বুধবার, মার্চ ২৩, ২০১৬

আদি বাংলার ইতিহাস (প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্ব ৯১

আদি বাংলার ইতিহাস
(প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্ব ৯১
পাল সাম্রাজ্যের পতন (ক্রমশ)
হরিকেল রাজ্য
চট্টগ্রামে প্রাপ্ত তাম্রশাসন থেকে জানা যায় যে, এই অঞ্চলে কান্তিদেব নামে আর একজন রাজা রাজত্ব করতেন। ইনি সম্ভবত পূর্বোক্ত দেববংশীয় রাজগণের পরবর্তী, কিন্তু তাঁদের সাথে এর কোনো সম্বন্ধ ছিল কি না তা জানা যায় না। রমেশচন্দ্র মজুমদার কান্তিদেবের শাসনকালকে ৯ম শতকের ঘটনা বলেছেন। পরমসৌগত পরমেশ্বর মহারাজাধিরাজ কান্তিদেব হরিকেলে রাজত্ব করতেন। তাঁর রাজধানীর অথবা এক প্রধান নগরীর নাম ছিল বর্ধমানপুর। হরিকেল বলতে সাধারণত পূর্ববঙ্গ বুঝায়; কিন্তু এটি শ্রীহট্টের নামান্তররূপেও ব্যবহৃত হতো। সুতরাং কান্তিদেবের রাজ্য কোথায় এবং কতদূর বিস্তৃত ছিল নিশ্চিত বলা যায় না। যদি বর্ধমানপুর সুপরিচিত বর্ধমান নগরী হয় তাহলে বলতে হবে যে, কান্তি দেবের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গেও বিস্তৃত ছিল; কিন্তু এটি সম্ভবপর মনে হয় না। কান্তিদেবের পিতা এক শক্তিশালী রাজার বিন্দুরতি নামী কন্যাকে বিবাহ করেছিলেন। মনে হয় এটিই তাঁর সৌভাগ্যের মূল। কারণ তাঁর পিতা বা পিতামহ রাজা ছিলেন বলে মনে হয় না। তাঁর পিতার নাম ধনদত্ত ও পিতামহের নাম ভদ্রদত (ভদ্রদত্ত); ভদ্রদত সম্বন্ধে বলা হয়েছে যে, তিনি শত্রুগণকে পরাজিত করেছিলেন। কান্তিদেব কোন সময়ে রাজত্ব করেছিলেন, তা আজও সঠিকভাবে নির্ণয় হয় নি। কান্তিদেব বৌদ্ধ ছিলেন। তাঁর বংশধরগণের সম্বন্ধে এ পর্যন্ত কিছুই জানা যায় নি।
চন্দ্রবংশ
তিব্বতের ভিক্ষু লামা তারনাথ বাংলাদেশের চন্দ্রবংশ সম্পর্কে বর্ণনায় বলেছেন যে, ৬ষ্ঠ থেকে ৮ম শতাব্দীতে তাঁরা এখানে রাজত্ব করেছেন। কুমিল্লা জেলার সম্প্রতি ময়নামতি-লালমাই পাহাড়ি অঞ্চল খনন করে অনেক নতুন নতুন প্রত্নতথ্য পাওয়া গেছে যার উপর নির্ভর করে ৮ম শতাব্দী থেকে পূর্ব ও দক্ষিণ বাংলার ইতিহাস অনেকখানি পুনর্গঠন করা সম্ভব হচ্ছে।৫৯৬ কান্তিদেবের পরে প্রবলপরাক্রান্ত চন্দ্রবংশ পূর্ব ও দক্ষিণ বঙ্গে রাজত্ব করতেন। এই বংশের প্র ম দুই জন রাজা পূর্ণচন্দ্র ও তাঁর পুত্র সুবর্ণচন্দ্র রোহিতাগিরিতে রাজত্ব করতেন। এটি সম্ভবত বর্তমান বিহার প্রদেশের শাহাবাদ জেলার অন্তর্গত রোটাসগড়েরই প্রাচীন নাম। পরবর্তীকালে এই বংশীয় রাজাদের রাজধানী ছিল কুমিল্লার নিকটবর্তী ক্ষিরোদ নদীর তীরে পূর্বোক্ত দেবপর্বত নামক স্থানে।
নলিনীকান্ত ভট্টশালীর মতে রোহিতাগিরি লালমাই বা লালমাটির সংস্কৃত নাম। কিন্তু এই বংশীয় রাজা শ্রীচন্দ্রের তাম্রশাসনে এই ক্ষুদ্র পাহাড়টি ‘লালম্বী’ বলে উল্লিখিত হয়েছে। সুতরাং শ্রীদীনেশচন্দ্র সরকারের মতে লালমাইর সাথে রোহিতাগিরির অভিন্নতা সম্বন্ধে কোনো প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু অসম্ভব নয় যে, লালম্বী লালমাই শব্দেরই বিশুদ্ধ সংস্করণ। রোটাসগড় রোহিতাশ্বগিরি হতে উদ্ভূত রোহিতাগিরি ও রোহিতাশ্বগিরির অভিন্নতাও সংশয়ের অতীত নয়। সুতরাং রোটাসগড়ই সে রোহিতাগিরি এটিও নিঃসংশয়ে গ্রহণ করা যায় না। লালমাই পাহাড়টি কুমিল্লার পাঁচ মাইল পশ্চিমে। এর দৈর্ঘ প্রায় ১১ মাইল এবং উচ্চতা গড়ে ৩০ ফুট, যদিও ১০০ ফুট উচ্চ চূড়াও কয়েকটি আছে। এখানে চন্দ্রবংশের কয়েকটি তাম্রশাসন পাওয়া গিয়েছে। রাজধানী দেবপর্বত যে এর উপরে অবস্থিত ছিল তা পূর্বেই বলা হয়েছে। উড়িষ্যার দুই জন রাজা তাম্রশাসনে তাঁদের পূর্বপুরুষের বাসভূমি রোহিতাগিরি উল্লেখ করেছেন। সুতরাং ভট্টশালীর মতটি একেবারে ভ্রমাত্মক বলা যুক্তিসঙ্গত নয়। যাঁরা রোহিতাগিরি ও রোটাসগড় অভিন্ন মনে করেন, তাঁরা বলেন, এই বংশের রাজাগণ পালরাজগণের অধীন সামন্তরাজা ছিলেন। পালগণের অধীন সামন্তরাজা বা সৈনিক কর্মচারী হিসেবেই তাঁরা বঙ্গদেশে আগমন করেন এবং পালরাজগণের গৃহবিবাদ বা দুর্বলতার সুযোগে পূর্ববঙ্গে রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।
আবদুল মোমিন চৌধুরী এর প্রতিবাদ করে বলেন যে, লালমাই পাহাড়ে চন্দ্র রাজগণের তিনটি তাম্রশাসন পাওয়া গিয়েছে এবং এই বংশের প্রথম শক্তিশালী রাজা ত্রৈলোক্যচন্দ্র হরিকেলের রাজার অধীন ছিলেন বলে বর্ণিত হয়েছে; সুতরাং লালমাই পর্বত অঞ্চলে রোহিতাগিরিতেই চন্দ্রবংশের রাজ্য ছিল এটিই সঙ্গত মনে হয়।
এ ধারণা থেকেই এন.কে. ভট্টশালী৫৯৭ কুমিল্লা জেলার লালমাই পাহাড়ে রোহিতাগিরি অবস্থিত ছিল বলে উল্লেখ করেন কিন্তু হরিদাস মিত্র৫৯৮ সাবেক পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি জেলাকে রোহিতাগিরি বলে উল্লেখ করেছিলেন। সম্প্রতি ময়নামতি উৎখননের ফলে প্রাপ্ত তিনটি চন্দ্র তাম্রশাসন থেকে রোহিতগিরির পরিচয় নির্ণয় হয়েছে।৫৯৯
এযাবত প্রাপ্ত তাম্রশাসন ও তাম্রলিপির বর্ণনামতে নিন্মে বর্ণিত রাজাদের নাম ও তাঁদের শাসনকালের প্রমাণ পাওয়া যায়।
নং বংশ রাজত্বকাল
১. পূর্ণচন্দ্র
২. সুবর্ণচন্দ্র
৩. ত্রৈলোক্যচন্দ্র অজ্ঞাত
৪. শ্রীচন্দ্র ৪৪ বছর৬০০
৫. কল্যাণচন্দ্র ২৪ বছর৬০১
৬. লাদাহচন্দ্র ১৮ বছর৬০২
৭. গোবিন্দচন্দ্র ২৩ বছর৬০৩
পূর্ণচন্দ্র এই রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর নাম বহু (দেব) মূর্তির পাদপীঠে উৎকীর্ণ লিপিতে, জয়স্তম্ভের গাত্রে এবং তাম্রশাসনে খোদিত আছে। আর একখানি তাম্রশাসনে বলা হয়েছে যে, “তাঁর নির্লজ্জ শত্রুগণ পরাজিত হয়ে তাঁরই সৈন্যগণের পাদোত্থিত ধূলিনির্মিত ছত্র-তলে আশ্রয় গ্রহণ করত।” সম্ভবত পূর্ণচন্দ্র পালগণের সামন্তরূপেই এই সকল সামরিক বিজয়যাত্রা করেছিলেন। সামন্তরাজা সুবর্ণচন্দ্র ছিলেন পূর্ণচন্দ্রের পুত্র। তিনি বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন। এতে বোঝা যায় পূর্ণচন্দ্র বৌদ্ধ ছিলেন না; কিন্তু পরবর্তী রাজাগণ সকলেই বৌদ্ধ ছিলেন, কারণ তাঁদের তাম্রশাসনের প্রথম শ্লোকেই বুদ্ধের বন্দনা আছে। সুবর্ণচন্দ্রের পুত্র ত্রৈলোক্যচন্দ্রের সম্বন্ধে তাঁর পুত্রের তাম্রশাসনে বলা হয়েছে যে, তিনি চন্দ্রদ্বীপের অধিপতি হরিকেল রাজলক্ষ্মীর আধার ছিলেন। এ থেকে অনুমিত হয় যে, তিনি হরিকেল রাজ্যেরও রাজা ছিলেন অথবা ঐ রাজ্যের শাসনক্ষমতা তাঁর হাতেই ছিল।
ত্রৈলোক্যচন্দ্রের পৌত্রের তাম্রশাসন হতে জানা যায় যে, তিনি বঙ্গের রাজা ছিলেন। আবদুল মোমিন চৌধুরীর মতে, চন্দ্রবংশের চার রাজা, শচিন্দ্র থেকে গোবিন্দচন্দ্র পর্যন্ত, প্রায় ১১৫ বছর রাজত্ব করেছেন। রমেশচন্দ্র মজুমদারের মতে, এই সময়কাল ১২০ বছর। রাজেন্দ্র চোলের তিরুমলয় শাসন থেকে জানা যায় যে, গোবিন্দ্রচন্দ্র ১০২১ থেকে ১০২৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ১ম মহীপালের সমসাময়িক কালে রাজত্ব করেছেন।৬০৪ তিনি চন্দ্ররাজাদের রাজত্বকাল নির্ণয় করেছেন এভাবে:
লড়হচন্দ্র- ১০০০- ১০২০ খ্রিষ্টাব্দ
কল্যাণচন্দ্র ৯৭৫- ১০০০ খ্রিষ্টাব্দ
শ্রীচন্দ্র ৯৩০- ৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দ৬০৫
কল্যাণচন্দ্রের ঢাকা তাম্রলিপি থেকে জানা যায় যে, তিনি দ্বিতীয় গোপালকে সাহায্য করেছিলেন তাঁর ক্ষমতা পুনরুদ্ধারে। অনুরূপ অন্যান্য সূত্র থেকে প্রাপ্ত প্রমাণাদি থেকে জানা যায় যে, ১০ম শতাব্দীর প্রথম থেকে ১১শ শতাব্দীর মধ্যবর্তীকাল পর্যন্ত বাংলার পূর্ব-দক্ষিণ অঞ্চলে চন্দ্রবংশের রাজারা স্বাধীনভাবে পাঁচ পুরুষ যাবত রাজত্ব করেছেন। ১০১৭-১৮ খ্রিষ্টাব্দে বা তার অল্প পূর্বে গোবিন্দচন্দ্র, চোলসৈন্যদ্বারা পরাজিত হন। সুতরাং শ্রীচন্দ্র দশম শতকের প্রথমে এবং তাঁর পিতা ত্রৈলোক্যচন্দ্র নবম শতাব্দীর শেষ পাদে সিংহাসনে আরোহণ করেন এরূপ অনুমান করা যেতে পারে। রাজেন্দ্র চোলের ষষ্ঠ বর্ষে (১০১৮ খ্রিষ্টাব্দ) উৎকীর্ণ লিপিতে তাঁর সৈন্যের হাতে গোবিন্দচন্দ্রের পরাজয়ের উল্লেখ আছে। সুতরাং গোবিন্দচন্দ্রের রাজ্যশাসন কিছু পূর্বে আরম্ভ হয়েছিল এ কথা ঠিক নয়। এসব বিবেচনা করলে চন্দ্রবংশীয় শেষপাঁচজন রাজা আনুমানিক ৮৭৫ হতে ১০৩৫ পর্যন্ত মোটামুটি ১৬০ বছর রাজত্ব করেন, এরূপ বলা যেতে পারে।
চন্দ্রবংশীয় ও সমসাময়িক পালরাজগনের নাম ও আনুমানিক রাজ্যকাল আচার্য রমেশচন্দ্র মজুমদারের হিসেব অনুযায়ী নিন্মে লিপিবদ্ধ করা হলো:
ত্রৈলোক্যচন্দ্র ৮৭৫-৯০৫ খ্রিষ্টাব্দ
শ্রীচন্দ্র ৯০৫-৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দ
কল্যাণচন্দ্র ৯৫৫-৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দ
লডহচন্দ্র ৯৮৫-১০১০ খ্রিষ্টাব্দ
গোবিন্দচন্দ্র ১০১০-১০৩৫ খ্রিষ্টাব্দ
ত্রৈলোক্যচন্দ্র একজন স্বাধীন ও পরাক্রান্ত রাজা ছিলেন কিন্তু দীনেশচন্দ্র সরকারের মতে, ত্রৈলোক্যচন্দ্র একজন সামন্ত রাজা ছিলেন। কারণ, তাঁর পুত্র শ্রীচন্দ্রকে ‘পরমেশ্বর পরমভট্টারক মহারাজাধিরাজ’ বলা হয়েছে। আবদুল মোমিন চৌধুরী এ ভিন্নমত ব্যক্ত করে লিখেছেন যে, চন্দ্ররাজাদের তাম্রশাসনে কেবলমাত্র শাসনদাতাগণকেই এই শেষোক্ত উপাধি দেওয়া হয়েছে। অন্য সকল রাজাকে কেবল ‘মহারাজধিরাজ’ বলা হয়েছে। ৬০৭ চৌধুরীর মতই সঙ্গত বলে মনে হয়। গৌড়রাজের সাথে বিবাদে সাফল্য লাভ করে ত্রৈলোক্যচন্দ্র রাজা হিসেবে শক্তিমত্তার পরিচয় দেন। শ্রীহট্ট জেলার অন্তর্গত পশ্চিমভাগ গ্রামে প্রাপ্ত একটি তাম্রশাসন হতে জানা যায় যে, ত্রৈলোক্যচন্দ্রও সমতট (ত্রিপুরা ও নোয়াখালি জেলা) জয় করেছিলেন। এর রাজধানী ক্ষীরোদ নদীর তীরস্থিত দেবপর্বতে। ঐ সময় কাম্বোজ বাহিনী গৌড় অধিকার করে এবং তার ফলে বহু লোক গৌড় হতে পালিয়ে সমতটে আশ্রয় গ্রহণ করে। রাতবংশ ও ভবদেবের প্রসঙ্গে বলা হয়েছে যে, ক্ষীরোদ নদী পরিবেষ্টিত দেবপর্বত এই বংশের (এবং এই সময়ে সমতটের) রাজধানী ছিল। ত্রৈলোক্যচন্দ্র সম্ভবত এই বংশের অধিকৃত সমতট রাজ্য জয় করেন। এটিও অসম্ভব নয় যে, গৌড়ের কাম্বোজ রাজগণের সাথে বিবাদই তাঁর তাম্রশাসনে উল্লিখিত হয়েছে। পশ্চিমভাগ তাম্রশাসনের অষ্টম শ্লোকে ত্রৈলোক্যচন্দ্রের দিগি¦জয় বর্ণিত হয়েছে। তাঁর বিজয়ী সৈন্যেরা বঙ্গদেশের কৃষ্ণশিখরিণ গ্রামের বিখ্যাত দধিভোজন ও বিন্ধ্যপর্বতের শুরুঙ্গানদীর জল পান করে কাবেরী নদী ও মলয় পর্বত পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছিল। এর মূলে কোনো ঐতিহাসিক সত্য নেই বলে রমেশচন্দ্র মজুমদার ধারণা করেন। তবে এটি হতে অনুমান করা যায় যে ত্রৈলোক্যচন্দ্র একজন পরাক্রান্ত স্বাধীন রাজা ছিলেন। এই তাম্রশাসনে ত্রৈলোক্যচন্দ্রের রানী কাঞ্চিকার উল্লেখ আছে। অন্যান্য তাম্রশাসনে এই রানীর নাম শ্রীকাঞ্চনা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।৬০৮
ত্রৈলোক্যচন্দ্রের পরে তাঁর পুত্র শ্রীচন্দ্র রাজা হয়ে পরমেশ্বর পরমভট্টারক মহারাজাধিরাজ উপাধি গ্রহণ করেন। তাঁর রাজধানী ছিল বিক্রমপুর। তিনি অন্তত ৪৪ (মতান্তরে ৪৬) বৎসর রাজত্ব করেন। শ্রীচন্দ্রের রানীর নাম ছিল বসুমতী। এ পর্যন্ত প্রাপ্ত ছয়টি যথা- রামপাল, মদনপুর, ধুল্লা, বেদারপুর, ইদিলপুর ও সিলেটে প্রাপ্ত তাম্রশাসন থেকে শ্রীচন্দ্র সম্পর্কে অনেক তথ্য পাওয়া যায়। শ্রীচন্দ্রের রাজ্যের পঞ্চম সংবৎসরে শ্রীহট্ট তাম্রশাসন হতে জানা যায় যে, তিনি শ্রীহট্টপ্রদেশও জয় করেছিলেন। শ্রীহট্ট হতে অগ্রসর হয়ে শ্রীচন্দ্র কামরূপও জয় করেছিলেন।৬০৯ তাঁর বংশধরগণের তাম্রশাসনে উল্লিখিত হয়েছে যে, তিনি গৌড় ও প্রাগজ্যেতিষ (কামরূপ) রাজ্যের সাথে যুদ্ধে জয়লাভ করেছিলেন। শ্রীচন্দ্রের পুত্র কল্যাণচন্দ্রের ঢাকা তাম্রশাসন হতে জানা যায় যে, শ্রীচন্দ্র পৃথ্বীপাল ও গোবর্ম রাজাকে পরাজিত করেছিলেন এবং রত্নপালকে অনায়াসে পরাজিত করে পূর্ব প্রতিশ্রুতি পালনের জন্য তাঁর রানীকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন।
গোবর্ম সম্বন্ধে কিছু জানা যায় না। পৃথ্বী পাল পালবংশীয় কোনো সামন্তরাজ হতে পারেন।৬১০ রত্নপাল কামরূপের রাজার নাম। কোনো কোনো তাম্রশাসনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, শ্রীচন্দ্র রাজযোগে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। চন্দ্র বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ রাজা হিসেবে শ্রীচন্দ্র স্বীকৃত। চন্দ্রবংশীয় রাজাগণ যে গৌড়রাজদের সাথে যুদ্ধ করেছিলেন বলে তাঁদের তাম্রশাসনে উল্লেখ করা হয়েছে, তাঁরা নারায়ণপাল ও তাঁর পরবর্তী পালরাজগণ এরূপ অনুমান করা যেতে পারে। কারণ পালরাজগণ গৌড়ের অধিপতি ছিলেন এবং গৌড়েশ্বর বলে অভিহিত হতেন। পালরাজ দ্বিতীয় গোপালের রাজ্যারম্ভে যে কুমিল্লা জেলা তাঁর রাজ্যভুক্ত ছিল ঐ জেলার চন্দিমা (চান্দিনা) থানার মনকুক গ্রামে প্রাপ্ত একটি মূর্তির পাদপীঠে তাঁর প্রথম রাজ্যবর্ষের লিপি হতে তা প্রমাণিত হয়। সুতরাং তাঁর সঙ্গে শ্রীচন্দ্রের সংঘর্ষ হয়েছিল এরূপ অনুমান করা যেতে পারে, কারণ ঐ অঞ্চল শ্রীচন্দ্রের রাজ্যেরও অন্তর্ভুক্ত ছিল। দশম শতাব্দীতে কাম্বোজগণ গৌড়ে, অর্থাৎ উত্তর ও পশ্চিমবঙ্গে রাজত্ব করতেন এবং তাঁদের রাজারাও গৌড়পতি বলে অভিহিত হতেন। কাম্বোজরাজকেও গৌড়রাজ বলা হয়ে থাকতে পারে। এটি অনুমান করলে বলতে হবে যে, গোপালকে শ্রীচন্দ্র সিংহাসনে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছিলেন তিনি সম্ভবত কাম্বোজগণ কর্তৃক গৌড়রাজ্য হতে অথবা কাম্বোজবংশীয় রাজগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে সাফল্য লাভ করেছিলেন তা নিশ্চিত বলা যায় না। দ্বিতীয় গোপাল যে অন্তত কিছুদিন উত্তরবঙ্গে রাজত্ব করেছিলেন জাজিলপুরে প্রাপ্ত তাঁর উৎকীর্ণ তাম্রশাসনই তার প্রমাণ। কিন্তু তিনি রাজ্যভ্রষ্ট হয়েছিলেন এবং শ্রীচন্দ্র তাঁকে পুনরায় সিংহাসনে প্রতিষ্ঠা করেন। খুব সম্ভব কাম্বোজরাজকে পরাজিত করেই তিনি দ্বিতীয় গোপালকে হৃতরাজ্যে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। সুতরাং এক্ষেত্রে চন্দ্ররাজগণের শত্র“ কাম্বোজের গৌড়রাজ, পালরাজ নয়, এই অনুমানই আচার্য রমেশচন্দ্র মজুমদার অধিক যুক্তিসঙ্গত বলে মনে করেছেন। মোটের উপর শ্রীচন্দ্র যে বাংলায় প্রাধান্য স্থাপন করেছিলেন তা ধরে নেওয়া যেতে পারে। শ্রীচন্দ্রের শ্রীহট্ট তাম্রশাসনে ব্যক্ত হয়েছে যে, তিনি যমন (যবন) শক, হূণ ও উৎকল দেশের যুদ্ধে তাঁর বীরত্ব প্রদর্শন করে রণদেবতাগণের সন্তুষ্টি অর্জন করেছিলেন৬১১ এটি কবির উক্তি বলে গ্রহণ করলেও শ্রীচন্দ্র যে একজন পরাক্রান্ত রাজা ছিলেন সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। শ্রীচন্দ্রের রামপাল, মদনপুর, ধুল্লা এবং সিলেটের ভূমিদান পুণ্ড্র অর্থাৎ পুণ্ড্রভুক্তির অন্তর্গত ছিল। এর থেকে পণ্ডিতব্যক্তিরা ধারণা করেন যে, উত্তরবঙ্গও হয়তো চন্দ্র সাম্রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। সবগুলি তাম্রশাসনই বিক্রমপুরে জয়স্কন্ধাবার হতে প্রদত্ত।
এর একটিতে সতট-পদ্মাবতী বিষয়ের উল্লেখ আছে। খ্রিষ্টীয় দশম শতাব্দীতেও যে পদ্মানদীর অস্তিত্ব বজায় ছিল এটি তার একটি বিশিষ্ট প্রমাণ। শ্রীচন্দ্রের মৃত্যুর পর তাঁর রানী বসুমতীর৬১২ গর্ভজাত পুত্র কল্যাণচন্দ্র রাজা হন এবং অন্তত ২৪ বছর রাজত্ব করেন। তিনি ব্রহ্মপুত্র তীরের ম্লেচ্ছ এবং গৌড়দিগকে পরাজিত করেছিলেন।৬১৩ তিনি কামরূপেও যুদ্ধ করেছিলেন। চন্দ্র-তাম্রশাসন থেকে কল্যাণচন্দ্রের বিজয় সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানা যায় না। তাঁকে দানে বলীর সমকক্ষ, সত্যবাদিতায় যুধিষ্ঠির এবং বীরত্বে অর্জুনের মতো বলা হয়েছে।৬১৪ এতে সুনির্দিষ্ট রাজকীয় ঘটনার কথা না থাকলেও বোঝা যায় যে, রাষ্ট্র ক্রমেই উন্নতি করে শক্তিশালী হচ্ছিল। কল্যাণচন্দ্রের পরে তাঁর পুত্র লডহচন্দ্র অন্তত ১৮ বছর রাজত্ব করেন। লডহচন্দ্রের মাতার নাম ছিল কল্যাণদেবী। এ যাবত প্রাপ্ত সমস্ত তাম্রশাসনে লডহচন্দ্রের বিভিন্ন ক্রিয়াকাণ্ড ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের উল্লেখ থাকলেও তাঁর কোনো সামরিক অভিযানের কথা বলা হয় নি। তিনি ধার্মিক ও পণ্ডিতব্যক্তি ছিলেন। তাঁর ছিল কবিত্বশক্তি এবং তিনি ধর্মীয় স্থাপনাসমূহের সংস্কারক ছিলেন। তিনি ধর্মোপলক্ষে বারাণসী দর্শনে গিয়েছিলেন। তিনি শুধু বৌদ্ধধর্মের উন্নতির জন্য ভূমিদান করেন নি, ব্রাহ্মণ্য ধর্মের জন্যও ভূমিদান করেছেন এবং সকল ধর্মের প্রতিই তাঁর শ্রদ্ধাবোধ ছিল। লডহচন্দ্রের পর তাঁর পুত্র গোবিন্দচন্দ্র রাজা হন। সৌভাগ্যদেবী ছিলেন গোবিন্দচন্দ্রের মাতা।
চোলরাজের তাম্রশাসনে গোবিন্দচন্দ্রের রাজ্য ‘অবিরাম বর্ষা বারিসিক্ত বঙ্গাল দেশ’ বলে অভিহিত হয়েছে। বঙ্গালদেশ বললে, সাধারণত পূর্ব ও দক্ষিণ বঙ্গ বুঝায়। এখানেই যে চন্দ্রবংশীয়েরা রাজত্ব করতেন তা পূর্বেই উল্লিখিত হয়েছে। চোল রাজার তাম্রশাসনে বলা হয়েছে যে, চোল সেনাপতির সঙ্গে যুদ্ধে গোবিন্দচন্দ্র পরাস্ত হন এবং হস্তীপৃষ্ঠ হতে অবতরণ করে পলায়ন করেন। পরে তা পালবংশীয় রাজা মহীপালের প্রসঙ্গে উল্লিখিত হবে। গোবিন্দচন্দ্র অন্তত ২৩ বছর রাজত্ব করেন। গোবিন্দচন্দ্রের পরে এই রাজবংশের সম্বন্ধে সঠিক কোনো বিবরণ জানা যায় না।ভেরাঘাটে প্রাপ্ত অহ্মণদেবীর এবং রেওয়াতে প্রাপ্ত কলচুরিরাজ কর্ণের লিপিতে তাঁর দ্বারা বঙ্গদেশের রাজার পরাজয়ের উল্লেখ আছে। প্রথমোক্ত লিপিতে বলা হয়েছে যে, কর্ণের ভয়ে বঙ্গ ও কলিঙ্গের রাজারা সর্বদা কম্পমান থাকতেন।
মিরাশি দ্বিতীয় লিপির ২৩ সংখ্যক শ্লোকের যে ব্যাখ্যা করেছেন তা হতে প্রমাণিত হয় যে, কর্ণ দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গের রাজাকে যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত করেন। এই রাজা সম্ভবত গোবিন্দচন্দ্র অথবা তাঁর পরবর্তী রাজা। এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলে বলতে হয়ে যে কর্ণের আক্রমণের ফলেই চন্দ্রবংশ ধ্বংস হয় এবং পূর্ববঙ্গে বর্মরাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
নারায়ণপালের রাজত্বে (৮৫৪-৯০৮ খ্রিষ্টাব্দে) যে পালসাম্রাজ্যের চরম দুরাবস্থা ঘটেছিল তা পূর্বেই উলিখিত হয়েছে। সুতরাং পূর্ববঙ্গে চন্দ্রবংশের অভ্যুদয় যে পালসাম্রাজ্যের পতনের ফল অথবা কারণ তা সহজেই অনুমান করা যেতে পারে।পালসম্রাট মহীপাল পালরাজ্যের লুপ্ত গৌরব পুনরায় উদ্ধার করেন এবং পূর্ববঙ্গে তাঁর অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন।
মহীপাল লডহচন্দ্র ও গোবিন্দচন্দ্রের সমসাময়িক এবং এঁদের কোনো বিজয়কাহিনী তাঁদের নিজেদের তাম্রশাসনেও উল্লিখিত হয় নি। সুতরাং মহীপালই যে চন্দ্রবংশের রাজাদের নিকট হতে বঙ্গাল রাজ্য বা তার অংশ পুনরায় পালসাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন এরূপ মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে। মহীপালের তাম্রশাসনে ব্যক্ত হয়েছে যে, তিনি ‘অনধিকারী কর্তৃক বিলুপ্ত পিতৃরাজ্যের উদ্ধার সাধন করেছিলেন।’ রাষ্ট্রকূটরাজ তৃতীয় গোবিন্দের তাম্রশাসনে পালসম্রাট ধর্মপালকে বঙ্গালরাজ বলে অভিহিত করা হয়েছে। লামা তারনাথের মতেও পালবংশের প্রতিষ্ঠাতা গোপাল বঙ্গাল দেশেই প্রথম রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। অতএব বঙ্গাল পালগণের পিতৃরাজ্য ছিল এরূপ অনুমান করা যেতে পারে। সুতরাং মহীপাল যে অনধিকারী চন্দ্রবংশ দ্বারা বিলুপ্ত পিতৃরাজ্য বঙ্গাল (বা তার অধিকাংশ) পুনরায় অধিকার করেছিলেন সম্ভবত মহীপালের তাম্রশাসনের উল্লেখ এটিই ইঙ্গিত করেছে। মহীপাল সম্ভবত চন্দ্রবংশ একেবারে ধ্বংস করতে পারেন নি। অবশ্য কেউ কেউ অনুমান করেন যে, বর্মবংশীয় রাজগণই চন্দ্রবংশীয় রাজগণকে পরাজিত করে তাঁদের রাজ্য অধিকার করেন। পালসম্রাট নারায়ণপালের রাজত্বের শেষভাগে ত্রৈলোক্যচন্দ্র স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। শ্রীচন্দ্র নারায়ণপালের পৌত্র গোপালকে স্বীয় রাজ্যে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। সুতরাং নারায়ণপালের রাজত্বের শেষভাগ হতেই পূর্ব ও দক্ষিণ বঙ্গে পালগণের পরিবর্তে চন্দ্রবংশীয়রা রাজত্ব করেন। অতএব অন্তত কিছুকাল পর্যন্ত পালরাজ গোপাল চন্দ্রবংশের প্রাধান্য স্বীকার করেছিলেন এরূপ মনে করা যেতে পারে।
বাংলার এই শক্তিশালী চন্দ্র রাজবংশের কথা কিছুদিন পূর্বেও বিশেষভাবে জানা ছিল না। সম্প্রতি বাংলাদেশে কয়েকটি তাম্রশাসন আবিষ্কৃত হওয়ায়, বাংলার ইতিহাসের একটি বিস্মৃত অধ্যায় পুনরায় আমরা জানতে পেরেছি।লামা তারনাথের মতে, পালরাজগণের পূর্বে বঙ্গাল দেশে এক চন্দ্রবংশ রাজত্ব করত। কিন্তু এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় নি। তবে পালবংশের পূর্বে চন্দ্র উপাধিধারী প্রায় ২০ জন রাজা যে দক্ষিণ বঙ্গের সনিহিত আরাকানে রাজত্ব করতেন মুদ্রা ও তাম্রশাসন হতে তা নিশ্চিত জানা যায়।৬১৫ বিশেষ করে ৭৮৮ থেকে ৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত আরাকানের চন্দ্র বংশের রাজত্বের ইতিহাস সম্পর্কে আরাকানে স্থানীয়ভাবে প্রচলিত কাহিনী ও প্রত্নতত্ত্ব থেকে অনেক খবর পাওয়া যায়।৬১৬
ময়নামতিতে প্রাপ্ত মুদ্রা ও মাটির মূর্তির সঙ্গে বার্মার নারী ও পুরুষের মূর্তির অনেক সাদৃশ্য রয়েছে। নবম ও দশম শতাব্দীতে আরাকান বাসীদের চট্টগ্রামে অনুপ্রবেশ করে মেঘনার তীর পর্যন্ত পৌঁছার খবর পাওয়া যায়। আর পরবর্তী দুই শতাব্দীতে বর্তমান কুমিল্লা জেলা পর্যন্ত তাদের সম্পর্ক গড়ে উঠে।
ময়নামতি তাম্রলিপিতে আরাকানবাসীদের প্রভাব ও প্রতিপত্তির ইঙ্গিত পাওয়া যায়।৬১৭ এব থেকে অনুমান করা যায় যে, পূর্ব-দক্ষিণ বাংলার চন্দ্রবংশের রাজন্যবর্গের সঙ্গে আরাকানের চন্দ্রবংশের হয়তো ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। তাছাড়া, সিলেটে ৮টি, ময়নামতিতে ২০০টি এবং রাজশাহীর পাহাড়পুরে কয়েকটি মুদ্রা পাওয়া গেছে। সেগুলি পূর্ব-দক্ষিণ বাংলার চন্দ্রবংশের বলে দানী প্রমাণ করেছেন।৬১৮ এগুলির আকার-আকৃতিও আরাকানের চন্দ্রবংশীয় রাজাদের মুদ্রার অনুরূপ। এজন্যই আবদুল মোমিন চৌধুরী এমন ধারণা করেছেন যে, হয়তো আরাকানের চন্দ্রবংশীয় কোনো সদস্য কুমিল্লার লালমাই এলাকার প্রধান হিসেবে বসবাস করতে আরম্ভ করেন। পূর্ণচন্দ্র হয়তো সেই পরিবারের পরবর্তী বংশধর ছিলেন। তারই দৌহিত্র ত্রৈলোক্যচন্দ্র, হরিকেলসহ পূর্ব-দক্ষিণ বাংলায় রাজত্ব কায়েম করেন। অবশ্য এসবই অনুমান মাত্র। খুব সম্ভবত বাংলাদেশের বরিশাল জেলাস্থিত চন্দ্রদ্বীপ প্রাচীন বিস্মৃত কোনো চন্দ্রবংশের স্মৃতি বহন করছে।
উপরের আলোচনা হতে সহজেই প্রতীয়মান হয় যে, দ্বিতীয় গোপাল ও দ্বিতীয় বিগ্রহপালের রাজত্বকালে পালরাজ্য তিনটি প্রধান ভাগে বিভক্ত হয়েছিল। পূর্ব ও দক্ষিণবঙ্গ অর্থাৎ বঙ্গ অথবা বঙ্গাল দেশে চন্দ্রবংশীয় রাজ্য, পশ্চিম ও উত্তরবঙ্গ অর্থাৎ রাঢ়া বরেন্দ্র অথবা গৌড়ে কাম্বোজবংশীয় রাজ্য এবং বিহার অর্থাৎ অঙ্গ ও মগধে পালবংশীয় রাজ্য। আনুমানিক ৮৭৫ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১০৩৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় এক বৌদ্ধ রাজবংশ সগৌরবে স্বাধীনভাবে রাজত্ব করেছেন। তাছাড়া পশ্চিমবঙ্গে আরও দুই একটি ক্ষুদ্র স্বাধীন রাজ্য ছিল। এই সময় পালরাজগণের পিতৃভূমি বিশাল বাংলাদেশে তাঁদের কোনো প্রাধান্য ছিল বলে মনে হয় না। তবে রাজ্যপাল ও দ্বিতীয় গোপাল যে কিছুকালের জন্য উত্তর ও পূর্ববঙ্গের কোনো কোনো স্থান অধিকার করতে সমর্থ হয়েছিলেন শিলালিপি ও তাম্রশাসন হতে তা প্রমাণিত হয়। চন্দেল্ল ও কলচুরি রাজগণের প্রশস্তিতে যে বঙ্গ, বঙ্গাল, গৌড়, রাঢ়া, অঙ্গ প্রভৃতি রাজ্যজয়ের উল্লেখ আছে, তাতে খুব সম্ভবত এই সমুদয় স্বাধীন খণ্ডরাজ্যের কথাই উল্লেখ করা হয়েছে।
৫৯৬ F.A. Khan: Mainamati (A Preliminary Report).
৫৯৭ ভারতবর্ষ: ১৩৪৮- বাংলা সনের জৈষ্ঠ সংখ্যা।
৫৯৮ একই সংখ্যা। (ভারতবর্ষ: ১৩৪৮- বাংলা সনের জৈষ্ঠ সংখ্যা।)
৫৯৯ F.A. Khan: Mainamati, p. 5.
৬০০. A.H. Dani: Asian Archaeological Conference, Delhi, 1960.
৬০১. A.H. Dani: Bangla Academy Patrika, vol. IV.
৬০২. N.K. Bhattasali: Epigraphia Indica, vol. XVII.
৬০৩. Betka Vasudeva Image Incriptions: Indian Culture, vol. VII.
৬০৪. Abdul Mumin Chowdhury; Dynastic History of Bengal- p. 136.
৬০৫.Paikpara Vasudeva Image Inscriptions: vol. IX.
৬০৬ রমেশচন্দ্র মজুমদার- বাংলাদেশের ইতিহাস (প্রাচীন যুগ)।
৬০৭ Abdul Momin Chowdhury: Dynastic History of Bengal.
৬০৮ N.K. Bhattasali: Commemoration Volume, p. 178.
৬০৯ হাসান আহমদ দানী: বাংলা একাডেমি পত্রিকা, খন্ড- ৪।
৬১০ History of Ancient Bengal, by R.C. Mazumder P. 180.
৬১১ A.H. Dani: Sylhet Copper- plate of Sricandra.
৬১২ ঢাকা তাম্রশাসনের শ্লোক নং- ১০-১৩।
৬১৩ F.A. Khan: Mainamati, 1969.
৬১৪ রাজা গোবিন্দ চন্দ্রের ময়নামতি শাসন: শ্লোক নং- ৬।
৬১৫ রমেশচন্দ্র মজুমদার: বাংলাদেশের ইতিহাস (প্রাচীন যুগ)।
৬১৬ A.P. Phayre: History of Burma.
আগামী পর্বেঃ পাল সাম্রাজ্যের পতন, বর্মণ রাজবংশ, সেন রাজ বংশের আগমন।

শেয়ার করুন