বুধবার, মার্চ ২৩, ২০১৬

আদি বাংলার ইতিহাস (প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্ব ১০৭

আদি বাংলার ইতিহাস
(প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্ব ১০৭

ব্রাহ্মণরা শুধুমাত্র নতুন লিখন পদ্ধতি, ভাষা, আচার-অনুষ্ঠানের শিক্ষা নিরক্ষর লোকদের দিত তা নয়, তারা লাঙল দিয়ে চাষ করানো, নতুন শস্য, ঋতু বৈচিত্র্য, পঞ্চিকা এবং গবাদি পশুর সংরক্ষণের শিক্ষাও দিত। আমরা শুনেছি আভীর ব্রাহ্মণ, আভীর ক্ষত্রিয়, আভীর বৈশ্য, আভীর মহাশূদ্র, আভীর ছুতোর এবং আভীর স্বর্ণকারদের কথা।৮৩৭
অথবা বর্তমান কালের অফিস সচিব ধরনের রাষ্ট্রীয় কর্মচারী। তবে অধিকরণের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন বিষয়পতি। উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য নগরশ্রেষ্ঠী, প্রথম-সার্থবাহ ও প্রথম-কুলিক সরকার কর্তৃক মনোনীত হতেন নাকি নিজ নিজ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের দ্বারা নির্বাচিত হতেন তা নির্ধারণ করা কঠিন। তবে এ কথা সুস্পষ্টভাবে বলা যায় যে, তারা ছিলেন জেলার প্রধান শহরের বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের প্রতিনিধি।৮৩৮ ধর্মাদিত্যের ফরিদপুর তাম্রশাসনে ‘বিষয়পতি’র অধিকরণ ছাড়াও বিষয় মহত্তর (জেলার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি) এবং অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ (পুরোগঃ প্রকৃত্যশ্চ) সমন্বয়ে গঠিত এক পরিষদের উল্লেখ পাওয়া যায়। রমেশচন্দ্র মজুমদার মনে করেন যে, অতিরিক্ত সদস্যদের নাম ও পদবির পরে ‘পুরোগঃ’ শব্দের ব্যবহার থেকে বোঝা যায় যে, সম্ভবত ‘তারা ছিলেন অধিকরণের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং সাধারণ উপদেষ্টাদের চেয়েও অনেক বেশি অধিকার ও সুবিধা তারা ভোগ করতেন।’ গুপ্ত তাম্রশাসনে বিষয়াধিকরণে কর্মরত দলিলপত্রাদি সংরক্ষণের দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মচারীদের উল্লেখ পাওয়া যায়। জেলার প্রশাসনে বিভিন্ন উপদেষ্টামণ্ডলীর বর্ণনা নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে যে, প্রশাসনে স্থানীয় জনগণের সংযোগ ছিল এবং স্থানীয় প্রশাসনে গণতান্ত্রিক রীতিনীতি অনুসরণ করা হতো।
‘বিষয়’ বা জেলার পরবর্তী অধঃস্তন প্রশাসনিক বিভাগ ‘বীথি’র শাসনব্যবস্থা প্রাচীন বাংলার প্রশাসনের অপর এক গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। ‘বীথি’ শব্দটির প্রকৃত অর্থ অস্পষ্ঠ। কখনও কখনও বীথি ‘ভুক্তি’ বা ‘মণ্ডল’-এর উপ-বিভাগ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। কিছুসংখ্যক শিলালিপিতে এ প্রশাসনিক ইউনিটের উলেখ আছে। সমাচারদেবের গুগ্রাহটি তাম্রশাসনে নব্যবকাশিকায় অবস্থিত সুবর্ণবীথিকে ‘স্বর্ণবাজার’ বলা হয়েছে। প্রশাসনিক বিভাগ হিসেবে ‘বীথি’র উল্লেখ মল্লসারুল তাম্রশাসন থেকেও জানা যায়। এই একই লিপিতে কোন ‘বিষয়’-এর উল্লেখ ছাড়াই বর্ধমানভুক্তির অন্তর্ভুক্ত বক্কটক্কবীথির নাম পাওয়া যায়। ১৫৯ গুপ্তাব্দের পাহাড়পুর তাম্রশাসনে বীথির অপর একটি উল্লেখ রয়েছে। সেখানে দক্ষিণাংশক- বীথিকে পুণ্ড্রবর্ধনভুক্তির অন্তর্ভুক্ত বলা হয়েছে। পাহাড়পুর তাম্রশাসনে বীথ্যধিকরণের অবস্থান সম্পর্কে সুস্পষ্ট উল্লেখ থাকলেও কিভাবে এ অধিকরণ গঠিত হতো তা সঠিকভাবে বলা হয় নি। ভূমি দান-বিক্রয় সংক্রান্ত ব্যাপারে বীথ্যধিকরণের দায়িত্ব ছিল বিষয়াধিকরণের অনুরূপ। মল্লসারুল তাম্রশাসনের সাক্ষ্যে জানা যায় যে, বীথির অধিকরণকে সহায়তা দানের জন্য বিশিষ্ট লোকদের সমন্বয়ে একটি পরিষদ থাকত। বীথির অন্তর্ভুক্ত বিভিন্ন এলাকার নেতৃস্থানী ব্যক্তিগণের মধ্যে ‘মহত্তর’, ‘অগ্রহঋণ’, ‘খড়গী’ (অসি যোদ্ধা) এবং অন্ততপক্ষে একজন ‘বহনায়ক’ (যানবাহন তত্ত্বাবধায়ক) মিলে এ পরিষদ গঠিত হতো।
সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকে বাংলাদেশে গ্রামগুলিই ছিল সমস্ত অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ক্রিয়াকান্ডের ভিত্তিভূমি। গ্রামকে ভিত্তি করেই পার হয়ে এসেছে সভ্যতা প্রারম্ভিক কাল। গুপ্ত যুগেও গ্রামের গুরুত্ব এতটুকুও সংকুচিত হয় নি। সেসময় সম্ভবত গ্রামই ছিল সবচাইতে ছোট প্রশাসনিক ইউনিট। সমসাময়িক শিলালিপিতে গ্রামের স্বাভাবিক নাম উল্লেখ করা হয়েছে। আবার কোনো কোনো লিপিতে গ্রামের নামের শেষে ‘অগ্রহার’ যুক্ত করে উল্লেখ করা হয়েছে। বৈন্যগুপ্তের গুনাইঘর তাম্রশাসনে (৫০৭ খ্রিষ্টাব্দ) অনেকগ্রহার গ্রাম এবং ১৬৯ গুপ্তাব্দের (৪৪৮ খ্রি.) নন্দপুর লিপিতে ‘অম্বিল-গ্রাম-অগ্রহার’-এর উলেখ পাওয়া যায়। নীহাররঞ্জন রায় মনে করেন, প্রশাসনিক দিক থেকে ‘অগ্রহার’কে প্রায়শঃ গ্রাম অপেক্ষা বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও উন্নততর বলে বিবেচনা করা হতো। প্রাচীনকালে কয়েকটি গ্রামের সমন্বয়ে প্রশাসনিক ইউনিট গঠনের ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল বলে মনে হয়। বুধগুপ্তের দামোদরপুর তাম্রশাসনে (৪৮২ খ্রি.) ‘পলাশ-বৃন্দকের’ নাম পাওয়া যায় যার আয়তন ছিল গ্রামের স্বাভাবিক আয়তনের চেয়ে বড়। ১২৮ গুপ্তাব্দের বৈগ্রাম তাম্রশাসনে ছোট ছোট গ্রাম মিলে গঠিত সম্ভবত গুচ্ছগ্রামের একটি উদাহরণ রয়েছে। তাম্রশাসনে একে বৈ-গ্রাম বলা হয়েছে এবং ত্রিবৃতা ও ম্রীগোহালি নামে দুটি পৃথক এলাকা এর অন্তর্ভুক্ত দেখানো হয়েছে।
গ্রামের প্রধান ব্যক্তিরাই গ্রাম-প্রশাসন ও স্থানীয় ব্যাপারে জড়িত থাকতেন। তারা সম্ভবত শাসনকার্যে সরকারি কর্মচারীদের
সাহায্য করতেন। ‘বিষয়’ ও ‘বীথি’ অধিকরণের মতো গ্রাম-শাসনযন্ত্রেও ‘মহত্তর’ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ভূমিকা লক্ষ্য করা যায়। প্রতিটি গ্রামেই যে প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে ‘গ্রামিক’ ছিলেন তা পুরোপুরি প্রমাণ করা যায় না। আবার যে সকল গ্রামের শাসনযন্ত্রে ‘গ্রামিক’ জড়িত ছিলেন না ঐ সকল গ্রামের শাসনযন্ত্রের প্রধান কে ছিলেন লিপিমালা থেকে তাও নির্ণয় করা যায় না। পাহাড়পুর লিপি সাক্ষ্যে জানা যায় যে, ‘ব্রাহ্মণ’, ‘মহত্তর’, ‘কুটুম্বি’ ছিলেন গ্রামের প্রশাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বেসরকারি ব্যক্তি। বুধগুপ্তের দামোদরপুর তাম্রশাসনে (৪৭৬-৯৫ খ্রি.) উল্লিখিত হয়েছে যে, ‘চণ্ডগ্রামে’র শাসনে ‘ব্রাহ্মণ’ ও ‘কুটুম্ব’দের নেতৃত্বে গণ্যমান্য বেসরকারি ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। এ ধরনের ‘গ্রাম’ প্রশাসনের প্রকৃতি অন্যান্য গ্রামের শাসনব্যবস্থার তুলনায় আলাদা ছিল। শেষোক্ত গ্রামের শাসনযন্ত্রের ‘ব্রাহ্মণ’, ‘মহত্তর’ ও ‘কুটুম্ব’প্রভৃতির পাশাপাশি ‘গ্রামিক’ ও ‘অষ্টকুলধিকরণে’র ভূমিকার উলেখ পাওয়া যায়। এ ধরনের গ্রাম-প্রশাসনে অধিকরণেরও অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া যায়। এ অধিকরণ সম্ভবত আটজন প্রধান ব্যক্তি ও গ্রামিকের সমন্বয়ে গঠিত ছিল। এ সকল গ্রামে ভূমি দান-বিক্রয় সংক্রান্ত দলিলপত্রাদি সংরক্ষণের একটি কার্যালয় থাকত। খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে দক্ষিণ ও পূর্ব বাংলার স্বাধীন রাজাদের সময়ে গ্রামের অধিকরণ সম্পর্কে কোন তথ্য পাওয়া যায় না। সম্ভবত গ্রাম-অধিকরণের যথার্থ গঠন বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন ধরনের ছিল।
ভূমি প্রশাসন
আবাহমান কাল থেকে বাংলার সে যুগে উৎপাদনের উপকরণ হিসেবে ভূমিরই ছিল সম্পদ। ভূমির উপর নির্ভরশীল ছিল বলে ভূমির যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ, উন্নয়ন, ভূমি হিসেব-নিকেশ রাখা এবং ভূমির কর আদায় করা ছিল সরকারের প্রধান দায়িত্ব। গুপ্তযুগে এসব কাজের জন্য একটি আলাদা দপ্তর ছিল যা পুস্তপালের দপ্তর নামে পরিচিত ছিল। প্রাচীনকালের ভূমিব্যবস্থা সম্পর্কে সঠিক বিবরণের প্রধান উৎসই হচ্ছে সমসাময়িক কালের তাম্রশাসন। এসকল লিপিমালায় ভূমির মালিকানা, ভূমি দান-বিক্রয় সংক্রান্ত এবং ভূমিস্বত্ব নির্ধারণ সম্পর্কিত তথ্য জানা যায়। এখানে উল্লেখ্য যে, প্রাচীন বাংলার সকল অঞ্চলে ভূমি ব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য একই রকম ছিল না। স্থানীয় অবস্থা, রীতিনীতি ও ঐতিহ্য বিভিন্ন এলাকায় ভূমি ব্যবস্থায় বিভিন্ন মান নির্ধারণে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছে। সেকালে ভূমির মালিকানা সম্পর্কিত বিষয়টি নির্ধারণ করা খুবই কঠিন। এক্ষেত্রে পণ্ডিতদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। ইউ.এন ঘোষাল মনে করেন যে, প্রাচীন বাংলায় রাজাই ছিলেন ভূমির একক স্বত্বাধিকারী। অন্যদিকে আর.জি বসাকের মতে, সমগ্র গ্রামবাসী যৌথভাবে বা কৃষকরা এককভাবে ভূমির প্রকৃত মালিক ছিল। বাংলার প্রথম দিকের ভূমি লেনদেনের পাথুরে দলিল থেকে জমি বিক্রয় বা ধর্মীয় উদ্দেশ্যে পতিত জমি দান করার অসংখ্য উল্লেখ পাওয়া যায়। ভূমি দান বা বিক্রয়কালে ভূমির সীমানা অন্য ভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন করে তা সুস্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট করা হতো। তাম্রশাসনে এ সীমানা নির্ধারণের বিস্তৃত বর্ণনা পাওয়া যায়।
ভূমি হস্তান্তরের বিধি-নিষেধ
সমসাময়িক দলিলে দেখা যায় যে, ভূমি হস্তান্তর সাধারণ নিন্মবর্ণিত শর্তগুলির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হতো, যেমন ‘নীবিধর্ম’ (দামোদরপুর তাম্রশাসন ১নং), ‘অক্ষয়নীবিধর্ম’ (বৈগ্রাম তাম্রশাসন), অথবা ‘অপ্রদধর্ম’ (দামোদরপুর তাম্রশাসন ৫নং)। নীবিধর্মের মূল বৈশিষ্ট্য হলো যে, এটি একটি অ-হস্তান্তরযোগ্য স্থায়ী দান বা বিক্রয়। এ আইনের মাধ্যমে যে ভূমি দানবিক্রয় করা হতো তা ছিল হস্তান্তরের অযোগ্য এবং ভূমি গ্রহীতা তা চিরকাল ভোগ দখল করতে পারতেন (পুত্র পৌত্র ক্রমে ও চন্দ্র তারকা-স্থিতিকাল সম্ভোগ্যম)। এখানে উল্লেখ করা যায় যে, জমি ক্রয়কালে ‘নীবিধর্ম’ বাতিল করে এ ধরনের সীমাবদ্ধতা পরিহার করা যেত অর্থাৎ হস্তান্তরের ক্ষমতা প্রদান করা যেত। ‘অক্ষয় নীবিধর্ম’ কথার দ্বারা জমি হস্তান্তরের উপর স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা বোঝাত বলে মনে হয়। ভাস্করবর্মার নিধনপুর তাম্রশাসনে ষষ্ঠ ও সপ্তম শতাব্দীতে বাংলায় ধর্মীয় উদ্দেশ্যে নিষ্কর ভূমিদানের উল্লেখ পাওয়া যায়। এ যুগে রাজা কর্তৃক মন্দির, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, পুরোহিত ও শিক্ষিত ব্রাহ্মণদের এবং অনেক সময় প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিবর্গকে যৌথভাবে ভূমিদানের উল্লেখ পাওয়া যায়।
ভূমির শ্রেণীভেদ ও পরিমাপ
গুপ্ত যুগের শিলালিপি ও তাম্র শাসন থেকে বোঝা যায় যে, জমি তখন প্রধানতঃ দু’ভাগে বিভক্ত ছিল- বসতভিটা ও নালজমি। নালজমিকে আমরা তিনভাগে দেখতে পাই, যথা- আবাদী জমি (অপ্রদ), অনাবাদী জমি (অপ্রহদ) এবং খিল বা পতিত জমি।
গুপ্ত আমলে জমি বিক্রয় সংক্রান্ত তাম্রশাসনে জমির পরিমাপের বিবরণও রয়েছে। ভূমির যথার্থ পরিমাপের দায়িত্ব সম্ভবত সে সংস্থার উপরই ন্যস্ত করা হতো যে সংস্থা ক্রয়ের জন্য আবেদনপত্র গ্রহণ করত। সমগ্র বাংলায় ভূমির পরিমাপ একই ধরনের ছিল না। গুপ্তযুগে জমির পরিমাপের একক ছিল ‘কুল্যবাপ’ ও ‘দ্রোণবাপ’। এক ‘কুল্য’ পরিমাপের বীজ দ্বারা যে পরিমাপের জমি বপন করা যায় ‘কুল্যবাপ’ শব্দ দ্বারা সাধারণত ঐ পরিমাণ জমিকে বোঝাত। ‘কুল্যবাপে’র আট ভাগের এক ভাগকে ‘দ্রোণবাপ’ বলা হতো। বর্তমান বাংলাদেশেরও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার উত্তরাংশ, হবিগঞ্জ জেলার পশ্চিমাংশ, কিশোরগঞ্জ এবং নেত্রকোণার পূর্বাংশের মধ্যে জমির পরিমাণ নির্ধারণ করতে ‘দ্রোণ’ কথাটি এখনও প্রচলিত আছে। এখানে ১৬ কানি অর্থাৎ ৪০০ শতাংশ বা ৪ একর জমিকে ১ ‘দ্রোণ’ বলা হয়। প্রাচীনকালের ‘কুল্যবাপে’র সঠিক পরিমাণ নির্ণয় করা খুবই কঠিন। কোনো কোনো পণ্ডিত মনে করেন যে, এটি ছিল প্রায় তিন বিঘার সমান। শিলালিপিতে জমির পরিমাপের একক হিসাবে আরও শব্দের উল্লেখ পাওয়া যায়, যেমন- ‘পাটক’ অথবা ‘ভূপাটক’। বৈন্যগুপ্তের গুণাইঘর তাম্রশাসনে ধর্মীয় উদ্দেশ্যে একজন ব্রাহ্মণকে পাঁচটি ভূমিখণ্ডে এগার ‘পাটক’ আকর্ষিত ভূমিদানের উল্লেখ রয়েছে। ঐ একই সূত্রে এক ‘পাটক’ ভূমি চল্লিশ ‘দ্রোণ’ বা ‘দ্রোণবাপে’র সমান বলে নির্দেশ করা হয়েছে। ভূমি পরিমাপের ক্ষেত্রে উপরোক্ত এককগুলি ছাড়াও ‘আঢক’ বা আঢবাপ’, উন্মান’ বা ‘উদান’, ‘কাক’ বা ‘কাকিনি’, ‘ভূ-খাদি’, ‘খাদিক’, ‘হাল’(১২ কানি বা ৩ একর), ‘দ্রোণ’ প্রভৃতি এককসমূহ প্রচলিত ছিল। কিন্তু এগুলির কোনটির পরিমাণ কত ছিল তা যথাযথভাবে নির্ণয় করা খুবই দুষ্কর। গুপ্ত ও গুপ্ত পরবর্তী যুগের লিপিমালায় ভূমির পরিমাপের প্রকৃত একক হিসাবে ‘নলে’র ব্যবহারের উপর আলোকপাত করা হয়েছে। বৈগ্রাম তাম্রশাসন ও ধর্মাদিত্যের ফরিদপুর তাম্রশাসনে ‘অষ্টক-নবকনেলন’ অথবা ‘অষ্টক-নবক-নলাভ্যম’ শব্দের উল্লেখ পাওয়া যায়।
ভূমি বিক্রয় পদ্ধতি
গুপ্তযুগে জমি ক্রয়-বিক্রয় ও হস্তান্তর সম্পর্কে দলিল দস্তাবেজ পাওয়া না গেলেও গুপ্তযুগের অনেক তাম্রশাসনে তার উল্লেখ আছে যার ভিত্তিতে জমি ক্রয়-বিক্রয়ের পদ্ধতি সম্পর্কে একটি কাঠামো দাঁড় করানো যায়। জমি ক্রেতাকে প্রথমে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমির পরিমাণ, কি কাজে ব্যবহৃত হবে, বাজার মূল্য ও ক্রেতা কি মূল্য দিতে আগ্রহী ইত্যাদি বিষয়ের ফিরিস্তিসহ দরখাস্ত করতে হতো। সংশ্লিষ্ট দপ্তর বা অধিকরণ অনুমোদন পুস্তপালের মাধ্যমে শর্তগুলি যাচাই করে সরকারের পক্ষ থেকে পুস্তপাল তাম্র শাসনে লিখে জমির নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করে স্থানীয় গণ্যমান্যদের সাক্ষী রেখে জমি ক্রেতাকে বুঝিয়ে দেয়া হত এবং তার হাতে ক্রয়ের দলিল তাম্রশাসনটি তুলে দেয়া হতো। পুস্তপালের কাজ ছিল জমি সংকরান্ত বিষয়ের খোঁজখবর রাখা, ক্রয়-বিক্রয়, দানপত্রের দলিল রক্ষণাবেক্ষণ করা এবং জমির পরিমাণ ও কি ধরনের কাজের উপযুক্ত এসব বিষয়ের খবর সংরক্ষণ করা।
পুস্তপালের দপ্তরটি গুপ্তযুগে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলে মনে হয়। জমির মূল্য কিভাবে এবং কার কাছে পরিশোধ করা হতো এ বিষয়ে কোন তথ্য পাওয়া যায় না। তবে মনে হয় পুস্ত পালের দপ্তরই কেনা-বেচার ও মূল্য গ্রহণের দায়িত্ব পালন করতো। একটি অবিন্যাস্ত প্রশাসনিক আদিম অবস্থা থেকে সাড়ে বার’শ বছর সময়কালের মধ্যে (৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ থেকে ৭৫০খ্রিষ্টাব্দ) একটি গ্রাম্য গোষ্ঠীবদ্ধ শাসনতান্ত্রিক অবস্থা থেকে ধাপে ধাপে উন্নত হয়ে একটি গণমূখী রাজতন্ত্রের উদ্ভব হয়েছে।
এই দীর্ঘ সময়ের ধারাবাহিকতায় ইতিহাস না থাকলেও পরিবর্তন সূচিত হওয়ায় সাক্ষ্য প্রমাণ পাওয়া যায়। ক্ষমতা বণ্টনের বিধি ব্যবস্থায় যতটা স্থানীয়ভাবে রূপ লাভ করেছে তার চেয়ে বেশি সংগ্রহ ও প্রশিক্ষণ পেয়েছে মৌর্য ও গুপ্ত আমলের কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থার উপমা থেকে। ধাপে ধাপে এই অগ্রগতি পাল ও সেন যুগে এসে অনেকখানি পূর্ণতা লাভ করেছে। প্রশাসনে বাঙালি মেধা ও প্রতিভার কিছুটা উদাহরণ হলেও এযুগে রয়ে গেছে।
খ্রিষ্টপূর্ব ৫০০-৭৫০ খ্রিষ্টাব্দ (পাল পূর্বযুগ)
বুদ্ধযুগের সূচনায় দু’ধরনের রাষ্ট্র-প্রতিষ্ঠান দেখা যায়। উল্লেখ করা হয়েছে, সম্ভবত, পশ্চিম ও উত্তর বঙ্গে প্রথম রাজতন্ত্রের পত্তন হয় এবং পূর্ব বঙ্গে তখনও গোষ্ঠীবদ্ধ সমাজ ব্যবস্থার প্রশাসনিক কাঠামোর অধিনে শাসিত হচ্ছিল। আবার রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থাও মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত ধারায় রূপ লাভ করেছে। ৫০০ শতক থেকে ৭৫০ শতকের মধ্যে বাংলাদেশ শাসন করেছে গুপ্তরা, অন্যদিকে গোপচন্দ্র, বর্মাদিত্য ও সমাচার দেব ৫২৫ থেকে ৬০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত, গৌড়ের মহাসেন গুপ্ত ৫৯৫ সাল পর্যন্ত, শশাঙ্ক, বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যায় ৬৩৭ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করেছিলেন। সম্ভবত শশাঙ্কই প্রথম বাঙালি শাসনকর্তা যিনি উড়িষ্যা ও মগধে প্রাধান্য বিস্তার করেছিলেন। এরপর দীর্ঘ একশত বছরের অধিক কাল বঙ্গে অরাজগতার সময়।
পাল রাজাদের প্রারম্ভিক কালেই আমরা বাংলাদেশে তাদের গড়ে তোলা প্রশাসনিক কাঠামোর খবর পাই। তার সূচনা নিশ্চয় অনেক পূর্বেই আরম্ভ হয়েছিল। মৌর্য আমলে আরম্ভ হয়ে গুপ্তদের সময়ে একটি বিস্তৃত এবং পরিবর্তিত সামন্ততান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে জানা যায়। এই সামন্ততন্ত্র গুপ্তদের সময়ে পূর্ণভাবে বিকশিত হয়েছিল বলেই প্রমাণ পাওয়া যায়। এই ব্যবস্থা স্থানীয়ভাবে রূপ লাভ করে শশাঙ্কের আমলেই। এই রুপের অর্থাৎ প্রাচীন বাংলার প্রশাসনিক কাঠামোর পূর্ণইতিহাস পাওয়া যায় না বলে তার পুনর্গঠন বেশ কষ্টসাধ্য একটি কাজ। প্রকৃতপক্ষে প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে মুসলমানদের আগমন পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে বাংলার প্রশাসনিক ইতিহাস রচনার পথে প্রধান অন্তরায় হচ্ছে পর্যাপ্ত তথ্যের অভাব। এক্ষেত্রে কেবল সমসাময়িক লিপিমালায় প্রাপ্ত তথ্যই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎস। কিন্তু একমাত্র লিপিমালার উপর ভিত্তি করে শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারণা লাভ করা সম্ভব নয়। শিলালিপি থেকে প্রাপ্ত তথ্যের সীমাবদ্ধতা প্রাচীন বাংলার শাসন ব্যবস্থার বিবরণকে অনেকাংশে অসম্পূর্ণ করে রেখেছে। সমসাময়িক বাংলার প্রশাসনিক রূপরেখার গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলি পুনর্গঠনের যে কোন প্রয়াসে এই সীমাবদ্ধতা একটি বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়।
পঞ্চম হতে অষ্টম শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বিভিন্ন যেসব রাজপুরুষদের উল্লেখ পাওয়া যায় তাতে মনে হয় মহারাজাধিরাজের অধীনে রাজা, রাজক, রাজনক-রাজন্যক, সামন্ত-মহাসামন্ত, মাণ্ডুলিক-মহামাণ্ডুলিক, দন্ডপাশিক, দন্ডনায়ক, বিষয়াপতি, এসব নিয়ে গঠিত ছিল রাজপাদোপজীবী, রাজকর্মচারী ও কর্মকর্তা। রাজা-রাজনক-রাজপুত্র হতে আরম্ভ করে তরিক-শৌল্কিক-গৌল্মিক প্রভৃতি নিন্মস্তরের রাজকর্মচারী পর্যন্ত সকলের উল্লেখই শুধু নয়, তাঁদের সকলকে একত্রে একমালায় গেঁথে বলা হয়েছে ‘রাজপাদোপজীবীন’, এবং সুদীর্ঘ তালিকায়ও যখন সমস্ত রাজপুরুষের নাম শেষ হয় নি, তখন তার পরই বলা হয়েছে ‘অধ্যক্ষপ্রচারোক্তানিহকীর্তিতান’, অর্থাৎ আর যাঁদের কথা এখানে কীর্তিত বা উল্লিখিত হয়নি কিন্তু তাঁদের নাম (অর্থশাস্ত্র জাতীয় গ্রন্থের) অধ্যক্ষ পরিচ্ছেদে উল্লিখিত আছে। এতে বুঝা যায় পাল আমলের বহু পূর্বেই এইসব পদ ও পদবি বাংলাদেশে ও বাংলাদেশের বাহিরেও ছিল, কিন্তু পাল আমলেই শুধু পদগুলিকে একত্রে সুবিন্যাস্ত অবস্থায় দেখা যায়। সপ্তম শতকের সূচনা হতে গৌড় স্বাধীন, স্বতন্ত্র রাষ্ট্রীয় সত্তা লাভ করে; বঙ্গ এই সত্তার পরিচয় পেয়েছিল ষষ্ঠ শতকের তৃতীয় পাদ হতে। যাহোক, সপ্তম শতকেই সর্বপ্রথম গৌড় নিজস্ব রাষ্ট্র লাভ করল, নিজস্ব শাসনতন্ত্র গড়ে তুলল। গৌড় ও কর্ণসুর্ণের রাজা শশাঙ্ককে আশ্রয় করেই তার সূচনা দেখা গেল; কিন্তু তার পরই প্রায় শতাব্দীকাল ধরে সমস্ত দেশ জুড়ে রাষ্ট্রীয় আবর্ত, মাৎস্যন্যায়ের উৎপীড়ন। এই মাৎস্যন্যায় পর্বের পর পাল রাষ্ট্র ও রাজ্য লাভ করল, রাষ্ট্রীয় স্বাজাত্য ফিরে পেল, এবং পেল পূর্ণতর বৃহত্তর রূপে। মর্যাদায় ও আয়তনে, শক্তিতে ও ঐক্যবোধে বাংলাদেশ নিজের এই পূর্ণতর বৃহত্তর রূপ আগে কখনও দেখে নি। শশাঙ্কের গৌড়ের সমসাময়িককালে গৌড় পূর্বাঞ্চলে তিনটি রাষ্ট্রের সন্ধান পাওয়া যায়। যেমন পদ্মা ও ব্রহ্মপুত্রের মধ্যবর্তী অঞ্চলে যাকে আমরা বঙ্গ বলে জানি, তার দক্ষিণ দিকে চন্দ্রদ্বীপ এবং পূর্বদক্ষিণে সমতট রাষ্ট্রের অস্তিত্ব ছিল। শশাঙ্কের সময়ে মগধের বৃহত্তর অংশ ছিল গৌড়ের অধীন, তখন বাংলাদেশ এত সুবিস্তৃত ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে রাষ্ট্রে শক্তিশালী ভিত্তি ও প্রশাসনিক আমলাতন্ত্র গৌড়ের মতই ছিল বলে মনে হয়। শাসনতন্ত্রের মৌলনীতিও আমলাতান্ত্রিক ব্যবস্থা একই ধরনের ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়।
জনপদের স্তর
মহত্তর, মহামহত্তর, কুটুম্ব, প্রতিবাসী, জনপদবাসী ইত্যাদিরা বিভিন্ন স্তরে ভূম্যধিকারী ছিলেন। কয়েকটি গ্রাম যেসব ভূস্বামীদের অধীনে ছিল তারাই সম্ভবত ছিলেন মহামহত্তর। কুটুম্ব, প্রতিবাসী, জনপদবাসী- এরা সাধারণভাবে স্বল্পভূমিসম্পন্ন গৃহস্থ; কৃষি, গৃহ-শিল্প ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যবসা এদের বৃত্তি ও জীবিকা। কৃষি তাদের জীবিকা হলেও, নীহাররঞ্জন রায়ের মতে, এরা চাষী ছিলেন না। চাষের কাজ নিজে যাঁরা করতেন, তাঁরা ক্ষেত্রকর, কর্ষক, কৃষক বলেই পৃকভাবে উল্লিখিত হয়েছেন। অষ্টম শতকের দেবখড়েগর আস্রফপুর-লিপি পাওয়া যায়, তাতে উল্লিখিত আছে, ভূমি ভোগ করছেন একজন, কিন্তু চাষ করছে অন্য লোকেরা- “শ্রীশর্বান্তরেণ ভুজ্যমানক: মহত্তরশিখরাদিভি: কৃষ্যমাণক:” (এখানে মহত্তর এক ব্যক্তির নাম)। এই ব্যবস্থা শুধু এখন নয়, প্রাচীনকালে এবং মধ্যযুগেও প্রচলিত ছিল। বস্তুত, যিনি ভূমির মালিক, তাঁর পক্ষে নিজের হাতেই সমস্ত ভূমি চাষাবাদ করা সম্ভব ছিল না। সাহিত্য-পরিষদে রক্ষিত বিশ্বরূপসেনের এক লিপিতে দেখা যায়, হলায়ুধ শর্মা নামক জনৈক আবল্লিক মহাপণ্ডিত ব্রাহ্মণ একা নিজের ভোগের জন্য নিজের গ্রামের আশেপাশে তিন-চারটি ভিন্ন ভিন্ন গ্রামে ৩৩৬১/২ উন্মান ভূমি রাজার নিকট হতে দানস্বরূপ পেয়েছিলেন; এই ভূমির বার্ষিক আয় ছিল ৫০০ কপর্দক পুরাণ।এই ৩৩৬১/২ উন্মানের মধ্যে অধিকাংশ ছিল নালভূমি অর্থাৎ চাষের ক্ষেত্র। এই সমগ্র ভূমি হলায়ুধ শর্মার সমগ্র পরিবার পরিজনবর্গ নিয়েও নিজেদের চাষ করা সম্ভব ছিল না এবং হলায়ুধ শর্মা ক্ষেত্রকর বলে উল্লিখিতও হতে পারেন না। তাঁকে জমি ক্ষেত্রকরদের মধ্যে বিলি বন্দোবস্ত করে দিতেই হতো। নীহাররঞ্জন রায় অনুমান করেন, সমাজের মধ্যে ভূমি-সম্পদে ও শিল্প-বাণিজ্যাদি সম্পদে সমৃদ্ধ নানা স্তরের একটি শ্রেণীও ছিল এবং এই শ্রেণীরই প্রতিনিধি হচ্ছেন মহত্তর, মহামহত্তর, কুটুম্ব ইত্যাদি ব্যক্তিরা।
প্রশাসনে বিবর্তন
সমসাময়িককালের লিপিগুলি থেকে জানা যায় যে, পাল-পূর্বযুগে আমলাতন্ত্রের গঠন-বিন্যাস ও ক্ষমতার প্রয়োগ-পদ্ধতি গুপ্ত আমলের মতই ছিল। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নতুন নতুন ক্ষেত্রে প্রয়োগের ফলে প্রশাসনিক জটিলতাও বেড়ে যায়। এই যুগে সৃষ্টি হয় বীথি নামে নতুন বিভাগ। বঙ্গে-সমতটেও ভুক্তি এবং বিষয়-বিভাগের মত বীথি-ভাগেরও একটি অধিকরণ থাকত। ভুক্তি শব্দের অর্থ যেখানে ভোগ বা আমোদ করা যায়। ভুক্তির যিনি উপরিক বা শাসনকর্তা থাকতেন তাঁর দায়িত্ব বেড়ে যায় আবার তাকে অধিক মর্যাদাবান মহারাজ বলা হয়েছে, যেমন গুপ্ত-আমলেও বলা হত; কিন্তু কখনো কখনো নতুন উপাধি তাঁর উপর অর্পিত হয়েছে। যেমন- সমাচারদেবের কুর্পালা-পট্টোলীতে ভুক্তির শাসনকর্তাকে বলা হয়েছে, ‘পৌরোপকারিকব্যাপারপর-মহাপ্রতীহার;’ শশাঙ্কের অন্যতম মেদিনীপুর লিপিতেও দণ্ডভুক্তির শাসনকর্তাকে বলা হয়েছে মহাপ্রতীহার; সমাচারদেবের ঘুগ্রাহাটি-লিপিতে উপরিক জীবদত্তকে অধিকন্তু বলা হয়েছে অন্তরঙ্গ। মল্লসারুল-পট্টোলীতে (গোপচন্দ্রের আমল) অনেক নতুন নতুন রাজপুরুষের নামের দীর্ঘ তালিকা সর্বপ্রথম পাওয়া যাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় স্বাতন্ত্র্য লাভের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্র অনেক বেশি আত্মসচেতন হয়েছে, নতুন নতুন সামাজিক দায় ও কর্তব্য রাষ্ট্রের স্বীকৃতি লাভ করছে। দায়িত্বের চাপে এবং নতুন নতুন ক্ষেত্রে প্রশাসন সম্প্রচারিত হওয়ার ফলে পাদপোজীবীদের ক্ষমতায়ন, প্রশাসন, মর্যাদা প্রভৃতির ক্ষেত্রেও পরিবর্তন সূচিত হয়। আগে যা ছিল পল্লী বা স্থানীয় স্বায়ত্বশাসনের অন্তর্গত তা ধীরে ধীরে রাষ্ট্রের কুক্ষিগত হয়। এই পর্যায়ে বিষয়াধিকরণ যাঁরা গঠন করছেন তাঁদের মধ্যে শ্রেষ্ঠী-সার্থবাহ-কুলিকদের উপস্থিতি পাওয়া যায় না; পরিবর্তে মহত্তর এবং ব্যাপারী বা ব্যবহারী প্রভৃতিদের দেখা যাচ্ছে। মহত্তরেরা স্থানীয় প্রধান, ব্যাপারী-ব্যবহারীরা তো স্পষ্টটতই শিল্পী-বর্ণিক-ব্যবসায়ী সমাজের প্রতিনিধি। রাষ্ট্রে শিল্পী-বণিক-ব্যবসায়ীদের আধিপত্য তখনও বিদ্যমান; তবে সে আধিপত্য এখন অন্যান্য স্থানীয় প্রধানদের সঙ্গে ভাগ করে ভোগ করতে হচ্ছে, অথবা এমনও হতে পারে, যে অঞ্চলের বিষয়াধিকরণে এই গঠন-বিন্যাস পাওয়া যাচ্ছে সেই অঞ্চলে তাদের নিরবচ্ছিন্নন প্রাধান্য ছিল না। মলসারল-লিপিতে বীথি-অধিকরণ গঠন-বিন্যাসেরও সংবাদ পাওয়া যায়। সেই অধিকরণটি গঠিত হয়েছিল একজন বাহনায়ক এবং মহত্তর, অগ্রহারী ও খাড়্গীদের নিয়ে। বাহনায়ক পথঘাট-যানবাহনের কর্তা এবং রাজপুরুষ বলেই মনে হয়। অগ্রহারীরা বোধ হয় ব্রাহ্মণদের প্রতিনিধি অথবা অগ্রহার-ভূমি বা গ্রামের শাসনকর্তা। মহত্তরেরা ছিলেন স্থানীয় গ্রাম প্রধান। খাড়ঈ কারা বোঝা কঠিন, তবে পরবর্তীকালের খড়্গগ্রাহী এবং খড়গী বোধ হয় একই শ্রেণীর রাজপুরুষ।
পাল রাজাদের রাজ্য প্রশাসনে নিয়োজিত কর্মচারীদের পদ ও পদবি সম্পর্কে ইতিপূর্বে বলা হয়েছে। এই বিরাট আমলাতন্ত্রের প্রধান ছিলেন মন্ত্রীক বা সচিব। পাল রাজাদের শাসনামলেই সর্বপ্র ম রাজ্যের একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার উল্লেখ পাওয়া যায় যার পদমর্যাদা প্রধানমন্ত্রীর অনুরূপ। দেবপালের বাদল স্তম্ভলিপি থেকে এ পদের ক্ষমতা ও মর্যাদার বিষয়টি জানা যায়। ধর্মপালের রাজত্বকালে গর্গ নামে একজন ব্রাহ্মণের পরিবারের সদস্যদের জন্য বংশানুক্রমে প্রধানমন্ত্রীর পদ সংরক্ষিত ছিল। গর্গের বংশধরগণ (দর্ভপাণি, সোমেশ্বর, কেদারমিশ্র ও গুরবমিশ্র) পরবর্তী এক শত বছর প্রধানমন্ত্রীর পদ অলংকৃত করেন। তারা সকলেই পাল বংশের শাসন প্রতিষ্ঠা ও সুদৃঢ়করণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
পরবর্তীকালে এরূপ আর এক মন্ত্রী বংশের পরিচয় পাওয়া যায়। যোগদেব ছিলেন তৃতীয় বিগ্রহপালের এবং তাঁর উত্তরাধিকারী বৈদ্যদেব ছিলেন কুমারপালের প্রধানমন্ত্রী। রাজ্যের উচ্চপদে নিয়োগের ক্ষেত্রে এই বংশানুক্রমিক নীতি পরবর্তী চন্দ্র ও যাদব রাজবংশের ক্ষেত্রে প্রচলিত ছিল। ভট্ট ভবদেবের ভুবনেশ্বর প্রশস্তি থেকে এর প্রমাণ মেলে।৮৩৯ পাল রাজাদের অধিনে রাজন, রাজন্যক, রনক, সামন্ত ও মহাসামন্ত উপাধিধারী অনেক সামন্ত রাজা ছিলেন। তারা ছিলেন শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শাসনের নিয়ন্ত্রণাধীন। কেন্দ্রীয় রাজশক্তির দুর্বলতার সুযোগে এ সামন্ত রাজারা নিজেদের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে স্বাধীনতা ঘোষণা করতেন। বরেন্দ্র পুনরুদ্ধারের জন্য রামপালের চৌদ্দ জন সামন্তের সহায়তা চাওয়ার ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয় যে, কখনও সামন্ত প্রধানদের সাহায্যের উপর পাল রাজাদের অনেকাংশে নির্ভর করতে হতো। পাল যুগে পূর্ববর্তী যুগের প্রশাসনিক কাঠামোই প্রচলিত ছিল। তখনো ভূক্তি, বিষয়, মন্ডল, গ্রাম প্রভূক্তি নামে প্রশাসনিক এলাকা ছিল। এছাড়া, খণ্ডল, আকৃতি ও ভাগ নামে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অঞ্চল ছিল।
পাল যুগে কেন্দ্রীয় শাসনের উপর পূর্বের চেয়ে বেশি প্রাধান্য হতো বলে মনে হয় এবং বিভিন্ন শিলালিপিতে কেন্দ্রের উল্লেখই বেশি পাওয়া যায়। মনে হয়- ভূক্তি, বিষয়, মন্ডল, গ্রাম প্রভৃতি এলাকা ও দপ্তরগুলিতে কিছু কিছু প্রশাসনিক ক্ষমতার রদবদল হয়েছিল কি কোথায় কতটুকু হয়েছিল এ বিষয়ে শিলালিপি থেকে বিধি জানা যায় না। সময়ের প্রয়োজনে কিছুটা পরিবর্তন হয়ে থাকলে এগুলির কার্যক্রম নিশ্চয় বন্ধ করে দেয়া হয়নি।
৮৩৭ D. R. Vandarkar, Foreign Elements in The Hindu Population, p. 286-88.
৮৩৮ নীহাররঞ্জন রায়- বাঙালির ইতিহাস
——————————————————-
আগামী পর্বেঃ পাল যুগ

শেয়ার করুন