বুধবার, মার্চ ২৩, ২০১৬

আদি বাংলার ইতিহাস (প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্ব ৮৬

আদি বাংলার ইতিহাস
(প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্ব ৮৬
পাল বংশ (ক্রমশ) পর্ব ৮৫’র পর
(৮৫তম পর্বের লিংক নীচে দেওয়া আছে)
পালরাজগণ আর্যাবর্ত ও দাক্ষিণাত্যের দু’টি প্রবল রাজবংশের সাথে বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ হয়ে নিজেদের শক্তিবৃদ্ধির চেষ্টা করেছিলেন। বিগ্রহপাল কলচুরি অথবা হৈহয় রাজবংশের কন্যা লজ্জাদেবীকে বিবাহ করেছিলেন। কিন্তু এ সত্ত্বেও কলচুরিগণ নারায়ণপালের শত্রুপক্ষে যোগদান করেছিলেন। নারায়ণপালের পুত্র রাজ্যপাল রাষ্ট্রকূটরাজ তুঙ্গের কন্যা ভাগ্যাদেবীকে বিবাহ করেন। এই তুঙ্গ সম্ভবত দ্বিতীয় কৃষ্ণের পুত্র জগত্তুঙ্গ। এই বিবাহের ফলে পালরাজগণের কিছু সুবিধা হয়েছিল কি না জানা যায় না। বিহারে প্রাপ্ত একটি তাম্রলিপি ৫৩৩ যা রাজা নারায়ণপালের শাসনের ৫৪তম বৎসর বর্ণিত হয়, থেকে জানা যায় যে, এর অল্প কিছু পূর্বে বিহার ও বাংলার কিয়দংশ তিনি পুনরুদ্ধার করতে সমর্থ হন। প্রথম মহেন্দ্রপালের মৃত্যুর (৯১০ খ্রিষ্টাব্দে) পর গুর্জর প্রতীহার সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী নিয়ে সম্ভবত সমস্যা দেখা দেয়।
তাছাড়া, রাষ্ট্রকূটরাজ দ্বিতীয় কৃষ্ণের (৮৮০-৯১৪ খ্রিষ্টাব্দ) ও তৃতীয় ইন্দ্রের (৯১৫-৯১৭) আক্রমণে প্রতীহার সাম্রাজ্য অনেক দুর্বল হয়ে পড়ে।৫৩৪ এই সুযোগে নারায়ণপাল তাঁর হৃত রাজ্য উদ্ধারে সহজসাধ্য হয়। নারায়ণপাল অন্যান্য পাল সম্রাটের মতোই বৌদ্ধধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু আশ্চর্য বিষয় হলো, তিনি ব্যক্তিগতভাবে শিবভক্ত ছিলেন। তিনি নিজেই গর্ব করে বলেছেন যে, তিনি শিবের পূজার জন্য হাজারটি মন্দির তৈরি করেছেন। ভাগলপুর তাম্রশাসন থেকে জানা যায়, তিনি কলসপোতা শিব মন্দিরের জন্য একটি গ্রাম দান করেছিলেন।
রাজ্যপাল (৯০৮-৯৪০)
নারায়ণপালের মৃত্যুর পর যথাক্রমে তাঁর পুত্র রাজ্যপাল সিংহাসন লাভ করেন। পালরাজগণের সভাকবি লিখেছেন যে, রাজ্যপাল সমুদ্রের ন্যায় গভীর জলাশয় খনন ও পর্বতের তুল্য উচ্চ মন্দির নির্মাণ করে খ্যাতিলাভ করেছিলেন। কিন্তু তিনি রাজ্যপাল ও গোপালের বিজয়-কাহিনীর উল্লেখ করেন নি।
অপর একটি লিপি নালন্দার তার গ্রামে (পাটনা জিলা) আবিষ্কৃত হয়েছে। এছাড়া গয়াজিলার (বিহার) কুর্কিহারাতে রাজ্যপালের ২৮তম, ৩১তম এবং ৩২তম প্রশাসনিক বছরে ব্রোঞ্জের মূর্তির গাত্রে ক্ষুদিত লিপিতে জানা যায় যে, রাজ্যপাল ৩২ বছর রাজত্ব করেছিলেন।৫৩৫
এই প্রসঙ্গে রাজশাহী জেলা শহর থেকে ২০ মাইল দূরে ভাতুরিয়া গ্রামে আবিষ্কৃত একটি শিলালিপি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।৫৩৬ মষুদা নামে জনৈক মন্ত্রী হিসেবে পরিচিতি দেয়া ব্যক্তি এই লিপিটি ক্ষুদিত করেছিলেন। স্থায়ী শিবমন্দিরের জন্য রাজ্যপাল কর্তৃক একটি গ্রামদান উপলক্ষে এই লিপি বর্ণিত হয়েছিল। এই লিপিতে রাজ্যপাল সম্বন্ধে উক্ত হয়েছে যে, তিনি বহু শত্র“ জয় করেছিলেন এবং ম্লেচ্ছ ও অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, ওড্র, পাণ্ডা, কর্ণাট, লাট, সূহ্ম, গুর্জর, কৃত (কিরাত) এবং চীন দেশীয়গণ তাঁর আজ্ঞা শিরোধার্য করত। এই পরাক্রান্ত রাজ্যপাল যে নারায়ণ পালের পুত্র রাজ্যপাল এটিই সাধারণ মত।
এই প্রশস্তিতে পালরাজার গুণকীর্তন থাকলেও প্রকৃত কোনো ঘটনার উল্লেখ নেই। রাজ্যপালের পুত্র দ্বিতীয় গোপালের জাজিলপাড়া তাম্রশাসনে বলা হয়েছে যে, তাঁর সেনা-গজেন্দ্রগণ পূর্বাঞ্চলে, মলয়োপত্যকার চন্দন বনে, মরুদেশে এবং হিমালয়ের কটক দেশে ভ্রমণ করেছিল। এই শ্লোকটি পরবর্তীকালে মহীপালের বানগড় লিপিতে দ্বিতীয় গোপালের পুত্র দ্বিতীয় বিগ্রহপাল সম্বন্ধে ব্যক্ত হয়েছে। প্রথম মহীপালের সম্বন্ধে বেলার তাম্রশাসনে ও তাঁর পুত্র তৃতীয় বিগ্রহপালের আমগাছি তাম্রশাসনেও এই রাজার সম্বন্ধে ঐ শ্লোকটি উক্ত হয়েছে। এই চারজন রাজাই রাজ্যভ্রষ্ট হয়ে সারা ভারতবর্ষ সসৈন্যে ঘুরে বেড়ালেন এবং একই শ্লোক দ্বারা সভাকবি তিনজনের অনুরূপ লাঞ্ছনা, অপমান ও দুরবস্থা চিরস্মরণীয় করার প্রয়াস পাবেন- এই ধারণা খুব সঙ্গত বলে মনে হয় না।
অন্যপক্ষে ভাতুরিয়া লিপিতে রাজ্যপালের দিগ্বিজয় বর্ণনার সঙ্গে এই উক্তির সামঞ্জস্য করার জন্য রমেশচন্দ্র মজুমদার মনে করেছেন যে, রাজ্যপালের পুত্র দ্বিতীয় গোপাল পিতার দিগ্বিজয় উপলক্ষে তাঁর সঙ্গে ভারতের চতুর্দিকে ভ্রমণ করেছিলেন কবি এটিই ইঙ্গিত করেছেন এবং পরবর্তীকালে কোনো পালরাজা নিজের বাহুবলের পরিবর্তে অন্যের সহায়ক বা সহচররূপে নানাস্থানে ভ্রমণ করলে তাঁর সম্বন্ধেও ঐ শ্লোক প্রয়োগ করা হয়েছে।
পালরাজা রাজ্যপাল রাষ্ট্রকূট রাজন্যাকে বিবাহ করে ঐ রাজ্যের সঙ্গে মিত্রতা স্থাপন করেছিলেন এবং সম্ভবত প্রতীহার ও অন্যান্য শত্রুর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকূটরাজের অভিযানে সাহায্য করেছিলেন। একারণেই রাজ্যপাল সম্ভবত নিরুদ্বেগে রাজত্ব করতে পেরেছিলেন। কারণ, তাঁর রাজত্বের প্রারম্ভেই চিরশত্রু প্রতীহাররাজ রাষ্ট্রকূটরাজ ইন্দ্র কর্তৃক পরাজিত হয়েছিলেন। ইন্দ্র প্রতীহার-রাজধানী কান্যকুব্জ অধিকার করে লুণ্ঠন করেছিলেন এবং প্রতীহাররাজ মহীপাল পালিয়ে কোনোমতে প্রাণরক্ষা করেছিলেন। এই নিদারুণ বিপর্যয়ের ফলে প্রতীহাররাজ্য ধ্বংসের পথে অগ্রসর হলো এবং পালরাজগণও অনেকটা নিরাপদ হলেন।
দ্বিতীয় গোপাল (৯৪০-৯৫৭)
রাজ্যপালের পুত্র দ্বিতীয় গোপাল এবং তার পুত্র দ্বিতীয় বিগ্রহপালের রাজত্বকাল রাজ্যপালের মতো উপদ্রপহীন ছিল না। দ্বিতীয় গোপালের রাজত্বকালের প্রারম্ভে সমস্ত বিহার তাঁর অধিকারে ছিল। নালন্দা লিপি৫৩৭ থেকে এর প্রমাণ পাওয়া যায়। উত্তর বাংলা তাঁর শাসনাধীন ছিল এর প্রমাণও রয়েছে। তাঁর রাজত্বের ষষ্ঠ বছরে জজিলপাড়ায় প্রাপ্ত তাম্রশাসনে উল্লিখিত পুণ্ড্রবর্ধনভুক্তির ভূদান উপলক্ষে। বর্তমান বাংলাদেশের কুমিল্লা জেলার দাউদকান্দি থানার মন্দকে প্রাপ্ত তাম্রলিপি ৫৩৮ থেকে জানা যায় যে, পূর্ব বাংলাও তখন দ্বিতীয় গোপালের শাসনাধীন ছিল। অবশ্য দক্ষিণ বাংলা ৯০০ খ্রিষ্টাব্দ থেকেই চন্দ্র রাজাদের শাসনাধীনে চলে যায়। চন্দ্র রাজাদের মধ্যে শক্তিশালী শ্রীচন্দ্র দ্বিতীয় গোপালের সমসাময়িক ছিলেন। পাল সাম্রাজ্যের বৃহদাংশ নিয়ে দ্বিতীয় গোপালের যাত্রা আরম্ভ হলেও, শিঘ্রই কেন্ডেল্লা ও কালচুরি রাজাদের আক্রমণ মোকাবেলা করতে গিয়ে তিনি পর্যদুস্থ হন। পণ্ডিতব্যক্তিদের মতানুসারে বাংলাদেশে ৯২৫ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে কম্বোজদের উত্থান হয়।
ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দক্ষিণ-পূর্ব বাংলা নিয়ে চন্দ্র বংশ একটি স্বাধীন রাজ্য গঠন করেছিল। অনুরূপভাবে উত্তর-পশ্চিম বাংলা নিয়ে কম্বোজ শাসকরা স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এ সময়ে পাল-শাসন শুধু অঙ্গ এবং মগধেই সীমিত থাকে। দ্বিতীয় বিগ্রহপালের দীর্ঘ ৩০ বছরের শাসনকাল দ্বিতীয় গোপালের মতোই শুধু পাল রাজ্যের পতনই প্রত্যক্ষ করেছে।
এদিকে আবার অন্য শত্রুর আবির্ভাব হয়। পাল ও প্রতীহার সাম্রাজ্যের পতনের পরে আর্যাবর্তে নতুন নতুন রাজশক্তির উদয় হয়েছিল এবং এরা অনেকেই সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় পাল, প্রতীহার ও অন্যান্য রাজ্যের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। এভাবে সর্বপ্রথমে মধ্যভারতের বুন্দেলখণ্ড অঞ্চলে চন্দ্রাত্রেয় বা চন্দেল্ল রাজ্য প্রবল হয়ে উঠে। চন্দেল্লরাজ যশোবর্মণ প্রসিদ্ধ কালঞ্জর গিরিদুর্গ অধিকার করে আর্যাবর্তে প্রাধান্য লাভ করেন এবং তাঁর বিজয়বাহিনী কাশ্মীর হতে বাংলাদেশ পর্যন্ত যুদ্ধাভিযান করে। চন্দেল্ল রাজ্যের সভাকবি লিখেছেন যে, যশোবর্মণ গৌড়দেরকে উদ্যানলতার মতো অবলীলা ক্রমে অসিদ্বারা ছেদন করেছিলেন এবং তাঁর পুত্র ধঙ্গ (আ: ৯৫৪- ১০০০ খ্রিষ্টাব্দ) রাঢ়া ও অঙ্গদেশের রানীকে কারারুদ্ধ করেছিলেন। এই সমস্ত শ্লেষোক্তি পুরোপুরি সত্য না হলেও পালরাজগণ চন্দেল্লরাজ কর্তৃক পরাজিত হয়েছিলেন তা সম্ভবপর বলে মনে হয়। চন্দেল্লগণের মতো কলচুরিরাজগণও দশম শতাব্দীর মধ্যভাগে আর্যাবর্তের নানা দেশ আক্রমণ করেন। কলচুরিরাজ প্রথম যুবরাজ ও তাঁর পুত্র লক্ষ্মণরাজ যথাক্রমে গৌড় ও বঙ্গাল দেশ জয় করেন বলে তাঁদের সভাকবি বর্ণণা করেছেন। এসব আক্রমণের ফলে পালরাজাগণ ক্রমেই শক্তিহীন হয়ে পড়লেন এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন অংশে স্বাধীন খণ্ডরাজ্যের উদ্ভব হলো।
দ্বিতীয় বিগ্রহপাল (৯৬০-৯৮৮)
চন্দেল্ল ও কলচুরি রাজবংশের সভাকবিরা যে অঙ্গ, রাঢ়া, গৌড় ও বঙ্গাল প্রভৃতি রাজ্যের উলেখ করেছেন, তা সম্ভবত এভাবে পৃথক পৃথক স্বাধীন রাজ্যের সূচনা করে। কিন্তু এর অন্যবিধ প্রমাণও আছে। দ্বিতীয় গোপালের পুত্র দ্বিতীয় বিগ্রহপাল আনুমানিক ৯৬০ হতে ৯৮৮ খ্রি. পর্যন্ত রাজত্ব করেন। তাঁর পুত্র মহীপালের তাম্রশাসনে উক্ত হয়েছে যে, তিনি (মহীপাল) অনধিকারী কর্তৃক বিলুপ্ত পিতৃরাজ্যের উদ্ধার করেন। সুতরাং দ্বিতীয় বিগ্রহপালের রাজাকালেই বা তার পূর্বেই পালগণের পৈতৃক রাজ্যেরও বিলোপ হয়েছিল।
১ম মহীপাল (৯৮৮-১০৩৮ খ্রিষ্টাব্দ)
পাল বংশের অবনতির প্রায় শেষদিকে দ্বিতীয় বিগ্রহপালের পুত্র মহীপাল পিতৃসিংহাসনে আরোহণ করেন (আ: ৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দ); তাঁর অর্ধশতাব্দীব্যাপী রাজত্বকালে পালরাজবংশের সৌভাগ্যরবি আবার উদিত হয়েছিল। তিনি বাংলায় বিলুপ্ত পিতৃরাজ্য উদ্ধার ও পুনরায় পালসাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে যে অতুল কীর্তি অর্জন করেছেন, তা ইতিহাসে তাঁকে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে। তাঁর অনেক কীর্তি-কাহিনী তাঁকে আজও অমর করে রেখেছে। দিনাজপুরের মহীপালদীঘি ও মুর্শিদাবাদের সাগরদীঘি এবং মুর্শিদাবাদ জেলার মহীপাল, বগুড়া জেলার মহীপুর, দিনাজপুর জেলার মহীসন্তোষ ও রংপুর জেলার মাহীগঞ্জ প্রভৃতি স্থান আজও মহীপালের স্মৃতি রক্ষা করছে। মহীপালের নামে রচিত গাঁথা ষোড়শ শতাব্দীতেও বঙ্গদেশে প্রচলিত ছিল। কারণ চৈতন্য-ভাগবতে এর উল্লেখ আছে।
মহীপাল পৈত্রিক সূত্রে পিতা দ্বিতীয় বিগ্রহপাল থেকে শুধু অঙ্গ ও মগধের শাসন কর্তৃত্ব পেয়েছিলেন বলে পণ্ডিতব্যক্তিদের ধারণা। মহীপাল তাঁর রাজত্বের প্রথম ভাগেই উত্তর ও পশ্চিমবঙ্গে তাঁর শাসন প্রতিষ্ঠা করেন।৫৩৯ অবশ্য পশ্চিম বাংলার দক্ষিণ অঞ্চলের কিছু অংশে ধর্মপাল ও রণশূরের রাজত্ব ছিল। রাজেন্দ্র চোলের আক্রমণকালে তাদের সঙ্গেই সংঘর্ষ হয়েছিল। মহীপাল তাঁর রাজত্বের শেষ পর্যায়ে বিহারও পুনরুদ্ধার করেছিলেন। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের ধারণা, তিনি বিহার ছাড়িয়েও কিছু ভূখণ্ড দখল করেছিলেন। ‘সারনাথ লিপি’ থেকে জানা যায় যে, বেনারস পর্যন্ত তাঁর শাসনাধীনে ছিল।
কুমিল্লা সদরের নিকটবর্তী বাঘাউরা৫৪০ ও নারায়ণপুর ৫৪১ গ্রামে একটি বিষ্ণু ও একটি গণেশ মূর্তির পাদপীঠে যথাক্রমে তৃতীয় চতুর্থ সংবৎসরে উৎকীর্ণ মহীপালের দুখানি লিপি হতে প্রমাণিত হয় যে, সিংহাসনে আরোহণের দুই-তিন বৎসরের মধ্যেই তিনি পূর্ববঙ্গ পুনরাধিকার করেছিলেন। উত্তর বা পশ্চিমবঙ্গ জয় না করে তিনি পূর্ববঙ্গে যেতে পারেন না। তাঁর রাজত্বের নবম বছরে উৎকীর্ণ বাণগড়-লিপি হতে প্রমাণিত হয় যে, উত্তরবঙ্গ তাঁর অধীন ছিল। উল্লেখ করা হয়েছে যে, রাজ্যারম্ভেই তিনি উত্তর ও পূর্ববঙ্গ জয় করেন। ‘বেলাব তাম্রশাসন’৫৪২ হতে জানা যায় যে, তাঁর রাজত্বের পঞ্চম বছরে উত্তরবঙ্গে তাঁর অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ‘বাণগড়-লিপি’তে ব্যক্ত হয়েছে যে, মহীপাল “রণক্ষেত্রে বাহুদর্পপ্রকাশে সকল বিপক্ষ পক্ষ নিহত করে, অনধিকারী কর্তৃক বিলুপ্ত পিতৃরাজ্যের উদ্ধার সাধন করে, রাজগণের মস্তকে চরণপদ্ম সংস্থাপিত করে অবনীপাল হয়েছিলেন।” সভাকবির এই উক্তি অনেকখানিই সত্যে পরিণত হয়েছিল।
সমগ্র বাংলাদেশ জয় করার পূর্বেই দক্ষিণ ভারতের পরাক্রান্ত চোলরাজ রাজেন্দ্র মহীপালের রাজ্য আক্রমণ করলেন। চোলরাজগণ তখন ভারতের অদ্বিতীয় শক্তি। উড়িষ্যা হতে আরম্ভ করে রামেশ্বর সেতুবন্ধ পর্যন্ত ভারতের পূর্ব উপকূল সমস্তই তাঁদের অধীন ছিল এবং তাঁদের শক্তিশালী নৌবাহিনী সুদূর সুমাত্রা ও মলয় উপদ্বীপের কোনো কোনো রাজ্য জয় করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিপুল বাণিজ্য-ভাণ্ডারের স্বর্ণদ্বার তাঁদের সম্মুখে উন্মুক্ত করে দিয়েছিল। এই বিশাল সাম্রাজ্য ও অতুল ঐশ্বর্যের অধিকারী রাজা রাজেন্দ্রচোল শিবের উপাসক ছিলেন। সুতরাং তাঁর রাজ্য পবিত্র করার উদ্দেশ্যে গঙ্গাজল আনার জন্য তিনি এক বিরাট সৈন্যদল প্রেরণ করেন।
তাঁর সেনাপতি বঙ্গের সীমান্তে উপস্থিত হয়ে প্রথমে দণ্ডভুক্তিরাজ ধর্মপাল ও পরে লোকপ্রসিদ্ধ দক্ষিণ রাঢ়ের অধিপতি রণশূরকে পরাজিত করে এই দুই রাজ্য অধিকার করেন এবং বাংলাদেশ আক্রমণ করে রাজা গোবিন্দচন্দ্রকে পরাজিত করেন।৫৪৩ তারপর মহীপালের সাথে যুদ্ধ হয়। মহীপাল ভীত হয়ে রণক্ষেত্র ত্যাগ করেন। তাঁর দুর্মদ রণহস্তী, নারীগণ ও ধনরতড়ব লুণ্ঠনপূর্বক চোলসেনাপতি উত্তর রাঢ় অধিকার করে গঙ্গাতীরে উপনীত হলেন।৫৪৪
রমেশচন্দ্র মজুমদার উল্লেখ করেছেন যে, একাদশ শতাব্দীর প্রারম্ভে দাক্ষিণাত্যের একজন লেখক বঙ্গদেশের রাজনৈতিক অবস্থা সম্বন্ধে কিরূপ ধারণা পোষণ করতেন, রাজেন্দ্রচোলের তিরু-মলয়লিপির নিমেড়বাধৃত অংশে এই অভিযানের বর্ণনা হতে তা বোঝা যাবে। ‘শ্রীরাজেন্দ্রচোলদেব তাঁর সমরনিপুণ সৈন্যবাহিনী কর্তৃক (নিন্মোক্ত দেশগুলো) অধিকার করেছেন। তন্দবৃত্তি ভীষণ যুদ্ধে ধর্মপালকে নিহত করে তিনি যে দেশ অধিকার করেছিলেন; সকলদিকে প্রসিদ্ধ তক্কণ লাড়ম (দক্ষিণ রাঢ়া), সবেগে রণশূরকে আক্রমণ করে যে দেশ অধিকার করেছিলেন; বঙ্গাল দেশ যেখানে ঝড় বৃষ্টির কোন বিরাম নেই এবং গজ পৃষ্ঠ হতে নেমে যেখান থেকে গোবিন্দচন্দ্র পলায়ন করেছিলেন; কর্ণভূষণ, চর্মপাদুকা এবং বলয়বিভূষিত মহীপালকে ভীষণ সমরক্ষেত্র হতে পলায়ন করতে বাধ্য করে, যিনি তাঁর অদ্ভুত বলশালী করিসমূহ এবং ‘রত্নোপমা’ রমণীগণকে হস্তগত করেছিলেন; সাগরের ন্যায় রত্নসম্পন্ন উত্তরি-লাড়ম (উত্তর রাঢ়া)।’
এই বর্ণনা হতে জানা যায় যে, রাজেন্দ্রচোলের (১০১২-১০৪৪ খ্রিষ্টাব্দ) আক্রমণের সময় পশ্চিমবঙ্গ মহীপালের অধীনে ছিল না। কারণ তন্দবৃত্তি বা দণ্ডভুক্তি (মেদিনীপুর ও বালেশ্বর জেলা) এবং দক্ষিণ রাঢ়া এই দুই দেশে যথাক্রমে ধর্মপাল ও রণশূর রাজত্ব করতেন। উত্তর রাঢ়ের রাজার নামের স্পষ্ট উল্লেখ না থাকলেও যে মহীপালকে উদ্দেশ্য করছে এরূপ অনুমান অসঙ্গত নয়।
চোলরাজের গঙ্গাজলের জন্য অভিযান সম্ভবত ১০২১-২৪ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে সংঘঠিত হয়েছিল।৫৪৫ চোলরাজের সভাকবি এই অভিযানের৫৪৬ যে বর্ণনা দিয়েছেন, তাতে অনুমিত হয়, গঙ্গাজল সংগ্রহ করা ছাড়া এর আর কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। তামিল ঐতিহাসিকগণও স্বীকার করেন যে, এই অভিযানে আর কোনও স্থায়ী ফল লাভ হয় নি। চোল প্রশস্তিতে বাংলায় চোলরাজ্যের প্রভুত্ব প্রতিষ্ঠার কোনো উল্লেখ নেই; কেবল বলা হয়েছে, চোল-সেনাপতি বাংলার পরাজিত রাজন্যবর্গকে মস্তকে গঙ্গাজল বহন করে আনতে বাধ্য করেছিলেন।
দুই বছরের কম সময়ের মধ্যে রাজেন্দ্রচোলের বিরাট সৈন্যবাহিনী এই অভিযান পরিচালনা করে। রাজেন্দ্র চোলের অভিযানের প্রকৃত উদ্দেশ্য ও ফলাফল যাই হোক, মোটের উপর এ কথা সকলেই স্বীকার করেন যে, ভাগীরথীর পবিত্র বারি সংগ্রহ করে চোলসৈন্যের স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের পর বাংলাদেশে তাঁদের বিজয় অভিযানের আর কোনো চিহ্ন রইল না। তামিল প্রশস্তিকারের উল্লিখিত বর্ণনা হতেও প্রকাশ পায় দণ্ডভুক্তি, দক্ষিণ রাঢ় ও বঙ্গদেশে তখন ধর্মপাল, রণশূর ও গোবিন্দচন্দ্র স্বাধীনভাবে রাজত্ব করছিলেন; কিন্তু উত্তর রাঢ় মহীপালের অধীন ছিল। চোল আক্রমণের ফলে এই রাজনৈতিক অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়েছিল কিনা এবং মহীপাল দক্ষিণ রাঢ় ও দক্ষিণ বঙ্গ জয় করে সমগ্র বঙ্গে তাঁর অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন কিনা তা সঠিক জানা যায় না। তবে চন্দ্র রাজা গোবিন্দচন্দ্রের পতন হলে হয়তো প্রথম মহীপাল বা দ্বিতীয় মহীপালের রাজত্বকালে দক্ষিণবঙ্গ তাদের শাসনাধীনে এসেছিল।
বারাণসীর নিকটবর্তী প্রাচীন বৌদ্ধতীর্থ সারনাথে ১০৮৩ সম্বতে (১০২৬ খ্রিষ্টাব্দ) উৎকীর্ণ একটি লিপি পাওয়া গিয়েছে। এতে গৌড়াধিপতি মহীপালের আদেশে তাঁর অনুজ শ্রীমান স্থিরপাল ও বসন্তপাল কর্তৃক নতুন নতুন মন্দির নির্মাণ ও পুরাতন মন্দিরাদির জীর্ণসংস্কারের উল্লেখ আছে। এ হতে কেউ কেউ মনে করেন যে, অনুমতি হয় যে, ১০২৬ অব্দে মহীপালের অধিকার বারাণসী পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। কিন্তু এ ধরনের অনুমান সঠিক নাও হতে পারে। কারণ, বারাণসী যেহেতু তীর্থস্থান, যে কেউ স্থানীয় প্রশাসকের অনুমতি সাপেক্ষে ধর্মীয় স্থাপনার কাজ করতে পারতেন। হয়তো মহীপালের আদেশে তাঁরা মন্দিরের কাজ করেও থাকবেন। কিন্তু এর অল্পকাল পরেই কলচুরিরাজ গাঙ্গেয়দেব মহীপালকে পরাজিত করে বারাণসী অধিকার করাতে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, বারানসী তখন পর্যন্ত মহীপালের অধীনে ছিল। “কারণ ১০৩৪ খ্রিষ্টাব্দে যখন আহম্মদ নিয়ালতিগীন বারাণসী আক্রমণ করেন, তখন এটি কলচুরিরাজার অধীন ছিল”; বস্তুত বহুদিন যাবৎ মহীপাল ও কলচুরিরাজ গাঙ্গেয়দেবের মধ্যে সংঘর্ষ চলেছিল এবং উভয় পক্ষেরই জয়-পরাজয় ঘটছিল- এটি অনুমান করা অসঙ্গত হবে না। নেপালে প্রাপ্ত একটি রামায়ণ গ্রন্থের পুষ্পিকা (Colophon) হতে জানা যায় যে, মহারাজাধিরাজ পুণ্যাবলোক সোমবংশোম্ভব গৌড়ধ্বজ শ্রীমদ্ গাঙ্গেয়দেব ১০৭৬ সম্বতে তীরভুক্তির (উত্তর বিহার) রাজা ছিলেন। গৌড়ধ্বজ উপাধি হতে অনেকে সিদ্ধান্ত করেছিলেন যে, তিনি গৌড় দেশও জয় করেছিলেন। কিন্তু এটি এতই অসম্ভব যে, অনেকে মনে করেন, ‘গরুড়ধ্বজ’ শব্দের পরিবর্তে ভ্রমবশত ‘গউর ধ্বজ’ লিখিত হয়েছে। তা হলেও অনেকে মনে করেন যে কলচুরিরাজ ১০১৯ খ্রিষ্টাব্দে ত্রিহুতে রাজত্ব করলে ১০২৬ খ্রিষ্টাব্দে বারণসী মহীপালের রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল এটি বিশ্বাস করা কঠিন।
কিন্তু স্মরণ রাখতে হবে যে, মজঃফরপুর জেলার অন্তর্গত ইমাদপুরে প্রাপ্ত এক মূর্তির পাদপীঠে মহীপালদেবের ৪৮ রাজ্য সম্বৎসরে উৎকীর্ণ একটি লিপি আছে- সুতরাং ১০৭৬ সম্বতে ত্রিহুত গাঙ্গেয়দেবের অধীনে থাকলেও যেমন পরবর্তীকালে মহীপাল তা জয় করেছিলেন বারাণসী সম্বন্ধেও ঠিক তাই ঘটেছিল- অর্থাৎ ১০১৯ খ্রিষ্টাব্দে বারণসী, মিথিলা প্রভৃতি গাঙ্গেয়দেবের রাজ্যভুক্ত ছিল, ১০২৬ খ্রিষ্টাব্দে ঐ দেশগুলি মহীপাল জয় করেন। কিন্তু ১০৩৪ খ্রিষ্টাব্দে অন্তত বারাণসী গাঙ্গেয়দেব পুনরায় অধিকার করেছিলেন। যে সমুদয় প্রমাণ এ পর্যন্ত পাওয়া গিয়েছে তাতে এই অনুমানই সঙ্গত মনে হয়। বিশেষত প্রবোধ শিবের গুর্গি লিপিতে এবং গোহারওয়া তাম্রশাসনে মহীপালের সাথে কলচুরিরাজ গাঙ্গেয়দেবের যুদ্ধের উল্লেখ আছে। শেষোক্ত লিপিতে বলা হয়েছে, গাঙ্গেয়দেব অঙ্গদেশের অধিপতিকে পরাজিত করেছিলেন। এই সময়ে অঙ্গ দেশের অধিপতি ছিলেন মহীপাল।
মহীপালের রাজত্বকালে আর্যাবর্তের পশ্চিমভাগে বড়ই দুর্দিন উপস্থিত হয়েছিল। গজনীর সুলতানগণের পুনঃপুনঃ ভারত আক্রমণের ফলে পরাক্রান্ত সাহি ও প্রতীহারবংশ ধ্বংস হয়, অন্যান্য রাজবংশ বিপর্যস্ত ও হতবল হয়ে পড়ে এবং ভারতের প্রসিদ্ধ মন্দির ও নগরগুলি ধ্বংস ও তাদের অগণিত ধনরত্ন লুণ্ঠিত হয়। আর্যাবর্তের রাজন্যবর্গ একযোগে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেও কোন ফল লাভ করতে পারেন নি। এই বিধর্মী বিদেশী শত্রুর আক্রমণ প্রতিরোধ করার জন্য মহীপাল কোন সাহায্য প্রেরণ করেন নি, এজন্য কোনো কোনো ঐতিহাসিক তাঁর প্রতি দোষারেপ করেছিলেন। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক রামপ্রসাদ চন্দ্র তাঁর বিখ্যাত গৌড়রাজমালা গ্রন্থে লিখেছেন, ‘মহীপাল যে সমরানুরাগী শশাঙ্ক, ধর্মপাল এবং দেবপালের ন্যায় উচ্চাভিলাষী ছিলেন না, শান্তিই ভালবাসতেন, এরকম মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে।’
কিন্তু মহীপালের ইতিহাস সম্যক আলোচনা করলে এই প্রকার নিন্দা বা অভিযোগের সমর্থন করা যায় না। পিতৃরাজ্যচ্যুত মহীপালকে নিজের বাহুবলে বাংলায় পুনরাধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হয়। এই কার্য সম্পূর্ণ হওয়ার পূর্বেই রাজেন্দ্র চোল তাঁর রাজ্য আক্রমণ করেন। কলচুরিরাজও তাঁর এক শত্রু ছিলেন। তৎকালে রাজেন্দ্র চোল ও গাঙ্গেয়দেবের ন্যায় শক্তিশালী শাসক ভারতবর্ষে আর কেউ ছিল না। এদের ন্যায় শত্রুর হাত হতে আত্মরক্ষা করতেই তাঁকে সর্বদা বিব্রত থাকতে হতো। এমতাবস্থায় সুদূর পঞ্চনদে সৈন্য প্রেরণ করা তাঁর পক্ষে হয়ত সম্ভবপর ছিল না। সুতরাং তৎকালীন বাংলার অভ্যন্তরীণ অবস্থা সবিশেষ না জেনে মহীপালকে ভীরু, কাপুরুষ অথবা দেশের প্রতি কর্তব্যপালনে উদাসীন ইত্যাদি আখ্যায় ভূষিত করা যুক্তিসঙ্গত নয়।৫৪৭
ইমাদপুর লিপি অনুসারে মহীপাল ৪৮ বছর রাজত্ব করেছেন। কিন্তু লামা তারনাথ বলেছেন ৫২ বছর। অবশ্য বেশিরভাগ পণ্ডিতব্যক্তিগণের অভিমত তিনি ৫০ বছর রাজত্ব করেছেন। দীর্ঘ ৫০ বছরের রাজত্বকালে মহীপাল যা করেছিলেন, তাই তাঁর শৌর্যবীর্যের যথেষ্ট পরিচয় দিচ্ছে। পালরাজ্যকে আসন্ন ধ্বংস হতে রক্ষা করে তিনি বঙ্গদেশের পূর্ব সীমান্ত হতে বারাণসী পর্যন্ত ভূভাগ ও মিথিলায় পালরাজ্যের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তারপর ভারতের দুই প্রবল শক্তির সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি এই রাজ্যের অধিকাংশ রক্ষা করতে সমর্থ হয়েছিলেন। এটিই মহীপালের কৃতিত্বের শ্রেষ্ঠ পরিচয়। পালরাজশক্তির পুনরভ্যুদয়ের চিহ্নস্বরূপ মহীপাল প্রাচীন কীর্তির রক্ষণে যত্নশীল ছিলেন। ‘সারনাথ-লিপি’তে শত শত কীর্তিরত্ন নির্মাণ এবং অশোক স্তূপ ‘সাঙ্গ ধর্মচক্র’ ও ‘অষ্ট-মহাস্থান’, ‘শৈলবিনির্মিত-গন্ধকূটী’ প্রভৃতি প্রসিদ্ধ প্রাচীন বৌদ্ধকীর্তির সংস্কার সাধনের উলেখ আছে। আবদুল মুমিন চৌধুরী মনে করেন, ধর্মীয় পীঠস্থান সারনাথে ধর্মীয় স্থাপনাগুলির সংস্কার, নতুন মন্দির নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ দ্বারা মহীপাল সারনাথ অধিকার করেছিলেন বুঝায় না। একজন ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি ও বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে এগুলি তাঁর ধর্মীয় কীর্তির অংশ বলেই গণ্য হতো। এগুলি ছাড়াও মহীপাল অগ্নিদাহে বিনষ্ট নালন্দা মহাবিহারের জীর্ণোদ্ধার এবং বুদ্ধগয়ায় দুটি মন্দির নির্মাণ করেন। কাশীধামে নবদুর্গার প্রাচীন মন্দির ও অন্যান্য হিন্দু দেবদেবীর মন্দিরও সম্ভবত তিনি নির্মাণ করেন।অনেক দীঘি ও নগরী এখনও তাঁর নামের সাথে বিজড়িত হয়ে আছে এবং সম্ভবত তিনিই সেগুলির প্রতিষ্ঠা করেন। এই অধ্যায়ের প্রারম্ভেই এগুলির উল্লেখ করা হয়েছে। সারনাথে মন্দির প্রতিষ্ঠা ও জীর্ণমন্দির সংস্কারের কথাও পূর্বে বলা হয়েছে। মহীপাল বারাণসী ধামে ঈশান (শিব) ও চিত্রঘণ্টার (দুর্গার) মন্দিরাদি (কীর্তিরত্নশতানি) প্রতিষ্ঠা করিয়েছিলেন; মৃগদাবের (সারনাথের) ধর্মরাজিকা বা অশোকস্তূপ এবং অশোকের স্তম্ভের শীর্ষস্থিত ‘সাঙ্গধর্মচক্রের’ জীর্ণ সংস্কার করিয়েছিলেন এবং অভিনব ‘শৈলগন্ধ-কূটী’ নির্মাণ করিয়েছিলেন। মহীপালের রাজত্বে একাদশ সম্বৎসরে উৎকীর্ণ দুটি শিলালিপিতে অগ্নিদাহের পর নালন্দার একটি মন্দিরের সংস্কার এবং বুদ্ধগয়াতে দুটি মন্দির নির্মাণের উল্লেখ আছে।
মহীপালের নামে, বিশেষ করে উত্তরবঙ্গে, অনেক গীত কবিতা ও পল্লীতে লোকসঙ্গীত রচিত হয়েছিল বলে জানা যায়।৫৪৮ কিন্তু এগুলি আর শোনা যায় না। পাহাড়পুরের খননকার্য প্রসঙ্গে এর ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লিখেছেন যে, দশম শতকের শেষভাবে অথবা একাদশ শতকের প্রথম ভাগে এর বিরাট মন্দিরের পুরোপুরি সংস্কার করা হয়েছিল। সুতরাং মহীপালের দ্বারাই তা সাধিত হয়েছিল এরূপ সিদ্ধান্ত করা যেতে পারে। মোটের উপর মহীপালের রাজত্বকালে বাংলায় সকল দিকেই এক নতুন জাতীয় জাগরণের আভাস পাওয়া যায়।
জৈন গ্রন্থকার হেমচন্দ্র লিখেছেন যে, চৌলুক্য রাজা দুর্লভ এক স্বয়ম্বরসভায় অঙ্গ, কাশী, অবন্তী, চেদী ও মথুরা এবং কুরু ও হূণদেশের রাজাকে পরাজিত করে রানী দুর্লভদেবীকে বিবাহ করেছিলেন। দুর্লভ আনুমানিক ১০০৮ খ্রিষ্টাব্দে অনহিল পাটকের সিংহাসনে আরোহণ করেন; সুতরাং এই স্বয়ম্বরসভায় উপস্থিত অঙ্গদেশের রাজা নিশ্চয়ই মহীপাল। অতএব হেমচন্দ্রের কাহিনী সত্য হলে রাজা মহীপালের জীবনের একটি নতুন ঘটনার সন্ধান পাওয়া যায়।
৫৩৩ Indian Antiquary: vol. XLVII.
৫৩৪ R.S. Tripathi: istory of Kanauj.
৫৩৫ Journal of the Bihar and Orissa Research Society: vol. XXVI
৫৩৬ S.P. Lahiry: Indian Historical Quarterly, vol. XXXI.
৫৩৭ Journal of Asiatic Society of Bengal (NS): vol. IV.
৫৩৮ Varendra Research Society Monograph no. 8.
৫৩৯ Indian Antiquary: vol. XIV.
৫৪০ Epigraphia Indica, vol XVII, pp. 353-55.
৫৪১ Indian Culture: vol IX, pp. 121-24.
৫৪২ Journal of Asiatic Society, Letters Published in 1951.
৫৪৩ Journal of the Royal Asiatic Society: 1935, p. 73.
৫৪৪ K.A. Nilkanta Sastri: The Colas (Translation), vol. I.
৫৪৫ H.C. Roy: The Dynastic History of Northern India.
৫৪৬ K.A. Nilkanta Sastri: The Colas, vol. I.
৫৪৭ রমেশচন্দ্র মজুমদার: বাংলাদেশের ইতিহাস (প্রাচীন যুগ)।
৫৪৮ Indian Antiquary, vol. IV, p. 366.
আগামী পর্বেঃ পাল সাম্রাজ্যের পতন

শেয়ার করুন