَكُورٌ حَلِيمٌ ١٧﴾ [التغابن: ١٦، ١٧]
‘অতএব তোমরা যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় কর, শ্রবণ
কর, আনুগত্য কর এবং তোমাদের নিজদের কল্যাণে ব্যয় কর, আর যাদেরকে অন্তরের কার্পণ্য থেকে রক্ষা করা হয়, তারাই
মূলত সফলকাম। যদি তোমরা আল্লাহকে উত্তম ঋণ দাও, তিনি তা তোমাদের
জন্য দ্বিগুন করে দিবেন এবং তোমাদের ক্ষমা করে দিবেন। আল্লাহ গুণগ্রাহী, পরম ধৈর্যশীল।’ {সূরা আত-তাগাবুন, আয়াত : ১৬-১৭}
চ. আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿وَأَقِيمُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَءَاتُواْ ٱلزَّكَوٰةَ وَأَقۡرِضُواْ
ٱللَّهَ قَرۡضًا حَسَنٗاۚ وَمَا تُقَدِّمُواْ لِأَنفُسِكُم مِّنۡ خَيۡرٖ تَجِدُوهُ
عِندَ ٱللَّهِ هُوَ خَيۡرٗا وَأَعۡظَمَ أَجۡرٗاۚ وَٱسۡتَغۡفِرُواْ ٱللَّهَۖ إِنَّ ٱللَّهَ
غَفُورٞ رَّحِيمُۢ ٢٠﴾ [المزمل: ٢٠]
‘আর সালাত কায়েম কর, যাকাত দাও এবং
আল্লাহকে উত্তম ঋণ দাও। আর তোমরা নিজদের জন্য মঙ্গলজনক যা কিছু অগ্রে পাঠাবে তোমরা
তা আল্লাহর কাছে পাবে প্রতিদান হিসেবে উৎকৃষ্টতর ও মহত্তর রূপে। আর তোমরা আল্লাহর কাছে
ক্ষমা চাও। নিশ্চয় আল্লাহ অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ {সূরা
আল-মুযযাম্মিল, আয়াত : ২০}
ছ. আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ وَفِيٓ أَمۡوَٰلِهِمۡ حَقّٞ لِّلسَّآئِلِ وَٱلۡمَحۡرُومِ
١٩ ﴾ [الذاريات: ١٩]
‘আর তাদের ধনসম্পদে রয়েছে প্রার্থী ও বঞ্চিতের হক।’ {সূরা
আয-যারিয়াত, আয়াত : ১৯}
জ. আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ وَٱلَّذِينَ فِيٓ أَمۡوَٰلِهِمۡ حَقّٞ مَّعۡلُومٞ ٢٤ لِّلسَّآئِلِ
وَٱلۡمَحۡرُومِ ٢٥ ﴾ [المعارج: ٢٤، ٢٥]
‘আর যাদের ধন-সম্পদে রয়েছে নির্ধারিত হক, যাচ্ঞাকারী
ও বঞ্চিতের’। {সূরা আল-মা‘আরিজ, আয়াত :
২৪-২৫}
এ ধরনের আরো অসংখ্য আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলা মানবের সেবা ও সমাজের
কল্যাণের নির্দেশ ও উৎসাহ দিয়েছেন। তেমনি মানবমুক্তি ও সমাজকল্যাণের মহান
প্রতিভূ মুহাম্মদে আরাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবনভর এ শিক্ষা প্রচার
করেছেন। মানবসেবা ও সমাজকল্যাণের চর্চা করেছেন আপন কর্মে যেমন, তেমনি নানা
উপলক্ষ্যে নানাভাবে এর প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন আপন বাণী বা উক্তিসমগ্রে। কিয়ামত অবধি
আগত মানবতার শান্তি ও কল্যাণে তিনি অনাগত সকল ঈমানদারের সামনে এ আদর্শ রেখে গেছেন।
নবুওয়ত লাভের প্রাক্কালে হিলফুল ফুযূল নামক সংস্থা
গড়েছিলেন। সেখানে কিছু যুবককে নিয়ে তিনি এ মর্মে অঙ্গিকারাবদ্ধ হন,
‘আমরা নিঃস্ব ও অসহায় দুর্গতদের সেবা করব। অত্যাচারী প্রাণপণে বাধা দেব, দেশের
শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা করব এবং বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে সম্প্রীতি স্থাপনে সচেষ্ট
হব।’ [বিশ্বনবী পৃ. : ৫৭]
সেকালে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লামের আর্তমানব সেবার অনন্য উপমা খুঁজে পাওয়া যায় মা খাদিজা রাদিআল্লাহু
আনহার প্রজ্ঞাপূর্ণ উক্তিতে। প্রথম ওহী দর্শনে ভীত-সন্ত্রস্ত স্বামীকে অভয় দিতে
গিয়ে যা তিনি উচ্চারণ করেছিলেন। যেমনটি উম্মুল মুমিনীন আয়েশা সিদ্দীকা রাদিআল্লাহু
আনহা সূত্রে ইমাম বুখারীর সহীহ গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আস্বস্ত করতে গিয়ে তিনি বলেন,
« كَلَّا وَاللَّهِ مَا يُخْزِيكَ اللَّهُ
أَبَدًا، إِنَّكَ لَتَصِلُ الرَّحِمَ ، وَتَحْمِلُ الكَلَّ، وَتَكْسِبُ المَعْدُومَ،
وَتَقْرِي الضَّيْفَ، وَتُعِينُ عَلَى نَوَائِبِ الحَقِّ».
(ভার্বার্থ) ‘কখনো নয়, আল্লাহর
শপথ, আল্লাহ আপনাকে কখনো অপমানিত করবেন না। কারণ, আপনি আত্মীয়দের প্রতি দয়াশীল, পীড়িত
মা ও আতুরদের ব্যয়ভার বহন করেন, নিঃস্বদের জন্য উপার্জন করেন, আপনি অতিথিপরায়ন এবং
সত্যিকার বিপদাপদে সদা সাহায্যকারী।’ [বুখারী : ০৩; মুসলিম : ৪২২]
৬ষ্ঠ হিজরীর শেষের দিকে খায়বার
বিজিত হয়। ৯ম হিজরীতে যখন আরব উপদ্বীপ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লামের অনুগত হয়, তখন তিনি বিশাল
রাজ্যের অধিপতি। চারদিক থেকে মদীনায় যত ধন-দৌলত প্রেরিত হয় সবই তিনি অকাতরে বিলিয়ে
দেন অনাথ ও দুস্থদের মাঝে। নিজে কিছুই ভোগ করেন না তিনি। মা আয়েশা রাদিআল্লাহু
আনহার ভাষ্য মতে, তিনি এমনভাবে ইহলোক ত্যাগ করেছেন যে তাঁর পরিবার লাগাতার দু’দিন
পেট পুরে যবের রুটি খেতে পারে নি।
প্রখ্যাত সাহাবী জাবির ইবন
আবদুল্লাহ রাদিআল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম
জীবনে কখনো কোনো প্রার্থীকে ‘না’ বলেন নি। তাঁর বদান্যতা, পরোপকার, মানবসেবা ও
সমাজকল্যাণে অবদানের অসংখ্য দৃষ্টান্ত ইতিহাস ও হাদীস গ্রন্থসমূহে লিপিবদ্ধ হয়েছে।
মানব সেবায় গুরুত্বারোপ এবং এতে উদ্বুদ্ধ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম অসংখ্য বাণী উচ্চারণ করেছেন, স্বল্প পরিসরে যা উল্লেখ সম্ভব নয়। সেদিকে
না দিয়ে সংক্ষেপে কয়েকটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরা যাক।
আবূ হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু
থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
«مَنْ نَفَّسَ عَنْ مُؤْمِنٍ كُرْبَةً مِنْ كُرَبِ الدُّنْيَا نَفَّسَ
اللَّهُ عَنْهُ كُرْبَةً مِنْ كُرَبِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ وَمَنْ يَسَّرَ عَلَى مُعْسِرٍ
يَسَّرَ اللَّهُ عَلَيْهِ فِى الدُّنْيَا وَالآخِرَةِ وَمَنْ سَتَرَ مُسْلِمًا سَتَرَهُ
اللَّهُ فِى الدُّنْيَا وَالآخِرَةِ وَاللَّهُ فِى عَوْنِ الْعَبْدِ مَا كَانَ الْعَبْدُ
فِى عَوْنِ أَخِيهِ».
‘যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের পার্থিব কষ্টসমূহ থেকে কোনো কষ্ট দূর করবে কিয়ামতের কষ্টসমূহ
থেকে আল্লাহ তার একটি কষ্ট দূর করবেন। যে ব্যক্তি কোনো অভাবীকে দুনিয়াতে ছাড় দেবে আল্লাহ
তা‘আলা তাকে দুনিয়া ও আখিরাতে তাকে ছাড় দেবেন।
যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের দোষ গোপন রাখবে, আল্লাহ তা‘আলা দুনিয়া
ও আখিরাতে তার দোষ গোপন রাখবেন। আর আল্লাহ তা‘আলা বান্দার সাহায্যে
থাকেন যতক্ষণ সে তার ভাইয়ের সাহায্য করে
যায়।’
[মুসলিম : ৭০২৮; আবূ দাঊদ : ৪৯৪৮; তিরমিযী : ১৪২৫]
অপর হাদীসে রয়েছে, প্রখ্যাত
সাহাবী আবূ হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
لاَ وَاللَّهِ لاَ يُؤْمِنُ
، لاَ وَاللَّهِ لاَ يُؤْمِنُ ، لاَ وَاللَّهِ لاَ يُؤْمِنُ قَالُوا : وَمَنْ ذَاكَ
يَا رَسُولَ اللهِ ؟ قَالَ : جَارٌ لاَ يَأْمَنُ جَارُهُ بَوَائِقَهُ ، قِيلَ : وَمَا
بَوَائِقُهُ ؟ قَالَ : شَرُّهُ.
‘না, আল্লাহর কসম সে ঈমান আনে নি’; ‘না, আল্লাহর কসম সে ঈমান আনে
নি’; ‘না, আল্লাহর কসম সে ঈমান আনে নি’। সাহাবীরা জিজ্ঞেস করলেন, তারা কারা হে
আল্লাহর রাসূল? তিনি বললেন, ‘সেই ব্যক্তি যার
হঠকারিতা থেকে প্রতিবেশি নিরাপদ নয়।’ জিজ্ঞেস করা হলো, হঠকারিতা কী? তিনি বললেন,
‘তার অনিষ্ট বা জুলুম’। [মুসনাদ আহমদ : ৮৪১৩; মুসনাদ বাযযার : ২০২৬] বলাবাহুল্য
আল্লাহ প্রদত্ত সম্পদের অপচয় করা অথচ নিকটস্থ অসহায়ের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করাও এক
ধরনের জুলুম।
একে অপরকে সাহায্য করা, একে
অন্যকে যৎসামান্য হলেও কিছু দেয়াও তাই গুরুত্বপূর্ণ। প্রখ্যাত সাহাবী আবূ হুরায়রা
রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
«يَا نِسَاءَ الْمُسْلِمَاتِ لاَ تَحْقِرَنَّ جَارَةٌ لِجَارَتِهَا
وَلَوْ فِرْسِنَ شَاةٍ».
‘হে মুসলিম নারীগণ, এক প্রতিবেশি যেন তার অপর প্রতিবেশির পাঠানো দানকে
তুচ্ছজ্ঞান না করে, যদিও তা ছাগলের পায়ের একটি ক্ষুর হয়।’ [বুখারী : ২৫৬৬; মুসলিম
: ২২৬]
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়াসাল্লাম দারিদ্রক্লিষ্ট বনী আদম এবং অসহায় নারীদের সাহায্যে উদ্বুদ্ধ
করেছেন ব্যাপকভাবে। আবূ হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
« السَّاعِى عَلَى الأَرْمَلَةِ وَالْمِسْكِينِ كَالْمُجَاهِدِ فِى
سَبِيلِ اللَّهِ - وَأَحْسِبُهُ قَالَ - وَكَالْقَائِمِ لاَ يَفْتُرُ وَكَالصَّائِمِ
لاَ يُفْطِرُ ».
‘বিধবা ও অসহায়কে সাহায্যকারী ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারীর
সমতুল্য।’ (বর্ণনাকারী বলেন,) আমার ধারণা তিনি আরও বলেন, ‘এবং সে ওই সালাত
আদায়কারীর ন্যায় যার ক্লান্তি নেই এবং ওই সিয়াম পালনকারীর ন্যায় যার সিয়ামে বিরাম
নেই।’ [বুখারী : ৬০০৭; মুসলিম : ৭৬৫৯]
তিনি স্ত্রীদের প্রতি
সবিশেষভাবে সহমর্মিতা ও দয়ার্দ্র আচরণের উপদেশ দিয়েছেন। আবূ হুরায়রা রাদিআল্লাহু
আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ
করেন,
« اسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ ، فَإِنَّ
الْمَرْأَةَ خُلِقَتْ مِنْ ضِلَعٍ ، وَإِنَّ أَعْوَجَ شَىْءٍ فِى الضِّلَعِ أَعْلاَهُ
، فَإِنْ ذَهَبْتَ تُقِيمُهُ كَسَرْتَهُ ، وَإِنْ تَرَكْتَهُ لَمْ يَزَلْ أَعْوَجَ
، فَاسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ »
‘তোমরা (সদুপদেশ ও সদাচারের
মাধ্যমে) নারীদের কল্যাণ কামনা করো, কেননা নারীদের সৃষ্টি করা হয়েছে পাঁজরের হাড়
থেকে। আর পাঁজরের হাড়গুলোর মধ্যে সবচেয়ে বাঁকা হাড় হলো ওপরেরটি। তুমি যদি সেটি
সোজা করতে যাও তাহলে তা ভেঙ্গে ফেলবে। আর নিজ অবস্থায় যদি ছেড়ে দাও তবে তা বাঁকা
হতেই থাকবে। সুতরাং সদুপদেশ ও সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে নারীর কল্যাণ কামনা করো।’ [বুখারী
: ৩৩৩১; মুসলিম : ২৬৭১]
স্ত্রীর প্রতি সদাচারে তাগিদ
দিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন বাণীও উচ্চারণ করেছেন যা
নিয়ে আমাদের মা-বোনেরা সত্যিই গর্ব করতে পারেন। যা লজ্জা দিতে পারে তথাকথিত নারী
স্বাধীনতার ধ্বজাধারীদের। মা আয়েশা রাদিআল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
« خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لأَهْلِهِ
وَأَنَا خَيْرُكُمْ لأَهْلِى ».
‘তোমাদের মধ্যে সে-ই উত্তম যে
স্ত্রীর কাছে তোমাদের মধ্যে উত্তম। আর আমি আমার স্ত্রীর কাছে তোমাদের মধ্যে
সর্বোত্তম।’ [তিরমিযী : ৩৮৯৫]
অন্য ভাইয়ের প্রয়োজনে এগিয়ে
যাওয়া, অন্যের আহ্বানে সাড়া দেয়াকে তিনি অত্যধিক গুরুত্ব দিয়েছেন। এটাকে তিনি
ঐচ্ছিক হিসেবে নয়; একেবারে দায়িত্বের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। যেমন : আবূ হুরায়রা
রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
« حَقُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ سِتٌّ ». قِيلَ مَا هُنَّ يَا رَسُولَ اللَّهِ قَالَ « إِذَا لَقِيتَهُ
فَسَلِّمْ عَلَيْهِ وَإِذَا دَعَاكَ فَأَجِبْهُ وَإِذَا اسْتَنْصَحَكَ فَانْصَحْ لَهُ
وَإِذَا عَطَسَ فَحَمِدَ اللَّهَ فَسَمِّتْهُ وَإِذَا مَرِضَ فَعُدْهُ وَإِذَا مَاتَ
فَاتَّبِعْهُ ».
‘এক মুসলমানের ওপর অন্য মুসলমানের ছয়টি হক রয়েছে। বলা হলো সেগুলো কী
হে আল্লাহর রাসূল? তিনি বললেন, (১) তুমি যখন তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে, তাকে সালাম দেবে।
(২) সে যখন তোমাকে নিমন্ত্রণ করবে তা গ্রহণ করবে। (৩) সে যখন তোমার মঙ্গল কামনা করবে,
তুমিও তার মঙ্গল কামনা করবে। (৪) যখন সে হাঁচি দিয়ে আলহামদুলিল্লাহ বলবে, তখন তুমি
ইয়ারহামুকাল্লাহ (আল্লাহ তোমার প্রতি রহমত করুন) বলবে। (৫) যখন সে অসুস্থ হবে তাকে,
দেখতে যাবে। (৬) এবং যখন সে মারা যাবে, তখন তার জানাযায় অংশগ্রহণ করবে।’ [মুসলিম :
৫৭৭৮; মুসনাদ আহমাদ : ৮৮৩২]
আরেক হাদীসে বলা হয়েছে, আবূ
মূসা রাদিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
« عُودُوا الْمَرِيضَ، وَأَطْعِمُوا الْجَائِعَ، وَفُكُّوا الْعَانِيَ
».
‘অসুস্থ লোকের সেবা করো, ক্ষুধার্তকে অন্ন দাও এবং বন্দিকে মুক্ত
করো।’ [বুখারী : ৫৬৪৯; মুসনাদ আবী ই‘আলা : ৭৩২৫]
মানবসেবা ও সমাজকল্যাণে ইসলামের
অতি আগ্রহ এবং অনন্ত প্রেরণার স্বাক্ষর হিসেবে আর কিছু নয় কেবল নিম্নোক্ত হাদীসে
কুদসীই যথেষ্ট হতে পারে। আবূ হুরায়রা রাদিআল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
« إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ يَقُولُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يَا ابْنَ
آدَمَ مَرِضْتُ فَلَمْ تَعُدْنِى. قَالَ يَا رَبِّ كَيْفَ أَعُودُكَ وَأَنْتَ رَبُّ
الْعَالَمِينَ. قَالَ أَمَا عَلِمْتَ أَنَّ عَبْدِى فُلاَنًا مَرِضَ فَلَمْ تَعُدْهُ
أَمَا عَلِمْتَ أَنَّكَ لَوْ عُدْتَهُ لَوَجَدْتَنِى عِنْدَهُ يَا ابْنَ آدَمَ اسْتَطْعَمْتُكَ
فَلَمْ تُطْعِمْنِى. قَالَ يَا رَبِّ وَكَيْفَ أُطْعِمُكَ وَأَنْتَ رَبُّ الْعَالَمِينَ.
قَالَ أَمَا عَلِمْتَ أَنَّهُ اسْتَطْعَمَكَ عَبْدِى فُلاَنٌ فَلَمْ تُطْعِمْهُ أَمَا
عَلِمْتَ أَنَّكَ لَوْ أَطْعَمْتَهُ لَوَجَدْتَ ذَلِكَ عِنْدِى يَا ابْنَ آدَمَ اسْتَسْقَيْتُكَ
فَلَمْ تَسْقِنِى. قَالَ يَا رَبِّ كَيْفَ أَسْقِيكَ وَأَنْتَ رَبُّ الْعَالَمِينَ
قَالَ اسْتَسْقَاكَ عَبْدِى فُلاَنٌ فَلَمْ تَسْقِهِ أَمَا إِنَّكَ لَوْ سَقَيْتَهُ
وَجَدْتَ ذَلِكَ عِنْدِى ».
‘কেয়ামত
দিবসে নিশ্চয় আল্লাহ তাআ’লা বলবেন,
‘হে আদম সন্তান, আমি
অসুস্থ
হয়েছিলাম, কিন্তু তুমি আমার শুশ্রূষা করো
নি।’ বান্দা বলবে,
‘হে আমার প্রতিপালক। আপনিতো বিশ্বপালনকর্তা
কিভাবে আমি আপনার শুশ্রূষা করব?’ তিনি বলবেন, ‘তুমি কি জানতে না যে, আমার অমুক বান্দা অসুস্থ হয়েছিল, অথচ তাকে তুমি দেখতে যাও নি। তুমি কি জান না, যদি তুমি তার শুশ্রূষা করতে তবে তুমি তার কাছেই আমাকে পেতে।?’ ‘হে আদম সন্তান, আমি
তোমার কাছে আহার চেয়েছিলাম, কিন্তু তুমি আমাকে আহার
করাও নি।’ বান্দা
বলবে, ‘হে
আমার রব, তুমি হলে বিশ্ব পালনকর্তা, তোমাকে
আমি কীভাবে আহার করাব?’ তিনি
বলবেন, ‘তুমি কি জান না যে, আমার
অমুক বান্দা তোমার কাছে খাদ্য চেয়েছিল, কিন্তু তাকে তুমি খাদ্য দাও নি। তুমি কি জান না যে, তুমি যদি তাকে আহার করাতে বে আজ তা প্রাপ্ত হতে।?’ ‘হে আদম সন্তান,
তোমার কাছে আমি পানীয় চেয়েছিলাম, অথচ তুমি
আমাকে পানীয় দাও নি।’ বান্দা
বলবে, ‘হে আমার প্রভু, তুমি তো রাব্বুল আলামীন
তোমাকে আমি কীভাবে পান করাব?’ তিনি
বলবেন,
‘তোমার কাছে আমার অমুক বান্দা পানি চেয়েছিল কিন্তু তাকে
তুমি পান করাও নি। তাকে যদি পান করাতে তবে নিশ্চয় আজ তা প্রাপ্ত হতে।’ [মুসলিম
: ৬৭২১; সহীহ ইবন হিব্বান : ৭৩৬]
এত সব আয়াত ও হাদীসকে সামনে রাখলে কোনো মুসলিমের পক্ষেই
সমাজসেবা বিমুখ হওয়া সম্ভব নয়। কুরআন-সুন্নাহর ধারক-বাহক উলামায়ে কিরাম তাই এ
ব্যাপারে সবসময় সচেতন ছিলেন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেখা যায় আমাদের ভারতীয় উপমহাদেশে
বৃটিশ বিদায়ের পর থেকে দুইশ বছরের গোলামীর ক্ষতি পুষিয়ে এ ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত
অগ্রগতি অর্জিত হয় নি। জাগতিক লাভের উদ্দেশে কিংবা আত্মপ্রচারমুখী সংস্থা, দল বা
ব্যক্তিবর্গের পক্ষ থেকে যেমন সন্তোষজনক জনসেবা জাতি নিকট অতীতে পায় নি; তেমনি
উলামায়ে কিরামকেও এ অঙ্গনে পর্যাপ্ত সংখ্যায় সম্পৃক্ত হতে দেখা যায় নি। আশার কথা হলো বর্তমান আলেম সমাজ ও ইসলামী আদর্শের লোকেরা
জনসেবামূলক বিভিন্ন সংস্থা তথা ইসলামভিত্তিক এনজিও প্রতিষ্ঠা করেছেন। আর্ত মানবতার
সেবায় তারাও ব্যাপকভাবে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন। আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম, আল-মুনাতাদা
আল-আসলামী, আল-মারকাযুল ইসলামী, আন-নাদিল ইমদাদী আল-ইসলামীসহ খ্যাত-অখ্যাত অনেক
ইসলামী সাহায্য সংস্থা মানবসেবায় এগিয়ে এসেছে এবং উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে।
অতি বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করি, বাংলাদেশে বর্তমানে
কর্মরত প্রায় ১৬ হাজার এনজিওর মধ্যে অধিকাংশের ব্যাপারে খ্রিস্টধর্ম প্রচার, ধর্মান্তর
প্রচেষ্টা, অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অনভিপ্রেত নাক গলানো এবং সেবার নামে আসা কোটি
কোটি টাকা লুটপাটের অসংখ্য নজির ও প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তাদের বিরুদ্ধে গণমাধ্যমগুলো
যথেষ্ট সমালোচনা মুখর নয়। আন্তর্জাতিক
চাপের কারণে সরকারও যথাযথ ব্যবস্থা নিতে সক্ষম হচ্ছে না। তাদের সম্পর্কে দেশে
নাশকতা ও দুষ্কৃতিমূলক কাজে সহায়তা করার সুস্পষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও তাদেরকে
বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয় না। পক্ষান্তরে নিষ্ঠা ও সততার সাথে কর্মরত মুসলিম
এনজিওগুলোকে জঙ্গিদের মদদদানের অজুহাতে অনেক ক্ষেত্রে কোনো প্রমাণ ছাড়াই হয়রানির
শিকার হতে হয়। শুধু বাংলাদেশে নয়; অনেক মুসলিমপ্রধান দেশেই এমন অনাকাঙ্ক্ষিত
অবস্থা বিরাজ করছে।
পরিশেষে ইসলামী এনজিওগুলোর উদ্দেশে বলতে চাই আপনারা
নিজেদের কর্মকাণ্ড শুধু মসজিদ-মাদরাসা স্থাপন, কুরআন শিক্ষা ইত্যাদির মাঝে
সীমাবদ্ধ না রেখে এতিমদের পুনর্বাসন, নিরক্ষরতা দূরীকরণ, বিধবাদের সহায়তা প্রদান,
যৌতুক প্রতিরোধ, মাদকদ্রব্য নির্মূল, বৃক্ষরোপন, স্যানিটেশন প্রকল্প, ইসলামভিত্তিক
ক্ষুদ্র ঋণ প্রকল্প, বেকারদের প্রশিক্ষণ ইত্যাদি সেবাকর্মের মাধ্যমে মানুষের আরও কাছে
ঘেঁষতে চেষ্টা করুন। আর্ত-মানবতার সেবায় ইসলামের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরুন। এ
ক্ষেত্রে অবশ্যই পার্থিব লালসা ও ব্যক্তিগত ভোগ-বিলাসের রোগ থেকে নিজেদের দূরে
থাকতে হবে। জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সবার মাঝে ব্যাপক সেবাকর্মের মাধ্যমে
প্রমাণ করে দিন ইসলাম শুধু মুসলমানের জন্যই আসে নি বরং পৃথিবীর সব মানুষের জন্যই
এসেছে। এছাড়াও ভুল বোঝাবুঝি ও অপপ্রচার রোধে নিজেদের সেবার ক্ষেত্র, আয়ের উৎস
ইত্যাদির বিবরণ সম্বলিত তথ্য সরকার ও জনসমক্ষে তুলে ধরে আর্থিক স্বচ্ছতার বিষয়টিও
নিশ্চিত করুন। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। আমীন।