বুধবার, মার্চ ২৩, ২০১৬

আদি বাংলার ইতিহাস (প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্ব ৮৯

আদি বাংলার ইতিহাস
(প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্ব ৮৯
বরেন্দ্র বিদ্রোহ
যে বিদ্রোহের ফলে দ্বিতীয় মহীপাল রাজ্য ও প্রাণ হারালেন, কৈবর্তনায়ক দিব্যের সাথে তার কোনো সম্বন্ধ ছিল কি না তা নির্ণয় করা কঠিন। রামচরিতের একটি শ্লোকে (১।৩৯) এরূপ ইঙ্গিত আছে যে, দিব্য মহীপালের অধীনে উচ্চরাজকার্যে নিযুক্ত ছিলেন। রামচরিতে (১) .(২৯) এটিও উলিখিত হয়েছে যে, দিব্য মহীপালকে পরাজিত ও সম্ভবত হত্যা করে বরেন্দ্রভূমি অধিকার করেছিলেন। সুতরাং প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে যে দিব্য এই বিদ্রোহে সংশ্লিষ্ট ছিলেন তা অনুমান করা স্বাভাবিক। কিন্তু দিব্যের সাথে বিদ্রোহীদের কোনো প্রকার যোগাযোগ ছিল কিনা, রামচরিতে তার উল্লেখ নেই। সুতরাং অসম্ভব নয় যে, দিব্য প্রথম মহীপালের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে যোগদান করেন নি, কিন্তু বিদ্রোহীদের হাতে পরাজয়ের পর মহীপালকে হত্যা করে তিনি বরেন্দ্রী অধিকার করেছিলেন। রামচরিতে দিব্যকে দস্যু ‘উপধিব্রতী’ বলা হয়েছে। টীকাকার উপধিব্রতীর অর্থ করেছেন ‘ছদ্মনিব্রতী’; কেউ কেউ এ থেকে সিদ্ধান্ত করেছেন যে, দিব্য কর্তব্যবশে বিদ্রোহী সেজে মহীপালকে হত্যা করেছিলেন। কিন্তু এরূপ অর্থ সঙ্গত মনে হয় না। দস্যু ও উপধিব্রতী হতে বরং এটিই মনে হয় যে, রামচরিতকারের মতো দিব্য প্রকৃতই দস্যু ছিলেন; কিন্তু দেশহিতের ভান করে রাজাকে হত্যা করেছিলেন। বস্তুত রামচরিত কাব্যের অন্যত্রও দিব্যের আচরণ কুৎসিত ও নিন্দনীয় বলে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কিছুদিন পর্যন্ত বাংলার একদল লোক বিশ্বাস করতেন যে, দিব্য অত্যাচারী মহীপালকে বধ করে দেশকে রক্ষা করেছিলেন এবং তাঁর এই মহৎ কার্যের জন্যজনসাধারণ কর্তৃক রাজা নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাঁরা দিব্যকে মহাপুরুষ সাজিয়ে উত্তরবঙ্গের নানা স্থানে প্রতি বছর ‘দিব্যস্মৃতি উৎসবের’ ব্যবস্থা করতেন। কিন্তু রামচরিতে এর কোনো সমর্থনই পাওয়া যায় না। অবশ্য পালরাজগণের কর্মচারী সন্ধ্যাকর নন্দী দিব্য সম্বন্ধে বিরুদ্ধভাব পোষণ করতেন, এটি খুবই স্বাভাবিক; কিন্তু রামচরিত ব্যতীত দিব্য সম্বন্ধে জানার আর কোনো উপায় নেই। সুতরাং রামচরিতকার তাঁর চরিত্রে যে কলঙ্ক লেপন করেছেন, তা পুরোপুরি সত্য বলে গ্রহণ না করলেও দিব্যকে দেশের ত্রাণকর্তা মহাপুরুষ মনে করার কোনোই কারণ নেই। বস্তুত মহীপাল যে প্রজাপীড়ক বা অত্যাচারী রাজা ছিলেন এবং এই জন্যই তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ হয়েছিল এরূপ মনে করার কোনো কারণ নেই। আর এই বিদ্রোহকে কৈবর্ত জাতির বিদ্রোহ বলে চিহ্নিত করাও সঙ্গত নয়। দিব্য কৈবর্তজাতীয় ছিলেন কিন্তু তিনি যে এই জাতির উপর রাজার অত্যাচারের জন্য মহীপালের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন রামচরিতে এর সমর্থনে কোনো উক্তি বা প্রমাণ পাওয়া যায় না। এরূপ বিদ্রোহ সে যুগে প্রায়ই ঘটত। রামচরিতের প্রথম সর্গের ২৯ শ্লোকে বলা হয়েছে যে, রামপাল ‘নৃপতি-শ্রেষ্ঠ (মহীপালকে) হত্যা করে প্রচুর ভূমণ্ডলের অধিকারী শত্রু (কৈবর্ত রাজার) নিরাময়তা নষ্ট করেছিলেন।’ এ হতে মনে হয় যে, দিব্যই মহীপালকে বধ করেছিলেন।
দিব্য নিষ্কণ্টভাবে বরেন্দ্রের রাজ্য ভোগ করতে পারেন নি। পূর্ববঙ্গের বর্ম-বংশীয় রাজা রাতবর্মা তাঁকে পরাজিত করেছিলেন; কিন্তু এই বিরোধের হেতু বা বিশেষ কোনো বিবরণ জানা যায় না। রামপাল বরেন্দ্র উদ্ধার করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু পারেন নি, বরং দিব্য রামপালের রাজ্য আক্রমণ করে তাঁকে ব্যতিব্যস্ত করেছিলেন। যদিও রামচরিতে দিব্যের রাজত্বকালের কোনো ঘটনার উল্লেখ নেই, তথাপি যিনি জাতবর্মা ও রামপালের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে বরেন্দ্রী রক্ষা করতে পেরেছিলেন, তিনি যে বেশ শক্তিশালী রাজা ছিলেন এবং বরেন্দ্রে তাঁর প্রভুত্ব বেশ দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা স্বীকার করতে হবে। দিব্যের মৃত্যুর পর তাঁর ভ্রাতা রুদোক এবং তৎপরে রুদোকের পুত্র ভীম বরেন্দ্রের সিংহাসনে আরোহণ করেন। রামচরিতে ভীমের প্রশংসাসূচক কয়েকটি শ্লোক আছে এবং তাঁর রাজ্যের শক্তি ও সমৃদ্ধির বর্ণনা আছে। সুতরাং দিব্য স্বীয় প্রভু ও রাজাকে বধ করে যে মহাপাতক হয়েছিলেন, বরেন্দ্রে একটি শক্তিশালী রাজ্য প্রতিষ্ঠাপূর্বক তথায় সুখশান্তি ফিরিয়ে এনে তার কতক প্রায়শ্চিত্ত করেছিলেন। দিনাজপুরের কৈবর্তস্তম্ভ আজো এই রাজবংশের স্মৃতি বহন করছে।
রামপাল (১০৭৭-১১৩০ খ্রিষ্টাব্দ)
দ্বিতীয় শূরপালের পরে তার কনিষ্ঠভ্রাতা রামপাল সিংহাসন লাভ করেন।৫৬০ দ্বিতীয় মহীপাল যখন বিদ্রোহ দমন করতে অগ্রসর হন, তখন তাঁর দুই কনিষ্ঠভ্রাতা শূরপাল ও রামপাল কারাগারে আবদ্ধ ছিলেন। মহীপালের পরাজয় ও মৃত্যুর পর তাঁরা কিভাবে মুক্তিলাভ করে বরেন্দ্র হতে পলায়ন করেন, রামচরিতে তাঁর কোনো উল্লেখ নেই। পলায়ন করার পর পালরাজ্যের কোনো এক অংশে, সম্ভবত মগধে, শূরপাল রাজসিংহাসনে আরোহণ করেন। তাঁর রাজত্বকালের কোনো বিবরণই জানা যায় নি। সম্ভবত তিনি খুব অল্পকালই রাজত্ব করেছিলেন এবং তারপর রামপাল রাজা হন। রামপাল সম্ভবত সিংহাসনে আরোহণ করেন। পিতা বিগ্রহপালের মৃত্যুর পর তার জ্যেষ্ঠ দুই ভ্রাতা দ্বিতীয় মহীপাল ও দ্বিতীয় শূরপালের পর তিনি সিংহাসনের অধিকারী হন। তারপরও তিনি প্রায় ৫ দশকের অধিকাল পর্যন্ত পাল রাজ্য শাসন করেছেন।৫৬১ রামচরিতেও উল্লেখ আছে যে, তাঁর সন্তানদের মধ্যে রাজ্যপাল, ভিত্যপাল এবং অন্যরা রাষ্ট্রের কোনো কোনো দায়িত্ব বহন করতেন। রামপাল তার মামা মদনদেবের মৃত্যুসংবাদ শুনে গঙ্গানদীতে ডুবে প্রাণত্যাগ করেন।রামপাল যখন সিংহাসনে আরোহণ করেন, পাল সাম্রাজ্য তখন নামে মাত্র বর্তমান। কারণ উত্তর বাংলা তখন কৈবর্ত্যরাজ দিব্যের অধীন। উত্তর বিহার ইতোমধ্যে মিথিলারাজ নান্যদেবের (১০৯৭-১১৫০ খ্রিষ্টাব্দ) করতলগত। শোনা যায় নান্যদেবের পূর্বপুরুষ চালুক্যারাজ ৬ষ্ঠ বিক্রমাদিত্যের বিহার আক্রমণ করার সময় তাঁর ফৌজের সঙ্গে বিহারে এসে বসতি স্থাপন করে।৫৬২
পূর্ব ও দক্ষিণ বাংলা বর্মণরাজদের শাসনাধীন৫৬৩, এদিকে রাঢ় পর্যন্ত কৈবর্তরাজ দিব্যের অনুগতদের শাসনাধীন। দক্ষিণ বিহারের সামন্তরাও রামপালের অনুগত ছিল বলে মনে হয় না। শুধুমাত্র পশ্চিম বাংলার সামন্তরাই তাঁর প্রতি কিছুটা হলেও অনুগত ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। কারণ দিব্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় বেশিরভাগ সহায়তাকারী এরাই ছিল।রামপাল রাজা হয়ে বরেন্দ্র উদ্ধার করার প্রয়াস করেছিলেন, কিন্তু বিফলমনোরথ হয়ে বহুদিন নিশ্চেষ্ট ছিলেন। তারপর আবার এক গুরুতর বিপদ উপস্থিত হলে পুত্র ও অমাত্যগণের সাথে পরামর্শ করে বিপুল উদ্যমে কার্যক্ষেত্রে অবতীর্ণ হলেন। এই গুরুতর বিপদ কি, রামচরিতকার তার উল্লেখ করেন নি। সম্ভবত দিব্য কর্তৃক আক্রমণই এই বিপদ এবং রাজ্যের অবশিষ্ট অংশ হারাবার ভয়েই বিচলিত হয়ে রামপাল পুনরায় দিব্যের প্রতিরোধ করতে কৃতসংকল্প হলেন।দিব্যের বিরুদ্ধে সৈন্য সংগ্রহের জন্য রামপাল সামন্তরাজগণের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে লাগলেন। অর্থ ও সম্পত্তির প্রলোভনে অনেকেই তাঁকে সাহায্য করতে স্বীকৃত হলো। এভাবে বহুদিনের চেষ্টায় রামপাল অবশেষে বিশাল সৈন্যবাহিনী সংগ্রহ করতে সমর্থ হলেন। এই আয়োজনে রামপালের প্রধান সহায়ক ছিলেন তাঁর মাতুল রাষ্ট্রকূটকুলতিলক মথন। ইনি মহণ নামেও পরিচিত ছিলেন। তিনি দুই পুত্র মহামাণ্ডলিক কাহ্নরদেব ও সুবর্ণদেব এবং ভ্রাতুষ্পুত্র মহাপ্রতীহার শিবরাজ প্রভৃতিকে সঙ্গে নিয়ে আসেন। অপর যেসব সামন্তরাজ রামপালকে সৈন্যদ্বারা সাহায্য করেছিলেন, তাঁদের মধ্যে নিন্মলিখিত কয়েকজনের নাম রামচরিতে পাওয়া যায়। রামচরিতের টীকায় এদের রাজ্যের নাম এবং কোনো কোনো স্থলে অন্যান্য বিবরণও দেয়া আছে; কিন্তু এর অনেকগুলির অবস্থান নির্ণয় করা যায় না।
১. ভীমযশ: ইনি মগধ ও পীঠীর অধিপতি। রামচরিত থেকেই জানা যায় যে, তিনি একাকী কান্যকুব্জরাজের সৈন্যদের পরাস্ত করেছিলেন।৫৬৪
২. কোয়াটবীর রাজা বীরগুণ: রামচরিতের টীকাতে বীরগুণ সম্বন্ধে বলা হয়েছে ‘দক্ষিণ সিংহাসনে চক্রবর্তী’;নগেন্দ্রনাথ বসুর মতে এটি বিশাল অরণ্যানী-বেষ্টিত উড়িষ্যার গড়জাত প্রদেশ। আইন-ই-আকবরীতে এই স্থান কটক সরকারের অন্তর্গত ‘কোটদেশ’ বলেই অভিহিত হয়েছে।৫৬৫ রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ও এই মত সমর্থন করেছিলেন। কিন্তু উড়িষ্যায় রামপালের বা তাঁর পিতার রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত সামন্তশাসিত কোনো রাজ্য ছিল এর কোনো প্রমাণ নেই। বিষ্ণুপুরের পূর্বে কোটেশ্বর নামক গ্রামের সাথে এর নামসাদৃশ্য আছে। শ্রীযুক্ত পঞ্চানন মণ্ডলের মতে অজয় নদের দক্ষিণ তীরে বর্ধমান জেলার ও আউসগ্রাম থানার অন্তর্গত ভল্কীকোট গ্রামই প্রাচীন কোটাটবী, কারণ এই অঞ্চলকে এখনও কোটার জঙ্গল বলা হয়।
৩. দণ্ডভুক্তির রাজা জয়সিংহ: দণ্ডভুক্তি মেদিনীপুর জেলার দক্ষিণভাগে অবস্থিত ছিল। ইনি উড়িষ্যার রাজা কর্ণকেশরীকে পরাজিত করেছিলেন।
৪. বিক্রম: রামচরিতে শুধু এই নামটি আছে, টীকাতে এঁকে বিক্রমরাজ বলা হয়েছে। টীকাকারের ভাষ্যে ‘দেবগ্রাম প্রতিবদ্ধ’ ও ‘বালবলভী তরঙ্গ’, এই দুইটি শব্দ আছে। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এর অর্থ করেছিলেন যে বিক্রমরাজ দেবগ্রামের রাজা ছিলেন এবং এর চারিপার্শ্ব বালবলভী দেশের নদী দ্বারা বেষ্টিত ছিল। তাঁর মতে বালবলভী প্রাচীন বাগড়ীর (মেদিনীপুর জেলার গড়বেতা) নাম। শ্রীরাধাগোবিন্দ বসাক বলেন যে, বালবলভী একটি নদীর নাম এবং বিশাল তরঙ্গ-বহুল নদীদ্বারা বেষ্টিত থাকায় রাজধানী দেবগ্রাম সুরক্ষিত ছিল। দেবগ্রামের অবস্থিতি সম্পর্কে কেউ কেউ ধারণা করেন: কলিকাতা-লালগোলা রেলওয়ে লাইনে কলিকাতার শিয়ালদহ স্টেশন হতে ১৪০ কিলোমিটার দূরে দেবগ্রাম নামক স্টেশনের আধ মাইল দূরে দেবগ্রাম নামক গ্রামই খুব সম্ভব প্রাচীন দেবগ্রাম।
৫. ‘নগেন্দ্রনাথ বসু নদীয়া জেলার একটি গ্রামকে চিহ্নিত করেছেন।৫৬৬ রমেশচন্দ্র মজুমদার দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার সুবর্ণরেখা নদীর মুখে পিপলী গ্রামকে চিহ্নিত করেছেন।৫৬৭ সম্পাদিত ‘বর্ধমানের পুরাকথা’ নামক গ্রন্থে এই স্থানের অনেক প্রাচীন ধ্বংসাবশেষের বিবরণ আছে।
৬. লক্ষ্মীশূর:৫৬৮ তিনি হুগলী জেলার অন্তর্গত অপারমন্দারের অধিপতি ছিলেন। শ্রীপঞ্চানন মণ্ডল বলেন যে, বর্তমান গড়মান্দারণ নামক গ্রাম হুগলী জেলার আরামবাগ হতে নয় মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত। নলিনী দাশগুপ্ত এই মত গ্রহণ করেন নি। তাঁর মতে বর্তমান দেওঘর, বৈদ্যনাথ এবং অপর মন্দার অর্থাৎ ভাগলপুরের ৩০ মাইল
দক্ষিণে মন্দার পর্বতের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে অবস্থিত অরণ্যসঙ্কুল ‘অপর-মন্দার’ প্রদেশেই লক্ষ্মীশূরের রাজ্য ছিল। প্র ম মহীপালের সমসাময়িক রণশূর দক্ষিণ রাধা শাসন করতেন। লক্ষ্মীশূর এক বংশীয় হতে পারেন। বিজয়সেন যে শূর বংশে বিবাহ৫৬৯ করেছিলেন, হয়তো এরাই সেই বংশের। জানা যায় যে, লক্ষ্মীশূর পার্বত্য এলাকার সামন্তদের প্রধান ছিলেন।৫৭০
৭. কুব্জবটির রাজা শূরপাল: কুব্জবটি সাঁওতাল পরগনার অন্তর্ভুক্ত নয়া দুমকার ১৪ মাইল উত্তরে অবস্থিত ছিল।৫৭১
৮. তৈলকম্পের (মানভূম) রাজা রুদ্রশিখর: বিহারের মানভূম জেলার তেলকুপিই প্রাচীন তৈলকম্প।৫৭২
৯. উচ্ছালের রাজা ভাস্কর অথবা মদকলসিংহ: পূর্বে বীরভূম জেলার অন্তর্গত ‘জৈনউঝিয়াল’ পরগনার নামই উচ্ছাল বলে গৃহীত হতো। শ্রীপঞ্চানন মণ্ডল বলেন যে, এটি বর্ধমান জেলার উছলান গ্রাম। এটিই অধিকতর সঙ্গত বলে মনে করেছেন ঐতিহাসিক মজুমদার, কিন্তু অনেকেই দ্বিমত পোষণ করেছেন।৫৭৩
১০. ঢেক্করীরাজ প্রতাপসিংহ: কাটোয়ার নিকটবর্তী বর্ধমান জেলায় অবস্থিত বলে জানা যায়।৫৭৪
১১. কয়ঙ্গলমণ্ডলের অধিপতি নরসিংহাসর্জুন: এর বর্তমান নাম কাঙ্গজোল- এটি বর্তমান রাজমহলের ২০ মাইল
দক্ষিণে অবস্থিত।
১২. সঙ্কটগ্রামের রাজা চণ্ডার্জুন: শ্রীপঞ্চানন মণ্ডলের মতে বর্ধমান জেলার রায়না থানার অন্তর্গত সংকট নামক গ্রাম হতে শক্তিগড় পর্যন্ত বিস্তৃত ভূভাগই প্রাচীন সংকট রাজ্য। আইন-ই-আকবরীতে সাতগাঁও সরকারের অন্তর্গত সকোট পরগনার উল্লেখ পাওয়া যায়। সম্ভবত বল্লাল চরিতের সংককোট এবং তবকাত-ই-নাসিরীর সঙ্কনাৎ ও এই সংকট গ্রাম অভিন্ন।৫৭৫
১৩. নিদ্রাবলীর রাজা বিজয়রাজ: সম্ভবত সেনবংশীয় রাজা বিজয় সেন। বিজয় সেন ও বিজয়রাজ অভিন্ন বলে গ্রহণ করলে নিদ্রাবলী পশ্চিম বাংলায় অবস্থিত ছিল। বল্লালসেন নৈহাটী তাম্রশাসন থেকে আমরা জানতে পারি যে, তাদের পূর্বপুরুষ রাধা রাজ্যে প্রথমে বসতি স্থাপন করে।
১৪. কৌশাম্বীর রাজা দ্বোরপবর্ধন: কৌশাম্বী সম্ভবত রাজশাহী অথবা বগুড়া জেলায় অবস্থিত ছিল। কেউ কেউ একে ভাগীরথীর পূর্ববতীরে কলিকাতার দক্ষিণে অবস্থিত বলে মত প্রকাশ করেছেন। শ্রীপঞ্চানন মণ্ডল বর্ধমান জেলার কালনা মহকুমার অন্তর্গত কুসুমগ্রামই রামচরিতের কোশাম্বী বলে মত প্রকাশ করেছেন।
১৫. পদুবন্বার রাজা সোম: ঐতিহাসিকদের কেউ কেউ হুগলী, পাবনা অথবা দিনাজপুর৫৭৬ চিহ্নিত করেছেন। খুব সম্ভব হুগলী জেলার অন্তর্গত পাউনান পরগনা প্রাচীন পদুবন্বার স্মৃতি বহন করছে বলে আচার্য মজুমদার চিহ্নিত করেছেন। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী তা বর্তমান পাবনা নগরীর প্রাচীন নাম হতে পারে এরূপ মত প্রকাশ করেছিলেন।এই সমুদয় ব্যতীত তাঁর মামা ও মামাতো ভাইসহ আরও অনেক সামন্তরাজ রামপালের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন:
রামচরিতে তাঁদের বিষয় সাধারণভাবে উল্লিখিত আছে, নাম দেওয়া নই। এদের মধ্যে যে সমুদয় সামন্তরাজ্যের অবস্থিতি মোটামুটি জানা যায়, তার বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে, প্রধানত মগধ ও রাঢ়দেশের সামন্তগণই রামপালের পক্ষ অবলম্বন করেছিলেন।
যদি কোশাম্বী রাজশাহী বা বগুড়া জেলায় এবং পদুবন্বা পাবনায় ছিল বলে অনুমান করা যায় তাহলে বলতে হবে যে, বরেন্দ্রী বা উত্তর বাংলা ভীমের হলেও এর কোনো কোনো সামন্তরাজ রামপালের কূটনীতিতে তাঁর সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন এবং এর ফলে ভীম খুব দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। অথবা এরূপও হতে পারে যে দিব্য বা ভীম কেউই সমগ্র উত্তরবঙ্গে স্বীয় ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন নি। এর কোনা সামন্ত প্রত্যক্ষ বা পরোক্তভাবে দিব্যের বিদ্রোহের পরও রামপালের অনুরক্ত ছিলেন। এই সমুদয় সামন্তরাজ হস্তী, অশ্ব ও পদাতিক সৈন্য সঙ্গে নিয়ে রামপালের সাথে মিলিত হলে রামপাল এক বিপুল বাহিনী নিয়ে ভীমের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করলেন।
রামপাল সম্ভবত বঙ্গ হতে বরেন্দ্র আক্রমণ করেন। সমস্ত সামন্তরাজ্যের সৈন্য একত্র করে তিনি প্রথমে মহাপ্রতীহার শিবরাজকে একদল সৈন্যসহ প্রেরণ করেন। এই সৈন্যদল পদ্মা বা গঙ্গা নদী পার হয়ে বরেন্দ্রভূমি বিধ্বস্ত করে।৫৭৭ এভাবে গঙ্গার উত্তর তীর সুরক্ষিত করে রামপাল তাঁর বিপুল সৈন্যসহ নদী পার হয়ে বরেন্দ্রভূমি আক্রমণ করেন। এবার কৈবর্তরাজ ভীম সসৈন্যে রামপালকে বাধা দিলেন এবং দুই দলে ভীষণ যুদ্ধ হলো। রামচরিতে নয়টি শ্লোকে এই যুদ্ধের বর্ণনা আছে। রামপাল ও ভীম উভয়েই বিশেষ বিক্রম প্রদর্শন করেন এবং পরস্পরের সম্মুখীন হয়ে যুদ্ধ করেন। কিন্তু হস্তীপৃষ্ঠে যুদ্ধ করতে করতে দৈববিড়ম্বনায় ভীম বন্দী হলেন।
এতে তাঁর সৈন্যদল ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ল।৫৭৮ হরি নামক তাঁর এক সুহৃদ পুনরায় তাঁর সৈন্যগণকে একত্র করে যুদ্ধ করেন এবং প্রথমে কিছু সফলতাও লাভ করেন। তথাপি পরিশেষে রামপালেরই জয় হলো। রামপাল প্র মে ভীমের সাথে সদ্ব্যবহার করেছিলেন। এর পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ রামচরিতে অনুসরণ করা কষ্টকর, এজন্য যে এখানে টীকাকারের ভাষ্য পাওয়া যায় না। কিন্তু পরে ভীমকে বধ্যভূমিতে নিয়ে প্রথমে তাঁর সম্মুখেই পরিজনবর্গকে হত্যা করা হয়। তারপর বহু শরাঘাতে ভীমকেও বধ করা হলো।৫৭৯ এভাবে কৈবর্তনায়কের বিদ্রোহ ও ভীমের জীবনের অবসান ঘটে। পূর্বোক্ত হরি কে এবং তার সাথে রামপালের কি সম্বন্ধ ছিল তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় নি। হরি যে প্রথমে ভীমের সুহৃদ ছিলেন ও তার ছত্রভঙ্গ সৈন্য নিয়ে রামপালের সাথে যুদ্ধ করেছিলেন, পরে রামপালের সাথে তাঁর বিলক্ষণ সৌহার্দ্য জন্মেছিল রামচরিতের তিনটি শ্লোকে এরূপ ইঙ্গিত আছে। খুব সম্ভবত হরি প্রথমে ভীমের পক্ষে ছিলেন, কিন্তু যে কোনো উপায়ে হোক (সম্ভবত অর্থ দ্বারা) রামপাল অথবা তাঁর পুত্র তাঁকে নিজের পক্ষভুক্ত করতে সমর্থ হয়েছিলেন। তবে কেউ কেউ বলেন হরি বরাবরই রামপালের পক্ষে ছিলেন।
রামপাল আবার পিতৃভূমি বরেন্দ্রী অধিকার করে প্রথমে এর শান্তি ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে যত্নবান হলেন এবং প্রজার করভার লাঘব ও কৃষির উন্নতিবিধান করলেন। তারপর তিনি রামাবতী নামক নতুন রাজধানী প্রতিষ্ঠা করলেন।৫৮০ পালবংশের রাজ্যের শেষ পর্যন্ত রামাবতীই রাজধানী ছিল। রামচরিত-এ এর ঐশ্বর্যের ও সৌন্দর্যের বিস্তৃত বর্ণনা সন্ধ্যাকরনন্দী ৩৯ শ্লোকে করেছেন।৫৮১ রামপালের সময় থেকে মনদপালের শাসনামল পর্যন্ত রামাবতী পাল সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল।৫৮২ এভাবে পিতৃভূমি বরেন্দ্রীতে স্বীয় শক্তি সুপ্রতিষ্ঠিত হলে রামপাল নিকটবর্তী রাজ্যসমূহ জয় করে পালসাম্রাজ্যের লুপ্ত গৌরব উদ্ধার করতে যত্নবান হলেন।
বিক্রমপুরের বর্মরাজ সম্ভবত বিনা যুদ্ধেই রামপালের বশ্যতা স্বীকার করেন। রামচরিতে বর্ণিত্যক্ত হয়েছে যে, পূর্বদেশীয় বর্মরাজ নিজের পরিত্রাণের জন্য উৎকৃষ্ট হস্তী ও স্বীয় রথ উপঢৌকন দিয়ে রামপালের আরাধনা করলেন। যুদ্ধে বিজিত হয়ে কামরূপরাজ তিমঞ্জদেব অধীনতা স্বীকার করলেন। পালের মন্ত্রী বৈদ্যদেব এই যুদ্ধের সেনাপতি ছিলেন। তিনি কামরূপ জয় করে ফিরে এলে রামপাল তাঁকে বহু সম্মানদানে আপ্যায়িত করলেন।
এভাবে পূর্বদিকে সীমান্ত প্রদেশ জয় করে রামপাল দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হলেন। রাঢ়দেশের সামন্তসকলেই রামপালের অধীনতা স্বীকার করেছিলেন। তাঁদের সাহায্যে রামপাল উড়িষ্যা অধিকার করেন। এই সময় উড়িষ্যার রাজনৈতিক অবস্থা বিশেষ শোচনীয় হয়ে উঠেছিল। দক্ষিণ হতে গঙ্গরাজগণ পুনঃ পুনঃ আক্রমণ করে একে বিপর্যস্ত করছিলেন। রামপালের সামন্তরাজ দণ্ডভুক্তির অধিপতি জয়সিংহ রামপালের বরেন্দ্র অভিযানে যোগ দেয়ার পূর্বেই উৎকলরাজ কর্ণকেশরীকে পরাজিত করেছিলেন। গঙ্গরাজগণ উৎকল অধিকার করলে বাংলাদেশর সমূহ বিপদ- এই আশঙ্কাতেই সম্ভবত রামপাল নিজের মনোনীত একজনকে উৎকলের সিংহাসনে প্রতিষ্ঠিত করলেন। ঠিক অনুরূপ কারণেই অনন্তবর্মা চোড়গঙ্গ রাজ্যচ্যুত উৎকলরাজকে আশ্রয় দিলেন। এভাবে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী রাজার রক্ষকরূপে উৎকলের অধিকার নিয়ে রামপাল ও অনন্তবর্মার মধ্যে বহুদিনব্যাপী যুদ্ধ চলেছিল। রামচরিত অনুসারে রামপাল উৎকল জয় করে কলিঙ্গদেশ পর্যন্ত স্বীয় প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। অনন্তবর্মার লিপি হতে জানা যায়, ১১৩৫ অব্দের অনতিকাল পূর্বে তিনি উড়িষ্যা জয় করে স্বীয় রাজ্যভুক্ত করেন।
সুতরাং রামপালের মৃত্যু পর্যন্ত উড়িষ্যায় তাঁর আধিপত্য ছিল, এটি অনুমান করা যেতে পারে। অঙ্গ ও মগধ যে রামপালের রাজ্যভুক্ত ছিল, শিলালিপি হতে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। কর্ণাটদেশীয় চালুক্যরাজগণের বাংলা আক্রমণের কথা পূর্বেই বলা হয়েছে। রামপালের রাজত্বকালে আর্যাবর্তে কর্ণাটগণের প্রভুত্ব আরও বিস্তার লাভ করে। কর্ণাটের দুইজন সেনানায়ক পালসাম্রাজ্যের সীমার মধ্যে দুটি রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথমটি রাঢ়দেশের সেনরাজ্য। রামপালের জীবিতকালে এটি খুব শক্তিশালী ছিল না। কিন্তু কর্ণাটবীর নান্যদেব একাদশ শতাব্দের শেষ ভাগে (আ. ১০৯৭ খ্রিষ্টাব্দ) মিথিলায় একটি স্বাধীন রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন। মিথিলা প্রথম মহীপালের সময় পালরাজ্যভুক্ত ছিল। নান্যদেবের সাথে গৌড়াধিপের সংঘর্ষ হয়।৫৮৩ এই গৌড়াধিপ সম্ভবত রামপাল, কারণ রামপালকে পরাজিত না করে কোনো কর্ণাটবীর মিথিলায় রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে পারেন, এটি সম্ভবপর বলে মনে হয় না। সুতরাং কর্ণাটের লোলুপ দৃষ্টি এ সময় বাংলার বিশেষ শঙ্কা ও উদ্বেগের কারণ হয়েছিল। রামপালের জীবিতকালে বাংলা জয় করতে পারেন নি এবং সেনরাজগণও মাথা তুলতে পারেন নি।
——————————————————————-
৫৬০ গৌড়লেখমালা, শ্লোক- ১৫, মনাহালি তাম্রশাসন।
৫৬১ Sir Cummingham: Asiatic Society of India Report, vol. XI.
৫৬২ H.C. Roy: Dynastic History of Northern India, vol. I, pp. 203-259.
৫৬৩ Uren Inscriptions: R.K. Chaudhury: Tebet Inscriptions of Bihar.
৫৬৪ Ramacarita: Verse no. 11/5.
৫৬৫ আর,ডি, ব্যানার্জী: বাংলার ইতিহাস, প্র ম খন্ড, পৃ. ২৮৭।
৫৬৬ বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস: রাজন্য কান্ড, পৃ. ১৯৮।
৫৬৭ আচার্য রমেশচন্দ্র মজুমদার: বাংলাদেশের ইতিহাস, ১ম খন্ড, পৃ. ১৫৭;
৫৬৮ আচার্য রমেশচন্দ্র মজুমদার: বাংলাদেশের ইতিহাস, ১ম খন্ড, পৃ. ১৫৭।
৫৬৯ Epigraphia Indica, vol. XV, pp. 283,285.
৫৭০ রামচরিত: শ্লোক নং- ২/৫।
৫৭১ History of Bengal, vol. I, p. 157.
৫৭২ History of Bengal, vol. I, p. 157.
৫৭৩ এন,এন, ভাসু এবং আর,ডি, ব্যানার্জী দ্বিমত পোষণ করেছেন।
৫৭৪ History of Bengal, vol. I, p. 157.
৫৭৫ আচার্য রমেশচন্দ্র মজুমদার: বাংলাদেশের ইতিহাস (প্রাচীন যুগ), পৃ. ৮৯।
৫৭৬ History of Bengal, vol. I, p. 158.
৫৭৭ রামচরিত, শ্লোক নং- ১/৪৬-৫০।
৫৭৮ রামচরিত, শ্লোক নং- ২/১৭,২০।
৫৭৯ রামচরিত, শ্লোক নং- ২/৪৫-৪৯।
৫৮০ রামচরিত, শ্লোক নং- ৩/২৯।
৫৮১ আর, ডি, ব্যানার্জী, বাংলার ইতিহাস, ১ম খন্ড, পৃ. ২৯২।
৫৮২ মদনপালের মানহালী তাম্রলিপি: গৌড় লেখমালা, পৃ. ১৫৩।
৫৮৩ এ বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনার জন্য দ্রষ্টব্য I.H.Q. VII. pp. 679.
আগামী পর্বেঃ পাল সাম্রাজ্যের পতন (ক্রমশ) কুমারপাল (১১৩০ খ্রিষ্টাব্দ) ও পরবর্তি পাল সম্রাট গণ।

শেয়ার করুন