আদি বাংলার ইতিহাস
(প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্ব ১০৯
* সামরিক ব্যবস্থা*
প্রতিরক্ষা মানুষের প্রকৃতিগত ও জৈবিক ধারণা প্রসূত। আত্মরক্ষার জন্য জন্মগতভাবে মানুষ নিজের শক্তির উপর নির্ভর করতে হয়েছে, আর শক্তি বৃদ্ধির জন্য অস্ত্রধারণ করেছে। প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই মানুষ অস্ত্রধারী। বনের জানোয়ার ও শত্রুর আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য অস্ত্রধারী হওয়াই যথেষ্ট ছিল না, তারা দলবদ্ধ হয়ে শক্তিকে সুসংহত করেছে। প্রাগৈতিহাসিক যুগেই দলবদ্ধ মানুষের প্রতিনিধি অংশ অস্ত্রধারণ করে একক ও যৌথভাবে নিজের ও দলের অন্যদের নিরাপত্তা দেয়ার চেষ্টা করেছে। প্রাগৈতিহাসিক যুগে বাংলাদেশের মানুষের হাতে কিরূপ অস্ত্র ছিল তা এখনও স্পষ্ট নয়। যেসব দেশে পাথর পাওয়া যেতো, সেখানে পাথরের অস্ত্র দিয়ে তাদের যাত্রা আরম্ভ হয়েছিল, কিন্তু বাংলাদেশে প্রাথমিক স্তরের পুরাতন বা নব্যপ্রস্তর যুগের, প্রচুর পাথরের অস্ত্র এযাবত পাওয়া যায়নি। ১৮৮৬ সালে আর.ডি. ব্যানার্জী, ১৯১৭ সালে জে. কগিন ব্রাউন তার Prehistoric Antiquities of India Preserved in Indian Museum গ্রন্থে, ১৯৫৮ সালে ডাইসন, ১৯৬৩ সালে ছাগলনাইয়াতে প্রাপ্ত এবং ১৯৭৯ সালে আহমেদ জানান বাংলাদেশের বিভিনড়ব স্থানে প্রাপ্ত জীবাশ্ম কাঠের তৈরি নব্যপ্রস্তর যুগের অস্ত্রের কথা। এসবই কুঠার জাতীয় অস্ত্র। তবে পুরাতন প্রস্তর যুগের কোন অস্ত্র এযাবত বাংলাদেশে পাওয়া যায়নি। সম্প্রতি, ২০০৫-৬ সালে মোঃ হাবিবুল্লাহ পাঠান জানিয়েছেন ওয়ারী বটেশ্বর এলাকায় আটটি নবোপলীয় সেন্ট পাওয়া গেছে। এতে বুঝা যায়, বাংলার লালমাটি অঞ্চলে নবোপলীয় যুগের মানুষ বাস করতো এবং তারা জীবাষ্ম কাঠের কুঠার জাতীয় অস্ত্র ব্যবহার করতো। তখন ব্যক্তিগত ও দলীয় উভয় প্রকারেই আত্মরক্ষার্থে, শিকারে বা শত্রুর মোকাবেলা অস্ত্রের ব্যবহার জানতো। তবে পশ্চিম বাংলার কোনো কোনো অঞ্চলে পুরাতন প্রস্তর যুগের পাথরের প্রচুর অস্ত্র পাওয়া গেছে। পশ্চিম বাংলায় পুরাতন প্রস্তরযুগ থেকেই লোকবসতি ছিল এবং তারা পাথরের ও জীবাশ্ম কাঠের অস্ত্রশস্ত্রের ব্যবহার করতো। বাংলার সংলগ্ন পূর্বাঞ্চল, ত্রিপুরা ও আসামে পুরাতন প্রস্তর যুগের ও নব্যপ্রস্তর যুগের কিছু কিছু পাথরের অস্ত্র পাওয়া গেছে, এগুলিও কুঠার জাতীয় অস্ত্র। এদেশের মানুষ ঐতিহাসিক যুগের সূচনাতেও তরবারীর ব্যবহার জানতো না এবং সে যুগের কোন তরবারী এযাবত পাওয়া যায়নি, তবে, ছুরার ব্যবহার জানতো এবং কোনো কোনো স্থানে ছুরা পাওয়া গেছে। এদেশে তরবারী ব্যবহারের পূর্ব থেকেই তারা জানতো দা-এর ব্যবহার। পরবর্তীকালে বিভিনড়ব রকমের দা-ই ছিল তাদের আত্মরক্ষার প্রধান অস্ত্র। আক্রমনাত্মক অস্ত্রের উল্লেখযোগ্য ব্যবহার ছিল বল্লমের এবং পরবর্তীকালে তীর ধনুকের। তীর ধনুক সম্ভবত ঐতিহাসিক যুগের সূচনালগ্নের পূর্বে ছিল না।
নবোপলীয় যুগ পর্যন্ত একটি দল বা গোত্রের সক্ষম নারী-পুরুষ সকলেই অস্ত্রধারী ছিল। বন্য জানোয়ার ও শত্রুর আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য দলের প্রত্যেকটি সদস্যকেই অস্ত্র বহন করতে হতো। কিন্তু ঐতিহাসিক যুগের প্রারম্ভ থেকে ধাতুর ব্যবহার আরম্ভ হওয়ায় অস্ত্রের কার্যকারিত অনেক বেড়ে যায়। তাছাড়া, দলের একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে কৃষি ও গৃহস্থালির কোনো কোনো কাজে ব্যস্ত থাকায়, তাদের নিরাপত্তা অন্যদের দিতে হতো। এভাবেই দলের নিরাপত্তার জন্য কিছু সংখ্যক পুরুষ নিয়ে লাঠিয়াল বাহিনী গড়ে উঠে। জনগোষ্ঠীর লাঠিয়াল বাহিনীর সদস্য হিসেবে তারা নিজের, দলের ও দলীয় জনগোষ্ঠী এবং মালের নিরাপত্তার জন্য যুদ্ধ করতে হতো। তারাও বেতনভুক্ত সরকারি বা বেসরকারি যোদ্ধা ছিল না। তবে কোনো কোনো সময় তারা যুদ্ধে লব্ধ মালামালের লোভে এবং সময়ে বীরত্ব প্রদর্শনের জন্যও যুদ্ধে যেতো।এ.সি. দাস তাঁর গ্রন্থে অনুরূপ মত প্রকাশ করে বলেন: ‘People fought for their own safety but the love of adventure as also loot and plunder, motivated the soldiers’841’৮৪১ তাদের বেতন সম্পর্কে ই.ডব্লিউ হপকিনস্ (E.W. Hopkins) বলেন: ‘In the pre-epic period the soldier’s pay was a part of the booty’|
এই লাঠিয়াল বাহিনীই পরবর্তী রাজা মহারাজার সামরিক বাহিনীর পূর্বসূরী। দলের প্রধানই থাকতেন এই লাঠিয়াল বাহিনীর প্রধান। কারণ, এক সময়ে দলকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য এই দলীয় লাঠিয়াল বাহিনীকে নিয়ম-শৃঙ্খলাতে রাখার প্রয়োজন ছিল। ঐতিহাসিক কালের প্রারম্ভ থেকেই বাংলায় বসবাসকারী বিভিন্ন অঞ্চলে বিভক্ত অস্ট্রিক ভাষাভাষীরা আর গোষ্ঠীবদ্ধ ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না। এরা একটি জাতি হিসেবে বাংলাদেশ থেকে আরম্ভ করে ভারতের মধ্যভাগ পর্যন্ত বহু অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বাস করতে ছিল। বিশেষ করে বাংলাদেশে বসবাসকারী অস্ট্রিকরা জানোয়ার ছাড়া অন্য মানুষ দ্বারা সামরিক অভিযানের কোন আশঙ্কা করতো বলে মনে হয় না। ঐতিহাসিক যুগের সূচনা থেকেই এরা উদ্ধৃত্ত উৎপাদনকারী হিসেবে বিনিময় বাণিজ্যের জন্য দেশে ও বিদেশে পরিচিতি লাভ করেছিল। খ্রিষ্টপূর্ব ১৫ শতক থেকেই বঙ্গোপসাগর, আরব সাগর ও পূর্বের চীন উপসাগরের তীরবর্তী জনপদগুলির সঙ্গে বিনিময় বাণিজ্যের সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল বলে জানা যায়। তারা কৃষি উৎপাদন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য যতটা আগ্রহী ছিল, সামরিক অভিযানের বিষয়ে ততটা চিন্তিত ছিল না। তারা তখন কি ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করতো পূর্ণ পরিচিতি পাওয়া না গেলেও অনুমান করা যায়, খ্রিষ্টপূর্ব ৮/৭ শতক
পর্যন্ত এদেশে লৌহের অস্ত্রশস্ত্র অল্পই ছিল। কারণ, তখন পর্যন্ত বিহারের লৌহ খনি থেকে লৌহ উত্তোলন শুরু হয়নি। উত্তর ভারতে কিছু কিছু লৌহ আড়ক পাওয়া যেতো এবং ভারতের বাইরে থেকে গান্ধার ও বৎস্য রাষ্ট্রের মধ্য দিয়ে লৌহ আসত, কিন্তু এ উৎসগুলি ছিল সম্পূর্ণভাবে আর্যদের নিয়ন্ত্রণে। আর যুগটা ছিল লৌহশক্তির করতলগত। লৌহই ছিল শক্তির মাপকাঠি। বাংলার সঙ্গে তখন লৌহ আর অপরিচিত ছিল না, কিন্তু লৌহের পর্যাপ্ত সরবরাহ ছিল না বিধায় লৌহের অস্ত্রশস্ত্রের পরিবর্তে তখনো অস্ট্রিকরা ব্যবহার করতো তামা ও ব্রোঞ্জের অস্ত্র। সম্ভবত ৭০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের মধ্যেই অস্ট্রিকদের পরিচয় প্রায় মুছে গিয়ে কতগুলি সংকর জনপদ, যেমন- পুণ্ড্রবর্ধন, বঙ্গ, সুহ্ম, কলিঙ্গ, তাম্রলিপ্তি প্রভৃতি গড়ে উঠেছে যাদের হাতে লৌহের উন্নত অস্ত্র যেমন- দা, তীর-ধনুক, কুঠার, বল্লম প্রভৃতি প্রচুর ছিল না। কিছু কিছু থাকলেও তারা তখনো তরবারীর ব্যবহার জানতো বলে মনে হয় না। এই জনপদগুলি রাষ্ট্র হিসেবে অস্তিত্ব না থাকলেও তারা নিশ্চয় দলীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থার অধীনেই বাস করতো। এই প্রশাসনিক ব্যবস্থায় লাঠিয়াল বাহিনীর প্রধান সমাজে এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন। এদের অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও ব্যবহৃত সরঞ্জাম সম্পর্কে আমরা পুরোপুরি অন্ধকারেই আছি। মহাভারতে উল্লেখ আছে যে, ভীম বাংলাদেশের রাজন্যবর্গকে পরাজিত ও হত্যা করে বাংলাকে পদানত করেছিলেন। মহাভারতের ভাষ্য অনুসারে পুণ্ড্রবর্ধন ও বঙ্গে রাজাগণ তার সঙ্গে যুদ্ধ করে পরাজিত হন। মহাভারতের ভাষ্য যা-ই হোক, আর্যরা কারো না কারোর নেতৃত্বে বাংলা জয় করেছিলেন এবং দেশের অধিবাসীরা পরাজিত হয়ে কেউ কেউ দেশ ত্যাগ করেছিলেন এবং আবার কোন শাখা পার্শ্ববর্তী বনে জঙ্গলে আশ্রয় দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। আর, যারা দেশে আর্যদের অধীনতা স্বীকার করে থাকতে হয়েছিল, তারা দাসত্ব বরণ করে পরবর্তী ১৫০০ বছর (শশাঙ্কের ক্ষমতা দখল ৬০০ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত অমানবিক জীবন কাটাতে হয়েছে এবং ৪র্থ বর্ণ ও বর্ণ বহির্ভুত মানব প্রজাতি হিসেবে ইতিহাসে স্বাক্ষর রেখেছে।
বাংলাদেশের আদি জনবসাতি অস্ট্রিকভাষাভাষীরা সামরিক জাতি ছিল না বা তাদের সামরিক ক্রিয়াকাণ্ডের উল্লেখযোগ্য কোন প্রমাণও আমাদের সামনে বর্তমান নেই। বাংলার আদিবাসী হিসেবে তারা নানা কারণে সুরক্ষিত ছিল। প্রথমত বাংলা ছিল একটি বিচ্ছিন্ন এলাকা, যেখানে বাইরে থেকে আসা এবং বেরিয়ে যাওয়া ব্যক্তিগতভাবে বা ছোটখাট দলের পক্ষেও সম্ভব ছিল না। তাছাড়া, বাংলার ভিতরের অধিবাসীরাও বিশাল এক একটি নদীর জন্য পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। তাছাড়াও জঙ্গলাকীর্ণ জলাভূমি যাতায়াতের জন্য কোন সময় অনুকূল ছিল না। এসব কারণে এক একটি বিচ্ছিন্ন জনবসতি প্রাকৃতিগতভাবেই বিচ্ছিন্নভাবে জীবনযাত্রা করতো এবং বাইরের শত্রু থেকেও আক্রমণের সম্ভাবনা অনেক কম ছিল। বিশেষ করে, প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে খ্রিষ্টপূর্ব ৮/৭ শতক সাল পর্যন্ত আর্যরা ছাড়া এদেশের বিরুদ্ধে আর কোন বিরাট সামরিক অভিযান কেউ চালায়নি। সম্ভবত প্রমাণ না থাকলেও অনুমান করা যায় খ্রিষ্টপূর্ব ৮/৭ শতক সাল পর্যন্ত এদেশের অধিবাসীরা নিরবিচ্ছিন্নভাবে শান্তি-শৃঙ্খলার সাথেই বাস করতে ছিল। এজন্যই ভিতরের বা বাইরের শত্রু থেকে নিরাপদ থাকার কারণে, এদেশের আদিম অধিবাসী অস্ট্রিকরা বহু পূর্ব থেকেই গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে বাস করার প্রচলন প্রায় ভুলেই গিয়েছিল।
এমনকি পূর্ব থেকে আগত মঙ্গোলীয় জাতিগোষ্ঠীর শাখা এবং পশ্চিম দিক থেকে দ্রাবিড়রা বাংলাদেশে আসলেও স্থায়ী অধিবাসীদের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী বা বিশেষ কোন সামরিক অভিযানের কথা জানা যায় না। তাদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়ে থাকলেও তা ছিল সাময়িক। সম্ভবত পরস্পরের মধ্যে বোঝাপড়া হয়ে সহাবস্থান নিয়েছিল। প্রথমবার আদিম অধিবাসীর বিরুদ্ধে বড় ধরনের এবং ভীষণ আকারের সামরিক অভিযান যদি হয়ে থাকে তবে তা ছিল আর্যদের আক্রমণ। কারণ, তখন থেকেই এদেশের অধিবাসীদের জীবনযাত্রা, চিন্তা-চেতনা এবং জীবন ধারণ পদ্ধতিতে এক ব্যাপক এবং দীর্ঘস্থায়ী অবনতি নেমে আসে, যা অস্ট্রিকরা আর কোনদিন পুনরোদ্ধার করতে পারেনি। কাজেই বাঙালি জাতির সমরসজ্জা হওয়ার মতো কোন পরিবেশ তারা কোনদিনই পায়নি। প্রথম ভূমিপুত্র যিনি বাংলার শাসন ব্যবস্থা হাতে নিতে পেরেছিলেন- তিনি শশাঙ্ক। তারপরে আসে বাঙালি পালদের শাসন। কাজেই আদিযুগে দলীয়ভাবে গোত্রের মধ্যে সামরিক অস্ত্রসজ্জা বা প্রশিক্ষণ এমন বিশেষ কিছু ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে, মানুষের আদিকাল থেকে বন্য জন্তু-জানোয়ার ও শত্রুর আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য স্থানীয় ধরনের অস্ত্রশস্ত্র তারা নিশ্চয় ব্যবহার করতো, যা আজও আদিবাসী ভূমিপুত্রদের মধ্যে দেখা যায়।
আমরা আর্যদের আক্রমণের বিভিষীকার স্বাক্ষ্য আরও পূর্ব থেকেই পেয়েছি। প্রায় ৭ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার৮৪৩ এলাকার বসবাসকারী ৪০ লক্ষ অধিবাসীকে৮৪৪ সিন্ধু নদীর অববাহিকা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকে সমূলে বিতাড়িত করে আর্যরা সমস্ত সিন্ধু, পাঞ্জাব, মধ্যভারত অধিকার করেছিল।৮৪৫ তার আরো কয়েকশত বছর পরে হলেও বাংলা অধিবাসীর সংখ্যা তখন ১৩ লক্ষের উপর ছিল বলে মনে হয় না। লৌহের ব্যাপক ব্যবহার আরম্ভ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বাংলায় প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৬ জনের অতিরিক্ত মানুষ বাস করতো বলে পণ্ডিতদের ধারণা। দক্ষিণ বাংলায় তখনো জনবসতি গড়ে উঠেনি। এই ১৩ লক্ষ অধিবাসীর বিভিন্ন জনপদ ভিত্তিক শক্তিকে আর্যদের উন্নত লৌহের অস্ত্র, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সামরিক বাহিনী, প্রভূত যুদ্ধের অভিজ্ঞতা নিয়ে পরাজিত করা তাদের জন্য খুব কষ্টকর ছিল না। তখন থেকে পরাজিত বাংলার অধিবাসীর অস্ত্রধারণ ও ব্যবহার নিষিদ্ধ হয়ে গেল। এ ধরনের একটি সিদ্ধান্তে আসার জন্য যথেষ্ট ঐতিহাসিক উপাত্ত আমাদের কাছে বর্তমান না থাকলেও কিছু যুক্তিকতা রয়েছে। বেদে এবং অন্যান্য আর্যসাহিত্যে উল্লেখ আছে যে, তাদের দেবতা ইন্দ্র হরিউপিয়া, প্রাগার্ম হরপ্পা নামের সংস্কৃতায়ন, অর্থাৎ (স্বর্ণনির্মিত যুগস্তম্ভ নগরী) ধ্বংস করেছিলেন।৮৪৬ আর্যকর্তৃক বাংলাদেশ জয় করার উল্লেখ কোথাও নাই, শুধু মহাভারতে উল্লেখ আছে, দ্বিতীয় পাণ্ডব ভীম পুণ্ড্রবর্ধন ও বঙ্গ জয় করে সমুদ্র-উপকূল পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন। মহাভারতে বর্ণিত ঘটনা যদি বিশ্বাসযোগ্য হয় তবে বুঝতে হবে ভীম নিশ্চয় খ্রিষ্টপূর্ব ৭ম শতাব্দীর বহু পূর্বে কোন সময় বাংলাদেশে এসেছিলেন। কারণ, খ্রিষ্টপূর্ব ৮ম শতাব্দীর প্রারম্ভেই আর্যরা ভারতে আর রাষ্ট্রশক্তির অধিকারী ছিল না। আর্য বাসস্থান সিন্ধু-পাঞ্জা ও গান্ধঅর (উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ) খ্রিষ্টপূর্ব ৮ শতকের প্রথম দিকেই পারস্য সম্রাট দখল করে নেয় এবং ষষ্ঠ শতকের প্রথম দিকেই আর্যরাষ্ট কুরু, পাঞ্জাল ও মৎস্য আর্য রাষ্ট্র মগধের দখলে চলে আসে। কাজেই বেদের যুগেই বাংলাদেশে আর্যরা এসে থাকবে। তবে তাদের এদেশ দখল করা সম্পর্কে নিশ্চয়তা পাওয়ার কারণগুলি হল:
ক) খ্রিষ্টপূর্ব ৭ম শতক থেকে এদেশের জনসাধারণকে নিন্মবর্ণে (শূদ্র) ও পরাজিত দাস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
খ) আর্যরা এবং আযর্- অনুসারী দ্বিজবর্ণের লোকেরা এদেশের ভূমিপুত্রদের কাউকে বৈশ্য বলেও স্বীকার করেনি।
গ) এদেশের জড়োপাসকদের উপর বৈদিক ধর্ম চাপিয়ে দেয়া হয়।
ঘ) স্থানীয় অধিবাসীদের জাগতিক এবং ধর্মীয় কোন অধিকার ছিল না।
ঙ) এদেশবাসী বৈদিক ধর্ম স্বীকার করলেও ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে তাদের আদি জড়োপাসনাকেই আঁকড়িয়ে রেখেছে।
চ) ১৫০০ পূর্বাব্দেই এদেশের আদিবাসী অস্ট্রিক ভাষাভাষীদের শুধু ব্যবসা নয়, বহিঃবাণিজ্যেও লিপ্ত ছিল, কিন্তু বেদের
যুগের পরে তাদেরকে তার পূর্বাবস্থাতেও পাওয়া যায়া না। তাদেরকে দাস ও শ্রমিক শ্রেণীতে অবনমিত করা হয়।
ছ) আর্য ধর্ম ও প্রশাসনের প্রতিভূ হিসেবে সমস্ত বাংলায় ব্রাহ্মণদেরকে সামন্তপ্রভু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। তবে
পশ্চিম বাংলায় যতখানি নিবিড়ভাবে সম্ভব হয়েছিল পূর্ব বাংলার সেভাবে সম্ভব হয়নি।
এদেশে ব্রাহ্মণ প্রতিষ্ঠা হাজার বছরের অধিককাল ধরে চলতেছিল এবং সেন আমলে এসে শেষ হয়। তবে পরবর্তীকালে কৌটিল্যের দাবিতে পাঁচ শ্রেণীতে বিভক্ত ব্রাহ্মণদের প্রায় সবাই পশ্চিম বাংলাতেই স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। কুলীন, শ্রোত্রীয়, গৌন কুলীন, বংশজও সপ্তশতী গোষ্ঠীর মধ্যে শেষ দুই শ্রেণীর ব্রাহ্মণরাই শুধু বাংলাদেশে ছিল বলে জানা যায়। এ কারণেই বোধ হয় পাল পূর্ব যুগে থকে বর্তমান কাল পর্যন্ত পশ্চিম বাংলার নেতৃত্ব ব্রাহ্মণদের হাতেই ছিল এবং এখনও তাদের হাতেই আছে। কিন্তু পূর্ব বাংলার তার বিপরীত। পালদের পূর্ব কাল থেকেই এখানে শূদ্রদরে তার বিপরীত। পালদের পূর্বকাল থেকেই এখানে শূদ্রদের প্রাধান্য। এমনকি পালরাও শূদ্র শ্রেণী থেকেই আগত।৮৪৭ তাদের বিরুদ্ধে যারা দীর্ঘকাল থেকে থেকে বিদ্রোহ করেছে তাদের সবাই শূদ্র এবং আজও যারা বাংলাদেশে নেতৃত্ব দিচ্ছে তাদের সবাই শূদ্রদেরই বংশোদ্ভূত ধর্মান্তরিত মুসলমান। বিদেশাগত আশরাফ মুসলমানদের শাসন ও নেতৃত্ব এদেশের ধর্মান্তরিত মুসলমানের কোন প্রজন্মই মনে প্রাণে গ্রহণ করতে পারেনি। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ এই ধারার শেষ ঘটনা। শূদ্রদের অবস্থার পরিবর্তনের জন্য শূদ্রদের থেকেই বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর পূর্ব বাংলা থেকে উঠে এসেছে, কিন্তু পশ্চিম বাংলা থেকে বাধা এসেছে ক্ষত্রিয় রক্তধারার অনুগত ব্রাহ্মণদের থেকে। মাত্র এই সেদিন ঢাকার রাজনগরের বৈদ্যবংশীয় মহারাজ রাজবল্লভ রাজনগরে বিশাল জনসমাজে ধর্মীয় অধিকার হিসেবে বৈদ্যদের উপর্বীত ধারণের অধিকার ঘোষণা করেছিলেন, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে নদীয়ার ব্রাহ্মণ জমিদার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের নেতৃত্বে পশ্চিম বাংলার সমস্ত ব্রাহ্মণ সমাজ এই অধিকার অস্বীকার করেছিলেন।৮৪৮ যুগে যুগে পূর্ব বাঙলায় সফল নেতৃত্ব এসেছে শূদ্রবংশীয়দের উত্তরপুরুষ থেকে সর্ববাংলার ভিত্তিতে আর পশ্চিম বাংলার নেতৃত্ব এসেছে খাঁটি ব্রাহ্মণদের থেকে সর্বভাতরীয় ব্রাহ্মণ সংস্কৃতির ভিত্তিতে। এটুকুই পূর্ব ও পশ্চিমে বাংলার নেতৃত্বে পার্থক্য যেমন ছিল আদিকালে, আজও আছে তেমনি।
বাংলার উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের কিছু অধিবাসী এই বর্ণের আওতায় আসেনি এবং অধীনতাও স্বীকার করেনি। তারা সরাসরি আর্যদের প্রতিনিধিত্বে প্রতিষ্ঠিত প্রশাসনিক ক্ষমতার অধীনে বাস না করে আরো পূর্বদিকে পাহাড়ি বনাঞ্চলে চলে যায়। তারা অস্ত্রধারণ করতো। এরাই বাংলার উত্তর পূর্বাঞ্চলে বসবাসকারী আদিবাসী ভূমিপুত্র। পরবর্তী বহুযুগ পর্যন্ত টিপরা বা গারো ও চাকমা ত্রিপুরা, জনগোষ্ঠী নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে সামর্থ হয়েছিল। আর্যদের বাংলা বিজয়ের পর অর্থাৎ ৮০০/৭০০ খ্রিষ্টপূর্বাবদ্ধ থেকে বাংলার সামরিক শক্তি ও অস্ত্রশস্ত্রের ইতিহাস লিখলে, লিখতে হবে বিজয়ী শক্তির সামরিক ইতিহাস এবং অল্প সংখ্যক আদিবাসী ভূমিপুত্রদের দুর্দমনীয় সামরিক জীবনের ইতিহাস।
আর্যদের বাংলা আক্রমণকাল (সম্ভবত খ্রিষ্টপূর্ব ৮ম শতাব্দী) থেকে খ্রিষ্টোত্তর ৬ষ্ঠ শতক পর্যন্ত বাঙালি স্বাধীনতা ভোগ করেনি। উল্লেখ করা হয়েছে যে, এ সময়ে বাংলার অধিবাসীদের অস্ত্র বহন করার কোন অধিকার ছিল না। এদেশের অধিবাসীদের কখনও ক্ষত্রিয়দের মর্যাদা দেওয়া হয়নি এবং ব্রাহ্মণ্য ধর্মানুসারীরা বা পরবর্তীকালে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরাও এদেশে ক্ষত্রিয়ের বসবাস আছে বা ছিল তা স্বীকার করেনি। যদিও অতি অল্প দূরে নেপালে, শাক্য, লিচ্ছবি, আরও অন্য কোনো কোনো গোত্রকে ক্ষত্রিয় গোত্র ও রাষ্ট্রশক্তি হিসেবে সর্ব-ভারতীয় ভিত্তিতে সমস্ত জনপদেই স্বীকৃতি দেবার ইতিহাস আছে। লিচ্ছবিরাতো কুলীন ক্ষত্রিয় হিসেবেই ভারতের সর্বত্র স্বীকৃত ছিল। মগধের রাষ্ট্রশক্তিও মাঝে মধ্যে লিচ্ছবিদের তরবারির ধার অনুভব করতো।
৮৪১. E.W. Hopkins: The Social and Military Position of the Ruling Caste in Ancient India.
৮৪২. A.C Das: Rgvedic Culture, P. 340.
৮৪৩ ইরফান হাবিব: সিন্ধু সভ্যতা (অনুবাদ), পৃ- ২৫।
৮৪৪ ইরফান হাবিব: সিন্ধু সভ্যতা (অনুবাদ), পৃ- ২৬।
৮৪৫ ইরফান হাবিব: সিন্ধু সভ্যতা (অনুবাদ), পৃ- ২৫।
৮৪৬ দামোদর ধর্মানন্দ কোসাম্বি: ভারত ইতিহাস চর্চার ভূমিকা, পৃ- ৬০।
৮৪৭ সুরোধকুমার মুখোপাধ্যায়: প্রাক-পলাশী বাংলা, পৃ- ২১।
৮৪৮ সুরোধকুমার মুখোপাধ্যায়: প্রাক-পলাশী বাংলা, পৃ- ২১।
———————————————————
চলবে————-
(প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্ব ১০৯
* সামরিক ব্যবস্থা*
প্রতিরক্ষা মানুষের প্রকৃতিগত ও জৈবিক ধারণা প্রসূত। আত্মরক্ষার জন্য জন্মগতভাবে মানুষ নিজের শক্তির উপর নির্ভর করতে হয়েছে, আর শক্তি বৃদ্ধির জন্য অস্ত্রধারণ করেছে। প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই মানুষ অস্ত্রধারী। বনের জানোয়ার ও শত্রুর আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য অস্ত্রধারী হওয়াই যথেষ্ট ছিল না, তারা দলবদ্ধ হয়ে শক্তিকে সুসংহত করেছে। প্রাগৈতিহাসিক যুগেই দলবদ্ধ মানুষের প্রতিনিধি অংশ অস্ত্রধারণ করে একক ও যৌথভাবে নিজের ও দলের অন্যদের নিরাপত্তা দেয়ার চেষ্টা করেছে। প্রাগৈতিহাসিক যুগে বাংলাদেশের মানুষের হাতে কিরূপ অস্ত্র ছিল তা এখনও স্পষ্ট নয়। যেসব দেশে পাথর পাওয়া যেতো, সেখানে পাথরের অস্ত্র দিয়ে তাদের যাত্রা আরম্ভ হয়েছিল, কিন্তু বাংলাদেশে প্রাথমিক স্তরের পুরাতন বা নব্যপ্রস্তর যুগের, প্রচুর পাথরের অস্ত্র এযাবত পাওয়া যায়নি। ১৮৮৬ সালে আর.ডি. ব্যানার্জী, ১৯১৭ সালে জে. কগিন ব্রাউন তার Prehistoric Antiquities of India Preserved in Indian Museum গ্রন্থে, ১৯৫৮ সালে ডাইসন, ১৯৬৩ সালে ছাগলনাইয়াতে প্রাপ্ত এবং ১৯৭৯ সালে আহমেদ জানান বাংলাদেশের বিভিনড়ব স্থানে প্রাপ্ত জীবাশ্ম কাঠের তৈরি নব্যপ্রস্তর যুগের অস্ত্রের কথা। এসবই কুঠার জাতীয় অস্ত্র। তবে পুরাতন প্রস্তর যুগের কোন অস্ত্র এযাবত বাংলাদেশে পাওয়া যায়নি। সম্প্রতি, ২০০৫-৬ সালে মোঃ হাবিবুল্লাহ পাঠান জানিয়েছেন ওয়ারী বটেশ্বর এলাকায় আটটি নবোপলীয় সেন্ট পাওয়া গেছে। এতে বুঝা যায়, বাংলার লালমাটি অঞ্চলে নবোপলীয় যুগের মানুষ বাস করতো এবং তারা জীবাষ্ম কাঠের কুঠার জাতীয় অস্ত্র ব্যবহার করতো। তখন ব্যক্তিগত ও দলীয় উভয় প্রকারেই আত্মরক্ষার্থে, শিকারে বা শত্রুর মোকাবেলা অস্ত্রের ব্যবহার জানতো। তবে পশ্চিম বাংলার কোনো কোনো অঞ্চলে পুরাতন প্রস্তর যুগের পাথরের প্রচুর অস্ত্র পাওয়া গেছে। পশ্চিম বাংলায় পুরাতন প্রস্তরযুগ থেকেই লোকবসতি ছিল এবং তারা পাথরের ও জীবাশ্ম কাঠের অস্ত্রশস্ত্রের ব্যবহার করতো। বাংলার সংলগ্ন পূর্বাঞ্চল, ত্রিপুরা ও আসামে পুরাতন প্রস্তর যুগের ও নব্যপ্রস্তর যুগের কিছু কিছু পাথরের অস্ত্র পাওয়া গেছে, এগুলিও কুঠার জাতীয় অস্ত্র। এদেশের মানুষ ঐতিহাসিক যুগের সূচনাতেও তরবারীর ব্যবহার জানতো না এবং সে যুগের কোন তরবারী এযাবত পাওয়া যায়নি, তবে, ছুরার ব্যবহার জানতো এবং কোনো কোনো স্থানে ছুরা পাওয়া গেছে। এদেশে তরবারী ব্যবহারের পূর্ব থেকেই তারা জানতো দা-এর ব্যবহার। পরবর্তীকালে বিভিনড়ব রকমের দা-ই ছিল তাদের আত্মরক্ষার প্রধান অস্ত্র। আক্রমনাত্মক অস্ত্রের উল্লেখযোগ্য ব্যবহার ছিল বল্লমের এবং পরবর্তীকালে তীর ধনুকের। তীর ধনুক সম্ভবত ঐতিহাসিক যুগের সূচনালগ্নের পূর্বে ছিল না।
নবোপলীয় যুগ পর্যন্ত একটি দল বা গোত্রের সক্ষম নারী-পুরুষ সকলেই অস্ত্রধারী ছিল। বন্য জানোয়ার ও শত্রুর আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য দলের প্রত্যেকটি সদস্যকেই অস্ত্র বহন করতে হতো। কিন্তু ঐতিহাসিক যুগের প্রারম্ভ থেকে ধাতুর ব্যবহার আরম্ভ হওয়ায় অস্ত্রের কার্যকারিত অনেক বেড়ে যায়। তাছাড়া, দলের একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে কৃষি ও গৃহস্থালির কোনো কোনো কাজে ব্যস্ত থাকায়, তাদের নিরাপত্তা অন্যদের দিতে হতো। এভাবেই দলের নিরাপত্তার জন্য কিছু সংখ্যক পুরুষ নিয়ে লাঠিয়াল বাহিনী গড়ে উঠে। জনগোষ্ঠীর লাঠিয়াল বাহিনীর সদস্য হিসেবে তারা নিজের, দলের ও দলীয় জনগোষ্ঠী এবং মালের নিরাপত্তার জন্য যুদ্ধ করতে হতো। তারাও বেতনভুক্ত সরকারি বা বেসরকারি যোদ্ধা ছিল না। তবে কোনো কোনো সময় তারা যুদ্ধে লব্ধ মালামালের লোভে এবং সময়ে বীরত্ব প্রদর্শনের জন্যও যুদ্ধে যেতো।এ.সি. দাস তাঁর গ্রন্থে অনুরূপ মত প্রকাশ করে বলেন: ‘People fought for their own safety but the love of adventure as also loot and plunder, motivated the soldiers’841’৮৪১ তাদের বেতন সম্পর্কে ই.ডব্লিউ হপকিনস্ (E.W. Hopkins) বলেন: ‘In the pre-epic period the soldier’s pay was a part of the booty’|
এই লাঠিয়াল বাহিনীই পরবর্তী রাজা মহারাজার সামরিক বাহিনীর পূর্বসূরী। দলের প্রধানই থাকতেন এই লাঠিয়াল বাহিনীর প্রধান। কারণ, এক সময়ে দলকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য এই দলীয় লাঠিয়াল বাহিনীকে নিয়ম-শৃঙ্খলাতে রাখার প্রয়োজন ছিল। ঐতিহাসিক কালের প্রারম্ভ থেকেই বাংলায় বসবাসকারী বিভিন্ন অঞ্চলে বিভক্ত অস্ট্রিক ভাষাভাষীরা আর গোষ্ঠীবদ্ধ ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না। এরা একটি জাতি হিসেবে বাংলাদেশ থেকে আরম্ভ করে ভারতের মধ্যভাগ পর্যন্ত বহু অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বাস করতে ছিল। বিশেষ করে বাংলাদেশে বসবাসকারী অস্ট্রিকরা জানোয়ার ছাড়া অন্য মানুষ দ্বারা সামরিক অভিযানের কোন আশঙ্কা করতো বলে মনে হয় না। ঐতিহাসিক যুগের সূচনা থেকেই এরা উদ্ধৃত্ত উৎপাদনকারী হিসেবে বিনিময় বাণিজ্যের জন্য দেশে ও বিদেশে পরিচিতি লাভ করেছিল। খ্রিষ্টপূর্ব ১৫ শতক থেকেই বঙ্গোপসাগর, আরব সাগর ও পূর্বের চীন উপসাগরের তীরবর্তী জনপদগুলির সঙ্গে বিনিময় বাণিজ্যের সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল বলে জানা যায়। তারা কৃষি উৎপাদন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য যতটা আগ্রহী ছিল, সামরিক অভিযানের বিষয়ে ততটা চিন্তিত ছিল না। তারা তখন কি ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করতো পূর্ণ পরিচিতি পাওয়া না গেলেও অনুমান করা যায়, খ্রিষ্টপূর্ব ৮/৭ শতক
পর্যন্ত এদেশে লৌহের অস্ত্রশস্ত্র অল্পই ছিল। কারণ, তখন পর্যন্ত বিহারের লৌহ খনি থেকে লৌহ উত্তোলন শুরু হয়নি। উত্তর ভারতে কিছু কিছু লৌহ আড়ক পাওয়া যেতো এবং ভারতের বাইরে থেকে গান্ধার ও বৎস্য রাষ্ট্রের মধ্য দিয়ে লৌহ আসত, কিন্তু এ উৎসগুলি ছিল সম্পূর্ণভাবে আর্যদের নিয়ন্ত্রণে। আর যুগটা ছিল লৌহশক্তির করতলগত। লৌহই ছিল শক্তির মাপকাঠি। বাংলার সঙ্গে তখন লৌহ আর অপরিচিত ছিল না, কিন্তু লৌহের পর্যাপ্ত সরবরাহ ছিল না বিধায় লৌহের অস্ত্রশস্ত্রের পরিবর্তে তখনো অস্ট্রিকরা ব্যবহার করতো তামা ও ব্রোঞ্জের অস্ত্র। সম্ভবত ৭০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের মধ্যেই অস্ট্রিকদের পরিচয় প্রায় মুছে গিয়ে কতগুলি সংকর জনপদ, যেমন- পুণ্ড্রবর্ধন, বঙ্গ, সুহ্ম, কলিঙ্গ, তাম্রলিপ্তি প্রভৃতি গড়ে উঠেছে যাদের হাতে লৌহের উন্নত অস্ত্র যেমন- দা, তীর-ধনুক, কুঠার, বল্লম প্রভৃতি প্রচুর ছিল না। কিছু কিছু থাকলেও তারা তখনো তরবারীর ব্যবহার জানতো বলে মনে হয় না। এই জনপদগুলি রাষ্ট্র হিসেবে অস্তিত্ব না থাকলেও তারা নিশ্চয় দলীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থার অধীনেই বাস করতো। এই প্রশাসনিক ব্যবস্থায় লাঠিয়াল বাহিনীর প্রধান সমাজে এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন। এদের অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ও ব্যবহৃত সরঞ্জাম সম্পর্কে আমরা পুরোপুরি অন্ধকারেই আছি। মহাভারতে উল্লেখ আছে যে, ভীম বাংলাদেশের রাজন্যবর্গকে পরাজিত ও হত্যা করে বাংলাকে পদানত করেছিলেন। মহাভারতের ভাষ্য অনুসারে পুণ্ড্রবর্ধন ও বঙ্গে রাজাগণ তার সঙ্গে যুদ্ধ করে পরাজিত হন। মহাভারতের ভাষ্য যা-ই হোক, আর্যরা কারো না কারোর নেতৃত্বে বাংলা জয় করেছিলেন এবং দেশের অধিবাসীরা পরাজিত হয়ে কেউ কেউ দেশ ত্যাগ করেছিলেন এবং আবার কোন শাখা পার্শ্ববর্তী বনে জঙ্গলে আশ্রয় দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। আর, যারা দেশে আর্যদের অধীনতা স্বীকার করে থাকতে হয়েছিল, তারা দাসত্ব বরণ করে পরবর্তী ১৫০০ বছর (শশাঙ্কের ক্ষমতা দখল ৬০০ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত অমানবিক জীবন কাটাতে হয়েছে এবং ৪র্থ বর্ণ ও বর্ণ বহির্ভুত মানব প্রজাতি হিসেবে ইতিহাসে স্বাক্ষর রেখেছে।
বাংলাদেশের আদি জনবসাতি অস্ট্রিকভাষাভাষীরা সামরিক জাতি ছিল না বা তাদের সামরিক ক্রিয়াকাণ্ডের উল্লেখযোগ্য কোন প্রমাণও আমাদের সামনে বর্তমান নেই। বাংলার আদিবাসী হিসেবে তারা নানা কারণে সুরক্ষিত ছিল। প্রথমত বাংলা ছিল একটি বিচ্ছিন্ন এলাকা, যেখানে বাইরে থেকে আসা এবং বেরিয়ে যাওয়া ব্যক্তিগতভাবে বা ছোটখাট দলের পক্ষেও সম্ভব ছিল না। তাছাড়া, বাংলার ভিতরের অধিবাসীরাও বিশাল এক একটি নদীর জন্য পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। তাছাড়াও জঙ্গলাকীর্ণ জলাভূমি যাতায়াতের জন্য কোন সময় অনুকূল ছিল না। এসব কারণে এক একটি বিচ্ছিন্ন জনবসতি প্রাকৃতিগতভাবেই বিচ্ছিন্নভাবে জীবনযাত্রা করতো এবং বাইরের শত্রু থেকেও আক্রমণের সম্ভাবনা অনেক কম ছিল। বিশেষ করে, প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে খ্রিষ্টপূর্ব ৮/৭ শতক সাল পর্যন্ত আর্যরা ছাড়া এদেশের বিরুদ্ধে আর কোন বিরাট সামরিক অভিযান কেউ চালায়নি। সম্ভবত প্রমাণ না থাকলেও অনুমান করা যায় খ্রিষ্টপূর্ব ৮/৭ শতক সাল পর্যন্ত এদেশের অধিবাসীরা নিরবিচ্ছিন্নভাবে শান্তি-শৃঙ্খলার সাথেই বাস করতে ছিল। এজন্যই ভিতরের বা বাইরের শত্রু থেকে নিরাপদ থাকার কারণে, এদেশের আদিম অধিবাসী অস্ট্রিকরা বহু পূর্ব থেকেই গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে বাস করার প্রচলন প্রায় ভুলেই গিয়েছিল।
এমনকি পূর্ব থেকে আগত মঙ্গোলীয় জাতিগোষ্ঠীর শাখা এবং পশ্চিম দিক থেকে দ্রাবিড়রা বাংলাদেশে আসলেও স্থায়ী অধিবাসীদের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী বা বিশেষ কোন সামরিক অভিযানের কথা জানা যায় না। তাদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়ে থাকলেও তা ছিল সাময়িক। সম্ভবত পরস্পরের মধ্যে বোঝাপড়া হয়ে সহাবস্থান নিয়েছিল। প্রথমবার আদিম অধিবাসীর বিরুদ্ধে বড় ধরনের এবং ভীষণ আকারের সামরিক অভিযান যদি হয়ে থাকে তবে তা ছিল আর্যদের আক্রমণ। কারণ, তখন থেকেই এদেশের অধিবাসীদের জীবনযাত্রা, চিন্তা-চেতনা এবং জীবন ধারণ পদ্ধতিতে এক ব্যাপক এবং দীর্ঘস্থায়ী অবনতি নেমে আসে, যা অস্ট্রিকরা আর কোনদিন পুনরোদ্ধার করতে পারেনি। কাজেই বাঙালি জাতির সমরসজ্জা হওয়ার মতো কোন পরিবেশ তারা কোনদিনই পায়নি। প্রথম ভূমিপুত্র যিনি বাংলার শাসন ব্যবস্থা হাতে নিতে পেরেছিলেন- তিনি শশাঙ্ক। তারপরে আসে বাঙালি পালদের শাসন। কাজেই আদিযুগে দলীয়ভাবে গোত্রের মধ্যে সামরিক অস্ত্রসজ্জা বা প্রশিক্ষণ এমন বিশেষ কিছু ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে, মানুষের আদিকাল থেকে বন্য জন্তু-জানোয়ার ও শত্রুর আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য স্থানীয় ধরনের অস্ত্রশস্ত্র তারা নিশ্চয় ব্যবহার করতো, যা আজও আদিবাসী ভূমিপুত্রদের মধ্যে দেখা যায়।
আমরা আর্যদের আক্রমণের বিভিষীকার স্বাক্ষ্য আরও পূর্ব থেকেই পেয়েছি। প্রায় ৭ লক্ষ বর্গ কিলোমিটার৮৪৩ এলাকার বসবাসকারী ৪০ লক্ষ অধিবাসীকে৮৪৪ সিন্ধু নদীর অববাহিকা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চল থেকে সমূলে বিতাড়িত করে আর্যরা সমস্ত সিন্ধু, পাঞ্জাব, মধ্যভারত অধিকার করেছিল।৮৪৫ তার আরো কয়েকশত বছর পরে হলেও বাংলা অধিবাসীর সংখ্যা তখন ১৩ লক্ষের উপর ছিল বলে মনে হয় না। লৌহের ব্যাপক ব্যবহার আরম্ভ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত বাংলায় প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৬ জনের অতিরিক্ত মানুষ বাস করতো বলে পণ্ডিতদের ধারণা। দক্ষিণ বাংলায় তখনো জনবসতি গড়ে উঠেনি। এই ১৩ লক্ষ অধিবাসীর বিভিন্ন জনপদ ভিত্তিক শক্তিকে আর্যদের উন্নত লৌহের অস্ত্র, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সামরিক বাহিনী, প্রভূত যুদ্ধের অভিজ্ঞতা নিয়ে পরাজিত করা তাদের জন্য খুব কষ্টকর ছিল না। তখন থেকে পরাজিত বাংলার অধিবাসীর অস্ত্রধারণ ও ব্যবহার নিষিদ্ধ হয়ে গেল। এ ধরনের একটি সিদ্ধান্তে আসার জন্য যথেষ্ট ঐতিহাসিক উপাত্ত আমাদের কাছে বর্তমান না থাকলেও কিছু যুক্তিকতা রয়েছে। বেদে এবং অন্যান্য আর্যসাহিত্যে উল্লেখ আছে যে, তাদের দেবতা ইন্দ্র হরিউপিয়া, প্রাগার্ম হরপ্পা নামের সংস্কৃতায়ন, অর্থাৎ (স্বর্ণনির্মিত যুগস্তম্ভ নগরী) ধ্বংস করেছিলেন।৮৪৬ আর্যকর্তৃক বাংলাদেশ জয় করার উল্লেখ কোথাও নাই, শুধু মহাভারতে উল্লেখ আছে, দ্বিতীয় পাণ্ডব ভীম পুণ্ড্রবর্ধন ও বঙ্গ জয় করে সমুদ্র-উপকূল পর্যন্ত পৌঁছেছিলেন। মহাভারতে বর্ণিত ঘটনা যদি বিশ্বাসযোগ্য হয় তবে বুঝতে হবে ভীম নিশ্চয় খ্রিষ্টপূর্ব ৭ম শতাব্দীর বহু পূর্বে কোন সময় বাংলাদেশে এসেছিলেন। কারণ, খ্রিষ্টপূর্ব ৮ম শতাব্দীর প্রারম্ভেই আর্যরা ভারতে আর রাষ্ট্রশক্তির অধিকারী ছিল না। আর্য বাসস্থান সিন্ধু-পাঞ্জা ও গান্ধঅর (উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ) খ্রিষ্টপূর্ব ৮ শতকের প্রথম দিকেই পারস্য সম্রাট দখল করে নেয় এবং ষষ্ঠ শতকের প্রথম দিকেই আর্যরাষ্ট কুরু, পাঞ্জাল ও মৎস্য আর্য রাষ্ট্র মগধের দখলে চলে আসে। কাজেই বেদের যুগেই বাংলাদেশে আর্যরা এসে থাকবে। তবে তাদের এদেশ দখল করা সম্পর্কে নিশ্চয়তা পাওয়ার কারণগুলি হল:
ক) খ্রিষ্টপূর্ব ৭ম শতক থেকে এদেশের জনসাধারণকে নিন্মবর্ণে (শূদ্র) ও পরাজিত দাস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
খ) আর্যরা এবং আযর্- অনুসারী দ্বিজবর্ণের লোকেরা এদেশের ভূমিপুত্রদের কাউকে বৈশ্য বলেও স্বীকার করেনি।
গ) এদেশের জড়োপাসকদের উপর বৈদিক ধর্ম চাপিয়ে দেয়া হয়।
ঘ) স্থানীয় অধিবাসীদের জাগতিক এবং ধর্মীয় কোন অধিকার ছিল না।
ঙ) এদেশবাসী বৈদিক ধর্ম স্বীকার করলেও ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানে তাদের আদি জড়োপাসনাকেই আঁকড়িয়ে রেখেছে।
চ) ১৫০০ পূর্বাব্দেই এদেশের আদিবাসী অস্ট্রিক ভাষাভাষীদের শুধু ব্যবসা নয়, বহিঃবাণিজ্যেও লিপ্ত ছিল, কিন্তু বেদের
যুগের পরে তাদেরকে তার পূর্বাবস্থাতেও পাওয়া যায়া না। তাদেরকে দাস ও শ্রমিক শ্রেণীতে অবনমিত করা হয়।
ছ) আর্য ধর্ম ও প্রশাসনের প্রতিভূ হিসেবে সমস্ত বাংলায় ব্রাহ্মণদেরকে সামন্তপ্রভু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। তবে
পশ্চিম বাংলায় যতখানি নিবিড়ভাবে সম্ভব হয়েছিল পূর্ব বাংলার সেভাবে সম্ভব হয়নি।
এদেশে ব্রাহ্মণ প্রতিষ্ঠা হাজার বছরের অধিককাল ধরে চলতেছিল এবং সেন আমলে এসে শেষ হয়। তবে পরবর্তীকালে কৌটিল্যের দাবিতে পাঁচ শ্রেণীতে বিভক্ত ব্রাহ্মণদের প্রায় সবাই পশ্চিম বাংলাতেই স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। কুলীন, শ্রোত্রীয়, গৌন কুলীন, বংশজও সপ্তশতী গোষ্ঠীর মধ্যে শেষ দুই শ্রেণীর ব্রাহ্মণরাই শুধু বাংলাদেশে ছিল বলে জানা যায়। এ কারণেই বোধ হয় পাল পূর্ব যুগে থকে বর্তমান কাল পর্যন্ত পশ্চিম বাংলার নেতৃত্ব ব্রাহ্মণদের হাতেই ছিল এবং এখনও তাদের হাতেই আছে। কিন্তু পূর্ব বাংলার তার বিপরীত। পালদের পূর্ব কাল থেকেই এখানে শূদ্রদরে তার বিপরীত। পালদের পূর্বকাল থেকেই এখানে শূদ্রদের প্রাধান্য। এমনকি পালরাও শূদ্র শ্রেণী থেকেই আগত।৮৪৭ তাদের বিরুদ্ধে যারা দীর্ঘকাল থেকে থেকে বিদ্রোহ করেছে তাদের সবাই শূদ্র এবং আজও যারা বাংলাদেশে নেতৃত্ব দিচ্ছে তাদের সবাই শূদ্রদেরই বংশোদ্ভূত ধর্মান্তরিত মুসলমান। বিদেশাগত আশরাফ মুসলমানদের শাসন ও নেতৃত্ব এদেশের ধর্মান্তরিত মুসলমানের কোন প্রজন্মই মনে প্রাণে গ্রহণ করতে পারেনি। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ এই ধারার শেষ ঘটনা। শূদ্রদের অবস্থার পরিবর্তনের জন্য শূদ্রদের থেকেই বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর পূর্ব বাংলা থেকে উঠে এসেছে, কিন্তু পশ্চিম বাংলা থেকে বাধা এসেছে ক্ষত্রিয় রক্তধারার অনুগত ব্রাহ্মণদের থেকে। মাত্র এই সেদিন ঢাকার রাজনগরের বৈদ্যবংশীয় মহারাজ রাজবল্লভ রাজনগরে বিশাল জনসমাজে ধর্মীয় অধিকার হিসেবে বৈদ্যদের উপর্বীত ধারণের অধিকার ঘোষণা করেছিলেন, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে নদীয়ার ব্রাহ্মণ জমিদার রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের নেতৃত্বে পশ্চিম বাংলার সমস্ত ব্রাহ্মণ সমাজ এই অধিকার অস্বীকার করেছিলেন।৮৪৮ যুগে যুগে পূর্ব বাঙলায় সফল নেতৃত্ব এসেছে শূদ্রবংশীয়দের উত্তরপুরুষ থেকে সর্ববাংলার ভিত্তিতে আর পশ্চিম বাংলার নেতৃত্ব এসেছে খাঁটি ব্রাহ্মণদের থেকে সর্বভাতরীয় ব্রাহ্মণ সংস্কৃতির ভিত্তিতে। এটুকুই পূর্ব ও পশ্চিমে বাংলার নেতৃত্বে পার্থক্য যেমন ছিল আদিকালে, আজও আছে তেমনি।
বাংলার উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের কিছু অধিবাসী এই বর্ণের আওতায় আসেনি এবং অধীনতাও স্বীকার করেনি। তারা সরাসরি আর্যদের প্রতিনিধিত্বে প্রতিষ্ঠিত প্রশাসনিক ক্ষমতার অধীনে বাস না করে আরো পূর্বদিকে পাহাড়ি বনাঞ্চলে চলে যায়। তারা অস্ত্রধারণ করতো। এরাই বাংলার উত্তর পূর্বাঞ্চলে বসবাসকারী আদিবাসী ভূমিপুত্র। পরবর্তী বহুযুগ পর্যন্ত টিপরা বা গারো ও চাকমা ত্রিপুরা, জনগোষ্ঠী নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে সামর্থ হয়েছিল। আর্যদের বাংলা বিজয়ের পর অর্থাৎ ৮০০/৭০০ খ্রিষ্টপূর্বাবদ্ধ থেকে বাংলার সামরিক শক্তি ও অস্ত্রশস্ত্রের ইতিহাস লিখলে, লিখতে হবে বিজয়ী শক্তির সামরিক ইতিহাস এবং অল্প সংখ্যক আদিবাসী ভূমিপুত্রদের দুর্দমনীয় সামরিক জীবনের ইতিহাস।
আর্যদের বাংলা আক্রমণকাল (সম্ভবত খ্রিষ্টপূর্ব ৮ম শতাব্দী) থেকে খ্রিষ্টোত্তর ৬ষ্ঠ শতক পর্যন্ত বাঙালি স্বাধীনতা ভোগ করেনি। উল্লেখ করা হয়েছে যে, এ সময়ে বাংলার অধিবাসীদের অস্ত্র বহন করার কোন অধিকার ছিল না। এদেশের অধিবাসীদের কখনও ক্ষত্রিয়দের মর্যাদা দেওয়া হয়নি এবং ব্রাহ্মণ্য ধর্মানুসারীরা বা পরবর্তীকালে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরাও এদেশে ক্ষত্রিয়ের বসবাস আছে বা ছিল তা স্বীকার করেনি। যদিও অতি অল্প দূরে নেপালে, শাক্য, লিচ্ছবি, আরও অন্য কোনো কোনো গোত্রকে ক্ষত্রিয় গোত্র ও রাষ্ট্রশক্তি হিসেবে সর্ব-ভারতীয় ভিত্তিতে সমস্ত জনপদেই স্বীকৃতি দেবার ইতিহাস আছে। লিচ্ছবিরাতো কুলীন ক্ষত্রিয় হিসেবেই ভারতের সর্বত্র স্বীকৃত ছিল। মগধের রাষ্ট্রশক্তিও মাঝে মধ্যে লিচ্ছবিদের তরবারির ধার অনুভব করতো।
৮৪১. E.W. Hopkins: The Social and Military Position of the Ruling Caste in Ancient India.
৮৪২. A.C Das: Rgvedic Culture, P. 340.
৮৪৩ ইরফান হাবিব: সিন্ধু সভ্যতা (অনুবাদ), পৃ- ২৫।
৮৪৪ ইরফান হাবিব: সিন্ধু সভ্যতা (অনুবাদ), পৃ- ২৬।
৮৪৫ ইরফান হাবিব: সিন্ধু সভ্যতা (অনুবাদ), পৃ- ২৫।
৮৪৬ দামোদর ধর্মানন্দ কোসাম্বি: ভারত ইতিহাস চর্চার ভূমিকা, পৃ- ৬০।
৮৪৭ সুরোধকুমার মুখোপাধ্যায়: প্রাক-পলাশী বাংলা, পৃ- ২১।
৮৪৮ সুরোধকুমার মুখোপাধ্যায়: প্রাক-পলাশী বাংলা, পৃ- ২১।
———————————————————
চলবে————-
খবর বিভাগঃ
বাংলাদেশের ইতিহাস