মঙ্গলবার, মার্চ ১৫, ২০১৬

ইসলামের দৃষ্টিতে কর্ম ও শ্রম দ্বিতীয় পর্ব



কাজের সামর্থ থেকে মানুষ যদি উপকৃত না হতো কিংবা সবচেয়ে কম কাজ করেই যদি মানুষ সকল নিয়ামতের অধিকারী হয়ে যেত, তাহলে তাদের জীবন হয়ে যেত আনন্দ উল্লাসহীন। জীবনের অর্থ বা মজাই হারিয়ে যেত। সম্পর্কে ইমাম সাদেক () এর বক্তব্যের একটি উদ্ধৃতি দিয়ে শুরু করবো আজকের আলোচনা
নবীজীর আহলে বাইতের মহান উত্তরপুরুষ ইমাম জাফর সাদেক () মানুষের আত্মার ওপরে কাজের ইতিবাচক প্রভাব এবং কাজের মানসিক স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে বলেছেনঃমানুষের সকল প্রয়োজনীয়তা যদি কোনোরকম কাজকর্ম ছাড়াই পূরণ হয়ে যেত তাহলে কক্ষণো তাদের জীবন স্বাস্থ্যকর হতো না এবং জীবন উপভোগ্য হয়ে উঠতো না। ধরা যাক কোনো এক লোক এমন একদল মেহমানের সাথে যোগ দিলো যাদের খাওয়া পরার সকল দায় দায়িত্বসহ সব ধরনের সেবারই নিশ্চয়তা রয়েছে। একটা সময় পর বেকার বসে খাবার দাবার করতে করতে লোকটা ক্লান্ত হয়ে যায় এবং অবশেষে কাজের সন্ধানে যায় যাতে তার বেকারত্বের অবসান হয়। এখন ভাবুন যদি সারাটি জীবন মানুষের সকল প্রয়োজনীয়তা, সকল চাহিদা আপনা আপনি মিটে যেত তাহলে মানুষের অনুভূতিটা কীরকম হতো।' তাঁর বক্তব্য থেকে বোঝা যায় যে কাজ কেবল মাত্র আয়রোজগারের জন্যেই নয় বরং সুস্থ থাকা এবং ব্যক্তিত্ববান হবারও গোপন রহস্য। অগাধ অর্থ সম্পদের মালিক হবার পরও তাই কাজের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে
বিখ্যাত ফরাশি লেখক কবি ফ্রাঁসোয়া ভলতেয়ার বলেছেন, ‘যখনি অনুভব করি কষ্ট, ক্লান্তি আর রোগব্যাধি আমাকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে তখন কাজের আশ্রয় নিই, কেননা আমার ভেতরের যন্ত্রণার সবচেয়ে উত্তম প্রতিষেধক হচ্ছে কাজ। সেজন্যেই কাজের অভ্যন্তরীণ এবং বাহ্যিক উভয়বিধ ফায়দা বা উপকারিতা রয়েছে। তাছাড়া মানুষের ব্যক্তিগত এবং সামাজিক জীবন কাজ এবং দায়িত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত। মানুষের সফলতার রহস্য এই কর্মতপরতার পরিমাণের ওপর নির্ভরশীল। যিনি ব্যক্তিগত সামাজিক দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে যতো বেশি কর্মতপর হবেন, তিনি ততো বেশি সফল হবেন এটাই স্বাভাবিক। সাধারণত যে কোনো কাজেরই একটা নির্দিষ্ট চিন্তাদর্শ সাংস্কৃতিক ভিত্তি থাকে। যারা কাজকে কেবলমাত্র বস্তুগত লক্ষ্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে রাখতে চায় তারা ইহজাগতিক চাহিদা মেটানোকেই কাজের একমাত্র উদ্দেশ্য বলে মনে করে। কিন্তু যারা তাকে বস্তুজাগতিক চাহিদার অনেক উর্ধ্বে বলে মনে করে তারা কাজকে একটা সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখে এবং কাজকে তারা অনেক বড়ো উদ্দেশ্য তথা মানবীয় পূর্ণতা অর্জনের উপায় হিসেবে বিবেচনা করে
ইসলামে মানুষের অস্তিত্বটা দ্বিমাত্রিক। একটি হলো আধ্যাত্মিক এবং অপরটি বস্তুতান্ত্রিক। আল্লাহ পাক মানুষের সৃষ্টির সেরা হিসেবে মর্যাদাবান করেছেন এবং আকাশ যমিনের সকল বস্তুকেই মানুষের সেবায় নিয়োজিত করেছেন। পবিত্র কোরআনের সূরা লোকমানের ২০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছেঃতোমরা কি দেখ না আল্লাহ নভোমন্ডল ভূ-মন্ডলে যাকিছু আছে,সবই তোমাদের কাজে নিয়োজিত করে দিয়েছেন এবং তোমাদের প্রতি তাঁর প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য নেয়ামতসমূহ পরিপূর্ন করে দিয়েছেন'? থেকে বোঝা যায় মানুষকে শ্রেষ্ঠ করে সৃষ্টি করার পেছনে আল্লাহর কোনো একটা উদ্দেশ্য নিশ্চয়ই রয়েছে। যেমনটি বলা হয়েছে সূরায়ে জারিয়াতের ৫৬ নম্বর আয়াতেঃআমার এবাদত করা ছাড়া আর কোনো কাজের জন্যে আমি মানব জিন জাতিকে সৃষ্টি করি নি।' ফলে মানব সৃষ্টির উদ্দেশ্যটা পরিস্কার, তাহলো আল্লাহর ইবাদাত করা। এজন্যে মুমিন যে, তার কোনো একটি কাজও সেই উন্নত বৃহলক্ষ্য থেকে বিচ্যুত থাকতে পারে না। তার প্রতিটি কাজেরই লক্ষ্য হবে ইবাদাত তথা আল্লাহর আনুগত্য। আর এই ইবাদাতের পথ ধরে আত্মিক এবং আধ্যাত্মিক পূর্ণতায় পৌঁছানোটাই মূল লক্ষ্য
আল্লাহ মানুষকে যেসব নিয়ামতের অধিকারী করেছেন ধন সম্পদ সেগুলোর একটি। সেজন্যে কোনো মুসলমানের ধন সম্পদ কেবল তার একারই নয় বরং তার মধ্যে অন্যদেরও অধিকার রয়েছে। যাকাত বা খুমুস প্রদান সেই অধিকারেরই অংশ। এটা কোনো দান নয় কিংবা খয়রাতও নয় এটা বাধ্যতামূলক প্রদেয়। ফলে যাকাত খুমুস প্রদান আল্লাহর ইবাদাতের শামিল। যাকাত খুমুস প্রদান আল্লাহর কাছে গৃহীত হবার জন্যে শর্ত হলো আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে আন্তরিকতার সাথে প্রদান করা এজন্যে সম্পদ অর্জনের লক্ষ্যে কাজ করাটাও আধ্যাত্মিকতার প্রবাহে মিলিত হবার শামিল বলে এটা ইবাদাত হিসেবে গণ্য। কোনো ব্যক্তি যদি নিজের এবং পরিবারের চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যে কিংবা জনকল্যাণের লক্ষ্যে কাজ করে তাহলে তা ইবাদাত। অবশ্য তা হতে হবে আল্লাহর আদেশ নিষেধের মানদণ্ডের ভিত্তিতে। আর সেই অনুযায়ী যদি কর্মকাণ্ড চলে তাহলে পরকালেও তার পুরস্কার রয়েছে। এজন্যেই রাসূলে খোদা (সা) বলেছেনদুনিয়া হচ্ছে আখেরাতের কৃষিক্ষেত্র' পার্থিব জগতের সকল সুযোগ সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে যদি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে তাঁরই প্রদর্শিত পথে চলা যায়, তাঁরই নির্দেশনা অনুযায়ী কর্মতপরতা চালানো যায় তাহলে পার্থিব স্বার্থ হাসিলের পাশাপাশি পরকালীন স্বার্থও অর্জিত হয়
ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গিটা হলো একজন মুসলমান যেহেতু নিজে আল্লাহর অফুরন্ত নিয়ামতের অধিকারী হয় সেহেতু অন্যান্যদেরকেও আল্লাহর সেই নিয়ামতের অধিকারী হতে সহযোগিতা করা তার কর্তব্য। আল্লাহর অশেষ অনুগ্রহ থেকে একজন মুসলমান যথার্থ পন্থায় উপকৃত হয় এবং সেই অনুগ্রহের ব্যাপারে অকৃতজ্ঞতা পোষণ করে না।ইসলামের অর্থণৈতিক ব্যবস্থায় বস্তুগত ধন সম্পদ হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে দেওয়া আমানত। নিজের এবং সমাজের আত্মিক কর্ষ সাধনের জন্যে এইসব নিয়ামতকে কাজে লাগানো উচিত। এইদিক থেকে বিবেচনা করলে একজন মুসলমান বিশ্বকে গড়া এবং সংস্কার করার জন্যে একজন দায়িত্বশীল হিসেবে নিজেকে মনে করে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সূরা হুদের একষট্টি নম্বর আয়াতে বলেছেনঃতিনিই যমিন হতে তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে আবাদ করার জন্যে তোমাদের ওপর দায়িত্ব দিয়েছেন' এই দায়িত্ব পালনের জন্যে যেই পরতা, তাই কাজ। মানুষ তার মেধা মনন দিয়ে কাজ করার ফলেই নতুন নতুন প্রযুক্তি বিভিন্ন জিনিস আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছে


শেয়ার করুন