আদালত হচ্ছে আইনের চর্চ্চা কেন্দ্র, ইতিহাসের নয়। গত ০২ ফেব্রুয়ারী, ২০১৬ তারিখে বাংলাদেশে অবস্থিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মুক্তিযুদ্ধ ও শহীদের ইতিহাস নিয়ে ব্যাপক চর্চ্চা করেছে। ত্রিশ লাখ শহীদ ও দুই লাখ সম্ভ্রমহারা মা-বোন প্রসঙ্গে একটি আংশিক রায় দিয়েছে। রায়ে উল্লেখ হয়েছে, “মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ মানুষের শহীদ হওয়া ও লাখ লাখ নারীর সম্ভ্রম বিসর্জন প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস। এই ইতিহাস মুক্তিযুদ্ধের পবিত্র আবেগ ও গৌরবের মধ্যে মিশে আছে।” মুক্তিযুদ্ধে ত্রিশ লাখ শহীদের সংখ্যা সঠিক হলে বাংলাদেশে প্রচলিত মাত্র দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধা তালিকা কেন অবৈধ নয়, সে প্রসঙ্গে আদালত কোনো মন্তব্য করেনি। হয়তোবা আদালত শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধার তফাৎ সম্পর্কে অবহিত নয়। প্রকৃতপক্ষে যারা যুদ্ধে শহীদ হন, তারা অবশ্যই যোদ্ধা। যোদ্ধা ছাড়া কেউ কি কখনো শহীদ স্বীকৃতি পায়? একথা সত্য যে, সকল শহীদ যোদ্ধা কিন্তু সকল যোদ্ধা সর্বদা শহীদ হয় না। কারণ, যে কোনো যুদ্ধে শহীদের তুলনায় যোদ্ধা সংখ্যা সাধারণত বেশী থাকে। যোদ্ধাদের কতক শহীদ হয়, কতক বন্দী হয় আর অনেকে হয় গাজী। ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধেও তাই হয়েছে। এদেশের সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালির মধ্যে ত্রিশ লাখ শহীদ হয়েছে, দুই লাখ নারী সম্ভ্রম হারিয়েছে, বঙ্গবন্ধুসহ প্রায় পাঁচ লাখ বাঙ্গালি বন্দী দিন কাটিয়েছে, প্রায় এক কোটি বাঙ্গালি ভারতে শরণার্থী হয়ে মানবেতর দিনাতিপাত করেছে এবং অবশিষ্ট সকল বাঙ্গালি দেশে অবস্থান করে যে যেভাবে পেরেছে, প্রাণপণ লড়াই করেছে। তারা প্রত্যেকে এক একজন মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু বাংলাদেশে উক্ত ত্রিশ লাখ শহীদ আজও মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি পায়নি কেন? বাংলাদেশে যে দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধা কোটা ও তালিকা প্রচলিত, তাই কি সঠিক? বাংলাদেশে শহীদের সংখ্যা ত্রিশ লাখ আর মুক্তিযোদ্ধা সংখ্যা মাত্র দুই লাখ, এতো তফাৎ কেন? এ দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধাই কি দেশ স্বাধীন করেছে? মুক্তিযুদ্ধে কি অন্য কারো কোনো অবদান নেই? খোদ বঙ্গবন্ধুর নামটি প্রচলিত মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নেই কেন? বঙ্গবন্ধু কি মুক্তিযোদ্ধা নয়? ইতিহাসের এ সকল অন্যায় ও অবৈধ বিষয়ে আদালত নিশ্চুপ কেন? এ সকল মানবিক বৈষম্য এড়িয়ে আদালত অযথা ইতিহাসের আবেগ, অনুভূতি ও ঘটনা প্রসঙ্গে রায় দেয় কেন? তাতে কি সুস্পষ্ট হয় না যে, আদালত আইনের চর্চ্চা বাদ দিয়ে ইতিহাসের চর্চ্চা শুরু করেছে?
এ্যাডভোকেট, ঢাকা।
সিরাজী এম আর মোস্তাক
খবর বিভাগঃ
সম্পাদকীয়
সিরাজী এম.আর মোস্তাক এর লেখা
