আদি বাংলার ইতিহাস
(প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্ব ৮৭
পাল সাম্রাজ্যের পতন
—————–
নয়পাল (১০৩৮-৫৪ খ্রিষ্টাব্দ)
পাল সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন ও সংরক্ষণের মধ্য দিয়ে প্রায় ২৮৮ বছর অতিবাহিত হওয়ার পর পরবর্তী ১০০ বছর পাল সাম্রাজ্যেল পতন ও বিলুপ্ত হওয়ার কাল।স্থানীয়ভাবে দুর্বল প্রশাসন, চারিদিক থেকে সামরিক আগ্রাসন এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দল পাল সাম্রাজ্য পতনের প্রধান কারণগুলির অন্যতম বলে ঐতিহাসিকদের অভিমত। মহীপালের পরে আর কোনো যোগ্য সম্রাটের কথা শোনা যায় না। মহীপালের পুত্র নয়পাল সিংহাসনে আরোহণ করে অন্তত ১৫ বছর রাজত্ব করেন।৫৪৯ ক্যাম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে রক্ষিত পঞ্চরক্ষা নামক গ্রন্থ নয়পালের রানী উদ্দাকার আদেশে নয়পালের ১৪তম রাজত্ববছরে রচিত হয়েছিল। কলচুরিরাজ গাঙ্গেয়দেবের পুত্র কর্ণ অথবা লক্ষ্মীমকর্ণের (আ. ১০৪১-১০৭০ খ্রিষ্টাব্দ) সাথে সুদীর্ঘকালব্যাপী যুদ্ধই তাঁর রাজত্বকালের প্রধান ঘটনা। তিব্বতীয় গ্রন্থে এই যুদ্ধের বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া যায়। আলনদেবী৫৫০ ও কর্ণের রেওয়া৫৫১ লিপি থেকে জানা যায় যে, রাজা কর্ণ বঙ্গের রাজাকে (নয়পাল) পরাজিত করেছিলেন ১০৪৮-৪৯ খ্রিষ্টাব্দে এবং ঐ সময়েই বেওয়া লিপি রচিত হয়েছিল। কর্ণ মগধ আক্রমণ করে নয়পালকে পরাজিত করেন। তিনি পাল-রাজধানী অধিকার করতে পারেন নি, কিন্তু অনেক বৌদ্ধ প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে মন্দিরের দ্রব্যাদি লুন্ঠন করেন। প্রসিদ্ধ বৌদ্ধ আচার্য অতীশ অথবা দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান তখন মগধে বাস করছিলেন। তিনি প্রথমে কোনো প্রকারে এই যুদ্ধব্যাপারে হস্তক্ষেপ করেন নি। কিন্তু পরে যখন নয়পাল কর্ণকে পরাজিত করে কলচুরিসৈন্য বিধ্বস্ত করছিলেন, তখন দীপঙ্কর কর্ণ ও তাঁর সৈন্যকে আশ্রয় দেন। তাঁর চেষ্টায় উভয় পক্ষের মধ্যে সন্ধি স্থাপিত হয়। প্রচলিত কাহিনী অনুসারে কর্ণের সাথে নয়পালের সন্ধি হওয়ার পরেই দীপঙ্কর তিব্বত গমন করেন। এই ঘটনার তারিখ সম্বন্ধে বহু মতভেদ আছে- ১০৩৮ হতে ১০৪২ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত প্রতি বছরই কোনো কোনো মত অনুসারে অতীশ তিব্বত যাত্রা করেন। কিন্তু এটি যে নয়পালের রাজত্বে- সম্ভবত এর প্রথম ভাগে ঘটেছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। পণ্ডিতগণের ধারণা নয়পালের সঙ্গে কর্ণের যুদ্ধ ও সন্ধি ১০৪৩ খ্রিষ্টাব্দে সংঘটিত হয়েছিল।৫৫২ কিন্তু দীপঙ্করের চেষ্টায় যে সন্ধি হয় তা দীর্ঘকাল স্থায়ী হয় নি।
নয়পালের পুত্র তৃতীয় বিগ্রহপালের রাজত্বকালে (১০৫৪-৭২ খ্রিষ্টাব্দ) কর্ণ পুনরায় বাংলাদেশে যুদ্ধাভিযান করেন। এই যুদ্ধেও কর্ণ প্রথমে জয়লাভ করেন। বীরভূম জেলার অন্তর্গত পাইকোর নামক স্থানে একটি শিলাস্তম্ভের গাত্রে কর্ণো নামে একটি লিপি উৎকীর্ণ আছে। এ থেকে বুঝা যায় যে, তিনি পশ্চিমবঙ্গের কিছু অংশ অধিকার করেছিলেন। কিন্তু পরে তিনি তৃতীয় বিগ্রহপাল কর্তৃক পরাজিত হন। সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিত থেকে জানা যায় যে, তৃতীয় বিগ্রহপালের সাথে কর্ণের কন্যা যৌবনশ্রীর বিবাহ হয়। সম্ভবত এই বৈবাহিক সম্বন্ধ দ্বারা উভয় পক্ষের মধ্যে সন্ধি স্থাপিত হয়। কেউ কেউ মনে করেন যে, পাইকোর স্তম্ভলিপি এই বৈবাহিক সম্বন্ধের স্মৃতিচিহ্নরূপেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এটি দ্বারা কর্ণের বঙ্গদেশের এই অংশ জয় করার সিদ্ধান্ত যুক্তিযুক্ত নয়।
তবে কর্ণ অতঃপর আর বঙ্গদেশের বিরুদ্ধে অভিযান করেন নি। কারণ চন্দেল্লরাজ কীর্তিবর্মণ কর্ণকে যুদ্ধে পরাজিত করেন (১০৬০ হতে ১০৬৪ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে কোনো এক সময়ে) এবং দক্ষিণে চালুক্য এবং পশ্চিমে পরাসর রাজার সাথেও তাঁর সংঘর্ষ হয়। অনতিবিলম্বেই অতি শক্তিশালী শত্র“ চালুক্যরাজ কল্যাণ ৫৫৩ (১০৪২-১০৫৮) গৌড় ও বঙ্গসহ অনেক দেশকে পরাজিত করেছেন বলে অসম্ভর (এক) সমস্বর (দুই) এবং বিক্রমাদিত্য (ছয়) প্রভৃতির তাম্রলিপিতে পাওয়া যায়। সুতরাং পাইকোর শিলালিপি অনুযায়ী কলচুরিরাজ কর্ণ কর্তৃক রাঢ়দেশের কোনো অংশ অধিকৃত হলেও তা দীর্ঘকাল স্থায়ী হয় নি।
ঈশ্বর ঘোষ পালরাজশক্তি ক্রমশই দুর্বল হয়ে পড়লে বাংলার নানা প্রদেশে স্বাধীন খণ্ডরাজ্যের উদ্ভব হয়। এ সময়ে গয়াতে এক সুদ্রক পরিবারের কথা জানা যায়। নয়পালের ১৫ রাজ্য সম্বৎসরের দুটি লিপিতে পরিতোষ তাঁর পুত্র শূদ্রক এবং শূদ্রকের পুত্র বিশ্বরূপ এই তিন (অথবা চার) জনের নাম পাওয়া যায়। একটি লিপিতে উক্ত হয়েছে যে, শূদ্রকের বাহুবলে গয়া নগরী ‘পরিপালিত’ অর্থাৎ রক্ষিত। কিন্তু এর অধিক এই দুই লিপিতে আর কিছুই জানা যায় না। পালরাজ তৃতীয় বিগ্রহপালের পঞ্চম রাজ্য সম্বৎসরে লিখিত তৃতীয় লিপিটিতে শূদ্রকের বহু প্রসংসা করা হয়েছে এবং বিশ্বরূপ সম্বন্ধে বলা হয়েছে যে, তিনি শত্রুগণকে বিনাশ করেছিলেন। বিশ্বরূপের পুত্র যক্ষপালের সময়ে লিখিত চতুর্থ লিপিতে অনেক ঐতিহাসিক তথ্য পাওয়া যায়। এতে বলা হয়েছে যে, শূদ্রক তাঁর শত্রুগণকে পরাজিত করে অরণ্যে আশ্রয় নিতে বাধ্য করেছিলেন।
————————————————
৫৪৯ আমগাচী তাম্রলিপি, শ্লোক নং- ১২।
৫৫০ Epigraphia Indica, vol. II.
৫৫১ Ibid, vol. XXIV.
৫৫২ Abdul Momin Chowdhury: Dynastic History of Bengal, p. 273.
৫৫৩ History and Culture of the Indian People, vol. V, published by the Bharatiya Vidya Bhavan, Mumbai.
আগামী পর্বেঃ পাল সাম্রাজ্যের পতন (ক্রমশ)
(প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্ব ৮৭
পাল সাম্রাজ্যের পতন
—————–
নয়পাল (১০৩৮-৫৪ খ্রিষ্টাব্দ)
পাল সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন ও সংরক্ষণের মধ্য দিয়ে প্রায় ২৮৮ বছর অতিবাহিত হওয়ার পর পরবর্তী ১০০ বছর পাল সাম্রাজ্যেল পতন ও বিলুপ্ত হওয়ার কাল।স্থানীয়ভাবে দুর্বল প্রশাসন, চারিদিক থেকে সামরিক আগ্রাসন এবং অভ্যন্তরীণ কোন্দল পাল সাম্রাজ্য পতনের প্রধান কারণগুলির অন্যতম বলে ঐতিহাসিকদের অভিমত। মহীপালের পরে আর কোনো যোগ্য সম্রাটের কথা শোনা যায় না। মহীপালের পুত্র নয়পাল সিংহাসনে আরোহণ করে অন্তত ১৫ বছর রাজত্ব করেন।৫৪৯ ক্যাম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে রক্ষিত পঞ্চরক্ষা নামক গ্রন্থ নয়পালের রানী উদ্দাকার আদেশে নয়পালের ১৪তম রাজত্ববছরে রচিত হয়েছিল। কলচুরিরাজ গাঙ্গেয়দেবের পুত্র কর্ণ অথবা লক্ষ্মীমকর্ণের (আ. ১০৪১-১০৭০ খ্রিষ্টাব্দ) সাথে সুদীর্ঘকালব্যাপী যুদ্ধই তাঁর রাজত্বকালের প্রধান ঘটনা। তিব্বতীয় গ্রন্থে এই যুদ্ধের বিস্তৃত বিবরণ পাওয়া যায়। আলনদেবী৫৫০ ও কর্ণের রেওয়া৫৫১ লিপি থেকে জানা যায় যে, রাজা কর্ণ বঙ্গের রাজাকে (নয়পাল) পরাজিত করেছিলেন ১০৪৮-৪৯ খ্রিষ্টাব্দে এবং ঐ সময়েই বেওয়া লিপি রচিত হয়েছিল। কর্ণ মগধ আক্রমণ করে নয়পালকে পরাজিত করেন। তিনি পাল-রাজধানী অধিকার করতে পারেন নি, কিন্তু অনেক বৌদ্ধ প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে মন্দিরের দ্রব্যাদি লুন্ঠন করেন। প্রসিদ্ধ বৌদ্ধ আচার্য অতীশ অথবা দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান তখন মগধে বাস করছিলেন। তিনি প্রথমে কোনো প্রকারে এই যুদ্ধব্যাপারে হস্তক্ষেপ করেন নি। কিন্তু পরে যখন নয়পাল কর্ণকে পরাজিত করে কলচুরিসৈন্য বিধ্বস্ত করছিলেন, তখন দীপঙ্কর কর্ণ ও তাঁর সৈন্যকে আশ্রয় দেন। তাঁর চেষ্টায় উভয় পক্ষের মধ্যে সন্ধি স্থাপিত হয়। প্রচলিত কাহিনী অনুসারে কর্ণের সাথে নয়পালের সন্ধি হওয়ার পরেই দীপঙ্কর তিব্বত গমন করেন। এই ঘটনার তারিখ সম্বন্ধে বহু মতভেদ আছে- ১০৩৮ হতে ১০৪২ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত প্রতি বছরই কোনো কোনো মত অনুসারে অতীশ তিব্বত যাত্রা করেন। কিন্তু এটি যে নয়পালের রাজত্বে- সম্ভবত এর প্রথম ভাগে ঘটেছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই। পণ্ডিতগণের ধারণা নয়পালের সঙ্গে কর্ণের যুদ্ধ ও সন্ধি ১০৪৩ খ্রিষ্টাব্দে সংঘটিত হয়েছিল।৫৫২ কিন্তু দীপঙ্করের চেষ্টায় যে সন্ধি হয় তা দীর্ঘকাল স্থায়ী হয় নি।
নয়পালের পুত্র তৃতীয় বিগ্রহপালের রাজত্বকালে (১০৫৪-৭২ খ্রিষ্টাব্দ) কর্ণ পুনরায় বাংলাদেশে যুদ্ধাভিযান করেন। এই যুদ্ধেও কর্ণ প্রথমে জয়লাভ করেন। বীরভূম জেলার অন্তর্গত পাইকোর নামক স্থানে একটি শিলাস্তম্ভের গাত্রে কর্ণো নামে একটি লিপি উৎকীর্ণ আছে। এ থেকে বুঝা যায় যে, তিনি পশ্চিমবঙ্গের কিছু অংশ অধিকার করেছিলেন। কিন্তু পরে তিনি তৃতীয় বিগ্রহপাল কর্তৃক পরাজিত হন। সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিত থেকে জানা যায় যে, তৃতীয় বিগ্রহপালের সাথে কর্ণের কন্যা যৌবনশ্রীর বিবাহ হয়। সম্ভবত এই বৈবাহিক সম্বন্ধ দ্বারা উভয় পক্ষের মধ্যে সন্ধি স্থাপিত হয়। কেউ কেউ মনে করেন যে, পাইকোর স্তম্ভলিপি এই বৈবাহিক সম্বন্ধের স্মৃতিচিহ্নরূপেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এটি দ্বারা কর্ণের বঙ্গদেশের এই অংশ জয় করার সিদ্ধান্ত যুক্তিযুক্ত নয়।
তবে কর্ণ অতঃপর আর বঙ্গদেশের বিরুদ্ধে অভিযান করেন নি। কারণ চন্দেল্লরাজ কীর্তিবর্মণ কর্ণকে যুদ্ধে পরাজিত করেন (১০৬০ হতে ১০৬৪ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে কোনো এক সময়ে) এবং দক্ষিণে চালুক্য এবং পশ্চিমে পরাসর রাজার সাথেও তাঁর সংঘর্ষ হয়। অনতিবিলম্বেই অতি শক্তিশালী শত্র“ চালুক্যরাজ কল্যাণ ৫৫৩ (১০৪২-১০৫৮) গৌড় ও বঙ্গসহ অনেক দেশকে পরাজিত করেছেন বলে অসম্ভর (এক) সমস্বর (দুই) এবং বিক্রমাদিত্য (ছয়) প্রভৃতির তাম্রলিপিতে পাওয়া যায়। সুতরাং পাইকোর শিলালিপি অনুযায়ী কলচুরিরাজ কর্ণ কর্তৃক রাঢ়দেশের কোনো অংশ অধিকৃত হলেও তা দীর্ঘকাল স্থায়ী হয় নি।
ঈশ্বর ঘোষ পালরাজশক্তি ক্রমশই দুর্বল হয়ে পড়লে বাংলার নানা প্রদেশে স্বাধীন খণ্ডরাজ্যের উদ্ভব হয়। এ সময়ে গয়াতে এক সুদ্রক পরিবারের কথা জানা যায়। নয়পালের ১৫ রাজ্য সম্বৎসরের দুটি লিপিতে পরিতোষ তাঁর পুত্র শূদ্রক এবং শূদ্রকের পুত্র বিশ্বরূপ এই তিন (অথবা চার) জনের নাম পাওয়া যায়। একটি লিপিতে উক্ত হয়েছে যে, শূদ্রকের বাহুবলে গয়া নগরী ‘পরিপালিত’ অর্থাৎ রক্ষিত। কিন্তু এর অধিক এই দুই লিপিতে আর কিছুই জানা যায় না। পালরাজ তৃতীয় বিগ্রহপালের পঞ্চম রাজ্য সম্বৎসরে লিখিত তৃতীয় লিপিটিতে শূদ্রকের বহু প্রসংসা করা হয়েছে এবং বিশ্বরূপ সম্বন্ধে বলা হয়েছে যে, তিনি শত্রুগণকে বিনাশ করেছিলেন। বিশ্বরূপের পুত্র যক্ষপালের সময়ে লিখিত চতুর্থ লিপিতে অনেক ঐতিহাসিক তথ্য পাওয়া যায়। এতে বলা হয়েছে যে, শূদ্রক তাঁর শত্রুগণকে পরাজিত করে অরণ্যে আশ্রয় নিতে বাধ্য করেছিলেন।
————————————————
৫৪৯ আমগাচী তাম্রলিপি, শ্লোক নং- ১২।
৫৫০ Epigraphia Indica, vol. II.
৫৫১ Ibid, vol. XXIV.
৫৫২ Abdul Momin Chowdhury: Dynastic History of Bengal, p. 273.
৫৫৩ History and Culture of the Indian People, vol. V, published by the Bharatiya Vidya Bhavan, Mumbai.
আগামী পর্বেঃ পাল সাম্রাজ্যের পতন (ক্রমশ)
খবর বিভাগঃ
বাংলাদেশের ইতিহাস