ছবি কথা বলে ২০.
ঘরোয়া পরিবেশে তোলা এ ছবিটিতে ফরহাদ সাহেবের এ হাসি মুখখানার পেছনে রয়েছে তার জীবনের এক অভূতপূর্ব আনন্দঘন মুহূর্তের ইতিহাস। ছবিটি তোলার অল্প কিছুক্ষন আগেই ঢাকার একটি মাঝারি গোছের প্রাইভেট টিভি চ্যানেলে সর্বমোট আটত্রিশ সেকেন্ডের জন্য ফরহাদ সাহেবকে দেখানো হয়েছে। একটি রাজনৈতিক দলের কর্মী সমাবেশে তিনি বক্তব্য রাখছেন- এমন একটি দৃশ্য চ্যানেল কর্তৃপক্ষ তাদের সংবাদ পরিক্রমায় প্রচার করেছে। এই সম্প্রচারের খবরটি ফরহাদ সাহেব আগে থেকেই জানতেন বলে টিভি সেটের সামনে বাড়ির সকল সদস্য মন্ডলী সহ তিনি অপেক্ষমান ছিলেন। টিভিতে নিজেকে দেখার পরই তিনি উৎফুল্ল চিত্তে তার নিকট আত্মীয় ও বন্ধুজনদের এই শুভ সংবাদটি মোবাইলযোগে প্রচার করায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। ফরহাদ সাহেবের ধারণা অনুযায়ী আজকালকার টিভি চ্যানেলগুলো দেশের বাইরেও তাদের সম্প্রচার চালু করায় বাংলাদেশ ছাড়াও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তাকে দেখানো হচ্ছে।
সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে নাটক সিনেমার প্রতি ফরহাদ সাহেবের আকর্ষণ খুব ছোটবেলা থেকেই। স্কুলে পড়ার সময় সহপাঠীদের সাথে একটা নাটকের মহড়ার মাধ্যমে তার নাট্য জগতে পদার্পন। স্থানীয় একটি গ্রামের মোড়ল চরিত্রে অভিনয় করবেন তিনি। স্বভাবের সাথে নাটকের চরিত্রের মিল থাকায় অভিনয়ে তেমন একটা বাঁধা পেতে হচ্ছে না তাকে। কিন্তু চূড়ান্ত মহড়ার দিন ফরহাদ সাহেব অযাচিত এক বিপদে পড়ে গেলেন। ভাবের কোনো অভাব না থাকলেও ফরহাদ সাহেবের মুখ থেকে একটি সংলাপ ও বের হচ্ছেনা। কিংকর্তব্য বিমূঢ় অবস্থায় ফরহাদ সাহেব অভিনয় থেকে বাদ পড়ে গেলেন। কিন্তু ফরহাদ সাহেব শোকে মূহ্যমান হওয়ার লোক নন। তিনি জানেন শোককে কিভাবে শক্তিতে পরিণত করতে হয়। সেদিন থেকেই তিনি অভিনয় বাদ দিয়ে নাট্য পরিচালনায় আগ্রহী হয়ে উঠলেন। আর মনে মনে অপেক্ষা করতে থাকলেন একটা উপযুক্ত সুযোগের জন্য।
ঢাকায় এসে কলেজে ভর্তির সুবাদে ফরহাদ সাহেবের সুযোগ হয়ে গেলো বেশ কিছু নাট্য ব্যক্তিত্বদের সাথে কথাবার্তা বলার। নাট্য মহারথীদের তীর্থস্থান শাহবাগের আজিজ সুপারমার্কেটে তখন নিয়মিত ভাবে যাতায়াত করছেন তিনি। সে সময়কার মঞ্চনাটকের এক সুন্দরী অভিনেত্রী ফরহাদ সাহেবকে নাটকের বিষয়ে উৎসাহী দেখে তাকে অভিনয়ের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়ে ফেললেন। দীর্ঘদিনের শুকিয়ে যাওয়া মরা নদীর রেখায় আবার যেন জোয়ারের বান বয়ে গেলো। একটা সুযোগের হাত ধরে ফরহাদ সাহেব দেখাও করে ফেললেন চলচ্চিত্রের পর্দা কাঁপানো অভিনেতা রিয়াজের সাথে। নায়ক রিয়াজের সাথে হাত মেলানো ও একসাথে বসে এক কাপ কফি খাওয়া আজও ফরহাদ সাহেবের অমূল্য স্মৃতিগুলোর মধ্যে একটি। পরবর্তীতে অভিনেতা মাহফুজের সাথে ফরহাদ সাহেবের বেশ কয়েকবার রাস্তায় ঘাটে কুশল বিনিময় হলেও অভিনয়ের বিষয়টি নিয়ে আর তেমন একটা এগোনো হয়নি। তবে আজিজ সুপারমার্কেটের সঙ্গ গুনে মাহফুজ অভিনীত "চোখের বালি" নামক একটি নাটকের শ্যুটিংয়ে ফরহাদ সাহেব দর্শক হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। এ শ্যুটিং দেখাটিও তার জীবনের একটি অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতা। যদিও পরিচালক ও প্রযোজকের মন কষাকষিতে পড়ে সে নাটকটি আর প্রচারের মুখ দেখেনি।
শ্যুটিং দেখা শেষে গভীর রাতে বাড়ি ফেরার পথে ঢাক মেডিকেলের সামনে এক নির্জন রাস্তায় ফরহাদ সাহেব পুলিশের নজরে পড়ে যান। জেরার মুখে ফরহাদ সাহেব পুলিশকে জানান যে তিনি এক দল শিল্পী-কলাকুশলীর সাথে রবীন্দ্রনাথের একটি ক্লাসিক নাটকের শ্যুটিংয়ে এতক্ষন ব্যস্ত ছিলেন। এসব কোনো কিছু বুঝতে না চেয়ে পুলিশ ফরহাদ সাহেবকে বলে বসলেন- "গাঞ্জা কই রাখছোস বাইর কর !!"। শিল্প ও সাহিত্যের প্রতি এই নির্মম লাঞ্ছনার বেদনা মাথায় নিয়ে ফরহাদ সাহেবের আজিজ সুপারমার্কেট প্রীতির সেখানেই মৃত্যু ঘটে। বহুদিন আর সে পথ মাড়াননি তিনি। ফরহাদ সাহেবের এর পরের নাটক আর অভিনয়ের ইতিহাস পুরোটাই মরুময়।
আজকালকার ঝাঁক-ঝাঁক টিভি চ্যানেলের যুগে রাস্তাঘাটে বেরোলেই কোনো না কোনো টিভি ক্যামেরা চোখে পড়ে যায়। যখন যে অবস্থাতেই থাকুক না কেন, ক্যামেরা পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় মনের অজান্তেই ফরহাদ সাহেবের আঙ্গুল চলে যায় তার অবিন্যস্ত চুলের ওপর। চোখের চশমার বদলে পকেটে রাখা সানগ্লাস গলিয়ে নিয়ে মুহূর্তেই বেশ পরিপাটি হয়ে যান তিনি। বলা তো যায় না, কখন কোন মুহূর্তে ক্যামেরাবন্দি হয়ে যেতে হয় !
পর্দায় দেখানো না হলেও জীবনের গোড়া থেকেই আমরা অভিনয়ে আসলে বেশ পটু। এর শুরু হয় শৈশবে, আর শেষ জীবনে পৌঁছনো অব্দি আমরা এতটাই মান সম্পন্ন অভিনেতা-অভিনেত্রীতে পরিণত হই যে নিদেনপক্ষে একটা অস্কার আমাদের প্রাপ্য হয়েই যায়। শৈশবে ভয়ংকর রকমের সব দুষ্টুমি কাজকর্ম করার পর ভাঁজা মাছটি উল্টে খেতে না পারার অভিনয় দিয়ে অভিনয় জীবনের শুরু। তার পর অপ্রেমে প্রেমের অভিনয়, তিক্ত সংসারে মুধুরতার অভিনয়, আধ পেট খেয়ে সুখী হওয়ার অভিনয়, রাতভর ঝগড়া করে ফেইসবুকে রোমান্টিক যুগলের ন্যাকা ন্যাকা ছবির অভিনয় অথবা দিনভর অফিসের বসের ধমক আর কটু কথা শুনে সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে একজন সুখী স্বামী আর হাসিমুখের কমেডিয়ান বাবার ভূমিকায় অভিনয়। বুকের ভেতর আগলে রাখা এ সংসারটার কেউ যেন জানতে না পারে, ছা-পোষা বেতনের এ চাকরীটা টিকিয়ে রাখার জন্য কত অসম্মানই না তাকে সহ্য করতে হচ্ছে ! জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও এ অভিনয় থেকে নিস্তার নেই কারো। ছেলের সংসারে বোঝা হয়ে পড়ে থাকা বাবাকেও সুনিপুন অভিনয় করে যেতে হয়। পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী, নীরোগ আর অনুভূতিহীন মানুষের অভিনয়। ভুলক্রমেও বাড়ির কাউকে বোঝানো যাবেনা যে গত কয়েকমাস ধরেই রোজ রাতে কী প্রচন্ড কাশিতে ভুগছেন তিনি। কোমরের ব্যাথাটা এতোই বেড়েছে যে সকালে বাজারের থলে হাতে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠতে আজকাল তাকে দু'বার মাটিতে বসে জিরোতে হয়। উৎবৃত্ত মানুষ হিসেবে অপরাধের বোঝাটা আর ভারী করা চলবে না। অতএব অভিনয়ই একমাত্র ভরসা।
সুপারমলে মাসের বাজার ঝুড়িতে তুলে দাম পরিশোধ করার জন্য লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে আমি আর ফরহাদ সাহেব। দোকানী জিনিস হিসেব করে ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রে দাম টুকছেন। একটা স্নায়বিক চাপকে গোপন করে সেদিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন ফরহাদ সাহেব। মনে মনে হিসেব করে নিচ্ছেন ক্রেডিট কার্ডের তলানিতে পড়ে থাকা অল্প কটা টাকা দিয়ে এ বাজারের হিসেবটা পার করে দেয়া যাবে তো ! হঠাৎ আমার দিকে চোখ পড়তেই একটা ঝলমলে মিথ্যে হাসিতে চোখমুখ ভরিয়ে আমাকে বললেন- "তোর আর কিছু লাগবে বউ?" আমি অবাক হয়ে সে অভিনয় দেখি। কী চমৎকার অভিনয়। শক্তিমান অভিনেতারা সত্যিই অন্যের চোখে জল আনতে পারে। নিজের চোখের জল গোপন করে রাখাটাও কিন্তু কম কঠিন অভিনয় নয়।

0 coment rios:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন