মঙ্গলবার, মার্চ ১৫, ২০১৬

ইসলামের দৃষ্টিতে কর্ম ও শ্রম ষষ্ঠ পর্ব



ইতোপূর্বে আমরা যেমনটি বলেছিলাম যে ইসলামের দৃষ্টিতে একজন মুসলমানের বিশ্বাস তার জীবনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডসহ সকল ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কারণ বিশ্বাস হচ্ছে জীবনের সকল কাজের ভিত্তিভূমি। তাই ইসলামের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার লক্ষ্যও হচ্ছে মানুষ এবং সমাজকে নৈতিক আধ্যাত্মিক পূর্ণতায় পৌঁছানো এবং মূল্যবোধগুলোকে শক্তিশালী করা। আর এই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্র তৈরির ব্যাপারে কাজের ভূমিকা অপরিসীম। কাজ মানুষকে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিসহ পার্থিব জগতের উন্নতির পাশাপাশি পরকালীন জীবনের মুক্তিরও উপায়। যাই হোক বিষয়টি নিয়ে আজকের আসরে আমরা কিছু কথা বলার চেষ্টা করবো
আপনারা নিশ্চয়ই জানেন যে, ইসলামের মৌলিক একটি বিশ্বাস হচ্ছে প্রতিটি প্রাণীর রিযিকদাতা হলেন আল্লাহ, যেমনটি সূরা হুদের ছয় নম্বর আয়াতে এসেছে। তাহলে মানুষ কেন কাজ করে করে পরিশ্রান্ত হবে? কাজের প্রতি ইসলাম এতো গুরুত্ব দেওয়ার ব্যাপারটা কি স্ববিরোধী নয়- রকম জিজ্ঞাসা অনেকের মনে নিশ্চয়ই জাগে। বিখ্যাত চিন্তাবিদ মরহুম আয়াতুল্লাহ মোতাহহারী সম্পর্কে বলেছেনঃ আল্লাহকে আমরা যদি যথার্থভাবে চিনি এবং তাঁর গুণাবলি সম্পর্কে জানি, তাহলে বুঝতে পারবো যে জীবিকার ব্যবস্থাপনা এবং মানুষের অধিকারের সাথে কোনো বিরোধ নেই। সেজন্যেই সকল অলি-আওলিয়াই কাজ করেছেন। আসলে রিযিকদাতার মানে হলো সৃষ্টিকূলের সক্ষমতাকে কাজে লাগাতে সহযোগিতা করা
যেমন, একটি উদ্ভিদ যখন শেকড়ের সাহায্যে মাটি থেকে তার প্রয়োজনীয় খাবার গ্রহণ করে কিংবা কোনো জন্তু যখন তার দন্ত-নখরের শক্তি দিয়ে আক্রমণ চালায় তখন তারা মূলত তাদের রিযিক গ্রহণের শক্তিকেই কাজে লাগায় যা আল্লাহ তাদেরকে দিয়েছেন। এভাবে আল্লাহ তার সকল সৃষ্টিকেই রিযিক নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। তবে মানুষ যেহেতু সৃষ্টির সেরা সেজন্যে মানুষকে অনেক বেশি সুযোগ সুবিধা দিয়েছেন। মানুষকে দিয়েছেন বিবেক বুদ্ধির সেরা নিয়ামত। তাই মানুষ তার জীবিকা নিশ্চিত করার জন্যে নিজের মেধার শক্তিকে ব্যাপকভাবে কাজে লাগাতে পারে। মরহুম অধ্যাপক মোতাহহারী খোদার রিযিকদাতা হবার ব্যাপারে আরো বলেনঃ মানুষ নিজেদের আয় উপার্জনের জন্যে কিংবা নিজেদের সমৃদ্ধির জন্যে যেসব চেষ্টা চালান, তাও আল্লাহর রায্যাকিয়াতেরই প্রকাশ। আল্লাহ কোরআনে বলেছেন সকল প্রাণীর রিযকের দায়িত্ব তাঁর অর্থাআল্লাহ যদি জীবিকার নিশ্চয়তা বিধানকারী না হতেন তাহলে সৃষ্টিকূলে না কোনো চাহিদা থাকতো না থাকতো সহজাত কোনো প্রবণতা। মানুষও নিজের অধিকার বা সম্পদ সংরক্ষণের ব্যাপারে আগ্রহী হতো না
এদিক থেকে বলা যায় আল্লাহ হলেন রিযিক সরবরাহকারী,তবে প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মেই সবকিছু করেন। আর প্রকৃতির একটি নিয়ম হলো চেষ্টা কর্মপ্রচেষ্টার মাধ্যমে বেশি সুযোগ সুবিধা মেলে। মানুষের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নয়। মানুষেরও বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমৃদ্ধির বিষয়টি তার শারীরিক সক্ষমতা,চিন্তা বুদ্ধি-বিবেক অনুযায়ী কর্মতপরতার ওপর নির্ভরশীল। আর এইসব সক্ষমতা আল্লাহর জীবিকা সরবরাহকারী সত্ত্বারই প্রমাণবাহী
আমরা আগেও বলেছি যে নবীজী এবং তাঁর আহলে বাইত কথায় এবং বাস্তবে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন এবং নিজেরাও জীবিকা নির্বাহের কাজে পর ছিলেন। একদিন ইমাম কাজেম () নিজের ক্ষেতে কাজ করছিলেন। আলি বিন আবি হামযাহ নামে এক লোক তাঁর কাছে এসে বললেনঃকেন কাজ অন্যদেরকে করতে দিচ্ছেন না'? ইমাম বললেনঃ কেন দেবো! আমার চেয়েও উত্তম ব্যক্তি সবসময় এরকম কাজে ব্যস্ত ছিলেন। লোকটি জানতে চাইলোঃ কে? ইমাম বললেনঃ স্বয়ং রাসুলে খোদা এবং ইমাম আলী () তাঁদের সবাই আমার পূর্বপুরুষমূলত কাজ করাটা নবীজী এবং আল্লাহর মনোনীত বান্দাদের সুন্নাত। আলী () এর জীবনীতে এসেছে তিনি সবসময় জেহাদের ময়দান থেকে ফিরে শিক্ষা বিচার সংক্রান্ত তাঁর নিয়মিত কাজকর্মের পাশাপাশি কৃষিকাজ করতেন।তিনি নিজ হাতে বহু খেজুর বাগান আবাদ করেছেন। তিনি মদিনার পশ্চিমেরইয়াম্বা' এলাকায় নিজ হাতে একটি কূপ খনন করেছেন। প্রচণ্ড বাতাসের বেগ থাকায় এলাকায় কেউ কাজ করতো না। আলী () সেখানে জমি কিনে নিজ হাতে বহু কূপ খনন করেন এবং বহু খেজুর বাগান করেন,কষ্ট তাঁকে কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখতে পারে নি।
আলী () নিজের কর্মময় জীবনের স্মৃতি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেনঃমদিনায় ভীষণরকম ক্ষুধার্ত হয়ে পড়েছিলাম। কাজের সন্ধানে তাই ঘর থেকে বের হলাম। মদিনার উপকণ্ঠেই দেখতে পেলাম এক বুড়িকে, বেশ কিছু মাটির ঢিলা জমিয়ে রেখেছে। বুঝতে পারলাম সেগুলোকে পানি দিয়ে ভেজাতে চায়। আমি তার কাছে গিয়ে বললাম কাজটা আমি করে দিতে চাই, তবে মজুরি হিসেবে প্রতি বালতি পানি কূপ থেকে তোলার জন্যে একটি করে খুরমা দিতে হবে। আমি ষোলো বালতি পানি তুললাম।আমার হাতে ফোসকা পড়ে গিয়েছিল। ষোলোটি খুরমা নিয়ে নবীজীর কাছে গেলাম এবং দুজনে সেগুলো খেলাম'
এরকম আরেকটি বর্ণনায় এসেছে, একদিন আলী () খুরমার অনেক বিচি বহন করে নিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলো-এগুলো কী? আলী () বললেনঃ ইনশাআ... খুরমা গাছ। লোকটি বললো, ইমাম খুরমা-বিচিগুলো সবই নিজ হাতে রোপন করলেন
হযরত আলী () একবার এক বক্তব্যে বলেছিলেনঃ মুমিন ব্যক্তি সবসময় কর্মব্যস্ত থাকে। যে কাজ করে তার শক্তি বেড়ে যায়। জীবিকার কার্যকারণ হলো কাজ। অর্থাকাজের সাথে জীবিকার সম্পর্ক। তাই জীবিকা অর্জন করতে হলে সুন্দর সুশৃঙ্খলভাবে কাজ করতে হবে। শরীর ভালো লাগছে না-এরকম অলসতা কিংবা ফুরফুরে ভাব উভয় অবস্থাতে যারা কাজ করে তাদের প্রতি মোবারকবাদ। কেননা বিমর্ষতা এবং অলসতা পরকালকে ধ্বংস করে দেয়। এভাবে লক্ষ্য করা যাবে ন্যায়বিচার, বীরত্ব, তাকওয়া, জ্ঞানের দিক থেকে অন্যতম শীর্ষস্থানে থাকা সত্ত্বেও কাজ কর্মকে বিশেষ গুরুত্বের সাথে দেখেছেন। হযরত আলী () এর দৃষ্টিতে মানুষ যদি তার পেশায় কাজের ক্ষেত্রে আল্লাহর দেওয়া বিধান এভং মানবীয় মূল্যবোধগুলোর সীমারেখা ঠিকঠাকমতো মেনে চলে,তাহলে তা একধরনের ইবাদাত। ধরনের পেশাজীবী লোক আল্লাহর প্রিয়ভাজন। তিনি বলেছেনঃআল্লাহ রাব্বুল আলামিন পেশাজীবী এবং আমানতদারী ভালোবাসেন'


শেয়ার করুন