বুধবার, মার্চ ২৩, ২০১৬

আদি বাংলার ইতিহাস (প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্ব ১০৫

আদি বাংলার ইতিহাস
(প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্ব ১০৫
পুরোহিত ও পণ্ডিত
দেশে প্রচলিত বৌদ্ধ ও বৈদিক ধর্মাবলম্বীদের পূজাপার্বণ, মন্দিরের সেবাইত, ধর্মীয় বিধি-বিধান ব্যাখ্যা ও জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার জন্য ছিল বৈদিক ব্রাহ্মণ ও বৌদ্ধদের ভিক্ষু। বেদ সঙ্কলিত হওয়ার পূর্বেও ব্রাহ্মণ ছিল বৌদ্ধের ধর্মীয় প্রচারের আগে ভিক্ষু ছিল না।
ব্রাহ্মণরা বর্ণ হিসেবে যেমন, শ্রেণী হিসেবেও তেমনই পৃক শ্রেণী; এবং এই শ্রেণীর উল্লেখ তো পরিষ্কার। দান-ধ্যানক্রিয়াকর্ম যাকিছু করা হচ্ছে, এদের সম্মাননা করার পর। ভূমিদান এরাই লাভ করছেন, এদের মধ্যে কেউ কেউ রাজপাদোপজীবী শ্রেণীতে উল্লিখিত হয়েছেন; মন্ত্রী, এমন-কি, সেনাপতি, সামন্ত, মহাসামন্ত, আবস্থিক, ধর্মাধ্যক্ষ ইত্যাদিও হয়েছেন সন্দেহ নেই, কিন্তু তাঁরা সাধারণ নিয়মের ব্যতিক্রম। সাধারণ নিয়মে এরা পুরোহিত, ঋত্বিক, ধর্মজ্ঞ, নীতিপাঠক, শান্ত্যাগারিক, শান্তিবারিক, রাজপণ্ডিত, স্মৃতি ও ব্যবহারশাস্ত্রাদির লেখক, প্রশস্তিকার, কাব্য, সাহিত্য ইত্যাদির রচয়িতা। এদের উল্লেখ পাল ও সেন আমলের লিপিগুলিতে, সমসাময়িক সাহিত্যে বারংবার পাওয়া যায়। সেন আমলে ব্রাহ্মণ্য ধর্ম পুনরুত্থানের সঙ্গে সঙ্গে ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতিরও বিস্তৃতি ঘটে। পুরাণ ভিত্তিক বর্ণবাদ ও শ্রেণী বিন্যাস মনুসংহিতাকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠে। ব্রাহ্মণ বুদ্ধিজীবীরাই এর সংগঠক ও প্রতিষ্ঠাতা। কারণেই শ্রেণী হিসেবে ব্রাহ্মনের প্রাধান্য ও শ্রেষ্ঠত্ব অপ্রতিহতই থাকে। এ সময়ে রাষ্ট্রে সর্বোচ্চ পদ তারাই অধিকার করে থাকল। ৮২৪ একদিকে ব্রাহ্মণ হিসেবে ধর্মীয় প্রশিক্ষক ও রক্ষক এবং অন্যদিকে রাষ্ট্রের উচ্চ পদাধিকারী হিসেবে রাজা অমাত্য ও সামন্তে দ্বৈত ভূমিকায় প্রাচীনযুগের মতই ব্রাহ্মণদেরকে আবার দেখা পাওয়া যায়। বৌদ্ধধর্মের প্রতিভূ ছিলেন বৌদ্ধ ভিক্ষুরা, কিন্তু তারা শুধু রাজমহল থেকে দূরে ছিলেন না, সংসার থেকেও দূরে ছিলেন। তাদের দ্বৈত ভূমিকা ছিল না। বৌদ্ধ ধর্মের সেবাইত হিসেবেই তাদের একমাত্র পরিচয় ছিল, অবশ্য ধর্ম ও জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিক্ষা-দীক্ষা এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই ব্রাহ্মণ-শাসিত ব্রাহ্মণ্যধর্ম ছাড়া পাল আমলের শেষ পর্যন্ত বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের প্রাধান্যও কম ছিল না। ব্রাহ্মণরা যেমন শ্রেণী-হিসেবে সমাজের ধর্ম, শিক্ষা, নীতি ও ব্যবহারের ধারক ও নিয়ামক ছিলেন, বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মসংঘগুলিও ঠিক তেমনিই সমাজের কতকাংশের ধর্ম, শিক্ষা ও নীতির ধারক ও নিয়ামক ছিল এবং তাঁদের ভরণ-পোষণের জন্য রাজা ও অন্যান্য বিত্তমান ব্যক্তিরা ভূমি ও অর্থ দান করতেন। এই বৌদ্ধ-জৈন স্থবির ও সংঘ-সভ্যদের এবং ব্রাহ্মণদের নিয়ে প্রাচীন বাংলার বিদ্যাবুদ্ধি-জ্ঞান-ধর্মজীবী শ্রেণী।
শিল্পী-বণিক-ব্যবসায়ী শ্রেণী
অষ্টম শতক হতে আরম্ভ করে শিল্পী, বণিক-ব্যবসায়ী শ্রেণীর উল্লেখ পাওয়া যায় না। অষ্টম শতক-পূর্ববর্তী লিপিগুলি ভূমি দান-বিক্রয়ের দলিল, স্থানীয় অধিকরণ উপলক্ষ্যেই নগরশ্রেষ্ঠী, প্রথম সার্থবাহ ও প্রথম কুলিকের নাম করা হচ্ছে, কোনো কোনো লিপিতে ‘প্রধানব্যাপারিণঃ’ বা প্রধান ব্যবসায়ীদেরও উল্লেখ করা হচ্ছে, অন্যান্য শ্রেণীর ব্যক্তিদের সঙ্গে বণিক ও ব্যবসায়ীদেরও উল্লেখ করা হচ্ছে। রাষ্ট্র-ব্যাপারেও তাঁদের বেশ কতকটা আধিপত্য দেখা যাচ্ছে। কিন্তু অষ্টম শতকের পরবর্তী লিপিগুলিতে এই শ্রেণীটির কোন উলেখ পাওয়া যায়া না। যেখানে রাজসেবকদের উলেখ করা হচ্ছে, সেখানেও তো নগরশ্রেষ্ঠী বা সার্থবহ বা কুলিক ইত্যাদির উলেখ পাওয়া যায় না। অষ্টম শতকের পরে শিল্পী, বণিক ও ব্যবসায়ী নিশ্চয় ছিলেন কিন্তু তাদের পূর্বের প্রাধান্য সম্ভবত ছিল না। দৃষ্টান্তস্বরূপ উলেখ করা যেতে পারে, খালিমপুর লিপির ‘প্রত্যাপণে মানপৈঃ দোকানে দোকানে মানপদের দ্বারা ধর্মপালের যশ কীর্তনের কথা, তারনাথ কথিত শিল্পী ধীমান ও বীটপালের কথা, শিল্পী মহীধর, শিল্পী শশিদেব, শিল্পী কর্ণভদ্র, শিল্পী তথাগতসর, সূত্রধার বিষ্ণুভদ্র এবং আরও অগণিত শিল্পী যাঁরা পাল লিপিমালা ও অসংখ্য দেবদেবীর মূর্তি উৎকীর্ণ করেছিলেন তাঁদের কথা; বণিক বুদ্ধমিত্র ও বণিক লোকদত্তের কথা। মহারাজাধিরাজ মহীপালের রাজত্বের যথাক্রমে তৃতীয় ও চর্তু রাজ্যাঙ্কে বিলকিন্দক (ত্রিপুরা জেলার বিলকান্দি) গ্রামে শেষোক্ত দুই বণিক একটি নারায়ণ ও একটি গণেশমূর্তি প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। শুধু পাল আমলেই তো নয়; সেন আমলেও যথেষ্ঠসংখ্যক শিল্পী-বণিক-ব্যবসায়ী ছিল। শিল্পীদের তো গোষ্ঠীই ছিল এবং বিজয়সেনের আমলে জনৈক রাণক শিল্পীগোষ্ঠীর অধিনায়ক ছিলেন। পূর্বোক্ত ভাটেরা গ্রামের গোবিন্দকেশবের লিপিতে এক কাংস্যকার (কাঁসারী) এবং দন্তকারের (হাতির দাঁতের কাজ যাঁরা করেন) খবর পাওয়া যাচ্ছে। বল্লালচরিতে বণিক ও বিশেষভাবে সুবর্ণবণিকদের উলেখ আছে। আর বৃহদ্ধর্ম ও ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ দুটিতে তো শিল্পী, বণিক ও ব্যবসায়ী শ্রেণীর অগণিত উপবর্ণের তালিকা পাওয়া যাচ্ছে। শিল্পীদের মধ্যে উল্লেখ করা যায়, তন্তুবায়-কুবিন্দক, কর্মকার, কুম্ভকার, কংসকার,শঙ্খকার, তক্ষণ-সূত্রধার, স্বর্ণকার, চিত্রকার, অট্টালিকাকার, কোটক ইত্যাদি, বণিক-ব্যবসায়ীদের মধ্যে দেখা পাচ্ছি, তৈলিক, তৌলিক, মোদক, তাম্বুলী, গন্ধবণিক, সুবর্ণবণিক, তৈলকর, ধীবর ইত্যাদির।
অষ্টম শতকের পূর্বে শ্রেণী হিসেবে তাঁদের যে প্রাধান্য রাষ্ট্রে ও সমাজে ছিল, সেই প্রাধান্য ও আধিপত্য সপ্তম শতকের পর হতেই কমে গিয়েছিল। বণিক ও ব্যবসায়ী বৃত্তিধারী যে-সব বর্ণের তালিকা উপরোক্ত দুই সূত্রে পাওয়া গিয়েছে, এরা সকলেই ক্ষুদ্র বণিক ও ব্যবসায়ী স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যেই নিয়োজিত ছিল। পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতকের শ্রেষ্ঠী ও সার্থবাহদের মত প্রাধান্য আর নেই। মোটামুটি সপ্তম শতকের পূর্ব থেকেই প্রাচীন বাংলার সমাজ কৃষিনির্ভর হয়ে পড়তে আরম্ভ করে এবং ক্ষেত্রকর-কর্ষকরাও বিশেষ একটি শ্রেণীরূপে রাষ্ট্র ও সমাজের দাবির বোঝা বহন করে। শিল্পী, বণিক ও ব্যবসায়ী শ্রেণী এর বিপরীত। খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয়-দ্বিতীয় শতক হতেই- বিশেষভাবে শ্রেণী হিসেবে তাঁদের উল্লেখ না থাকলেও রাষ্ট্র ও সমাজে এদের প্রাধান্য ছিল, তাঁদেরই আধিপত্য ছিল অন্যান্য শ্রেণীর লোকদের অপেক্ষা বেশি। এর একমাত্র কারণ, তদানীন্তন বাঙালি সমাজ ছিল প্রধানত শিল্প-ব্যবসা-বাণিজ্য নির্ভর। এই তিন উপায়েই ধনোৎপাদনের প্রধান তিন পথ এবং সামাজিক ধন বণ্টনও অনেকাংশে নির্ভর করত এদের উপর। কৃষিও তখন ধনোৎপাদনের অন্যতম উপায় বটে, কিন্তু শিল্প-ব্যবসা-বাণিজ্যে উপার্জন ছিল প্রচুর। অষ্টম শতক হতে সমাজ অধিকতর কৃষিনির্ভর এবং উত্তরোত্তর এই নির্ভরতা বেড়েই গিয়েছে; শিল্প-ব্যবসা-বাণিজ্য সে পরিমাণেই সংকুচিত হয়েছে এবং সেজন্যই রাষ্ট্র ও সমাজে এদের প্রাধান্যও হারিয়ে যায়। ব্যক্তি হিসেবে কারো কারো মর্যাদার স্বীকৃতি পেলেও শ্রেণী হিসেবে সপ্তম শতক-পূর্ব মর্যাদা আর তাঁরা ফিরে পাননি। লক্ষণীয় যে, অনেক শিল্পী ও বণিক-ব্যবসায়ী শ্রেণীর লোক বৃহদ্ধর্ম ও ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে মধ্যম-সংকর বা অসৎশূদ্র পর্যায়ভুক্ত; যাঁরা উত্তম-সংকর বা সৎশূদ্র পর্যায়ভুক্ত তাঁদেরও মর্যাদা করণ-কায়স্থ, বৈদ্য-অম্বষ্ঠ, গোপ, নাপিত প্রভৃতির নীচে। ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণে পাওয়া যায়, শিল্পী, স্বর্ণকার, সূত্রধার ও চিত্রকার এবং কোনও কোনও বণিক সম্প্রদায়কে মধ্যম সংকর পর্যায়ে স্থান দেওয়া হয়েছে। বল্লালচরিতের সাক্ষ্য প্রামাণিক হলে স্বীকার করতে হয়, বণিক ও বিশেষভাবে সুবর্ণ বণিকদের তিনি সমাজে পতিত করে দিয়েছিলেন। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, রাষ্ট্র ও সমাজে এদের প্রাধান্য থাকলে, ধনোৎপাদন ও বণ্টন ব্যাপারে এদের আধিপত্য থাকলে এরূপ স্থান নির্দেশ বা অবনতিকরণ কিছুতেই সম্ভব হত না।৮২৫
প্রাচীনকালে শ্রেষ্ঠীরা শত্রুধ্বজোত্থান পূজা (ইন্দ্রের ধ্বজার পূজা) উৎসব করতেন; দ্বাদশ শতকেও উৎসবটি হত কিন্তু
তখন শ্রেষ্ঠীরা আর ছিলেন না।
তে শ্রেষ্ঠীনঃ ক্ক সম্প্রতি শত্রুধ্বজ যৈঃ কৃতস্তবোচ্ছায়ঃ।
ঈষাং বা মেঢ়িং বাধূনাতনাস্তাং বিধিৎসন্তি॥
হে শত্রুধ্বজ! যে শ্রেষ্ঠীরা (একদিন) তোমাকে উন্নত করে গিয়েছিলেন, সম্প্রতি সেই শ্রেষ্ঠীরা কোথায়! ইদানীংকালে
লোকেরা তোমাকে (লাঙ্গলের) ঈষ অথবা মেঢ়ি (গরু বাঁধার গোঁজ) করতে চাচ্ছে।
এই শ্লোকে তৎকালে ব্যবসা-বাণিজ্যের অবনতি এবং কৃষিনির্ভরতার ছবি একজন রাজসভাসদ দ্বারাই মূর্ত হয়ে উঠেছে। এই পংতির রচয়িতা গোবর্ধন আচার্য ছিলেন লক্ষ্মণসেনের অন্যতম সভাকবি। তার এই কবিতায় শ্রেষ্ঠীদের করুণ অবস্থার কথা জানা যায়।
কৃষক বা ক্ষেত্রকর শ্রেণী
অষ্টম শতক হতে আরম্ভ করে বাংলাদেশে যতগুলি লিপি আবিস্কৃত হয়েছে, তাদের প্রায় প্রত্যেকটিতেই ক্ষেত্রকরদের বা কৃষক-কর্ষকদের উল্লেখ আছে। অথচ অষ্টম শতকের আগে প্রায় কোনও লিপিতেই এদের উল্লেখ নেই। খিল অথবা ক্ষেত্রভূমি দান ক্রয়-বিক্রয় যখন হচ্ছে, চাষের জন্যই হচ্ছে। আর, ভূমি দান বিক্রয় যদি মহত্তর, কুটুম্ব, শিল্পী, ব্যবসায়ী, রাজপুরুষ, সাধারণ ও অসাধারণ (প্রকৃতয়ঃ এবং অক্ষুদ্র-প্রকৃতয়ঃ) লোক, ব্রাহ্মণ ইত্যাদি সকলকে বিজ্ঞাপিত করা যায়, তা হলে ভূমিব্যাপারে যাঁর স্বার্থ সকলের চেয়ে বেশি, সেই কর্ষকের উল্লেখ নেই। কিন্তু, অষ্টম শতক হতে আরম্ভ করে পরবর্তী লিপিগুলিতে তাঁদের উল্লেখ আছে। কর্ষকদের নামে উল্লেখ না থাকলেও কর্ষকশ্রেণীর অর্থাৎ যারা ভূমি কর্ষনে নিযুক্ত যেমন- কুটুম্ব, গৃহস্থ, প্রকৃতয়ঃ অর্থাৎ সাধারণ লোক, এদের মধ্যেই তাঁদের উল্লেখ আছে। ইতিমধ্যে উল্লেখ করা হয়েছে যে, শিল্প-উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য সংকেুচিত হওয়ায় ভূমির উপর চাপ ক্রমশঃই বেড়ে যাচ্ছে। সামাজিক ধনোৎপাদনের ভারকেন্দ্রটি ক্রমশ যেন ভূমির উপরই এসে পড়েছিল; পাল ও বিশেষ করে সেন-আমলের লিপিগুলি তন্ন তন্ন করে পড়লে প্রকট হয়ে উঠে। কোন্ ভূমির উৎপন্ন দ্রব্য কী, ভূমির দাম কত, বার্ষিক আয় কত, ইত্যাদি সংবাদ খুঁটিনাটিসহ সবিস্তারে যেভাবে দেওয়া হচ্ছে, তাতে সমাজের কৃষি-নির্ভরতার কথাই বেশি স্পষ্ট হচ্ছে। আর এই কৃষকরা তাদের নিকটতম সামন্ত প্রভু এবং দূরতম অধিরাজ উভয়কেই সাহায্য করার বোঝা বহন করতে হতো।৮২৬ তাছাড়া, জনসংখ্যা বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন ভূমি আবাদ, জঙ্গল কেটে গ্রাম পত্তন ও চাষের জন্য জমি বের করার উল্লেখ পাওয়া যায়। বস্তুত, তেমন প্রমাণও দু-একটি আছে; দৃষ্টান্তস্বরূপ সপ্তম শতকের লোকনাথের ত্রিপুরা-পট্টোলীর উল্লেখ করা যেতে পারে। এই ক্রমবর্ধমান কৃষিনির্ভরতার প্রতিচ্ছবি সামাজিক শ্রেণী-বিন্যাসের মধ্যে ফুটে। তাই স্বাভাবিক এবং পাল ও সেন-আমলের লিপিগুলিতে তাই হয়েছে। সপ্তম শতক পর্যন্ত লিপিগুলিতে বর্ণিত ও উল্লিখিত ব্যক্তিদের মধ্যে পৃথক ও সুনির্দিষ্টভাবে কৃষক বা ক্ষেত্রকর বলে যে কারো উল্লেখ নেই তার কারণ এই নয় যে, তখন কৃষক ছিল না, কৃষিকর্ম হত না; তার যথার্থ ঐতিহাসিক কারণ, সমাজ তখন একান্তভাবে কৃষিনির্ভর হয়ে উঠে নি এবং কৃষক বা ক্ষেত্রকর সমাজের মধ্যে থাকলেও তাঁরা তখনও একটা বিশেষ অথবা উল্লেখযোগ্য শ্রেণী হিসেবে গড়ে উঠেন নি।
প্রান্তিক চাষী ও শ্রমিক
কিন্তু লক্ষণীয় এই যে, এরা প্রায় সকলেই বৃহদ্ধর্মপুরাণের মধ্যম-সংকর এবং ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণের অসৎশূদ্র পর্যায়ভুক্ত। এদের মধ্যে শিল্পজীবী ও কৃষিজীবীও আছেন, এমন-কি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীও আছেন; শিল্পজীবী, যেমন তক্ষণ, সূত্রাধার, চিত্রকার, রাজমিস্ত্রী, কোটক ইত্যাদি; কৃষিজীবী, যেমন রজক, আভীর (বিদেশী কোম), নট, পৌন্ড্রক (পোদ?), কৌয়ালী, মাংসচ্ছেদ ইত্যাদি; ব্যবসায়ী, যেমন তৈলকার, শৌন্ডিক (শুঁড়ি), ধীবর-জালিক ইত্যাদি। নিজ নিজ বৃত্তিই এদের জীবিকা সন্দেহ নেই, কিন্তু জীবিকার জন্য এরা কমবেশি আংশিক কৃষিনির্ভরও ছিলেন, এরূপ অনুমান অত্যন্ত স্বাভাবিক। এদের বৃত্তিগুলির প্রত্যেকটিই সামাজিক কর্তব্য; সেই কর্তব্যের বিনিময়ে এরা ভূমির উপর অথবা ভূমিলব্ধ দ্রব্যাদির উপর আংশিক অধিকার ভোগ করতেন, এই অনুমানও স্বাভাবিক। এরাই অপেক্ষাকৃত আধুনিক কালের অস্থায়ী প্রজা, ভাগচাষী ইত্যাদি। উন্নত সমাজাধিকার বা উৎপাদন ও বণ্টন-কতৃত্ব যে এদের নেই তা বর্ণ-বিন্যাসের শ্রেণী হতেও জানা যায়। এদেরই অবব্যহিত উপরের এই শ্রেণীতে আছে ক্ষুদ্র ভূম্যধিকারী, ভূমিস্বত্ববান কৃষক বা ক্ষেত্রকর, শিল্পী, ব্যবসায়ী, করণ-কায়স্থ- বৈদ্যক-গোপ-যুদ্ধ-চারণ প্রভৃতি বৃত্তিধারী বিভিন্ন লোক নিয়ে একটি বৃহৎ মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের পরিচয়ও বৃহদ্ধর্মপুরাণ ও ব্রহ্মবৈবর্তপুরাণের বর্ণতালিকায় বলা আছে। এরাও উত্তম সংকর শ্রেণীর শূদ্র।ব্রক্ষবৈবর্তপুরানে বাংলার জনবসতির তালিকায় অল্প সংখ্যক বৈশ্য ছাড়া সবাইকেই শূদ্র বর্ণের অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। অবশ্য এই শূদ্র শ্রেণীকে তিন ভাগে, যথাঃ উত্তম, মধ্যম ও অন্তজ, হিসেবে আমরা দেখা পাই। অন্তজরা অবশ্য নিঃস্ব শ্রমিক শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ছিল।
নিঃশ্ব শ্রমিক ও কৃতদাস
বৌদ্ধ চর্যাগীতিতে কয়েকটি আদিবাসী গোত্র ও উপবর্ণ এবং তাঁদের বৃত্তির ইঙ্গিত আছে; সেন আমলের দু’একটি লিপিতেও আছে। সমসাময়িক বঙ্গীয় স্মৃতি ও পুরাণে এরা অন্ত্যজ বা ম্লেচ্ছ পর্যায়ভুক্ত এবং শুধু বর্ণ হিসেবেই নয়, অর্থনৈতিক শ্রেণী হিসেবেও এরা সমাজের নিমড়বতম শ্রেণীর লোক হিসেবেই চিহ্নিত এবং নির্ধারিত কাজ করতে দায়বদ্ধ।৮২৭ এরা হলো- মেদ, অন্ধ্র ও চণ্ডালদের মতো কোল, পুলিন্দ, পুক্কস, শবর, বরুড় (বাউড়ী), চর্মকার, ঘট্টজীবী, ডোলাবাহী (দুলিয়া, দুলে) ব্যাধ, হডড্ড (হাড়ি), ডোম, জোলা, বাগ্দী,৮২৮ ইত্যাদি সকলেই সমাজের শ্রমিক-সেবক, আজিকার দিনের ভাষায় দিনমজুর এবং আজিকার মতোই ভূমিহীন প্রজা। এদের অব্যবহিত উপরের শ্রেণীতেই আর-একটি শ্রেণীর আভাস ধরতে পারা যায়; এরা বিভিন্ন উপবর্ণে বিভক্ত, প্রত্যকের প্রথম পৃথক বৃত্তি ও উপজীবিকা। তাদের সঙ্গে চাষ বাস, কারিগরি ও সাধারণ শ্রমিক হিসেবে কাজে নিয়োজিত সকল অধিকার বিহীন একটি দল ছিল, তারাই কৃতদাস। তাদের কেউ কেউ ভূমিদাসও ছিল, তারা ছিল ভূমির সঙ্গে সম্পৃক্ত। ভূমি ক্রয় বিক্রয়ের সময় তারা জমির সঙ্গে হস্তান্তরিত হয়ে যেত। তাদের কথা তৎকালিন লিপি ও সাহিত্যে স্পষ্টভাবে বহুল প্রচারিত না হলেও তাদের উপস্থিতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়। অন্তজদের যেমন সম্পত্তি অর্জনে অধিকার ছিল না, তেমনি কৃতদাসদেরও ছিল না। তবে কৃতদাসদের মালিক হিসেবে কেউ না কেউ তাদের ভরণ পোষণ ও রক্ষনাবেক্ষনের দায়িত্বে ছিল কিন্তু অন্তজদের প্রতি এ দায়িত্ব কারো ছিল না। তবে মনুসংহিতা থেকে পুরান পর্যন্ত সকল বিধানেই শূদ্র ও কৃতদাসদের সম্পত্তি অর্জনের কোন অধিকার দেয়া হয়নি।
৮২৪ এস,এম রফিকুল ইসলাম- প্রাচীন বাংলার সামাজিক ইতিহাস।
৮২৫ ড: নীহাররঞ্জন রায়- বাঙালির ইতিহাস
৮২৬ রাম শরণ শর্মা- আদি মধ্যযুগের ভারতীয় সমাজ।
৮২৭ বৃহদ্ধর্ম্মপুরান- উত্তর খন্ড।
৮২৮ ব্রহ্মবৈবর্ত্তপুরাণ- ব্রহ্ম খন্ড।
আগামী পর্বেঃ প্রশাসন- প্রাগৈতিহাসিক যুগ

শেয়ার করুন