বুধবার, মার্চ ২৩, ২০১৬

আদি বাংলার ইতিহাস (প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্ব ১০৬

আদি বাংলার ইতিহাস
(প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্ব ১০৬
*প্রশাসন।*
প্রাগৈতিহাসিক যুগ
প্রাগৈতিহাসিক বাংলায় কখনও স্থায়ী কোন প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছিল না। প্রত্যেক নতুন বিজয়ের পরপরই নতুন ধরনের শাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হতো। ঐতিহাসিকযুগে, বিশেষ করে ৭০০/৬০০ খ্রিষ্টপূবাব্দ থেকে গোষ্ঠিবদ্ধ সমাজ জীবনে প্রাথমিক বা আদিম প্রশাসনিক ব্যবস্থার সূচনা হয় বলে পণ্ডিতদের ধারণা। পশুপালক ও চাষবাসে উৎপন্ন শস্যের সংগ্রহ এবং বণ্টন ব্যবস্থার জন্য গোষ্ঠী শাসনতন্ত্রে নিশ্চয়ই কোন না কোন বিধি বিধান বা নিয়মকানুন ছিল। এগুলি সম্ভবত এদেশের প্রথম আদিম প্রশাসনিক বিধান এবং সামাজিকভাবেই এ বিধান প্রয়োগ এবং প্রচলিত ছিল।
প্রাচীনযুগ (১৫০০-৫০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ)
এই যুগের প্রারম্ভিক কালে কোন প্রাতিষ্ঠানিক প্রশাসনিক কাঠামো ছিল এমন কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। ঐতিহাসিক যুগের প্রারম্ভে বাংলাদেশে পরিবার একটি দৃঢ় সমাজ কাঠামো হিসেবে গড়ে ওঠারও প্রারম্ভিক কাল, আর পরিবারগুলি তখনও সম্ভবত নিয়ন্ত্রণ করত গোত্রপ্রধান। আর বিভিনড়ব গোত্রগুলো মিলে সে সময়ে গঠিত হতো গোষ্ঠীবদ্ধসমাজ। সমাজ প্রধানই ছিলেন সমাজের প্রধান ব্যক্তি। বাংলার আদিবাসীদের পরিবারগুলি ছিল মাতৃতান্ত্রিক। অবশ্য সব গোত্রের মধ্যেই একই তন্ত্র ছিল বলে মনে হয় না। তবে মাতৃতান্ত্রিকতার প্রাধান্য ছিল এ কথার সত্যতা ইতিহাস থেকে পাওয়া যায়। কালক্রমে সমাজ প্রধান একদিন শীথিলভাবে গঠিত রাষ্ট্রপ্রধানের মর্যাদা লাভ করে। রাষ্ট্রগঠন হওয়ার পর প্রশাসনিক কাঠামোতে তিনটি শ্রেণীর প্রাধান্য বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনী ও লোকসাহিত্যের মাঝে পাওয়া যায়। এই শ্রেণীগুলো হলো সমাজ প্রধান বা রাষ্ট্রপ্রধান, সমাজের পুরোহিত ও রাষ্ট্র যন্ত্রের সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ এবং লাঠিয়াল বাহিনী যা পরবর্তীকালে সামরিক বাহিনীতে রূপ নেয়। বণিকশ্রেণীর প্রতাপ তখনও গড়ে ওঠেনি।
এ প্রশাসনের রূপরেখা কেমন ছিল তার সঠিক ইতিহাস না পেলেও দেশে বসবাসকারী আদিবাসীদের জীবনযাত্রা ও গোত্র প্রশাসন থেকে আমরা কিছুটা হলেও আঁচ করতে পারি। গোষ্ঠীবদ্ধ সমাজ প্রধানের শক্তি নিহিত ছিল লাঠিয়াল বা সৈন্যবাহিনী নয়, পুরুষানুক্রমে গড়ে ওঠা সমাজপ্রধানের প্রতি ব্যক্তিগত ও দলীয় আনুগত্য। অবশ্য, সাধারণ মানুষকে সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা, চোর-ডাকাতের উপদ্রব, বহিঃশত্রুর আক্রমণ, লুণ্ঠন ও রাহাজানি থেকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রতি সক্ষম পরিবারকেই কিছু না কিছু উদ্বৃত শস্য বা কায়িক পরিশ্রম দিতে হতো।
খ্রিষ্টপূর্ব ৫ম শতকেরও পরে, এমন কি মৌর্য কালেও, প্রাচীন বাংলার কোন কোন অঞ্চলের অধিবাসীরা সমাজবদ্ধ হয়ে বাস করত, তাদের সমাজ ছিল, রাজা ছিল, রাষ্ট্রও ছিল। তারও আগে যখন রাজা ছিল না, কিন্তু গোষ্ঠীবদ্ধ ছিল, ইতিহাসের সেই ঊষাকালে সেই সমাজেরও একটা শাসনপদ্ধতি ছিল। আজও তা নিশ্চিহ্ন হয়ে লোপ পেয়ে যায় নি। বাংলার বিভিন্ন জেলায় সমাজের নিন্মতম স্তরে, অথবা পার্বত্য আরণ্য আদিবাসীদের মধ্যে, যেমন সাঁওতাল, গারো, রাজবংশী ইত্যাদির মধ্যে, তাঁদের পঞ্চায়েতী প্রথায়, তাঁদের দলপতি নির্বাচনে, সামাজিক দণ্ডবিধানে, নানা আচারানুষ্ঠানে, ভূমি ও শিকার স্থানের বিলি বন্দোবস্তে, উত্তরাধিকার-শাসনে এখনও সেই সামাজিক শাসনযন্ত্র ও পদ্ধতির পরিচয় পাওয়া যায়। বাংলার বাইরে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশেও এই ধরনের বিচিত্র সমাজ শাসন-যন্ত্র ও পদ্ধতি আজও দেখতে পাওয়া যায়, যদিও উন্নত অর্থনৈতিক সমাজ-পদ্ধতির ক্রমবর্ধমান চাপে আজ তা দ্রুত বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।
গোষ্ঠীবদ্ধ সমাজ ব্যবস্থা প্রচলন থাকাকালেই বাংলার কিছু কিছু অঞ্চল বাংলার বহির্ভূত কেন্দ্রীয় শাসনের অধিনে চলে যায়। মৌর্যদের সময়েই উত্তর বাংলা এবং পশ্চিব বাংলা তাদের শাসনাধীনে ছিল বলে কিছু কিছু প্রমাণ পাওয়া যায়। এমনকি পূর্ব বাংলাও তাদের প্রভাবাধিনে ছিল। মৌর্যদের কর্তৃক গড়ে তোলা প্রশাসনিক কাঠামো শুধু বাংলার অধিকৃত অঞ্চলে নয়, তাদের প্রভাবাধিন অঞ্চলেও সম্ভবত প্রচলিত ছিল। তারপূর্বে ঐতিহাসিক যুগের প্রথম দিকে আর্যাবর্তের আর্যদের প্রশাসনিক ব্যবস্থা আদৌও বাংলাদেশে পরিচিত ছিল কিনা এ বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ আছে। তবে চিরাচরিত নিয়ম অনুযায়ী মৌর্য শাসন ব্যবস্থাও স্থানীয় শাসন ব্যবস্থার দ্বারা পক্ষান্তরে নিশ্চয়ই প্রভাবিত হয়ে থাকবে।
গোষ্ঠীবদ্ধ জীবনে সমাজ প্রধানের কথাই ছিল সমাজের বিধান। অবশ্য পুরোহিতের ভূমিকাও অস্বীকার করা যায় না। বৈদিক ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রভাবে বাংলাদেশে বর্ণবাদ অস্তিত্বে এসে গেলে চার বর্ণ যথা- ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বশ্য ও শূদ্র বর্ণ-প্রধানদের মর্যাদা সমাজে স্বীকৃতি লাভ করে। আবার শূদ্রদের যারা সমাজে আচ্ছোদ হিসেবে পরিচিত তাদের সামাজিক মর্যাদা ও আর্থিক সঙ্গতি না থাকলেও তাদের প্রধানের ইঙ্গিতও অর্থবহ ছিল। তাদেরকেও সমাজ-শাসনে গণ্য করা হয়।
এভাবেই পাঁচ বর্ণের পাঁচজনকে নিয়ে গঠিত ও প্রচলিত হয় পঞ্চায়েত। এই পঞ্চায়েত প্রশাসনিক কাঠামো প্রাচীন বর্ণবাদী সমাজের দান।
মোটামুটিভাবে শুধু এটুকু বলা চলে, আমাদের গ্রাম্য পঞ্চায়েতী শাসনযন্ত্র বেদ ও সংহিতার বর্ণবাদের হুবহু প্রতিফলন নয়। এদেশের বর্ণবাদে শূদ্রদেরকে দাস হিসেবে যেমন শ্রেণীভূক্ত করা হয়নি তেমনি বৈশদেরও সর্বস্তরে প্রাধান্য সমাজে অস্বীকার করেনি। পঞ্চায়েত কর্তৃক নির্বাচিত দলপতিই স্থানীয় সমাজের শাসনযন্ত্রের নায়কত্ব করতেন। মাতৃপ্রধান বা পিতৃপ্রধান গোত্র ব্যবস্থানুযায়ী উত্তরাধিকার শাসন নিয়ন্ত্রিত হত এবং সামাজিক দণ্ডের ও নির্দেশের কর্তা ছিলেন পঞ্চায়েতমণ্ডলী। আলেকজান্ডারের ভারত-আক্রমণ ও অব্যবহিত পরবর্তী মৌর্যাধিকার কালের আগেই বাংলাদেশে গোষ্ঠীবদ্ধ সমাজগুলির সমন্বয়ে নিঃসন্দেহে রাজতন্ত্রে বিবর্তিত হয়ে গিয়েছিল এবং অনুমান হয়, কিছু পরেই মৌর্য রাষ্ট্র- বিন্যাসের প্রাদেশিক রূপও এদেশে প্রবর্তিত হওয়ার কথা ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলার এই রাজতন্ত্রের আদি পরিচয় মহাভারতের দুই একটি কাহিনীতে এবং সিংহলী দীপবংশ-মহাবংশ পুরাণের বিজয়সিংহের গল্পে প্রথম পাওয়া যাচ্ছে। মহাভারতে পৌন্ড্রক-বাসুদেব নামে পুণ্ড্রদের এক রাজার কথা; ভীম কর্তৃক এক পৌন্ড্র রাজার পরাজয়ের কথা; বঙ্গ, তাম্রলিপ্ত, কর্বট, সুহ্ম প্রভৃতি কৌম রাজাদের কথা; দুর্যোধনের সহায়তাকারী এক বঙ্গরাজের কথা; রামায়ণে প্রাচীন বাংলার কয়েকটি রাজবংশের কথা প্রভৃতি সমস্তই বাংলার আদি রাজতন্ত্রের পরিচয় বহন করে। দীপবংশ-মহাবংশের বঙ্গ ও রাঢ়ের সীহবাহুর কথা প্রভৃতি হতেই মনে হয় খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ-পঞ্চম শতক হতেই বোধহয় বাংলার বিভিন্ন গোষ্ঠীবদ্ধ সামাজিক ব্যবস্থা রাজতন্ত্রে বিবর্তিত হচ্ছিল; কিন্তু এই বিবর্তন যখনই হোক, তার পরও বহুদিন পর্যন্ত ঐতিহ্যে ও লোকস্মৃতিতে পূর্ব স্মৃতিই যে শুধু জাগরূক ছিল তা নয়, ইতস্তত তার কিছু কিছু অভ্যাস এবং ব্যবস্থাও প্রচলিত ছিল। সমগ্র দেশ বোধ হয় এক সঙ্গে রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা গ্রহণ করে নি।
মৌর্য ও গুপ্ত পূর্ববর্তী যুগ
সাহিত্যে পাওয়া কিছু গল্প ও পৌরাণিক কাহিনী এবং ক্লাসিক্যাল বিবরণ থেকে জানা যায় যে, তৎকালে সম্ভবত রাজতন্ত্রই বাংলায় প্রচলিত ছিল। গ্রিক ও লাতিন বিবরণে খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে বাংলায় সামরিক দিক থেকে শক্তিশালী গঙ্গারিডাই নামে গাঙ্গেয় অঞ্চলের এক শক্তিশালী জাতি বা রাষ্ট্রের অস্তিত্বের উল্লেখ পাওয়া যায়। সুশৃঙ্খল ও উন্নত সামরিক শক্তিসম্পন্ন ‘গঙ্গারিডাই’ রাজ্যের বিবরণ খুবই উন্নত রাষ্ট্র সংগঠনের ইঙ্গিতবহ। ‘গঙ্গারিডাই’ রাজ্য ছাড়াও সমসাময়িক বাংলায় আরও কতগুলি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্য ছিল বলে মনে হয়। এসকল রাজ্য কেবল তাদের স্ব স্ব এলাকায় শাসনকর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল। এদের সঙ্গে গঙ্গারিডাই রাজ্যের সম্পর্ক কেমন ছিল তা নির্ধারণ করা খুবই কঠিন।
মহাভারতে উল্লেখ আছে যে, ঐ সকল রাষ্ট্রের মধ্যে সাধারণ রাষ্ট্রীয় সচেতনতার অভাব ছিল না। কখনও কখনও অভিন্ন শত্রুকে মোকাবিলা করার জন্য ছোট ছোট রাজ্য একত্র হয়ে শক্তিশালী রাজ্যসংঘ প্রতিষ্ঠা করত। তারা বিদেশী শাসকদের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কও বজায় রাখত।
মৌর্য যুগ
বাংলাদেশে মৌর্য ও গুপ্ত যুগের শাসনকালকে স্বর্ণযুগ বলে চিহ্নিত করা হয়। অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সামাজিকও ধর্ম প্রভৃতিতে সমসাময়িক বঙ্গে ব্যাপক পরিবর্তন আসলেও মৌর্য ও গুপ্ত শাসনকালে বর্তমান বাংলাদেশ বা তৎকালীন বঙ্গ, সমতট, তাম্রলিপ্তি তাদের সরাসরি শাসনাধীনে ছিল কিনা নির্দিষ্ট করে জানা যায় না। মৌর্যবংশের পতনের পর বাংলায় প্রায় পাঁচশত বছরব্যাপী বিরাজমান স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহের রাজ্যশাসন পদ্ধতি সম্বন্ধেও কোন সঠিক বিবরণ পাওয়া যায় না। তবুও এটা ধরে নেয়া যায় যে, মৌর্যদের গড়ে তোলা প্রাদেশিক শাসনকাঠামো বাংলায় প্রচলিত ছিল।অনুমান করা যায়, যেহেতু পুণ্ড্রবর্ধন মৌর্য সাম্রাজ্যের অধীন একটি প্রদেশ ছিল এবং বঙ্গদেশ মৌর্য প্রভাবের বাইরে ছিল এমন ভাবা যায় না। কাজেই তখনকার বঙ্গদেশ বা বাংলাদেশে পুণ্ড্রবর্ধনের মতই শাসনব্যবস্থা না থাকলে মৌর্য প্রভাবের বাহিরে ছিল এমন ভাবা যায় না।
মহাস্থানে প্রাপ্ত এক প্রস্তরলিপি (খ্রিষ্টপূর্ব ৩য় শতকের) থেকে জানা যায় যে, পুণ্ড্রনগর ছিল মৌর্যযুগের ‘মহামাত্র’ নামক রাজকর্মচারীর শাসনকেন্দ্র। বাংলা মৌর্য সাম্রাজ্যের অধীন একটি প্রদেশ হিসেবে শাসিত হতো কিনা বা মৌর্য সম্রাটের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণাধীনে ছিল কিনা তার উলেখ এ প্রস্তর লিপিতে নেই। তবে এই লিপির বিষয়বস্তু একটি সুসংগঠিত ও জনকল্যাণমুখী শাসনব্যবস্থার ইঙ্গিত দেয়, যা ছিল মৌর্য-প্রশাসনের মূল বৈশিষ্ঠ্য।
খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীর শুরুতে, মৌর্যবংশের পতনের পর, রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। পরবর্তী প্রায় পাঁচশত বছরব্যাপী উত্তর ভারতে কোন শক্তিশালী সার্বভৌম শাসকের পরিচয় পাওয়া যায় না। মৌর্য-পরবর্তী যুগের শিলালিপিসমূহে বাংলাদেশে কয়েকটি রাজবংশের পরিচয় পাওয়া যায়। কিন্তু তাদের রাজ্য শাসনপ্রণালী সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। যে সকল স্থানীয় রাজবংশ বা শাসক বাংলার অন্তর্ভুক্ত এলাকায় শাসন করতেন তাদের মধ্যে প্রসিদ্ধ ছিলেন সুসুনিয়া লিপির (চর্তু শতাব্দীর শুরুতে) বর্মন এবং সমতটের খড়গবংশীয় শাসকগণ (সপ্তম শতাব্দী)। এ সময় বঙ্গ অঞ্চলের স্থানীয় শাসক ধর্মাদিত্য, গোপচন্দ্র ও সমাচারদেব এবং কর্নসুবর্ণের শাসক জয়নাগ ও ত্রিপুরার বৈন্যগুপ্তের উল্লেখ পাওয়া যায়। খ্রিষ্টীয় চর্তু শতাব্দীর শুরুতে গুপ্তশাসন প্রতিষ্ঠিত হলে এ অবস্থার পরিবর্তন ঘটে এবং সূচিত হয় শান্তি ও সমৃদ্ধির যুগ।
গুপ্ত ও গুপ্ত-পরবর্তী যুগ খ্রিষ্টীয় চতুর্থ শতাব্দীর শুরুতে প্রচলিত শাসন ব্যবস্থায় রাজা সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। তার উপাধি ছিল ‘মহারাজা’। পুষ্করণের (বাঁকুড়া জেলার পোখর্ণা) অধিপতি সিংহবর্মা ও তাঁর পুত্র চন্দ্রবর্মা ‘মহারাজা’ উপাধি গ্রহণ করেন। সমুদ্রগুপ্তের এলাহাবাদ প্রশস্তি থেকে জানা যায় যে, চন্দ্রবর্মা ছিলেন ঐ সময় আর্যাবর্তের শক্তিশালী শাসকদের অন্যতম। দামোদপুর তাম্রশাসনসমূহ (৪৪৪ খ্রি. ৪৪৮ খ্রি. ৪৮২ খ্রি. এবং ৪৭৬-৯৫ খ্রি.) থেকে জানা যায়, গুপ্ত সম্রাটগণ ‘পরমদৈবত, পরমভট্টারক-মহারাজাধিরাজ’ উপাধি গ্রহণ করতেন। বাংলার স্থানীয় শাসকদের মধ্যে ধর্মাদিত্য, গোপচন্দ্র ও সমাচারদেব (খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দী) এবং জয়নাগ (খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দী) ‘মহারাজাধিরাজ’ উপাধি ধারণ করেছিলেন। শশাঙ্কও একই উপাধি গ্রহণ করেন। কোনো কোনো বাংলাদেশের সামন্ত রাজারা ও মাহারাজা উপাধি ধারণ করেছেন। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যায় যে, গুণাইঘর তাম্রশাসনে (১৮৮ গুপ্তাব্দ) বর্ণিত আছে যে, মহারাজ বৈন্যগুপ্তের অধীনে মহারাজা রুদ্রদত্ত ও মহারাজা-মহাসামন্ত বিজয়সেন নামে দুজন সামন্ত রাজা ছিলেন যারা অনুরূপ উপাধি গ্রহণ করেন। কিছুসংখ্যক সামন্ত শাসকদের ‘মহাসামন্ত’ ও ‘মহারাজা’ উপাধি গ্রহণ থেকে স্পষ্টতই বোঝা যায় যে, রাজ্যের অংশবিশেষ তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। গুণাইঘর তাম্রশাসন থেকে আরও প্রমাণিত হয় যে, বিজয়সেন নামক সামন্ত রাজা ‘দূতক’, ‘মহাপ্রতীহার’, ‘মহাপিলুপতি’, ‘পঞ্চধিরপরিক’, ‘পট্যুপরিক’ ও ‘পুরপালোপরিক’ উপাধি গ্রহণ করেন। একজন সামন্ত রাজা কর্তৃক উপরিউক্ত উপাধিসমূহ ধারণ নিঃসন্দেহে রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে তার গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানের কথা প্রমাণ করে। উদাহরণ হিসেবে মল্লসারুল তাম্রশাসনে উল্লিখিত মহারাজ বিজয়সেন কর্তৃক নিজস্ব সিলমোহর ব্যবহার এবং রাজকর্মচারীদের প্রতি প্রশাসনিক আদেশ জারি করার ব্যাপারটি উল্লেখ করা যেতে পারে। বাংলাদেশে গুপ্ত সম্রাটগণ কর্তৃক শাসিত অংশ কতগুলি প্রশাসনিক ভাগে বিভক্ত ছিল, যেমন ‘ভুক্তি’, ‘বিষয়’, ‘মণ্ডল’,‘বীথি’ ও ‘গ্রাম’। এ সকল প্রশাসনিক ভাগের প্রত্যেকটির একটি করে প্রধান কেন্দ্র বা ‘অধিকরণ’ (অধিষ্ঠান) ছিল।
‘ভুক্তি’
(আধুনিক বিভাগ-এর অনুরূপ) ছিল সর্ববৃহৎ প্রশাসনিক বিভাগ এবং সম্রাটের একজন প্রতিনিধি তা শাসন করতেন। সমসাময়িক লিপিমালায় পুণ্ড্রবর্ধন (সমগ্র উত্তরবঙ্গ) ও বর্ধমান (প্রাচীন রাঢ়ের দক্ষিণাংশ) নামে দুটি ভুক্তির নাম জানা যায়। গুপ্তযুগের শিলালিপিতে নামবিহীন এক ভুক্তিরও উল্লেখ আছে। এর সদর দফতর ছিল নব্যবকাশিকা এবং সুবর্ণবীথি এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। সম্রাট কর্তৃক সরাসরি নিয়োগকৃত একজন শাসনকর্তা ভুক্তির শাসনকার্য পরিচালনা করতেন। গুপ্ত সম্রাটদের দামোদরপুর তাম্রশাসনে পুণ্ড্রবর্ধনভুক্তির শাসনকর্তাকে সম্রাটের সঙ্গে সম্পর্ক নির্দেশ করে ‘তৎপাদপরিগৃহীত’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথম কুমারগুপ্তের সময় ভুক্তির প্রশাসককে ‘উপরিক’ এবং বুধগুপ্তের সময় ‘মহারাজ উপরিক’বলা হতো। দামোদপুর তাম্রশাসনে (৫৪৩ খ্রি.) উলিখিত পুণ্ড্রবর্ধনভুক্তির শাসনকর্তার ‘উপরিক মহারাজ মহারাজপুত্র- দেব-ভট্টারক’ উপাধি থেকে মনে হয় যে, কোনো কোনো সময় রাজকুমার বা রাজপরিবারের সদস্যদের পুণ্ড্রবর্ধনভুক্তির প্রশাসক নিয়োগ করা হতো। ১৫৯ গুপ্তাব্দের (৪৭৯ খ্রি.) পাহাড়পুর তাম্রশাসন থেকে জানা যায় যে, পুণ্ড্রবর্ধন শহরে পুণ্ড্রবর্ধনভুক্তির ‘অধিকরণ’ (সদর দফতর) অবস্থিত ছিল। ভুক্তির শাসনকর্তা তার কার্যাবলির জন্য সরাসরি সম্রাটের কাছে দায়ী থাকতেন। ‘ভুক্তি’র অধীনস্থ পরবর্তী প্রশাসনিক বিভাগের নাম ‘বিষয়’। ‘বিষয়’ দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রশাসনিক ইউনিট এবং শাসনক্ষেত্রে এর ভূমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়গুলি ছিল আধুনিক জেলার অনুরূপ। বিষয়ের শাসনকর্তাকে প্র ম গুপ্তযুগে বলা হতো ‘কুমারমাত্য’ এবং পরবর্তী গুপ্তযুগে ‘আযুক্তক’। উত্তরবঙ্গে পরবর্তী গুপ্তদের শাসনকালে বিষয়ের শাসনকর্তাকে‘বিষয়পতি’ বলা হতো। সাধারণত ‘ভুক্তি’র শাসনকর্তাই তার অধীন বিষয় এর প্রশাসক নিয়োগ করতেন। কোনো কোনো সময় সম্রাট নিজেই এক বা একাধিক বিষয়ে প্রশাসক নিয়োগ করতেন। বৈগ্রাম তাম্রশাসনে জেলার শাসনকর্তা সরাসরি ভট্টারকের কাছে দায়ী ছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে দক্ষিণ ও পূর্ববঙ্গে স্বাধীন রাজাদের শাসনামলে ‘ভুক্তি’র শাসনকর্তা সাধারণত বিষয়পতিকে নিয়োগ দান করতেন।
সমসাময়িক কালের শিলালিপি থেকে মাত্র কয়েকটি ‘বিষয়’-এর নাম জানা যায় যেমন পুণ্ড্রবর্ধন ভুক্তির অধীন কেটিবর্ষ, খাদাপাড়া, পঞ্চনগরী, নব্য বকাশিকা ভুক্তির অধীন বরাকমন্ডল, এক কর্ণসুবর্ণের অধীন ঔদম্বরিক প্রভৃতি। দামোদপুর তাম্রশাসনসমূহ (নং ১, ২, ৪ ও ৫) থেকে পুণ্ড্রবর্ধনভুক্তির অধীন কোটিবর্ষ বিষয়ের নাম পাওয়া যায়। প্রথম কুমারগুপ্তের ধনাইদহ তাম্রশাসনে (৪৩২-৩৩ খ্রিষ্টাব্দ) ঐ একই ভুক্তির অধীন খাটাপাড়া বা খাদাপাড়া নামে বিষয়ের উলেখ আছে। বৈগ্রাম তাম্রশাসনে একটি ‘বিষয়’-এর উল্লেখ পাওয়া যায় যার সদর দফতর ছিল পঞ্চনগরী। এটাই স্বাভাবিক যে, এই বিষয়েরও নাম ছিল পঞ্চনগরী। এ ‘বিষয়’টি পুণ্ড্রবর্ধনভুক্তির অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে প্রতীয়মান হয়। ধর্মাদিত্য ও গোপচন্দ্রের ফরিদপুর তাম্রশাসনে নব্যবকাশিকার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণাধীন বরাকমন্ডল নামে একটি বিষয়ের উল্লেখ পাওয়া যায়।
এছাড়াও কর্ণসুবর্ণ এর রাজা জয়নাগের বপ্পাঘোষবাট তাম্রলিপিতে ঔদম্বরিক-বিষয়ের নাম পাওয়া যায়। দামোদপুর তাম্রশাসনের (নং ১-৫) বিবরণ থেকে এটা প্রায় স্পষ্ট যে, জেলা প্রশাসকের সদর দফতরে (অধিষ্ঠান- অধিকরণম) তার শাসনকেন্দ্র (অধিকরণ) ও তার অধীন কর্মচারীরা ছিল। এসকল কর্মচারীর মধ্যে দলিল-রক্ষক (পুস্তপাল) ভূমি দান-বিক্রয় সংক্রান্ত কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন। শিলালিপিই হচ্ছে ভূমি দান বা বিক্রয় সংক্রান্ত তথ্যের এবং একাজে অধিকরণের ভূমিকা সম্পর্কে জানার একমাত্র উৎস। দামোদপুর তাম্রশাসনে (২, ৪ ও ৫নং) কোটিবর্ষ-বিষয়ের বিষয়পতির সহায়করূপে এক উপদেষ্টামণ্ডলীর কথা উল্লেখ আছে। সেকালের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণীর প্রতিনিধিত্বকারী চারজন সদস্য ও স্বয়ং বিষয়পতি সমন্বয়ে এ উপদেষ্টামণ্ডলী গঠিত হতো। এ উপদেষ্টা-সভার সদস্যরা ছিলেন ‘নগরশ্রেষ্ঠী’,‘প্রথম-সার্থবাহ’, ‘প্রথম-কুলিক’ এবং ‘প্রথম-কায়স্থ’।‘নগরশ্রেষ্ঠী’ ছিলেন শহরের বিভিন্ন গিল্ড বা কর্পোরেশনের অথবা ধনী ব্যাঙ্কারদের সংস্থার সভাপতি। ‘প্রথম-সার্থবাহ’ ছিলেন বর্ণিত সম্প্রদায় বা বিভিন্ন ব্যবসায়িক গিল্ডের প্রতিনিধিত্বকারী প্রধান ব্যবসায়ী। ‘প্রথম-কুলিক’ ছিলেন বিভিন্ন কারিগর শ্রেণীর প্রতিনিধিত্বকারী প্রধান কারিগর এবং ‘প্রথম কায়স্থ’ ছিলেন কায়স্থ শ্রেণীর প্রতিনিধিত্বকারী প্রধান করণিক। করণিকরা ছিলেন একশ্রেণীর লেখক, যাঁরা কায়স্থ, করণ, করণিক, অধিকৃত, পুস্তপাল, চিত্রগুপ্ত, লেখক, দিবির, ধর্মলেখিন, লক্ষরচনা, অক্ষপটালিক, অক্ষপটলাধিকৃত নামে পরিচিত তারাই নথি রক্ষণাবেক্ষণ করত। অখৌরী উপাধি অক্ষর থেকে এসেছে। এই উপাধিটি এখনও বিহার ও উত্তরপ্রদেশের কায়স্থদের মধ্যে চালু আছে। করণ এবং করণিক উপাধি বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা এবং পশ্চিম ভারতে দেখা যায়।৮২৯
বৈদিককালের ষোলো ধরনের ব্রাহ্মণ থেকে শুধুমাত্র একটি পুরোহিত শ্রেণী গঠন করা হয়েছে। প্রায় বারো ধরনের লেখক এবং নথিরক্ষক থেকে একটি কায়স্থ শ্রেণী গঠিত হয়েছে। ক্রমে ক্রমে সমস্ত নথিরক্ষকরা কায়স্থ হিসেবে পরিচিত হয়েছে। প্রথমদিকে উচ্চবর্ণের স্বাক্ষর ব্যক্তিরা রাজস্ব ও প্রশাসনিক প্রয়োজনে কায়স্থ বা লিপিকর হিসেবে নিযুক্ত হতো। কলহন লিখেছেন, ব্রাহ্মণ শিবরথ একজন কায়স্থ৮৩০ কর্মচারী হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন। পিতৃপুরুষ ব্রাহ্মণ হওয়া সত্ত্বেও লোকনাথ ছিলেন একজন করণ।৮৩১ ক্রমশ লিপিকররা বিভিন্ন বর্ণ থেকে নিযুক্ত হতে লাগল এবং তাদের নতুন সম্প্রদায়ের মধ্যেই সামাজিক মেলামেশা আবদ্ধ ছিল। তারা নিজ বর্ণের সঙ্গে বিবাহ এবং অন্যান্য সামাজিক সংযোগ ত্যাগ করত। তারা সমশ্রেণীর মধ্যে ভিন্ন গোষ্ঠীকে বিয়ে করত। বর্ণ ব্যবস্থায় কায়স্থদের স্থান কোথায় এ বিষয়ে ব্রাহ্মণ আইন প্রণেতারা দ্বিধায় পড়ে কায়স্থদের শূদ্র এবং দ্বিজদের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। যেহেতু ধর্মশাস্ত গ্রন্থে কায়স্থদের উৎপত্তির স্পষ্ট কোনো নিদর্শন নেই এবং ঐতিহাসিক উদাহরণ একটি বর্ণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বর্তমানকালে কোলকাতা হাইকোর্ট তাদের শূদ্র এবং এলাহাবাদ হাইকোর্ট ব্রাহ্মণ বলে রায় দিয়েছে। পেশাগত জাতি হিসেবে কায়স্থদের উত্থান হওয়ায় স্বাভাবিক কারণেই ব্রাহ্মণদের লেখক ও নথিরক্ষকের একচেটিয়া কাজে ব্যাঘাত ঘটায়। মধ্যপ্রদেশ, কর্ণাটক এবং উড়িষ্যায় চন্দেল ও কলচুরি রাজাদের অধীনে কায়স্থ মন্ত্রীরা কাজ করত।
একাদশ শতাব্দীতে কলিঙ্গের গঙ্গ-প্রশাসনে কায়স্থরা উচ্চপদ অর্জন করেছে। তাদের বলা হতো রাজবিদ্যাধর (রাজনীতিতে অভিজ্ঞ) এবং গঙ্গবিদ্যাধর (গঙ্গপরিবার বিষয়ে প্রাজ্ঞ)।৮৩২ তারা প্রশাসনে উচ্চ স্থান অধিকার করে এবং প্রশাসনিক কাজকর্ম চালানোর জন্য ‘ভূমিদান’ ভোগ করে। স্বভাবতই ব্রাহ্মণরা বিক্ষুব্ধ হতো তাদের উপর যারা এই ধরনের উচ্চ কর্মশালায় নিযুক্ত থাকত। তারা কায়স্থদের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়েছিল কারণ ইতিপূর্বে ব্রাহ্মণরাই ভূীমদানের নথি রক্ষণাবেক্ষণ করত। লিপিকর এবং নথি রক্ষক কায়স্থরা ব্রাহ্মণদের সবসময় সমস্যায় ফেলত। এই ব্রাহ্মণরাই ভূমিস্বত্বভোগী শ্রেণী গঠন করেছিল। ফলে ব্রাহ্মণদের পুঁথিতে কায়স্থদের প্রতি আনুকুল্য দেখানো হয়নি। চতুর্দশ শতাব্দীর যাজ্ঞবল্ক্যের পুঁথিতে কায়স্থদের উল্লেখ আছে।৮৩৩ কায়স্থদের প্রজা-পীড়ক হিসেবে দেখানো হয়েছে। দ্বাদশ শতাব্দীতে কায়স্থদের ভর্ৎসনা করার খোঁক চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছিল। কলহনের রাজতরঙ্গিণীতে তাদের দোষারোপ করা হয়েছে৮৩৪ এবং ওই সময়ের কতকগুলি পুঁথিতে কিছু সংস্কারসহ ওইগুলি পুনরুক্ত হয়েছে।
আমরা যদি ৯২০ খ্রিষ্টাব্দে হরিষেণাচার্যের লেখা বৃহৎকথাকোষ-কে প্রমাণ হিসেবে গ্রাহ্য মনে করি, তাহলে দেখব একটি গ্রামের মহত্তর ১০০০ কলসি ঘি শাসককে দিয়ে গ্রামসংলগ্ন পশুচারণ ক্ষেত্র অধিকার করে নিয়েছে।৮৩৫
একাদশ শতাব্দী থেকে তারা প্রথাগত, ও আইনগত দিক দিয়ে শূদ্র হিসেবে পরিগণিত হলো। বাংলায় শূদ্ররা হচ্ছে দেশীয় অধিবাসী, কিন্তু ব্রাহ্মণরা নয়। প্রশান্তচন্দ্র মহলানবীশের মতে বাংলার নানা ধরনের শূদ্রজাতি একই গোত্রের এবং বিহারে তাদের প্রতিবেশীদের সঙ্গে সাদৃশ্য দেখা যায়। বাংলার ব্রাহ্মণদের সঙ্গে উত্তর ভারতের ব্রাহ্মণদের সাদৃশ্যও লক্ষণীয়।৮৩৬ এই সমস্ত অঞ্চলে স্থানীয় আদিবাসী প্রধানরা ক্ষত্রিয় হিসেবে স্বীকৃত হয়েছে। আদিবাসীয় জ্ঞাতিবর্গের বিপুল সংখ্যাধিক্য শূদ্রদের অবস্থাকে কিছুটা খাটো করেছিল। মধ্যবিত্ত জাতির অনুপস্থিতির ফলে ভারতের অন্যান্য অঞ্চল অপেক্ষা বাংলা ও দক্ষিণ ভারতের অনেক বেশি সামাজিক মেরু-করণ হয়েছিল। এর ফলেই হয়ত এই অঞ্চলে কৃষকদের প্রতিবাদ ও বিপ্লবী আন্দোলন সংগঠিত হয়েছিল।
৮২৯ রামশরণ শর্মা: আদি মধ্যযুগের ভারতীয় সমাজ, পৃ. ১৫২।
৮৩০ History of Dharmashastra, Vol- II, PV Kane, 1968, p.- 77.
৮৩১. Epigrpahia Indica, Calcutta & Delhi, XV, No. 19.
৮৩২. N. Mukund Rao, Kalinga Under The Eastern Gongas, p. 165.
৮৩৩ যাজ্ঞবল্ক্য, ১.৩২২।
৮৩৪. Rajtarangini of Kalahan IV. p. 620 ff; VIII. p. 560 ff.
৮৩৫ উদ্ধৃত B. N. Sharma, Social Life in Northern India, p. 311.
৮৩৬. R.C. Majumdar: The History of Bengal, 1, Dhaka, Dhaka University 1943, ra. 558-59.
—————————————————————————————————
আগামী পর্বেঃ প্রশাসন

শেয়ার করুন