শুক্রবার, ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০১৬

মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা বিতর্কের শেষ সমাধান। The Final Solution for argue on the Number of Martyrs in 1971.

সম্প্রতি সাবেক বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এক বিবৃতিতে মুক্তিযুদ্ধে সুনির্দিষ্ট ত্রিশ লাখ শহীদের সংখ্যা প্রসঙ্গে সংশয় প্রকাশ করেছেন। এজন্য তার বিরূদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হয়েছে। তার বিরূদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রতিদিনই আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা কোটাভোগী স্বার্থান্বেষী বিভিন্ন গোষ্ঠি প্রতিদিন মহাসড়ক ও পরিবহনে বাধা সৃষ্টি করে এ আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। তাই চলমান সমস্যা ও মুক্তিযুদ্ধে বীর শহীদদের সংখ্যা নিয়ে সৃষ্ট বিতর্কের একটি চুড়ান্ত সমাধান প্রয়োজন।
মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সংখ্যা কোনো সমস্যা নয়, সমস্যা মূলত শহীদদের স্বীকৃতি নিয়ে। যারা যুদ্ধ করে শহীদ হন, তারা যোদ্ধা এবং শহীদ দুইই। আর যারা গাজী বা ভুক্তভোগী হন, তারা শুধু যোদ্ধা। যোদ্ধা না হয়ে কেউ কি শহীদ স্বীকৃতি পেতে পারে? আগে যোদ্ধা, তারপর তো শহীদ। অর্থাৎ, যোদ্ধা ও শহীদ অভিন্ন। সব শহীদই যোদ্ধা, কিন্তু সব যোদ্ধা শহীদ নয়। শহীদের চেয়ে যোদ্ধা সংখ্যা অবশ্যই বেশী। কারণ যোদ্ধাদের মধ্যে শহীদ, গাজী, আহত ও বন্দী সবই থাকে। কতক শহীদ হয়, কতক বন্দী হয় আর অনেকে হয় গাজী। ১৯৭১ সালে আমাদের মুক্তিযুদ্ধেও তাই হয়েছে। এদেশের সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালির মধ্যে ত্রিশ লাখ প্রাণ বিসর্জন করেছে, দুই লাখ নারী সম্ভ্রম হারিয়েছে, বঙ্গবন্ধুসহ প্রায় পাঁচ লাখ বাঙ্গালি বন্দী দিন কাটিয়েছে, প্রায় এক কোটি বাঙ্গালি ভারতে শরণার্থী হয়ে মানবেতর দিনাতিপাত করেছে এবং অবশিষ্ট সকল বাঙ্গালি দেশে অবস্থান করে যে যেভাবে পেরেছে প্রাণপণ লড়াই করেছে। তারা প্রত্যেকে এক একজন মুক্তিযোদ্ধা। বাঙ্গালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সুস্পষ্টভাবে উক্ত সাড়ে সাত কোটি মুক্তিযোদ্ধাকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তিনি ৬৬৯ জন যোদ্ধা ও মাত্র সাতজন শহীদকে খেতাব দিয়েছেন। এছাড়া অবশিষ্ট সকল যোদ্ধা ও শহীদদেরকে সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা ঘোষণা করেছেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যার পর তার ঘোষণা পুরো পাল্টে গেছে। সাড়ে সাত কোটি যোদ্ধার বিপরীতে মাত্র দুই লাখ ব্যক্তি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে। দুই লাখ সম্ভ্রমহারা মা-বোনের বিপরীতে মাত্র ৪১ নারী বীরাঙ্গনা হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে। লাখো শহীদ সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি থেকেও বঞ্চিত হয়েছে। খোদ বঙ্গবন্ধুর নামটিও মুক্তিযোদ্ধা তালিকার বাইরে রয়েছে। ১৯৭১ এর সাড়ে সাত কোটি যোদ্ধা ও তাদের ত্রিশ লাখ শহীদের এই স্বীকৃতি বঞ্চণাই বর্তমান বিতর্কের মূল কারণ।
সুতরাং বর্তমানে যারা ত্রিশ লাখ শহীদের সংখ্যাটি অকাট্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান, তাদের উচিত আগে প্রচলিত দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধা তালিকার বিরূদ্ধে আন্দোলন করা। কারণ, ত্রিশ লাখ শহীদের বিপরীতে মুক্তিযোদ্ধা সংখ্যা মাত্র দুই লাখ কখনো সঠিক নয়। শহীদের তুলনায় যোদ্ধা সংখ্যাটি একেবারেই কম হয়েছে। তেমনি দুই লাখ সম্ভ্রমহারা মা-বোনের বিপরীতে মাত্র ৪১ বীরাঙ্গনার সংখ্যাটি সম্পুর্ণ অবাস্তব প্রতিয়মান হয়েছে। তাই ত্রিশ লাখ শহীদ ও দুই লাখ সম্ভ্রমহারা মা-বোনের সংখ্যাটি আদেী সত্য কিনা, তার নিশ্চয়তা জরুরী। তারা এমনিতে মারা গেছে, নাকি শহীদ হয়েছে, নাকি রাজাকারি করে মৃত্যুবরণ করেছে, তা নিশ্চিত করা উচিত। তাদের মৃত্যুটি সাধারণভাবে বা রাজাকারিভাবে হয়েছে মনে করলে, সকল বিতর্কের সহজ সমাধান পাওয়া যায়। আর তাদেরকে শহীদ হিসেবে স্বীকৃতি দিলে, বর্তমান প্রচলিত মুক্তিযোদ্ধা তালিকা ও কোটানীতি বাতিল করতে হয়। এতে ত্রিশ লাখ শহীদ ও দুই লাখ সম্ভ্রমহারা মা-বোন সবাইকে মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি প্রদান করতে হয়। তাতে দেশের ষোল কোটি নাগরিক সবাই মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারের সদস্য বিবেচিত হয়।  
সুতরাং প্রচলিত দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধা কোটানীতি বাতিল করলেই মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা প্রসঙ্গে সকল সংশয় ও বিতর্কের অবসান হবে। দেশে মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা বিভাজন দূর হবে। মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে সৃষ্ট বিতর্কের এটাই চুড়ান্ত ও সর্বশেষ সমাধান।
সিরাজী এম আর মোস্তাক
এ্যাডভোকেট, ঢাকা।

mrmostak786@gmail.com.


শেয়ার করুন