আদি বাংলার ইতিহাস
(প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্ব ১০৮
পাল যুগ
পাল বংশের দীর্ঘ শাসনে বাংলায় প্র মবারের মতো এক শক্তিশালী ও স্থায়ী রাষ্ট্রপ্রশাসন ব্যবস্থা সূচিত হয়। কিন্তুপাল প্রশাসন-ব্যবস্থার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ পাওয়া যায় না। তবে প্রাপ্ত উপাদানের ভিত্তিতে প্রশাসন ব্যবস্থার বিভিন্ন দিকের এক রূপরেখা প্রণয়ন করা সম্ভব। বাংলায় প্রচলিত গুপ্ত প্রাদেশিক শাসন কাঠামোর উপরই পাল রাজাদের আমলে শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শাসন কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়। এ যুগেও পূর্ববর্তী যুগের ন্যায় রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। রাজার জ্যেষ্ঠ পুত্র ‘যুবরাজ’ নামে অভিহিত হতেন। যুবরাজের দায়-দায়িত্ব ও অধিকার সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানা যায় না। গুপ্তযুগের মতো এ যুগেও রাজপুত্রকে ‘কুমার’ নামে অভিহিত করা হতো। ‘কুমার’ প্রাদেশিক শাসনকর্তার পদের মতো উচ্চ প্রশাসনিক দায়িত্ব পেতেন। এ পদে থাকাকালে কুমারগণ রাজার সামরিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন। পাল রাজাদের রাজ্য প্রশাসনে নিয়োজিত কর্মচারীদের পদ ও পদবি সম্পর্কে ইতিপূর্বে বলা হয়েছে। এই বিরাট আমলাতন্ত্রের প্রধান ছিলেন মন্ত্রীক বা সচিব। পাল রাজাদের শাসনামলেই সর্বপ্র ম রাজ্যের একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার উল্লেখ পাওয়া যায় যার পদমর্যাদা প্রধানমন্ত্রীর অনুরূপ। দেবপালের বাদল স্তম্ভলিপি থেকে এ পদের ক্ষমতা ও মর্যাদার বিষয়টি জানা যায়। ধর্মপালের রাজত্বকালে গর্গ নামে একজন ব্রাহ্মণের পরিবারের সদস্যদের জন্য বংশানুক্রমে প্রধানমন্ত্রীর পদ সংরক্ষিত ছিল। গর্গের বংশধরগণ (দর্ভপাণি, সোমেশ্বর, কেদারমিশ্র ও গুরবমিশ্র) পরবর্তী এক শত বছর প্রধানমন্ত্রীর পদ অলংকৃত করেন। তারা সকলেই পাল বংশের শাসন প্রতিষ্ঠা ও সুদৃঢ়করণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
পরবর্তীকালে এরূপ আর এক মন্ত্রী বংশের পরিচয় পাওয়া যায়। যোগদেব ছিলেন তৃতীয় বিগ্রহপালের এবং তাঁর উত্তরাধিকারী বৈদ্যদেব ছিলেন কুমারপালের প্রধানমন্ত্রী। রাজ্যের উচ্চপদে নিয়োগের ক্ষেত্রে এই বংশানুক্রমিক নীতি পরবর্তী চন্দ্র ও যাদব রাজবংশের ক্ষেত্রে প্রচলিত ছিল। ভট্ট ভবদেবের ভুবনেশ্বর প্রশস্তি থেকে এর প্রমাণ মেলে।৮৩৯ পাল রাজাদের অধিনে রাজন, রাজন্যক, রনক, সামন্ত ও মহাসামন্ত উপাধিধারী অনেক সামন্ত রাজা ছিলেন। তারা ছিলেন শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শাসনের নিয়ন্ত্রণাধীন। কেন্দ্রীয় রাজশক্তির দুর্বলতার সুযোগে এ সামন্ত রাজারা নিজেদের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে স্বাধীনতা ঘোষণা করতেন। বরেন্দ্র পুনরুদ্ধারের জন্য রামপালের চৌদ্দ জন সামন্তের সহায়তা চাওয়ার ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয় যে, কখনও সামন্ত প্রধানদের সাহায্যের উপর পাল রাজাদের অনেকাংশে নির্ভর করতে হতো। পাল যুগে পূর্ববর্তী যুগের প্রশাসনিক কাঠামোই প্রচলিত ছিল। তখনো ভূক্তি, বিষয়, মন্ডল, গ্রাম প্রভূক্তি নামে প্রশাসনিক এলাকা ছিল। এছাড়া, খণ্ডল, আকৃতি ও ভাগ নামে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অঞ্চল ছিল।
পাল যুগে কেন্দ্রীয় শাসনের উপর পূর্বের চেয়ে বেশি প্রাধান্য হতো বলে মনে হয় এবং বিভিন্ন শিলালিপিতে কেন্দ্রের উল্লেখই বেশি পাওয়া যায়। মনে হয়- ভূক্তি, বিষয়, মন্ডল, গ্রাম প্রভৃতি এলাকা ও দপ্তরগুলিতে কিছু কিছু প্রশাসনিক ক্ষমতার রদবদল হয়েছিল কি কোথায় কতটুকু হয়েছিল এ বিষয়ে শিলালিপি থেকে বিধি জানা যায় না। সময়ের প্রয়োজনে কিছুটা পরিবর্তন হয়ে থাকলে এগুলির কার্যক্রম নিশ্চয় বন্ধ করে দেয়া হয়নি।
পাল যুগের শাসনব্যবস্থায় রাজা ছিলেন সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। তার উপাধি পূর্ববর্তী যুগের ন্যায় অক্ষুণড়ব ছিল। তিনি প্রকৃতপক্ষে সীমাহীন ক্ষমতা ভোগ করতেন। রাজা কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তারা রাজ্যশাসনে ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালন করতেন। ‘যুবরাজ’ ও প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও এ যুগে রাজ্যে আরও অনেক ‘মন্ত্রী’ ছিলেন। এদের মধ্যে ‘মহাসান্ধিবিগ্রহিক’, ‘রাজমাত্য’, ‘মহাকুমারমাত’ এবং ‘দূত’ ছিলেন প্রধান্য। ‘মহাসান্ধিবিগ্রহিক’ ছিলেন যুদ্ধ ও শান্তি বিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ‘রাজমাত্য’ বলতে সম্ভবত সাধারণভাবে কনিষ্ঠ মন্ত্রীদের বোঝাত। ‘মহকুমারমাত্যে’র প্রকৃত অবস্থান নির্ণয় করা না গেলেও অনুমান করা যায় তাদের অনেকেই ছিলেন রাজপরিবারের সদস্য। ‘দূত’ ছিলেন বিদেশী রাজ্যের সঙ্গে যোগসূত্র রক্ষাকারী রাষ্ট্রদূত। উপরিউক্ত উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারীদের পরেই এ যুগে ‘অমাত্য’ নামক পদস্থ রাজকর্মচারীর নাম পাওয়া যায়। অন্যান্য উচ্চ রাজকর্মচারীর মধ্যে ‘অঙ্গরক্ষ’ (সম্ভবত রাজার দেহরক্ষী দলের প্রধান) এবং ‘রাজস্থানীয়’র (সম্ভবত রাজ প্রতিনিধ বা প্রাদেশিক শাসনকর্তা) নাম উল্লেখ করা যায়। ‘অধ্যক্ষ’ নামে কেন্দ্রীয় শাসনের সঙ্গে জড়িত আরও এক ধরনের রাজকর্মচারী থাকতেন যার দায়িত্ব ছিল সাধারণভাবে সামরিক প্রশাসন বিভাগের তত্ত্বাবধান করা। ‘প্রমাতৃ’ ও ‘ক্ষেত্রপ’ নামে আরও দুধরনের কর্মচারীর নাম পাওয়া যায় যারা কেন্দ্রীয় শাসনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সম্ভবত তাদের কার্যক্রম সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধে সীমাবদ্ধ ছিল অথবা তারা ছিলেন জমি জরিপ বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মচারী। কোনো কোনো পণ্ডিত মনে করেন যে, ‘প্রমাতৃ’ ছিলেন দেওয়ানি মামলার বিচারক।
রাজস্ব প্রশাসন
পালযুগে কেন্দ্রীয় সরকার শুধু ভূমিকরের উপর নির্ভরশীল ছিল না। কর আদায়ের ক্ষেত্র আরো প্রসারিত হয়েছিল বলে মনে হয়। তার জন্য আলাদা কর্মচারী নিযুক্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। কৃষিভূমির রাজস্ব আদায় করতেন বিভিন্ন প্রশাসনিক বিভাগের প্রধানগণ যেমন ‘উপরিক’, ‘বিষয়পতি’, ‘দাশগ্রামিক’ ও ‘গ্রামপতি’। রাজস্বের খাত ছিল ‘ভাগ’, ‘ভোগ’, ‘কর’, ‘হিরণ্য’ ও ‘উপরিকর’ প্রভৃতি। এ সকল করের প্রকৃতি নির্ণয় করা কঠিন। তাম্রশাসনে ‘ষষ্ঠাধিখৃত’ নামে রাজস্ব কর্মচারীর উল্লেখ পওায়া যায়। তিনি কৃষকদের নিকট থেকে রাজস্বের এক-ষষ্ঠাংশ রাজার প্রাপ্য হিসেবে আদায় করতেন। ‘ভোগ’কর আদায়ের দায়িত্বে সম্ভবত নিয়োজিত ছিলেন ‘ভোগপতি’। খেয়া পারাপার ঘাট থেকে সম্ভবত রাষ্ট্রে আয় হতো এবং খেয়াঘাটের মাশুল সংগ্রহ করত ‘তরিকা’ নামক কর্মচারী। উপশুল্ক ও আবগারি কর আদায় বিভাগের তত্বাবধায়ক ছিরেন ‘শৌল্কিক’। চোর-ডাকাতদের হাত থেকে প্রজাদের রক্ষার জন্য আরোপিত কর আদায়ের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন‘চৌরোদ্ধরণিক’। ফৌজদারি অপরাধের জন্য আরোপিত অর্থদণ্ড আদায় বিভাগের কর্মকর্তা ছিলেন ‘দশাপরাধিক’।
শিলালিপিতে উল্লিখিত ‘মহাক্ষপটলিক’ নামীয় রাজস্ব কর্মকর্তা ‘জ্যেষ্ঠ কায়স্থ’ নামক কর্মচারীর সহযোগিতায় হিসাব বিভাগের কার্যাবলি নিয়ন্ত্রণ করতেন। ‘মহাদণ্ডনায়ক’ ছিলেন বিচার বিভাগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। ‘মহাপ্রতিহার’, ‘দণ্ডিক’, ‘দণ্ডপাশিক’ ও ‘দণ্ডশক্তি’ উপাধিধারী কর্মকর্তারা পুলিশ বিভাগ পরিচালনা করতেন। ‘খোল’ সম্ভবত ছিলেন
গুপ্তচর বিভাগের দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা।
সেনাপতি বা মহাসেনাপতি ছিলেন সামরিক প্রশাসনে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সামরিক কর্মকর্তা। তিনি ছিলেন রাজার সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক। পদাতিক, অশ্বারোহী, হস্তি ও উষ্ট্র বাহিনী এবং নৌবাহিনীর জন্য মহাসেনাপতির অধীনে একজন করে স্বতন্ত্র সামরিক কর্মকর্তা নিযুক্ত থাকতেন। পাল রাজাদের অধিকাংশ শিলালিপিতে ‘গ্যেড়-মালব-খাশ-হুণ-কুলিক-কর্ণটিলাট বাক্যের উল্লেখ পাওয়া যায়। এ থেকে বুঝা যায় যে, পাল রাজারা রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনী গঠন করতেন ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের আদিবাসী দ্বারা। শিলালিপিতে বিশেষ কর্মচারী হিসেবে দুর্গাধিপতি ‘কোট্টপাল’ এবং রাজ্যের সীমান্ত রক্ষক‘প্রান্তপাল’-এর উল্লেখ রয়েছে। এছাড়াও পাল তাম্রশাসনে আরও অনেক রাজ কর্মচারীর উল্লেখ পাওয়া যায়।
চন্দ্র বর্মণ ও সেন যুগ
চন্দ্রবর্মন ও সেন আমলে প্রশাসনিক ব্যবস্থা আরো কেন্দ্রীভূত হওয়ার লক্ষণ দেখা যায়। প্রশাসনিক কাঠামো আরো কিছুটা বিস্তৃতি লাভ করেছিল। কিছু নতুন নতুন ক্ষেত্র প্রশাসনের আওতাভুক্ত করা দুটি নতুন রাজকর্মচারীর নাম যেমন ‘মহাব্যূহপতি’ (প্রধান সামরিক কর্মকর্তা) এবং ‘মহাপীলুপতি’ (হস্তি বাহিনীর ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) যথাক্রমে চন্দ্র, বর্মণ ও সেন তাম্রশাসনে এবং বর্মণ ও সেন লিপিফলকে পাওয়া যায়। এছাড়াও রাজকর্মচারীদের তালিকায় এ যুগের উল্লেখযোগ্য সংযোজন হচ্ছে ‘মহাধর্মাধ্যক্ষ’ (প্রধান বিচারকের দায়িত্ব পালনকারী), ‘মহাপুরোহিত’ (প্রধান পুরোহিত), মহাসর্বাধিকৃত্ব’ (রাষ্ট্রীয় সকল বিভাগের প্রধান তত্ত্বাবধায়ক) এবং ‘মহাগস্থ’ (সম্ভবত উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা যিনি বিভিন্ন সামরিক বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন)। সেন তাম্রশাসনে ‘রাজ্ঞী’র উল্লেখ পাওয়া যায়। এ থেকে রাজ্যশাসন বিষয়ে রাণীর রাজনৈতিক প্রভাবের সম্ভাব্যতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। পাল-পরবর্তী যুগের রাজ্যশাসন বিষয়ের অপর এক গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ব্রাহ্মণ পুরোহিতের প্রাধান্যের সরকারি স্বীকৃতি। বর্মণ ও সেন রাজাদের রাজত্বকালে উচ্চ রাজকর্মচারীর মর্যাদাসহ পুরোহিতের প্রাধান্যের স্বীকৃতি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এ প্রসঙ্গে বিনয়চন্দ্র সেনের মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য:
‘The interest of such an officer whose position in the social sphere was one of the unquestioned domination, would naturally lie in the administration becoming a tool of the priesthood’|
প্রাক-পাল ও পাল যুগের প্রশাসনিক বিভাগসমূহ পরবর্তী শতাব্দীকালেরও বেশি সময় ধরে প্রচলিত ছিল। পাল যুগের পুণ্ড্রবর্ধনভুক্তি (উত্তরবঙ্গের বৃহৎ অংশ এর অন্তর্ভুক্ত ছিল) পরবর্তী যুগে পৌণ্ড্রবর্ধনভুক্তি নামে পরিচিত হয়। সেনরাজাদের আমলে ক্রমাম্বয়ে পৌণ্ড্রবর্ধনভুক্তির সীমা বৃদ্ধি পায়। এটি ছিল বাংলার সর্ববৃহৎ প্রশাসনিক বিভাগ। উত্তরবঙ্গ ছাড়াও দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গ (সমতট) ও পূর্ববঙ্গ (বঙ্গ) এ ভুক্তির অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ যুগে কঙ্কগ্রামভুক্তি নামে অপর এক নতুন ভুক্তি গড়ে উঠে। এ যুগের প্রধান ‘বিষয়’গুলি ছিল ‘মহান্ত প্রকাশ- বিষয়’, ‘স্থলিক্কট-বিষয়’, ‘কোটীবষর্- বিষয়’, ‘ক্রিমিলবিষয়’, ‘কক্ষ-বিষয়’, ‘গয়া-বিষয়’, খাটিক বা ‘খাড়ি-বিষয়’, ‘শুভঙ্গ-বিষয়’ ও ‘বড়-বিষয়’। ‘বিষয়’ থেকে বৃহত্তর প্রশাসনিক বিভাগ ‘মণ্ডল’ এর কয়েকটি নামের উলেখ পাওয়া যায়, যেমন ‘ব্যাঘ্রতটীমণ্ডল’, ‘কামরূপমণ্ডল’, ‘গোকালিকামণ্ডল’, ‘হলাবরত্বমণ্ডল’, ‘ব্রাহ্মণীগ্রামমণ্ডল’, উত্তররাঢ়মণ্ডল’ ইত্যাদি। প্রধান প্রধান প্রশাসনিক বিভাগ ছাড়াও তৎকালে ‘পাটক’, ‘চতুরক’ ও ‘আবৃত্তি’ নামক ছোট ছোট প্রশাসনিক বিভাগেরও উল্লেখ পাওয়া যায়।
রাজস্ব প্রশাসনের ক্ষেত্রে এ যুগের লিপিফলকে ‘হট্টপতি’ (সম্ভবত হাট বাজারের তত্ত্বাবধায়ক) নামক কর্মচারীর উলেখ পাওয়া যায়। এ সময়কালে ভূমি পরিমাপের ক্ষেত্রে কোনো কোনো অঞ্চলে সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড অনুসরণ করা হতো। ভূমি সংক্রান্ত দলিলসমূহ রাজকীয় সিলমোহর দ্বারা চিহ্নত করা হতো এবং রাজকীয় সিলমোহরের দায়িত্বে নিয়োজিত রাজকর্মচারীর নাম ছিল ‘মহামুদ্রাধিকৃত’। সেন রাজাদের ভূমিদান-সংক্রান্ত অনুশাসনগুলিতে তৎকালীন বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে ভূমি পরিমাপের মানদণ্ড হিসেবে নলের ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায়। বিজয়সেনের বারাকপুর তাম্রশাসনে সমতট ও পুণ্ড্রবর্ধনভুক্তির খাড়ি-বিষয়ে জমি পরিমাপের জন্য নলের ব্যবহারের উল্লেখ রয়েছে। বল্লালসেন এর নৈহাটি তাম্রশাসনে বিজয়সেন কর্তৃক প্রবর্তিত ‘বৃষভ-শংকর-নলে’র প্রচলন ছিল বলে জানা যায়। লক্ষ্মণসেন এর আনুলিয়া তাম্রশাসনে বৃষভ-শংকর-নলের উল্লেখ রয়েছে। লক্ষ্মণসেনের তর্পণদীঘি তাম্রশাসনে ‘তত্রত্য-দেশ-ব্যবহার নলেন’কথাটির উল্লেখ রয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে, যে অঞ্চলে ভূমি পরিমাপের কোন নির্দিষ্ট মানদণ্ড ছিল না সে অঞ্চলে প্রদত্ত ভূমি মাপা হতো ঐ অঞ্চলে প্রচলিত নলের সাহায্যে। কোনো কোনো পণ্ডিত মনে করেন যে, ‘হস্ত’ ছিল প্রতিটি ক্ষেত্রেই জমি পরিমাপের ভিত্তি। ‘বৃষভ-শংকর-নল’ শব্দ থেকে অনুমিত হয় যে, বিজয়সেনের হাতের মাপই পরিমাপের একক হিসেবে বিবেচিত হতো। লক্ষণসেনের গোবিন্দপুর তাম্রশাসন থেকে জানা যায় যে, নলের পরিমাপ ছিল ৫৬ হাত। আসলে নলের প্রকৃত দৈর্ঘ্য নির্ণয় করা খুবই কঠিন। হয়ত বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন ব্যক্তির হস্ত দ্বারাই নলের প্রকৃত দৈর্ঘ্য নির্ধারণ করা হতো।৮৪০
সময়ের চাহিদা মেটানোর প্রয়োজনে প্রতি যুগেই প্রশাসনিক কাঠামোতে কিছু কিছু পরিবর্তন সব সময়েই হয়েছে এবং হওয়ার পিছনে কিছু যুক্তিসঙ্গত কারণও বর্তমান ছিল। মৌল অক্ষুণ্ণ রেখে পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় ঐতিহাসিক যুগের প্রারম্ভ থেকে ১২০৫ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় প্রশাসনিক ব্যবস্থার ক্রমান্নোতিও লক্ষ্য করা যায়। ঐতিহাসিক পটভূমিকায় আদিবাংলায় প্রশাসনিক ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে পাশ্ববর্তী দেশগুলির চেয়ে অনুন্নত ছিল না।
৮৩৯ নীহাররঞ্জন রায়- বাঙালির ইতিহাস।
৮৪০ চিত্তরঞ্জন মিশ্র।
——————————–
আগামী পর্বেঃ সামরিক ব্যবস্থা।
(প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্ব ১০৮
পাল যুগ
পাল বংশের দীর্ঘ শাসনে বাংলায় প্র মবারের মতো এক শক্তিশালী ও স্থায়ী রাষ্ট্রপ্রশাসন ব্যবস্থা সূচিত হয়। কিন্তুপাল প্রশাসন-ব্যবস্থার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ পাওয়া যায় না। তবে প্রাপ্ত উপাদানের ভিত্তিতে প্রশাসন ব্যবস্থার বিভিন্ন দিকের এক রূপরেখা প্রণয়ন করা সম্ভব। বাংলায় প্রচলিত গুপ্ত প্রাদেশিক শাসন কাঠামোর উপরই পাল রাজাদের আমলে শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শাসন কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়। এ যুগেও পূর্ববর্তী যুগের ন্যায় রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। রাজার জ্যেষ্ঠ পুত্র ‘যুবরাজ’ নামে অভিহিত হতেন। যুবরাজের দায়-দায়িত্ব ও অধিকার সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানা যায় না। গুপ্তযুগের মতো এ যুগেও রাজপুত্রকে ‘কুমার’ নামে অভিহিত করা হতো। ‘কুমার’ প্রাদেশিক শাসনকর্তার পদের মতো উচ্চ প্রশাসনিক দায়িত্ব পেতেন। এ পদে থাকাকালে কুমারগণ রাজার সামরিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন। পাল রাজাদের রাজ্য প্রশাসনে নিয়োজিত কর্মচারীদের পদ ও পদবি সম্পর্কে ইতিপূর্বে বলা হয়েছে। এই বিরাট আমলাতন্ত্রের প্রধান ছিলেন মন্ত্রীক বা সচিব। পাল রাজাদের শাসনামলেই সর্বপ্র ম রাজ্যের একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার উল্লেখ পাওয়া যায় যার পদমর্যাদা প্রধানমন্ত্রীর অনুরূপ। দেবপালের বাদল স্তম্ভলিপি থেকে এ পদের ক্ষমতা ও মর্যাদার বিষয়টি জানা যায়। ধর্মপালের রাজত্বকালে গর্গ নামে একজন ব্রাহ্মণের পরিবারের সদস্যদের জন্য বংশানুক্রমে প্রধানমন্ত্রীর পদ সংরক্ষিত ছিল। গর্গের বংশধরগণ (দর্ভপাণি, সোমেশ্বর, কেদারমিশ্র ও গুরবমিশ্র) পরবর্তী এক শত বছর প্রধানমন্ত্রীর পদ অলংকৃত করেন। তারা সকলেই পাল বংশের শাসন প্রতিষ্ঠা ও সুদৃঢ়করণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
পরবর্তীকালে এরূপ আর এক মন্ত্রী বংশের পরিচয় পাওয়া যায়। যোগদেব ছিলেন তৃতীয় বিগ্রহপালের এবং তাঁর উত্তরাধিকারী বৈদ্যদেব ছিলেন কুমারপালের প্রধানমন্ত্রী। রাজ্যের উচ্চপদে নিয়োগের ক্ষেত্রে এই বংশানুক্রমিক নীতি পরবর্তী চন্দ্র ও যাদব রাজবংশের ক্ষেত্রে প্রচলিত ছিল। ভট্ট ভবদেবের ভুবনেশ্বর প্রশস্তি থেকে এর প্রমাণ মেলে।৮৩৯ পাল রাজাদের অধিনে রাজন, রাজন্যক, রনক, সামন্ত ও মহাসামন্ত উপাধিধারী অনেক সামন্ত রাজা ছিলেন। তারা ছিলেন শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শাসনের নিয়ন্ত্রণাধীন। কেন্দ্রীয় রাজশক্তির দুর্বলতার সুযোগে এ সামন্ত রাজারা নিজেদের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে স্বাধীনতা ঘোষণা করতেন। বরেন্দ্র পুনরুদ্ধারের জন্য রামপালের চৌদ্দ জন সামন্তের সহায়তা চাওয়ার ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয় যে, কখনও সামন্ত প্রধানদের সাহায্যের উপর পাল রাজাদের অনেকাংশে নির্ভর করতে হতো। পাল যুগে পূর্ববর্তী যুগের প্রশাসনিক কাঠামোই প্রচলিত ছিল। তখনো ভূক্তি, বিষয়, মন্ডল, গ্রাম প্রভূক্তি নামে প্রশাসনিক এলাকা ছিল। এছাড়া, খণ্ডল, আকৃতি ও ভাগ নামে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অঞ্চল ছিল।
পাল যুগে কেন্দ্রীয় শাসনের উপর পূর্বের চেয়ে বেশি প্রাধান্য হতো বলে মনে হয় এবং বিভিন্ন শিলালিপিতে কেন্দ্রের উল্লেখই বেশি পাওয়া যায়। মনে হয়- ভূক্তি, বিষয়, মন্ডল, গ্রাম প্রভৃতি এলাকা ও দপ্তরগুলিতে কিছু কিছু প্রশাসনিক ক্ষমতার রদবদল হয়েছিল কি কোথায় কতটুকু হয়েছিল এ বিষয়ে শিলালিপি থেকে বিধি জানা যায় না। সময়ের প্রয়োজনে কিছুটা পরিবর্তন হয়ে থাকলে এগুলির কার্যক্রম নিশ্চয় বন্ধ করে দেয়া হয়নি।
পাল যুগের শাসনব্যবস্থায় রাজা ছিলেন সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী। তার উপাধি পূর্ববর্তী যুগের ন্যায় অক্ষুণড়ব ছিল। তিনি প্রকৃতপক্ষে সীমাহীন ক্ষমতা ভোগ করতেন। রাজা কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক কর্মকর্তারা রাজ্যশাসনে ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালন করতেন। ‘যুবরাজ’ ও প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও এ যুগে রাজ্যে আরও অনেক ‘মন্ত্রী’ ছিলেন। এদের মধ্যে ‘মহাসান্ধিবিগ্রহিক’, ‘রাজমাত্য’, ‘মহাকুমারমাত’ এবং ‘দূত’ ছিলেন প্রধান্য। ‘মহাসান্ধিবিগ্রহিক’ ছিলেন যুদ্ধ ও শান্তি বিষয়ক দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী ‘রাজমাত্য’ বলতে সম্ভবত সাধারণভাবে কনিষ্ঠ মন্ত্রীদের বোঝাত। ‘মহকুমারমাত্যে’র প্রকৃত অবস্থান নির্ণয় করা না গেলেও অনুমান করা যায় তাদের অনেকেই ছিলেন রাজপরিবারের সদস্য। ‘দূত’ ছিলেন বিদেশী রাজ্যের সঙ্গে যোগসূত্র রক্ষাকারী রাষ্ট্রদূত। উপরিউক্ত উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারীদের পরেই এ যুগে ‘অমাত্য’ নামক পদস্থ রাজকর্মচারীর নাম পাওয়া যায়। অন্যান্য উচ্চ রাজকর্মচারীর মধ্যে ‘অঙ্গরক্ষ’ (সম্ভবত রাজার দেহরক্ষী দলের প্রধান) এবং ‘রাজস্থানীয়’র (সম্ভবত রাজ প্রতিনিধ বা প্রাদেশিক শাসনকর্তা) নাম উল্লেখ করা যায়। ‘অধ্যক্ষ’ নামে কেন্দ্রীয় শাসনের সঙ্গে জড়িত আরও এক ধরনের রাজকর্মচারী থাকতেন যার দায়িত্ব ছিল সাধারণভাবে সামরিক প্রশাসন বিভাগের তত্ত্বাবধান করা। ‘প্রমাতৃ’ ও ‘ক্ষেত্রপ’ নামে আরও দুধরনের কর্মচারীর নাম পাওয়া যায় যারা কেন্দ্রীয় শাসনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সম্ভবত তাদের কার্যক্রম সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধে সীমাবদ্ধ ছিল অথবা তারা ছিলেন জমি জরিপ বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মচারী। কোনো কোনো পণ্ডিত মনে করেন যে, ‘প্রমাতৃ’ ছিলেন দেওয়ানি মামলার বিচারক।
রাজস্ব প্রশাসন
পালযুগে কেন্দ্রীয় সরকার শুধু ভূমিকরের উপর নির্ভরশীল ছিল না। কর আদায়ের ক্ষেত্র আরো প্রসারিত হয়েছিল বলে মনে হয়। তার জন্য আলাদা কর্মচারী নিযুক্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়। কৃষিভূমির রাজস্ব আদায় করতেন বিভিন্ন প্রশাসনিক বিভাগের প্রধানগণ যেমন ‘উপরিক’, ‘বিষয়পতি’, ‘দাশগ্রামিক’ ও ‘গ্রামপতি’। রাজস্বের খাত ছিল ‘ভাগ’, ‘ভোগ’, ‘কর’, ‘হিরণ্য’ ও ‘উপরিকর’ প্রভৃতি। এ সকল করের প্রকৃতি নির্ণয় করা কঠিন। তাম্রশাসনে ‘ষষ্ঠাধিখৃত’ নামে রাজস্ব কর্মচারীর উল্লেখ পওায়া যায়। তিনি কৃষকদের নিকট থেকে রাজস্বের এক-ষষ্ঠাংশ রাজার প্রাপ্য হিসেবে আদায় করতেন। ‘ভোগ’কর আদায়ের দায়িত্বে সম্ভবত নিয়োজিত ছিলেন ‘ভোগপতি’। খেয়া পারাপার ঘাট থেকে সম্ভবত রাষ্ট্রে আয় হতো এবং খেয়াঘাটের মাশুল সংগ্রহ করত ‘তরিকা’ নামক কর্মচারী। উপশুল্ক ও আবগারি কর আদায় বিভাগের তত্বাবধায়ক ছিরেন ‘শৌল্কিক’। চোর-ডাকাতদের হাত থেকে প্রজাদের রক্ষার জন্য আরোপিত কর আদায়ের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন‘চৌরোদ্ধরণিক’। ফৌজদারি অপরাধের জন্য আরোপিত অর্থদণ্ড আদায় বিভাগের কর্মকর্তা ছিলেন ‘দশাপরাধিক’।
শিলালিপিতে উল্লিখিত ‘মহাক্ষপটলিক’ নামীয় রাজস্ব কর্মকর্তা ‘জ্যেষ্ঠ কায়স্থ’ নামক কর্মচারীর সহযোগিতায় হিসাব বিভাগের কার্যাবলি নিয়ন্ত্রণ করতেন। ‘মহাদণ্ডনায়ক’ ছিলেন বিচার বিভাগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। ‘মহাপ্রতিহার’, ‘দণ্ডিক’, ‘দণ্ডপাশিক’ ও ‘দণ্ডশক্তি’ উপাধিধারী কর্মকর্তারা পুলিশ বিভাগ পরিচালনা করতেন। ‘খোল’ সম্ভবত ছিলেন
গুপ্তচর বিভাগের দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তা।
সেনাপতি বা মহাসেনাপতি ছিলেন সামরিক প্রশাসনে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সামরিক কর্মকর্তা। তিনি ছিলেন রাজার সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক। পদাতিক, অশ্বারোহী, হস্তি ও উষ্ট্র বাহিনী এবং নৌবাহিনীর জন্য মহাসেনাপতির অধীনে একজন করে স্বতন্ত্র সামরিক কর্মকর্তা নিযুক্ত থাকতেন। পাল রাজাদের অধিকাংশ শিলালিপিতে ‘গ্যেড়-মালব-খাশ-হুণ-কুলিক-কর্ণটিলাট বাক্যের উল্লেখ পাওয়া যায়। এ থেকে বুঝা যায় যে, পাল রাজারা রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনী গঠন করতেন ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের আদিবাসী দ্বারা। শিলালিপিতে বিশেষ কর্মচারী হিসেবে দুর্গাধিপতি ‘কোট্টপাল’ এবং রাজ্যের সীমান্ত রক্ষক‘প্রান্তপাল’-এর উল্লেখ রয়েছে। এছাড়াও পাল তাম্রশাসনে আরও অনেক রাজ কর্মচারীর উল্লেখ পাওয়া যায়।
চন্দ্র বর্মণ ও সেন যুগ
চন্দ্রবর্মন ও সেন আমলে প্রশাসনিক ব্যবস্থা আরো কেন্দ্রীভূত হওয়ার লক্ষণ দেখা যায়। প্রশাসনিক কাঠামো আরো কিছুটা বিস্তৃতি লাভ করেছিল। কিছু নতুন নতুন ক্ষেত্র প্রশাসনের আওতাভুক্ত করা দুটি নতুন রাজকর্মচারীর নাম যেমন ‘মহাব্যূহপতি’ (প্রধান সামরিক কর্মকর্তা) এবং ‘মহাপীলুপতি’ (হস্তি বাহিনীর ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) যথাক্রমে চন্দ্র, বর্মণ ও সেন তাম্রশাসনে এবং বর্মণ ও সেন লিপিফলকে পাওয়া যায়। এছাড়াও রাজকর্মচারীদের তালিকায় এ যুগের উল্লেখযোগ্য সংযোজন হচ্ছে ‘মহাধর্মাধ্যক্ষ’ (প্রধান বিচারকের দায়িত্ব পালনকারী), ‘মহাপুরোহিত’ (প্রধান পুরোহিত), মহাসর্বাধিকৃত্ব’ (রাষ্ট্রীয় সকল বিভাগের প্রধান তত্ত্বাবধায়ক) এবং ‘মহাগস্থ’ (সম্ভবত উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা যিনি বিভিন্ন সামরিক বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন)। সেন তাম্রশাসনে ‘রাজ্ঞী’র উল্লেখ পাওয়া যায়। এ থেকে রাজ্যশাসন বিষয়ে রাণীর রাজনৈতিক প্রভাবের সম্ভাব্যতার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। পাল-পরবর্তী যুগের রাজ্যশাসন বিষয়ের অপর এক গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ব্রাহ্মণ পুরোহিতের প্রাধান্যের সরকারি স্বীকৃতি। বর্মণ ও সেন রাজাদের রাজত্বকালে উচ্চ রাজকর্মচারীর মর্যাদাসহ পুরোহিতের প্রাধান্যের স্বীকৃতি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এ প্রসঙ্গে বিনয়চন্দ্র সেনের মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য:
‘The interest of such an officer whose position in the social sphere was one of the unquestioned domination, would naturally lie in the administration becoming a tool of the priesthood’|
প্রাক-পাল ও পাল যুগের প্রশাসনিক বিভাগসমূহ পরবর্তী শতাব্দীকালেরও বেশি সময় ধরে প্রচলিত ছিল। পাল যুগের পুণ্ড্রবর্ধনভুক্তি (উত্তরবঙ্গের বৃহৎ অংশ এর অন্তর্ভুক্ত ছিল) পরবর্তী যুগে পৌণ্ড্রবর্ধনভুক্তি নামে পরিচিত হয়। সেনরাজাদের আমলে ক্রমাম্বয়ে পৌণ্ড্রবর্ধনভুক্তির সীমা বৃদ্ধি পায়। এটি ছিল বাংলার সর্ববৃহৎ প্রশাসনিক বিভাগ। উত্তরবঙ্গ ছাড়াও দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গ (সমতট) ও পূর্ববঙ্গ (বঙ্গ) এ ভুক্তির অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ যুগে কঙ্কগ্রামভুক্তি নামে অপর এক নতুন ভুক্তি গড়ে উঠে। এ যুগের প্রধান ‘বিষয়’গুলি ছিল ‘মহান্ত প্রকাশ- বিষয়’, ‘স্থলিক্কট-বিষয়’, ‘কোটীবষর্- বিষয়’, ‘ক্রিমিলবিষয়’, ‘কক্ষ-বিষয়’, ‘গয়া-বিষয়’, খাটিক বা ‘খাড়ি-বিষয়’, ‘শুভঙ্গ-বিষয়’ ও ‘বড়-বিষয়’। ‘বিষয়’ থেকে বৃহত্তর প্রশাসনিক বিভাগ ‘মণ্ডল’ এর কয়েকটি নামের উলেখ পাওয়া যায়, যেমন ‘ব্যাঘ্রতটীমণ্ডল’, ‘কামরূপমণ্ডল’, ‘গোকালিকামণ্ডল’, ‘হলাবরত্বমণ্ডল’, ‘ব্রাহ্মণীগ্রামমণ্ডল’, উত্তররাঢ়মণ্ডল’ ইত্যাদি। প্রধান প্রধান প্রশাসনিক বিভাগ ছাড়াও তৎকালে ‘পাটক’, ‘চতুরক’ ও ‘আবৃত্তি’ নামক ছোট ছোট প্রশাসনিক বিভাগেরও উল্লেখ পাওয়া যায়।
রাজস্ব প্রশাসনের ক্ষেত্রে এ যুগের লিপিফলকে ‘হট্টপতি’ (সম্ভবত হাট বাজারের তত্ত্বাবধায়ক) নামক কর্মচারীর উলেখ পাওয়া যায়। এ সময়কালে ভূমি পরিমাপের ক্ষেত্রে কোনো কোনো অঞ্চলে সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড অনুসরণ করা হতো। ভূমি সংক্রান্ত দলিলসমূহ রাজকীয় সিলমোহর দ্বারা চিহ্নত করা হতো এবং রাজকীয় সিলমোহরের দায়িত্বে নিয়োজিত রাজকর্মচারীর নাম ছিল ‘মহামুদ্রাধিকৃত’। সেন রাজাদের ভূমিদান-সংক্রান্ত অনুশাসনগুলিতে তৎকালীন বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে ভূমি পরিমাপের মানদণ্ড হিসেবে নলের ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায়। বিজয়সেনের বারাকপুর তাম্রশাসনে সমতট ও পুণ্ড্রবর্ধনভুক্তির খাড়ি-বিষয়ে জমি পরিমাপের জন্য নলের ব্যবহারের উল্লেখ রয়েছে। বল্লালসেন এর নৈহাটি তাম্রশাসনে বিজয়সেন কর্তৃক প্রবর্তিত ‘বৃষভ-শংকর-নলে’র প্রচলন ছিল বলে জানা যায়। লক্ষ্মণসেন এর আনুলিয়া তাম্রশাসনে বৃষভ-শংকর-নলের উল্লেখ রয়েছে। লক্ষ্মণসেনের তর্পণদীঘি তাম্রশাসনে ‘তত্রত্য-দেশ-ব্যবহার নলেন’কথাটির উল্লেখ রয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে, যে অঞ্চলে ভূমি পরিমাপের কোন নির্দিষ্ট মানদণ্ড ছিল না সে অঞ্চলে প্রদত্ত ভূমি মাপা হতো ঐ অঞ্চলে প্রচলিত নলের সাহায্যে। কোনো কোনো পণ্ডিত মনে করেন যে, ‘হস্ত’ ছিল প্রতিটি ক্ষেত্রেই জমি পরিমাপের ভিত্তি। ‘বৃষভ-শংকর-নল’ শব্দ থেকে অনুমিত হয় যে, বিজয়সেনের হাতের মাপই পরিমাপের একক হিসেবে বিবেচিত হতো। লক্ষণসেনের গোবিন্দপুর তাম্রশাসন থেকে জানা যায় যে, নলের পরিমাপ ছিল ৫৬ হাত। আসলে নলের প্রকৃত দৈর্ঘ্য নির্ণয় করা খুবই কঠিন। হয়ত বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন ব্যক্তির হস্ত দ্বারাই নলের প্রকৃত দৈর্ঘ্য নির্ধারণ করা হতো।৮৪০
সময়ের চাহিদা মেটানোর প্রয়োজনে প্রতি যুগেই প্রশাসনিক কাঠামোতে কিছু কিছু পরিবর্তন সব সময়েই হয়েছে এবং হওয়ার পিছনে কিছু যুক্তিসঙ্গত কারণও বর্তমান ছিল। মৌল অক্ষুণ্ণ রেখে পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় ঐতিহাসিক যুগের প্রারম্ভ থেকে ১২০৫ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় প্রশাসনিক ব্যবস্থার ক্রমান্নোতিও লক্ষ্য করা যায়। ঐতিহাসিক পটভূমিকায় আদিবাংলায় প্রশাসনিক ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে পাশ্ববর্তী দেশগুলির চেয়ে অনুন্নত ছিল না।
৮৩৯ নীহাররঞ্জন রায়- বাঙালির ইতিহাস।
৮৪০ চিত্তরঞ্জন মিশ্র।
——————————–
আগামী পর্বেঃ সামরিক ব্যবস্থা।
খবর বিভাগঃ
বাংলাদেশের ইতিহাস