কাজের গুরুত্ব এবং
এ সম্পর্কে
বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি
নিয়ে আমরা
কথা বলছিলাম।
বিশেষ করে
ইসলামের দৃষ্টিতে
কাজের গুরুত্ব
ও তাৎপর্য এবং
এ সংক্রান্ত
দর্শন নিয়ে
ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ
করছিলাম। আজকের
আসরে আমরা
এ সংক্রান্ত
আরেকটি দিক
নিয়ে কথা
বলার চেষ্টা
করবো।
ইসলামসহ বিশ্বের প্রতিটি
অর্থব্যবস্থারই নিজস্ব দর্শন এবং বিশ্বদৃষ্টি
রয়েছে। যেমনটি
গত আসরে
বলেছিলাম ইসলামী
চিন্তাদর্শনে মানুষের জীবনের ওপর তার
বোধ ও
বিশ্বাসের কেন্দ্রিয় ভূমিকা রয়েছে। সেজন্যে
একজন মুসলমানের
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে তার বিশ্বাসের
সম্পর্ক খুবই
নিবীড়।অন্যভাবে বলা যেতে পারে ইসলামে
একজন মানুষের
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডসহ জীবনের প্রত্যেকটি বিষয়
ধর্মীয় বিশ্বাস
ও শিক্ষার
কাঠামো অনুযায়ী
সম্পাদিত হয়।
ইসলামী চিন্তাদর্শ
অনুযায়ী একজন
মানুষের জীবন
বা অস্তিত্বের
দুটি দিক
রয়েছে। একটি
তার বস্তুগত
জীবন অপরটি
তার আধ্যাত্মিক
জীবন। আল্লাহ
তায়ালা মানুষকে
সৃষ্টিকূলের সেরা জীব হিসেবে সৃষ্টি
করেছেন এবং
অপরাপর সকল
সৃষ্টির ওপর
মানুষকে মর্যাদাবান
করেছেন। তাই
মানুষের কর্তব্য
হলো তার
অভ্যন্তরীণ মেধা ও সৃজনশীলতা এবং
তার বোধ
ও বুদ্ধিকে
কাজে লাগিয়ে
মানবীয় তথা
তার আত্মিক
ও আধ্যাত্মিক
পূর্ণতায় পৌঁছার
জন্যে চেষ্টা
প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়ন
করার জন্যে
আল্লাহ তায়ালা
মানুষের জন্যে
প্রয়োজনীয় সকল সুযোগ সুবিধা সকল
পন্থা ও
উপায় উপকরণ
দিয়ে দিয়েছেন,যাতে মানুষ
তার বস্তুগত
ও আধ্যাত্মিক
চাহিদাগুলো সহজেই মেটাতে পারে। মানুষ
তার প্রয়োজন
মেটানোর জন্যে
কাজ করতে
বাধ্য। এদিক
থেকে বিচার
করলে দেখা
যাবে ইসলামের
দৃষ্টিতে এ
বিষয়টির বিশেষ
গুরুত্ব রয়েছে।
কর্মতৎপরতা
ইহকাল এবং
পরকালীন জগতে
মানুষের ভাগ্য
নির্ধারণী একটি উপায়। কোরআনে কারিম
আশিটিরও বেশি
আয়াতে মানুষের
সৌভাগ্যের শর্ত হিসেবে দুটি বিষয়ের
কথা উল্লেখ
করেছে। একটি
হলো ইমান
এবং অপরটি
সৎ কাজ।
সাংসারিক বা
পারিবারিক ব্যয় নির্বাহ করার জন্যে
সময় দেওয়া
এবং পরিশ্রম
করাটা সৎ
কাজের অন্তর্ভুক্ত।
অবশ্য ইসলামে
সৎ লক্ষ্য
উদ্দেশ্যে পৌঁছার জন্যে যে কাজই
করা হোক
না কেন
সেই কাজ
অত্যন্ত মূল্যবান
হিসেবে পরিগণিত।
যেই প্রকৌশলী বিশাল
কোনো ভবনের
নকশা তৈরির
জন্যে কাগজের
ওপর রেখাচিত্র
আঁকেন, যেই
আর্টিস্ট তাঁর
সময় এবং
মেধাকে কাজে
লাগিয়ে ক্যানভাসে
প্রকৃতির বিচিত্র
ছবি আঁকেন,
যেই শিক্ষক
স্কুল কলেজ
বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের পড়ান কিংবা যেই
মালি বাগানের
কাজ করেন
বা যেই
কৃষক কৃষিকাজে
ব্যস্ত সময়
কাটান, তাঁরা
সকলেই সামাজিক
উন্নয়ন ও
বিকাশের ক্ষেত্রে
অবদান রেখে
যাচ্ছেন। সামগ্রিকভাবে
ধর্মীয় দৃষ্টিতে
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করা
যেতে পারেঃ
‘ধর্মীয় মূল্যবোধ
এবং বিধি
বিধানের আলোকে
জনকল্যাণ ও
সামাজিক মর্যাদাকে
রেো উন্নত
করার লক্ষ্যে
প্রয়োজনীয় সেবামূলক কাজকর্ম কিংবা পণ্য
উৎপাদন
করার জন্যে
যেসব তৎপরতা চালানো
হয়, সেইসব
তৎপরতাকে
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে গণ্য করা
হয়।'
আয় উপার্জনের মৌলিক
পন্থাই হলো
কর্ম তৎপরতা। পবিত্র
কোরআনের বহু
আয়াতে মানুষের
জীবিকার প্রয়োজন
মেটানোর জন্যে
আল্লাহর দেওয়া
বিচিত্র রহমত
ও অনুগ্রহের
খোজেঁ মানুষকে
যমিনে চাষাবাদ
করার ব্যাপারে
অনুপ্রাণিত করা হয়েছে। কেবল অনুপ্রাণিতই
নয় বরং
বহুভাবে তার
গুরুত্বও তুলে
ধরা হয়েছে।
বহু আয়াতে
আসমান এবং
যমিনকে মানুষের
বশীভূত করার
কথা, দিবারাত্রি
সৃষ্টির কথা,
বাতাস এবং
বৃষ্টিকে পাঠানোর
কথা, নৌকা
চালানোর কথা
ইত্যাদির উল্লেখ
করা হয়েছে।
আল্লাহর রহমত
ও কল্যাণ
কামনা এবং
রুটিরুজির অনুসন্ধান প্রসঙ্গেই এসবের উল্লেখ
করা হয়েছে।
আর আল্লাহও
তাঁর প্রাকৃতিক
নিয়ামতগুলোকে খুজেঁ বের করার দায়িত্ব
মানুষের ওপরই
অর্পন করেছেন।
মানুষের একান্ত
নিজস্ব দায়িত্ব
হলো দিবারাত্রি
পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে তাদের জ্ঞান
বুদ্ধি বিবেককে
কাজে লাগিয়ে
নিজেদের বস্তুগত
ও আধ্যাত্মিক
কল্যাণ ও
উন্নতি বিধান
করা। কোরআনে
পাকে আমরা
লক্ষ্য করবো
সূরা হুদের
৬১ নম্বর
আয়াতে আল্লাহ
মানুষকে যমিনে
চাষাবাদ করার
আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি মানুষকে
স্মরণ করিয়ে
দিয়েছেন যে,
আল্লাহ রাব্বুল
আলামিন মানুষের
জন্যে সর্বপ্রকার
সুযোগ সুবিধাকে
প্রস্তুত করে
রেখেছেন, এখন
মানুষের কাজ
হলো সেগুলোকে
খুঁজে বের
করা এবং
সেগুলোর সাহায্যে
নিজেদের সার্বিক
অভাব ও
দৈন্যতা দূর
করা।
কোরআনের অসংখ্য আয়াতে
মানুষের জন্যে
দেওয়া আল্লাহর
বিচিত্র নিয়ামতের
কথা বলা
হয়েছে। সূরায়ে
লোকমানের বিশ
নম্বর আয়াতে
এই নিয়ামতের
কথা বলা
হয়েছে এভাবেঃ
তোমরা কি
দেখ না
আল্লাহ নভোমন্ডল
ও ভূ-মন্ডলে যা
কিছু আছে,সবই তোমাদের
কাজে নিয়োজিত
করে দিয়েছেন
এবং তোমাদের
প্রতি তাঁর
প্রকাশ্য ও
অপ্রকাশ্য নেয়ামতসমূহ পরিপূর্ন করে দিয়েছেন?
আল্লাহ রাব্বুল
অপর একটি
আয়াতে বলেছেনঃ
‘আকাশ, যমিন,
সমুদ্রগুলো, পাহাড় পর্বতরাজি, নদীসমূহ এবং
সর্বপ্রকার প্রাণীকে মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত
করেছেন যাতে
তা থেকে
তাঁর বান্দারা
উপকৃত হতে
পারে।' একইভাবে
সূরায়ে কাসাসের
সাতাত্তর নম্বর
আয়াতে আল্লাহর
দেওয়া সেইসব
নিয়ামতকে আখেরাত
তথা পরকালীন
জীবনের পাথেয়
সঞ্চয়ের কাজে
ব্যবহার করার
আহ্বান জানানো
হয়েছে। বলা
হয়েছেঃ আল্লাহ
তোমাকে যা
দান করেছেন,তা দিয়ে
পরকালের গৃহ
অনুসন্ধান কর,এবং ইহকাল থেকে
তোমার লাভবান
হবার কথা
ভুলে যেয়ো
না। তুমি
অনুগ্রহ কর,যেমন আল্লাহ
তোমার প্রতি
অনুগ্রহ করেছেন।'
প্রকৃতপক্ষে প্রকৃতিকে জয় করে আল্লাহর
দেওয়া নিয়ামতগুলো
অর্জন করতে
হলে শ্রম
বা কাজের
কোনো বিকল্প
নেই। অলসতা
বা কর্মহীন
জীবন যাপনের
মধ্য দিয়ে
সেসব অর্জন
করার কোনো
সুযোগ নেই।
এখানে প্রকৃতিকে জয়
করার মানে
হলো ব্যবসা-বাণিজ্য , পশুপালন,
কৃষিকাজ, খনিজ
সম্পদ উত্তোলনসহ
বিচিত্র পণ্য
উৎপাদনের
মতো কাজ
করার মধ্য
দিয়ে জীবিকা
নির্বাহ করা।
আর এসব
কাজ করতে
গেলে মেধা
খাটাতে হয়,
পরিশ্রম করতে
হয়। এই
পরিশ্রমই উন্নতি
ও সৌভাগ্যের
মূল চাবিকাঠি।
আল্লাহ পাক
মানুষের আয়
রোজগারের জন্যে
যেসব ক্ষেত্র
প্রস্তুত করে
রেখেছেন, সেগুলোকে
রহমত হিসেবে
উল্লেখ করেছেন।
সূরা কাসাসের
তিয়াত্তর নম্বর
আয়াতে বলা
হয়েছেঃ ‘তিনিই
স্বীয় রহমতে
তোমাদের জন্যে
রাত ও
দিন করেছেন,যাতে তোমরা
তাতে বিশ্রাম
গ্রহণ কর
ও তাঁর
অনুগ্রহ অন্বেষণ
কর এবং
যাতে তোমরা
কৃতজ্ঞতা প্রকাশ
কর।' আল্লাহ
পাক কাজ
করার ওপর
এতো গুরুত্ব
দেওয়া সত্ত্বেও
অনেকে মনে
করেন জীবন-জীবিকার জন্যে
এতো কাজ
করা দুনিয়া
পূজার শামিল।
তাদের বক্তব্য
হচ্ছে রুটি
রুজির বিষয়টি
আল্লাহর পক্ষ
থেকে নির্ধারিত
হয়েই আছে
ফলে কাজের
মাঝে তার
কোনো লাভ-ক্ষতির সম্ভাবনা
নেই। অথচ
সকল নবী
রাসূলই পৃথিবীতে
এসে ব্যাপক
পরিশ্রম করেছেন
এবং অন্যান্যদেরকেও
সৎ পথে
কাজ করার
আহ্বান জানিয়েছেন।
আল্লাহ আমাদের
সৎ পথে
থেকে কাজ
কর্ম করার
তৌফিক দিন।
খবর বিভাগঃ
ইসলাম
