আদি বাংলার ইতিহাস
(প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্ব ১০৪
* বর্ণ ও শ্রেণী বিভাজন*
শ্রেণী
সেন আমল ছিল বৈদিক ধর্মের পরিবর্তনের আর একটি অধ্যায়। সে অধ্যায়ের লিখিত স্মৃতি ও পুরানে, সেন আমলের কিছু লিপিতে, বৌদ্ধ-চর্যাগীতিতে, জাতকের গল্পগুলিতে এবং বিশেষ করে সমসাময়িক সাহিত্যে বাংলাদেশে তৎকালে জনবসতির আর্থিক, সামাজিক ও ধর্মীয় চিত্র আমরা পাই।৮২২ এর ভিত্তিতে অর্থাৎ পেশা, সামাজিক অবস্থান ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তৎকালে মানুষের শ্রেণী বিভাজন খুব সহজ না হলেও, আমরা শ্রেণী-বিভক্তির একটি কাঠামো দাঁড় করাতে পারি। এটি পূর্ণাঙ্গ সঠিক চিত্র না হলেও, তৎকালে জনবসতির অবস্থা ও অবস্থান বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। তৎকালে দেশের জনসংখ্যাকে মোটামুটি সাত ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। আদি যুগে এ ভাগগুলি অর্থনৈতিক ভিত্তিতে হলেও পরবর্তীতে বর্ণের আলোকে চিরস্থায়ী রূপ ধারণ করে যা ইতিপূর্বে কিছুটা আলোচনা করা হয়েছে। কাজেই মানুষের পেশাভিত্তিক কর্ম এবং তার ভিত্তিতে শ্রেণী বিন্যাসই সভ্যতার আদি উপসর্গ। শ্রেণী উদ্ভবের সূচনা সম্ভবত ধাতুর ব্যবহারের পর থেকে। পাথরের অস্ত্র ব্যবহারের সময়কাল পর্যন্ত খাদ্য সংগ্রাহক দল হিসেবে দলের সকল সদস্য একই শ্রেণীভুক্ত ছিল। ধাতুর ব্যবহারের পর থেকেই বাংলার মানুষের কর্মের পরিধি বেড়ে যায়। নবোপলীয় যুগের প্রথম দিকেও কর্মের এত বিভিন্ন পেশা না থাকায় শ্রেণী বিন্যাসের প্রয়োজন ছিল বলে মনে হয় না। গোত্র বা গোষ্ঠীবদ্ধ জীবন ধারণের একমাত্র প্রয়োজন শুধু খাদ্য সংগ্রহ করা, তখন শ্রেণী বিন্যাসের প্রয়োজন থাকার কথা নয়। কিন্তু নবোপলীয় যুগের শেষ দিকে পরিবার গঠনের সময়কাল থেকে নতুন নতুন কাজের উদ্ভব হতে থাকে- কৃষি, পশুপালন, গৃহ নির্মাণ, হাতিয়ার তৈরি, মৃৎপাত্র নির্মাণ, চাকা তৈরি, প্রসাধন ও অলঙ্কার তৈরি, বস্ত্র তৈরি। কর্মে বিভিন্নতা অনুসারে গড়ে উঠে বিভিন্ন পেশা। তাছাড়া কৃষি ও পশু পালনের ফলে উদ্বৃত্ত খাদ্য গড়ে উঠে একদল লোকের হাতে। আবার কেউ কেউ থেকে যায় নিঃস্ব। প্রাথমিক স্তরে এভাবেই গড়ে উঠে আর্থিক শ্রেণী বিভাগ এবং সামাজিক স্তর বিন্যাস। এ সম্বন্ধে অন্যত্র কিছুটা আলোচনা হয়েছে।
শ্রমের প্রয়োজনে পরাজিত শত্রুকে কেউ কেউ আশ্রিত রেখে দাস শ্রমিক হিসাবে কাজে খাটাবার পদ্ধতি সমাজে স্বীকৃতি পায়। ঐতিহাসিক যুগের প্রারম্ভে সমাজে আমরা প্রধানতঃ চার শ্রেণী দেখতে পাই- গোত্র প্রধান, তার সহায়তাকারী ধর্মীয় যাজক এবং লাঠিয়াল বাহিনী, দ্বিতীয় স্তরে উদ্বৃত খাদ্যের মালিক বিত্তবানরা, তৃতীয়তঃ প্রান্তিক চাষী ও শ্রমিক এবং চতুর্থ: দাস শ্রমিক। এই সামাজিক শ্রেণী বিন্যাসের সমন্বয়ে গড়ে উঠে বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষ যাদের মধ্যেও ছিল বিত্তবান মালিক ও দরিদ্র শ্রমিক। এই বিত্তবান মালিকদের থেকেই পরবর্তীকালে আমরা সাক্ষাত পাই প্রাথমিক যুগের শিল্পপতি, বণিক, ব্যবসায়ী, দোকানদার, প্রভৃতি বিত্তশালী শ্রেণীর, আবার তেমনি প্রান্তিক চাষী, কৃষি ও শিল্প শ্রমিক এবং দাস-শ্রমিক। লৌহ যুগের আগেই ছিল বাঁশ-বেত, কাঠ-পাথর, ব্রোঞ্জ-তামা-পিতলের শিল্পে নিয়োজিত বিন্যস্ত শ্রমিক। লৌহ আবিষ্কারের পর থেকে কামার- কুমার সহ বহুমুখী শিল্প উৎপাদন বেড়ে যায়। বিশেষ করে কৃষির যন্ত্রপাতি তৈরি করার কারখানা একটি বিশেষ শিল্পখাত তৈরি করে। এসব শিল্প, চাকা ও চাকার গাড়ি, ঘরবাড়ি তৈরি, যুদ্ধের অস্ত্রশস্ত্র, কাঠের বহুমুখী ব্যবহার, নৌ-শিল্প ও লৌহ গলাবার কারখানা শিল্পখাতে নূতন মাত্রা যোগ করে। বিভিন্ন কাজের ক্ষেত্রে পেশাভিত্তিক দক্ষ কারিগর গড়ে উঠে। এতে উৎপাদন বেড়ে যাওয়ার উদ্বৃত্ত উৎপাদনের বিনিময় ব্যবসা-বাণিজ্যও বেড়ে যায়। শিল্পপতি ও বণিকশ্রেণী সমাজে বিত্তবান শ্রেণী হিসাবে ক্ষমতাশালী হয়ে উঠে। সমাজে বুদ্ধিজীবী ও ধর্মীয় কাজের পুরোহিত হিসাবে ব্রাহ্মণ সমাজে প্রাধান্য লাভ করে।
তারপরেই সমাজে শক্তিমত্তার প্রতীক হিসেবে ক্ষত্রিয়রা সমাজের অভিজাত রাষ্ট্র পরিচালক হিসাবে স্বীকৃতি পায় এবং বিত্তশালী-ধনবানরা বৈশ্যশ্রেণীর অন্তর্ভূক্ত হয়। খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতক থেকে খ্রিষ্ট পূর্ব দ্বিতীয় শতক পর্যন্ত বাংলাদেশ সভ্যতার একটি প্রান্তিককাল অতিক্রম করতেছিল। মগধ শক্তি কর্তৃক শাসিত অঞ্চলগুলির বাইরে বাংলার বৃহৎ জনপদগুলি কোনো কোনোটি জনগোষ্ঠী শাসন তান্ত্রিক অবস্থা অতিক্রম করে রাজতন্ত্রের দিকে এগিয়ে যাওয়ার কথা আমরা জানতে পারি। বিভিনড়ব পেশাজীবী জনগোষ্ঠী শ্রেণী বিন্যস্ত হতে আরম্ভ করেছে। অর্থনৈতিক বুনিয়াদের উপর ভিত্তি করে বিত্তশালীরা নিজদের প্রাধান্য বিস্তার ও সামাজিক মর্যাদা অর্জনের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। একটি সামন্ততান্ত্রিক সমাজের রূপ পরিগ্রহণের তখন ঊষালগড়ব। খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীর পূর্ব পর্যন্ত শুধু বাংলায় নয়, সমস্ত উপমহাদেশে ধর্মীয় ভিত্তিতে কোন বর্ণবাদ থাকার কথা জানা যায়না। একদিকে বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের প্রভাব অন্যদিকে বৈদিক ধর্মের প্রসারে জনজীবনে ধর্মীয় রীতিনীতির ভিত্তিতে সমাজে শ্রেণী বিন্যাস ছিল এবং আর্থিক উপায় উন্নতির স্তর এই শ্রেণী বিভাজনকে সহজতর করে দিয়ে ছিল। আর্থিক বুনিয়াদ ও পেশার ভিত্তিতে মৌর্যযুগে আমরা নিন্মে বর্ণিত শ্রেণীগুলিকে সমাজে উপস্থিত দেখতে পাই।
মনুসংহিতার বর্ণবাদ তখন সমাজ জীবনের সর্বস্তরে শিকর গেড়ে বসে গেছে। ব্রাহ্মনের স্বেচ্ছাচারিতার দাপট সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে অনুভূত হচ্ছে। ক্ষত্রিয়ের সহায়তা রাষ্ট্রীয় জীবনে রূপ দেয়ার প্রকৃষ্ট প্রমাণ কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র। প্রশাসনিক কাঠামো দ্বারা শ্রেণীবিন্যাস একটি স্থায়ী ভিত্তির উপর স্থাপন করা হলো।
এই শ্রেণীগুলি হল (১) রাজপুরুষ ও অমাত্য শ্রেণী (২) রাজ পাদোপজীবী, (৩) ভূম্যধাকারী, (৪) ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি, (৫) কৃষিজীবী, (৬) প্রান্তিক চাষী ও শ্রমিক এবং (৭) নিঃশ্ব শ্রমিক ও কৃতদাস।
রাজ পুরুষ অমাত্য শ্রেণী
বর্ণ ও শ্রেণীর মধ্যে অল্পই পার্থক্য ছিল। উচ্চবর্ণের লোকেরাই ছিলেন উচ্চ শ্রেণীতে। ব্রাহ্মণ ব্যতীত ক্ষমতায় আসিন সবাই ক্ষত্রিয়। এমন কি অতি নিন্ম বর্ণের হয়েও যারা ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন তারাও ক্ষত্রিয় হিসেবে গণ্য হতেন। এই শ্রেণীর আরম্ভ রাজা, মহারাজা বা রাজাধীরাজ থেকে সামন্ত, মহাসামন্ত, মান্ডলিক, মহামাগুলিক ভুক্তিপতি, বিষয়পতি,
মণ্ডলপতি, অমাত্য, সান্ধিবিগ্রহিক, মন্ত্রী, মহামন্ত্রী, ধর্মাধ্যক্ষ, দণ্ডনায়ক, মহাদণ্ডনায়ক, তৌঃসাধসাধনিক, দূত, দূতক, পুরোহিত, শান্ত্যাগারিক, রাজপণ্ডিত, কুমারমাত্য, মহাপ্রতীহার, রাজমাত্য, রাজস্থানীয় ইত্যাদি রাজ অমাত্য শ্রেণীর। রাষ্ট্র পরিচালনার এরাই উর্ধ্বতম শ্রেণী এবং এদের অর্থনৈতিক স্বার্থ, অর্থাৎ শ্রেণীস্বার্থ একদিকে যেমন রাষ্ট্রের সঙ্গে জড়িত, তেমনই অন্যদিকে ক্ষুদ্র বৃহৎ ভূস্বামীদের সঙ্গে।
এই ভূমধ্যকারিক শ্রেণীতে বোধহয় অগ্রহারিক, ঔদ্রঙ্গিক, আবস্থিক, চৌরোদ্ধরণিক, বলাধ্যক্ষ, নাবাধ্যক্ষ, দাণ্ডিক, দণ্ডপাশিক, দণ্ডশক্তি, দশাপরাধিক, গ্রামপতি, জ্যেষ্ঠকায়স্থ, খণ্ডরক্ষ, খোল, কোট্টপাল, ক্ষেত্রপ, মপ্রমাতৃ, প্রান্তপাল, ষষ্ঠাধিকৃত ইত্যাদি। এদের নিন্মবর্তী শ্রেণীতে শৌল্কিক, গৌল্মিক, গ্রামপতি, হট্টপতি, লেখক, শিরোরক্ষিক, শান্তকিক, বাসাগারিক, পিলুপতি ইত্যাদি। বিভিনড়ব সময়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রে এসব রাজপুরুষদের ক্ষমতা ও মর্যাদার তারতম্য হত, এটি সহজেই অনুমেয়।
রাজপাদোপজীবী শ্রেণী
রাজপাদোপজীবীদের বিন্যস্ত অবস্থান মৌর্যযুগে উন্মেষ ঘটলেও বাংলাদেশে গুপ্তযুগ থেকে সুদৃঢ় হয়। খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতক থেকে এদেশে রাষ্ট্রশক্তি উন্মেষের ধারনা করা হয়। তার পূর্বে রাজপাদোপজীবীরা এমন বিন্যস্ত ছিল না। মৌর্যযুগ থেকেই এদেশে কোনো কোনো বিশিষ্ট রাজ প্রতিনিধি ও রাজ কর্মচারীর পদবি ও দায়িত্ব সম্বন্ধে কিছু কিছু জানা যায়। গুপ্তযুগেই প্রথম সামন্তদেরকে তাদের সামরিক ও প্রশাসনিক সহায়তার জন্য বেতনের পরিবর্তে ভূমির মালিকানা দেয়া হয়। গুপ্ত যুগের সামন্তরা রাজার অধীনে যার যার নিজস্ব এলাকায় রাজার প্রতিভূ হিসেবেই শাসনকার্য পরিচালনা করার
অধিকার পায়। সামন্ততন্ত্রের বিকাশ এযুগেই পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়।
শ্রেণী হিসেবে তাদের কেউ কেউ ক্ষত্রিয়ের মর্যাদা পায়।৮২৩ রাজপাদোপজীবীদের প্রথম বিন্যস্ত রূপ ও অবস্থান সম্ভবত গড়ে উঠেছিল গুপ্তযুগে। তাদের আমলে রাজ্য শাসন যেমন সুশৃঙ্খল ও সুবিস্তৃত ছিল প্রয়োজনীয় রাজকর্মচারী বিভিন্ন শাখা প্রশাখায় নিয়োজিত থাকা স্বাভাবিক ছিল। গুপ্তযুগে এদেশে উৎপাদন বন্টন, শিল্প-বাণিজ্য যথেষ্ট প্রসার লাভ করেছিল। এ সম্বন্ধে বাংলার আদি অর্থনৈতিক অবস্থা অধ্যায়ে কিছুটা আলোচনা করা হয়েছে। পঞ্চম হতে সপ্তম শতক পর্যন্ত লিপিগুলোতে বিভিন্ন রাজপুরুষদের উল্লেখ আছে।
মহারাজাধিরাজের অধীনে রাজা, রাজক, রাজনক-রাজন্যক, সামন্ত-মহাসামন্ত, মাণ্ডলিক-মহামাণ্ডলিক, এসব নিয়ে যে বিস্তৃত সামন্তচক্র এরাও রাজপাদোপজীবী। রাজা-রাজনক-রাজপুত্র হতে আরম্ভ করে তরিক-শৌল্কিক- গৌল্মিক প্রভৃতি নিন্মশ্রেণীর রাজকর্মচারী পর্যন্ত সকলের উল্লেখই শুধু নয়, তাঁদের সকলকে একত্রে উল্লেখ করা হয়েছে ‘রাজপাদোপজীবীন:’, এবং সুদীর্ঘ তালিকায়ও যখন সমস্ত রাজপুরুষের নাম শেষ হয় নি, তখন তার পরই বলা হয়েছে ‘অধ্যক্ষ প্রচারোক্তানিহ কীর্তিতান’, অর্থাৎ আর যাঁদের কথা এখানে কীর্তিত বা উল্লিখিত হয় নি তাঁদের নাম অর্থশাস্ত্রের অধ্যক্ষ পরিচ্ছেদে উল্লিখিত আছে। সপ্তম শতকেই সর্বপ্রথম বাংলাদেশ নিজস্ব রাষ্ট্র লাভ করল, নিজস্ব শাসনতন্ত্র গড়ে তুলল। গৌড় ও কর্ণসুবর্ণাধীপ শশাঙ্ককে আশ্রয় করেই তার সূচনা দেখা গেল; কিন্তু তা স্বল্পকালের জন্য মাত্র। কারণ, তার পরই প্রায় শতাব্দীকাল ধরে কোন কেন্দ্রীয় শাসকের অভাবে সমস্ত দেশ জুড়ে মাৎস্যন্যায়ের উৎপীড়ন। এই মাৎস্যন্যায় পর্বের পর পাল রাষ্ট্র ও পাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গেই দেশীয় শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হল। রাজপাদোপজীবীগণ সুবিন্যস্ত আঙ্গিকে প্রকাশ পেলে এবং আরো বিস্তৃত কর্মক্ষেত্রে নিয়োজিত হলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদেরকে পূর্বের ভূমিকায় দেখা গেল না।
বেতনভুক্ত রাষ্ট্রীয় সেবাদানকারী ছাড়াও এক শ্রেণীর রাজপাদোপজীবী ছিল। তারা সার্বক্ষণিক সেবদানকারী ছিল না। আহুত হলে তারা রাজকার্যে যোগদান করত। সমাজের সর্ববর্ণের লোক থেকেই এই দলে অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই সেবক শ্রেণীতে বর্ণ অনুযায়ী শ্রেণী নির্দিষ্ট ছিল না।
পাল ও সেন লিপিতে পঞ্চম একটি শ্রেণীর উল্লেখ আছে; এই শ্রেণীর লোকেরা সমাজের শ্রমিক-সেবক, অধিকাংশই ভূমিবঞ্চিত, রাষ্ট্রীয়-সামাজিক অধিকার বঞ্চিত। এই শ্রেণী তথাকথিত অন্ত্যজ ও ম্লেচ্ছচ্ছবর্ণের ও আদিবাসী গোষ্ঠীর নানা বৃত্তিধারী লোকদের নিয়ে গঠিত। লিপিগুলিতে বিশদভাবে এদের কথা বলা হয়নি, এবং যেটুকু বলা হয়েছে তাও পালপর্বের লিপিমালাতেই। অষ্টম শতকের আগে এদের উল্লেখ নেই; পালপর্বের পরেও এদের উল্লেখখ নেই। পালপর্বেও এদের সকলকে নিয়ে নিন্মতম বৃত্তি ও স্তরের নাম পর্যন্ত করে এক নিঃশ্বাসে বলে দেওযা হয়েছে, ‘মেদান্ধ্রচণ্ডালপর্যন্তান্’- একেবারে চণ্ডাল পর্যন্ত। কিন্তু পাল ও সেন-আমলের সমসাময়িক সাহিত্যে- কাব্যে, পুরাণে, স্মৃতিগ্রন্থে- এদের বর্ণ ও বৃত্তিমর্যাদা সম্বন্ধে বিস্তারিত পরিচয় পাওয়া যায়। লিপিপ্রমাণ দ্বারাও সমসাময়িক সাহিত্যের সাক্ষ্য সমর্থিত হয়। রজক ও নাপিতরাও সমাজশ্রমিক, সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা আবার কর্ষক বা ক্ষেত্রকরও বটে। জনৈক রজক সিরূপা ও নাপিত গোবিন্দের উলেখ পাচ্ছি শ্রীহট্ট জেলার ভাটেরা গ্রামে প্রাপ্ত গোবিন্দকেশবের লিপিতে। মেদ, অন্ধ্র, চণ্ডাল ছাড়া আরও দু’একটি অন্ত্যজ ও ম্লেচ্ছ পর্যায়ের অর্থাৎ নিন্মতম অর্থনৈতিক স্তরের লোকদের খবর সমসাময়িক লিপিতে পাওয়া যায়, যেমন পুলিন্দ, শবর ইত্যাদি। চর্যাপদে যে ডোম্, ডোম্বী বা ডোম্নী, শবর-শবরী, কাপালিক ইত্যাদির কথা বার বার পাওয়া যায় তাঁরাও এই শ্রেণীর। একটি পদে স্পষ্টই বলা হয়েছে, ডোম্বীর কুঁড়িয়া (কুঁড়েঘর) নগরের বাইরে; এখনও তো তাঁরা গ্রাম ও নগরের বাইরেই থাকে। বাঁশের চাংগাড়ী ও বাঁশের তাঁত তৈরি করা তখন যেমন ছিল এদের কাজ, এখনও তাই। এদের মধ্যে ব্রাহ্মণ, বৌদ্ধ এবং জৈনধর্মের সংঘগুরু এবং যতিরাও আছেন, সিদ্ধাচার্যরা আছেন এবং স্বল্পসংখ্যক করণকায়স্থ, বৈদ্য এবং উত্তম-সংকর বা সৎশূদ্র পর্যায়ের কিছু কিছু লোকও আছেন। স্মরণ রাখা প্রয়োজন, লক্ষ্মণসেনের অন্যতম সভাকবি ধোয়ী তন্তুবায় ছিলেন এবং সমসাময়িক অন্য আর একজন কবি, জনৈক পপীপ, জাতে ছিলেন কেবট্ট বা কৈবর্ত। গুপ্ত যুগ থেকে ব্রহ্মদেয় অথবা ধর্মদেয় ভূমি, দক্ষিণালব্ধ ধন ও সাময়িক পুরস্কার হল এই শ্রেণীর প্রধান আর্থিক নির্ভর।
ভূম্যধিকারী শ্রেণী
এই শ্রেণীতে সকলের উপরে ছিলেন রাণক, রাজনক, সামন্ত, মহাসামন্ত, মান্ডলিক, মহামান্ডলিক ইত্যাদি সামন্ত প্রভুরা; স্ব স্ব নির্দিষ্ট জনপদে এদের প্রভুত্ব মহারাজাধিরাজাপেক্ষা কিছু কম ছিল না। সর্বপ্রধান ভূস্বামী মহাসামন্ত-মহামাণ্ডলিকরা; তাঁদের নীচেই সামন্ত-মাণ্ডলিকরা-সামন্তসৌধের দ্বিতীয় শ্রেণী। তৃতীয় শ্রেণীতে মহামহত্তররা- বৃহৎভূস্বামীর দল;
চতুর্থ শ্রেণীতে মহত্তর ইত্যাদি, অর্থাৎ ক্ষুদ্র ভূস্বামীর দল। তার পর ধাপে ধাপে নেমে কুটুম্ব অর্থাৎ সাধারণ গৃহস্থ বা ভূমিবানপ্রজা, ভাগীপ্রজা, ভূমিবিহীন প্রজা ইত্যাদি। সামন্ত, মহাসামন্ত, মান্ডলিক, মহামান্ডলিক- এরা সকলেই সাক্ষাৎভাবে রাজপাদোপজীবী; কিন্তু আহূত হলে রাজপুরুষদের সহায়তা এরা করতেন, এমন প্রমাণ পঞ্চম শতক হতে আরম্ভ করে প্রায় সকল লিপিতেই পাওয়া যায়। সর্বনিমড়ব শ্রেণীতে স্থান হয়েছিল ক্ষুদ্রতম রাষ্ট্রসেবকদলের এবং এই দলে হূণ-মালব-খস-লাট-কর্ণাট-চোড় ইত্যাদি বেতনভুক্ত সৈন্যরা ছিলেন, ক্ষুদ্রকরণ বা কেরানিরা ছিলেন, চাটভাটেরা ছিলেন এবং ছিলেন এমন আরও অনেকে। তাদের মধ্যে সামন্ত, মহাসামন্ত, রানক, রাজনক, প্রভৃতি শ্রেণীর সামন্তরা সম্ভবত: তাদের সামরিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকারে বা পালন করার কারনে ক্ষমতাধর সামন্ত শ্রেণীতে পরিণত হয়েছিল।
মহত্তর, মহামহত্তর, কুটুম্ব, ইত্যাদিরাও বিভিন্ন শ্রেণীতে ভূম্যধিকারী ছিলেন। সম্ভবত তারাও রাজপাদোপজীবী হিসেবে বিশেষ পদমর্যাদা বা বিশেষ সেবা দেয়ার জন্য ভূমি-স্বত্ত্ব লাভ করে ভূমি-অধিকারী হয়েছিলেন। এছাড়া, আগে যারা ভূমির মালিক ছিলেন তারা হলেন প্রতিবাসী, জনপদবাসী, কুটুম্ব প্রভৃতি। তারা ছিলেন চাষী, কুটির শিল্পের মালিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। তারা ক্রয় সূত্রেও মালিক হয়ে থাকতে পারেন। মহতো শব্দ থেকেই মহত্তর শব্দের উৎপত্তি। মহতো শব্দের অর্থ প্রধান। সম্ভবত গ্রাম প্রধানকেই মহত্তর বা মহামহত্তর উপাধীতে ভূষিত করা হতো। কুটুম্ব, প্রতিবাসী, জনপদবাসী- এরা সাধারণভাবে স্বল্পভূমি-অধিকারী গৃহস্থ; কৃষি, কুঠির-শিল্প ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যবসা এদের বৃত্তি ও জীবিকা। এরা নিজেরা নিজেদের হাতে চাষের জমি আবাদ করতেন বলে মনে হয় না যদিও ভূমির মালিক তাঁরা ছিলেন। চাষের কাজ নিজে যাঁরা করতেন, তাঁর ক্ষেত্রকর, কর্ষক, কৃষক বলেই পৃ কভাবে উলিখিত হয়েছেন। অষ্টম শতকের দেবখক্ষের আস্রফপুরলিপিতে দেখা যায়, ভূমি ভোগ করছেন একজন, কিন্তু চাষ করছে অন্য লোকেরা- ‘শ্রীশর্বান্তরেণ ভুজ্যমানক: মহত্তরশিখরাদিভি: কৃষ্যমাণক:’ (এখানে মহত্তর একজন ব্যক্তির নাম)। এই ব্যবস্থা শুধু এখন নয়, প্রাচীনকালে এবং মধ্যযুগেও প্রচলিত ছিল। বস্তুত, যিনি ভূমির মালিক, তাঁর পক্ষে নিজের হাতেই সমস্ত ভূমি রাখা এবং নিজেরাই চাষ করা কিছুতেই সম্ভব ছিল না। জমি নানা শর্তে বিলি বন্দোবস্ত করতেই হত বলে ধারনা হয়। সাহিত্য-পরিষদে রক্ষিত বিশ্বরূপসেনের এক লিপিতে আছে, হলায়ুধ শর্মা নামক জনৈক আবল্লিক মহাপণ্ডিত ব্রাহ্মণ একা নিজের ভোগের জন্য নিজের গ্রামের আশেপাশে তিন-চারিটি ভিন্ন ভিন্ন গ্রামে ৩৩৬১/২ উন্মান ভূমি রাজার নিকট হতে দানস্বরূপ পেয়েছিলেন; এই ভূমির বার্ষিক আয় ছিল ৫০০ কর্পদক পুরাণ। এই ৩৩৬১/২ উন্মানের মধ্যে অধিকাংশ ছিল নালভূমি অর্থাৎ চাষের ক্ষেত্র। এটি তো সহজেই অনুমেয় যে, এই সমগ্র ভূমি হলায়ুধ শর্মার সমগ্র পরিবার পরিজনবর্গ নিয়েও নিজেদের চাষ করা সম্ভব ছিল না এবং হলায়ুধ শর্মা ক্ষেত্রকর বলে উল্লিখিতও হতে পারেন না। তাঁকে জমি চাষী প্রজাদের মধ্যে বিলি বন্দোবস্ত করে দিতেই হতো। এই চাষী প্রজারাই ছিলেন ক্ষেত্রকর।
৮২২ ড: নীহাররঞ্জন রায়: বাঙালির ইতিহাস (আদি পর্ব)
(প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্ব ১০৪
* বর্ণ ও শ্রেণী বিভাজন*
শ্রেণী
সেন আমল ছিল বৈদিক ধর্মের পরিবর্তনের আর একটি অধ্যায়। সে অধ্যায়ের লিখিত স্মৃতি ও পুরানে, সেন আমলের কিছু লিপিতে, বৌদ্ধ-চর্যাগীতিতে, জাতকের গল্পগুলিতে এবং বিশেষ করে সমসাময়িক সাহিত্যে বাংলাদেশে তৎকালে জনবসতির আর্থিক, সামাজিক ও ধর্মীয় চিত্র আমরা পাই।৮২২ এর ভিত্তিতে অর্থাৎ পেশা, সামাজিক অবস্থান ও ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তৎকালে মানুষের শ্রেণী বিভাজন খুব সহজ না হলেও, আমরা শ্রেণী-বিভক্তির একটি কাঠামো দাঁড় করাতে পারি। এটি পূর্ণাঙ্গ সঠিক চিত্র না হলেও, তৎকালে জনবসতির অবস্থা ও অবস্থান বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। তৎকালে দেশের জনসংখ্যাকে মোটামুটি সাত ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। আদি যুগে এ ভাগগুলি অর্থনৈতিক ভিত্তিতে হলেও পরবর্তীতে বর্ণের আলোকে চিরস্থায়ী রূপ ধারণ করে যা ইতিপূর্বে কিছুটা আলোচনা করা হয়েছে। কাজেই মানুষের পেশাভিত্তিক কর্ম এবং তার ভিত্তিতে শ্রেণী বিন্যাসই সভ্যতার আদি উপসর্গ। শ্রেণী উদ্ভবের সূচনা সম্ভবত ধাতুর ব্যবহারের পর থেকে। পাথরের অস্ত্র ব্যবহারের সময়কাল পর্যন্ত খাদ্য সংগ্রাহক দল হিসেবে দলের সকল সদস্য একই শ্রেণীভুক্ত ছিল। ধাতুর ব্যবহারের পর থেকেই বাংলার মানুষের কর্মের পরিধি বেড়ে যায়। নবোপলীয় যুগের প্রথম দিকেও কর্মের এত বিভিন্ন পেশা না থাকায় শ্রেণী বিন্যাসের প্রয়োজন ছিল বলে মনে হয় না। গোত্র বা গোষ্ঠীবদ্ধ জীবন ধারণের একমাত্র প্রয়োজন শুধু খাদ্য সংগ্রহ করা, তখন শ্রেণী বিন্যাসের প্রয়োজন থাকার কথা নয়। কিন্তু নবোপলীয় যুগের শেষ দিকে পরিবার গঠনের সময়কাল থেকে নতুন নতুন কাজের উদ্ভব হতে থাকে- কৃষি, পশুপালন, গৃহ নির্মাণ, হাতিয়ার তৈরি, মৃৎপাত্র নির্মাণ, চাকা তৈরি, প্রসাধন ও অলঙ্কার তৈরি, বস্ত্র তৈরি। কর্মে বিভিন্নতা অনুসারে গড়ে উঠে বিভিন্ন পেশা। তাছাড়া কৃষি ও পশু পালনের ফলে উদ্বৃত্ত খাদ্য গড়ে উঠে একদল লোকের হাতে। আবার কেউ কেউ থেকে যায় নিঃস্ব। প্রাথমিক স্তরে এভাবেই গড়ে উঠে আর্থিক শ্রেণী বিভাগ এবং সামাজিক স্তর বিন্যাস। এ সম্বন্ধে অন্যত্র কিছুটা আলোচনা হয়েছে।
শ্রমের প্রয়োজনে পরাজিত শত্রুকে কেউ কেউ আশ্রিত রেখে দাস শ্রমিক হিসাবে কাজে খাটাবার পদ্ধতি সমাজে স্বীকৃতি পায়। ঐতিহাসিক যুগের প্রারম্ভে সমাজে আমরা প্রধানতঃ চার শ্রেণী দেখতে পাই- গোত্র প্রধান, তার সহায়তাকারী ধর্মীয় যাজক এবং লাঠিয়াল বাহিনী, দ্বিতীয় স্তরে উদ্বৃত খাদ্যের মালিক বিত্তবানরা, তৃতীয়তঃ প্রান্তিক চাষী ও শ্রমিক এবং চতুর্থ: দাস শ্রমিক। এই সামাজিক শ্রেণী বিন্যাসের সমন্বয়ে গড়ে উঠে বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষ যাদের মধ্যেও ছিল বিত্তবান মালিক ও দরিদ্র শ্রমিক। এই বিত্তবান মালিকদের থেকেই পরবর্তীকালে আমরা সাক্ষাত পাই প্রাথমিক যুগের শিল্পপতি, বণিক, ব্যবসায়ী, দোকানদার, প্রভৃতি বিত্তশালী শ্রেণীর, আবার তেমনি প্রান্তিক চাষী, কৃষি ও শিল্প শ্রমিক এবং দাস-শ্রমিক। লৌহ যুগের আগেই ছিল বাঁশ-বেত, কাঠ-পাথর, ব্রোঞ্জ-তামা-পিতলের শিল্পে নিয়োজিত বিন্যস্ত শ্রমিক। লৌহ আবিষ্কারের পর থেকে কামার- কুমার সহ বহুমুখী শিল্প উৎপাদন বেড়ে যায়। বিশেষ করে কৃষির যন্ত্রপাতি তৈরি করার কারখানা একটি বিশেষ শিল্পখাত তৈরি করে। এসব শিল্প, চাকা ও চাকার গাড়ি, ঘরবাড়ি তৈরি, যুদ্ধের অস্ত্রশস্ত্র, কাঠের বহুমুখী ব্যবহার, নৌ-শিল্প ও লৌহ গলাবার কারখানা শিল্পখাতে নূতন মাত্রা যোগ করে। বিভিন্ন কাজের ক্ষেত্রে পেশাভিত্তিক দক্ষ কারিগর গড়ে উঠে। এতে উৎপাদন বেড়ে যাওয়ার উদ্বৃত্ত উৎপাদনের বিনিময় ব্যবসা-বাণিজ্যও বেড়ে যায়। শিল্পপতি ও বণিকশ্রেণী সমাজে বিত্তবান শ্রেণী হিসাবে ক্ষমতাশালী হয়ে উঠে। সমাজে বুদ্ধিজীবী ও ধর্মীয় কাজের পুরোহিত হিসাবে ব্রাহ্মণ সমাজে প্রাধান্য লাভ করে।
তারপরেই সমাজে শক্তিমত্তার প্রতীক হিসেবে ক্ষত্রিয়রা সমাজের অভিজাত রাষ্ট্র পরিচালক হিসাবে স্বীকৃতি পায় এবং বিত্তশালী-ধনবানরা বৈশ্যশ্রেণীর অন্তর্ভূক্ত হয়। খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতক থেকে খ্রিষ্ট পূর্ব দ্বিতীয় শতক পর্যন্ত বাংলাদেশ সভ্যতার একটি প্রান্তিককাল অতিক্রম করতেছিল। মগধ শক্তি কর্তৃক শাসিত অঞ্চলগুলির বাইরে বাংলার বৃহৎ জনপদগুলি কোনো কোনোটি জনগোষ্ঠী শাসন তান্ত্রিক অবস্থা অতিক্রম করে রাজতন্ত্রের দিকে এগিয়ে যাওয়ার কথা আমরা জানতে পারি। বিভিনড়ব পেশাজীবী জনগোষ্ঠী শ্রেণী বিন্যস্ত হতে আরম্ভ করেছে। অর্থনৈতিক বুনিয়াদের উপর ভিত্তি করে বিত্তশালীরা নিজদের প্রাধান্য বিস্তার ও সামাজিক মর্যাদা অর্জনের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। একটি সামন্ততান্ত্রিক সমাজের রূপ পরিগ্রহণের তখন ঊষালগড়ব। খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীর পূর্ব পর্যন্ত শুধু বাংলায় নয়, সমস্ত উপমহাদেশে ধর্মীয় ভিত্তিতে কোন বর্ণবাদ থাকার কথা জানা যায়না। একদিকে বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের প্রভাব অন্যদিকে বৈদিক ধর্মের প্রসারে জনজীবনে ধর্মীয় রীতিনীতির ভিত্তিতে সমাজে শ্রেণী বিন্যাস ছিল এবং আর্থিক উপায় উন্নতির স্তর এই শ্রেণী বিভাজনকে সহজতর করে দিয়ে ছিল। আর্থিক বুনিয়াদ ও পেশার ভিত্তিতে মৌর্যযুগে আমরা নিন্মে বর্ণিত শ্রেণীগুলিকে সমাজে উপস্থিত দেখতে পাই।
মনুসংহিতার বর্ণবাদ তখন সমাজ জীবনের সর্বস্তরে শিকর গেড়ে বসে গেছে। ব্রাহ্মনের স্বেচ্ছাচারিতার দাপট সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে অনুভূত হচ্ছে। ক্ষত্রিয়ের সহায়তা রাষ্ট্রীয় জীবনে রূপ দেয়ার প্রকৃষ্ট প্রমাণ কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র। প্রশাসনিক কাঠামো দ্বারা শ্রেণীবিন্যাস একটি স্থায়ী ভিত্তির উপর স্থাপন করা হলো।
এই শ্রেণীগুলি হল (১) রাজপুরুষ ও অমাত্য শ্রেণী (২) রাজ পাদোপজীবী, (৩) ভূম্যধাকারী, (৪) ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি, (৫) কৃষিজীবী, (৬) প্রান্তিক চাষী ও শ্রমিক এবং (৭) নিঃশ্ব শ্রমিক ও কৃতদাস।
রাজ পুরুষ অমাত্য শ্রেণী
বর্ণ ও শ্রেণীর মধ্যে অল্পই পার্থক্য ছিল। উচ্চবর্ণের লোকেরাই ছিলেন উচ্চ শ্রেণীতে। ব্রাহ্মণ ব্যতীত ক্ষমতায় আসিন সবাই ক্ষত্রিয়। এমন কি অতি নিন্ম বর্ণের হয়েও যারা ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন তারাও ক্ষত্রিয় হিসেবে গণ্য হতেন। এই শ্রেণীর আরম্ভ রাজা, মহারাজা বা রাজাধীরাজ থেকে সামন্ত, মহাসামন্ত, মান্ডলিক, মহামাগুলিক ভুক্তিপতি, বিষয়পতি,
মণ্ডলপতি, অমাত্য, সান্ধিবিগ্রহিক, মন্ত্রী, মহামন্ত্রী, ধর্মাধ্যক্ষ, দণ্ডনায়ক, মহাদণ্ডনায়ক, তৌঃসাধসাধনিক, দূত, দূতক, পুরোহিত, শান্ত্যাগারিক, রাজপণ্ডিত, কুমারমাত্য, মহাপ্রতীহার, রাজমাত্য, রাজস্থানীয় ইত্যাদি রাজ অমাত্য শ্রেণীর। রাষ্ট্র পরিচালনার এরাই উর্ধ্বতম শ্রেণী এবং এদের অর্থনৈতিক স্বার্থ, অর্থাৎ শ্রেণীস্বার্থ একদিকে যেমন রাষ্ট্রের সঙ্গে জড়িত, তেমনই অন্যদিকে ক্ষুদ্র বৃহৎ ভূস্বামীদের সঙ্গে।
এই ভূমধ্যকারিক শ্রেণীতে বোধহয় অগ্রহারিক, ঔদ্রঙ্গিক, আবস্থিক, চৌরোদ্ধরণিক, বলাধ্যক্ষ, নাবাধ্যক্ষ, দাণ্ডিক, দণ্ডপাশিক, দণ্ডশক্তি, দশাপরাধিক, গ্রামপতি, জ্যেষ্ঠকায়স্থ, খণ্ডরক্ষ, খোল, কোট্টপাল, ক্ষেত্রপ, মপ্রমাতৃ, প্রান্তপাল, ষষ্ঠাধিকৃত ইত্যাদি। এদের নিন্মবর্তী শ্রেণীতে শৌল্কিক, গৌল্মিক, গ্রামপতি, হট্টপতি, লেখক, শিরোরক্ষিক, শান্তকিক, বাসাগারিক, পিলুপতি ইত্যাদি। বিভিনড়ব সময়ে বিভিন্ন রাষ্ট্রে এসব রাজপুরুষদের ক্ষমতা ও মর্যাদার তারতম্য হত, এটি সহজেই অনুমেয়।
রাজপাদোপজীবী শ্রেণী
রাজপাদোপজীবীদের বিন্যস্ত অবস্থান মৌর্যযুগে উন্মেষ ঘটলেও বাংলাদেশে গুপ্তযুগ থেকে সুদৃঢ় হয়। খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতক থেকে এদেশে রাষ্ট্রশক্তি উন্মেষের ধারনা করা হয়। তার পূর্বে রাজপাদোপজীবীরা এমন বিন্যস্ত ছিল না। মৌর্যযুগ থেকেই এদেশে কোনো কোনো বিশিষ্ট রাজ প্রতিনিধি ও রাজ কর্মচারীর পদবি ও দায়িত্ব সম্বন্ধে কিছু কিছু জানা যায়। গুপ্তযুগেই প্রথম সামন্তদেরকে তাদের সামরিক ও প্রশাসনিক সহায়তার জন্য বেতনের পরিবর্তে ভূমির মালিকানা দেয়া হয়। গুপ্ত যুগের সামন্তরা রাজার অধীনে যার যার নিজস্ব এলাকায় রাজার প্রতিভূ হিসেবেই শাসনকার্য পরিচালনা করার
অধিকার পায়। সামন্ততন্ত্রের বিকাশ এযুগেই পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়।
শ্রেণী হিসেবে তাদের কেউ কেউ ক্ষত্রিয়ের মর্যাদা পায়।৮২৩ রাজপাদোপজীবীদের প্রথম বিন্যস্ত রূপ ও অবস্থান সম্ভবত গড়ে উঠেছিল গুপ্তযুগে। তাদের আমলে রাজ্য শাসন যেমন সুশৃঙ্খল ও সুবিস্তৃত ছিল প্রয়োজনীয় রাজকর্মচারী বিভিন্ন শাখা প্রশাখায় নিয়োজিত থাকা স্বাভাবিক ছিল। গুপ্তযুগে এদেশে উৎপাদন বন্টন, শিল্প-বাণিজ্য যথেষ্ট প্রসার লাভ করেছিল। এ সম্বন্ধে বাংলার আদি অর্থনৈতিক অবস্থা অধ্যায়ে কিছুটা আলোচনা করা হয়েছে। পঞ্চম হতে সপ্তম শতক পর্যন্ত লিপিগুলোতে বিভিন্ন রাজপুরুষদের উল্লেখ আছে।
মহারাজাধিরাজের অধীনে রাজা, রাজক, রাজনক-রাজন্যক, সামন্ত-মহাসামন্ত, মাণ্ডলিক-মহামাণ্ডলিক, এসব নিয়ে যে বিস্তৃত সামন্তচক্র এরাও রাজপাদোপজীবী। রাজা-রাজনক-রাজপুত্র হতে আরম্ভ করে তরিক-শৌল্কিক- গৌল্মিক প্রভৃতি নিন্মশ্রেণীর রাজকর্মচারী পর্যন্ত সকলের উল্লেখই শুধু নয়, তাঁদের সকলকে একত্রে উল্লেখ করা হয়েছে ‘রাজপাদোপজীবীন:’, এবং সুদীর্ঘ তালিকায়ও যখন সমস্ত রাজপুরুষের নাম শেষ হয় নি, তখন তার পরই বলা হয়েছে ‘অধ্যক্ষ প্রচারোক্তানিহ কীর্তিতান’, অর্থাৎ আর যাঁদের কথা এখানে কীর্তিত বা উল্লিখিত হয় নি তাঁদের নাম অর্থশাস্ত্রের অধ্যক্ষ পরিচ্ছেদে উল্লিখিত আছে। সপ্তম শতকেই সর্বপ্রথম বাংলাদেশ নিজস্ব রাষ্ট্র লাভ করল, নিজস্ব শাসনতন্ত্র গড়ে তুলল। গৌড় ও কর্ণসুবর্ণাধীপ শশাঙ্ককে আশ্রয় করেই তার সূচনা দেখা গেল; কিন্তু তা স্বল্পকালের জন্য মাত্র। কারণ, তার পরই প্রায় শতাব্দীকাল ধরে কোন কেন্দ্রীয় শাসকের অভাবে সমস্ত দেশ জুড়ে মাৎস্যন্যায়ের উৎপীড়ন। এই মাৎস্যন্যায় পর্বের পর পাল রাষ্ট্র ও পাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার সঙ্গে সঙ্গেই দেশীয় শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হল। রাজপাদোপজীবীগণ সুবিন্যস্ত আঙ্গিকে প্রকাশ পেলে এবং আরো বিস্তৃত কর্মক্ষেত্রে নিয়োজিত হলেও কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাদেরকে পূর্বের ভূমিকায় দেখা গেল না।
বেতনভুক্ত রাষ্ট্রীয় সেবাদানকারী ছাড়াও এক শ্রেণীর রাজপাদোপজীবী ছিল। তারা সার্বক্ষণিক সেবদানকারী ছিল না। আহুত হলে তারা রাজকার্যে যোগদান করত। সমাজের সর্ববর্ণের লোক থেকেই এই দলে অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই সেবক শ্রেণীতে বর্ণ অনুযায়ী শ্রেণী নির্দিষ্ট ছিল না।
পাল ও সেন লিপিতে পঞ্চম একটি শ্রেণীর উল্লেখ আছে; এই শ্রেণীর লোকেরা সমাজের শ্রমিক-সেবক, অধিকাংশই ভূমিবঞ্চিত, রাষ্ট্রীয়-সামাজিক অধিকার বঞ্চিত। এই শ্রেণী তথাকথিত অন্ত্যজ ও ম্লেচ্ছচ্ছবর্ণের ও আদিবাসী গোষ্ঠীর নানা বৃত্তিধারী লোকদের নিয়ে গঠিত। লিপিগুলিতে বিশদভাবে এদের কথা বলা হয়নি, এবং যেটুকু বলা হয়েছে তাও পালপর্বের লিপিমালাতেই। অষ্টম শতকের আগে এদের উল্লেখ নেই; পালপর্বের পরেও এদের উল্লেখখ নেই। পালপর্বেও এদের সকলকে নিয়ে নিন্মতম বৃত্তি ও স্তরের নাম পর্যন্ত করে এক নিঃশ্বাসে বলে দেওযা হয়েছে, ‘মেদান্ধ্রচণ্ডালপর্যন্তান্’- একেবারে চণ্ডাল পর্যন্ত। কিন্তু পাল ও সেন-আমলের সমসাময়িক সাহিত্যে- কাব্যে, পুরাণে, স্মৃতিগ্রন্থে- এদের বর্ণ ও বৃত্তিমর্যাদা সম্বন্ধে বিস্তারিত পরিচয় পাওয়া যায়। লিপিপ্রমাণ দ্বারাও সমসাময়িক সাহিত্যের সাক্ষ্য সমর্থিত হয়। রজক ও নাপিতরাও সমাজশ্রমিক, সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা আবার কর্ষক বা ক্ষেত্রকরও বটে। জনৈক রজক সিরূপা ও নাপিত গোবিন্দের উলেখ পাচ্ছি শ্রীহট্ট জেলার ভাটেরা গ্রামে প্রাপ্ত গোবিন্দকেশবের লিপিতে। মেদ, অন্ধ্র, চণ্ডাল ছাড়া আরও দু’একটি অন্ত্যজ ও ম্লেচ্ছ পর্যায়ের অর্থাৎ নিন্মতম অর্থনৈতিক স্তরের লোকদের খবর সমসাময়িক লিপিতে পাওয়া যায়, যেমন পুলিন্দ, শবর ইত্যাদি। চর্যাপদে যে ডোম্, ডোম্বী বা ডোম্নী, শবর-শবরী, কাপালিক ইত্যাদির কথা বার বার পাওয়া যায় তাঁরাও এই শ্রেণীর। একটি পদে স্পষ্টই বলা হয়েছে, ডোম্বীর কুঁড়িয়া (কুঁড়েঘর) নগরের বাইরে; এখনও তো তাঁরা গ্রাম ও নগরের বাইরেই থাকে। বাঁশের চাংগাড়ী ও বাঁশের তাঁত তৈরি করা তখন যেমন ছিল এদের কাজ, এখনও তাই। এদের মধ্যে ব্রাহ্মণ, বৌদ্ধ এবং জৈনধর্মের সংঘগুরু এবং যতিরাও আছেন, সিদ্ধাচার্যরা আছেন এবং স্বল্পসংখ্যক করণকায়স্থ, বৈদ্য এবং উত্তম-সংকর বা সৎশূদ্র পর্যায়ের কিছু কিছু লোকও আছেন। স্মরণ রাখা প্রয়োজন, লক্ষ্মণসেনের অন্যতম সভাকবি ধোয়ী তন্তুবায় ছিলেন এবং সমসাময়িক অন্য আর একজন কবি, জনৈক পপীপ, জাতে ছিলেন কেবট্ট বা কৈবর্ত। গুপ্ত যুগ থেকে ব্রহ্মদেয় অথবা ধর্মদেয় ভূমি, দক্ষিণালব্ধ ধন ও সাময়িক পুরস্কার হল এই শ্রেণীর প্রধান আর্থিক নির্ভর।
ভূম্যধিকারী শ্রেণী
এই শ্রেণীতে সকলের উপরে ছিলেন রাণক, রাজনক, সামন্ত, মহাসামন্ত, মান্ডলিক, মহামান্ডলিক ইত্যাদি সামন্ত প্রভুরা; স্ব স্ব নির্দিষ্ট জনপদে এদের প্রভুত্ব মহারাজাধিরাজাপেক্ষা কিছু কম ছিল না। সর্বপ্রধান ভূস্বামী মহাসামন্ত-মহামাণ্ডলিকরা; তাঁদের নীচেই সামন্ত-মাণ্ডলিকরা-সামন্তসৌধের দ্বিতীয় শ্রেণী। তৃতীয় শ্রেণীতে মহামহত্তররা- বৃহৎভূস্বামীর দল;
চতুর্থ শ্রেণীতে মহত্তর ইত্যাদি, অর্থাৎ ক্ষুদ্র ভূস্বামীর দল। তার পর ধাপে ধাপে নেমে কুটুম্ব অর্থাৎ সাধারণ গৃহস্থ বা ভূমিবানপ্রজা, ভাগীপ্রজা, ভূমিবিহীন প্রজা ইত্যাদি। সামন্ত, মহাসামন্ত, মান্ডলিক, মহামান্ডলিক- এরা সকলেই সাক্ষাৎভাবে রাজপাদোপজীবী; কিন্তু আহূত হলে রাজপুরুষদের সহায়তা এরা করতেন, এমন প্রমাণ পঞ্চম শতক হতে আরম্ভ করে প্রায় সকল লিপিতেই পাওয়া যায়। সর্বনিমড়ব শ্রেণীতে স্থান হয়েছিল ক্ষুদ্রতম রাষ্ট্রসেবকদলের এবং এই দলে হূণ-মালব-খস-লাট-কর্ণাট-চোড় ইত্যাদি বেতনভুক্ত সৈন্যরা ছিলেন, ক্ষুদ্রকরণ বা কেরানিরা ছিলেন, চাটভাটেরা ছিলেন এবং ছিলেন এমন আরও অনেকে। তাদের মধ্যে সামন্ত, মহাসামন্ত, রানক, রাজনক, প্রভৃতি শ্রেণীর সামন্তরা সম্ভবত: তাদের সামরিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকারে বা পালন করার কারনে ক্ষমতাধর সামন্ত শ্রেণীতে পরিণত হয়েছিল।
মহত্তর, মহামহত্তর, কুটুম্ব, ইত্যাদিরাও বিভিন্ন শ্রেণীতে ভূম্যধিকারী ছিলেন। সম্ভবত তারাও রাজপাদোপজীবী হিসেবে বিশেষ পদমর্যাদা বা বিশেষ সেবা দেয়ার জন্য ভূমি-স্বত্ত্ব লাভ করে ভূমি-অধিকারী হয়েছিলেন। এছাড়া, আগে যারা ভূমির মালিক ছিলেন তারা হলেন প্রতিবাসী, জনপদবাসী, কুটুম্ব প্রভৃতি। তারা ছিলেন চাষী, কুটির শিল্পের মালিক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। তারা ক্রয় সূত্রেও মালিক হয়ে থাকতে পারেন। মহতো শব্দ থেকেই মহত্তর শব্দের উৎপত্তি। মহতো শব্দের অর্থ প্রধান। সম্ভবত গ্রাম প্রধানকেই মহত্তর বা মহামহত্তর উপাধীতে ভূষিত করা হতো। কুটুম্ব, প্রতিবাসী, জনপদবাসী- এরা সাধারণভাবে স্বল্পভূমি-অধিকারী গৃহস্থ; কৃষি, কুঠির-শিল্প ও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ব্যবসা এদের বৃত্তি ও জীবিকা। এরা নিজেরা নিজেদের হাতে চাষের জমি আবাদ করতেন বলে মনে হয় না যদিও ভূমির মালিক তাঁরা ছিলেন। চাষের কাজ নিজে যাঁরা করতেন, তাঁর ক্ষেত্রকর, কর্ষক, কৃষক বলেই পৃ কভাবে উলিখিত হয়েছেন। অষ্টম শতকের দেবখক্ষের আস্রফপুরলিপিতে দেখা যায়, ভূমি ভোগ করছেন একজন, কিন্তু চাষ করছে অন্য লোকেরা- ‘শ্রীশর্বান্তরেণ ভুজ্যমানক: মহত্তরশিখরাদিভি: কৃষ্যমাণক:’ (এখানে মহত্তর একজন ব্যক্তির নাম)। এই ব্যবস্থা শুধু এখন নয়, প্রাচীনকালে এবং মধ্যযুগেও প্রচলিত ছিল। বস্তুত, যিনি ভূমির মালিক, তাঁর পক্ষে নিজের হাতেই সমস্ত ভূমি রাখা এবং নিজেরাই চাষ করা কিছুতেই সম্ভব ছিল না। জমি নানা শর্তে বিলি বন্দোবস্ত করতেই হত বলে ধারনা হয়। সাহিত্য-পরিষদে রক্ষিত বিশ্বরূপসেনের এক লিপিতে আছে, হলায়ুধ শর্মা নামক জনৈক আবল্লিক মহাপণ্ডিত ব্রাহ্মণ একা নিজের ভোগের জন্য নিজের গ্রামের আশেপাশে তিন-চারিটি ভিন্ন ভিন্ন গ্রামে ৩৩৬১/২ উন্মান ভূমি রাজার নিকট হতে দানস্বরূপ পেয়েছিলেন; এই ভূমির বার্ষিক আয় ছিল ৫০০ কর্পদক পুরাণ। এই ৩৩৬১/২ উন্মানের মধ্যে অধিকাংশ ছিল নালভূমি অর্থাৎ চাষের ক্ষেত্র। এটি তো সহজেই অনুমেয় যে, এই সমগ্র ভূমি হলায়ুধ শর্মার সমগ্র পরিবার পরিজনবর্গ নিয়েও নিজেদের চাষ করা সম্ভব ছিল না এবং হলায়ুধ শর্মা ক্ষেত্রকর বলে উল্লিখিতও হতে পারেন না। তাঁকে জমি চাষী প্রজাদের মধ্যে বিলি বন্দোবস্ত করে দিতেই হতো। এই চাষী প্রজারাই ছিলেন ক্ষেত্রকর।
৮২২ ড: নীহাররঞ্জন রায়: বাঙালির ইতিহাস (আদি পর্ব)
খবর বিভাগঃ
বাংলাদেশের ইতিহাস