আদি বাংলার ইতিহাস
(প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্ব ৯৭
পরিশিষ্ট (প্রথম খন্ড)
রামচরিত কাব্য
স্বগীয় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৮৭৯ খ্রিষ্টাব্দে নেপালে তালপাতায় লিখিত এই গ্রন্থটির পাণ্ডুলিপি প্রাপ্ত হন। অদ্যাবধি এই গ্রন্থের আর কোনো পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায় নি। এই অমূল্য পুঁথিখানি কলিকাতায় এশিয়াটিক সোসাইটিতে রক্ষিত আছে। শাস্ত্রী মহাশয়ের সম্পাদনায় এশিয়াটিক সোসাইটি হতে এই গ্রন্থ ১৯১০ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম প্রকাশিত হয় (Memoir, vol. III, no. 1)। পুঁথিটিতে সমগ্র কাব্যটি এবং তার টীকা ছিল। দুর্ভাগ্যবশত শাস্ত্রী যে পাণ্ডুলিপিটি পেয়েছিলেন তাতে কেবল প্রথম পরিচ্ছেদের সকল শ্লোকের এবং দ্বিতীয় পরিচ্ছেদের প্রথম ৩৫টি শ্লোকের টীকা আছে। মূল কাব্যটি এক হাতের এবং টীকার অংশ অন্য হাতের লেখা। অক্ষরদৃষ্টে মনে হয় যে, সমগ্র পুঁথিটি খ্রিষ্টীয় দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতকের প্রচলিত বাংলা অক্ষরে লিখিত; সুতরাং গ্রন্থ রচনার পরে একশত বছরের মধ্যেই এই পাণ্ডুলিপিটি লিখিত হয়েছিল। ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন শিক্ষক- শ্রীরাধাগোবিন্দ বসাক, পণ্ডিত ননীগোপাল বন্দোপাধ্যায় ও বর্তমান লেখক ………………… মূল পুঁথির সাথে প্রতিটি পংক্তি মিলিয়ে সঠিক রামচরিত কাব্যের নতুন সংস্করণ প্রকাশ করেন। এতে প্রতিটি শ্লোকের ইংরেজি অনুবাদ এবং ভূমিকায় এর ঐতিহাসিক মূল্যের বিস্তৃত আলোচনা ছিল। পুঁথির টীকার যে অংশ পাওয়া যায়নি আমাদের রচিত নতুন টীকা দিয়ে তা সম্পূর্ণ করা হয়েছিল। ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে শ্রীরাধাগোবিন্দ বসাক রামচরিত কাব্যের বাঙ্গালা সংস্করণ প্রকাশিত করেন। ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর সম্পাদনায় এশিয়াটিক সোসাইটি এই পূর্বপ্রকাশিত গ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করেন।
রামচরিত কাব্যের প্রণেতা ও টীকাকার একই ব্যক্তি- কেউ কেউ প্রথমে এই মত প্রকাশ করলেও এটি ভ্রান্ত বলে প্রতিপন্ন হয়েছে। এই গ্রন্থের চতুর্থ পরিচ্ছেদের পর কবিপ্রশস্তিতে এই কাব্য-রচয়িতা সন্ধ্যাকর নন্দী নিজের বংশ পরিচয় দিয়েছেন। বরেন্দ্র অর্থাৎ উত্তরবঙ্গে প্রাচীন রাজধানী সুপ্রসিদ্ধ পুণ্ড্রবর্ধন নগরীর নিকটে করণ বা কায়স্থদের অগ্রণী প্রজাপতি নন্দী বাস করতেন। তিনি রাজার (সম্ভবত রামপালের) সান্ধিবিগ্রহিক ছিলেন। তাঁর পুত্র সন্ধ্যাকর নন্দী যখন রামচরিত কাব্য শেষ করেন তখন রামপালের দ্বিতীয় পুত্র মদনপাল গৌড়ের রাজা ছিলেন। এই কাব্যটি এরূপভাবে রচিত হয়েছে যে, এর প্রায় প্রত্যেক শ্লোকেরই দুই প্রকার ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। একটি ব্যাখ্যা দ্বারা দশরথতনয় রামচন্দ্রের এবং দ্বিতীয় দ্বারা গৌড়াধিপ রামপালের জীবনকাহিনী বর্ণিত হয়েছে। এর ফলে প্রায় প্রতি শ্লোকেরই অর্থ টীকার সাহায্য ছাড়া দুর্বোধ্য হয়েছে। সুতরাং এই কাব্যের যে সব শ্লোকের টীকা পাওয়া যায়নি, তার মধ্যে নিহিত ঐতিহাসিক ঘটনার যথাযথ নির্ণয় কষ্টসাধ্য- অনেক স্থলেই অসম্ভব হয়েছে।
রাজা রামপালের জীবনকাহিনী বিবৃত করা রামচরিত কাব্যের প্রধান উদ্দেশ্য হলেও প্রধমে ধর্মপালের উল্লেখ আছে। কবি তাঁকে ‘সমুদ্র-কুলদীপ’ অর্থাৎ কুলের প্রদীপস্বরূপ বলে বর্ণনা করেছেন, এর অর্থ ঠিক বুঝা যায় না। অন্যত্র তিনি রামপালকে ‘শ্রীপতি নাভি সম্ভূতঃ’ বলেছেন। শ্রীরাধাগোবিন্দ বসাক এর অর্থ করেছেন ‘রাজবংশীয় ক্ষত্রিয় হতে সম্ভূত।’ এর সমর্থনে তিনি বলেছেন যে, ‘পালরাজগণের জাতি কি ছিল, তা তাঁদের শাসনলিপিতে স্পষ্ট উল্লিখিত না হলেও দেখা যায় যে, তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ ক্ষত্রিয় বংশে বিবাহ করেছিলেন।’ কিন্তু বৈদ্যদেবের কমৌলিলিপিতে তৃতীয় বিগ্রহপাল সূর্য- বংশসম্ভূত বলে উল্লিখিত হয়েছিল। পূর্বকথার মধ্যে ধর্মপালের পর (তৃতীয়) বিগ্রহপালের উল্লেখ করে কবি বলেছেন যে, তিনি কর্ণ নামক রাজাকে পরাজিত করেও রক্ষা করেছিলেন এবং যৌবনশ্রীর সাথে পৃথিবী পালন করেছিলেন। এখানে তৃতীয় বিগ্রহপালের সাথে কলচুরিরাজ কর্ণের যুদ্ধ এবং পরে কর্ণের কন্যা যৌবনশ্রীর সাথে বিগ্রহপালের বিবাহ এই যে দুটি ঘটনার কথা বলা হয়েছে তা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। এর পরের শ্লোকেই (১।১০) তৃতীয় বিগ্রহপালের তিন পুত্রের নাম উল্লিখিত হয়েছে- মহীপাল, শূরপাল ও রামপাল।
* ধর্ম
সংস্কৃত ধৃ ধাতু হতে ধর্ম শব্দের উৎপত্তি। মানুষ যা ধারণ করে, অথবা মানুষকে যা ধারণ করে তাকে ধর্ম বলে। মানুষ তার ক্ষমতা বহির্ভুত বিষয়ে আত্মিক সমর্থনে যে বিশ্বাস পোষণ করে, তাকে আমরা সাদামাটা ধর্ম বলে থাকি। ধর্মের সাধারণত দুটি দিক থাকে যথা- মনোজগতে আত্মিক বিশ্লেষণ আর বাহ্যিক জগতে আচার অনুষ্ঠান।
ঐতিহাসিক ও মানুষের ব্যবহারিক জীবন বিশ্লেষণকারী পণ্ডিতব্যক্তিদের ধারণা, শুধু ধর্ম নয়, অন্যান্য শিল্পকলা, যেমন নৃত্য, সঙ্গীত, চিত্রশিল্প, সাহিত্য, যাদু প্রভৃতির জন্ম হয়েছে অজানা ও নিয়ন্ত্রণক্ষমতার বাইরের রহস্যময় প্রকৃতিকে দৃষ্ট করার জন্য৭৩৯ এবং মূল লক্ষ্য উৎপাদন বাড়ানো- তা মানুষের বংশবৃদ্ধিই হোক যা জমিনের উৎপাদন নিশ্চিত করাই হোক, একই উদ্দেশ্যে বলিদান প্রথারও প্রচলন হয়। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের ধারণা, পুরাতন প্রস্তর যুগেই অর্থাৎ ১০০০/ ১২০০০ বছর পূর্বেই মানুষ আগুন জ্বালাতে জানত, কিন্তু তা প্রজ্জ্বলিত রাখা খুবই কষ্টকর ছিল। আগুনের দেবতাকে সন্তুষ্ট রাখার জন্য কুমারী মেয়েদের অগিড়বর উদ্দেশ্যে বলিদান করা হতো। অর্থাৎ দুর্জ্ঞেয় রহস্যময় সবকিছুর উদ্দেশ্যে যাবতীয় নিবেদনই আদিকালে এদেশের মানুষের ধর্মের অন্তর্গত ছিল। এই ধর্ম বাংলাদেশসহ ভারতের সর্বত্রই বিরাজমান ছিল। এই ধর্মকেই সকলে সনাতন ধর্ম বা হিন্দু ধর্ম বলে জানে। সমসাময়িক কালে বাংলায় বসবাসকারী আদিবাসীরা জড়োপাসনা করতো বলে জানা যায়।৭৪০ তবে দ্রাবিড় ভাষাভাষী ও মঙ্গোলীয় জাতিগোষ্ঠী এ অঞ্চলে আগমনের পর আমরা জানতে পারি যে, দ্রাবিড় ভাষাভাষীরা সনাতন ধর্মের উপাসক আর অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীরা প্রকৃতির বা জড়োপাসক।৭৪১ কালক্রমে এদেশে বৈদিক ধর্মের বিস্তার ঘটে এবং পরবর্তীতে বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মেরও প্রসার হয়। বৈদিক, সনাতন ও বৌদ্ধ ধর্মের সংমিশ্রনে এদেশে গড়ে উঠে বৈষ্ণব ধর্ম, নাথ ধর্ম, শাক্ত ধর্ম প্রভৃতি। এই ধর্মগুলির মৌল বক্তব্য ও সমাজ গঠনে তাদের ঐতিহাসিক প্রভাব সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো।
প্রথমেই আরম্ভ করতে চাই বেদের ধর্ম নিয়েঃ
এক সময়ে যা ছিল ঐতিহাসিকদের অনুমান, আজ পৃথিবীবাসীর দৃঢ় প্রত্যয় জন্মেছে যে, মধ্য এশিয়ার একটি জাতিগোষ্ঠীর শাখা ভারতে আসে এবং তাদেরই অপর দু’টি শাখা ইউরোপ ও ইরানে বসতি স্থাপন করে। ইতিহাস থেকে যা পাওয়া যায়, সে যুগে যাযাবর আর্যরা মেধা, প্রতিভা, চিন্তা-চেতনা ও যুদ্ধবিদ্যায় ছিল অতুলনীয়। ইউরোপের আর্যরা আজও তাদের পূর্ব পুরুষের প্রতিভার স্বাক্ষর বাঁচিয়ে রেখেছে। এমন কি, ইরানীরাও খুব পিছিয়ে নেই। কিন্ত ভারতের আর্যরা এদেশে আগমনের ১০০০ বছরের মধ্যেই ক্ষয় পেতে আরম্ভ করে এবং পরবর্তী ১০০০ বছরের ইতিহাস তাদের পতনের ইতিহাস। এমন প্রতিভাবান জাতির কোন বিজয়ের কথা ৫৫০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের পর আর শোনা যায়নি। তাদেরকে ৩২৭ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে অনায়াসে পদানত করেছিল গ্রীক বীর আলেকজ্যান্ডার, দীর্ঘদিন পরে করেছে তুর্কী, আফগান, মোঘল ও ইরানিরা। আধ্যাত্বিক জগতের আলো দেখাবার সেই ব্রাহ্মণ আজ শুধুই পুজারী। যাক, সে যুগেই ফিরে যাই।
সনাতন ধর্ম ও জড়োপাসনা
প্রাক ঐতিহাসিক যুগ থেকেই বাংলাদেশে ধর্ম ছিল। এ ধর্মকে আমরা দু’ভাগে দেখতে পাই। ভূমিপুত্র স্থানীয় বিভিন্ন জনগোষ্ঠীদের মধ্যে আলাদা আলাদা ধর্মবিশ্বাস ছিল এবং তাদের আচার অনুষ্ঠানও আলাদা ছিল। আবার সর্বভারতীয় ভিত্তিতে তাদের মধ্যে একটি ধর্মীয় বিশ্বাস ছিল যা বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজাপার্বণে রূপ লাভ করেছিল এবং দেবতাদের মধ্যে শিব’ই ছিল প্রধান। এগুলি বৈদিক বা ব্রাহ্মণ্য ধর্ম ছিল না। বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ধর্মকে আমরা প্রকৃতির পূজা বলতে ৭৩৯ দামোদর ধর্মানন্দ কোসাম্বি: ভারত ইতিহাস চর্চার ভূমিকা, পৃ- ২০; পারি ও তাদের সঙ্গে বসবাসকারী দ্রাবিড় ভাষাভাষীদের ধর্ম আলাদা ছিল, যাকে আমরা আদি ভারতীয়ধর্ম বা সনাতন ধর্ম বলতে পারি।
ঋগবেদের আগেও তাদের ধর্ম ছিল যা সিন্ধু উপত্যকাবাসীরা পালন করেছে। তখন বর্ণ বৈষম্য ছিল না এবং ছিল না কোন গোত্র বা গোষ্ঠি বিশেষের একচেটিয়া ধর্মীয় কতৃত্ব বা অধিকার বা কারো স্বীকৃত সামাজিক শ্রেষ্ঠত্ব। এটাই ছিল দ্রাবিড় ভাষা-ভাষীদের ধর্ম। এমনকি, এই উপমহাদেশে আর্য আগমণের পরও প্রায় ৫/৭ শত বৎসর পর্যস্ত এই সনাতন ধর্মের কোন বিরোধিতা করার ইতিহাস আমরা খুঁজে পাইনি। সম্ভবত: খ্রিষ্টপূর্ব ১৩/১২ শতকেই আর্যদের নিজস্ব ধর্ম, যা তারা এদেশে নিয়ে এসেছিল, প্রসার হতে থাকে। খ্রিষ্টপূর্ব ১০০০ সালের মধ্যে আর্যদের বৈদিক ধর্ম উত্তর ভারতের প্রধান ধর্ম হয়ে দাড়ায়।৭৪২ আর্য বা বৈদিক ধর্ম আলোচনা করতে গেলে সংক্ষিপ্তভাবে হলেও যুগের প্রেক্ষাপটে আর্যধর্মও সমসাময়িক জড়োপাসকদের সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো:
আর্য ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব
দু’টি আর্য জনস্রোত ভারতে এসেছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রথম স্রোত সম্ভবত খ্রিষ্ট দ্বিতীয় সহস্রাব্দের প্রথম দিকে এবং দ্বিতীয়টি তার প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ বছর পর ১৭০০ থেকে ১৬৫০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে ভারতে আসে। প্রথম দলটির ধর্ম সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানা না গেলেও দ্বিতীয় দলটির ধর্ম সম্পর্কে অনেক তথ্য পাওয়া যায়। দ্বিতীয় দলটিই বেদ সংকলিত করেছিল। তাদের প্রধান দেবতা ছিলেন ইন্দ্র, তার নিচে বরুণ এবং দেবতারা ছিলেন অবিবাহিত। সম্ভবত দ্বিতীয় দলটি এদেশে আসা পর্যন্ত তাদের মধ্যে বিবাহিত জীবন গড়ে উঠেনি।৭৪৩ হয়তো এই উপমহাদেশে এসেই তারা পারিবারিক জীবনের উপলব্ধি করে।
আর্যরা (আক্ষরিক অর্থ মহৎ) ছিল সে যুগে একটি উন্নত যোদ্ধা জাতিগোষ্ঠি। তারা শুধু দেখতে দীর্ঘকায় সুপুরষই ছিল না, এরা সঙ্গে করে এনেছিল একটি পরিচ্ছন্ন ভাষা, অদম্য মনোবল, উন্নতমানের যুদ্ধবিদ্যা, চিন্তার গভীরতা এবং পরবর্তীকালে গড়ে তুলে আধ্যাতিক মতবাদ যা এদেশবাসীর জানা ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না।৭৪৪ যাযাবর জাতি হিসাবে তাদের ছিল বহুস্থানের পরিচিতি ও ভ্রমনের অভিজ্ঞতা। অবশ্য কৃষিকাজ সম্পর্কে তারা অনভিজ্ঞ ছিল। পরবর্তীকালে জাতি বর্ণ নির্ধারণ কালে প্রান্তিক চাষিকে তারা সর্বনিন্মবর্ণে নামিয়ে দেয়। নিয়মিত সমাজজীবনে যে নিরাপত্তা ও প্রাচুর্য উপভোগ করা যায, তা তাদের কাছে অজানা ছিল না। তারা বহু কিংবদন্তী ও আচার-আচরণ সঙ্গে করে এনেছিল। স্থানীয় লোকদের সঙ্গে এই নবাগত জাতির বেঁচে থাকার সংগ্রাম সম্পর্কে কোন নথিপত্র নেই। আমরা জানি না তাদের নেতাদের নাম, তাদের আগমণের তারিখ বা বিশ্ববাসী শাসন করার অদম্য মনোবলের উৎস। একমাত্র নৃতত্ত্ববিদরাই বলতে পারেন যে, অভিজাত জনগোষ্ঠীর একটি শাখা জনবহুল আদিবাসীদের মধ্যে কিভাবে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছিল এবং ইতিহাসের সূত্রপাত হওয়ার আগেই স্থানীয় অধিবাসীরা ভূমিদাসে পরিণত হয়েছিল অথবা জঙ্গলে বিতাড়িত হয়েছিল।৭৪৫
ভারতবাসীর ধর্ম আগেও ছিল কিন্তু মনোজগতে প্রবেশের কোন প্রক্রিয়া এবং আত্মাকে আলোকিত করার কোন সাধন-ভোজন জানা ছিল না। ভারতবাসীর ধর্মীয় অনুভূতি ও মনোজগতের বিক্ষিপ্ত ধর্মীয় ধ্যান ধারনাকে ক্রমান্নোতির সোপানে উপস্থাপন করে স্থিতিশীল করার এক নূতন প্রক্রিয়া উপহার দিল আর্যরা, যার নাম বেদ, মনোজগতে শৃঙ্খলাবদ্ধ উন্নতির ধারা (Mental regulatory reform); এখানেই আর্য ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব। তাদের কাছে ভগবত জ্ঞানই বেদ আর বেদই ভগবত জ্ঞান।
এখানেই আর্য ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব। তাদের কাছে ভগবত জ্ঞানই বেদ আর বেদই ভগবত জ্ঞান।
৭৪০ বিজয়চন্দ্র মজুমদার: বাঙ্গালা ভাষায় দ্রাবিড়ী উপাদান।
৭৪১ প্রবোধ চন্দ্র বাগচী: বৌদ্ধধর্ম ও সাহিত্য।
৭৪২ Jitendranath Bandopadhyay: The Development of Hindu iconography.
৭৪৩ দামোদর ধর্মানন্দ কোসাম্বি: ভারত ইতিহাস চর্চার ভূমিকা, পৃ- ২০।
৭৪৪ Ramprasad Chandra: Indo- Aryan Races
৭৪৫ William Hunter- The Annals of Rural Bengal
(প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্ব ৯৭
পরিশিষ্ট (প্রথম খন্ড)
রামচরিত কাব্য
স্বগীয় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৮৭৯ খ্রিষ্টাব্দে নেপালে তালপাতায় লিখিত এই গ্রন্থটির পাণ্ডুলিপি প্রাপ্ত হন। অদ্যাবধি এই গ্রন্থের আর কোনো পাণ্ডুলিপি পাওয়া যায় নি। এই অমূল্য পুঁথিখানি কলিকাতায় এশিয়াটিক সোসাইটিতে রক্ষিত আছে। শাস্ত্রী মহাশয়ের সম্পাদনায় এশিয়াটিক সোসাইটি হতে এই গ্রন্থ ১৯১০ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম প্রকাশিত হয় (Memoir, vol. III, no. 1)। পুঁথিটিতে সমগ্র কাব্যটি এবং তার টীকা ছিল। দুর্ভাগ্যবশত শাস্ত্রী যে পাণ্ডুলিপিটি পেয়েছিলেন তাতে কেবল প্রথম পরিচ্ছেদের সকল শ্লোকের এবং দ্বিতীয় পরিচ্ছেদের প্রথম ৩৫টি শ্লোকের টীকা আছে। মূল কাব্যটি এক হাতের এবং টীকার অংশ অন্য হাতের লেখা। অক্ষরদৃষ্টে মনে হয় যে, সমগ্র পুঁথিটি খ্রিষ্টীয় দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতকের প্রচলিত বাংলা অক্ষরে লিখিত; সুতরাং গ্রন্থ রচনার পরে একশত বছরের মধ্যেই এই পাণ্ডুলিপিটি লিখিত হয়েছিল। ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন শিক্ষক- শ্রীরাধাগোবিন্দ বসাক, পণ্ডিত ননীগোপাল বন্দোপাধ্যায় ও বর্তমান লেখক ………………… মূল পুঁথির সাথে প্রতিটি পংক্তি মিলিয়ে সঠিক রামচরিত কাব্যের নতুন সংস্করণ প্রকাশ করেন। এতে প্রতিটি শ্লোকের ইংরেজি অনুবাদ এবং ভূমিকায় এর ঐতিহাসিক মূল্যের বিস্তৃত আলোচনা ছিল। পুঁথির টীকার যে অংশ পাওয়া যায়নি আমাদের রচিত নতুন টীকা দিয়ে তা সম্পূর্ণ করা হয়েছিল। ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দে শ্রীরাধাগোবিন্দ বসাক রামচরিত কাব্যের বাঙ্গালা সংস্করণ প্রকাশিত করেন। ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর সম্পাদনায় এশিয়াটিক সোসাইটি এই পূর্বপ্রকাশিত গ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করেন।
রামচরিত কাব্যের প্রণেতা ও টীকাকার একই ব্যক্তি- কেউ কেউ প্রথমে এই মত প্রকাশ করলেও এটি ভ্রান্ত বলে প্রতিপন্ন হয়েছে। এই গ্রন্থের চতুর্থ পরিচ্ছেদের পর কবিপ্রশস্তিতে এই কাব্য-রচয়িতা সন্ধ্যাকর নন্দী নিজের বংশ পরিচয় দিয়েছেন। বরেন্দ্র অর্থাৎ উত্তরবঙ্গে প্রাচীন রাজধানী সুপ্রসিদ্ধ পুণ্ড্রবর্ধন নগরীর নিকটে করণ বা কায়স্থদের অগ্রণী প্রজাপতি নন্দী বাস করতেন। তিনি রাজার (সম্ভবত রামপালের) সান্ধিবিগ্রহিক ছিলেন। তাঁর পুত্র সন্ধ্যাকর নন্দী যখন রামচরিত কাব্য শেষ করেন তখন রামপালের দ্বিতীয় পুত্র মদনপাল গৌড়ের রাজা ছিলেন। এই কাব্যটি এরূপভাবে রচিত হয়েছে যে, এর প্রায় প্রত্যেক শ্লোকেরই দুই প্রকার ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। একটি ব্যাখ্যা দ্বারা দশরথতনয় রামচন্দ্রের এবং দ্বিতীয় দ্বারা গৌড়াধিপ রামপালের জীবনকাহিনী বর্ণিত হয়েছে। এর ফলে প্রায় প্রতি শ্লোকেরই অর্থ টীকার সাহায্য ছাড়া দুর্বোধ্য হয়েছে। সুতরাং এই কাব্যের যে সব শ্লোকের টীকা পাওয়া যায়নি, তার মধ্যে নিহিত ঐতিহাসিক ঘটনার যথাযথ নির্ণয় কষ্টসাধ্য- অনেক স্থলেই অসম্ভব হয়েছে।
রাজা রামপালের জীবনকাহিনী বিবৃত করা রামচরিত কাব্যের প্রধান উদ্দেশ্য হলেও প্রধমে ধর্মপালের উল্লেখ আছে। কবি তাঁকে ‘সমুদ্র-কুলদীপ’ অর্থাৎ কুলের প্রদীপস্বরূপ বলে বর্ণনা করেছেন, এর অর্থ ঠিক বুঝা যায় না। অন্যত্র তিনি রামপালকে ‘শ্রীপতি নাভি সম্ভূতঃ’ বলেছেন। শ্রীরাধাগোবিন্দ বসাক এর অর্থ করেছেন ‘রাজবংশীয় ক্ষত্রিয় হতে সম্ভূত।’ এর সমর্থনে তিনি বলেছেন যে, ‘পালরাজগণের জাতি কি ছিল, তা তাঁদের শাসনলিপিতে স্পষ্ট উল্লিখিত না হলেও দেখা যায় যে, তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ ক্ষত্রিয় বংশে বিবাহ করেছিলেন।’ কিন্তু বৈদ্যদেবের কমৌলিলিপিতে তৃতীয় বিগ্রহপাল সূর্য- বংশসম্ভূত বলে উল্লিখিত হয়েছিল। পূর্বকথার মধ্যে ধর্মপালের পর (তৃতীয়) বিগ্রহপালের উল্লেখ করে কবি বলেছেন যে, তিনি কর্ণ নামক রাজাকে পরাজিত করেও রক্ষা করেছিলেন এবং যৌবনশ্রীর সাথে পৃথিবী পালন করেছিলেন। এখানে তৃতীয় বিগ্রহপালের সাথে কলচুরিরাজ কর্ণের যুদ্ধ এবং পরে কর্ণের কন্যা যৌবনশ্রীর সাথে বিগ্রহপালের বিবাহ এই যে দুটি ঘটনার কথা বলা হয়েছে তা পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে। এর পরের শ্লোকেই (১।১০) তৃতীয় বিগ্রহপালের তিন পুত্রের নাম উল্লিখিত হয়েছে- মহীপাল, শূরপাল ও রামপাল।
* ধর্ম
সংস্কৃত ধৃ ধাতু হতে ধর্ম শব্দের উৎপত্তি। মানুষ যা ধারণ করে, অথবা মানুষকে যা ধারণ করে তাকে ধর্ম বলে। মানুষ তার ক্ষমতা বহির্ভুত বিষয়ে আত্মিক সমর্থনে যে বিশ্বাস পোষণ করে, তাকে আমরা সাদামাটা ধর্ম বলে থাকি। ধর্মের সাধারণত দুটি দিক থাকে যথা- মনোজগতে আত্মিক বিশ্লেষণ আর বাহ্যিক জগতে আচার অনুষ্ঠান।
ঐতিহাসিক ও মানুষের ব্যবহারিক জীবন বিশ্লেষণকারী পণ্ডিতব্যক্তিদের ধারণা, শুধু ধর্ম নয়, অন্যান্য শিল্পকলা, যেমন নৃত্য, সঙ্গীত, চিত্রশিল্প, সাহিত্য, যাদু প্রভৃতির জন্ম হয়েছে অজানা ও নিয়ন্ত্রণক্ষমতার বাইরের রহস্যময় প্রকৃতিকে দৃষ্ট করার জন্য৭৩৯ এবং মূল লক্ষ্য উৎপাদন বাড়ানো- তা মানুষের বংশবৃদ্ধিই হোক যা জমিনের উৎপাদন নিশ্চিত করাই হোক, একই উদ্দেশ্যে বলিদান প্রথারও প্রচলন হয়। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের ধারণা, পুরাতন প্রস্তর যুগেই অর্থাৎ ১০০০/ ১২০০০ বছর পূর্বেই মানুষ আগুন জ্বালাতে জানত, কিন্তু তা প্রজ্জ্বলিত রাখা খুবই কষ্টকর ছিল। আগুনের দেবতাকে সন্তুষ্ট রাখার জন্য কুমারী মেয়েদের অগিড়বর উদ্দেশ্যে বলিদান করা হতো। অর্থাৎ দুর্জ্ঞেয় রহস্যময় সবকিছুর উদ্দেশ্যে যাবতীয় নিবেদনই আদিকালে এদেশের মানুষের ধর্মের অন্তর্গত ছিল। এই ধর্ম বাংলাদেশসহ ভারতের সর্বত্রই বিরাজমান ছিল। এই ধর্মকেই সকলে সনাতন ধর্ম বা হিন্দু ধর্ম বলে জানে। সমসাময়িক কালে বাংলায় বসবাসকারী আদিবাসীরা জড়োপাসনা করতো বলে জানা যায়।৭৪০ তবে দ্রাবিড় ভাষাভাষী ও মঙ্গোলীয় জাতিগোষ্ঠী এ অঞ্চলে আগমনের পর আমরা জানতে পারি যে, দ্রাবিড় ভাষাভাষীরা সনাতন ধর্মের উপাসক আর অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীরা প্রকৃতির বা জড়োপাসক।৭৪১ কালক্রমে এদেশে বৈদিক ধর্মের বিস্তার ঘটে এবং পরবর্তীতে বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মেরও প্রসার হয়। বৈদিক, সনাতন ও বৌদ্ধ ধর্মের সংমিশ্রনে এদেশে গড়ে উঠে বৈষ্ণব ধর্ম, নাথ ধর্ম, শাক্ত ধর্ম প্রভৃতি। এই ধর্মগুলির মৌল বক্তব্য ও সমাজ গঠনে তাদের ঐতিহাসিক প্রভাব সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো।
প্রথমেই আরম্ভ করতে চাই বেদের ধর্ম নিয়েঃ
এক সময়ে যা ছিল ঐতিহাসিকদের অনুমান, আজ পৃথিবীবাসীর দৃঢ় প্রত্যয় জন্মেছে যে, মধ্য এশিয়ার একটি জাতিগোষ্ঠীর শাখা ভারতে আসে এবং তাদেরই অপর দু’টি শাখা ইউরোপ ও ইরানে বসতি স্থাপন করে। ইতিহাস থেকে যা পাওয়া যায়, সে যুগে যাযাবর আর্যরা মেধা, প্রতিভা, চিন্তা-চেতনা ও যুদ্ধবিদ্যায় ছিল অতুলনীয়। ইউরোপের আর্যরা আজও তাদের পূর্ব পুরুষের প্রতিভার স্বাক্ষর বাঁচিয়ে রেখেছে। এমন কি, ইরানীরাও খুব পিছিয়ে নেই। কিন্ত ভারতের আর্যরা এদেশে আগমনের ১০০০ বছরের মধ্যেই ক্ষয় পেতে আরম্ভ করে এবং পরবর্তী ১০০০ বছরের ইতিহাস তাদের পতনের ইতিহাস। এমন প্রতিভাবান জাতির কোন বিজয়ের কথা ৫৫০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের পর আর শোনা যায়নি। তাদেরকে ৩২৭ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে অনায়াসে পদানত করেছিল গ্রীক বীর আলেকজ্যান্ডার, দীর্ঘদিন পরে করেছে তুর্কী, আফগান, মোঘল ও ইরানিরা। আধ্যাত্বিক জগতের আলো দেখাবার সেই ব্রাহ্মণ আজ শুধুই পুজারী। যাক, সে যুগেই ফিরে যাই।
সনাতন ধর্ম ও জড়োপাসনা
প্রাক ঐতিহাসিক যুগ থেকেই বাংলাদেশে ধর্ম ছিল। এ ধর্মকে আমরা দু’ভাগে দেখতে পাই। ভূমিপুত্র স্থানীয় বিভিন্ন জনগোষ্ঠীদের মধ্যে আলাদা আলাদা ধর্মবিশ্বাস ছিল এবং তাদের আচার অনুষ্ঠানও আলাদা ছিল। আবার সর্বভারতীয় ভিত্তিতে তাদের মধ্যে একটি ধর্মীয় বিশ্বাস ছিল যা বিভিন্ন দেব-দেবীর পূজাপার্বণে রূপ লাভ করেছিল এবং দেবতাদের মধ্যে শিব’ই ছিল প্রধান। এগুলি বৈদিক বা ব্রাহ্মণ্য ধর্ম ছিল না। বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ধর্মকে আমরা প্রকৃতির পূজা বলতে ৭৩৯ দামোদর ধর্মানন্দ কোসাম্বি: ভারত ইতিহাস চর্চার ভূমিকা, পৃ- ২০; পারি ও তাদের সঙ্গে বসবাসকারী দ্রাবিড় ভাষাভাষীদের ধর্ম আলাদা ছিল, যাকে আমরা আদি ভারতীয়ধর্ম বা সনাতন ধর্ম বলতে পারি।
ঋগবেদের আগেও তাদের ধর্ম ছিল যা সিন্ধু উপত্যকাবাসীরা পালন করেছে। তখন বর্ণ বৈষম্য ছিল না এবং ছিল না কোন গোত্র বা গোষ্ঠি বিশেষের একচেটিয়া ধর্মীয় কতৃত্ব বা অধিকার বা কারো স্বীকৃত সামাজিক শ্রেষ্ঠত্ব। এটাই ছিল দ্রাবিড় ভাষা-ভাষীদের ধর্ম। এমনকি, এই উপমহাদেশে আর্য আগমণের পরও প্রায় ৫/৭ শত বৎসর পর্যস্ত এই সনাতন ধর্মের কোন বিরোধিতা করার ইতিহাস আমরা খুঁজে পাইনি। সম্ভবত: খ্রিষ্টপূর্ব ১৩/১২ শতকেই আর্যদের নিজস্ব ধর্ম, যা তারা এদেশে নিয়ে এসেছিল, প্রসার হতে থাকে। খ্রিষ্টপূর্ব ১০০০ সালের মধ্যে আর্যদের বৈদিক ধর্ম উত্তর ভারতের প্রধান ধর্ম হয়ে দাড়ায়।৭৪২ আর্য বা বৈদিক ধর্ম আলোচনা করতে গেলে সংক্ষিপ্তভাবে হলেও যুগের প্রেক্ষাপটে আর্যধর্মও সমসাময়িক জড়োপাসকদের সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলো:
আর্য ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব
দু’টি আর্য জনস্রোত ভারতে এসেছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রথম স্রোত সম্ভবত খ্রিষ্ট দ্বিতীয় সহস্রাব্দের প্রথম দিকে এবং দ্বিতীয়টি তার প্রায় ৩০০ থেকে ৩৫০ বছর পর ১৭০০ থেকে ১৬৫০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে ভারতে আসে। প্রথম দলটির ধর্ম সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানা না গেলেও দ্বিতীয় দলটির ধর্ম সম্পর্কে অনেক তথ্য পাওয়া যায়। দ্বিতীয় দলটিই বেদ সংকলিত করেছিল। তাদের প্রধান দেবতা ছিলেন ইন্দ্র, তার নিচে বরুণ এবং দেবতারা ছিলেন অবিবাহিত। সম্ভবত দ্বিতীয় দলটি এদেশে আসা পর্যন্ত তাদের মধ্যে বিবাহিত জীবন গড়ে উঠেনি।৭৪৩ হয়তো এই উপমহাদেশে এসেই তারা পারিবারিক জীবনের উপলব্ধি করে।
আর্যরা (আক্ষরিক অর্থ মহৎ) ছিল সে যুগে একটি উন্নত যোদ্ধা জাতিগোষ্ঠি। তারা শুধু দেখতে দীর্ঘকায় সুপুরষই ছিল না, এরা সঙ্গে করে এনেছিল একটি পরিচ্ছন্ন ভাষা, অদম্য মনোবল, উন্নতমানের যুদ্ধবিদ্যা, চিন্তার গভীরতা এবং পরবর্তীকালে গড়ে তুলে আধ্যাতিক মতবাদ যা এদেশবাসীর জানা ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না।৭৪৪ যাযাবর জাতি হিসাবে তাদের ছিল বহুস্থানের পরিচিতি ও ভ্রমনের অভিজ্ঞতা। অবশ্য কৃষিকাজ সম্পর্কে তারা অনভিজ্ঞ ছিল। পরবর্তীকালে জাতি বর্ণ নির্ধারণ কালে প্রান্তিক চাষিকে তারা সর্বনিন্মবর্ণে নামিয়ে দেয়। নিয়মিত সমাজজীবনে যে নিরাপত্তা ও প্রাচুর্য উপভোগ করা যায, তা তাদের কাছে অজানা ছিল না। তারা বহু কিংবদন্তী ও আচার-আচরণ সঙ্গে করে এনেছিল। স্থানীয় লোকদের সঙ্গে এই নবাগত জাতির বেঁচে থাকার সংগ্রাম সম্পর্কে কোন নথিপত্র নেই। আমরা জানি না তাদের নেতাদের নাম, তাদের আগমণের তারিখ বা বিশ্ববাসী শাসন করার অদম্য মনোবলের উৎস। একমাত্র নৃতত্ত্ববিদরাই বলতে পারেন যে, অভিজাত জনগোষ্ঠীর একটি শাখা জনবহুল আদিবাসীদের মধ্যে কিভাবে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছিল এবং ইতিহাসের সূত্রপাত হওয়ার আগেই স্থানীয় অধিবাসীরা ভূমিদাসে পরিণত হয়েছিল অথবা জঙ্গলে বিতাড়িত হয়েছিল।৭৪৫
ভারতবাসীর ধর্ম আগেও ছিল কিন্তু মনোজগতে প্রবেশের কোন প্রক্রিয়া এবং আত্মাকে আলোকিত করার কোন সাধন-ভোজন জানা ছিল না। ভারতবাসীর ধর্মীয় অনুভূতি ও মনোজগতের বিক্ষিপ্ত ধর্মীয় ধ্যান ধারনাকে ক্রমান্নোতির সোপানে উপস্থাপন করে স্থিতিশীল করার এক নূতন প্রক্রিয়া উপহার দিল আর্যরা, যার নাম বেদ, মনোজগতে শৃঙ্খলাবদ্ধ উন্নতির ধারা (Mental regulatory reform); এখানেই আর্য ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব। তাদের কাছে ভগবত জ্ঞানই বেদ আর বেদই ভগবত জ্ঞান।
এখানেই আর্য ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব। তাদের কাছে ভগবত জ্ঞানই বেদ আর বেদই ভগবত জ্ঞান।
৭৪০ বিজয়চন্দ্র মজুমদার: বাঙ্গালা ভাষায় দ্রাবিড়ী উপাদান।
৭৪১ প্রবোধ চন্দ্র বাগচী: বৌদ্ধধর্ম ও সাহিত্য।
৭৪২ Jitendranath Bandopadhyay: The Development of Hindu iconography.
৭৪৩ দামোদর ধর্মানন্দ কোসাম্বি: ভারত ইতিহাস চর্চার ভূমিকা, পৃ- ২০।
৭৪৪ Ramprasad Chandra: Indo- Aryan Races
৭৪৫ William Hunter- The Annals of Rural Bengal
খবর বিভাগঃ
বাংলাদেশের ইতিহাস