মঙ্গলবার, মার্চ ১৫, ২০১৬

ইসলামের দৃষ্টিতে কর্ম ও শ্রম পঞ্চম পর্ব



মানুষসহ সকল প্রাণীরই অভিন্ন বৈশিষ্ট্য হলো জীবনকে সচল রাখার জন্যে চেষ্টা প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। কিন্তু চেষ্টা প্রচেষ্টা সম্পর্কে মানুষের রয়েছে বিচিত্র দৃষ্টিভঙ্গি। কেউ কেউ মনে করেন মানুষের জীবন এই পার্থিব জগতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। সেজন্যে তাদের সকল চেষ্টা বা কর্মতপরতা এই দুনিয়া কেন্দ্রিক। আবার কেউ কেউ বিশ্বাস করেন পার্থিব এই জগতেই মানব জীবন সমাপ্ত নয় বরং পরবর্তীকালে রয়েছে অনন্ত আরেক জীবন। সেজন্যে তাঁরা পরবর্তী পৃথিবীর অনন্ত জীবনের সুখ শান্তির স্বার্থে পার্থিব এই পৃথিবীর সকল সুযোগ সুবিধাকে কাজে লাগান। এই দ্বিবিধ দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে কর্মপ্রচেষ্টা নিয়ে আরো কিছু কথা বলার চেষ্টা করবো।

কাজ মানুষের একটি স্বাভাবিক প্রয়োজনীয়তা। তাছাড়া ধর্ম এবং ধর্মীয় শিক্ষাগুলোও মানুষকে কাজের প্রতি সাহিত করে। ধর্ম প্রাকৃতিক একটি বিষয়। কথার মানে হলো ধর্মের নিয়মনীতি আর প্রকৃতির নিয়মকানুন পরস্পর সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং পরিপূরক। এর কারণটা হলো উভয়ই এক এবং অভিন্ন শক্তি থেকে সারিত, সেই শক্তি হলোখোদা' প্রকৃতির বিধান অনুযায়ী কাজ হলো প্রাকৃতিক বিচিত্র সম্পদ সুযোগগুলোকে কাজে লাগিয়ে তা থেকে উপকৃত হবার জন্যে মানবজাতির পরতা। কর্মপ্রচেষ্টা মানুষের অভ্যন্তরীণ মেধা প্রতিভা বিকাশের অন্যতম একটি উপায়ও বটে। আর এই পন্থাটি ধর্মই মানুষের জন্যে প্রদর্শন করেছে যাতে কর্মপ্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে মানুষ তার আত্মিক এবং আধ্যাত্মিক পূর্ণতায় পৌঁছার সুযোগ পায়।
যেমনটি বলেছিলাম যে ইসলামের বিশ্বদর্শন অনুযায়ী মানুষের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো আল্লাহর নৈকট্য আনুগত্য লাভ করা। তাই যা কিছুই মানুষকে তার এই লক্ষ্যে পৌঁছতে সাহায্য করবে তা- মানুষের কাছে বাঞ্ছনীয়। ইসলামের দৃষ্টিতে জীবনজীবিকা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্য হলো তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের পথে অগ্রসর হবার শক্তি লাভ করা। মানুষ সুখ শান্তিতে বাস করার জন্যে এবং আল্লাহর ইবাদাতে মশগুল থাকার জন্যেও খাওয়া পরার প্রয়াজন রয়েছে, ঘরবাড়িসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধারও প্রয়োজন রয়েছে। আর এসবই নিশ্চিত হবে কেবল কাজ শ্রমের মধ্য দিয়ে। তাই মানুষের অকাট্য অধিকার হচ্ছে বস্তুগত চাহিদাগুলো মেটানোর জন্যে কর্মপ্রচেষ্টা চালানো। তবে শর্ত হলো কর্মপ্রচেষ্টা চালাতে গিয়ে কোনোভাবেই আধ্যাত্মিক পূর্ণতার পথকে বন্ধ করা যাবে না, বরং বলা ভালো কর্মপ্রচেষ্টাকেই আধ্যাত্মিকতার শীর্ষে পৌঁছার সোপান হিসেবে গ্রহণ করা সঙ্গত, কেননা এটাই হতে পারে তাকওয়া অর্জনের অন্যতম পন্থা। ইমাম বাকের () একটি দোয়ায় বলেছেনঃহে খোদা!যতোদিন বেঁচে আছি তোমার কাছে কল্যাণময় জীবন কামনা করছি। তোমার কাছে সেরকম জীবন চাই যে রকম জীবন যাপন করলে তোমার আনুগত্যের শক্তি অর্জিত হবে এবং তোমার বেহেশতের জন্যে উপযুক্ততা অর্জিত হবে'
গত আসরে আমরা নবীজী এবং তাঁর পবিত্র আহলে বাইতসহ অন্যান্য নবীরাসূল আধ্যাত্মিক মহান ব্যক্তিত্ববর্গের জীবন পর্যালোচনা করে দেখিয়েছিলাম যে তাঁরা কাজ করার প্রতি কতোটা গুরুত্ব দিয়েছেন। নবীদের বেশিরভাগই কৃষিকাজ, পশুর রাখাল, কাঠ মিস্ত্রি, ব্যবসা-বাণিজ্যের মতো পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। ইসলামী দর্শনে কাজ করাটা ইবাদাত। জীবন জীবিকার প্রয়োজনীয় অর্থ যদি হালাল রুযির মধ্য দিয়ে অর্জিত হয় তাহলে আল্লাহর পথে জেহাদ করার সওয়াব অর্জিত হবে। মহানবী (সা) বক্তব্যে এবং বাস্তবে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন এবং বেকার থাকার ব্যাপারে নিষেধ করেছেন। আমরা আজকের আসরের পরবর্তী পর্যায়ের আলোচনায় কাজের গুরুত্ব মূল্যায়ন সম্পর্কে নবীজীর দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ
একটি হাদিস দিয়ে শুরু করা যাক। নবী করিম (সা) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি তার পরিবারের জীবিকা নির্বাহের প্রয়োজনে শ্রম দেয়, কষ্ট করে, সে ব্যক্তি আল্লাহর পথে জেহাদকারী মুজাহিদের মতো....আমি আমার উম্মাতের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি যে যে বিষয়ে উদ্বিগ্ন ভীত তাহলো উদরপূজা, বেশি ঘুম এবং বেকারত্ব...যে বা যারা নিজের জীবনের দায়িত্বভার জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয় সে বা তারা আল্লাহর রহমত থেকে দূরে অবস্থান করে। রাসূলে খোদা (সা) সেই শৈশবকাল থেকেই বিচিত্র কাজকর্মে ব্যস্ত ছিলেন। শৈশব এবং কৈশোরে তিনি রাখালবৃত্তি করেছেন এবং যুবক বয়সে ব্যবসা বাণিজ্যের কাজ করেছেন। নবুয়্যতের দায়িত্ব পাবার পরও তিনি তাঁর কাজকর্ম থেকে বিরত ছিলেন না এবং কখনোই তিনি রাজা বাদশাদের মতো শাহী জীবনযাপন করেন নি
নবুয়্যতির দায়িত্ব ছিল কর্মব্যস্ততাপূর্ণ। মদিনায় নবীজীবনের বৃহএবং গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়টিতে দাওয়াতী এবং প্রতিরক্ষামূলক কাজে ব্যয় হয়েছে। তারপরও তিনি ন্যুনতম সুযোগকেও কাজ করার ক্ষেত্রে ব্যয় করতে ভোলেন নি। তিনি সবসময় বলতেনঃআল্লাহ চান তাঁর বান্দারা হালাল রুযি অর্জনের লক্ষ্যে কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়ুক' নবীজী তাঁর দোয়ার একটা অংশে প্রায়ই বলতেনঃহে খোদা! আমি বেকারত্ব অলসতার ব্যাপারে তোমার কাছে মুক্তি চাই'তিনি আরো বলেছেনঃযার পানি এবং মাটি রয়েছে অথচ কর্মপ্রচেষ্টার অভাবে দারিদ্র্যক্লিষ্ট,সে আল্লাহর রহমত থেকে দূরে।' নবীজীর জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যাবেকুবা' মসজিদ নির্মাণ করার সময় নবীজী নিজেও মুসলমানদের সাথে কাধেঁ কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেছেন, শ্রম দিয়েছেন,তাদেঁর সাথে ছোটো বড়ো পাথর টেনে মসজিদের স্থানে নিয়ে গেছেন।যখনি তাঁর কোনো সাহাবি তাঁর কাছে আসতেন এবং বিনয়ের সাথে তাঁর জায়গায় কাজ করতে বলতেন,নবীজী কিছুতেই অনুমতি দিতেন না,বরং বলতেনঃতুমি যাও,আরো তো পাথর আছে,নিয়ে আসো'
নবী করিম (সা)একদিন দেখলেন শক্তিমান এক যুবক সেই সকাল থেকে কাজ করে যাচ্ছে। তাঁর সঙ্গীদের কেউ কেউ বললেন,এই যুবক যদি নিজের যৌবনটাকে আল্লাহর রাস্তায় কাজে লাগাতো তাহলে তা কতোই না প্রশংসনীয় হতো। নবীজী বললেনঃএভাবে বলো না, এই যুবক যদি নিজের চাহিদা মেটানোর জন্যে এবং অপরের কাছে সাহায্য চাওয়া থেকে মুক্তি পাবার জন্যে কাজ করে থাকে, তাহলে তার শ্রম আল্লাহর রাস্তাতেই ব্যয় হচ্ছে। একইভাবে যদি সে তার অসমর্থ বাবা-মার স্বার্থে কিংবা তার অপ্রাপ্ত বয়স্ক ছেলেপুলেকে অপরের দ্বারস্থ হওয়া থেকে বিরত রাখার জন্যে কাজ করে থাকে, তাহলেও সে খোদার পথেই শ্রম দিচ্ছে'নবীজী যেখানেই কারো প্রতি মনোনিবেশ করতেন তখনই তার পেশা সম্পর্কে জানতে চাইতেন।যদি সে বলতো যে কোনো কাজ করে না, তাহলে নবীজী রাগ করে বলতেনঃআমার আনুকূল্য হারালো। কোনো মুমিনের যদি পেশা না থাকে, তাহলে সে নিজের ধর্মকেই জীবিকার উপায় করে নেয়'
নবীজীর একথার মানে হলো,জীবিকার ন্যূনতম জোগান না থাকলে মানুষের ধর্ম বিশ্বাস বিপদের মুখে পড়ে যায়। কারণে আমাদের সবারই এই দোয়া করা উচিতঃহে খোদা! আমাদেরকে বরকত দান করো! আমাদেরকে আর্থিক দৈন্যতার মাঝে আবদ্ধ করো না'! কেননা মানুষের রুটি রুযি নিশ্চিত না হলে ধর্মীয় কর্তব্য পালনে অমনোযোগী হয়ে পড়ে। যাই হোক আল্লাহ আমাদের সবাইকে কর্মমূখর জীবন দান করুন। এই দোয়ার মধ্য দিয়ে শেষ করছি আজকের আলোচনা


শেয়ার করুন