আদি বাংলার ইতিহাস
(প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্ব ৮৮
পাল সাম্রাজ্যের পতন পর্ব ৮৮’র পর
এর পরেই বলা হয়েছ- ‘শ্রী শূদ্রকঃ স্বয়মুপাজয়দিন্দ্র-কল্পো গৌশ্বেরো নৃপতি লক্ষণ পূজয়া ষং।’ নানা পণ্ডিত এর নানা অর্থ করেছেন। কীলহর্ণ বলেন যে, ‘ইন্দ্রতুল্য গৌড়পতি স্বয়ং তাঁকে (শূদ্রককে) নরপতির ন্যায় পূজা করেছিলেন।’ শূদ্রক এবং তার দুই পুত্র বিশ্বদিত্য ও বিশ্বরূপ দীর্ঘদিন নিজ শক্তিবলে গয়া শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করেছেন।৫৫৪ বিশেষ করে নরপাল ও তৃতীয় বিগ্রহপালের সময়ে সুদ্রকের এই অবদানের জন্য রাজা নয়পাল তাকে গয়ার মণ্ডল নিযুক্ত করেন। মগধে এই শূদ্রক পরিবার তখন শুধু অতি উচ্চ মর্যাদাই লাভ করেনি, দ্বিতীয় রামপালের মৃত্যুর পর তারা স্বাধীনতা ঘোষণা করে।৫৫৫ একইভাবে, মহামাণ্ডলিক ঈশ্বরঘোষ ঢেক্করীতে রাজধানী স্থাপিত করে একটি স্বাধীন রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন। দিনাজপুর জেলার রানী শাঁকাইল থানার অন্তর্গত রাজগঞ্জের নিকটে প্রাপ্ত একটি তাম্রশাসন হতে এর বিবরণ পাওয়া যায়। এই তাম্রশাসনখানি দ্বারা মহামান্ডলিক ঈশ্বর ঘোষ ৩৫ সম্বৎসরে কয়েকজন ব্রাহ্মণকে ভূমিদান করেন। তাম্রশাসনখানির নিন্মে বংশাবলী দেওয়া হয়েছে:
ধূর্ত ঘোষ
বাল ঘোষ
ধবল ঘোষ = সম্ভাবা
ঈশ্বর ঘোষ
ধূর্ত ঘোষ ও বাল ঘোষ যোদ্ধা ছিলেন। ধবল ঘোষ সম্বন্ধে বলা হয়েছে যে, বীর ও যোদ্ধা ছিলেন এবং তাঁর প্রতাপ জগতে গীত হতো (জগতি গীত মহাপ্রতাপঃ); তিনি প্রবল অরিকুলের বজ্রস্বরূপ ছিলেন এবং প্রবল শত্রুগণকে ধ্বংস করেছিলেন। যদিও ঈশ্বর ঘোষের একমাত্র উপাধি ‘মহামাণ্ডলিক’ তথাপি পরাক্রান্ত সম্রাটগণের তাম্রশাসনে যে ভাষায় দানপত্র লিখিত হয় এই তাম্রশাসনটিতে তা অবিকল নকল করা হয়েছে অর্থাৎ ‘রাজা-রাজকন্যা, রাজ্ঞী, রাণক, রাজপুত্র, কুমারমাত্য’ এবং অপর প্রায় ৫০ জন রাজকর্মচারীকে উদ্দেশ্য করে এই দানপত্র আরম্ভ করা হয়েছে। সুতরাং ঈশ্বর ঘোষ প্রকৃতপক্ষে স্বাধীন নরপতিই ছিলেন। কিন্তু তিনি মহামাণ্ডলিক বলেই পরিচিত ছিলেন। অর্থাৎ পরবর্তীকালের মহারাষ্ট্রীয় সিন্ধিয়া হোলকার প্রভৃতির ন্যায় নামত রাজার অধীনতা স্বীকার করতেন- এটিই সম্ভব বলে মনে হয়। এটি স্মরণ করলে তাম্রশাসনের শেষে যে লিখিত আছে সম্বৎ ৩৫- এটি তাঁরই রাজ্য সম্বৎসর কিনা নিশ্চিত বলা যায় না। কারণ, তিনি ৩৫ বছর রাজত্ব করেছেন অথচ রাজোপাধি ধারণ করেন নি-সে যুগে, যখন দ্রুতবেগে রাজ্যের উত্থান পতন হচ্ছে, তখন এটি একটু অস্বাভাবিক বলেই মনে হয়। সম্ভবত এতদিন যে পালরাজবংশের অধীনে তিনি ও তাঁর পূর্বপুরুষ সামরিক কর্মচারী ছিলেন সেই রাজারই সংবৎ ব্যবহার করেছেন। তবে এ সকলই অনুমানমাত্র।
ঈশ্বর ঘোষের রাজ্য কোথায় ছিল তাও নিশ্চিত জানা যায় না। রাজশাসন ঢেক্করী হতে প্রদত্ত হয়েছে- সুতরাং এটি তাঁর রাজধানী ছিল বলে মনে করা যেতে পারে। ঈশ্বর ঘোষ পুণ্যদিনে জটোদা নদীতে স্নান করে একটি গ্রাম দান করেছিলেন এটিও তাম্রশাসনে উল্লিখিত হয়েছে। সুতরাং ঢেক্করী ও জটোদা নদী তাঁর রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। কালিকা পুরাণে কামরূপে জটোদা নদীর কথা আছে। নগেন্দ্রনাথ বসু এজন্য ঢেক্করী আসামে ছিল এই মত প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু রামচরিত গ্রন্থে রামপালের সামন্তবর্গের মধ্যে ঢেক্করীর মহাসামন্ত রাজা প্রতাপসিংহের নাম পাওয়া যায়- ইনি মণ্ডলাধিপতি ছিলেন। সুতরাং ঈশ্বর ঘোষের অনতিকাল পরে ইনিই ঢেক্করীর মহামাণ্ডলিক ছিলেন। এই ঢেক্করী কাটোয়ার নিকট বর্ধমান জেলার দক্ষিণ আউসগ্রাম থানায় অজয় নদীর দক্ষিণ তীরে ঢেকরগড় নামক স্থানের সাথে অভিন্ন বলে অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় ও হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মনে করেন। এটি খুবই সঙ্গত মনে হয়। এই প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে পঞ্চদশ শতকের কাছাকাছি কোনো সময়ে নির্মিত ইছাই ঘোষের মন্দির (বর্ধমান জেলার অন্তর্গত গৌরাঙ্গপুরে) এখনও দেখতে পাওয়া যায়।
ঘনরামের ধর্মমঙ্গল কাব্যে লাউসেনের অপূর্ব কীর্তিকলাপ বর্ণনার প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, অজয় ইছাই ঘোষকে জয় করে তিনি বুঝিয়েছেন বিক্রমে তাঁর সমকক্ষ নেই। রামচরিতে উল্লিখিত ঢেক্করীরাজ প্রতাপসিংহের উল্লেখ হতে প্রমাণিত হয় যে, ঈশ্বর ঘোষের অল্পকাল পরেই ঢেক্করী তাঁর বংশরদের হস্তচ্যুত হয়। রামগঞ্জ তাম্রশাসনের তারিখ সংবৎ ৩৫ সম্বন্ধে পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। প্রসঙ্গত বলা যেতে পারে যে, দেবদত্ত রামকৃষ্ণ ভাণ্ডারকর একে চালুক্যরাজ বিক্রমাদিত্যের প্রবর্তিত নতুন অব্দের তারিখ বলে অনুমান করেছেন, কিন্তু রমেশচন্দ্র মজুমদার এটি সঙ্গত মনে করেননি। একই সময়ে মগধে মন নামধারী এক বংশের পরিচয় পাওয়া যায় যারা নিজেদেরকে মগধের প্রভু বলে পরিচয় দিতেন। এই বংশের প্রথম ছিলেন ভর্ণমন এবং দ্বিতীয় একজনের নাম জানা যায় রুদ্রমণ। তারা ১১শ শতাব্দীর শেষদিকে অথবা ১২শ শতাব্দীর প্রথমদিকে মগধে প্রায় স্বাধীন রাজারূপে আত্মপ্রকাশ করেন।৫৫৬
পূর্ববঙ্গে দুটি স্বাধীন রাজ্যের প্রতিষ্ঠা হয়। বর্মবংশীয় রাজগণ বিক্রমপুরে রাজধানী স্থাপন করে পূর্ববঙ্গের কতকাংশ শাসন করেন। কুমিল্লা অঞ্চলে পট্টিকেরা নামে আর একটি রাজ্য স্থাপিত হয়। কুমিল্লার নিকটবর্তী পট্টিকেরা পরগনা এখনও এই প্রাচীন রাজ্যের স্মৃতি রক্ষা করছে।
পালরাজগণের এই আভ্যন্তরিক দুরবস্থার সময় কর্ণাটের চালুক্যরাজগণ বাংলাদেশ আক্রমণ করেন। চালুক্যরাজ প্রথম সোমেশ্বর (১০৪২-৬৮ খ্রিষ্টাব্দ), দ্বিতীয় সোমেশ্বর (১০৬৮-৭৬ খ্রিষ্টাব্দ) এবং বিক্রমাদিত্যের (১০৭৬-১১২৭ খ্রিষ্টাব্দ) লিপিতে গৌড় ও বঙ্গজয়ের উল্লেখ আছে। রাজকবি বিহ্মণের বিক্রমাঙ্কদেবচরিতে বর্ণিত হয়েছে যে বিক্রমাদিত্য তাঁর পিতা প্রথম সোমেশ্বরের রাজ্যকালে দিগ্বিজয়ে বহির্গত হয়ে গৌড় ও কামরূপ জয় করেন। এ হতে অনুমিত হয় যে, ১০৪২-৭৬ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে বঙ্গদেশ পুনঃ পুনঃ চালুক্যরাজগণ কর্তৃক আক্রান্ত হয়েছিল। ১০৫৩ খ্রিষ্টাব্দের পূর্বেই এই আক্রমণ আরম্ভ হয়, কারণ ঐ তারিখে কেলবাদি লিপিতে প্রথম সোমেশ্বর কর্তৃক বঙ্গজয়ের উল্লেখ আছে। সুযোগ পেয়ে উড়িষ্যার রাজগণও বাংলা আক্রমণ করলেন। সোমবংশীয় রাজা মহাশিবগুপ্ত যযাতি গৌড়, বঙ্গ ও রাঢ়ায় জয়লাভ করেছিলেন এবং রাজা উদ্যোতমেশরী গৌড়ীয় সৈন্যকে পরাস্ত করেছিলেন। এদের কারো তারিখ সঠিক জানা যায় না। কিন্তু খুব সম্ভবত উভয়েই একাদশ শতাব্দীতে রাজত্ব করতেন।
কামরূপের রাজা রত্নপালের রাজত্বে ২৫ বছরে লিখিত বড়গাঁও লিপিতে তাঁর গৌড়ের বিরুদ্ধে অভিযানের আভাস পাওয়া যায়। রত্নপালের বড়গাঁও লিপিতে তাঁর দিগ্বিজয়ের উল্লেখ আছে। এতে বলা হয়েছে যে, রত্নপাল ‘শক রাজ রূপ ক্রীড়া পক্ষীর দৃঢ় পঞ্জর-স্বরূপ গুর্জরাধিপতির জ্বরসদৃশ, দুর্দান্ত গৌড়াধিপতিরূপ হস্তীর কূটপাকল (হস্তী-জ্বর) প্রতিম, কেরলেশ্বর-রূপ পর্বতের শিলা জতু-তুল্য, বাহিক ও তায়িক (উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ) রাজের আতঙ্কজনক, দাক্ষিণাত্য ভূপতিগণের রাজযক্ষেণাপম।’ এরূপ উচ্ছ্বসিত ভাষায় আসমুদ্র হিমাচল ভারতের দিগি¦জয় কাহিনীর কোনো ঐতিহাসিক মূল্য আছে কিনা সন্দেহ। গৌড়াধিপতির ‘দুর্দান্ত’ বিশেষণটি বিশেষ লক্ষণীয়। কামরূপের নিকটবর্তী বঙ্গদেশের রত্নপালের সাথে নয়পালের সংঘর্ষ অবশ্য একেবারে অসম্ভব নয়। কেবল গৌড় ও বঙ্গে নয়, মগধেও যে পালবংশ হীনবল হয়ে পড়েছিল গয়া নগরীর চারটি শিলালিপি হতে তা জানা যায়। তৃতীয় বিগ্রহপালের মৃত্যুকালে (১০৭১-৭২ খ্রিষ্টাব্দ) পালরাজ্য বৈদেশিক শত্রুর আক্রমণে ও অন্তর্বিপ্লবে ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল। তৃতীয় বিগ্রহপালের তিন পুত্র ছিল- দ্বিতীয় মহীপাল, দ্বিতীয় শূরপাল ও রামপাল। দ্বিতীয় মহীপাল পিতার মৃত্যুর পর সিংহাসনে আরোহণ করলেন। কিন্তু চারদিকেই তখন বিশৃঙ্খলা ও ষড়যন্ত্র চলছিল। দুষ্ট লোকের কথায় রাজার বিশ্বাস হলো যে, তাঁর দুই ভ্রাতা এই সমুদয় ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আছেন। সম্ভবত দ্বিতীয় মহীপালকে হত্যা করে তারা সিংহাসন দখল করতে পারে।৫৫৭
সুতরাং তিনি তাদেরকে কারারুদ্ধ করে রাখলেন। কিন্তু শীঘ্রই বরেন্দ্রের সামন্তবর্গ প্রকাশ্যভাবে বিদ্রোহী হয়ে রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল। মহীপালের সৈন্য বা যুদ্ধসজ্জা যথেষ্ট পরিমাণে ছিল না; কিন্তু মন্ত্রিগণের পরামর্শ অগ্রাহ্য করে তিনি বিদ্রোহীগণের সাথে যুদ্ধ করেতে অগ্রসর হলেন। মহীপাল পরাস্ত ও নিহত হলেন। প্রধান জাতীয় নায়ক দিব্য (দিবোক বা দিম্বোক) বরেন্দ্রের রাজা হলেন। রাজা দ্বিতীয় মহীপালের মৃত্যু হলে (১০৭৫ খ্রিষ্টাব্দ) দ্বিতীয় শূরপাল পাল বংশের সিংহাসনের অধিকারী হন। কিন্তু রামচরিতে সন্ধ্যাকর নন্দী শূরপালের নাম উল্লেখ করেননি। সম্ভবত অল্পসময়ের ভিতরই তাঁকে সরিয়ে রামপাল সিংহাসন অধিকার করেন (১০৭৭ খ্রিষ্টাব্দে); রামচরিতে শূরপালের রাজা হওয়ার কোনো উলেখ নেই।৫৫৮ কিন্তু মদনপালের‘মনহালি শাসনে’ রামপালের নামের উলেখ করা হয়েছে। সম্ভবত অতি অল্প সময়ের জন্য হলেও শূরপাল রাজ্য শাসন করেছেন। দ্বিতীয় মহীপাল যুদ্ধে নিহত হওয়ার সময় রামপাল ও শূরপাল কারাবন্দী ছিলেন;কোনোভাবে কারামুক্ত হয়ে শূরপাল প্রায় দুই বছর দক্ষিণ-পূর্ব বাংলা ও বিহারে অংশবিশেষ শাসন করেন। ‘মনাহালি তাম্রলিপি’ ছাড়া অন্য কোথাও তার নাম পাওয়া যায় না। রামপালের সময়েই উত্তর বিহার কর্ণাটের রাজা নন্নাদেবের অধিকারে চলে যায়। এ কারণেই রামপাল পশ্চিম বাংলা ও দক্ষিণ বিহারে অধিকার পেলেও দেশের বিরাজমান পরিস্থিতিতে সামন্তরাজাদের তেমন আনুগত্য ছিল না। বরেন্দ্রে দিব্যের শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে, তাঁরপর রৌদুক ও ভীম বরেন্দ্র শাসন করেন। দিব্যের বিষয়ে রামচরিত নীরব থাকলেও ‘বেলাব তাম্রলিপি’ থেকে জানা যায় যে, ভোজবর্মণ ও যতুবর্মণ দিব্যকে নাজেহাল করেছিল।৫৫৯
সন্ধ্যাকর নন্দীর পিতা রাজমন্ত্রীর (সান্ধিবিগ্রাহিক) পদে নিযুক্ত ছিলেন এবং তিনি নিজেও এর অধিকাংশ প্রত্যক্ষ করেছিলেন। সুতরাং রামপালের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী ঘটনা ঘনিষ্ঠভাবে জানার তাঁর বিশেষ সুযোগ ছিল।। কিন্তু এই কাব্যটির সম্যক অর্থ ইতিহাসের উপাদান হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। প্রধান কারণ, কাব্যটি দ্ব্যর্থবোধক। এর প্রতিটি শ্লোকের দুই প্রকার অর্থ আছে। এক অর্থ ধরলে কাব্যটিতে রামায়ণে বর্ণিত রামচন্দ্রের আখ্যান এবং অন্য অর্থে পালরাজগণের, প্রধানত রামপালের ইতিহাস পাওয়া যায়। দ্বিতীয় অর্থব্যঞ্জনার জন্য শ্লোকগুলির শব্দযোজনা এমনভাবে করতে হয়েছে যে, সহজে তা বিশ্লেষণ করা যায় না। এজন্য কবির জীবৎকালে অথবা তার অল্পদিন পরেই এই কাব্যের একটি টীকা রচিত হয়। দুর্ভাগ্যের বিষয় মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালে এই কাব্যের যে একমাত্র পুঁথি আবিষ্কার করেন তাতে সম্পূর্ণ মূলগ্রন্থ ও টীকার এক অংশমাত্র পাওয়া যায়। যে অংশের টীকা নেই, সেই অংশের শ্লোকের প্রকৃত ব্যাখ্যা, বিশেষত তার মধ্যে ঐতিহাসিক ঘটনার যে সমুদয় ইঙ্গিত বা আভাস আছে, তার মর্মগ্রহণ করা সর্বত্র সম্ভবপর হয় নি।
রামচরিত কাব্য হলেও এর ঐতিহাসিক মূল্য অনেক সে সম্বন্দে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। কিন্তু তথাপি এ সম্বন্ধে কয়েকটি মন্তব্য করা প্রয়োজন। রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেন, রামচরিত প্রন্থখানি ঐতিহাসিক কাব্য হলেও এটি কাব্য, ইতিহাস নয়। সুতরাং এতে ঐতিহাসিকের অপক্ষপাত দৃষ্টি ও বিচারের আশা করা যায় না। বিশেষত তাঁর কাব্যের নায়ক রামপাল সম্বন্ধে তাঁর যে কবিসূলভ উচ্চ ধারণা ছিল তার স্পষ্ট প্রমাণ এই গ্রন্থে পাওয়া যায়।
সুতরাং রামপাল সম্বন্ধে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা ও তাঁর বিপক্ষ বা শত্রু সম্বন্ধে তীব্র নিন্দা, এই কাব্যে এ-দুয়েরই আধিক্য থাকার সম্ভাবনা।দৃষ্টান্তস্বরূপ মহীপাল ও দিব্য সম্বন্ধে কবির বিরূপ মন্তব্য ও রামপালের অকলঙ্ক চরিত্রের ও সর্ববিধ গুণের উচ্চপ্রশংসা- এ দুটিই কিছু অতিরঞ্জিত।রামচরিত কাব্যে মহীপাল সম্বন্ধে বলা হয়েছে যে, তিনি ‘অনীতি কারম্ভরত (১।৩১) অর্থাৎ নীতিবিরুদ্ধ কার্যকলাপে রত হয়েছিলেন। এই নীতিবিরুদ্ধ কার্য কি, এই শ্লোকের টীকাতে তার ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। যিনি এই টীকা লিখেছিলেন তিনি কাব্যের ইঙ্গিত ও আভাসগুলির মর্ম জানতেন এরূপ মনে করা অসঙ্গত নয়।
সুতরাং মূল কাব্যে ও টীকায় যা আছে তা সন্ধ্যাকর নন্দীরই বক্তব্য এই অনুমান করা যায়। রামচরিত কাব্য অথবা সন্দ্যাকর নন্দী সম্বন্ধে যে সমুদয় মন্তব্য করা হয়েছে তা এই ধারণার উপরই প্রতিষ্ঠিত।রামচরিত কাব্যের একটি শ্লোকে (১। ৩৫) কারারুদ্ধ রামপালের খাদ্যাভাবে শরীরক্ষয় এবং দুঃসহ নিগ্রহ বা অপকার সহ্য করা বা আর একটি শ্লোকে (১। ৩৭) রামপালের বিরুদ্ধে মহীপালের ‘বহু শাঠ্য প্রয়োগের’ কথা আছে। এসব কাব্যের নানাস্থানে নানা প্রসঙ্গে সন্ধ্যাকর নন্দী মহীপালকে নানা বিশেষণে ভূষিত করেছেন- ‘দুর্ণয়ভাজ’ (দুর্নীতিপরায়ণ জ্যেষ্ঠভ্রাতার যুদ্ধবাসনা) (১।২২)। ‘অনীতি কারম্ভরত’ (নীতিবিরুদ্ধে কার্যে রত) (১।৩১); ‘কুট্টিম কঠোর’ (বিষম- প্রস্তরসমূহের কুট্টিমের ন্যায় কঠিনচিত্ত) ও ‘চিরকূট’ (বিচিত্র মায়াকারী) (১।৩২); ‘ভূতনয়াত্রাণযুক্ত’ (সত্য ও নীতির অরক্ষণে প্রসক্ত) (১।৩৬); এই সমুদয় উক্তি যে বিদ্বেষমূলক তাতে সন্দেহ নেই; কেবল একটি শ্লোকে (১।২৯) সন্ধ্যাকর নন্দী মহীপালকে রাজপ্রবর বলে উল্লেখ করেছেন। এর সাধারণ অর্থ ‘নৃপতি-শ্রেষ্ঠ’; কিন্তু পূর্বোক্ত বিশেষণগুলি স্মরণ করলে এই অর্থ সঙ্গত মনে হয় না। একই শব্দের দুই অর্থ করতে হলে অনেক কষ্টকল্পনা করতে হয়। প্র ম অর্থে রামচন্দ্রের পক্ষে এর সাধারণ অর্থ প্রযোজ্য। কিন্তু ‘প্রবর’ শব্দের আর এক অর্থ জ্যেষ্ঠ পুত্র। সম্ভবত মহীপালের পক্ষে এই ব্যাখ্যাই প্রযোজ্য। রামচরিত কাব্যে মহীপালকে যেরূপ হঠকারী ও নিষ্ঠুর রাজা বলে চিত্রিত করা হয়েছে তা নিছক সত্য নাও হতে পারে। মহীপাল যে তাঁর দুই ভ্রাতাকে কারারুদ্ধ করেছিলেন তার সমর্থনে কবি বলেছেন যে, দুষ্ট লোকেরা প্রচার করেছিল যে, তাঁরা রাজ্যলাভের জন্য রাজার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আছেন। কিন্তু এটিও অসম্ভব নয় যে, নিজেরা রাজা হওয়ার জন্য তাঁরা মহীপালের বিরুদ্ধে কোনো ষড়যন্ত্রে সত্যসত্যই লিপ্ত ছিলেন; কারণ সে যুগে এর বহু দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। মহীপাল মন্ত্রিগণের পরামর্শ অগ্রাহ্য করে যে বিদ্রোহদমনে অগ্রসর হয়েছিলেন এটি তাঁর হঠকারিতার প্রমাণ বলে উল্লেখ করেছেন, কিন্তু মন্ত্রিগণ বিদ্রোহদমনের অপর কি উপায় অবলম্বন করতে পরামর্শ দিয়েছেন কবি তার উল্লেখ করেন নি।
বিদ্রোহের ফলে যে দিব্য বরেন্দ্রের রাজা হয়েছিলেন তিনিও মহীপালের অধীনে উচ্চ রাজকার্যে নিযুক্ত ছিলেন। সুতরাং মন্ত্রীদের পরামর্শ অগ্রাহ্য করা যে মহীপালের পক্ষে হঠকারিতার পরিচায়ক এই মত নিঃসন্দেহে গ্রহণ করা যায় না। দিব্য ও অন্যান্য মন্ত্রীকে তিনি যে বিশ্বাস করেন নি হয়ত তার যথেষ্ট কারণ ছিল। সন্ধ্যাকর নন্দী দিব্যের সম্বন্ধে যে সমুদয় কঠোর মন্তব্য করেছেন তাও কিছু পরিমাণে অতিরঞ্জিত বলে মনে করার কারণ আছে। যে ‘রামপাল সেই কুৎসিত (কৈবর্ত নৃপতির) ভারে নিমগ্ন পৃথিবীর উদ্ধারকর্তা’। অন্যত্র দিব্যকে ‘দস্যু’ বলা হয়েছে। এরকম আরো দৃষ্টান্ত দেওয়া যায়। তবে অন্য কোনো প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত রামচরিত-রচয়িতা সন্ধ্যাকর নন্দীর ঐতিহাসিকবিরুদ্ধ মনোভাব অর্থাৎ রামপালের প্রতি পক্ষপাতিত্ব সম্বন্ধে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্ত করা যায় না।
———————————————
৫৫৪ নরসিংহ মন্দির লিপি, শ্লোক নং ৫।
৫৫৫ Dynastic History of Northern India; H.C. Roy.
৫৫৬ Epigraphia Indica, vol. II, pp. 530-31.
৫৫৭ রামচরিত; বরেন্দ্র গবেষণা সমিতি সম্পাদিত, শ্লোক নং- ১/৩৩-৩৬।
৫৫৮ আর,ডি, ব্যানার্জী; বাংলার ইতিহাস।
৫৫৯ বরেন্দ্র বরেন্দ্র গবেষণা সমিতি; বাংলার তাম্রলিপি-৩।
আগামী পর্বেঃ পাল সাম্রাজ্যের পতন (ক্রমশ)- বরেন্দ্র বিদ্রোহ, রামপাল (১০৭৭-১১৩০ খ্রিষ্টাব্দ)
(প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্ব ৮৮
পাল সাম্রাজ্যের পতন পর্ব ৮৮’র পর
এর পরেই বলা হয়েছ- ‘শ্রী শূদ্রকঃ স্বয়মুপাজয়দিন্দ্র-কল্পো গৌশ্বেরো নৃপতি লক্ষণ পূজয়া ষং।’ নানা পণ্ডিত এর নানা অর্থ করেছেন। কীলহর্ণ বলেন যে, ‘ইন্দ্রতুল্য গৌড়পতি স্বয়ং তাঁকে (শূদ্রককে) নরপতির ন্যায় পূজা করেছিলেন।’ শূদ্রক এবং তার দুই পুত্র বিশ্বদিত্য ও বিশ্বরূপ দীর্ঘদিন নিজ শক্তিবলে গয়া শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করেছেন।৫৫৪ বিশেষ করে নরপাল ও তৃতীয় বিগ্রহপালের সময়ে সুদ্রকের এই অবদানের জন্য রাজা নয়পাল তাকে গয়ার মণ্ডল নিযুক্ত করেন। মগধে এই শূদ্রক পরিবার তখন শুধু অতি উচ্চ মর্যাদাই লাভ করেনি, দ্বিতীয় রামপালের মৃত্যুর পর তারা স্বাধীনতা ঘোষণা করে।৫৫৫ একইভাবে, মহামাণ্ডলিক ঈশ্বরঘোষ ঢেক্করীতে রাজধানী স্থাপিত করে একটি স্বাধীন রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন। দিনাজপুর জেলার রানী শাঁকাইল থানার অন্তর্গত রাজগঞ্জের নিকটে প্রাপ্ত একটি তাম্রশাসন হতে এর বিবরণ পাওয়া যায়। এই তাম্রশাসনখানি দ্বারা মহামান্ডলিক ঈশ্বর ঘোষ ৩৫ সম্বৎসরে কয়েকজন ব্রাহ্মণকে ভূমিদান করেন। তাম্রশাসনখানির নিন্মে বংশাবলী দেওয়া হয়েছে:
ধূর্ত ঘোষ
বাল ঘোষ
ধবল ঘোষ = সম্ভাবা
ঈশ্বর ঘোষ
ধূর্ত ঘোষ ও বাল ঘোষ যোদ্ধা ছিলেন। ধবল ঘোষ সম্বন্ধে বলা হয়েছে যে, বীর ও যোদ্ধা ছিলেন এবং তাঁর প্রতাপ জগতে গীত হতো (জগতি গীত মহাপ্রতাপঃ); তিনি প্রবল অরিকুলের বজ্রস্বরূপ ছিলেন এবং প্রবল শত্রুগণকে ধ্বংস করেছিলেন। যদিও ঈশ্বর ঘোষের একমাত্র উপাধি ‘মহামাণ্ডলিক’ তথাপি পরাক্রান্ত সম্রাটগণের তাম্রশাসনে যে ভাষায় দানপত্র লিখিত হয় এই তাম্রশাসনটিতে তা অবিকল নকল করা হয়েছে অর্থাৎ ‘রাজা-রাজকন্যা, রাজ্ঞী, রাণক, রাজপুত্র, কুমারমাত্য’ এবং অপর প্রায় ৫০ জন রাজকর্মচারীকে উদ্দেশ্য করে এই দানপত্র আরম্ভ করা হয়েছে। সুতরাং ঈশ্বর ঘোষ প্রকৃতপক্ষে স্বাধীন নরপতিই ছিলেন। কিন্তু তিনি মহামাণ্ডলিক বলেই পরিচিত ছিলেন। অর্থাৎ পরবর্তীকালের মহারাষ্ট্রীয় সিন্ধিয়া হোলকার প্রভৃতির ন্যায় নামত রাজার অধীনতা স্বীকার করতেন- এটিই সম্ভব বলে মনে হয়। এটি স্মরণ করলে তাম্রশাসনের শেষে যে লিখিত আছে সম্বৎ ৩৫- এটি তাঁরই রাজ্য সম্বৎসর কিনা নিশ্চিত বলা যায় না। কারণ, তিনি ৩৫ বছর রাজত্ব করেছেন অথচ রাজোপাধি ধারণ করেন নি-সে যুগে, যখন দ্রুতবেগে রাজ্যের উত্থান পতন হচ্ছে, তখন এটি একটু অস্বাভাবিক বলেই মনে হয়। সম্ভবত এতদিন যে পালরাজবংশের অধীনে তিনি ও তাঁর পূর্বপুরুষ সামরিক কর্মচারী ছিলেন সেই রাজারই সংবৎ ব্যবহার করেছেন। তবে এ সকলই অনুমানমাত্র।
ঈশ্বর ঘোষের রাজ্য কোথায় ছিল তাও নিশ্চিত জানা যায় না। রাজশাসন ঢেক্করী হতে প্রদত্ত হয়েছে- সুতরাং এটি তাঁর রাজধানী ছিল বলে মনে করা যেতে পারে। ঈশ্বর ঘোষ পুণ্যদিনে জটোদা নদীতে স্নান করে একটি গ্রাম দান করেছিলেন এটিও তাম্রশাসনে উল্লিখিত হয়েছে। সুতরাং ঢেক্করী ও জটোদা নদী তাঁর রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। কালিকা পুরাণে কামরূপে জটোদা নদীর কথা আছে। নগেন্দ্রনাথ বসু এজন্য ঢেক্করী আসামে ছিল এই মত প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু রামচরিত গ্রন্থে রামপালের সামন্তবর্গের মধ্যে ঢেক্করীর মহাসামন্ত রাজা প্রতাপসিংহের নাম পাওয়া যায়- ইনি মণ্ডলাধিপতি ছিলেন। সুতরাং ঈশ্বর ঘোষের অনতিকাল পরে ইনিই ঢেক্করীর মহামাণ্ডলিক ছিলেন। এই ঢেক্করী কাটোয়ার নিকট বর্ধমান জেলার দক্ষিণ আউসগ্রাম থানায় অজয় নদীর দক্ষিণ তীরে ঢেকরগড় নামক স্থানের সাথে অভিন্ন বলে অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় ও হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মনে করেন। এটি খুবই সঙ্গত মনে হয়। এই প্রসঙ্গে বলা যেতে পারে পঞ্চদশ শতকের কাছাকাছি কোনো সময়ে নির্মিত ইছাই ঘোষের মন্দির (বর্ধমান জেলার অন্তর্গত গৌরাঙ্গপুরে) এখনও দেখতে পাওয়া যায়।
ঘনরামের ধর্মমঙ্গল কাব্যে লাউসেনের অপূর্ব কীর্তিকলাপ বর্ণনার প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, অজয় ইছাই ঘোষকে জয় করে তিনি বুঝিয়েছেন বিক্রমে তাঁর সমকক্ষ নেই। রামচরিতে উল্লিখিত ঢেক্করীরাজ প্রতাপসিংহের উল্লেখ হতে প্রমাণিত হয় যে, ঈশ্বর ঘোষের অল্পকাল পরেই ঢেক্করী তাঁর বংশরদের হস্তচ্যুত হয়। রামগঞ্জ তাম্রশাসনের তারিখ সংবৎ ৩৫ সম্বন্ধে পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। প্রসঙ্গত বলা যেতে পারে যে, দেবদত্ত রামকৃষ্ণ ভাণ্ডারকর একে চালুক্যরাজ বিক্রমাদিত্যের প্রবর্তিত নতুন অব্দের তারিখ বলে অনুমান করেছেন, কিন্তু রমেশচন্দ্র মজুমদার এটি সঙ্গত মনে করেননি। একই সময়ে মগধে মন নামধারী এক বংশের পরিচয় পাওয়া যায় যারা নিজেদেরকে মগধের প্রভু বলে পরিচয় দিতেন। এই বংশের প্রথম ছিলেন ভর্ণমন এবং দ্বিতীয় একজনের নাম জানা যায় রুদ্রমণ। তারা ১১শ শতাব্দীর শেষদিকে অথবা ১২শ শতাব্দীর প্রথমদিকে মগধে প্রায় স্বাধীন রাজারূপে আত্মপ্রকাশ করেন।৫৫৬
পূর্ববঙ্গে দুটি স্বাধীন রাজ্যের প্রতিষ্ঠা হয়। বর্মবংশীয় রাজগণ বিক্রমপুরে রাজধানী স্থাপন করে পূর্ববঙ্গের কতকাংশ শাসন করেন। কুমিল্লা অঞ্চলে পট্টিকেরা নামে আর একটি রাজ্য স্থাপিত হয়। কুমিল্লার নিকটবর্তী পট্টিকেরা পরগনা এখনও এই প্রাচীন রাজ্যের স্মৃতি রক্ষা করছে।
পালরাজগণের এই আভ্যন্তরিক দুরবস্থার সময় কর্ণাটের চালুক্যরাজগণ বাংলাদেশ আক্রমণ করেন। চালুক্যরাজ প্রথম সোমেশ্বর (১০৪২-৬৮ খ্রিষ্টাব্দ), দ্বিতীয় সোমেশ্বর (১০৬৮-৭৬ খ্রিষ্টাব্দ) এবং বিক্রমাদিত্যের (১০৭৬-১১২৭ খ্রিষ্টাব্দ) লিপিতে গৌড় ও বঙ্গজয়ের উল্লেখ আছে। রাজকবি বিহ্মণের বিক্রমাঙ্কদেবচরিতে বর্ণিত হয়েছে যে বিক্রমাদিত্য তাঁর পিতা প্রথম সোমেশ্বরের রাজ্যকালে দিগ্বিজয়ে বহির্গত হয়ে গৌড় ও কামরূপ জয় করেন। এ হতে অনুমিত হয় যে, ১০৪২-৭৬ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে বঙ্গদেশ পুনঃ পুনঃ চালুক্যরাজগণ কর্তৃক আক্রান্ত হয়েছিল। ১০৫৩ খ্রিষ্টাব্দের পূর্বেই এই আক্রমণ আরম্ভ হয়, কারণ ঐ তারিখে কেলবাদি লিপিতে প্রথম সোমেশ্বর কর্তৃক বঙ্গজয়ের উল্লেখ আছে। সুযোগ পেয়ে উড়িষ্যার রাজগণও বাংলা আক্রমণ করলেন। সোমবংশীয় রাজা মহাশিবগুপ্ত যযাতি গৌড়, বঙ্গ ও রাঢ়ায় জয়লাভ করেছিলেন এবং রাজা উদ্যোতমেশরী গৌড়ীয় সৈন্যকে পরাস্ত করেছিলেন। এদের কারো তারিখ সঠিক জানা যায় না। কিন্তু খুব সম্ভবত উভয়েই একাদশ শতাব্দীতে রাজত্ব করতেন।
কামরূপের রাজা রত্নপালের রাজত্বে ২৫ বছরে লিখিত বড়গাঁও লিপিতে তাঁর গৌড়ের বিরুদ্ধে অভিযানের আভাস পাওয়া যায়। রত্নপালের বড়গাঁও লিপিতে তাঁর দিগ্বিজয়ের উল্লেখ আছে। এতে বলা হয়েছে যে, রত্নপাল ‘শক রাজ রূপ ক্রীড়া পক্ষীর দৃঢ় পঞ্জর-স্বরূপ গুর্জরাধিপতির জ্বরসদৃশ, দুর্দান্ত গৌড়াধিপতিরূপ হস্তীর কূটপাকল (হস্তী-জ্বর) প্রতিম, কেরলেশ্বর-রূপ পর্বতের শিলা জতু-তুল্য, বাহিক ও তায়িক (উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ) রাজের আতঙ্কজনক, দাক্ষিণাত্য ভূপতিগণের রাজযক্ষেণাপম।’ এরূপ উচ্ছ্বসিত ভাষায় আসমুদ্র হিমাচল ভারতের দিগি¦জয় কাহিনীর কোনো ঐতিহাসিক মূল্য আছে কিনা সন্দেহ। গৌড়াধিপতির ‘দুর্দান্ত’ বিশেষণটি বিশেষ লক্ষণীয়। কামরূপের নিকটবর্তী বঙ্গদেশের রত্নপালের সাথে নয়পালের সংঘর্ষ অবশ্য একেবারে অসম্ভব নয়। কেবল গৌড় ও বঙ্গে নয়, মগধেও যে পালবংশ হীনবল হয়ে পড়েছিল গয়া নগরীর চারটি শিলালিপি হতে তা জানা যায়। তৃতীয় বিগ্রহপালের মৃত্যুকালে (১০৭১-৭২ খ্রিষ্টাব্দ) পালরাজ্য বৈদেশিক শত্রুর আক্রমণে ও অন্তর্বিপ্লবে ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল। তৃতীয় বিগ্রহপালের তিন পুত্র ছিল- দ্বিতীয় মহীপাল, দ্বিতীয় শূরপাল ও রামপাল। দ্বিতীয় মহীপাল পিতার মৃত্যুর পর সিংহাসনে আরোহণ করলেন। কিন্তু চারদিকেই তখন বিশৃঙ্খলা ও ষড়যন্ত্র চলছিল। দুষ্ট লোকের কথায় রাজার বিশ্বাস হলো যে, তাঁর দুই ভ্রাতা এই সমুদয় ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আছেন। সম্ভবত দ্বিতীয় মহীপালকে হত্যা করে তারা সিংহাসন দখল করতে পারে।৫৫৭
সুতরাং তিনি তাদেরকে কারারুদ্ধ করে রাখলেন। কিন্তু শীঘ্রই বরেন্দ্রের সামন্তবর্গ প্রকাশ্যভাবে বিদ্রোহী হয়ে রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করল। মহীপালের সৈন্য বা যুদ্ধসজ্জা যথেষ্ট পরিমাণে ছিল না; কিন্তু মন্ত্রিগণের পরামর্শ অগ্রাহ্য করে তিনি বিদ্রোহীগণের সাথে যুদ্ধ করেতে অগ্রসর হলেন। মহীপাল পরাস্ত ও নিহত হলেন। প্রধান জাতীয় নায়ক দিব্য (দিবোক বা দিম্বোক) বরেন্দ্রের রাজা হলেন। রাজা দ্বিতীয় মহীপালের মৃত্যু হলে (১০৭৫ খ্রিষ্টাব্দ) দ্বিতীয় শূরপাল পাল বংশের সিংহাসনের অধিকারী হন। কিন্তু রামচরিতে সন্ধ্যাকর নন্দী শূরপালের নাম উল্লেখ করেননি। সম্ভবত অল্পসময়ের ভিতরই তাঁকে সরিয়ে রামপাল সিংহাসন অধিকার করেন (১০৭৭ খ্রিষ্টাব্দে); রামচরিতে শূরপালের রাজা হওয়ার কোনো উলেখ নেই।৫৫৮ কিন্তু মদনপালের‘মনহালি শাসনে’ রামপালের নামের উলেখ করা হয়েছে। সম্ভবত অতি অল্প সময়ের জন্য হলেও শূরপাল রাজ্য শাসন করেছেন। দ্বিতীয় মহীপাল যুদ্ধে নিহত হওয়ার সময় রামপাল ও শূরপাল কারাবন্দী ছিলেন;কোনোভাবে কারামুক্ত হয়ে শূরপাল প্রায় দুই বছর দক্ষিণ-পূর্ব বাংলা ও বিহারে অংশবিশেষ শাসন করেন। ‘মনাহালি তাম্রলিপি’ ছাড়া অন্য কোথাও তার নাম পাওয়া যায় না। রামপালের সময়েই উত্তর বিহার কর্ণাটের রাজা নন্নাদেবের অধিকারে চলে যায়। এ কারণেই রামপাল পশ্চিম বাংলা ও দক্ষিণ বিহারে অধিকার পেলেও দেশের বিরাজমান পরিস্থিতিতে সামন্তরাজাদের তেমন আনুগত্য ছিল না। বরেন্দ্রে দিব্যের শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে, তাঁরপর রৌদুক ও ভীম বরেন্দ্র শাসন করেন। দিব্যের বিষয়ে রামচরিত নীরব থাকলেও ‘বেলাব তাম্রলিপি’ থেকে জানা যায় যে, ভোজবর্মণ ও যতুবর্মণ দিব্যকে নাজেহাল করেছিল।৫৫৯
সন্ধ্যাকর নন্দীর পিতা রাজমন্ত্রীর (সান্ধিবিগ্রাহিক) পদে নিযুক্ত ছিলেন এবং তিনি নিজেও এর অধিকাংশ প্রত্যক্ষ করেছিলেন। সুতরাং রামপালের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী ঘটনা ঘনিষ্ঠভাবে জানার তাঁর বিশেষ সুযোগ ছিল।। কিন্তু এই কাব্যটির সম্যক অর্থ ইতিহাসের উপাদান হিসেবে গ্রহণ করা যায় না। প্রধান কারণ, কাব্যটি দ্ব্যর্থবোধক। এর প্রতিটি শ্লোকের দুই প্রকার অর্থ আছে। এক অর্থ ধরলে কাব্যটিতে রামায়ণে বর্ণিত রামচন্দ্রের আখ্যান এবং অন্য অর্থে পালরাজগণের, প্রধানত রামপালের ইতিহাস পাওয়া যায়। দ্বিতীয় অর্থব্যঞ্জনার জন্য শ্লোকগুলির শব্দযোজনা এমনভাবে করতে হয়েছে যে, সহজে তা বিশ্লেষণ করা যায় না। এজন্য কবির জীবৎকালে অথবা তার অল্পদিন পরেই এই কাব্যের একটি টীকা রচিত হয়। দুর্ভাগ্যের বিষয় মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালে এই কাব্যের যে একমাত্র পুঁথি আবিষ্কার করেন তাতে সম্পূর্ণ মূলগ্রন্থ ও টীকার এক অংশমাত্র পাওয়া যায়। যে অংশের টীকা নেই, সেই অংশের শ্লোকের প্রকৃত ব্যাখ্যা, বিশেষত তার মধ্যে ঐতিহাসিক ঘটনার যে সমুদয় ইঙ্গিত বা আভাস আছে, তার মর্মগ্রহণ করা সর্বত্র সম্ভবপর হয় নি।
রামচরিত কাব্য হলেও এর ঐতিহাসিক মূল্য অনেক সে সম্বন্দে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। কিন্তু তথাপি এ সম্বন্ধে কয়েকটি মন্তব্য করা প্রয়োজন। রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেন, রামচরিত প্রন্থখানি ঐতিহাসিক কাব্য হলেও এটি কাব্য, ইতিহাস নয়। সুতরাং এতে ঐতিহাসিকের অপক্ষপাত দৃষ্টি ও বিচারের আশা করা যায় না। বিশেষত তাঁর কাব্যের নায়ক রামপাল সম্বন্ধে তাঁর যে কবিসূলভ উচ্চ ধারণা ছিল তার স্পষ্ট প্রমাণ এই গ্রন্থে পাওয়া যায়।
সুতরাং রামপাল সম্বন্ধে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা ও তাঁর বিপক্ষ বা শত্রু সম্বন্ধে তীব্র নিন্দা, এই কাব্যে এ-দুয়েরই আধিক্য থাকার সম্ভাবনা।দৃষ্টান্তস্বরূপ মহীপাল ও দিব্য সম্বন্ধে কবির বিরূপ মন্তব্য ও রামপালের অকলঙ্ক চরিত্রের ও সর্ববিধ গুণের উচ্চপ্রশংসা- এ দুটিই কিছু অতিরঞ্জিত।রামচরিত কাব্যে মহীপাল সম্বন্ধে বলা হয়েছে যে, তিনি ‘অনীতি কারম্ভরত (১।৩১) অর্থাৎ নীতিবিরুদ্ধ কার্যকলাপে রত হয়েছিলেন। এই নীতিবিরুদ্ধ কার্য কি, এই শ্লোকের টীকাতে তার ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। যিনি এই টীকা লিখেছিলেন তিনি কাব্যের ইঙ্গিত ও আভাসগুলির মর্ম জানতেন এরূপ মনে করা অসঙ্গত নয়।
সুতরাং মূল কাব্যে ও টীকায় যা আছে তা সন্ধ্যাকর নন্দীরই বক্তব্য এই অনুমান করা যায়। রামচরিত কাব্য অথবা সন্দ্যাকর নন্দী সম্বন্ধে যে সমুদয় মন্তব্য করা হয়েছে তা এই ধারণার উপরই প্রতিষ্ঠিত।রামচরিত কাব্যের একটি শ্লোকে (১। ৩৫) কারারুদ্ধ রামপালের খাদ্যাভাবে শরীরক্ষয় এবং দুঃসহ নিগ্রহ বা অপকার সহ্য করা বা আর একটি শ্লোকে (১। ৩৭) রামপালের বিরুদ্ধে মহীপালের ‘বহু শাঠ্য প্রয়োগের’ কথা আছে। এসব কাব্যের নানাস্থানে নানা প্রসঙ্গে সন্ধ্যাকর নন্দী মহীপালকে নানা বিশেষণে ভূষিত করেছেন- ‘দুর্ণয়ভাজ’ (দুর্নীতিপরায়ণ জ্যেষ্ঠভ্রাতার যুদ্ধবাসনা) (১।২২)। ‘অনীতি কারম্ভরত’ (নীতিবিরুদ্ধে কার্যে রত) (১।৩১); ‘কুট্টিম কঠোর’ (বিষম- প্রস্তরসমূহের কুট্টিমের ন্যায় কঠিনচিত্ত) ও ‘চিরকূট’ (বিচিত্র মায়াকারী) (১।৩২); ‘ভূতনয়াত্রাণযুক্ত’ (সত্য ও নীতির অরক্ষণে প্রসক্ত) (১।৩৬); এই সমুদয় উক্তি যে বিদ্বেষমূলক তাতে সন্দেহ নেই; কেবল একটি শ্লোকে (১।২৯) সন্ধ্যাকর নন্দী মহীপালকে রাজপ্রবর বলে উল্লেখ করেছেন। এর সাধারণ অর্থ ‘নৃপতি-শ্রেষ্ঠ’; কিন্তু পূর্বোক্ত বিশেষণগুলি স্মরণ করলে এই অর্থ সঙ্গত মনে হয় না। একই শব্দের দুই অর্থ করতে হলে অনেক কষ্টকল্পনা করতে হয়। প্র ম অর্থে রামচন্দ্রের পক্ষে এর সাধারণ অর্থ প্রযোজ্য। কিন্তু ‘প্রবর’ শব্দের আর এক অর্থ জ্যেষ্ঠ পুত্র। সম্ভবত মহীপালের পক্ষে এই ব্যাখ্যাই প্রযোজ্য। রামচরিত কাব্যে মহীপালকে যেরূপ হঠকারী ও নিষ্ঠুর রাজা বলে চিত্রিত করা হয়েছে তা নিছক সত্য নাও হতে পারে। মহীপাল যে তাঁর দুই ভ্রাতাকে কারারুদ্ধ করেছিলেন তার সমর্থনে কবি বলেছেন যে, দুষ্ট লোকেরা প্রচার করেছিল যে, তাঁরা রাজ্যলাভের জন্য রাজার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত আছেন। কিন্তু এটিও অসম্ভব নয় যে, নিজেরা রাজা হওয়ার জন্য তাঁরা মহীপালের বিরুদ্ধে কোনো ষড়যন্ত্রে সত্যসত্যই লিপ্ত ছিলেন; কারণ সে যুগে এর বহু দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। মহীপাল মন্ত্রিগণের পরামর্শ অগ্রাহ্য করে যে বিদ্রোহদমনে অগ্রসর হয়েছিলেন এটি তাঁর হঠকারিতার প্রমাণ বলে উল্লেখ করেছেন, কিন্তু মন্ত্রিগণ বিদ্রোহদমনের অপর কি উপায় অবলম্বন করতে পরামর্শ দিয়েছেন কবি তার উল্লেখ করেন নি।
বিদ্রোহের ফলে যে দিব্য বরেন্দ্রের রাজা হয়েছিলেন তিনিও মহীপালের অধীনে উচ্চ রাজকার্যে নিযুক্ত ছিলেন। সুতরাং মন্ত্রীদের পরামর্শ অগ্রাহ্য করা যে মহীপালের পক্ষে হঠকারিতার পরিচায়ক এই মত নিঃসন্দেহে গ্রহণ করা যায় না। দিব্য ও অন্যান্য মন্ত্রীকে তিনি যে বিশ্বাস করেন নি হয়ত তার যথেষ্ট কারণ ছিল। সন্ধ্যাকর নন্দী দিব্যের সম্বন্ধে যে সমুদয় কঠোর মন্তব্য করেছেন তাও কিছু পরিমাণে অতিরঞ্জিত বলে মনে করার কারণ আছে। যে ‘রামপাল সেই কুৎসিত (কৈবর্ত নৃপতির) ভারে নিমগ্ন পৃথিবীর উদ্ধারকর্তা’। অন্যত্র দিব্যকে ‘দস্যু’ বলা হয়েছে। এরকম আরো দৃষ্টান্ত দেওয়া যায়। তবে অন্য কোনো প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত রামচরিত-রচয়িতা সন্ধ্যাকর নন্দীর ঐতিহাসিকবিরুদ্ধ মনোভাব অর্থাৎ রামপালের প্রতি পক্ষপাতিত্ব সম্বন্ধে নিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্ত করা যায় না।
———————————————
৫৫৪ নরসিংহ মন্দির লিপি, শ্লোক নং ৫।
৫৫৫ Dynastic History of Northern India; H.C. Roy.
৫৫৬ Epigraphia Indica, vol. II, pp. 530-31.
৫৫৭ রামচরিত; বরেন্দ্র গবেষণা সমিতি সম্পাদিত, শ্লোক নং- ১/৩৩-৩৬।
৫৫৮ আর,ডি, ব্যানার্জী; বাংলার ইতিহাস।
৫৫৯ বরেন্দ্র বরেন্দ্র গবেষণা সমিতি; বাংলার তাম্রলিপি-৩।
আগামী পর্বেঃ পাল সাম্রাজ্যের পতন (ক্রমশ)- বরেন্দ্র বিদ্রোহ, রামপাল (১০৭৭-১১৩০ খ্রিষ্টাব্দ)
খবর বিভাগঃ
বাংলাদেশের ইতিহাস