আদি বাংলার ইতিহাস
(প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্ব ৯৫
সেন যুগের অবসান> বখতিয়ার খিলজির আগমন।
লক্ষ্মণসেন (১১৭৮-১২০৫)
বল্লালসেনের পর তাঁর পুত্র লক্ষ্মণসেন পিতৃসিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি সম্ভবত বঙ্গে ২৭ বৎসর রাজত্ব করেন। তাঁর সময়ে সেন সাম্রাজ্য অভূতপূর্ব উনড়বতি ও চরম অবনতি দু’ই প্রত্যক্ষ করে। তাঁর সময়কালের ইতিহাসের উপকরণ হিসেবে তাঁর রাজত্বকালের আটটি তাম্রশাসন যথা: ১. গোবিন্দপুর তাম্রশাসন (২৪ পরগনা), ২. আনুলিয়া তাম্রশাসন (নদীয়া), ৩. তর্পণদীঘি তাম্রশাসন (দিনাজপুর), ৪. মাধাইনগর তাম্রশাসন (পাবনা), ৫. শক্তিপুর তাম্রশাসন (মুর্শিদাবাদ), ৬. ভাওয়াল তাম্রশাসন (ঢাকা), ৭. সুন্দরবন তাম্রশাসন, ৮. চণ্ডী মূর্তিলিপি (ঢাকা) এবং তাঁর সভাকবিদের স্তুতিবাচক শ্লোক, তৎপুত্রদ্বয়ের তাম্রশাসন ও মুসলিম ঐতিহাসিক মিনহাজ উদ্দীন রচিত তবকাত-ই-নাসিরী গ্রন্থ উল্লেখ্য।
লক্ষ্মণসেনের তাম্রশাসনগুলিকে তাঁর কৃতিত্ব সম্পর্কে অতি স্তুতিবাচক বর্ণনা রয়েছে। এতে বলা হয়েছে যে, তিনি কৌমারে উদ্ধৃত গৌড়েশ্বরের শ্রীহরণ ও যৌবনে কলিঙ্গদেশে অভিযান করেছিলেন, যুদ্ধে কাশীরাজকে পরাজিত করেছিলেন এবং ভীরু প্রগজ্যোতিষের (কামরূপ ও আসাম) রাজা তাঁর বশ্যতা স্বীকার করেছিলেন।৭০৪ মাধাইনগর থেকে লক্ষ্মণসেনের হাতে গৌড়, কলিঙ্গ, কামরূপ ও কাশীর রাজাদের পরাজয়ের কথা জানা যায়। তাঁর পুত্রের তাম্রশাসন থেকে জানা যায় যে, লক্ষণসেন পুরী, বারানসী ও এলাহাবাদে বিজয়স্তম্ভ স্থাপন করেছিলেন।৭০৫ ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে যে, বিজয়সেন ও বল্লালসেনের সমরাভিযানে যৌবনে লক্ষ্মণসেনও সহযাত্রী ছিলেন। তবে তাঁর তাম্রশাসন ‘কৌমার কেলী’ কথাটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। অর্থাৎ এই সকল যুদ্ধাভিযান লক্ষ্মণসেন যৌবন বয়সে খেলাধুলার মতোই অংশগ্রহণ করেছিলেন- যুদ্ধে পৃথিবীকে যোদ্ধাশূন্য করলেও পতিতজনের প্রতি আঘাত করেন নি। প্রশস্তিকার অন্যত্র লিখেছেন, লক্ষ্মণসেন নিজ বাহুবলে সমর-সমুদ্র মন্থন করে গৌড়লক্ষ্মী লাভ করেছিলেন। বিজয়সেন গৌড়ের রাজাকে পরাজিত করে গৌড় অধিকার করেছিলেন। যদি কিছু অঞ্চল থেকেও থাকে তা বল্লালসেনের আমলে অধিকৃত হয়ে থাকবে। কাজেই, লক্ষ্মণসেনের আমলে গৌড় বিজয়ের নতুন সম্ভাবনা থাকার কথা নয়। এটা অবশ্য ঠিক যে, লক্ষ্মণসেন নতুন রাজধানী স্থাপন করেন স্থানের নামানুসারে। তবে ধনৈশ্বর্যে বা সামরিক সামর্থে লক্ষ্মণাবতী খুব প্রসারিত হয়েছিল এমন মনে হয় না। বিজয়সেন বা বপ্ললালসেন গৌড়েশ্বর উপাধি ধারণ না করলেও সেন রাজা লক্ষ্মণসেন গৌড়েশ্বর উপাধি ধারণ করেছিলেন এবং তাঁর দুই পুত্র বিশ্বরূপসেন এবং কেশবসেন উভয়েই তাঁদের তাম্রশাসনে বল্লালসেন, বিজয়সেন এবং লক্ষ্মণসেনকে গৌড়েশ্বর উপাধিতে ভূষিত করেছেন।
মিনহাজের বর্ণনায় বখতিয়ার কর্তৃক নদীয়া আক্রমণের সময় লক্ষ্মণসেনের (জন্ম ১১২৪ খ্রিষ্টাব্দে) বয়স প্রায় ৮০ বছর ছিল এবং সম্ভবত ৫৪ বছর বয়সে তিনি রাজক্ষমতা গ্রহণ করেন। সুতরাং পিতা ও পিতামহের রাজত্বকালে তাঁর যৌবনকাল অতিক্রান্ত হয়।৭০৬ তাঁর যৌবনকালে সামরিক অভিযানে অংশগ্রহণ এবং সাফল্যের কথাই সম্ভবত তাঁর রাজ্য সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে লক্ষ্মণসেন কিছুটা সাফল্য অর্জন করেছিলেন বলা হয়ে থাকে।
তাঁর পুত্র বিশ্বরূপ সেন ও কেশবসেনের তাম্রশাসনে তাঁর পুরী, কাশী ও প্রয়াগে সমরজয়স্তম্ভ স্থাপনের উল্লেখ আছে।৭০৭ এসময় গঙ্গা বংশীয় রাজাগণ কলিঙ্গ ও উৎকলে রাজত্ব করতেন। তাঁদের তাম্রশাসনে লক্ষ্মণসেনের সময়ে তাঁর রাজ্য আর সম্প্রসারিত হওয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। সমসাময়িক গাহড়বাল রাজাদের তাম্রশাসনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। পাল বংশ পতনের আগেই গাহড়বাল রাজাগণ মগধে আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। বিজয়সেন নৌ-বাহিনী পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু যুদ্ধে জয়লাভ করতে পারেননি।
বল্লালসেন কিছু সফলতা লাভ করলেও পালদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত থাকায় গাহড়বালগণ মগধে অধিকার বিস্তারের সুযোগ পায়। গাহড়বাল রাজা বিজয়চন্দ্র ও জয়চন্দ্রের লিপি হতে প্রমাণিত হয় যে, ১১৬৯ হতে ১১৯০ অব্দের মধ্যে মগধের পশ্চিম ও মধ্য ভাগ গাহড়বাল রাজ্যভুক্ত ছিল। পূর্বদিকে তাদের রাজ্যবিস্তারে বাধা দিলে লক্ষ্মণসেনের সঙ্গে হয়ত যুদ্ধ বাধে। এ যুদ্ধের ফলাফল বিস্তারিত জানা যায় না। মাধাইনগর ও ভাওয়াল তাম্রলিপিতে লক্ষ্মণসেনকে গৌড়েশ্বর বলা হয়েছে।৭০৮ কিন্তু তিনি উত্তরাধিকারী হিসেবেই গৌড়ের রাজা ছিলেন। এতদ্ব্যতীত প্রবন্ধকোষ ও পুরাতন প্রবন্ধ সংগ্রহ প্রভৃতি জৈন গ্রন্থ হতেও এর সমর্থন মিলেছে।৭০৯ পালদের পতনে মগধাঞ্চলে গাহড়বালদের অগ্রগতি সেনসাম্রাজ্যের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিঘ্ন সৃষ্টি করেছিল। তাঁদের বিরুদ্ধে বিজয়সেন ও বল্লালসেন বিশেষ সাফল্য অর্জন করেন নি।৭১০ লক্ষ্মণসেনের পুত্রদ্বয়ের তাম্রশাসনে ব্যক্ত হয়েছে যে, তিনি সমুদ্রতীরে পুরুশোত্তর ক্ষেত্র, কাশীতে ও প্রয়াগে যজ্ঞয়ুপের সাথে ‘সমরজয়স্তম্ভ’ স্থাপন করেছিলেন। এ সময়ে গঙ্গাবংশীয় রাজাগণ কলিঙ্গ ও উৎকল, উভয় দেশেই রাজত্ব করতেন। জয়স্তম্ভ স্থাপনের সমসাময়িক সূত্র থেকে লক্ষ্মণসেনের প্রমাণ পাওয়া যায় না। মগধে তখন রাজত্ব করছিলেন গাহরবাল রাজ জয়চন্দ্র (১১৭০-১১৯৩ খ্রিষ্টাব্দ) বেনারস ও এলাহাবাদ তখন তাঁর সম্পূর্ণ কর্তৃত্বাধীনে ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। কাজেই, রাজা বিশ্বরূপসেন ও কেশবসেনের তাম্রশাসনের সত্যতা পাওয়া যায় না।
লক্ষ্মণসেনের বিজয় কাহিনী থেকে বুঝা যায় যে, উত্তরে গৌড়, পূর্বে কামরূপ ও দক্ষিণে কলিঙ্গরাজকে পরাভূত করে তিনি পৈতৃক রাজ্য অক্ষুণ্ণ রাখতে এবং সুদৃঢ় করতে সমর্থ হয়েছিলেন। তিনি স্বীয় পিতা ও পিতামহ অপেক্ষা পশ্চিমে সফলতা অর্জন করেছিলেন বলা হয়, কিন্তু কোনো ঐতিহাসিক সূত্র থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় না। কিন্তু পিতা বল্লালসেন বা পিতামহ বিজয়সেন কখনও নিজেদেরকে গৌড়েশ্বর বলেন নি এবং লক্ষ্মণসেন গৌড় অধিকার করার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। শুধু বিশ্বরূপসেন ও কেশবসেনের তাম্রশাসন থেকে জানা যায় যে, তাঁদের পূর্বপুরুষ গৌড়েশ্বর ছিলেন যখন উত্তর-পশ্চিম বাংলা তুর্কি অধিকারে ইতিমধ্যে চলে গেছে।
রাজা লক্ষ্মণসেনের সভাকবি উমাপতিধর শরণ চেদিরাজা (কলচুরি রাজা) ও এক ম্লেচ্ছ রাজার বিরুদ্ধে সম্ভবত তাঁর (লক্ষ্মণসেন) জয়লাভের কথা বলেছিলেন।৭১১ তখন রতনপুরের কলচুরি রাজবংশের রাজত্ব চলছিল। কলচুরিদের বিরুদ্ধে সংঘর্ষে লক্ষ্মণসেনের সাফল্য সভাকবিরা উল্লেখ করলেও মধ্যপ্রদেশে প্রাপ্ত লিপিতে তাঁরই (লক্ষ্মণসেন) পরাজয়ের উল্লেখ আছে। সুতরাং উভয় পক্ষের সাফল্য দাবি এর ফলাফলকে অনিশ্চিত করেছে।৭১২ ম্লেচ্ছ অর্থাৎ মুসলমান রাজার বিরুদ্ধে জয়লাভের উল্লেখ হতে নীরহাররঞ্জন রায় বখতিয়ার খলজীর বিরুদ্ধে লক্ষ্মণসেনের সাফল্য অনুমান করেছেন।৭১৩ আবার জে. এম. রায় ম্লেচ্ছ বলতে আরাকানের মগদের বুঝিয়েছেন। তাঁর মতে, মগগণ হয়তো বাংলা আক্রমণ করেছিল এবং লক্ষ্মণসেন তাঁদেরকে পরাজিত করেছিলেন।৭১৪ এসবই অনুমান মাত্র। বিশেষ করে, যবনদের সঙ্গে কোনো যুদ্ধে লক্ষ্মণসেনের জয়ী হওয়ার সংবাদ অলীক কল্পনামাত্র।
এ পর্যন্ত আলোচনা থেকে বুঝা যায় যে, লক্ষ্মণসেন প্রথম জীবনে বিভিন্ন যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত ছিলেন। যৌবনে পিতা ও পিতামহের সঙ্গী হিসেবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিজয়ী ছিলেন। তাঁর জীবনে সফলতা রাজা হওয়ার পূর্বে হয়তো উল্লেখযোগ্য ছিল, কিন্তু শেষ বিফলতাই তাঁর জীবনের সমস্ত অর্জন অনেকখানি ম্লান করে দিয়েছে। লক্ষ্মণসেন শিল্প, সাহিত্য ও ধর্মচর্চায় বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তিনি একজন সুকবি ছিলেন এবং তাঁর রচিত কয়েকটি শ্লোক সদ্যুক্তিকর্ণামৃত গ্রন্থে পাওয়া যায়। তাছাড়াও তিনি পিতা বল্লালসেনের অসমাপ্ত অদ্ভুতসাগর গ্রন্থটির রচনা সমাপ্ত করেন। ধোয়ী, শরণ, জয়দেব, গোবর্ধন, উমাপতিধর তাঁর রাজসভার পঞ্চরতড়ব ছিলেন। ব্রাহ্মণসর্বস্বম গ্রন্থ রচয়িতা হলায়ুধ লক্ষ্মণসেনের মন্ত্রী ও ধর্মাধ্যক্ষ ছিলেন।
সাহিত্যক্ষেত্র ব্যতীত শিল্পক্ষেত্রেও বাংলা এই সময় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লাভ করে। পিতা বল্লালসেন ও পিতামহ বিজয়সেনের শৈবধর্ম পরিত্যাগ করে লক্ষ্মণসেন বৈষ্ণবধর্ম গ্রহণ করেন। তিনি পিতা ও পিতামহের চিরাচরিত ‘পরম মাহেশ্বর’ উপাধির পরিবর্তে ‘পরম বৈষ্ণব’ উপাধি এবং ‘অরিরাজ মদন শঙ্কর’ উপাধি গ্রহণ করেন।৭১৫ উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিজয়সেন ও বল্লালসেন ছিলেন পরম শৈব। তারা পরম মহেশ্বর উপাধি ধারণ করতেন। তাদের তাম্রশাসনে প্রথমেই শিবের প্রণাম ও স্তুতিবাচক শ্লোক এবং মুদ্রায় কুলদেবতা সদাশিবের মূর্তি অঙ্কিত থাকত। লক্ষ্মণসেন সদাশিব মুদ্রার পরিবর্তন করেন নি কিন্তু তিনি পরম মহেশ্বরের পরিবর্তে ‘পরম বৈষ্ণব’ উপাধি গ্রহণ করেন।
তাঁর তাম্রশাসনগুলি নারায়ণের প্রণাম ও স্তূতিবাচক শ্লোক দিয়ে আরম্ভ করা হয়েছে। পণ্ডিত ও সুকবি এবং প্রেমের ধর্মে অবগাহনকারী, যুগের শ্রেষ্ঠ প্রতিভার পরিস্ফুটনে সহায়তাকারী, দীর্ঘজীবনে লব্ধ অভিজ্ঞতার আলোকে আত্মপলব্ধিকারী হিসেবে জীবনের প্রতি অঙ্গনে যোগ্যতা ও প্রতিভার আলোচ্ছটা দেখতে পাই। তাঁর এই আলোর রশ্মি ইতিহাসের পাতা আলোকিত করে রেখেছে। তিনি একজন দানশীল রাজা ছিলেন। রাজার মতোই ছিল তাঁর দানের পরিমাণ। যাঞ্চাকারীকে তিনি লক্ষ কড়ির কম দান করেন নি।৭১৬ তখনো এক লক্ষ কড়ির মূল্য ছিল ৭৮ টাকা থেকে একটু বেশি যা ছিল একজন সাধারণ শ্রমিকের এক বৎসর চার মাসের শ্রমের দাম। তাঁর দানশীলতা ঐতিহাসিক মিনহাজউদ্দীনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। মিনহাজউদ্দীন তাঁর দানশীলতার প্রশংসা করে তাঁকে ভারতের একজন মহানুভব শাসক হিসেবে অভিহিত করেছেন।৭১৭
কিন্তু লক্ষ্মণসেনের শেষজীবন সুখের ছিল না। কারণ, এই সময় তিনি বিপর্যয়ের সম্মুখীন হন। তখন রাষ্ট্রাভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলা, ষড়যন্ত্র, অভ্যুত্থান ও বহিঃশত্রুর আক্রমণের আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। সুন্দরবন অঞ্চলের এক মহামাণ্ডলিকের পুত্র ডোম্মনপাল বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং মহারাজাধিরাজ উপাধি ধারণ করে স্বাধীন রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন।৭১৮ অপরদিকে প্রায় একই সময়ে মেঘনা নদীর পূর্বপার্শ্বে দেববংশ নামে একটি স্বাধীন রাজবংশের উদ্ভব হয়।৭১৯ এতেই রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ভয়াবহ ষড়যন্ত্র, কেন্দ্রীয় শক্তির দুর্বলতা এবং অভ্যন্তরীণ গোলযোগ ও অন্তর্বিরোধের আভাস পাওয়া যায়। এমনই এক সংকটকালে (১২০৫ খ্রি.) নদীয়ায় তুর্কি অভিযান পরিচালিত হয়।৭২০ ঐতিহাসিকগণ বখতিয়ার খিলজীর নদীয়া অভিযানের সময়কাল নিরূপণে একমত হতে পারেননি। আহমদ হাসান দানী যথেষ্ট যুক্তিসহকারে প্রমাণ করেছেন যে, এই অভিযান ১০ই মে, ১২০৫ সালে পরিচালিত হয়েছিল। কারণ ইতোমধ্যে মোহাম্মদ ঘোরীর একটি স্বর্ণমুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে। উক্ত মুদ্রাায় ৬০১ হিজরী সনের ১৯ শে রমযান তারিখে (১০ই মে, ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দ) প্রচলিত এ মুদ্রায় গৌড় বিজয়ের কথা স্পষ্ট ভাষায় উল্লিখিত আছে। এ মুদ্রা থেকে বখতিয়ার খিলজীর গৌড় বিজয়ের সঠিক সন, তারিখ জানা যায়।৭২১
বখতিয়ার খিলজী নামক এক তুর্কি সেনাপতি সেনরাজ্য আক্রমণ করে এর পশ্চিম-উত্তরাংশে মুসলিম আধিপত্য বিস্তার করেন। বখতিয়ার খিলজীর নদীয়া আক্রমণ ও জয়ের বিবরণ সমসাময়িক ঐতিহাসিক মিনহাজ উদ্দীনের তবকাত-ই-নাসিরী গ্রন্থে লিপিবদ্ধ হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে যে, বখতিয়ার বিহার জয় করে নদীয়া অভিযান করেন। এ সময় বাংলার রাজা লক্ষ্মণসেন নদীয়াতে অবস্থান করছিলেন।
বখতিয়ারের বিহার জয়ের সংবাদে নদীয়ায় আতঙ্কের ভাব সৃষ্টি হয়েছিল। তখন রাজ্যের বিশিষ্ট ব্যক্তি মন্ত্রীবর্গ ও জ্যোতিষিগণ রাজা লক্ষ্মণসেনকে নদীয়া ত্যাগের পরামর্শ দেন, কিন্তু তিনি নদীয়া পরিত্যাগ না করে দৃঢ়তার পরিচয় দেন। অন্যদিকে বখতিয়ার নদীয়ার উদ্দেশ্যে এমনই দ্রুতগতিতে অগ্রসর হয়েছিলেন যে মাত্র ১৮ জন সৈনিক তাঁর সঙ্গে ছিল এবং মূল বাহিনী পশ্চাতে ছিল। তাঁদেরকে অশ্ববিক্রেতা মনে করে নদীয়াতে কারো মনে সংশয় সৃষ্টি হয় নি। এই সুযোগে তিনি সরাসরি রাজপ্রাসাদে গিয়ে বখতিয়ার স্বমূর্তি উন্মোচন করেন এবং আকস্মিক আক্রমণে প্রাসাদরক্ষীদের পরাস্ত করেন। তখন রাজা লক্ষ্মণসেন মধ্যাহ্ন আহারে রত ছিলেন। এই আকস্মিক ঘটনায় তিনি বিভ্রান্ত হয়ে রাজপ্রসাদের পশ্চাৎ দিয়ে নগ্ন পায়ে (পূর্ব) বঙ্গ ও সমতটে পলায়ন করেন। অতঃপর মূল বাহিনী এসে পড়লে সমগ্র নদীয়া শহরটি বখতিয়ারের হস্তগত হয় এবং বখতিয়ার ক্রমাগত অভিযান চালিয়ে বাংলার পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম অংশ তুর্কি অধিকারে নিয়ে আসেন।৭২২ মিনহাজ তাঁর বিবরণে মুসলিম অভিযান আসন্ন বলে বাংলাদেশে আতঙ্কভাব সৃষ্টির কথা এবং নদীয়াবাসীদের পলায়নবাদী মনোভাব ও লক্ষ্মণসেনের দৃঢ়তার বিষয় উল্লেখ করেছেন, অথচ আসন্ন প্রতিরোধে রাজা লক্ষ্মণসেন কর্তৃক গ্রহীত কোনো ব্যবস্থার কথা বলেন নি। এটি অস্বাভাবিক বলে মনে হয়। অন্যদিকে মিনহাজ বখতিয়ারের নদীয়া বিজয়ের পঞ্চাশ বছর পর এই তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন। তাই এর নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও ঐতিহাসিকরা সংশয় প্রকাশ করেছেন। অবশ্য ইসামীর ফুতুহ-উস-সালাতীন৭২৩ নামক গ্রন্থেও বখতিয়ারের নদীয়া জয়ের বিবরণ লিপিবদ্ধ হয়েছে। তাই সাধারণভাবে মিনহাজের বিবরণ সত্য বলে গৃহীত হয়েছে। কোনো কোনো পণ্ডিতব্যক্তির ধারণা, লক্ষ্মণসেন বার্ধক্যজনিত দুর্বলতা ও অন্যান্য কারণে জীবনের শেষ পর্যায়ে রাজ্যশাসনের প্রতি অমনোযোগী হয়ে পড়েছিলেন। এই কারণেই হয়ত লক্ষ্মণসেন গঙ্গাতীরবর্তী তীর্থস্থান নদীয়াতে বসবাস করছিলেন। ইতিহাসে এ ধরনের বর্ণনা খুব যুক্তিভিত্তিক বলে মনে হয় না। যে রাজা তাঁর জীবনের প্রারম্ভ থেকে শেষ সময় পর্যন্ত যুদ্ধের মাঠে দৃঢ় হস্তেই তরবারী ধরেছেন এবং যুদ্ধে পরাজয়ের চেয়ে সফলতার তালিকাই দীর্ঘ এবং যে রাজার উপস্থিতি চতুষ্পার্শ্বের রাজন্যবর্গ আতঙ্কের সঙ্গেই উপলব্ধি করেন, তেমন রাজা রাজ্যশাসনে অমনোযোগী হয়ে পড়েছিলেন, তা বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে না। আবার তিনি কিভাবে এবং কতখানি প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন তাও জানার উপায় নেই। ইতিহাসের এদিকটা আজো তমসাবৃতই রয়ে গেছে।
তুর্কি সেনাপতির বিহার জয়ের সংবাদে জনসাধারণের আতঙ্কগ্রস্ত হওয়াও অস্বাভাবিক নয়। এই আতঙ্কে দেশের লোক (পশ্চিমবঙ্গ) পূর্ববঙ্গ ও আসামে পালিয়ে গিয়েছিলেন। এই কারণে হয়ত নদীয়া জনশূন্য হয়ে পড়েছিল। এই ধরনের ইঙ্গিত মিনহাজের বিবরণে ধরা পড়েছে।৭২৪ সুতরাং বহিরাক্রমণ প্রতিরোধের কোনো বিশেষ ব্যবস্থাই যে গৃহীত হয় নি তা সহজেই উপলব্ধি করা সম্ভব। জ্যোতিষী, ব্রাহ্মণ ও মন্ত্রীবর্গ লক্ষ্মণসেনকে যুদ্ধ ব্যতিরেকেই নদীয়া পরিত্যাগ করতে উপদেশ দিয়েছিলেন, এতেও প্রতীয়মান হয় যে, রাষ্ট্র কর্তৃক বহিরাক্রমণ প্রতিরোধের কোনো পদক্ষেপ বিশেষ কার্যকর হয়নি এবং ভাগ্যনির্ভর পরাজয়ী মনোভাব রাষ্ট্রকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। অবশ্য যদি মনে করা হয়, লক্ষ্মণসেন বহিঃশত্র“ প্রতিরোধের ব্যবস্থা করেছিলেন, তাহলে স্বীকার করতে হবে যে, এই প্রতিরোধ ব্যবস্থা যথেষ্ট ছিল না এবং ইতিপূর্বেই সেনাবাহিনী মনোবল ও প্রতিরোধশক্তি হারিয়ে ফেলেছিল। কারণ বখতিয়ার নদীয়া অভিযানে প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হন নি। বখতিয়ার এই অভিযানে কোনো প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হলে এই ঘটনার নিশ্চয় উল্লেখ থাকত।
কারণ বখতিয়ারের তিব্বতাভিযানের ব্যর্থতার কথা মিনহাজ অসঙ্কোচে লিপিবদ্ধ করেছিলেন। তবে এও হতে পারে যে, জনসাধারণ, মন্ত্রী ও জ্যোতিষীদের পরাজয়ী মনোবৃত্তি সেনাবাহিনীর মনোবল ভেঙ্গে দিয়েছিল, সেই কারণেই হয়তো কোনো প্রতিরোধ ব্যবস্থাই ফলবতী হয় নি। এই কারণেই সম্ভবত মিনহাজের বিবরণীতে উল্লিখিত হয়েছে যে, বখতিয়ার অতি সহজেই বাংলাদেশ জয় করেছিলেন।৭২৫
যত সহজে বখতিয়ার খিলজী গৌড় অধিকার করেছেন বলে মিনহাজের বিবরণীতে পাওয়া যায়, প্রকৃত ঘটনা হয়তো তেমন ছিল না। কারণ, বিনা বাধায় নদীয়া বা নবদ্বীপ দখল করলে বখতিয়ারের নবদ্বীপ ধ্বংস করার কারণ ছিল না। কিন্তু তিনি নবদ্বীপ ধ্বংস করে দিয়েছিলেন, আর তা মিনহাজের বিবরণেই পাওয়া যায়। আর বিনা বাধায় নবদ্বীপ দখল করতে পারলে, বাংলায় পূর্ব ও দক্ষিণ অঞ্চল বখতিয়ারের পাশাপাশি টিকে ছিল কিভাবে? রাজা লক্ষ্মণসেনের দুই পুত্র বিশ্বরূপ সেন ও কেশবসেন এবং তাদের কোনো কোনো বংশধর আরো দীর্ঘ ৫০ বছরের অধিককাল রাজত্ব করেছেন।৭২৬ কাজেই, লক্ষ্মণসেন এবং তার বংশধরগণ যুদ্ধবিদ্যা ত্যাগ করেছিলেন এমন মনে হয় না। ইতিহাসের এই অস্পষ্ট দিকগুলি পরিষ্কার করতে আরো তথ্যের প্রয়োজন আছে।
মিনহাজের বিবরণেও পাওয়া যায়, লক্ষ্মণসেন যে দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছেন তা সত্যই প্রশংসনীয়। আসন্ন তুর্কি আক্রমণের ভয় এবং এই কারণে মানুষের আতঙ্ক ও পলায়নবাদী মনোভাব তাঁকে আচ্ছন্ন করতে পারে নি। শত্রুর আক্রমণ অত্যাসন্ন অনুধাবন করেও এবং উপদেষ্টা ও মন্ত্রীবর্গের পরামর্শেও নদীয়া পরিত্যাগ না করে স্বীয় কর্তব্যে তিনি অটল ছিলেন। সম্ভবত লক্ষ্মণসেন বখতিয়ারের আসন্ন আক্রমণ প্রতিরোধের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু সেই ব্যবস্থা কৌশলগত দিক থেকে কতখানি শক্তিশালী ছিল জানা যায় না। সেই ব্যবস্থা চতুর অশ্ববিক্রেতার ছদ্মাবরণধারী বখতিয়ারের নিকট বিশেষ কার্যকরী হয় নি বলেই মনে হয়। নিজের অবস্থাকে লুকানোর জন্য বখতিয়ার খিলজীর কিছুটা শারীরিক সুবিধা ছিল। তিনি দুঃসাহসী অভিযাত্রী হলেও শারীরিক দিক থেকে তুলনামূলকভাবে খর্বাকৃতি ছিলেন এবং চেহারাও অভিজাত শ্রেণীর বলে মনে হতো না।৭২৭ এজন্যই হয়তো নগরে প্রবেশকালে নগররক্ষী বা সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন নি। এজন্য বোধহয় তিনি অতি সহজেই রাজপ্রাসাদে গমন করতে সক্ষম হন এবং রাজা লক্ষ্মণসেনের প্রাসাদরক্ষীদের পরাস্ত করেন। মিনহাজের বর্ণনা থেকে জানা যায়, বখতিয়ারের প্রথম আক্রমণ ছিল প্রাসাদরক্ষীদের বিরুদ্ধেই এবং তখন লক্ষণসেন স্বীয় প্রাসাদে দ্বিপ্রহরের ভোজনে রত ছিলেন। ৭২৮ স্বর্ণ ও রৌপ্য নির্মিত পাত্রে তাঁকে আহার পরিবেশ করা হচ্ছিল। লক্ষ্মণসেনের সমসাময়িক কালের অনেক পাকা বাড়ি বা মন্দিরের ভগ্নাংশ এখনও রয়ে গেছে। সেসব চিহ্নিত করতে প্রত্নতত্ত্ববিদদের অসুবিধা হয় না। কিন্তু নদীয়াতে লক্ষণসেনের সেই প্রসাদের কোনো চিহ্নই বর্তমান নেই এবং কোনো কালে ছিল, এমন প্রমাণ বা উল্লেখ কোথাও নেই। সে যুগেও রাজপ্রসাদের মতো বিশিষ্ট স্থাপনার নিরাপত্তার জন্য যে সব প্রচলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকার কথা এখানে তারও কোনো উল্লেখ কোথাও নেই। কাজেই সম্পূর্ণ ঘটনাটিই রহস্যাবৃত।
এই আকস্মিক বিপজ্জনক অবস্থাদৃষ্টে রাজার সম্মুখে হয়তো আর কোনো উপায় ছিল না। তখন তিনি পলায়নই অধিক যুক্তিসঙ্গত বলে মনে করেন। উত্থান-পতন ইতিহাসের চিরন্তন নিয়ম। লক্ষ্মণসেনের রাজত্বকালের শেষে এর প্রতিফলন লক্ষ করা যায়। তাই তাঁর ব্যক্তিগত গুণাবলিও শেষ পর্যন্ত তাঁকে রক্ষা করতে সক্ষম হয় নি। তিনি বিপর্যয়ের দৃশ্যও অবলোকন করেন।৭২৯ তবে এটা ঠিক যে, নদীয়া বিজয় নাটকের অনেক অংশই আমাদের অজানা রয়ে গেছে। লক্ষ্মণসেনের সময়েই সেন প্রশাসন উন্নতির শিখরে পৌঁছে আবার অবনতির শেষ পর্যায়ে নেমে আসে। রাজা লক্ষ্মণসেন জীবনের শেষ মুহূর্তে বিপর্যয়ের সম্মুখীন হলেন। কারণ পশ্চিম ও উত্তর বাংলায় তুর্কি অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলে তার রাজ্য দক্ষিণ-পূর্ববাংলায় সীমাবদ্ধ হয়ে যায়।
৭০৪ পি.সি. সেন- করতোয়া মাহাত্ম, ১৯২৯।
৭০৫ কেশবসেনের আদিলপুর তাম্রশাসনের শ্লোক নং- ১৩।
৭০৬ W.W. Hunter: Statistical Account of Bengal, Vol VII, p. 165.
৭০৭ সুভাষ মুখোপাধ্যায়- বাঙালির ইতিহাস, পৃ. ২৪।
৭০৮ গৌরীনাথ শাস্ত্রী- সংস্কৃত সাহিত্যের ইতিহাস, খণ্ড-১, পৃ. ৪।
৭০৯ সুকুমার সেন- বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, প্র ম খণ্ড, পৃ ৪।
৭১০ আর.মুখার্জী অ্যান্ড এস.কে. মাইতি- করপাস অফ বেঙ্গল ইন্সক্রিপশনস্ বিয়ারিং অন হিস্ট্রি অ্যান্ড সিভিলাইজেশন অফ বেঙ্গল, পৃ. ৩৯-৪০।
৭১১ এপিগ্রাফিয়া ইন্ডিকা, খণ্ড-১৫, পৃ. ১১৩।
৭১২ হিস্ট্রি অফ বেঙ্গল, খণ্ড- ১, পৃ. ২০।
৭১৩ আনিসুজ্জামান- বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, খণ্ড- ১, পৃ. ১৫।
৭১৪ পি.সি. সেন- করতোয়া মাহাত্ম, ১৯২৯।
৭১৫ T. Waters- On Yuan-Chuangs Travel in India, Vol-II, p. 184-185.
৭১৬ মিনহাজ-ই-সিরাজ: তবকাত-ই-নাসিরী (অনুবাদক: আবুল কালাম মোঃ যাকারিয়া), পৃ. ২৪।
৭১৭ এ. কানিংহাম- অর্কিয়লজিক্যাল সারভে অফ ইন্ডিয়া অ্যানুয়াল রিপোর্ট, খণ্ড- ১৫, পৃ. ১১০।**
৭১৮ D.C. Sircar: Studies in the Geography of Ancient & Medieval India, p. 113-114.
৭১৯ এন. কে. ভট্টশালী- নিউ শক্তিপুর গ্রান্ট অফ লক্ষশণসেনদের অ্যান্ড জিওগ্রাফিক্যাল ডিভিশনস অফ অ্যানশিয়েন্ট বেঙ্গল, পৃ. ৭৫-৭৬, ৮৭-৮৮।**
৭২০ এন.জি. মজুমদার, ইন্সক্রিপশন্স অফ বেঙ্গল, খন্ড ৩, পৃ. ১০৪,১১৫।
৭২১ মিনহাজ-ই-সিরাজ: তবকাত-ই-নাসিরী (অনুবাদ) আবুল কালাম মোঃ যাকারিয়া, পৃ. ২৬৪।
৭২২ সন্ধ্যাকর নন্দী, রামচরিত, রমেশচন্দ্র মজুমদার ও অন্যান্য।
৭২৩ হিস্ট্রি অফ বেঙ্গল, খণ্ড-১।
৭২৪ আনিসুজ্জামান (সম্পাদিত)- বাঙলা সাহিত্যে ইতিহাস, খণ্ড-১।
৭২৫ বাঙালির ইতিহাস (আদিপর্ব)।
৭২৬ মিনহাজ-ই-সিরাজ: তবকাত-ই-নাসিরী (অনুবাদ) আবুল কালাম মোঃ যাকারিয়া, পৃ. ২৮।
৭২৭ মিনহাজ-ই-সিরাজ: তবকাত-ই-নাসিরী (অনুবাদ) পৃ. ১৭।
৭২৮ মিনহাজ-ই-সিরাজ: তবকাত-ই-নাসিরী (অনুবাদ) পৃ. ২৭।
৭২৯ কোলে (সম্পা)- দশকুমারচরিত।
আগামী পর্বেঃ বিশ্বরূপসেন এবং কেশবসেন
(প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্ব ৯৫
সেন যুগের অবসান> বখতিয়ার খিলজির আগমন।
লক্ষ্মণসেন (১১৭৮-১২০৫)
বল্লালসেনের পর তাঁর পুত্র লক্ষ্মণসেন পিতৃসিংহাসনে আরোহণ করেন। তিনি সম্ভবত বঙ্গে ২৭ বৎসর রাজত্ব করেন। তাঁর সময়ে সেন সাম্রাজ্য অভূতপূর্ব উনড়বতি ও চরম অবনতি দু’ই প্রত্যক্ষ করে। তাঁর সময়কালের ইতিহাসের উপকরণ হিসেবে তাঁর রাজত্বকালের আটটি তাম্রশাসন যথা: ১. গোবিন্দপুর তাম্রশাসন (২৪ পরগনা), ২. আনুলিয়া তাম্রশাসন (নদীয়া), ৩. তর্পণদীঘি তাম্রশাসন (দিনাজপুর), ৪. মাধাইনগর তাম্রশাসন (পাবনা), ৫. শক্তিপুর তাম্রশাসন (মুর্শিদাবাদ), ৬. ভাওয়াল তাম্রশাসন (ঢাকা), ৭. সুন্দরবন তাম্রশাসন, ৮. চণ্ডী মূর্তিলিপি (ঢাকা) এবং তাঁর সভাকবিদের স্তুতিবাচক শ্লোক, তৎপুত্রদ্বয়ের তাম্রশাসন ও মুসলিম ঐতিহাসিক মিনহাজ উদ্দীন রচিত তবকাত-ই-নাসিরী গ্রন্থ উল্লেখ্য।
লক্ষ্মণসেনের তাম্রশাসনগুলিকে তাঁর কৃতিত্ব সম্পর্কে অতি স্তুতিবাচক বর্ণনা রয়েছে। এতে বলা হয়েছে যে, তিনি কৌমারে উদ্ধৃত গৌড়েশ্বরের শ্রীহরণ ও যৌবনে কলিঙ্গদেশে অভিযান করেছিলেন, যুদ্ধে কাশীরাজকে পরাজিত করেছিলেন এবং ভীরু প্রগজ্যোতিষের (কামরূপ ও আসাম) রাজা তাঁর বশ্যতা স্বীকার করেছিলেন।৭০৪ মাধাইনগর থেকে লক্ষ্মণসেনের হাতে গৌড়, কলিঙ্গ, কামরূপ ও কাশীর রাজাদের পরাজয়ের কথা জানা যায়। তাঁর পুত্রের তাম্রশাসন থেকে জানা যায় যে, লক্ষণসেন পুরী, বারানসী ও এলাহাবাদে বিজয়স্তম্ভ স্থাপন করেছিলেন।৭০৫ ইতিপূর্বে বর্ণিত হয়েছে যে, বিজয়সেন ও বল্লালসেনের সমরাভিযানে যৌবনে লক্ষ্মণসেনও সহযাত্রী ছিলেন। তবে তাঁর তাম্রশাসন ‘কৌমার কেলী’ কথাটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। অর্থাৎ এই সকল যুদ্ধাভিযান লক্ষ্মণসেন যৌবন বয়সে খেলাধুলার মতোই অংশগ্রহণ করেছিলেন- যুদ্ধে পৃথিবীকে যোদ্ধাশূন্য করলেও পতিতজনের প্রতি আঘাত করেন নি। প্রশস্তিকার অন্যত্র লিখেছেন, লক্ষ্মণসেন নিজ বাহুবলে সমর-সমুদ্র মন্থন করে গৌড়লক্ষ্মী লাভ করেছিলেন। বিজয়সেন গৌড়ের রাজাকে পরাজিত করে গৌড় অধিকার করেছিলেন। যদি কিছু অঞ্চল থেকেও থাকে তা বল্লালসেনের আমলে অধিকৃত হয়ে থাকবে। কাজেই, লক্ষ্মণসেনের আমলে গৌড় বিজয়ের নতুন সম্ভাবনা থাকার কথা নয়। এটা অবশ্য ঠিক যে, লক্ষ্মণসেন নতুন রাজধানী স্থাপন করেন স্থানের নামানুসারে। তবে ধনৈশ্বর্যে বা সামরিক সামর্থে লক্ষ্মণাবতী খুব প্রসারিত হয়েছিল এমন মনে হয় না। বিজয়সেন বা বপ্ললালসেন গৌড়েশ্বর উপাধি ধারণ না করলেও সেন রাজা লক্ষ্মণসেন গৌড়েশ্বর উপাধি ধারণ করেছিলেন এবং তাঁর দুই পুত্র বিশ্বরূপসেন এবং কেশবসেন উভয়েই তাঁদের তাম্রশাসনে বল্লালসেন, বিজয়সেন এবং লক্ষ্মণসেনকে গৌড়েশ্বর উপাধিতে ভূষিত করেছেন।
মিনহাজের বর্ণনায় বখতিয়ার কর্তৃক নদীয়া আক্রমণের সময় লক্ষ্মণসেনের (জন্ম ১১২৪ খ্রিষ্টাব্দে) বয়স প্রায় ৮০ বছর ছিল এবং সম্ভবত ৫৪ বছর বয়সে তিনি রাজক্ষমতা গ্রহণ করেন। সুতরাং পিতা ও পিতামহের রাজত্বকালে তাঁর যৌবনকাল অতিক্রান্ত হয়।৭০৬ তাঁর যৌবনকালে সামরিক অভিযানে অংশগ্রহণ এবং সাফল্যের কথাই সম্ভবত তাঁর রাজ্য সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে লক্ষ্মণসেন কিছুটা সাফল্য অর্জন করেছিলেন বলা হয়ে থাকে।
তাঁর পুত্র বিশ্বরূপ সেন ও কেশবসেনের তাম্রশাসনে তাঁর পুরী, কাশী ও প্রয়াগে সমরজয়স্তম্ভ স্থাপনের উল্লেখ আছে।৭০৭ এসময় গঙ্গা বংশীয় রাজাগণ কলিঙ্গ ও উৎকলে রাজত্ব করতেন। তাঁদের তাম্রশাসনে লক্ষ্মণসেনের সময়ে তাঁর রাজ্য আর সম্প্রসারিত হওয়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। সমসাময়িক গাহড়বাল রাজাদের তাম্রশাসনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। পাল বংশ পতনের আগেই গাহড়বাল রাজাগণ মগধে আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন। বিজয়সেন নৌ-বাহিনী পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু যুদ্ধে জয়লাভ করতে পারেননি।
বল্লালসেন কিছু সফলতা লাভ করলেও পালদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত থাকায় গাহড়বালগণ মগধে অধিকার বিস্তারের সুযোগ পায়। গাহড়বাল রাজা বিজয়চন্দ্র ও জয়চন্দ্রের লিপি হতে প্রমাণিত হয় যে, ১১৬৯ হতে ১১৯০ অব্দের মধ্যে মগধের পশ্চিম ও মধ্য ভাগ গাহড়বাল রাজ্যভুক্ত ছিল। পূর্বদিকে তাদের রাজ্যবিস্তারে বাধা দিলে লক্ষ্মণসেনের সঙ্গে হয়ত যুদ্ধ বাধে। এ যুদ্ধের ফলাফল বিস্তারিত জানা যায় না। মাধাইনগর ও ভাওয়াল তাম্রলিপিতে লক্ষ্মণসেনকে গৌড়েশ্বর বলা হয়েছে।৭০৮ কিন্তু তিনি উত্তরাধিকারী হিসেবেই গৌড়ের রাজা ছিলেন। এতদ্ব্যতীত প্রবন্ধকোষ ও পুরাতন প্রবন্ধ সংগ্রহ প্রভৃতি জৈন গ্রন্থ হতেও এর সমর্থন মিলেছে।৭০৯ পালদের পতনে মগধাঞ্চলে গাহড়বালদের অগ্রগতি সেনসাম্রাজ্যের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিঘ্ন সৃষ্টি করেছিল। তাঁদের বিরুদ্ধে বিজয়সেন ও বল্লালসেন বিশেষ সাফল্য অর্জন করেন নি।৭১০ লক্ষ্মণসেনের পুত্রদ্বয়ের তাম্রশাসনে ব্যক্ত হয়েছে যে, তিনি সমুদ্রতীরে পুরুশোত্তর ক্ষেত্র, কাশীতে ও প্রয়াগে যজ্ঞয়ুপের সাথে ‘সমরজয়স্তম্ভ’ স্থাপন করেছিলেন। এ সময়ে গঙ্গাবংশীয় রাজাগণ কলিঙ্গ ও উৎকল, উভয় দেশেই রাজত্ব করতেন। জয়স্তম্ভ স্থাপনের সমসাময়িক সূত্র থেকে লক্ষ্মণসেনের প্রমাণ পাওয়া যায় না। মগধে তখন রাজত্ব করছিলেন গাহরবাল রাজ জয়চন্দ্র (১১৭০-১১৯৩ খ্রিষ্টাব্দ) বেনারস ও এলাহাবাদ তখন তাঁর সম্পূর্ণ কর্তৃত্বাধীনে ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। কাজেই, রাজা বিশ্বরূপসেন ও কেশবসেনের তাম্রশাসনের সত্যতা পাওয়া যায় না।
লক্ষ্মণসেনের বিজয় কাহিনী থেকে বুঝা যায় যে, উত্তরে গৌড়, পূর্বে কামরূপ ও দক্ষিণে কলিঙ্গরাজকে পরাভূত করে তিনি পৈতৃক রাজ্য অক্ষুণ্ণ রাখতে এবং সুদৃঢ় করতে সমর্থ হয়েছিলেন। তিনি স্বীয় পিতা ও পিতামহ অপেক্ষা পশ্চিমে সফলতা অর্জন করেছিলেন বলা হয়, কিন্তু কোনো ঐতিহাসিক সূত্র থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় না। কিন্তু পিতা বল্লালসেন বা পিতামহ বিজয়সেন কখনও নিজেদেরকে গৌড়েশ্বর বলেন নি এবং লক্ষ্মণসেন গৌড় অধিকার করার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। শুধু বিশ্বরূপসেন ও কেশবসেনের তাম্রশাসন থেকে জানা যায় যে, তাঁদের পূর্বপুরুষ গৌড়েশ্বর ছিলেন যখন উত্তর-পশ্চিম বাংলা তুর্কি অধিকারে ইতিমধ্যে চলে গেছে।
রাজা লক্ষ্মণসেনের সভাকবি উমাপতিধর শরণ চেদিরাজা (কলচুরি রাজা) ও এক ম্লেচ্ছ রাজার বিরুদ্ধে সম্ভবত তাঁর (লক্ষ্মণসেন) জয়লাভের কথা বলেছিলেন।৭১১ তখন রতনপুরের কলচুরি রাজবংশের রাজত্ব চলছিল। কলচুরিদের বিরুদ্ধে সংঘর্ষে লক্ষ্মণসেনের সাফল্য সভাকবিরা উল্লেখ করলেও মধ্যপ্রদেশে প্রাপ্ত লিপিতে তাঁরই (লক্ষ্মণসেন) পরাজয়ের উল্লেখ আছে। সুতরাং উভয় পক্ষের সাফল্য দাবি এর ফলাফলকে অনিশ্চিত করেছে।৭১২ ম্লেচ্ছ অর্থাৎ মুসলমান রাজার বিরুদ্ধে জয়লাভের উল্লেখ হতে নীরহাররঞ্জন রায় বখতিয়ার খলজীর বিরুদ্ধে লক্ষ্মণসেনের সাফল্য অনুমান করেছেন।৭১৩ আবার জে. এম. রায় ম্লেচ্ছ বলতে আরাকানের মগদের বুঝিয়েছেন। তাঁর মতে, মগগণ হয়তো বাংলা আক্রমণ করেছিল এবং লক্ষ্মণসেন তাঁদেরকে পরাজিত করেছিলেন।৭১৪ এসবই অনুমান মাত্র। বিশেষ করে, যবনদের সঙ্গে কোনো যুদ্ধে লক্ষ্মণসেনের জয়ী হওয়ার সংবাদ অলীক কল্পনামাত্র।
এ পর্যন্ত আলোচনা থেকে বুঝা যায় যে, লক্ষ্মণসেন প্রথম জীবনে বিভিন্ন যুদ্ধ-বিগ্রহে লিপ্ত ছিলেন। যৌবনে পিতা ও পিতামহের সঙ্গী হিসেবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিজয়ী ছিলেন। তাঁর জীবনে সফলতা রাজা হওয়ার পূর্বে হয়তো উল্লেখযোগ্য ছিল, কিন্তু শেষ বিফলতাই তাঁর জীবনের সমস্ত অর্জন অনেকখানি ম্লান করে দিয়েছে। লক্ষ্মণসেন শিল্প, সাহিত্য ও ধর্মচর্চায় বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তিনি একজন সুকবি ছিলেন এবং তাঁর রচিত কয়েকটি শ্লোক সদ্যুক্তিকর্ণামৃত গ্রন্থে পাওয়া যায়। তাছাড়াও তিনি পিতা বল্লালসেনের অসমাপ্ত অদ্ভুতসাগর গ্রন্থটির রচনা সমাপ্ত করেন। ধোয়ী, শরণ, জয়দেব, গোবর্ধন, উমাপতিধর তাঁর রাজসভার পঞ্চরতড়ব ছিলেন। ব্রাহ্মণসর্বস্বম গ্রন্থ রচয়িতা হলায়ুধ লক্ষ্মণসেনের মন্ত্রী ও ধর্মাধ্যক্ষ ছিলেন।
সাহিত্যক্ষেত্র ব্যতীত শিল্পক্ষেত্রেও বাংলা এই সময় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লাভ করে। পিতা বল্লালসেন ও পিতামহ বিজয়সেনের শৈবধর্ম পরিত্যাগ করে লক্ষ্মণসেন বৈষ্ণবধর্ম গ্রহণ করেন। তিনি পিতা ও পিতামহের চিরাচরিত ‘পরম মাহেশ্বর’ উপাধির পরিবর্তে ‘পরম বৈষ্ণব’ উপাধি এবং ‘অরিরাজ মদন শঙ্কর’ উপাধি গ্রহণ করেন।৭১৫ উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিজয়সেন ও বল্লালসেন ছিলেন পরম শৈব। তারা পরম মহেশ্বর উপাধি ধারণ করতেন। তাদের তাম্রশাসনে প্রথমেই শিবের প্রণাম ও স্তুতিবাচক শ্লোক এবং মুদ্রায় কুলদেবতা সদাশিবের মূর্তি অঙ্কিত থাকত। লক্ষ্মণসেন সদাশিব মুদ্রার পরিবর্তন করেন নি কিন্তু তিনি পরম মহেশ্বরের পরিবর্তে ‘পরম বৈষ্ণব’ উপাধি গ্রহণ করেন।
তাঁর তাম্রশাসনগুলি নারায়ণের প্রণাম ও স্তূতিবাচক শ্লোক দিয়ে আরম্ভ করা হয়েছে। পণ্ডিত ও সুকবি এবং প্রেমের ধর্মে অবগাহনকারী, যুগের শ্রেষ্ঠ প্রতিভার পরিস্ফুটনে সহায়তাকারী, দীর্ঘজীবনে লব্ধ অভিজ্ঞতার আলোকে আত্মপলব্ধিকারী হিসেবে জীবনের প্রতি অঙ্গনে যোগ্যতা ও প্রতিভার আলোচ্ছটা দেখতে পাই। তাঁর এই আলোর রশ্মি ইতিহাসের পাতা আলোকিত করে রেখেছে। তিনি একজন দানশীল রাজা ছিলেন। রাজার মতোই ছিল তাঁর দানের পরিমাণ। যাঞ্চাকারীকে তিনি লক্ষ কড়ির কম দান করেন নি।৭১৬ তখনো এক লক্ষ কড়ির মূল্য ছিল ৭৮ টাকা থেকে একটু বেশি যা ছিল একজন সাধারণ শ্রমিকের এক বৎসর চার মাসের শ্রমের দাম। তাঁর দানশীলতা ঐতিহাসিক মিনহাজউদ্দীনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। মিনহাজউদ্দীন তাঁর দানশীলতার প্রশংসা করে তাঁকে ভারতের একজন মহানুভব শাসক হিসেবে অভিহিত করেছেন।৭১৭
কিন্তু লক্ষ্মণসেনের শেষজীবন সুখের ছিল না। কারণ, এই সময় তিনি বিপর্যয়ের সম্মুখীন হন। তখন রাষ্ট্রাভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলা, ষড়যন্ত্র, অভ্যুত্থান ও বহিঃশত্রুর আক্রমণের আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। সুন্দরবন অঞ্চলের এক মহামাণ্ডলিকের পুত্র ডোম্মনপাল বিদ্রোহ ঘোষণা করেন এবং মহারাজাধিরাজ উপাধি ধারণ করে স্বাধীন রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন।৭১৮ অপরদিকে প্রায় একই সময়ে মেঘনা নদীর পূর্বপার্শ্বে দেববংশ নামে একটি স্বাধীন রাজবংশের উদ্ভব হয়।৭১৯ এতেই রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ভয়াবহ ষড়যন্ত্র, কেন্দ্রীয় শক্তির দুর্বলতা এবং অভ্যন্তরীণ গোলযোগ ও অন্তর্বিরোধের আভাস পাওয়া যায়। এমনই এক সংকটকালে (১২০৫ খ্রি.) নদীয়ায় তুর্কি অভিযান পরিচালিত হয়।৭২০ ঐতিহাসিকগণ বখতিয়ার খিলজীর নদীয়া অভিযানের সময়কাল নিরূপণে একমত হতে পারেননি। আহমদ হাসান দানী যথেষ্ট যুক্তিসহকারে প্রমাণ করেছেন যে, এই অভিযান ১০ই মে, ১২০৫ সালে পরিচালিত হয়েছিল। কারণ ইতোমধ্যে মোহাম্মদ ঘোরীর একটি স্বর্ণমুদ্রা আবিষ্কৃত হয়েছে। উক্ত মুদ্রাায় ৬০১ হিজরী সনের ১৯ শে রমযান তারিখে (১০ই মে, ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দ) প্রচলিত এ মুদ্রায় গৌড় বিজয়ের কথা স্পষ্ট ভাষায় উল্লিখিত আছে। এ মুদ্রা থেকে বখতিয়ার খিলজীর গৌড় বিজয়ের সঠিক সন, তারিখ জানা যায়।৭২১
বখতিয়ার খিলজী নামক এক তুর্কি সেনাপতি সেনরাজ্য আক্রমণ করে এর পশ্চিম-উত্তরাংশে মুসলিম আধিপত্য বিস্তার করেন। বখতিয়ার খিলজীর নদীয়া আক্রমণ ও জয়ের বিবরণ সমসাময়িক ঐতিহাসিক মিনহাজ উদ্দীনের তবকাত-ই-নাসিরী গ্রন্থে লিপিবদ্ধ হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে যে, বখতিয়ার বিহার জয় করে নদীয়া অভিযান করেন। এ সময় বাংলার রাজা লক্ষ্মণসেন নদীয়াতে অবস্থান করছিলেন।
বখতিয়ারের বিহার জয়ের সংবাদে নদীয়ায় আতঙ্কের ভাব সৃষ্টি হয়েছিল। তখন রাজ্যের বিশিষ্ট ব্যক্তি মন্ত্রীবর্গ ও জ্যোতিষিগণ রাজা লক্ষ্মণসেনকে নদীয়া ত্যাগের পরামর্শ দেন, কিন্তু তিনি নদীয়া পরিত্যাগ না করে দৃঢ়তার পরিচয় দেন। অন্যদিকে বখতিয়ার নদীয়ার উদ্দেশ্যে এমনই দ্রুতগতিতে অগ্রসর হয়েছিলেন যে মাত্র ১৮ জন সৈনিক তাঁর সঙ্গে ছিল এবং মূল বাহিনী পশ্চাতে ছিল। তাঁদেরকে অশ্ববিক্রেতা মনে করে নদীয়াতে কারো মনে সংশয় সৃষ্টি হয় নি। এই সুযোগে তিনি সরাসরি রাজপ্রাসাদে গিয়ে বখতিয়ার স্বমূর্তি উন্মোচন করেন এবং আকস্মিক আক্রমণে প্রাসাদরক্ষীদের পরাস্ত করেন। তখন রাজা লক্ষ্মণসেন মধ্যাহ্ন আহারে রত ছিলেন। এই আকস্মিক ঘটনায় তিনি বিভ্রান্ত হয়ে রাজপ্রসাদের পশ্চাৎ দিয়ে নগ্ন পায়ে (পূর্ব) বঙ্গ ও সমতটে পলায়ন করেন। অতঃপর মূল বাহিনী এসে পড়লে সমগ্র নদীয়া শহরটি বখতিয়ারের হস্তগত হয় এবং বখতিয়ার ক্রমাগত অভিযান চালিয়ে বাংলার পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম অংশ তুর্কি অধিকারে নিয়ে আসেন।৭২২ মিনহাজ তাঁর বিবরণে মুসলিম অভিযান আসন্ন বলে বাংলাদেশে আতঙ্কভাব সৃষ্টির কথা এবং নদীয়াবাসীদের পলায়নবাদী মনোভাব ও লক্ষ্মণসেনের দৃঢ়তার বিষয় উল্লেখ করেছেন, অথচ আসন্ন প্রতিরোধে রাজা লক্ষ্মণসেন কর্তৃক গ্রহীত কোনো ব্যবস্থার কথা বলেন নি। এটি অস্বাভাবিক বলে মনে হয়। অন্যদিকে মিনহাজ বখতিয়ারের নদীয়া বিজয়ের পঞ্চাশ বছর পর এই তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন। তাই এর নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও ঐতিহাসিকরা সংশয় প্রকাশ করেছেন। অবশ্য ইসামীর ফুতুহ-উস-সালাতীন৭২৩ নামক গ্রন্থেও বখতিয়ারের নদীয়া জয়ের বিবরণ লিপিবদ্ধ হয়েছে। তাই সাধারণভাবে মিনহাজের বিবরণ সত্য বলে গৃহীত হয়েছে। কোনো কোনো পণ্ডিতব্যক্তির ধারণা, লক্ষ্মণসেন বার্ধক্যজনিত দুর্বলতা ও অন্যান্য কারণে জীবনের শেষ পর্যায়ে রাজ্যশাসনের প্রতি অমনোযোগী হয়ে পড়েছিলেন। এই কারণেই হয়ত লক্ষ্মণসেন গঙ্গাতীরবর্তী তীর্থস্থান নদীয়াতে বসবাস করছিলেন। ইতিহাসে এ ধরনের বর্ণনা খুব যুক্তিভিত্তিক বলে মনে হয় না। যে রাজা তাঁর জীবনের প্রারম্ভ থেকে শেষ সময় পর্যন্ত যুদ্ধের মাঠে দৃঢ় হস্তেই তরবারী ধরেছেন এবং যুদ্ধে পরাজয়ের চেয়ে সফলতার তালিকাই দীর্ঘ এবং যে রাজার উপস্থিতি চতুষ্পার্শ্বের রাজন্যবর্গ আতঙ্কের সঙ্গেই উপলব্ধি করেন, তেমন রাজা রাজ্যশাসনে অমনোযোগী হয়ে পড়েছিলেন, তা বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে না। আবার তিনি কিভাবে এবং কতখানি প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন তাও জানার উপায় নেই। ইতিহাসের এদিকটা আজো তমসাবৃতই রয়ে গেছে।
তুর্কি সেনাপতির বিহার জয়ের সংবাদে জনসাধারণের আতঙ্কগ্রস্ত হওয়াও অস্বাভাবিক নয়। এই আতঙ্কে দেশের লোক (পশ্চিমবঙ্গ) পূর্ববঙ্গ ও আসামে পালিয়ে গিয়েছিলেন। এই কারণে হয়ত নদীয়া জনশূন্য হয়ে পড়েছিল। এই ধরনের ইঙ্গিত মিনহাজের বিবরণে ধরা পড়েছে।৭২৪ সুতরাং বহিরাক্রমণ প্রতিরোধের কোনো বিশেষ ব্যবস্থাই যে গৃহীত হয় নি তা সহজেই উপলব্ধি করা সম্ভব। জ্যোতিষী, ব্রাহ্মণ ও মন্ত্রীবর্গ লক্ষ্মণসেনকে যুদ্ধ ব্যতিরেকেই নদীয়া পরিত্যাগ করতে উপদেশ দিয়েছিলেন, এতেও প্রতীয়মান হয় যে, রাষ্ট্র কর্তৃক বহিরাক্রমণ প্রতিরোধের কোনো পদক্ষেপ বিশেষ কার্যকর হয়নি এবং ভাগ্যনির্ভর পরাজয়ী মনোভাব রাষ্ট্রকে বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিয়েছিল। অবশ্য যদি মনে করা হয়, লক্ষ্মণসেন বহিঃশত্র“ প্রতিরোধের ব্যবস্থা করেছিলেন, তাহলে স্বীকার করতে হবে যে, এই প্রতিরোধ ব্যবস্থা যথেষ্ট ছিল না এবং ইতিপূর্বেই সেনাবাহিনী মনোবল ও প্রতিরোধশক্তি হারিয়ে ফেলেছিল। কারণ বখতিয়ার নদীয়া অভিযানে প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হন নি। বখতিয়ার এই অভিযানে কোনো প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হলে এই ঘটনার নিশ্চয় উল্লেখ থাকত।
কারণ বখতিয়ারের তিব্বতাভিযানের ব্যর্থতার কথা মিনহাজ অসঙ্কোচে লিপিবদ্ধ করেছিলেন। তবে এও হতে পারে যে, জনসাধারণ, মন্ত্রী ও জ্যোতিষীদের পরাজয়ী মনোবৃত্তি সেনাবাহিনীর মনোবল ভেঙ্গে দিয়েছিল, সেই কারণেই হয়তো কোনো প্রতিরোধ ব্যবস্থাই ফলবতী হয় নি। এই কারণেই সম্ভবত মিনহাজের বিবরণীতে উল্লিখিত হয়েছে যে, বখতিয়ার অতি সহজেই বাংলাদেশ জয় করেছিলেন।৭২৫
যত সহজে বখতিয়ার খিলজী গৌড় অধিকার করেছেন বলে মিনহাজের বিবরণীতে পাওয়া যায়, প্রকৃত ঘটনা হয়তো তেমন ছিল না। কারণ, বিনা বাধায় নদীয়া বা নবদ্বীপ দখল করলে বখতিয়ারের নবদ্বীপ ধ্বংস করার কারণ ছিল না। কিন্তু তিনি নবদ্বীপ ধ্বংস করে দিয়েছিলেন, আর তা মিনহাজের বিবরণেই পাওয়া যায়। আর বিনা বাধায় নবদ্বীপ দখল করতে পারলে, বাংলায় পূর্ব ও দক্ষিণ অঞ্চল বখতিয়ারের পাশাপাশি টিকে ছিল কিভাবে? রাজা লক্ষ্মণসেনের দুই পুত্র বিশ্বরূপ সেন ও কেশবসেন এবং তাদের কোনো কোনো বংশধর আরো দীর্ঘ ৫০ বছরের অধিককাল রাজত্ব করেছেন।৭২৬ কাজেই, লক্ষ্মণসেন এবং তার বংশধরগণ যুদ্ধবিদ্যা ত্যাগ করেছিলেন এমন মনে হয় না। ইতিহাসের এই অস্পষ্ট দিকগুলি পরিষ্কার করতে আরো তথ্যের প্রয়োজন আছে।
মিনহাজের বিবরণেও পাওয়া যায়, লক্ষ্মণসেন যে দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছেন তা সত্যই প্রশংসনীয়। আসন্ন তুর্কি আক্রমণের ভয় এবং এই কারণে মানুষের আতঙ্ক ও পলায়নবাদী মনোভাব তাঁকে আচ্ছন্ন করতে পারে নি। শত্রুর আক্রমণ অত্যাসন্ন অনুধাবন করেও এবং উপদেষ্টা ও মন্ত্রীবর্গের পরামর্শেও নদীয়া পরিত্যাগ না করে স্বীয় কর্তব্যে তিনি অটল ছিলেন। সম্ভবত লক্ষ্মণসেন বখতিয়ারের আসন্ন আক্রমণ প্রতিরোধের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু সেই ব্যবস্থা কৌশলগত দিক থেকে কতখানি শক্তিশালী ছিল জানা যায় না। সেই ব্যবস্থা চতুর অশ্ববিক্রেতার ছদ্মাবরণধারী বখতিয়ারের নিকট বিশেষ কার্যকরী হয় নি বলেই মনে হয়। নিজের অবস্থাকে লুকানোর জন্য বখতিয়ার খিলজীর কিছুটা শারীরিক সুবিধা ছিল। তিনি দুঃসাহসী অভিযাত্রী হলেও শারীরিক দিক থেকে তুলনামূলকভাবে খর্বাকৃতি ছিলেন এবং চেহারাও অভিজাত শ্রেণীর বলে মনে হতো না।৭২৭ এজন্যই হয়তো নগরে প্রবেশকালে নগররক্ষী বা সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন নি। এজন্য বোধহয় তিনি অতি সহজেই রাজপ্রাসাদে গমন করতে সক্ষম হন এবং রাজা লক্ষ্মণসেনের প্রাসাদরক্ষীদের পরাস্ত করেন। মিনহাজের বর্ণনা থেকে জানা যায়, বখতিয়ারের প্রথম আক্রমণ ছিল প্রাসাদরক্ষীদের বিরুদ্ধেই এবং তখন লক্ষণসেন স্বীয় প্রাসাদে দ্বিপ্রহরের ভোজনে রত ছিলেন। ৭২৮ স্বর্ণ ও রৌপ্য নির্মিত পাত্রে তাঁকে আহার পরিবেশ করা হচ্ছিল। লক্ষ্মণসেনের সমসাময়িক কালের অনেক পাকা বাড়ি বা মন্দিরের ভগ্নাংশ এখনও রয়ে গেছে। সেসব চিহ্নিত করতে প্রত্নতত্ত্ববিদদের অসুবিধা হয় না। কিন্তু নদীয়াতে লক্ষণসেনের সেই প্রসাদের কোনো চিহ্নই বর্তমান নেই এবং কোনো কালে ছিল, এমন প্রমাণ বা উল্লেখ কোথাও নেই। সে যুগেও রাজপ্রসাদের মতো বিশিষ্ট স্থাপনার নিরাপত্তার জন্য যে সব প্রচলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকার কথা এখানে তারও কোনো উল্লেখ কোথাও নেই। কাজেই সম্পূর্ণ ঘটনাটিই রহস্যাবৃত।
এই আকস্মিক বিপজ্জনক অবস্থাদৃষ্টে রাজার সম্মুখে হয়তো আর কোনো উপায় ছিল না। তখন তিনি পলায়নই অধিক যুক্তিসঙ্গত বলে মনে করেন। উত্থান-পতন ইতিহাসের চিরন্তন নিয়ম। লক্ষ্মণসেনের রাজত্বকালের শেষে এর প্রতিফলন লক্ষ করা যায়। তাই তাঁর ব্যক্তিগত গুণাবলিও শেষ পর্যন্ত তাঁকে রক্ষা করতে সক্ষম হয় নি। তিনি বিপর্যয়ের দৃশ্যও অবলোকন করেন।৭২৯ তবে এটা ঠিক যে, নদীয়া বিজয় নাটকের অনেক অংশই আমাদের অজানা রয়ে গেছে। লক্ষ্মণসেনের সময়েই সেন প্রশাসন উন্নতির শিখরে পৌঁছে আবার অবনতির শেষ পর্যায়ে নেমে আসে। রাজা লক্ষ্মণসেন জীবনের শেষ মুহূর্তে বিপর্যয়ের সম্মুখীন হলেন। কারণ পশ্চিম ও উত্তর বাংলায় তুর্কি অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলে তার রাজ্য দক্ষিণ-পূর্ববাংলায় সীমাবদ্ধ হয়ে যায়।
৭০৪ পি.সি. সেন- করতোয়া মাহাত্ম, ১৯২৯।
৭০৫ কেশবসেনের আদিলপুর তাম্রশাসনের শ্লোক নং- ১৩।
৭০৬ W.W. Hunter: Statistical Account of Bengal, Vol VII, p. 165.
৭০৭ সুভাষ মুখোপাধ্যায়- বাঙালির ইতিহাস, পৃ. ২৪।
৭০৮ গৌরীনাথ শাস্ত্রী- সংস্কৃত সাহিত্যের ইতিহাস, খণ্ড-১, পৃ. ৪।
৭০৯ সুকুমার সেন- বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, প্র ম খণ্ড, পৃ ৪।
৭১০ আর.মুখার্জী অ্যান্ড এস.কে. মাইতি- করপাস অফ বেঙ্গল ইন্সক্রিপশনস্ বিয়ারিং অন হিস্ট্রি অ্যান্ড সিভিলাইজেশন অফ বেঙ্গল, পৃ. ৩৯-৪০।
৭১১ এপিগ্রাফিয়া ইন্ডিকা, খণ্ড-১৫, পৃ. ১১৩।
৭১২ হিস্ট্রি অফ বেঙ্গল, খণ্ড- ১, পৃ. ২০।
৭১৩ আনিসুজ্জামান- বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, খণ্ড- ১, পৃ. ১৫।
৭১৪ পি.সি. সেন- করতোয়া মাহাত্ম, ১৯২৯।
৭১৫ T. Waters- On Yuan-Chuangs Travel in India, Vol-II, p. 184-185.
৭১৬ মিনহাজ-ই-সিরাজ: তবকাত-ই-নাসিরী (অনুবাদক: আবুল কালাম মোঃ যাকারিয়া), পৃ. ২৪।
৭১৭ এ. কানিংহাম- অর্কিয়লজিক্যাল সারভে অফ ইন্ডিয়া অ্যানুয়াল রিপোর্ট, খণ্ড- ১৫, পৃ. ১১০।**
৭১৮ D.C. Sircar: Studies in the Geography of Ancient & Medieval India, p. 113-114.
৭১৯ এন. কে. ভট্টশালী- নিউ শক্তিপুর গ্রান্ট অফ লক্ষশণসেনদের অ্যান্ড জিওগ্রাফিক্যাল ডিভিশনস অফ অ্যানশিয়েন্ট বেঙ্গল, পৃ. ৭৫-৭৬, ৮৭-৮৮।**
৭২০ এন.জি. মজুমদার, ইন্সক্রিপশন্স অফ বেঙ্গল, খন্ড ৩, পৃ. ১০৪,১১৫।
৭২১ মিনহাজ-ই-সিরাজ: তবকাত-ই-নাসিরী (অনুবাদ) আবুল কালাম মোঃ যাকারিয়া, পৃ. ২৬৪।
৭২২ সন্ধ্যাকর নন্দী, রামচরিত, রমেশচন্দ্র মজুমদার ও অন্যান্য।
৭২৩ হিস্ট্রি অফ বেঙ্গল, খণ্ড-১।
৭২৪ আনিসুজ্জামান (সম্পাদিত)- বাঙলা সাহিত্যে ইতিহাস, খণ্ড-১।
৭২৫ বাঙালির ইতিহাস (আদিপর্ব)।
৭২৬ মিনহাজ-ই-সিরাজ: তবকাত-ই-নাসিরী (অনুবাদ) আবুল কালাম মোঃ যাকারিয়া, পৃ. ২৮।
৭২৭ মিনহাজ-ই-সিরাজ: তবকাত-ই-নাসিরী (অনুবাদ) পৃ. ১৭।
৭২৮ মিনহাজ-ই-সিরাজ: তবকাত-ই-নাসিরী (অনুবাদ) পৃ. ২৭।
৭২৯ কোলে (সম্পা)- দশকুমারচরিত।
আগামী পর্বেঃ বিশ্বরূপসেন এবং কেশবসেন
খবর বিভাগঃ
বাংলাদেশের ইতিহাস