মঙ্গলবার, মার্চ ১৫, ২০১৬

ইসলামের দৃষ্টিতে কর্ম ও শ্রম চতুর্থ পর্ব



গত পর্বে আমরা পবিত্র কোরআনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছিলাম যে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মানুষের জন্যে সর্বপ্রকার সুযোগ সুবিধা প্রস্তুত করে রেখেছেন, এখন মানুষের কাজ হলো কর্ম শ্রমের মাধ্যমে সেগুলোকে খুঁজে বের করা এবং সেগুলোর সাহায্যে নিজেদের সার্বিক অভাব দৈন্যতা দূর করা। পর্বে আমরা নবীজীবনে তথা ইসলামের শিক্ষায় কাজের অবস্থান গুরুত্ব নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করবো
বিশ্ব প্রকৃতির অমোঘ নিয়মেই মানুষের ওপর কাজের একটি গুরুদায়িত্ব অর্পিত হয়েছে যাতে মানুষ তাদের চেষ্টা শ্রম দিয়ে প্রকৃতি থেকে নিজেদের প্রয়োজনীয়তা চাহিদাগুলো মেটাতে পারে। হযরত আদম () পৃথিবীতে আসার প্রথম দিন থেকেই জীবন যাপনের জন্যে চেষ্টা প্রচেষ্টা শুরু করেন। অবশ্য এই চেষ্টা প্রচেষ্টার বিষয়টি কেবল মানুষের জন্যেই নয় বরং সকল প্রাণীকূলের জন্যেই সমানভাবে প্রযোজ্য। বেঁচে থাকার তাগিদে সবাই নিজ নিজ জীবিকার প্রয়োজনে কর্মতপর। যেমনটি আগেই বলেছি যে, ইসলামী চিন্তাদর্শে কর্মপ্রচেষ্টার বিশেষ একটি স্থান রয়েছে। কেননা এতে রয়েছে মানুষের জন্যে পার্থিব আধ্যাত্মিক অগণিত কল্যাণ। কোরআনের বিভিন্ন আয়াত এবং ধর্মীয় শিক্ষাগুলো মানুষকে কর্মচাঞ্চল্যের পক্ষে অনুপ্রাণিত করে। ইসলামের শিক্ষা হলো মানুষের উচিত জ্ঞান বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে এবং চেষ্টা প্রচেষ্টা চালিয়ে আধ্যাত্মিক বস্তুগত উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাওয়া। জীবিকার জন্যে চেষ্টা শ্রম দিলে মানুষের মাঝ থেকে যেমন নিষ্প্রাণ আলস্য দূর হয়ে যায় তেমনি মনের ভেতরে এক ধরনের প্রাণ চাঞ্চল্য দেখা দেয়।

দৈহিক এবং মানসিক সুস্থতার জন্যে কাজ সবোর্ত্তম একটি উপায় বা উপকরণ। মানুষের সাফল্য বা বিজয়ের নেপথ্যে রয়েছে এই কর্মপ্রচেষ্টা। যারা ব্যাপক পরিশ্রমী তাদের সাফল্য ব্যাপক আর যারা অপেক্ষাকৃত অলস তারা সফলতা থেকেও তুলনামূলকভাবে বঞ্চিত। বিবেক তাড়িত মানুষের উচিত দারিদ্র থেকে মুক্তি লাভ করার জন্যে বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত থাকা এবং সম্মান মর্যাদার সাথে জীবনযাপন করার জন্যে কাজ করা যাতে অপরের কাছে হাত বাড়াতে না হয়। তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ যে দিকটি ইসলামের স্বাতন্ত্রের কথাটি তুলে ধরছে তাহলো কর্মপ্রচেষ্টার পাশাপাশি ইসলাম তাকওয়ার প্রতি বিশেষভাবে জোর দিয়েছে। পবিত্র কোরআনের সূরা নূরের সাইত্রিশ নম্বর আয়াতে তাকওয়াবান লোকদের পরিচয় সম্পর্কে বলা হয়েছেতাঁরা এমন যে, অর্থনৈতিক কাজকর্ম তাঁদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে অর্থানামায কায়েম করা থেকে এবং যাকাত প্রদান করা ইত্যাদি থেকে বিরত রাখে না।' অন্যভাবে বলা যায় জীবনে আল্লাহ কেন্দ্রিকতা এমন একটি মৌলিক বিষয় যাকে বস্তুগত অর্থনৈতিক সকল কাজকর্মের মাঝেও ভোলা যাবে না। তাই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডসহ জীবনের সকল কাজ হতে হবে তাকওয়া আল্লাহ কেন্দ্রিক
সমাজের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার পরিবশে যদি এরকম পরহেজগারীপূর্ণ হয় তাহলে সমাজের প্রতিটি সদস্যের মাঝে সুস্থ যথাযথ একটি সম্পর্ক বিরাজ করবে। কেননা মানুষ যখন তাকওয়া পরহেজগারীর মধ্য দিয়ে হারাম বা আল্লাহর অপছন্দনীয় কাজকর্ম থেকে দূরে থাকে তাহলে সমাজের ওপর আল্লাহর রহমত বরকতের বৃষ্টি বর্ষিত হবে। সূরা তালাকের দুই তিন নম্বর আয়াতে এসেছেঃআর যে তাকওয়াবান অর্থাআল্লাহকে ভয় করে,আল্লাহ তার জন্যে নিস্কৃতির পথ করে দেবেন...এবং তাকে তার ধারণাতীত জায়গা থেকে রিযিক দেবেন।' আল্লাহর পূণ্যবান বান্দারা যে যে কাজই করুন না কেন তাঁর শুরুতেই আল্লাহর সন্তুষ্টির বিষয়টিকে মাথায় রাখেন এবং আল্লাহ তাঁর সকল কাজই দেখছেন এই বিশ্বাস সবসময় মনে লালন করে কাজ করেন। রাসূলে খোদা (সা) থেকে ইমাম বাকের () বর্ণনা করেছেনঃ ইবাদাতের সত্তুরটি অংশ রয়েছে,তার মধ্যে সবচেয়ে উত্তম অংশটি হলো হালাল উপায়ে রুযির জন্যে চেষ্টা প্রচেষ্টা চালানো
তো হালাল উপায়ে রুটি রুযির মধ্যে আল্লাহ যে বরকত রেখেছেন সেই বরকতের কল্যাণেই যে ব্যক্তি তার পরিবার পরিজনের জীবন জীবিকার প্রয়োজনে গঠনমূলক ইতিবাচক চেষ্টা প্রচেষ্টা চালায়,সে ব্যক্তি পার্থিব জীবনের উন্নতির পাশাপাশি পরকালীন জীবনের জন্যেও ব্যাপক কল্যাণ সওয়াব অর্জন করে। কারণেই ইসলামের বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছেএই পার্থিব জগত হচ্ছে পরকালীন জীবনের কৃষিক্ষেত্র' আর এই কৃষিক্ষেত কেবলমাত্র সঠিক বা ন্যায় পন্থা অর্থাতাকওয়াময় কাজ কর্ম সম্পাদনের মাধ্যমেই চাষাবাদ করা যায়।

আল্লাহর নবী রাসূলগণের জীবন কিংবা আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ববর্গের জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে তাঁদের জীবন ছিল কর্মমুখর। নবুয়্যত কিংবা আধ্যাত্ম চেতনা তাঁদের ব্যক্তিগত পারিবারিক জীবন জীবিকা অর্জনের জন্যে প্রয়োজনীয় কাজকর্ম সম্পাদনের পথ থেকে বিরত রাখেনি। ইমাম সাদেক () বলেছেনঃ যেদিন মানব জাতির আদি পিতা আদম () বেহেশত থেকে পৃথিবীতে এসেছেন,সেদিন থেকেই তাঁর পানাহারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। তিনি তখন জিব্রাইল () এর সাথে পরামর্শ করলেন এবং তাঁর সাহায্য চাইলেন। জিব্রাইল () তখন আদশ ()কে পরামর্শ দিয়েছিলেন এভাবেঃ হে আদম! তুমি যদি নিজস্ব চাহিদা প্রয়োজনীয়তাগুলো মেটাতে চাও তাহলে কৃষিবিদ হও এবং কৃষিকাজে নিয়োজিত হও!হযরত নূহ () এর ক্ষেত্রেও বর্ণনায় এসেছে যে, তিনি কাঠমিস্ত্রির পেশায় নিয়োজিত থেকেই নয়শ' পঞ্চাশ বছর তাঁর কওমের লোকদের মাঝে দাওয়াতি কাজ করেন।
তারপরও কওমের লোকজন যখন ঈমান আনলো না তখন আল্লাহ তাঁকে আদেশ দিলেন খুরমা গাছ লাগাও। তিনি তাই করলেন। কওমের লোকেরা তাঁকে খুরমা গাছ লাগাতে দেখে উপহাস করলো। কিন্তু নূহ () দমলেন না। খুরমা গাছগুলো যখন ফলবতী হয়ে উঠলো তখন আল্লাহর আদেশে সেগুলোকে কেটে ফেললেন এবং নৌকা বানালেন।
একইভাবে দাউদ ()কে একদিন আল্লাহ বললেনঃ হে দাউদ! তুমি একজন নেককার বান্দা! কিন্তু নিজ হাতে কাজকর্ম না করে নাবায়তুল মালের টাকা গ্রহণ করো!দাউদ () একথা শুনে চল্লিশ দিন কাঁদলেন এবং আল্লাহ তাঁর জন্যে লোহাকে নরম করে দিলেন। তারপর দাউদ () কাজ করতে শুরু করেন। নিজ হাতে তিনি তিনশ' ষাটটি লোহার বর্ম তৈরি করলেন এবং সেগুলো বিক্রি করে টাকা উপার্জন করে বায়তুল মালের টাকার প্রয়োজনীয়তা দূর করলেন। তিনি খুরমা খেজুর গাছের পাতা দিয়ে জাম্বিল বানিয়েও বিক্রি করতেন এবং পরিবারের খাদ্যের জোগান দিতেন
হযরত শোয়াইব () যখন মূসা () এর কাছে মেয়ে বিয়ে দিলেন তখন তিনি মূসাকে আট বছর তাঁর জন্যে কাজ করার শর্ত দিয়েছিলেন। মূসা () তাই করলেন,আট বছরের স্থলে দশ বছর রাখালবৃত্তি করলেন। ঈসা () কে একজন জিজ্ঞেস করেছিল-আমাদের মাঝে কে সবচেয়ে উত্তম। ঈসা () জবাবে বলেছিলেনঃ যে তার নিজ হাতে কাজ করে এবং নিজের রুযির টাকায় খাবার গ্রহণ করে। স্বয়ং রাসূলে খোদা (সা) কর্মকঠোর হাতে চুম্বন দিয়ে বলেছিলেন-‘এটা সেই হাত যে হাত দোযখের আগুণে পুড়বে না'


শেয়ার করুন