আদি বাংলার ইতিহাস
(প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্ব ৯৬
লক্ষ্মণসেনের পর বিশ্বরূপসেন এবং কেশবসেন নামে তাঁর দুই পুত্র পূর্ববাংলার সিংহাসনে আরোহণ করেন। দুই ভ্রাতার মধ্যে সম্ভবত বিশ্বরূপসেনই জ্যেষ্ঠ ছিলেন। তাঁদের রাজত্বকাল সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। তবে দক্ষিণ ও পূর্ববাংলা যে তাঁদের রাজ্যভুক্ত ছিল, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। তাঁদের রাজত্বকালের তিনটি তাম্রশাসন যথা- ১. বিশ্বরূপসেনের সাহিত্য-পরিষৎ লিপি, ২. বিশ্বরূপসেনের মদনপাড়া লিপি, ও ৩. কেশবসেনের ইদিলপুর লিপি আবিস্কৃত হয়েছে। তাম্রশাসনগুলিতে বিশ্বরূপসেন ‘অরিরাজ বৃষভাশঙ্কর গৌড়েশ্বর’৭৩০ উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন। তাঁরা উভয়েই সূর্যের উপাসক ছিলেন। তাঁদের তাম্রশাসনে উভয়েই ‘যবনামড়বয়-প্রলয়-কালরুদ্র৭৩১ বলে অভিহিত হয়েছেন। এতে ঐতিহাসিকরা অনুমান করেন যে, তাঁরা উভয়েই পশ্চিম, পশ্চিম-উত্তর বাংলার মুসলিম রাজ্যের আক্রমণ প্রতিরোধে সাফল্য অর্জন করেছিলেন।৭৩২ কারণ বাংলার পশ্চিম, পশ্চিম-উত্তরাংশ দখল করার পর দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় তুর্কি আগ্রাসন স্বাভাবিক ছিল। ঐতিহাসিক মিনহাজের বর্ণনায় এর সমর্থন পাওয়া যায়।৭৩৩ সুতরাং বিশ্বরূপসেন ও কেশবসেন তুর্কি আক্রমণ প্রতিহত করে স্বরাজ্য অক্ষুণ্ণ রেখেছিলেন, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।
বিশ্বরূপসেন ও কেশবসেন অন্তত ২৫ বছর (১২০৫-১২৩০ খ্রি.) রাজত্ব করেন। বিশ্বরূপসেনের তাম্রশাসনে সম্ভবত তাঁর দুই পুত্র কুমার সূর্যসেন ও কুমার পুরুষোত্তম সেনের নামের উল্লেখ আছে।৭৩৪ কিন্তু তাঁদের কেউ রাজত্ব করেছিলেন কিনা জানা যায় না। অথচ ঐতিহাসিক মিনহাজ যে সময় লক্ষ্মণাবতীতে আসেন (১২৪৪-৪৫ খ্রি.) তখনও লক্ষ্মণসেনের বংশধরগণ পূর্ববাংলায় রাজত্ব করছিলেন। সুতরাং মনে হয় কেশবসেনের পরেও একাধিক সেনরাজা পূর্ববাংলায় রাজত্ব করেছিলেন।
রাজা দশরথদেবের আদাবাড়ি তাম্রশাসন হতে জানা যায় যে, ত্রয়োদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে সেন শাসনের পতন ঘটেছিল এবং সেন শাসনের কেন্দ্রস্থল বিক্রমপুর দেববংশের হস্তগত হয়। বিক্রমপুর হতে প্রকাশিত এই তাম্রশাসনে রাজা দশরথদেবের নাম উল্লিখিত হয়েছে। তিনি পরমেশ্বর, পরমভট্টারক, মহারাজাধিরাজ, অরিরাজ দনুজ মাধব উপাধি গ্রহণ করেছিলেন।৭৩৫ ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দীন বারাণীর বিবরণে উল্লিখিত সোনারগাঁয়ের দনুজরায় ছিলেন সম্ভবত এই দশরথদেব। দিল্লির সুলতান গিয়াসউদ্দীন বলবন তুগরিল খানের বিরুদ্ধে বাংলা অভিযানকালে এই দনুজরায়ের সাহায্য গ্রহণ করেছিলেন। সুতরাং ত্রয়োদশ শতকের মধ্যবর্তী কোনো এক সময়ে বাংলায় সেনবংশীয় রাজাদের শাসনের অবসান ঘটেছিল- এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।৭৩৬
ছবিঃ কেশবসেনের ইদিলপুর তাম্রশাসন

সুতরাং সেনবংশ প্রায় দেড়শত বছর বাংলাদেশ শাসন করেছিল। তাঁদের এই শাসনকাল বিভিন্ন দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। এই বংশের তিনজন সুযোগ্য শাসক যথাক্রমেঃ- বিজয়সেন, বল্লালসেন ও লক্ষ্মণসেন বাংলায় শান্তি, শৃঙ্খলা ও সংহতি প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁদের সক্রিয় পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশে সংস্কৃত সাহিত্যের অভূতপূর্ব উন্নতি এবং হিন্দু সংস্কৃতিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়েছিল। এই সময় বাংলায় ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রাধান্য সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। তাঁদের পূর্বসূরী পালরাজবংশের উদার মানসিকতা তাঁদের ছিল না। ধর্মীয় ক্ষেত্রে তাঁরা অনুদার নীতি অনুসরণ করেছিলেন এবং অনান্য ধর্মাবলম্বী বিশেষত বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের পূর্ব আধিপত্য ও গৌরব বিলুপ্তমুখী হয়ে পড়েছিল। বস্তুত এই বহিরাগত সেনরাজাগণ বাঙালির আশা-আকাংক্ষা উপলব্ধি করতে মনে হয় ব্যর্থ হয়েছিলেন। ফলে বাঙালির জাতীয় ঐক্য রক্ষা করা তাঁদের পক্ষে সম্ভব হয় নি।
বাংলায় তুর্কি আধিপত্য ছিল এরই ফলশ্রুতি।
তখন সমাজ ছিল বিভিন্ন স্তরে ও বর্ণে বিভক্ত। একস্তরের সাথে অন্যস্তরের মেলামেশা ছিল নিষিদ্ধ। ব্রাহ্মণরা সমাজের শাসক ও শোষক শ্রেণীতে পরিণত হয়েছিলেন। অন্যদিকে দেশের অধিকাংশ শ্রমজীবী মানুষ ছিল অবহেলিত। এই ধরনের সামাজিক স্তরবিন্যাসের ফল হয়েছিল মারাত্মক। এই বর্ণভেদ ও শ্রেণীভেদ ক্রমশ সেনরাষ্ট্রের ভিত্তিকে দুর্বল করে ফেলেছিল। উচ্চবর্ণ ও স্তরের দেশের নেতৃত্বে আসীন ব্রাহ্মণ্য সমাজ শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, ব্যাকরণের ব্যাখ্যা, বর্ণের সীমা লঙ্ঘনকারীর বিচার, প্রভৃতি নিয়েই তাঁরা ব্যস্ত ছিলেন। যুগোপযোগী জ্ঞান-বিজ্ঞান, ভারতবহির্ভুত সমাজের ধারণা, আন্তর্জাতিক শিল্প-বাণিজ্য সম্পর্ক সম্বন্ধে তাঁরা প্রায় উদাসীন ছিলেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ শূদ্র ও অচ্ছুত সম্পর্কে তাঁরা কোন দায়িত্বই বহন করেননি। নিন্মবর্ণের উপর বহু যুগের অর্থনৈতিক নিষ্পেষণ, নিন্মবর্ণের মানবিক ও ধর্মীয় স্বাধীনতার অস্বীকৃতি, উচ্চবর্ণের অনুদারতা, ক্ষমতার অপব্যবহার সমাজ কাঠামো ভেঙ্গে দিয়েছিল। সম্ভবত এই কারণেই লক্ষণসেন বা তাঁর পুত্রদের ব্যক্তিগত শৌর্যবীর্য বা সৈন্যদলের প্রতিরোধশক্তি কার্যকর হয় নি। এই প্রসঙ্গে নীহাররঞ্জন রায়ের উক্তি উদ্ধৃতির যোগ্য। নীহাররঞ্জনের ভাষায়:
“একদিকে উত্তর ভারতের অধিকাংশ যখন মুসলমানদের করতলগত, উত্তর গাঙ্গেয় ভারতে, অর্থাৎ বর্তমান যুক্তপ্রদেশ (উত্তর প্রদেশ) ও বিহারে যখন রাষ্ট্রীয় অবস্থা প্রায় নৈরাজ্য বলিলেই চলে,তখন বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজ ভেদবুদ্ধি দ্বারা আচ্ছন্ন, স্তরে উপস্তরে দুর্লঙ্ঘ্য সীমায় বিভক্ত, রাজসভা চরিত্র ও আত্মশক্তিহীন; ধর্ম ও সমাজ বিলাসলালসায় ও যৌনাতিশয্যে পীড়িত; শিল্প ও সাহিত্য বস্তু-সম্বন্ধ-বিচ্যুত ভাব-কল্পনার জগতে পল্লবিত, বাক্য উচ্ছ্বাসময় অত্যুক্তি, আলংকারিক আতিশয্য এবং দেহগত লীলা বিলাসে ভারগ্রস্থ ও মদির, জনসাধারণের দেহমন বৌদ্ধ বজ্রযান-সহজযান প্রভৃতির এবং তান্ত্রিক সিদ্ধচার্য-ডাকিনী-যোগিনীদের অলৌকিক ক্রিয়াকাণ্ড তুকতাকে পঙ্গু, উচ্চস্তর বর্ণসমাজ ব্রাহ্মণ্য পুরোহিততন্ত্র এবং ব্রাহ্মণ্য রাষ্ট্রের সর্বময় কর্তৃত্বে আড়ষ্ট! রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অধোগতির চিত্র সম্পূর্ণ; উভয় চরিত্রে ও আত্মশক্তিতে দুর্বল ও দৈন্যপীড়িত। এই দুর্বল ও দৈন্যপীড়িত রাষ্ট্র ও সমাজ ভাঙ্গিয়া পড়িবে এবং সমাজ-প্রকৃতির নিয়মে পরবর্তীকালে শতাব্দীর পর শতাব্দী ব্যাপিয়া দেশ তাহার মূল্য দিয়া যাইবে, ইহা কিছু বিচিত্র নয়। বখতিয়ারের নবদ্বীপ জয় এবং একশত বৎসরের মধ্যে সমগ্র বাংলাদেশ জুড়িয়া মুসলমান রাজশক্তির প্রতিষ্ঠা কিছু আকস্মিক ঘটনা নয়, ভাগ্যের পরিহাসও নয়- রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধোগতির অনিবার্য পরিণাম!” ৭৩৭
সেনরাজবংশ প্রায় দেড়শত বছর বাংলায় শাসকরূপে বাংলার সামাজিক ইতিহাসে এক সুদূরপ্রসারী ভূমিকা পাল করেছিলেন। ব্রাহ্মণ্য ধর্মাবলম্বী রক্ষণশীল সেন নৃপতিগণ উত্তর ভারতীয় ব্রাহ্মণ্যধর্ম ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকরূপে বাংলার ধর্ম, সংস্কৃতি ও সমাজের মধ্যে উত্তর ভারতীয় উপাদান, আচার ও প্র ার প্রবর্তন করেন এবং বাংলার সমাজকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেন। তাই সেনরাজবংশের শাসনকাল বাংলার সামাজিক ইতিহাসে এক তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়।
সেনরাজ বংশের শাসনকাল (১০৯৪- ১২০৫ খ্রি.)
ঐতিহাসিকদের মতানুসারে নিন্ম সেনবংশীয় রাজাদের রাজত্বকাল নিন্মরূপ:
সামন্তসেন:
হেমন্তসেন:
বিজয়সেন: আ: ১০৯৭-১১৬০ খ্রিষ্টাব্দ
বল্লালসেন: আ: ১১৬০-১১৭৮ ”
লক্ষণসেন: আ: ১১৭৮-১২০৬ ”
বিশ্বরূপসেন: আ: ১২০৬-১২২০ ”
কেশবসেন : আ: ১২২০-১২২৩ ” ৭৩৮
—————————————————-
৭৩০ শ্রীমদ বরাহমিহিরচার্য্য, বৃহৎ সংহিতা।
৭৩১ সুকুমার সেন- বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস।
৭৩২ এপিগ্রাফিয়া ইন্ডিকা, খণ্ড- ২৩।
৭৩৩ প্রাগুক্ত- খণ্ড- ২৩।
৭৩৪ প্রাগুক্ত- খণ্ড- ১২।
৭৩৫ প্রাগুক্ত- খণ্ড- ১৪।
৭৩৬ রমেশচন্দ্র মজুমদার (সম্পা)- হিস্ট্রি অফ বেঙ্গল, খণ্ড-১।
৭৩৭ নীহাররঞ্জন রায়: বাঙালির ইতিহাস (আদিপর্ব) পৃ. ৪২৬।
৭৩৮ অতুল সুর- বাংলার সামাজিক ইতিহাস, পৃ. ৫।
আগামী পর্বেঃ পরিশিষ্ট (প্রথম খন্ড): রামচরিত কাব্য, ধর্ম, সনাতন ধর্ম, জড়োপাসনা, আর্য ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব, বাংলার জড়োপাসক।
(প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্ব ৯৬
লক্ষ্মণসেনের পর বিশ্বরূপসেন এবং কেশবসেন নামে তাঁর দুই পুত্র পূর্ববাংলার সিংহাসনে আরোহণ করেন। দুই ভ্রাতার মধ্যে সম্ভবত বিশ্বরূপসেনই জ্যেষ্ঠ ছিলেন। তাঁদের রাজত্বকাল সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। তবে দক্ষিণ ও পূর্ববাংলা যে তাঁদের রাজ্যভুক্ত ছিল, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। তাঁদের রাজত্বকালের তিনটি তাম্রশাসন যথা- ১. বিশ্বরূপসেনের সাহিত্য-পরিষৎ লিপি, ২. বিশ্বরূপসেনের মদনপাড়া লিপি, ও ৩. কেশবসেনের ইদিলপুর লিপি আবিস্কৃত হয়েছে। তাম্রশাসনগুলিতে বিশ্বরূপসেন ‘অরিরাজ বৃষভাশঙ্কর গৌড়েশ্বর’৭৩০ উপাধিতে ভূষিত হয়েছেন। তাঁরা উভয়েই সূর্যের উপাসক ছিলেন। তাঁদের তাম্রশাসনে উভয়েই ‘যবনামড়বয়-প্রলয়-কালরুদ্র৭৩১ বলে অভিহিত হয়েছেন। এতে ঐতিহাসিকরা অনুমান করেন যে, তাঁরা উভয়েই পশ্চিম, পশ্চিম-উত্তর বাংলার মুসলিম রাজ্যের আক্রমণ প্রতিরোধে সাফল্য অর্জন করেছিলেন।৭৩২ কারণ বাংলার পশ্চিম, পশ্চিম-উত্তরাংশ দখল করার পর দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় তুর্কি আগ্রাসন স্বাভাবিক ছিল। ঐতিহাসিক মিনহাজের বর্ণনায় এর সমর্থন পাওয়া যায়।৭৩৩ সুতরাং বিশ্বরূপসেন ও কেশবসেন তুর্কি আক্রমণ প্রতিহত করে স্বরাজ্য অক্ষুণ্ণ রেখেছিলেন, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।
বিশ্বরূপসেন ও কেশবসেন অন্তত ২৫ বছর (১২০৫-১২৩০ খ্রি.) রাজত্ব করেন। বিশ্বরূপসেনের তাম্রশাসনে সম্ভবত তাঁর দুই পুত্র কুমার সূর্যসেন ও কুমার পুরুষোত্তম সেনের নামের উল্লেখ আছে।৭৩৪ কিন্তু তাঁদের কেউ রাজত্ব করেছিলেন কিনা জানা যায় না। অথচ ঐতিহাসিক মিনহাজ যে সময় লক্ষ্মণাবতীতে আসেন (১২৪৪-৪৫ খ্রি.) তখনও লক্ষ্মণসেনের বংশধরগণ পূর্ববাংলায় রাজত্ব করছিলেন। সুতরাং মনে হয় কেশবসেনের পরেও একাধিক সেনরাজা পূর্ববাংলায় রাজত্ব করেছিলেন।
রাজা দশরথদেবের আদাবাড়ি তাম্রশাসন হতে জানা যায় যে, ত্রয়োদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে সেন শাসনের পতন ঘটেছিল এবং সেন শাসনের কেন্দ্রস্থল বিক্রমপুর দেববংশের হস্তগত হয়। বিক্রমপুর হতে প্রকাশিত এই তাম্রশাসনে রাজা দশরথদেবের নাম উল্লিখিত হয়েছে। তিনি পরমেশ্বর, পরমভট্টারক, মহারাজাধিরাজ, অরিরাজ দনুজ মাধব উপাধি গ্রহণ করেছিলেন।৭৩৫ ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দীন বারাণীর বিবরণে উল্লিখিত সোনারগাঁয়ের দনুজরায় ছিলেন সম্ভবত এই দশরথদেব। দিল্লির সুলতান গিয়াসউদ্দীন বলবন তুগরিল খানের বিরুদ্ধে বাংলা অভিযানকালে এই দনুজরায়ের সাহায্য গ্রহণ করেছিলেন। সুতরাং ত্রয়োদশ শতকের মধ্যবর্তী কোনো এক সময়ে বাংলায় সেনবংশীয় রাজাদের শাসনের অবসান ঘটেছিল- এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।৭৩৬
ছবিঃ কেশবসেনের ইদিলপুর তাম্রশাসন
সুতরাং সেনবংশ প্রায় দেড়শত বছর বাংলাদেশ শাসন করেছিল। তাঁদের এই শাসনকাল বিভিন্ন দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। এই বংশের তিনজন সুযোগ্য শাসক যথাক্রমেঃ- বিজয়সেন, বল্লালসেন ও লক্ষ্মণসেন বাংলায় শান্তি, শৃঙ্খলা ও সংহতি প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁদের সক্রিয় পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশে সংস্কৃত সাহিত্যের অভূতপূর্ব উন্নতি এবং হিন্দু সংস্কৃতিতে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়েছিল। এই সময় বাংলায় ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রাধান্য সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। তাঁদের পূর্বসূরী পালরাজবংশের উদার মানসিকতা তাঁদের ছিল না। ধর্মীয় ক্ষেত্রে তাঁরা অনুদার নীতি অনুসরণ করেছিলেন এবং অনান্য ধর্মাবলম্বী বিশেষত বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের পূর্ব আধিপত্য ও গৌরব বিলুপ্তমুখী হয়ে পড়েছিল। বস্তুত এই বহিরাগত সেনরাজাগণ বাঙালির আশা-আকাংক্ষা উপলব্ধি করতে মনে হয় ব্যর্থ হয়েছিলেন। ফলে বাঙালির জাতীয় ঐক্য রক্ষা করা তাঁদের পক্ষে সম্ভব হয় নি।
বাংলায় তুর্কি আধিপত্য ছিল এরই ফলশ্রুতি।
তখন সমাজ ছিল বিভিন্ন স্তরে ও বর্ণে বিভক্ত। একস্তরের সাথে অন্যস্তরের মেলামেশা ছিল নিষিদ্ধ। ব্রাহ্মণরা সমাজের শাসক ও শোষক শ্রেণীতে পরিণত হয়েছিলেন। অন্যদিকে দেশের অধিকাংশ শ্রমজীবী মানুষ ছিল অবহেলিত। এই ধরনের সামাজিক স্তরবিন্যাসের ফল হয়েছিল মারাত্মক। এই বর্ণভেদ ও শ্রেণীভেদ ক্রমশ সেনরাষ্ট্রের ভিত্তিকে দুর্বল করে ফেলেছিল। উচ্চবর্ণ ও স্তরের দেশের নেতৃত্বে আসীন ব্রাহ্মণ্য সমাজ শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, ব্যাকরণের ব্যাখ্যা, বর্ণের সীমা লঙ্ঘনকারীর বিচার, প্রভৃতি নিয়েই তাঁরা ব্যস্ত ছিলেন। যুগোপযোগী জ্ঞান-বিজ্ঞান, ভারতবহির্ভুত সমাজের ধারণা, আন্তর্জাতিক শিল্প-বাণিজ্য সম্পর্ক সম্বন্ধে তাঁরা প্রায় উদাসীন ছিলেন। সংখ্যাগরিষ্ঠ শূদ্র ও অচ্ছুত সম্পর্কে তাঁরা কোন দায়িত্বই বহন করেননি। নিন্মবর্ণের উপর বহু যুগের অর্থনৈতিক নিষ্পেষণ, নিন্মবর্ণের মানবিক ও ধর্মীয় স্বাধীনতার অস্বীকৃতি, উচ্চবর্ণের অনুদারতা, ক্ষমতার অপব্যবহার সমাজ কাঠামো ভেঙ্গে দিয়েছিল। সম্ভবত এই কারণেই লক্ষণসেন বা তাঁর পুত্রদের ব্যক্তিগত শৌর্যবীর্য বা সৈন্যদলের প্রতিরোধশক্তি কার্যকর হয় নি। এই প্রসঙ্গে নীহাররঞ্জন রায়ের উক্তি উদ্ধৃতির যোগ্য। নীহাররঞ্জনের ভাষায়:
“একদিকে উত্তর ভারতের অধিকাংশ যখন মুসলমানদের করতলগত, উত্তর গাঙ্গেয় ভারতে, অর্থাৎ বর্তমান যুক্তপ্রদেশ (উত্তর প্রদেশ) ও বিহারে যখন রাষ্ট্রীয় অবস্থা প্রায় নৈরাজ্য বলিলেই চলে,তখন বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজ ভেদবুদ্ধি দ্বারা আচ্ছন্ন, স্তরে উপস্তরে দুর্লঙ্ঘ্য সীমায় বিভক্ত, রাজসভা চরিত্র ও আত্মশক্তিহীন; ধর্ম ও সমাজ বিলাসলালসায় ও যৌনাতিশয্যে পীড়িত; শিল্প ও সাহিত্য বস্তু-সম্বন্ধ-বিচ্যুত ভাব-কল্পনার জগতে পল্লবিত, বাক্য উচ্ছ্বাসময় অত্যুক্তি, আলংকারিক আতিশয্য এবং দেহগত লীলা বিলাসে ভারগ্রস্থ ও মদির, জনসাধারণের দেহমন বৌদ্ধ বজ্রযান-সহজযান প্রভৃতির এবং তান্ত্রিক সিদ্ধচার্য-ডাকিনী-যোগিনীদের অলৌকিক ক্রিয়াকাণ্ড তুকতাকে পঙ্গু, উচ্চস্তর বর্ণসমাজ ব্রাহ্মণ্য পুরোহিততন্ত্র এবং ব্রাহ্মণ্য রাষ্ট্রের সর্বময় কর্তৃত্বে আড়ষ্ট! রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক অধোগতির চিত্র সম্পূর্ণ; উভয় চরিত্রে ও আত্মশক্তিতে দুর্বল ও দৈন্যপীড়িত। এই দুর্বল ও দৈন্যপীড়িত রাষ্ট্র ও সমাজ ভাঙ্গিয়া পড়িবে এবং সমাজ-প্রকৃতির নিয়মে পরবর্তীকালে শতাব্দীর পর শতাব্দী ব্যাপিয়া দেশ তাহার মূল্য দিয়া যাইবে, ইহা কিছু বিচিত্র নয়। বখতিয়ারের নবদ্বীপ জয় এবং একশত বৎসরের মধ্যে সমগ্র বাংলাদেশ জুড়িয়া মুসলমান রাজশক্তির প্রতিষ্ঠা কিছু আকস্মিক ঘটনা নয়, ভাগ্যের পরিহাসও নয়- রাষ্ট্রীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধোগতির অনিবার্য পরিণাম!” ৭৩৭
সেনরাজবংশ প্রায় দেড়শত বছর বাংলায় শাসকরূপে বাংলার সামাজিক ইতিহাসে এক সুদূরপ্রসারী ভূমিকা পাল করেছিলেন। ব্রাহ্মণ্য ধর্মাবলম্বী রক্ষণশীল সেন নৃপতিগণ উত্তর ভারতীয় ব্রাহ্মণ্যধর্ম ও সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকরূপে বাংলার ধর্ম, সংস্কৃতি ও সমাজের মধ্যে উত্তর ভারতীয় উপাদান, আচার ও প্র ার প্রবর্তন করেন এবং বাংলার সমাজকে বিশেষভাবে প্রভাবিত করেন। তাই সেনরাজবংশের শাসনকাল বাংলার সামাজিক ইতিহাসে এক তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়।
সেনরাজ বংশের শাসনকাল (১০৯৪- ১২০৫ খ্রি.)
ঐতিহাসিকদের মতানুসারে নিন্ম সেনবংশীয় রাজাদের রাজত্বকাল নিন্মরূপ:
সামন্তসেন:
হেমন্তসেন:
বিজয়সেন: আ: ১০৯৭-১১৬০ খ্রিষ্টাব্দ
বল্লালসেন: আ: ১১৬০-১১৭৮ ”
লক্ষণসেন: আ: ১১৭৮-১২০৬ ”
বিশ্বরূপসেন: আ: ১২০৬-১২২০ ”
কেশবসেন : আ: ১২২০-১২২৩ ” ৭৩৮
—————————————————-
৭৩০ শ্রীমদ বরাহমিহিরচার্য্য, বৃহৎ সংহিতা।
৭৩১ সুকুমার সেন- বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস।
৭৩২ এপিগ্রাফিয়া ইন্ডিকা, খণ্ড- ২৩।
৭৩৩ প্রাগুক্ত- খণ্ড- ২৩।
৭৩৪ প্রাগুক্ত- খণ্ড- ১২।
৭৩৫ প্রাগুক্ত- খণ্ড- ১৪।
৭৩৬ রমেশচন্দ্র মজুমদার (সম্পা)- হিস্ট্রি অফ বেঙ্গল, খণ্ড-১।
৭৩৭ নীহাররঞ্জন রায়: বাঙালির ইতিহাস (আদিপর্ব) পৃ. ৪২৬।
৭৩৮ অতুল সুর- বাংলার সামাজিক ইতিহাস, পৃ. ৫।
আগামী পর্বেঃ পরিশিষ্ট (প্রথম খন্ড): রামচরিত কাব্য, ধর্ম, সনাতন ধর্ম, জড়োপাসনা, আর্য ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব, বাংলার জড়োপাসক।
খবর বিভাগঃ
বাংলাদেশের ইতিহাস