বুধবার, মার্চ ২৩, ২০১৬

আদি বাংলার ইতিহাস (প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্ব ৯২

আদি বাংলার ইতিহাস
(প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্ব ৯২
পাল সাম্রাজ্যের পতন।
বর্মণ রাজবংশ
ঢাকা জেলার অন্তর্গত বেলাব গ্রামে প্রাপ্ত ব্রজবর্মণের একটি তাম্রশাসনই এ রাজবংশের ইতিহাস বর্ণনার প্রধান অবলম্বন। ভুবনেশ্বরে ভট্টভবদেবের লিপি, সামল বর্মণের ব্রজরঙ্গিনী তাম্রশাসন এবং হরিবর্মণের সামন্তস্বর শাসন থেকে এ প্রসঙ্গে কিছু কিছু তথ্য পাওয়া যায়। বর্মণ রাজারা নিজেদেরকে সিংহপুরার রাজা যাদব বংশের অধস্তন পুরুষ বলে দাবি করেছেন। ঐতিহাসিকগণ তাঁদের বংশপরিচয় নিয়ে, বিশেষ করে সিংহপুরার অবস্থান নিয়ে মতৈক্যে পৌঁছতে পারেন নি। পাঞ্জাবের লবণ পাহাড়ের উত্তর দিকে এক সিংহপুরার সন্ধান পাওয়া যায়।৬১৯ আবার কলিঙ্গ রাজ্যেও এক সিংহপুরার অবস্থান ছিল। তৃতীয় হুগলী জেলায় সিংগুরকেই৬২০ সিংহপুর বলে অনেকে উল্লেখ করেছেন। বিশেষ করে, ডি.সি. গাঙ্গুলী৬২১ ধারণা করেন যে, পূর্ব বাংলার কোথাও সিংগুরা থাকতে পারে, যদিও এ বিষয়ে বেলাব তাম্রশাসনে কোনো উল্লেখ নেই। বেলাব শাসন থেকে সন্দেহাতীতভাবে জানা যায় যে, জাত বর্মণই এই বংশের প্রতিষ্ঠাতা।
বেলাব তাম্রশাসনে এভাবে ব্যক্ত হয়েছে যে, জাতবর্মণের বিজয়কালে ভেনার পুত্র পৃথু গৌরব ম্লান হয়ে যায়। এই পৃথু থেকে এন.জি. মজুমদার ৬২২ উল্লেখ করেন যে, পৃথু যেমন তাঁর রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তেমনি জাতবর্মণও বর্মণ রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। তাঁর পিতা বজ্রবর্মণকে একজন সাহসী যোদ্ধা হিসেবে প্রশংসা করা হয়েছে।
তিনি রাজা কর্ণের কন্যা বিরশ্রীকে বিবাহ করে অঙ্গ দেশের উপর আধিপত্য লাভ করেন। তিনি কামরূপের রাজাকে নত করেন এবং উত্তর বাংলার রাজা দিব্যকে ধ্বংস করেন। তিনি গোবর্ধনের ভাগ্যকে নিঃশেষ করেন এবং তাঁর সম্পদ বেদ প্রচারে ব্রাহ্মণদের মধ্যে বিতরণ করেন। দিব্যকে পদানত করা এবং জাতবর্মণের সঙ্গে কলচুরীর রাজা কর্ণের (১০৪১- ১০৭০ খ্রিষ্টাব্দ) কন্যা বিরশ্রীর সঙ্গে বিবাহকে সঠিক ধরে নিলে জাতবর্মণ পালরাজ তৃতীয় বিগ্রহপালের (১০৫৮-১০৭৫ খ্রিষ্টাব্দ) সমসাময়িক বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। জাতবর্মণের রাজত্বকালকে ১০৫০-১০৭৫ খ্রিষ্টাব্দের বলে ধারণা করা হয়।
কর্ণের কন্যার সঙ্গে জাতবর্মণের বিবাহ তাঁর শক্তিসামর্থ্য অনেক বাড়িয়ে দেয়। কেউ কেউ এটিকে তাঁর রাজ্যলাভের প্রধান সূত্র বলে ধারণা করেন।৬২৪
কোনো কোনো ঐতিহাসিক ধারণা করেন যে, ব্রজবর্মণ হয়তো কর্ণের সঙ্গে মগধে এসেছিলেন এবং ১১ শতাব্দীর মাঝামাঝি কোনো এক সময়ে বাংলাদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকেন। সম্ভবত পিতা-পুত্র উভয়েই চন্দ্রবংশ ধ্বংসের জন্য কর্ণের সঙ্গে সহযোগিতা করেছিলেন এবং বিনিময়ে দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার খণ্ডাংশে প্রথমে সামন্তরাজা হিসেবে রাজ্য পেয়েছিলেন। আর কৈবর্ত্যরাজ দিব্য ধ্বংস হওয়ার পর জাতবর্মণ হয়তো পূর্ণস্বাধীনতা লাভ করেন। অবশ্য বেলাব তাম্রশাসন৬২৫ ছাড়া জাতবর্মণের সামরিক অভিযান সম্পর্কে অন্য কোনো সূত্র পাওয়া যায় না। এমনকি তিনি কত বছর রাজত্ব করেছিলেন তারও কোনো হদিস পাওয়া যায় না এবং তাঁর পর কে রাজা হয়েছিলেন তাও সঠিকভাবে নিরূপণ করা যায় না। কোনো কোনো সূত্রে পাওয়া যায় যে, জাতবর্মণের পরে সামলবর্মণ সিংহাসন অধিকার করেছিলেন, কিন্তু ঐতিহাসিকগণ এ বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেন না। এ পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ধারণা করা হয়, হরিবর্মণ হয়তো প্রথমে সিংহাসন অধিকার করেছিলেন, কিন্তু তাঁর কোনো উত্তরাধিকারীর কথা জানা যায় না। সম্ভবত তাঁর ছোট ভাই সামলবর্মণ তাঁর পরবর্তী সিংহাসনের উত্তরাধিকারী ছিলেন। সামলবর্মণের পরে উদয়ন, ত্রৈলোক্যসুন্দর ও ব্রজবর্মণের নাম পাওয়া যায়; তাঁদের কেউ কেউ হয়ত সিংহাসন অধিকার করেছিলেন। হরিবর্মণ এবং সামলবর্মণ ভ্রাতা ছিলেন। কিন্তু পরবর্তী তিনজন অর্থাৎ উদয়ন, ত্রৈলোক্যসুন্দর ও ব্রজবর্মণের সম্পর্ক স্পষ্ট নয়। বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায় যে, হরিবর্মণ ৪৬ বছর রাজত্ব করেছিলেন।৬২৬ সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিতে উল্লেখ আছে যে, পূর্বাঞ্চলের জনৈক বর্মণ রাজা রামপালকে সাহায্য করেছিলেন। ধারণা করা হয়, এ বর্মণ রাজাই ছিলেন ‘হরিবর্মণ’।
এ বর্মণ বংশের রাজত্বের সীমা নির্ধারণ করা এখন পর্যন্ত সম্ভব হয় নি। কোনো কোনো ঐতিহাসিক মনে করেন, রামপাল সম্ভবত বর্মণ বংশ ধ্বংস করে পূর্ববাংলা অধিকার করেছিলেন। কারণ, রামচরিতে এ ধরনের ইঙ্গিত রয়েছে, কিন্তু তথ্যসূত্রে এ কথার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং বিপরীত এটিই পাওয়া যায় যে, হরিবর্মণের মন্ত্রী, সে যুগের একজন শ্রেষ্ঠ মনীষী, ভবদেব ভট্টের প্রশস্তিতে৬২৭ হরিবর্মণের রাজত্বকালের সময় জানা যায়। অবশ্য, ভবদেব ভট্টের তাম্রশাসনের প্রাপ্তিস্থান অনুসারে উড়িষ্যাকেও হরিবর্মণের রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য করা হয়। কিন্তু বর্তমানে অনেক ঐতিহাসিকই এতে দ্বিমত পোষণ করেন যে, উড়িষ্যা কোনোদিনই বর্মণ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল না এবং ভুবনেশ্বরে প্রাপ্ত হলেও প্রশস্তি টি কোনো মন্দিরগাত্রে সংযোজিত ছিল না। তবে বেলাব তাম্রশাসন থেকে এটুকু জানা যায় যে, আসামের নাগ রাজা হরিবর্মণের মন্ত্রী ভবদেব ভট্ট কর্তৃক পরাজিত হয়েছিলেন। রাঢ়দেশের অলঙ্কারস্বরূপ সিন্ধল গ্রামের অধিবাসী ভবদেব নামক জনৈক ব্রাহ্মণ গৌড়রাজার নিকট হতে হস্তিনীভিট্ট গ্রাম উপহার পেয়েছিলেন। তাঁর পিতামহ আদিদেব বঙ্গরাজের বিশেষ বিশ্বাসভাজন মহামন্ত্রী, মহাপাত্র ও সান্ধিবিগ্রহিক ছিলেন।
আদিদেবের পুত্র গোবর্ধন অস্ত্র ও শাস্ত্রে সমভাবে পারদর্শী ছিলেন এবং পণ্ডিতগণের সভায় ও যুদ্ধক্ষেত্রে খ্যাতি অর্জনকরেছিলেন। তাঁর পত্নী বন্দ্যঘটীয় এক ব্রাহ্মণকন্যার গর্ভে ভবদেবভট্ট জন্মগ্রহণ করেন। তিনি সিদ্ধান্ত, তন্ত্র, গণিত ও ফলসংহিতায় (জোতিষ) পারদর্শী ছিলেন। তিনি ধর্মশাস্ত্র ও স্মৃতির নতুন ব্যখ্যা ও মীমাংসা সম্বন্ধে বহু গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। এছাড়া কাব্য, সর্ব আগম (দেব), অর্থশাস্ত্র, আয়ুর্বেদ, অস্ত্রবেদ প্রভৃতি শান্ত্রে অদ্বিতীয় পণ্ডিত ছিলেন বলে জানা যায়। উল্লেখ করা হয়েছে যে, তিনি ছিলেন রাজা হরিবর্মণের মন্ত্রী। তাঁর মন্ত্রশক্তির প্রভাবে ধর্মবিজয়ী রাজা হরিবর্মণ দীর্ঘকাল রাজ্যসুখ ভোগ করেছিলেন। অতিরঞ্জিত হলেও ভবদেবের পাণ্ডিত্যের বিবরণ যে অনেকাংশে সত্য, তাতে সন্দেহ নেই। কারণ, তাঁর মীমাংসা ও স্মৃতি বিষয়ক গ্রন্থ এখনও প্রচলিত ও প্রসিদ্ধ। ভবদেবের ‘বালবলভীভুজঙ্গ’এই উপাধি ছিল। হরিবর্মার রাজধানী সম্ভবত বিক্রমপুরেই ছিল। হরিবর্মণ ও তাঁর পুত্রের পর জাতবর্মণের অপর পুত্র সামলবর্মণ রাজা হন। সামলবর্মণ সম্বন্ধে বিস্তারিত আর কিছুই জানা যায় না। বর্মণ রাজাদের আলোচনা প্রসঙ্গে রমেশচন্দ্র মজুমদার বেলাব তাম্রশাসনের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন:
“ভোজবর্মার বেলাব তাম্রশাসনে একাদশ শ্লোকে বলা হয়েছে ‘তস্য মালব্যদেবাসীৎ কন্যা ত্রিলোক সুন্দরী’; ননীগোপাল মজুমদার এই তাম্রশাসনটির সম্পাদনাকালে এর ব্যাখ্যা করেছিলেন যে ‘সামলবর্মা ও তাঁর স্ত্রী মালব্যদেবীর ত্রিলোকসুন্দরী নামে এক কন্যা ছিল; পরবর্তীকালে অনেকে এই অর্থ গ্রহণ না করে লিখেছেন যে, তাঁদের একটি অপূর্ব সুন্দরী (ত্রিলোক সুন্দরী) কন্যা ছিল। কিন্তু ‘ত্রিলোকসুন্দরী’ নামে কন্যা ছিল এরূপ অর্থ অসঙ্গত নয় এবং এটি একটি নতুন ঐতিহাসিক তথ্যের সন্ধান দেয়। সিংহলদেশীয় ইতিহাসে লিখিত আছে যে, ঐ দেশের রাজা বিজয়বাহু কলিঙ্গের রাজকন্যা তিলোকসুন্দরী (ত্রিলোক সুন্দরী)-কে বিবাহ করেন। খুব সম্ভবত বর্মণ রাজবংশ প্রথমে কলিঙ্গেই রাজত্ব করতেন।
এতে সময়ের সম্পূর্ণ সঙ্গতি আছে। ত্রিলোকসুন্দরী পালি ভাষায় তিলোকসুন্দরীতে পরিণত হওয়া স্বাভাবিক। সিংহলের ইতিহাসে আছে যে, তিলোকসুন্দরী যখন বিবাহ করতে সিংহলে যান তখন তিনজন রাজকুমার ও তাঁদের ভগ্নী একসঙ্গে গিয়েছিলেন। সুতরাং বর্ম রাজবংশের সাথে সিংহলের রাজবংশের যে কেবল বৈবাহিক সম্বন্ধ ছিল তা নয়, ঘনিষ্ঠ অন্তরঙ্গতাও ছিল। ভোজবর্মার বেলাব তাম্রশাসনের চতুর্দশ শ্লোকের দুর্বোধ্যতা দূর হয়ে একটি ঐতিহাসিক ঘটনামূলক সদর্থের সন্ধান পাওয়া যায়।”
কোনো তাম্রশাসন থেকেই হরিবর্মণের উত্তরাধিকারী সম্পর্কে কিছুই জানা যায় না। তবে হরিবর্মণের পরে সামলবর্মণের রাজা হওয়ার খবর জানা যায়। বিশেষ করে এজন্য তাঁর নাম বিখ্যাত হয়ে আছে যে, তিনিই প্রথম বৈদিক ব্রাহ্মণদেরকে ১০৭৯ খ্রিষ্টাব্দে মধ্যপ্রদেশ থেকে বাংলাদেশে এনেছিলেন। মালব্যদেবী ছিলেন সামলবর্মণের স্ত্রী। ঐতিহাসিক আর.জি. ব্যাসাকের মতে মালব্যদেবী ছিলেন উদয়ীনের কন্যা। বেলাব তাম্রশাসন সূত্রে জানা যায় যে, সম্ভবত এসময় শ্রীলংকা রাজ্যের সাথে বর্মণ রাজদের সু-সম্পর্ক ছিল এবং ব্যক্তিগত পর্যায়েও আদানপ্রদান ছিল। তাঁদের মধ্যে কোনো বৈবাহিক সূত্র ছিল কি না তা সঠিকভাবে জানা যায় না। সামলবর্মণের পরে মালব্যদেবীর ঔরসজাত সন্তান ব্রজবর্মণ সিংহাসনের উত্তরাধিকারী ছিলেন। তিনি কত বছর রাজত্ব করেছেন তা জানা যায় না। এ পর্যন্ত আলোচনা থেকে এ সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, বর্মণ বংশের চারজন রাজা রাজত্ব করেছেন- ১. জাতবর্মণ, ২. হরিবর্মণ, ৩. সামলবর্মণ এবং ৪. ব্রজ বর্মণ।
সেন রাজবংশ
বাংলাদেশের ইতিহাস এক নতুন ধারায় প্রবাহিত হয় অবাঙালি সেন রাজবংশ ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে। তাঁদের পূর্বে পাল রাজবংশের রাজ্য কনৌজ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। কিন্তু সেন রাজবংশের রাজ্যভুক্ত ছিল শুধু বাংলা নামের ভূভাগ। তারা কর্ণাট থেকে আগত অবাঙালি অভিবাসী বলে অনেকের ধারণা। তাদের প্রকৃত পরিচিতি ও আদি বাসস্থান এখনও এদেশবাসীর কাছে স্পষ্ট নয়। তাদের বর্ণপরিচয়েও কিছুটা অস্পষ্টতা আছে। বাংলাদেশের প্রাচীন কুলজী গ্রন্থে তাদেরকে বৈদ্যজাতীয় বলা হয়েছে।৬২৮ আধুনিক কালে সেন রাজবংশ কায়স্থ৬২৯ এবং বাংলাদেশের অন্যান্য সুপরিচিত জাতিভুক্ত বলে প্রতিপন্ন করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে সমসাময়িক লিপিতে তাদের নিজস্ব উক্তিই সঠিক বলে গ্রহণ করা যেতে পারে।৬৩০ তাদের নিজস্ব উক্তি অনেকটা যুক্তিসঙ্গত বলেও মনে হয়। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের মতে, বাংলাদেশে আসার পর তাঁরা হয়তো বৈবাহিক সম্বন্ধ দ্বারা বৈদ্য অথবা অন্য কোনো জাতির অন্তর্ভুক্ত হয়েছিলেন। অনেকে মনে করেন যে, আদিতে তাঁরা ব্রাহ্মণ ছিলেন এবং পরে সামরিক বৃত্তি গ্রহণ করে ক্ষত্রিয় হিসেবে পরিচিত হন।৬৩১ কেউ কেউ অনুমান করেন যে, সেন রাজাগণের পূর্বপুরুষ এক জৈন আচার্য বংশে জন্মগ্রহণ করেন। প্রথমে তাঁরা জৈন ধর্ম ত্যাগ করে শৈবধর্ম ও পরবর্তীকালে অস্ত্রচর্চা করে ক্ষত্রিয় হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। শুধু দেওপাড়া তাম্রলিপিতে সামন্তসেনকে ব্রাহ্ম-ক্ষত্রিয় বলা হয়েছে, কিন্তু অন্যান্য লিপিতে তাঁদেরকে ক্ষত্রিয় বলা হয়েছে। তাঁদের শাসনকালকে গুরত্ব অনুসারে তিনটি অধ্যায়ে বিভক্ত করা যেতে পারে। প্রথমত, কর্ণাটাগত সেনরাজগণের পূর্বপুরুষ পশ্চিম বাংলার রাঢ় অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন। দ্বিতীয়ত, পালরাজাদের দুর্বলতার সুযোগে সেনরাজ বিজয়সেন সার্বভৌমত্বের অধিকারী হয়ে ক্রমান্বয়ে সমগ্র বাংলায় স্বীয় ক্ষমতার সম্প্রসারণ করেন। তৃতীয়ত, অবশেষে মুসলিম আক্রমণে এবং রাজ্যের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহে এই রাজবংশের পতন হয়।৬৩২ কর্ণাট অঞ্চল থেকে আগত সেনরাজাদের পূর্বপুরুষ সামন্তসেন প্রথম রাঢ় অঞ্চলে বসবাস শুরু করেন। তাঁরই পরবর্তী পুরুষ বাংলায় রাজক্ষমতার অধিকারী হন।৬৩৩ তবে এই সেনবংশ কখন, কি উপায়ে ও কি কারণে বাংলায় আগমন করেন এবং এদেশের রাজনৈতিক ক্ষমতার অধিকারী হন- এর বিস্তারিত বিবরণ আজও সঠিকভাবে জানা যায় নি। সেনদের লিপিমালা হতে জানা যায় যে, সেন নৃপতিগণ নিজেদেরকে ‘ক্ষত্রিয়’৬৩৪, ‘ব্রহ্ম ক্ষত্রিয়’৬৩৫, ‘কর্ণটি ক্ষত্রিয়’৬৩৬ প্রভৃতি বলে আত্মপরিচয় দিয়েছেন। তাঁদের পূর্বপুরুষ বীলসেনকে চন্দ্রবংশীয় বলে দাবি করা হয়েছে।৬৩৭ বিজয়সেনের ব্যারাকপুর তাম্রশাসন৬৩৮ এবং বল্লালসেনের নৈহাটি তাম্রশাসন৬৩৯ থেকে জানা যায় যে, তাঁরা নিজেদেরকে রাজপুত্র বলে উল্লেখ করেছেন। এগুলি থেকে আর.ডি. ব্যানার্জী ধারণা করেন যে, সেনরা রাজপুত্রই ছিল।৬৪০ তবে পণ্ডিতব্যক্তিদের ধারণা এই রাজপুত্র উত্তর ভারতের রাজপুত জাতির বংশধর নয়। সম্ভবত সামন্তসেনের পূর্বপুরুষ কোনো রাজপরিবারের সঙ্গে বৈবাহিক সূত্রে সম্পর্কিত ছিলেন। এই সূত্রে পরপর দুই পুরুষ যাবত তাঁরা নিজেদেরকে রাজপুত্র অর্থাৎ যুবরাজ (Prince) বলে পরিচয় দিয়েছেন।
এর আর্যপুত্র রাজপুত জাতির বংশধর নয়। তবে রাজপুতের ক্ষত্রিয় স্বভাবের কথা তাদের নানা লিপিতে ব্যক্ত হয়েছে। তাদেরকে এ দেশের সুপরিচিত জাতিভুক্ত করা হলেও৬৪১ বিভিন্ন পণ্ডিতব্যক্তিগণ তাদের লিপিমালায় প্রদত্ত উক্তিটি সত্য বলে গ্রহণ করে ‘ব্রহ্ম-ক্ষত্রিয়’ শব্দটির ব্যাখ্যা বিভিন্নভাবে প্রদান করেছেন। এ সম্পর্কে আর. ভাণ্ডারকরের উক্তিটি সাধারণভাবে গ্রহণ করা হয়েছে। তাঁর মতে, সেনগণ প্রথমে ব্রাহ্মণ ছিলেন এবং পরবর্তীকালে ক্ষত্রিয়ধর্ম অর্থাৎ ক্ষত্রিয়বৃত্তি গ্রহণ করেছিলেন।৬৪২
৬১৭ Indian Historical Quarterly: vol. IX.
৬১৮ A.H. Dani: Mainamati.
৬১৯ আর. ডি. ব্যানার্জী: বাংলার ইতিহাস, খন্ড- ১, পৃ. ২৭৫-৭৬।
৬২০ Epigraphia Indica, vol. 4, p. 142.
৬২১ Indian Historical Quarterly, vol. XII, pp. 608-9.
৬২২ Indian Historical Quarterly, verse 22.
৬২৩ Indian Historical Quarterly, verse 6.
৬২৪ Paul- Early history of Bengal, vol. I, p. 79.
৬২৫ Inscriptions of Bengal, III, p. 20.
৬২৬ Inscriptions of Bengal, III, verse- 16, p. 34.
৬২৭ Inscriptions of Bengal, pp. 25-32.
৬২৮ রমেশচন্দ্র মজুমদার- বাংলাদেশের ইতিহাস (প্রাচীন যুগ) পৃ- ১০৩।
৬২৯ আইনী আকবরী: আবুল ফজল।
৬৩০ রমেশচন্দ্র মজুমদার- বাংলাদেশের ইতিহাস (প্রাচীন যুগ) পৃ- ১০৩।
৬৩১ Indian Antiquary, 1911, p. 35.
৬৩২ এস.এম. রফিকুল ইসলামÑ প্রাচীন বাংলার সামাজিক ইতিহাস, পৃ- ১৭।
৬৩৩ রমেশচন্দ্র মজুমদার, হিস্ট্রি অফ বেঙ্গল, খণ্ড-১, পৃ. ১; এস.হোসেন, এভরি ডে লাইফ ইন দি পাল এম্পায়ার, পৃ. ১।
৬৩৪ সুকুমার সেনÑ বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, প্র ম খণ্ড, পৃ ২-৩।
৬৩৫ এইচ. ব্লকম্যান- কনট্রিবিউশনস টু দি জিওগ্রাফি অ্যান্ড হিস্ট্রি অফ বেঙ্গল, পৃ. ৩; ই. লেটব্রিজ, অ্যান্ড ইজি ইন্ট্রডাকশন টু দি হিস্ট্রি অ্যান্ড জিওগ্রাফি অফ বেঙ্গল, পৃ. ১৩।
৬৩৬ রমেশচন্দ্র মজুমদার, হিস্ট্রি অফ বেঙ্গল, খণ্ড-১, পৃ. ২১৬-২১৭।
৬৩৭ মিনহাজ-ই-সিরাজ: তবকাত-ই-নাসিরী (অনুবাদক: আবুল কালাম মোঃ যাকারিয়া), পৃ. ২৪-২৬।
৬৩৮ Verse no. 3: Epigraphia Indica, vol. 15, p. 282.
৬৩৯ Verse no. 3: Epigraphia Indica, vol. 14, p. 159.
৬৪০ Epigraphia Indica, vol. 15, p. 279.
৬৪১ রমেশচন্দ্র মজুমদার- বাংলাদেশের ইতিহাস, খণ্ড- ১, পৃ. ৮-৯।
৬৪২ এন.জি. মজুমদার, ইন্সক্রিপশন্স অফ বেঙ্গল, খণ্ড-৩, পৃ. ১০৭, ১৩৮, ১৪১।
আগামী পর্বে সেন রাজবংশ

শেয়ার করুন