মঙ্গলবার, মার্চ ১৫, ২০১৬

ইসলামের দৃষ্টিতে কর্ম ও শ্রম প্রথম পর্ব



ইরানের বিখ্যাত কবি নেজামে গাঞ্জাবি লিখেছেনঃ
পৃথিবীর প্রতিটি ধূলিকণা, প্রতিটি অণু পরমাণু
ধূলি-ধূসর যদিও তা
রাষ্ট্রের বিচিত্র কাজে পরোক্ষে ব্যতিব্যস্ত সকলেই
নিজ নিজ কাজে সর্বদা
আমরা ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে সৃষ্টিজগতের বিচিত্র কর্মতপরতা এবং মানুষের কর্মময় জীবনের দায়িত্ব-কর্তব্য যৌক্তিকতা সম্পর্কে এখানে আলোচনা করবো।
আসলে সৃষ্টি জগতের প্রতিটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বস্তুই অত্যন্ত সুন্দর এবং সুশৃঙ্খলভাবে যে যার কাজে বা দায়িত্বে সর্বদা নিয়োজিত রয়েছে।এই সৃষ্টি জগত আল্লাহর ইচ্ছা শক্তির এক অনন্য প্রকাশ। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আকাশমণ্ডলী আর ভূপৃষ্ঠকে সৃষ্টি করেছেন ছয় দিনে এবং বাহ্যিক কোনো খুঁটি বা পিলার ছাড়াই নভোমণ্ডলীকে উর্ধ্বে স্থাপন করেছেন। ভূপৃষ্ঠকে সৃষ্টিরাজির জন্যে দোলনার মতো করে তৈরি করেছেন। আকাশ ছোঁয়া বিশাল বিশাল পাহাড়-পর্বতকে স্থাপন করে ভূপৃষ্ঠকে কম্পন থেকে সুরক্ষা করেছেন। এই ভূপৃষ্ঠকে আলোকিত করার জন্যে উজ্জ্বল জ্যোস্নাময় চাঁদ আর রঞ্জনরশ্মিময় সূর্যকে স্থান করেছেন। এই ভূপৃষ্ঠ বা পৃথিবী নামক গ্রহটিকে তার নিজস্ব কক্ষপথে পরিচালিত করেছেন যাতে রাত এবং দিনের সৃষ্টি হয়। একইভাবে বাতাসকে পাঠিয়েছেন যাতে মেঘকে এদিক ওদিক সঞ্চালিত করা যায় এবং উপযুক্ত অঞ্চলে খরা জর্জরিত তৃষিত ভূমির ওপর প্রাণসঞ্চারী বৃষ্টি বর্ষণ করে উদ্ভিদের চারা রোপনের ব্যবস্থা করা যায়
আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে মানুষকে সৃষ্টি করেছেন পানি এবং মাটি থেকে। তারপর তিনি মাটি দিয়ে সৃষ্ট বস্তুর ভেতর রূহের সঞ্চার করেছেন। আকাশ এবং যমিনকে মানুষের সেবায় সৃষ্টি করেছেন যাতে মানুষ তার কাজকর্ম এবং কর্মতপরতার মাধ্যমে ভূপৃষ্ঠের ওপর আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে অধিষ্ঠিত হতে পারে। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী প্রতিনিয়ত কর্মতপর। সূরা আররাহমানের উনত্রিশ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছেঃনভোমন্ডল ভূমন্ডলের সবাই তাঁর কাছে প্রার্থী। তিনি সর্বদাই কোনো না কোন কাজে রত আছেন।' একইভাবে সৃষ্টিজগতের কোত্থাও বেকারত্ব কিংবা লক্ষ্য উদ্দেশ্যহীনতার কোনো স্থান নেই। প্রতিটি অণু পরমাণু থেকে শুরু করে গ্রহ নক্ষত্ররাজি সবাই যার যার নির্দিষ্ট পথে সুনিপুণ শৃঙ্খলার সাথে আপন আপন লক্ষ্যপানে সদা ধাবমান। বিরাম কিংবা একঘেঁয়েমির কোনো সুযোগ বা স্থান সৃষ্টিরাজ্যে নেই
সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে তাই মানুষেরও উচিত সৃশৃঙ্খল এই ব্যবস্থাকে অনুসরণ করা। সৃষ্টি জগতের ছন্দ সুরের সাথে তাল মিলিয়ে এমন সমন্বিত জীবনের সুর তৈরি করা যাতে সৃষ্টিজগতের সকল বস্তুই সেই ছন্দ সুরে আপ্লুত হয়। এদিক থেকে চিন্তা করলে কাজ, চেষ্টা প্রচেষ্টা তথা কর্মতপরতা মানব জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হবে এবং বেকারত্ব বিশ্রামের মানে হলো সৃষ্টিজগত জীবনের প্রবাহ থেকে ছিটকে পড়া। এজন্যেই লক্ষ্য করা যায় মানবজীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়ন এবং স্থায়ী পরিবতর্ন এখন অনস্বীকার্য একটি বাস্তবতা। উন্নত এবং জটিল এই মানব সমাজে তাই জীবনের সকল কোণেই বা সকল পর্যায়েই কাজের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। এমনকি বলা যেতে পারে কাজ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষে আত্মা এবং মনের ওপর, চিন্তাপদ্ধতির ওপর, মানুষের মূল্যবোধের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে
চলমান জীবন প্রবাহের গতিশীলতার জন্যে বা জীবন ধারণের জন্যে মানব সমাজকে অবশ্যই কাজ বা চেষ্টা প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। মানুষের বড়ো বড়ো আশা আকাঙ্ক্ষা বা বৃহমূল্যবোধগুলো অর্জন করার জন্যে নিরন্তর উদ্যম প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবার কোনো বিকল্প নেই। যেকোনো দেশ বা জাতি উন্নতির শিখরে আরোহন করতে চাইলে অবশ্যই সেই জাতিকে কর্মতপর হতে হবে, অলসতা পরিহার করে চলতে হবে। যুগে যুগে যারাই বড়ো বড়ো সভ্যতার জন্ম দিয়েছেন তারা নিরলস পরিশ্রমী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাঁরা নিজেদের খোদাপ্রদত্ত মেধাকে কাজে লাগিয়ে সৃষ্টি জগতে অনন্য অবদান রেখে গেছেন। বিশাল বিশাল অট্টালিকা নির্মাণ যেমন ইরানের ঐতিহাসিক পার্সেপোলিস প্রাসাদ, মিশরের বিশাল বিশাল পিরামিড কিংবা অধুনালুপ্ত চীনের প্রাচীর ইত্যাদি মানুষের এই সৃষ্টিশীল চিন্তারই ফল। আধুনিক কালের গগণচুম্বি অট্টালিকা বা টাওয়ার নির্মাণ, মহাশূণ্য জয় কিংবা আকাশে মানুষের উড্ডয়ন, দূরারোগ্য রোগের চিকিসা, মহাসড়ক, টানেল, বিশাল বিশাল শিল্প কারখানা নির্মাণ, যোগাযোগের জন্যে বিস্ময়কর ডিজিটাল সিস্টেম প্রভৃতি মানুষেরই সৃজনশীল চিন্তা আর নিরলস কর্মপ্রচেষ্টার উপহার। এগুলোকে তাই সুন্দর অর্থাইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা উচিত।
কর্ম প্রচেষ্টার কল্যাণে মানুষের জীবন নামক বৃক্ষটি ফলে ফুলে সুশোভিত হতে পেরেছে, মানুষের অন্তরাত্মা দেহ থেকে দুর্বলতা আর বিরক্তি বিদূরিত হয়। মানব জীবন থেকে যদি কর্ম পরতা লোপ পায়, তাহলে তার পতনের ধারার সূচনা হবে।সভ্যতার ইতিহাস' নামক গ্রন্থের লেখক বিল ডুরান্ট লিখেছেনসুস্থতা কাজের মাঝে নিহিত। মানব জীবনের সুখ সমৃদ্ধি আর সন্তুষ্টির মূল রহস্যগুলোর একটি হলো পেশা বা কাজ। আমার দৃষ্টিতে আল্লাহর কাছে ধন সম্পদ না চেয়ে কাজ এবং আমলের তৌফিক চাওয়াটাই উত্তম।' মানুষের জন্যে পানাহার যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি কাজও অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু কেন? মানুষ কি তার বস্তুগত প্রয়োজনে কিংবা উত্তম জীবনযাপনের জন্যে কাজ করবে? মানুষ কি কেবল খাবার দাবারের সংস্থানের জন্যেই কাজ করবে? প্রশ্নের জবাবে বিভিন্ন মতবাদে বিভিন্ন রকম দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে। কেউ কেউ কর্মপ্রচেষ্টাকে কেবল দুনিয়াবি স্বার্থ সিদ্ধি বা মানুষের বস্তুতান্ত্রিক জীবনের প্রয়োজনীয়তার মধ্যেই সীমাবদ্ধ করেছেন,যদিও আরো অনেক মতবাদ চিন্তাধারায় ভিন্নরকম দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করা হয়েছে
ইসলাম কাজকে একটু বিস্তৃত পরিসরে চিন্তা করে। মানুষের সাথে সৃষ্টিজগতের অন্যান্য সম্পর্কের মতোই কাজও পার্থিব এবং আধ্যাত্মিক উভয় দিক থেকেই প্রয়োজনীয় বলে ইসলাম মনে করে। আমরা পরবর্তী আসরগুলোতে ইসলামী চিন্তাদর্শ সংস্কৃতিতে কাজের অবস্থান গুরুত্ব সম্পর্কে কথা বলার চেষ্টা করবো। কাজের সংজ্ঞা, ইসলামে এর সাংস্কৃতিক দার্শনিক ব্যাখ্যা কীরকম, সেগুলো নিয়েও আলোচনা করা ইচ্ছে রইলো। নবী করিম (সা) এবং তাঁর আহলে বাইতের জীবন চরিতে কাজ কীরকম গুরুত্ব পেয়েছে সেদিকেও নজর দেওয়ার চেষ্টা করবো। মানুষের অন্তরাত্মার ওপর কাজের ইতিবাচক প্রভাব, কাজের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক গুরুত্ব, ইসলামে কাজের শিষ্টাচার চরিত্র ইত্যাদি বিষয়েও আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ


শেয়ার করুন