বুধবার, মার্চ ২৩, ২০১৬

আদি বাংলার ইতিহাস (প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্ব ৯৩

আদি বাংলার ইতিহাস
(প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্ব ৯৩
সেন রাজবংশ
এই প্রকারের বৃত্তি পরিবর্তনের দৃষ্টান্ত প্রাচীন ভারতবর্ষের অন্যত্রও ছিল। উদাহরণস্বরূপ সুঙ্গ, কাহ্নবা, প্রতীহার, সাতবাহন, চাহামন প্রভৃতি রাজবংশ এরূপ বৃত্তি পরিবর্তন করেছিল।৬৪৩ বিজয়সেনের পিতামহ সামন্তসেন রামেশ্বর সেতুবন্ধ পর্যন্ত অনেক যুদ্ধাভিযান করে এবং দুর্বৃত্ত কর্ণাটলক্ষ্মী অপহরণকারী শত্রুদিগকে ধ্বংস করে বৃদ্ধবয়সে গঙ্গাতটের পুণ্যাশ্রমে বসবাস আরম্ভ করেন।৬৪৪ আবার অপর একটি সেনলিপিতে বলা হয়েছে যে, কর্ণাটাগত চন্দ্রবংশীয় কোনো একটি সেন পরিবার রাঢ় অঞ্চলে এসে বসতি স্থাপন করেছিলেন এবং এই পরিবারে সামন্তসেন জন্মগ্রহণ করেন।৬৪৫
সেনলিপিমালায় পরস্পরবিরোধী বক্তব্য লক্ষ্য করা যায়। একটি লিপি হতে জানা যায় যে, সামন্তসেনই বাংলাদেশে বসবাসকারী সেনরাজবংশের প্রথম পুরুষ। আবার অন্য একটি লিপিমালা হতে মনে হয় যে, সামন্তসেনের পূর্বেই সেনবংশ রাঢ় অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছিলেন। এ সকল তথ্যের সামঞ্জস্য বিধান করে ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেছেন, “কর্ণাটের এক সেনবংশ বহুদিন যাবত রাঢ়দেশে বসবাস করছিলেন, কিন্তু তারা কর্ণাটদেশের সাথেও সম্বন্ধ রক্ষা করে আসছিলেন। এই বংশের সামন্তসেন যৌবনে কর্ণাটদেশে বহু যুদ্ধে নিজের শৌর্যবীর্যের পরিচয় দিয়ে এই বংশের উন্নতির সূত্রপাত করেন।”৬৪৬ সুতরাং সেনবংশীয় নৃপতিরা যে দাক্ষিণাত্যের কর্ণাট দেশ হতে আগত এবং সামন্তসেন সেনরাজবংশের প্রথম ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব-এটিই নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়। সেনরাজবংশ কিভাবে ও কি কারণে বাংলায় আগমন করেছিল তা নিশ্চিত করে জানা যায় নি। সেনলিপিমালায়ও এর সঠিক ব্যখ্যা প্রদান করা হয় নি। তাই ঐতিহাসিকরা সমসাময়িক তথ্যের ভিত্তিতে বিভিন্ন সম্ভাবনার কথা বলেছেন।
প্রথমত অধিকাংশ ঐতিহাসিক বলেছেন যে, সেনরা কর্ণাট হতে বাংলায় এসে পালরাজাদের অধীনে চাকুরি গ্রহণ করেছিলেন। বিশেষ করে সামরিক বাহিনীর খাদ্যসামগ্রী, কাপড়-চোপড়, অস্ত্র-শস্ত্র প্রভৃতি বহন করার জন্য অনেক শ্রমিকের প্রয়োজন হতো। সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সংযুক্ত পরিবহন ও অন্যান্য শ্রমিক রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রবহির্ভুত বহু অঞ্চল থেকে নিয়োগ করা হতো। দেবপাল হতে মদনপাল পর্যন্ত পাল লেখমালায় উল্লিখিত কর্মচারীর তালিকায় নিয়মিতভাবে গৌড়-মালব.খসহূণ-কলিক-কর্ণাট-লাট-চাট-ভাট প্রভৃতি জাতির লোকজন নিয়োজিত হতো বলে উল্লেখ আছে। লিপির সাক্ষ্য হতে মনে হয়, পাল রাজারা গৌড়, মালব, খস প্রভৃতির ন্যায় কর্ণাটগণকে সৈনিক বা কর্মচারী পদে নিযুক্ত করতেন। ঐতিহাসিকদের মতে, হয়তো কর্ণাটাগত সেনবংশীয় কোনো একজন কর্মচারী শক্তিসঞ্চয় করে পালরাজাদের দুর্বলতার সুযোগে স্বীয় আধিপত্য স্থাপন করেন।৬৪৭ এই ধরনের উক্তি নৈহাটি তাম্রলিপিতে প্রদত্ত হয়েছে। এতে বলা হয়েছে যে, চন্দ্রবংশীয় অনেক রাজপুত্র রাঢ় দেশের অলংকারস্বরূপ ছিলেন এবং তাঁদেরই বংশে সামন্তসেন জন্মগ্রহণ করেন।৬৪৮ এতে মনে হয় পাল রাজাদের সময়ে তাঁদের সৈন্যবাহিনীতে কর্নাটের চন্দ্র বংশীয় রাজপুত্ররা নিয়োজিত ছিলেন৬৪৯ এবং যুদ্ধবিশারদ হিসেবে তাঁদের যথেষ্ট সুনাম ছিল। এমনই কোনো পদে নিয়োজিত থেকে সামন্তসেন সামন্তপ্রভু হতে পেরেছিল। এই তথ্যের ভিত্তিতে মমিন চৌধুরী মত প্রকাশ করেছেন যে, খুব সম্ভবত বিজয়সেন ও তার পিতা হেমন্তসেন সামন্ত প্রভু হতে তাঁদের ক্ষমতার উন্মেষ ও বিস্তার করেন।৬৫০
কোনো কোনো ঐতিহাসিক বলেন যে, কর্ণাটাগত সেন রাজাগণের পূর্বপুরুষ দক্ষিণাগত কোনো আক্রমণকারী রাজার সাথে বাংলায় এসেছিলেন। এই সম্পর্কে উত্তর-পূর্ব ভারত আক্রমণকারী চালুক্যরাজ ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্য ও প্রথম সোমেশ্বরের নাম উল্লেখযোগ্য।৬৫১ চালুক্যরাজন্যদের এই ধরনের আক্রমণের ফলে উত্তর বিহার ও নেপালে নান্যদেব এবং উত্তরভারতে হাহাড়বাল বংশ শাসনক্ষমতা লাভ করেছিল। তাঁরা উভয়েই কর্ণাট দেশীয় ছিলেন। কর্নাটের কোনো কোনো বংশের Adventurist -দের সময় সফলতা অনুসরণ করে কর্নাটের সেন বংশের সামন্তসেন হয়তো বাংলাদেশে অনুরূপ সফলতা লাভ করেছিলেন। এটা অযৌক্তিক মনে করার কোনো কারণ নেই। উভয় সম্ভাবনা যুক্তিসঙ্গত হলেও সেনলিপিমালায় এদের কোনো উল্লেখ না থাকায় এই সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া দুরূহ।৬৫২ সামন্তসেন সেন রাজবংশের প্রথম ঐতিহাসিক ব্যক্তি। ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কর্ণাটে বিভিন্ন যুদ্ধবিগ্রহ করে শেষ বয়সে গঙ্গাতীরে বসতি স্থাপন করেন এমনও হতে পারে। হয়তো যুদ্ধ বিগ্রহের পর ধর্মপ্রাণ সেন বংশের পূর্বপুরুষ সামন্তসেন গঙ্গাতীরবর্তী বনে শান্তি ও সাধনার জায়গা বেছে নিয়েছিলেন যেখানে তোতাপাখীদেরও বেদের সমস্ত বক্তব্যের সঙ্গে পরিচয় ছিল। দেওপাড়া প্রশস্তিতে৬৫৩ এমন ইঙ্গিত দেয়া আছে। সম্ভবত তিনি ধর্মীয় সাধনার জন্যই এসেছিলেন, কাজেই কোনো রাজ্য প্রতিষ্ঠার কথা শোনা যায় নি। একারণেই বোধ হয় সেন লিপিমালায় তাঁর কোনো রাজ্য প্রতিষ্ঠা অথবা রাজকীয় উপাধি গ্রহণের ইঙ্গিত নেই। এই কারণেই তার পৌত্র বিজয়সেনের অথবা তাঁর বংশধরদের লিপিতে তাঁর নামের সাথে কোনো রাজকীয় উপাধি ব্যবহৃত হয় নি।
হেমন্তসেন
বিজয়সেনের ব্যারাকপুর তাম্রশাসনে সামন্তসেনের পুত্র হেমন্তসেনকে ‘মহারাজাধিরাজ’৬৫৪ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই রাজকীয় উপাধি হতে ঐতিহাসিকরা হেমন্তসেনকে সেন রাজবংশের প্র ম রাজা বলে আখ্যায়িত করেছেন। অবশ্য তিনি সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হয়েছিলেন কিনা সন্দেহ আছে। কারণ বিজয়সেনের ব্যারাকপুর তাম্রশাসনে হেমন্ত সেনকে ‘রাজরক্ষা সুদক্ষ’৬৫৫ বলে অভিহিত করা হয়েছে। খুব সম্ভবত তিনি পাল সাম্রাজ্যের একজন সামন্তরাজা এবং কৈবর্ত বিদ্রোহে অধিরাজ রামপালের সাম্রাজ্য রক্ষার্থ দক্ষতা প্রদর্শন করেছিলেন।৬৫৬ আমরা যদি হেমন্তসেনকে পালসম্রাট রামপালের সামন্ত ছিলেন মনে করি, তবে কিন্তু বিজয়সেনের ব্যারাকপুর তাম্রশাসনে তাঁকে ‘মহারাজাধিরাজ’ বলে উল্লেখ কেন করা হয়েছে এই প্রশ্নের উত্তর অদ্যাবধি প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে সঠিকভাবে দেওয়া সম্ভব নয়। একই শিলালিপিতে বিজয়সেনের মাতা যশোদেবীকে মহারাজ্ঞী উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে। তবে হয়তো এমন হয়ে থাকতে পারে যে, হেমন্তসেনের শাসনামলের প্রথমদিকে সামন্তরাজা ছিলেন কিন্তু শেষে স্বতন্ত্রতা লাভ করেন এবং তখনই হয়তো মহারাজাধিরাজ উপাধি গ্রহণ করেছিলেন।
বিজয়সেন (১০৯৭-১১৬০)
হেমন্তসেনের মহারাজাধিরাজ উপাধি থাকলেও ঐতিহাসিকদের ধারণা তাঁর পুত্র বিজয়সেনই সেন রাজবংশের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। পাল রাজগণের অধীন রাঢ় অঞ্চলের সামন্ত হিসেবে তিনি স্বীয় ক্ষমতার প্রসার ঘটান। তিনি সম্ভবত ১০৯৭ হতে ১১৬০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সুদীর্ঘ ৬৩ বছর রাজত্ব করেন। কিন্তু অনেক বিচার-বিবেচনার পর এন.জি. ব্যানার্জী বিজয়সেনের রাজত্বকাল ৬২ বছর বলে নিশ্চিত হয়েছেন।৬৫৭এই সুদীর্ঘ রাজত্বকালে তিনি প্রায় সমগ্র বাংলায় সেনবংশের একাধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হন। তাঁর রাজত্বকালের মূল্যবান উপকরণ ব্যারাকপুর তাম্রশাসন, দেওপাড়া শিলালিপি ও পাইকোড় মূর্তিলিপি।
সন্ধ্যাকর নন্দী বিরচিত রামচরিত, আনন্দভট্ট প্রণীত বল্লালচরিত প্রভৃতি গ্রন্থ হতেও তাঁর সমসাময়িককালের অনেক মূল্যবান তথ্য পাওয়া যায়। ঐতিহাসিকদের ধারণা বিজয়সেন তার সুদীর্ঘ ৬৩/৬৪ বছর রাজত্বকালের প্রথম ২৫ বছর ক্ষুদ্র ভূখণ্ডের অধিপতি ছিলেন এবং কিছুকাল পাল রাজা রামপালের অধীনে সামন্তরাজা ছিলেন।৬৫৮ বিজয়সেন কিভাবে স্বীয় ক্ষমতার প্রসার ঘটিয়েছিলেন ও সুসংহত করেছিলেন, তা আজও সঠিকভাবে জানা যায় নি। রামচরিতে উল্লিখিত নিদ্রাবলীর বিজয়রাজকে সেনরাজ বিজয়সেন হিসেবে অনুমান করা হয়। তিনি বরেন্দ্র উদ্ধারে ভীমের বিরুদ্ধে রামপালকে সাহায্য করেছিলেন।৬৫৯ এর পুরস্কারস্বরূপ বিজয়সেন রাঢ় অঞ্চলে স্বাধীন ক্ষমতা অর্জন করেন। দেওপাড়া লিপিতেও এই ধরনের পুরস্কার লাভের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।৬৬০ যাই হোক, রামচরিতে উল্লিখিত তথ্যের ভিত্তিতে এন.এন. দাসগুপ্ত রাঢ় অঞ্চল সংলগ্ন গঙ্গাতীরবর্তী নিড়োলকে নিদ্রাবলী বলে অনুমান করেছিলেন।৬৬১ পাইকোড় মূর্তিলিপিতে উপর্যুক্ত বক্তব্যের সমর্থন পাওয়া যায়।৬৬২
বীরভুম জেলার অন্তর্গত পাইকর গ্রামে একটি প্রস্তরস্তম্ভের গায়ে খোদিত লিপি৬৬৩ থেকে জানা যায় যে, এই স্তম্ভের উপরে স্থাপিত মূর্তিটি বিজয়সেন কর্তৃক স্থাপিত হয়েছিল। অনেকের মতে নিদ্রাবলীর রাজা বিজয়রাজ, যিনি রামপালের সাহায্যার্থে অগ্রসর হয়েছিলেন ও বীরভূম অঞ্চলের সামন্তরাজ বিজয়সেন একই ব্যক্তি।৬৬৪ সেন লিপিমালায় বিজয়সেন কর্তৃক ক্ষমতার ক্রমোন্নতির ধারাবাহিক কোনো বিবরণ নেই। সম্ভবত রামপালের মৃত্যুর পর পালরাজ্যে গোলযোগ উপস্থিত হলে বিজয়সেন স্বীয় শক্তি বৃদ্ধি করার সুযোগ পান। তিনি শূরবংশীয়া রাজকন্যা বিলাসদেবীকে বিবাহ করে নিজের শক্তিকে সুসংহত করেন। এই বিবাহের কথা ব্যারাকপুর তাম্রশাসনে উল্লিখিত হয়েছে।৬৬৫ অপরদিকে রামচরিতে পালরাজ রামপালের সামন্ত হিসেবে এই শূরবংশীয়দের উল্লেখ আছে। সম্ভবত এই বিবাহের মাধ্যমে শূরবংশীয়দের নিকট হতে বিজয়সেন উত্তর ও দক্ষিণ রাঢ় লাভ করেন।৬৬৬ বৈবাহিক সম্পর্ক ছাড়াও বিজয়সেন কুটনীতির মাধ্যমে কোনো কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্রের সঙ্গে সখ্যতা স্থাপন করে একদিকে নিরাপত্তা ও অন্যদিকে শক্তি বৃদ্ধি করেছিলেন।
বিজয়সেন উড়িষ্যারাজ অনন্তবর্মণ চোড়গঙ্গের সাথে মিত্রতা স্থাপন করে নিশ্চিতভাবেই লাভবান হয়ে থাকবেন। এই চোড়গঙ্গ একজন শক্তিশালী রাজা ছিলেন। কারণ চোড়গঙ্গ কর্তৃক সমগ্র সাগরবেষ্টিত পৃথিবী জয়ের কথা বল্লালচরিতে উল্লিখিত হয়েছে এবং সঙ্গে সঙ্গে বিজয়সেনকে চোড়গঙ্গ সখা বলে অভিহিত করা হয়েছে।৬৬৭ তবে এই গ্রন্থটিতে বর্ণিত ঘটনাবলীর ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে ঐতিহাসিকগণ সন্দেহ পোষণ করেছেন। এই গ্রন্থটির ঐতিহাসিক মূল্য যাই হোক, এটি অনস্বীকার্য যে, বিজয়সেন বাংলার তৎকালীন বিশৃঙ্খল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে স্বীয় অভিলাষ বাস্তবায়িত করতে সক্ষম হন।
উমাপতিধর বিরচিত দেওপাড়া প্রশস্তিতে বিজয়সেনের রাজত্বকালের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলী লিখিত হয়েছে। এতে বিজয়সেন কর্তৃক পরাজিত রাজন্যবর্গ ও পাশ্চাত্যচক্রের বিরুদ্ধে তার একটি নৌ-অভিযানের উল্লেখ আছে।৬৬৮ এই অভিযানের সাথে জড়িত নৃপতিদের দুই-একজন ব্যতীত সকলেই ঐতিহাসিকভাবে সনাক্ত হয়েছেন।
এটি প্রমাণিত হয়েছে যে, এদের মধ্যে নান্য ছিলেন মিথিলার রাজা৬৬৯ কর্ণাট দেশীয় নান্যদেব। তিনি সম্ভবত বঙ্গদেশ দখল করতে এলে একই উদ্দেশ্যে বিজয়সেন উপস্থিত হন। দখলদারিত্ব নিয়ে দু’জনের মধ্যে যুদ্ধ বেধে গেলে, নান্যদেব পরাজিত হয়ে বঙ্গ দখল করার আশা ত্যাগ করে মিথিলায় ফিরে যান। গৌড়রাজ ছিলেন মদনপাল এবং রাঘব ছিলেন উড়িষ্যার রাজা। তাছাড়া সম্ভবত কোটাটবীর রাজা বীরগুণ বর্ধন৬৭০, কৌশম্বীর রাজা দ্বোরপবর্ধন৬৭১ অথবা মদনপাল কর্তৃক পরাজিত গোবর্ধন গাহড়বালরাজের বিরুদ্ধে প্রেরিত হয়েছিলেন। কিন্তু কামরূপরাজ কে ছিলেন, তা সঠিকভাবে নির্ণীত হয় নি। তবে বৈদ্যদেবই কামরূপরাজ হওয়ার সম্ভাবনা অধিক।৬৭২ বিজয়সেন একজন সফল সমরনায়ক হিসেবে বাংলায় একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করেছিলেন, সন্দেহ নেই। একজন সামান্য সামন্ত থেকে সমস্ত বাংলায় একাধিপত্য বিস্তার করতে তাঁকে অনেক যুদ্ধেই সফলতা লাভ করতে হয়েছে। তবে কোনো কোনো অভিযানের সঠিক ফলাফল এখনও অনেকখানি অনুমাননির্ভর রয়েছে। দেওপাড়া লিপিতে উল্লিখিত আছে যে, পাশ্চাত্যচক্র ধ্বংস করার জন্য বিজয়সেনের নৌ-অভিযান গঙ্গা-নদীর উপর দিয়ে অগ্রসর হয়েছিল। এই অভিযান কার বিরুদ্ধে এবং কতটুকু সফল বা বিফল হয়েছিল জানা যায় না। সম্ভবত পাল ও গাহড়বাল এই দুই রাজশক্তির বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালিত হয়েছিল।৬৭৩ কিন্তু‘ দেওপাড়া লিপি থেকে সফলতার কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায় না।৬৭৪ বিদ্যমান সাক্ষ্য হতে অনুমিত হয় যে, বিজয়সেন তাঁর সমসাময়িক সামন্তরাজা বীর ও বর্ধনকে পরাভূত করে ও গৌড়রাজ মদনপালকে বিতাড়িত করে উত্তর বাংলা অধিকার করেন।৬৭৫ দুর্বল পাল রাজা মদনপালের শাসনের ৮ম বর্ষে তাঁকে বিতাড়িত করে বিজয়সেন উত্তর বাংলা অধিকার করেন। উত্তর বাংলার দিনাজপুরে ভূমিদান উপলক্ষে বর্ণিত রামাবতি থেকে জারিকৃত মানহালি তাম্রশাসন থেকে এ কথা জানা যায়। কিন্তু উড়িষ্যারাজ রাঘব,৬৭৬ কামরূপরাজ বৈদ্যদেব৬৭৭ এবং পাশ্চাত্য শক্তির বিরুদ্ধে বিজয়সেন কর্তৃক প্রেরিত নৌ-অভিযান প্রভৃতির সাফল্য বিতর্কিত বিষয় হয়ে আছে। বিজয়সেনের ব্যারাকপুর তাম্রশাসন বিক্রমপুরে উৎকীর্ণ হয়েছিল। এটিও তাঁর দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় সাম্রাজ্য সম্প্রসারণের ইঙ্গিত বহন করে।৬৭৮ সম্ভবত সমতট অঞ্চলভুক্ত সুন্দরবনের খাড়িমণ্ডলে ভূমিদান করার বিষয় এতে বর্ণিত হয়েছে। তাও বিজয়সেনের দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় আধিপত্য বিস্তারের কথাই প্রমাণ করে। কিন্তু এই অঞ্চল কখন সেন সাম্রাজ্যভুক্ত হয়েছিল তা নিশ্চিতভাবে নিরূপণ করা সম্ভব নয়।
কারণ, একাদশ শতাব্দীর শেষার্ধ হতে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তীকাল পর্যন্ত এই অঞ্চলে বর্মণদের শাসন চলছিল। সুতরাং নিশ্চিত যে, দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী কোনো এক সময় বিজয়সেন বর্মণদের নিকট হতে দক্ষিণ-পূর্ব বাংলা অধিকার করে থাকবেন। আবদুল মোমিন চৌধুরী এই সময়কাল সুনির্দিষ্ট করে ১১৫৭-১১৫৯ খ্রিষ্টাব্দ বলে উল্লেখ করেছেন।৬৭৯ ঐতিহাসিক দীনেশচন্দ্র সরকার দেওপাড়া প্রশস্তিতে উল্লিখিত বীরকে ভোজবর্মার উত্তরাধিকারী হিসেবে অনুমান করেছেন। কিন্তু মমিন চৌধুরী তা প্রত্যাখ্যান করে নির্দিষ্ট প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ অসমীচীন বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন।৬৮০
দেওপাড়া শিলালিপিতে বিজয়সেন কর্তৃক সামরিক সাফল্য অর্জন ছাড়াও শ্রোত্রিয় ব্রাহ্মণ ও দরিদ্রদের প্রতি তাঁর মহানুভবতার বিষয় উল্লেখ আছে।৬৮১ তিনি ব্রাহ্মণদের শ্রদ্ধা করতেন এবং তাঁর অনুগ্রহে ব্রাহ্মণগণ বিত্তশালী ও ধনবান হয়ে উঠেছিলেন। তিনি একজন শৈব ধর্মাবলম্বী ছিলেন। তিনি ‘পরম মাহেশ্বর, পরমেশ্বর, পরমভট্টারক, মহারাজাধিরাজ’প্রভৃতি উপাধি৬৮২ এবং ‘অধিরাজ বৃষভশঙ্কর’৬৮৩ গৌরবসূচক নামেও অভিষিক্ত হয়েছিলেন। বহু যুদ্ধে জয়লাভ করে সমগ্র বাংলায় সেনবংশের শাসন তাঁর সময়েই প্রতিষ্ঠা লাভ করে। একজন সামন্তরাজার অবস্থা থেকে বিজয়সেন স্বীয় মেধা, সাহস ও রণকৌশল দ্বারা বাংলায় সার্বভৌম রাজার স্থান অধিকার করেছিলেন এটাই তাঁর শ্রেষ্ঠ কৃতিত্ব। উপরন্তু তাঁর সুদীর্ঘ রাজত্বকালে বাংলায় শান্তি-শৃঙ্খলা স্থাপিত হয়। কারণ পাল সাম্রাজ্যের শেষ অধ্যায়ে পাল শাসনব্যবস্থার অবনতি ও পাল সম্রাটদের ক্ষয়িষ্ণু শক্তি বাংলার রাজনৈতিক অঙ্গনে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করেছিল; এই অবস্থায় তাঁর সমরনীতি ও আক্রমণাত্মক প্রচেষ্টায় বাংলার অরাজক পরিস্থিতির অবসান ঘটেছিল। এই ক্ষেত্রে তিনি পালবংশের প্রতিষ্ঠাতা গোপালের সাথে তুলনীয়। সুতরাং বিজেতা ও শাসক হিসেবে তাঁর কার্যক্রম সত্যই প্রশংসার দাবিদার। তাঁর সম্পর্কে ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার যথার্থই বলেছেন, “The long and prosperous reign of Vijayasena was a momentous episode in the History of Bengal”৬৮৪ কারণ তাঁর রাজত্বে বাংলায় যে নবযুগের সূচনা হয়েছিল কবি উপমাপতিধর রচিত দেওপাড়া- প্রশস্তি তার সাক্ষ্য দিচ্ছে। অতিশয়োক্তি দোষে দূষিত হলেও এই প্রশস্তির মধ্যে এক রাজবংশের আশা-আকাক্সক্ষা ও শক্তিমত্তার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। কবি শ্রীহর্ষ রচিত বিজয়-প্রশস্তি ও গৌড়োর্বীশকুল- প্রশস্তি বিজয়সেনকে উপলক্ষ্য করেই রচিত হয়েছিল বলে ঐতিহাসিকদের ধারণা।৬৮৫
————————————————————
৬৪৩ নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালির ইতিহাস (আদিপর্ব), পৃ. ৩৯।
৬৪৪ আনিসুজ্জামান- বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, খণ্ড-১, পৃ. ৫।
৬৪৫ শামস-সিরাজ-আফিফ- তারিখ-ই-ফিরোজশাহী, খণ্ড- ৩, পৃ. ২৯৬।
৬৪৬ এ.এইচ. দানী- শামসউদ্দীন ইলিয়াস শাহ শাহ-ই বাঙ্গাল, পৃ. ৫৬।
৬৪৭ আবুল ফজল, আইন-ই-আকবরী, খণ্ড- ২, পৃ. ১৩২।
৬৪৮ রমেশচন্দ্র মজুমদার – বাংলাদেশের ইতিহাস, খণ্ড- ১, পৃ. ২।
৬৪৯ রমেশচন্দ্র মজুমদার- বাংলাদেশের ইতিহাস (প্রাচীন যুগ) পৃ. ৮-১০৪।
৬৫০ আনিসুজ্জামান- বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, খণ্ড-১, পৃ. ৪।
৬৫১ রমেশচন্দ্র মজুমদার- বাংলাদেশের ইতিহাস (প্রাচীন যুগ) পৃ. ৮-১০৪।
৬৫২ নীহাররঞ্জন রায়, বাঙালির ইতিহাস (আদিপর্ব), পৃ. ১০৮।
৬৫৩ Inscriptions of Bengal-III, verse no. 9, pp. 47-51.
৬৫৪ সুকামার সেন- বাঙ্গালা দেশের নামের পুরাতত্ত্ব, পৃ. ১৭-২০।
৬৫৫ আনিসুজ্জামান- বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, খণ্ড- ১, পৃ. ৭।
৬৫৬ নীহাররঞ্জন রায়- বাঙ্গলীর ইতিহাস (আদিপর্ব), পৃ. ৭২।
৬৫৭ Inscriptions of Bengal-III, pp. 57.
৬৫৮ রমেশচন্দ্র মজুমদার- বাংলাদেশের ইতিহাস (প্রাচীন যুগ) পৃ. ৮-১২৫।
৬৫৯ হিস্ট্রি অফ বেঙ্গল, খণ্ড- ১, পৃ. ২।
৬৬০ আনিসুজ্জামান- বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, খণ্ড- ১, পৃ. ৭।
৬৬১ রমেশচন্দ্র মজুমদার- বাংলাদেশের ইতিহাস, খণ্ড-১, পৃ. ৬।
৬৬২ বাঙালির ইতিহাস (আদিপর্ব), পৃ. ৭৫।
৬৬৩ Inscriptions of Bengal-III, pp. 168.
৬৬৪ H.C. Roy Chaudhury: Studies in Indian Antiquities, p. 158.
৬৬৫ আর.মুখার্জী অ্যান্ড এস.কে. মাইতিÑ করপাস অফ বেঙ্গল ইন্সক্রিপশনস্ বিয়ারিং অন হিস্ট্রি অ্যান্ড সিভিলাইজেশন অফ বেঙ্গল, পৃ. ২৮৩।
৬৬৬ বাঙালির ইতিহাস (আদিপর্ব), পৃ. ৭৪-৭৭।
৬৬৭ প্রাযুক্ত পৃ. ৭৫।
৬৬৮ কে. বাগচী,- দি গেঞ্জেস ডেল্টা, পৃ. ১৮-৩৫।
৬৬৯ উপেন্দ্রঠাকুর: মিথিলার ইতিহাস, পৃ ২২৭।
৬৭০ Ramacharita, verses-II, pp. 5-6.
৬৭১ Ramacharita, verses-IV, p. 47.
৬৭২ এ. ভট্টাচারিয়া- হিস্টিরিক্যাল জিওগ্রাফি অফ অ্যানশিয়েন্ট অ্যান্ড আরলি মিডিএভল বেঙ্গল, পৃ. ১৬-১৭।
৬৭৩ রমেশচন্দ্র মজুমদার- বাংলাদেশের ইতিহাস (প্রাচীন যুগ), পৃ. ১০৭।
৬৭৪ আনিসুজ্জামান- বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, খণ্ড- ১, পৃ. ১১-১৩।
৬৭৫ বিপ্রদাস- মনসাবিজয়, পৃ. ১৪২।
৬৭৬ আনিসুজ্জামান- বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, খণ্ড- ১, পৃ. ৯।
৬৭৭ আবুল ফজল- আকবর নামা, খণ্ড- ৩, পৃ. ১৫৩।
৬৭৮ তৃত্তিবাসী রামায়ণ; দ্রষ্টব্য: সুকুমার সেন- বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, খণ্ড-১, পৃ. ১১২।
৬৭৯ Abdul Momin Chowdhury: Dynastic History of Bengal, p. 224.
৬৮০ আনিসুজ্জামান- বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, খণ্ড- ১, পৃ. ৭।
আগামী পর্বেঃ বল্লালসেন (১১৬০-১১৭৮)

শেয়ার করুন