আদি বাংলার ইতিহাস
(প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্ব ৯০
পাল সাম্রাজ্যের পতন (ক্রমশ)
কুমারপাল (১১৩০ খ্রিষ্টাব্দ)
রামচরিত থেকে জানা যায় যে, বৃদ্ধ বয়সে রামপাল দেশের শাসনভার তাঁর পুত্র বা পুত্রদের উপর ছেড়ে দিয়ে আরও অনেক বছর শান্তিতে বসবাস করেছেন।৫৮৪ রামপালের পরে তাঁর পুত্র কুমারপাল রাজা হন।৫৮৫ রামপালের আরও দুই পুত্র রাজ্যপাল ও ভিত্যপালের কথা জানা যায়, কিন্তু তাদের কোনো কার্যকলাপ সম্পর্কে রামচরিতে কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায় না। রামচরিতের একটিমাত্র শ্লোকে বর্ণিত আছে যে, কুমারপাল তাঁর শত্রুদের আনন্দ-বিনোদনকে সংক্ষিপ্ত করে দেন এবং তাঁর সার্বভৌমত্ব পালন করে স্বর্গে গমন করেন। পণ্ডিতগণের ধারণা কুমারপাল- ৪/৫ বছরে রাজত্ব করেছিলেন।
তৃতীয় গোপাল (১১৪০ খ্রিষ্টাব্দ)
কুমারপালের পরে তার পুত্র তৃতীয় গোপাল পিতৃসিংহাসনের অধিকারী হন। রামচরিতের বর্ণনা অনুসারে তিনি শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধে মৃত্যুবরণ করেন।৫৮৬ সন্ধ্যাকরন নন্দী কুমারপাল ও তৃতীয় গোপাল সম্পর্কে তাঁর রামচরিতে শুধুমাত্র একটি শ্লোক বরাদ্দ করেছেন। অবশ্য সন্ধ্যাকরন ন্দীর প্রধান উদ্দেশ্য রামপালের বরেন্দ্র পুনরুদ্ধার বর্ণনা করা। বংশতালিকা বর্ণনা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না। ঐতিহাসিকদের ধারণা তৃতীয় গোপাল অল্পবয়সেই রাজ্যভার গ্রহণ করেন। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই তাঁকে হত্যা করে তার পিতৃব্য মদনপাল রাজা হন।৫৮৭
মদনপাল (১১৪৪ খ্রিষ্টাব্দ)
মদনপাল সম্ভবত ৮ বছরের অধিককাল রাজত্ব করেছিলেন। ‘মনহালি তাম্রলিপি’ তাঁর রাজত্বের ৮ম বছরে রচিত হয়েছিল। এ সময়ে গৌহদেব রাজা গোবিন্দচন্দ্র (১১১৪-৫৫ খ্রিষ্টাব্দ) এবং পূর্ব চালুক্য রাজা বিহার আক্রমণ করেন। ক্রমে বিহার তাঁদের অধিকারে চলে যায় এবং উত্তর বাংলা সেন রাজারা দখল করে নেয়।
পূর্ব ও দক্ষিণ বঙ্গ
ভদ্রবংশ
ষষ্ঠ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় একটি স্বাধীন রাজ্যের অস্তিত্ব পাওয়া যায়, যার কর্ণধার হিসেবে ৬টি তাম্রশাসনে গোপচন্দ্র ধর্মাদিত্য ও সমাচারদেবের নাম পাওয়া যায়। এই দক্ষিণ-পূর্ব বাংলা অঞ্চল বিভিন্ন নামে পরিচিতি লাভ করেছে। আদিতে পরিচয় পাওয়া যায় বঙ্গ নামে, আর এই অঞ্চলের কিছু অংশ নিয়ে পরিচয় ছিল সমতট নামে, আবার কখনও হরিকেল নামে। চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙয়ের বিবরণ থেকে জানা যায় যে, সমতটে ভদ্র-নামধারী এক রাজ পরিবার ছিল। “নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত আচার্য শীলভদ্র এই রাজপরিবারেরই সন্তান ছিলেন”; জানা যায়, পাল বংশের পূর্বে এই পরিবার সমতটে রাজত্ব করেছে। খালিমপুর তাম্রলিপি থেকে জানা যায় যে, মহারাজা ধর্মপালের মাতা দেদ্দাদেবী এক ‘ভদ্র নামক রাজার কন্যা ছিলেন। এ প্রসঙ্গে ভাস্কর বর্মণের নিদানপুর তাম্রশাসন থেকে জানা যায় যে, জৈষ্ঠভদ্র নামে একজন সামন্তরাজা ছিলেন। ৫৮৮ এই সমস্ত সূত্রের ভিত্তিতে পণ্ডিতগণ এই সিদ্ধান্তে এসেছেন যে, কুমিল্লা অঞ্চলে ৬ষ্ঠ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে ৭ম শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত ভদ্র নামের কতিপয় সামন্তরাজারা রাজত্ব করেছেন। তবে তাঁরা কার সামন্ত ছিলেন জানা যায় না।
সপ্তম শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ থেকে এ অঞ্চলে খড়গ পরিবার রাজত্ব করেছেন বলে জানা যায়। আশ্রাফপুরের৫৮৯ দু’টি তাম্রলিপি থেকে এবং দেউলবাড়ীর৫৯০ (কুমিল্লা শহর থেকে ১৪ মাইল দক্ষিণে) এক সর্বাণী মূর্তির পাদপিঠে লিখিত বর্ণনা থেকে জানা যায় খড়গ বংশীয় তিন পুরুষের রাজা খড়গদ্যামা, জাতখড়গ ও দেবখড়গের নাম। এই সর্বাণী (দুর্গা) মূর্তির প্রতিষ্ঠাত্রী ছিলেন রানী প্রভাবতী ও পুত্র রাজাবাজ বা রজাবাজভট, এই পরিবারের শেষ রাজা। এই লিপিগুলি রাজধানী কামতাভাসক থেকে লেখা হয়েছিল। কামতা বর্তমানের কুমিল্লা জেলার বাদকাসতা বলে নির্ণয় করা হয়েছে। দেববংশ দেববংশের পরিচয় ইতিহাসে অজ্ঞাতই ছিল। সাম্প্রতিককালে প্রাপ্ত তিনটি তাম্রশাসন ও কতকগুলি মুদ্রা হতে দেব উপাধিধারী রাজবংশের পরিচয় পাওয়া যায়।৫৯১ দুটি তাম্রশাসন ও মুদ্রাগুলি কুমিল্লার নিকটবর্তী লালমাই ময়নামতি পাহাড়ে শালবন বিহারে প্রাপ্ত এবং তৃতীয় তাম্রশাসনটি এখন কলিকাতা এশিয়াটিক সোসাইটিতে রক্ষিত। ডি.সি. সরকার ১৯৫১ সালে এগুলি প্রথম প্রকাশ করেন। ময়নামতির একটি শাসনের পাঠ খুবই অস্পষ্ট, কিন্তু এর অক্ষর এবং ধর্মচক্র ও মৃগচিহ্নিত মুদ্রা দ্বিতীয়টির অনুরূপ। এই দ্বিতীয় তাম্রশাসনটির সম্মুখদিকে রাজা শ্রীআনন্দদেবের দানপত্র ও পশ্চাৎদিকে তাঁর পুত্র ও উত্তরাধিকারী রাজা ভবদেবের সম্মতিসূচক জ্ঞাপন। তৃতীয় তাম্রশাসনটি রাজা ভবদেবের দানপত্র এবং দেবপর্বতে অবস্থিত জয়স্কন্ধাবার হতে প্রদত্ত এই তাম্রশাসনগুলি নিন্মলিখিত রাজাগণের নাম পাওয়া যায়-
শ্রীশান্তিদেব
শ্রীবীরদেব
শ্রীআনন্দদেব
শ্রীভবদেব
এদের প্রত্যেকেরই সম্রাটের পদবি পরমসৌগত, পরমভট্টারক পরমেশ্বর এবং মহারাজাধিরাজ উপাধি হতে অনুমান করা যায় যে, এরা স্বাধীন রাজা ছিলেন। তাম্রশাসনগুলিতে যে সমস্ত স্থানের নাম আছে তা হতে বুঝা যায় যে, এই বংশ সমতটে রাজত্ব করতেন।পরমেশ্বর পরমভট্টারক মহারাজধিরাজ ভবদেব দেবপর্বত জয়স্কন্ধাবার হতে এই শাসনটি দান করেছিলেন। শ্রীধারণ রাতের কৈলান তাম্রলিপিতে৫৯২ এবং শ্রীচন্দ্রের শ্রীহস্র তাম্রলিপিতে৫৯৩ দেব পর্বতের উল্লেখ আছে। দেবপর্বত কুমিল্লার পশ্চিমে গোমতী নদীর একটি শাখা নদী ক্ষীরোদার তীরে অবস্থিত ছিল। ক্ষীরোদার বর্তমান নাম খিরা অথবা খিরনাই এবং এর শুষ্ক খাত এখনও বিদ্যমান। এই গোমতী নদী ময়নামতি পাহাড়ের পূর্ব দিক হতে এসে এর দক্ষিণ দিক ঘুরে পশ্চিম দিক হতে প্রবাহিত আর একটি শাখানদীর সাথে মিলিত হয়েছে। নদীবেষ্টিত ময়নামতি পাহাড়ের দক্ষিণেই পার্বত্য দুর্গ দেবপর্বত অবস্থিত ছিল। বর্তমান কুমিল্লা জেলা শহরের পশ্চিম পাশে অবস্থিত। এটি সমতটের রাজা সাতবংশীয় জীবনধারণ রাত ও তাঁর পুত্র শ্রীধারণ রাতের রাজধানী ছিল এবং সম্ভবত এটিই দেববংশের রাজধানী ছিল। এই শক্তিশালী দেব রাজবংশ বৌদ্ধধর্মাবলম্বী ছিলেন, কিন্তু এর সম্বন্ধে আর কোনো বিবরণ জানা যায় না। সম্ভবত গোপালের পূর্বে মাৎস্যন্যায়ের কালে অথবা দেবপালের পরবর্তী দুর্বল পালরাজগণের সময়েই দেববংশীয় রাজগণ পূর্ববঙ্গে একটি স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ময়নামতি পাহাড়ের পাদদেশেই কৌটিল্য মুড়ায় এক বিশাল দীঘি ও অনেকগুলি ধর্মীয় স্থাপনার অবশেষ রয়েছে। স্থানীয়ভাবে এগুলি আনন্দ রাজার প্রাসাদ নামে পরিচিত। আপাতদৃষ্টিতে এগুলিকে দেব রাজবংশের তৃতীয় রাজার নির্মাণ বলেই মনে হয়। দেব রাজা ভবদেবের তাম্রলিপিতে কোনো তারিখের উল্লেখ নেই। এফ.এ. খান এটাকে খড়গ রাজাদের পরপরই বলে ধারণা করেন। তাঁর অনুমান দেব রাজবংশের শাসনকাল সম্ভবত ৭ম শতাব্দীর শেষ থেকে ৮ম শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত। তবে দেব রাজাদের সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান অত্যন্ত সীমিত। এ পর্যন্ত প্রাপ্ত তিনটি তাম্রলিপি ও কয়েকটি মুদ্রা ব্যতীত তাদের সম্পর্কে আমাদের কাছে অন্য কোনো তথ্যের সূত্র নেই।
লিপির বর্ণনা ও চৈনিক বিবরণ থেকে অনুমান করা হয় যে, খড়গবংশ ৭ম শতাব্দীর শেষদিকে এখানে রাজত্ব করেছিলেন।৫৯৪ কুমিল্লা জেলার লোকনাথ তাম্রলিপি থেকে আরও একজন সামন্তরাজার কথা জানা যায় যিনি খড়গ রাজাদের অধীন ছিলেন।৫৯৫ অনুরূপভাবে কৈলান ও লোকনাথ তাম্রলিপি থেকে আমরা রাত পরিবার নামে আর একটি সামন্ত শাসক রাজপরিবারের পরিচয় পাই। তারা দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার কুমিল্লা-নোয়াখালি জেলায় প্রায় স্বাধীনভাবে রাজত্ব করতেন। কৈলান লিপির শ্রীধারণ রাত ছিলেন সামন্তরাজা জীবনধারন রাতের পুত্র। পিতা-পুত্রের কেউই কোনো রাজকীয় উপাধি ধারণ করেন নি। কিন্তু তাঁদের অধিরাজ কে ছিলেন তা জানা যায় না। তবে অনুমান করা হয় তাঁরা সম্ভবত খড়গ রাজবংশের অধীন ছিলেন।
——————————————————————————–
৫৮৪ Ramacarita- Verse IV/1, Verendra Research Soceity Edition.
৫৮৫ Ramacarita- Verse IV/1, Verendra Research Soceity Edition.
৫৮৬ Ramacarita- Verse IV/12, Verendra Research Soceity Edition.
৫৮৭ R.D. Banarje; Memories of Asiatic Society of Bengal.
৫৮৮ Epigraphia Indica, vol. XII, 65.
৫৮৯ Memories of Asiatic Society of Bengal, vol. I, No. 6, pp. 85-92.
৫৯০ IBID, vol. XVII, pp. 357-59.
৫৯১ F.A. Khan: Mainamati (A Preliminary Report).
৫৯২ Indian Historical Quarterly: vol. XXIII, p. 221.
৫৯৩ F.A. Khan: Mainamati (A Preliminary Report).
৫৯৪ Journal of Asiatic Society of Bengal (NS): XIX, pp. 376-79.
৫৯৫ R. G. Basak: The History of North-Eastern India, p. 195.
আগামী পর্বেঃ হরিকেল রাজ্য, পাল সাম্রাজ্যের পতন (ক্রমশ)
(প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্ব ৯০
পাল সাম্রাজ্যের পতন (ক্রমশ)
কুমারপাল (১১৩০ খ্রিষ্টাব্দ)
রামচরিত থেকে জানা যায় যে, বৃদ্ধ বয়সে রামপাল দেশের শাসনভার তাঁর পুত্র বা পুত্রদের উপর ছেড়ে দিয়ে আরও অনেক বছর শান্তিতে বসবাস করেছেন।৫৮৪ রামপালের পরে তাঁর পুত্র কুমারপাল রাজা হন।৫৮৫ রামপালের আরও দুই পুত্র রাজ্যপাল ও ভিত্যপালের কথা জানা যায়, কিন্তু তাদের কোনো কার্যকলাপ সম্পর্কে রামচরিতে কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায় না। রামচরিতের একটিমাত্র শ্লোকে বর্ণিত আছে যে, কুমারপাল তাঁর শত্রুদের আনন্দ-বিনোদনকে সংক্ষিপ্ত করে দেন এবং তাঁর সার্বভৌমত্ব পালন করে স্বর্গে গমন করেন। পণ্ডিতগণের ধারণা কুমারপাল- ৪/৫ বছরে রাজত্ব করেছিলেন।
তৃতীয় গোপাল (১১৪০ খ্রিষ্টাব্দ)
কুমারপালের পরে তার পুত্র তৃতীয় গোপাল পিতৃসিংহাসনের অধিকারী হন। রামচরিতের বর্ণনা অনুসারে তিনি শত্রুর সঙ্গে যুদ্ধে মৃত্যুবরণ করেন।৫৮৬ সন্ধ্যাকরন নন্দী কুমারপাল ও তৃতীয় গোপাল সম্পর্কে তাঁর রামচরিতে শুধুমাত্র একটি শ্লোক বরাদ্দ করেছেন। অবশ্য সন্ধ্যাকরন ন্দীর প্রধান উদ্দেশ্য রামপালের বরেন্দ্র পুনরুদ্ধার বর্ণনা করা। বংশতালিকা বর্ণনা তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না। ঐতিহাসিকদের ধারণা তৃতীয় গোপাল অল্পবয়সেই রাজ্যভার গ্রহণ করেন। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই তাঁকে হত্যা করে তার পিতৃব্য মদনপাল রাজা হন।৫৮৭
মদনপাল (১১৪৪ খ্রিষ্টাব্দ)
মদনপাল সম্ভবত ৮ বছরের অধিককাল রাজত্ব করেছিলেন। ‘মনহালি তাম্রলিপি’ তাঁর রাজত্বের ৮ম বছরে রচিত হয়েছিল। এ সময়ে গৌহদেব রাজা গোবিন্দচন্দ্র (১১১৪-৫৫ খ্রিষ্টাব্দ) এবং পূর্ব চালুক্য রাজা বিহার আক্রমণ করেন। ক্রমে বিহার তাঁদের অধিকারে চলে যায় এবং উত্তর বাংলা সেন রাজারা দখল করে নেয়।
পূর্ব ও দক্ষিণ বঙ্গ
ভদ্রবংশ
ষষ্ঠ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় একটি স্বাধীন রাজ্যের অস্তিত্ব পাওয়া যায়, যার কর্ণধার হিসেবে ৬টি তাম্রশাসনে গোপচন্দ্র ধর্মাদিত্য ও সমাচারদেবের নাম পাওয়া যায়। এই দক্ষিণ-পূর্ব বাংলা অঞ্চল বিভিন্ন নামে পরিচিতি লাভ করেছে। আদিতে পরিচয় পাওয়া যায় বঙ্গ নামে, আর এই অঞ্চলের কিছু অংশ নিয়ে পরিচয় ছিল সমতট নামে, আবার কখনও হরিকেল নামে। চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙয়ের বিবরণ থেকে জানা যায় যে, সমতটে ভদ্র-নামধারী এক রাজ পরিবার ছিল। “নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত আচার্য শীলভদ্র এই রাজপরিবারেরই সন্তান ছিলেন”; জানা যায়, পাল বংশের পূর্বে এই পরিবার সমতটে রাজত্ব করেছে। খালিমপুর তাম্রলিপি থেকে জানা যায় যে, মহারাজা ধর্মপালের মাতা দেদ্দাদেবী এক ‘ভদ্র নামক রাজার কন্যা ছিলেন। এ প্রসঙ্গে ভাস্কর বর্মণের নিদানপুর তাম্রশাসন থেকে জানা যায় যে, জৈষ্ঠভদ্র নামে একজন সামন্তরাজা ছিলেন। ৫৮৮ এই সমস্ত সূত্রের ভিত্তিতে পণ্ডিতগণ এই সিদ্ধান্তে এসেছেন যে, কুমিল্লা অঞ্চলে ৬ষ্ঠ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে ৭ম শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত ভদ্র নামের কতিপয় সামন্তরাজারা রাজত্ব করেছেন। তবে তাঁরা কার সামন্ত ছিলেন জানা যায় না।
সপ্তম শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ থেকে এ অঞ্চলে খড়গ পরিবার রাজত্ব করেছেন বলে জানা যায়। আশ্রাফপুরের৫৮৯ দু’টি তাম্রলিপি থেকে এবং দেউলবাড়ীর৫৯০ (কুমিল্লা শহর থেকে ১৪ মাইল দক্ষিণে) এক সর্বাণী মূর্তির পাদপিঠে লিখিত বর্ণনা থেকে জানা যায় খড়গ বংশীয় তিন পুরুষের রাজা খড়গদ্যামা, জাতখড়গ ও দেবখড়গের নাম। এই সর্বাণী (দুর্গা) মূর্তির প্রতিষ্ঠাত্রী ছিলেন রানী প্রভাবতী ও পুত্র রাজাবাজ বা রজাবাজভট, এই পরিবারের শেষ রাজা। এই লিপিগুলি রাজধানী কামতাভাসক থেকে লেখা হয়েছিল। কামতা বর্তমানের কুমিল্লা জেলার বাদকাসতা বলে নির্ণয় করা হয়েছে। দেববংশ দেববংশের পরিচয় ইতিহাসে অজ্ঞাতই ছিল। সাম্প্রতিককালে প্রাপ্ত তিনটি তাম্রশাসন ও কতকগুলি মুদ্রা হতে দেব উপাধিধারী রাজবংশের পরিচয় পাওয়া যায়।৫৯১ দুটি তাম্রশাসন ও মুদ্রাগুলি কুমিল্লার নিকটবর্তী লালমাই ময়নামতি পাহাড়ে শালবন বিহারে প্রাপ্ত এবং তৃতীয় তাম্রশাসনটি এখন কলিকাতা এশিয়াটিক সোসাইটিতে রক্ষিত। ডি.সি. সরকার ১৯৫১ সালে এগুলি প্রথম প্রকাশ করেন। ময়নামতির একটি শাসনের পাঠ খুবই অস্পষ্ট, কিন্তু এর অক্ষর এবং ধর্মচক্র ও মৃগচিহ্নিত মুদ্রা দ্বিতীয়টির অনুরূপ। এই দ্বিতীয় তাম্রশাসনটির সম্মুখদিকে রাজা শ্রীআনন্দদেবের দানপত্র ও পশ্চাৎদিকে তাঁর পুত্র ও উত্তরাধিকারী রাজা ভবদেবের সম্মতিসূচক জ্ঞাপন। তৃতীয় তাম্রশাসনটি রাজা ভবদেবের দানপত্র এবং দেবপর্বতে অবস্থিত জয়স্কন্ধাবার হতে প্রদত্ত এই তাম্রশাসনগুলি নিন্মলিখিত রাজাগণের নাম পাওয়া যায়-
শ্রীশান্তিদেব
শ্রীবীরদেব
শ্রীআনন্দদেব
শ্রীভবদেব
এদের প্রত্যেকেরই সম্রাটের পদবি পরমসৌগত, পরমভট্টারক পরমেশ্বর এবং মহারাজাধিরাজ উপাধি হতে অনুমান করা যায় যে, এরা স্বাধীন রাজা ছিলেন। তাম্রশাসনগুলিতে যে সমস্ত স্থানের নাম আছে তা হতে বুঝা যায় যে, এই বংশ সমতটে রাজত্ব করতেন।পরমেশ্বর পরমভট্টারক মহারাজধিরাজ ভবদেব দেবপর্বত জয়স্কন্ধাবার হতে এই শাসনটি দান করেছিলেন। শ্রীধারণ রাতের কৈলান তাম্রলিপিতে৫৯২ এবং শ্রীচন্দ্রের শ্রীহস্র তাম্রলিপিতে৫৯৩ দেব পর্বতের উল্লেখ আছে। দেবপর্বত কুমিল্লার পশ্চিমে গোমতী নদীর একটি শাখা নদী ক্ষীরোদার তীরে অবস্থিত ছিল। ক্ষীরোদার বর্তমান নাম খিরা অথবা খিরনাই এবং এর শুষ্ক খাত এখনও বিদ্যমান। এই গোমতী নদী ময়নামতি পাহাড়ের পূর্ব দিক হতে এসে এর দক্ষিণ দিক ঘুরে পশ্চিম দিক হতে প্রবাহিত আর একটি শাখানদীর সাথে মিলিত হয়েছে। নদীবেষ্টিত ময়নামতি পাহাড়ের দক্ষিণেই পার্বত্য দুর্গ দেবপর্বত অবস্থিত ছিল। বর্তমান কুমিল্লা জেলা শহরের পশ্চিম পাশে অবস্থিত। এটি সমতটের রাজা সাতবংশীয় জীবনধারণ রাত ও তাঁর পুত্র শ্রীধারণ রাতের রাজধানী ছিল এবং সম্ভবত এটিই দেববংশের রাজধানী ছিল। এই শক্তিশালী দেব রাজবংশ বৌদ্ধধর্মাবলম্বী ছিলেন, কিন্তু এর সম্বন্ধে আর কোনো বিবরণ জানা যায় না। সম্ভবত গোপালের পূর্বে মাৎস্যন্যায়ের কালে অথবা দেবপালের পরবর্তী দুর্বল পালরাজগণের সময়েই দেববংশীয় রাজগণ পূর্ববঙ্গে একটি স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ময়নামতি পাহাড়ের পাদদেশেই কৌটিল্য মুড়ায় এক বিশাল দীঘি ও অনেকগুলি ধর্মীয় স্থাপনার অবশেষ রয়েছে। স্থানীয়ভাবে এগুলি আনন্দ রাজার প্রাসাদ নামে পরিচিত। আপাতদৃষ্টিতে এগুলিকে দেব রাজবংশের তৃতীয় রাজার নির্মাণ বলেই মনে হয়। দেব রাজা ভবদেবের তাম্রলিপিতে কোনো তারিখের উল্লেখ নেই। এফ.এ. খান এটাকে খড়গ রাজাদের পরপরই বলে ধারণা করেন। তাঁর অনুমান দেব রাজবংশের শাসনকাল সম্ভবত ৭ম শতাব্দীর শেষ থেকে ৮ম শতাব্দীর মধ্যভাগ পর্যন্ত। তবে দেব রাজাদের সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান অত্যন্ত সীমিত। এ পর্যন্ত প্রাপ্ত তিনটি তাম্রলিপি ও কয়েকটি মুদ্রা ব্যতীত তাদের সম্পর্কে আমাদের কাছে অন্য কোনো তথ্যের সূত্র নেই।
লিপির বর্ণনা ও চৈনিক বিবরণ থেকে অনুমান করা হয় যে, খড়গবংশ ৭ম শতাব্দীর শেষদিকে এখানে রাজত্ব করেছিলেন।৫৯৪ কুমিল্লা জেলার লোকনাথ তাম্রলিপি থেকে আরও একজন সামন্তরাজার কথা জানা যায় যিনি খড়গ রাজাদের অধীন ছিলেন।৫৯৫ অনুরূপভাবে কৈলান ও লোকনাথ তাম্রলিপি থেকে আমরা রাত পরিবার নামে আর একটি সামন্ত শাসক রাজপরিবারের পরিচয় পাই। তারা দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার কুমিল্লা-নোয়াখালি জেলায় প্রায় স্বাধীনভাবে রাজত্ব করতেন। কৈলান লিপির শ্রীধারণ রাত ছিলেন সামন্তরাজা জীবনধারন রাতের পুত্র। পিতা-পুত্রের কেউই কোনো রাজকীয় উপাধি ধারণ করেন নি। কিন্তু তাঁদের অধিরাজ কে ছিলেন তা জানা যায় না। তবে অনুমান করা হয় তাঁরা সম্ভবত খড়গ রাজবংশের অধীন ছিলেন।
——————————————————————————–
৫৮৪ Ramacarita- Verse IV/1, Verendra Research Soceity Edition.
৫৮৫ Ramacarita- Verse IV/1, Verendra Research Soceity Edition.
৫৮৬ Ramacarita- Verse IV/12, Verendra Research Soceity Edition.
৫৮৭ R.D. Banarje; Memories of Asiatic Society of Bengal.
৫৮৮ Epigraphia Indica, vol. XII, 65.
৫৮৯ Memories of Asiatic Society of Bengal, vol. I, No. 6, pp. 85-92.
৫৯০ IBID, vol. XVII, pp. 357-59.
৫৯১ F.A. Khan: Mainamati (A Preliminary Report).
৫৯২ Indian Historical Quarterly: vol. XXIII, p. 221.
৫৯৩ F.A. Khan: Mainamati (A Preliminary Report).
৫৯৪ Journal of Asiatic Society of Bengal (NS): XIX, pp. 376-79.
৫৯৫ R. G. Basak: The History of North-Eastern India, p. 195.
আগামী পর্বেঃ হরিকেল রাজ্য, পাল সাম্রাজ্যের পতন (ক্রমশ)
খবর বিভাগঃ
বাংলাদেশের ইতিহাস