১৯৭১ সালে লাখো প্রাণের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। একপক্ষ সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে দেশ মুক্ত করেছে, অন্যপক্ষ জঘণ্য হত্যাকান্ড ও যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত করেছে। একপক্ষ মুক্তিযোদ্ধা, অন্যপক্ষ যুদ্ধাপরাধী। কৃতিত্ব ও অপরাধ অনুসারে উভয়ের মুল্যায়ন দরকার। এটাই যুদ্ধাপরাধী ও মুক্তিযোদ্ধা তত্ত্ব।
স্বাধীনতাযুদ্ধে তিন স্তরে যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হয়েছে। প্রথমত: ১৯৭১ এর ২৫ মার্চ রাতে পাকবাহিনী অন্যায়ভাবে আক্রমণ করে হাজারো বাঙ্গালি হত্যা করেছে। ঐ রাতে কোনো বাঙ্গালি তাদের সহযোগীতা করেনি। যুদ্ধের শুরুতে তারা একাই সকল অপরাধ করেছে। এ পাকবাহিনীই আসল যুদ্ধাপরাধী।
দ্বিতীয়ত: যুদ্ধের মধ্যভাগে পাকবাহিনী ও গেরিলা উভয়ে যুদ্ধাপরাধ করেছে। পাকবাহিনী যুদ্ধাপরাধী আর গেরিলারা মুক্তিযোদ্ধা সাব্যস্ত হয়েছে। যেমন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা সম্পাদিত ‘বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থের পৃষ্ঠা-৩১৫তে উল্লেখ রয়েছে, “১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা আক্রমণে ঢাকার নিজ বাড়িতে তিনি (মোনায়েম খান) নিহত হন।” একইভাবে লেখক মাহমুদ ইকবাল ‘বাংলাদেশের নির্বাচিত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস’ গ্রন্থের ৬৭-৬৮ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন, “১৪ই অক্টোবর ১৯৭১, মুক্তিযোদ্ধারা ঢাকার অদূরে সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার হাউজ উড়িয়ে দিয়েছে। বিভিন্ন স্থানে বৈদ্যুতিক তার কেটে দিয়েছে। কয়েকটি ওয়ারলেস সেট দখল করে নিয়েছে। বাঙ্গালী কোন ইঞ্জিনিয়ার ঐ পাওয়ার হাউস মেরামত করতে রাজি হয়নি। বাধ্য হয়ে পাক সেনা কর্মকর্তারা ঐ পাওয়ার হাউস মেরামতের জন্য পাকিস্তান থেকে ৫ জন ইঞ্জিনিয়ার নিয়া আসে। কিন্তু মুক্তিবাহিনী সেই ৫ জনের একজনকেও জীবিত অবস্থায় পাকিস্তান ফিরে যেতে দেয়নি।” যুদ্ধকালে এভাবে পাকবাহিনী ও গেরিলা সংঘর্ষে ত্রিশ লাখ বাঙ্গালী শহীদ হয়েছে এবং বিজয় চুড়ান্ত হয়েছে। এ শহীদগণ যোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়নি। হয়তো তারা স্বাধীনতা বিরোধী বা রাজাকার, আল-বদর ছিলেন। এজন্য তাদের হত্যাকান্ড যুদ্ধাপরাধ নয়।
তৃতীয়ত: বিজয়ের পরও জঘণ্য হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছে। পাকবাহিনীর অবর্তমানে মুক্তিবাহিনী তা করেছে। যেমন-বিজয়ের মাত্র তিনদিন পর তথা ১৯ ডিসেম্বর, ১৯৭১ ইং তারিখে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী ও তার বাহিনী প্রকাশ্য দিবালোকে চার ব্যক্তিকে হত্যা করে। (অনলাইনে ভিডিও দেখুন এখানে-যঃঃঢ়ং
https://www.youtube.com/watch?v=Ep8fNT4-A9g)|।)। স্বাধীনতার পর ঘাতকেরা এভাবে সারাদেশে হত্যাকান্ড করেছে। যেমন- সিরাজগঞ্জে আসাদুজ্জামান সিরাজী, সায়ফুদ্দিন খান মজলিশ, মাওলানা ওসমান গণি, ফেনীতে মুহম্মদ ইলিয়াস, মাওলানা আযহারুস সোবহান, সাতক্ষীরায় মাওলানা আব্দুস সাত্তার, ঢাকায় মাওলানা পীর দেওয়ান আলী এবং কক্সবাজারের পার্লামেন্টারিয়ান মৌলভী ফরিদ আহমদসহ অসংখ্য জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিকে ঘাতকেরা নির্মমভাবে হত্যা করেছে। লেখক নুরুজ্জামান মানিক উল্লেখ করেন, ‘৭১ সালের ডিসেম্বরে বিজয় লাভের পরেও বুদ্ধিজীবীদের নিধন অব্যাহত থাকে। দৃষ্টান্তস্বরূপ ড, মনসুর আলী (ডিসে ২১, ১৯৭১) চলচ্চিত্রকর জহির রায়হান (নিখোঁজ হন ৩০ জানু, ১৯৭২) এবং সাংবাদিক গোলাম রহমান (হত্যা জানু ১১, ১৯৭২)। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, ‘৭১ সালে বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ড শুরু হয়ে এখনো তা চলছে।”(নুরুজ্জামান মানিক, স্বাধীনতা যুদ্ধের অপর নায়কেরা, পৃষ্ঠা-৭৭, ঢাকাঃ শুদ্ধস্বর প্রকাশনী, ২০০৯)। তৎকালিন ভারত সরকার বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর বিরূদ্ধে মানবতা বিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি করে। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু তাকে ক্ষমা করে ‘বীর উত্তম’ খেতাব দেন। এভাবে স্বাধীনতা-পরবর্তী হত্যার দায়ও অন্যায়ভাবে অনুপস্থিত পাকবাহিনী ও তাদের দোসরদের ওপর বর্তায়।
অতএব স্পষ্ট হয় যে, মুক্তিযুদ্ধে দু’শ্রেণীর যুদ্ধাপরাধী ছিল। যুদ্ধের শুরুতে পাকবাহিনী এবং বিজয়ের পরে মুক্তিবাহিনী। এটাই যুদ্ধাপরাধী তত্ত্ব। কিন্তু বাংলাদেশে তা অপ্রচলিত। কারণ, বঙ্গবন্ধু নিজেই পাকি যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা করেছেন এবং বিজয়-পরবর্তী অপরাধীদের মুক্তিযোদ্ধা খেতাব দিয়েছেন। ফলে সম্পুর্ণ নিরপরাধ ও অসহায় যুদ্ধবিধ্বস্থ বাঙ্গালি নাগরিকগণ অন্যায়ভাবে যুদ্ধাপরাধী সাব্যস্ত হয়েছে। যেমন- অধ্যাপক গোলাম আজম, সাকা চৌধুরী, মাওলানা দেলোয়ার হোসেন সাঈদী ও অন্যান্য। তারা মোটেও যুদ্ধাপরাধী নয়। তারা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার স্বামী ড. এম. এ. ওয়াজেদ মিয়ার ন্যায় শুধু আত্মরক্ষার্থে যুদ্ধকালে পাকবাহিনীর বাধ্যানুগত ছিল।
বাংলাদেশে প্রচলিত মুক্তিযোদ্ধা তত্ত্ব প্রায় একই। যারা দেশের মুক্তির জন্য সংগ্রাম করেছেন, তারা মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধ শুরুর পূর্বেই বঙ্গবন্ধু মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচয় ও সংখ্যা নির্দেশ করেছেন। তিনি বলেছেন, “এদেশের সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালি তাদের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে দেশকে মুক্ত করে ছাড়বে ইনশাল্লাহ।’ বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্চের (১৯৭১) ভাষণে বলেন, ‘সাড়ে সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না।’ স্বাধীনতার পর ১০ জানুয়ারী, ১৯৭২ তারিখের ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেন, “যারা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন, যারা বর্বর বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন, তাদের আত্মার প্রতি আমি শ্রদ্ধা জানাই। লাখো মানুষের প্রাণদানের পর আজ আমার দেশ স্বাধীন হয়েছে। আজ আমার জীবনের স্বাদ পুর্ণ হয়েছে। বাংলাদেশ আজ স্বাধীন। বাংলার কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, বুদ্ধিজীবী ও পুলিশ জনতার প্রতি জানাই সালাম। তোমরা আমার সালাম নাও। আমার বাংলায় আজ এক বিরাট ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতা এসেছে। ৩০ লাখ লোক মারা গেছে। আপনারাই জীবন দিয়েছেন, কষ্ট করেছেন। এ স্বাধীনতা রক্ষার দ্বায়িত্ব আজ আপনাদেরই।”(ভিডিও দেখুন এখানে-
https://www.youtube.com/watch?v=GVSx5fbYN9M))। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু তার সকল ভাষণে ১৯৭১ এর সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালীকেই মুক্তিযোদ্ধা ঘোষণা করেছেন। এটাই মুক্তিযোদ্ধা তত্ত্ব। তিনি দেশবাসীকে মুক্তিযোদ্ধা, অমুক্তিযোদ্ধা বা শহীদ পরিবারে বিভক্ত করেননি। তার সময়ে দেশে মুক্তিযোদ্ধা কোটা ছিলনা।
বঙ্গবন্ধু প্রবর্তিত সাড়ে সাত কোটি মুক্তিযোদ্ধা তত্ত্বটি বাংলাদেশে নেই। বর্তমানে তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা প্রায় দুই লাখ। এক লাখ তালিকা এসেছে, ভারতের লালবই থেকে। এ তালিকাভুক্তরা যুদ্ধের শুরুতে ভারতে প্রস্থান করেন এবং যুদ্ধকাল সেখানেই কাটান। যেমন মুজিব বাহিনীর সদস্য, মুজিবনগর সরকারের প্রতিনিধি ও ভারতে প্রশিক্ষণ গ্রহণকারী যোদ্ধাগণ। বাকী এক লাখ মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধকালে দেশেই ছিলেন। তারা ভিডিওতে উল্লেখিত কাদের সিদ্দিকীর বাহিনীর অনুরূপ। বিজয়ের পর তারা দেশে সন্ত্রাস ও হত্যাকান্ড শুরু করে। বঙ্গবন্ধু তাদের নির্দেশ দেন, অস্ত্র জমা দিয়ে চাকুরিতে যোগ দিতে। তারা মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়ে চাকুরিতে যোগ দেন। এদের সন্তান-সন্ততি ও নাতি-নাতনিরা আজও মুক্তিযোদ্ধা কোটাভুক্ত। এতে প্রতিয়মান হয় যে, শুধুমাত্র তালিকাভুক্ত দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধাই দেশ স্বাধীন করেছেন। অন্যরা স্বাধীনতা বিরোধী। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু ও সকল বন্দি, জাতীয় চার নেতা ও প্রায় এক কোটি শরণার্র্থী, ত্রিশ লাখ শহীদ ও দুই লাখ সম্ভ্রমহারা নারী তথা সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালী স্বাধীনতার স্বপক্ষ হয়েও মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত নয়।
অতএব, বাংলাদেশে প্রচলিত যুদ্ধাপরাধী ও মুক্তিযোদ্ধা তত্ত্ব বিকৃত। এতে প্রকৃত যোদ্ধাগণ স্বীকৃতি বঞ্চিত। আসল ঘাতক ও যুদ্ধাপরাধীরা পুরস্কৃত। এজন্য উচিত, এসব সংশোধন করে সঠিক চর্চা করা। ড. এম. এ ওয়াজেদসহ ‘৭১ এর সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালিকে মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি দিয়ে বর্তমান ষোল কোটি নাগরিককে তাদের পরিবারভুক্ত করা। প্রচলিত দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধা তালিকা ও কোটা বাতিল করা। ত্রিশ লাখ শহীদ ও দুই লাখ সম্ভ্রমহারা মা-বোনকে মুক্তিযোদ্ধা ঘোষণা করা। এদের আত্মদান ব্যতিত মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা ত্রিশ লাখ নয়, তিন কোটিরও বেশি হতো।
এ্যাডভোকেট, ঢাকা।
স্বাধীনতাযুদ্ধে তিন স্তরে যুদ্ধাপরাধ সংঘটিত হয়েছে। প্রথমত: ১৯৭১ এর ২৫ মার্চ রাতে পাকবাহিনী অন্যায়ভাবে আক্রমণ করে হাজারো বাঙ্গালি হত্যা করেছে। ঐ রাতে কোনো বাঙ্গালি তাদের সহযোগীতা করেনি। যুদ্ধের শুরুতে তারা একাই সকল অপরাধ করেছে। এ পাকবাহিনীই আসল যুদ্ধাপরাধী।
দ্বিতীয়ত: যুদ্ধের মধ্যভাগে পাকবাহিনী ও গেরিলা উভয়ে যুদ্ধাপরাধ করেছে। পাকবাহিনী যুদ্ধাপরাধী আর গেরিলারা মুক্তিযোদ্ধা সাব্যস্ত হয়েছে। যেমন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা সম্পাদিত ‘বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থের পৃষ্ঠা-৩১৫তে উল্লেখ রয়েছে, “১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা আক্রমণে ঢাকার নিজ বাড়িতে তিনি (মোনায়েম খান) নিহত হন।” একইভাবে লেখক মাহমুদ ইকবাল ‘বাংলাদেশের নির্বাচিত মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস’ গ্রন্থের ৬৭-৬৮ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেন, “১৪ই অক্টোবর ১৯৭১, মুক্তিযোদ্ধারা ঢাকার অদূরে সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার হাউজ উড়িয়ে দিয়েছে। বিভিন্ন স্থানে বৈদ্যুতিক তার কেটে দিয়েছে। কয়েকটি ওয়ারলেস সেট দখল করে নিয়েছে। বাঙ্গালী কোন ইঞ্জিনিয়ার ঐ পাওয়ার হাউস মেরামত করতে রাজি হয়নি। বাধ্য হয়ে পাক সেনা কর্মকর্তারা ঐ পাওয়ার হাউস মেরামতের জন্য পাকিস্তান থেকে ৫ জন ইঞ্জিনিয়ার নিয়া আসে। কিন্তু মুক্তিবাহিনী সেই ৫ জনের একজনকেও জীবিত অবস্থায় পাকিস্তান ফিরে যেতে দেয়নি।” যুদ্ধকালে এভাবে পাকবাহিনী ও গেরিলা সংঘর্ষে ত্রিশ লাখ বাঙ্গালী শহীদ হয়েছে এবং বিজয় চুড়ান্ত হয়েছে। এ শহীদগণ যোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়নি। হয়তো তারা স্বাধীনতা বিরোধী বা রাজাকার, আল-বদর ছিলেন। এজন্য তাদের হত্যাকান্ড যুদ্ধাপরাধ নয়।
তৃতীয়ত: বিজয়ের পরও জঘণ্য হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছে। পাকবাহিনীর অবর্তমানে মুক্তিবাহিনী তা করেছে। যেমন-বিজয়ের মাত্র তিনদিন পর তথা ১৯ ডিসেম্বর, ১৯৭১ ইং তারিখে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী ও তার বাহিনী প্রকাশ্য দিবালোকে চার ব্যক্তিকে হত্যা করে। (অনলাইনে ভিডিও দেখুন এখানে-যঃঃঢ়ং
https://www.youtube.com/watch?v=Ep8fNT4-A9g)|।)। স্বাধীনতার পর ঘাতকেরা এভাবে সারাদেশে হত্যাকান্ড করেছে। যেমন- সিরাজগঞ্জে আসাদুজ্জামান সিরাজী, সায়ফুদ্দিন খান মজলিশ, মাওলানা ওসমান গণি, ফেনীতে মুহম্মদ ইলিয়াস, মাওলানা আযহারুস সোবহান, সাতক্ষীরায় মাওলানা আব্দুস সাত্তার, ঢাকায় মাওলানা পীর দেওয়ান আলী এবং কক্সবাজারের পার্লামেন্টারিয়ান মৌলভী ফরিদ আহমদসহ অসংখ্য জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিকে ঘাতকেরা নির্মমভাবে হত্যা করেছে। লেখক নুরুজ্জামান মানিক উল্লেখ করেন, ‘৭১ সালের ডিসেম্বরে বিজয় লাভের পরেও বুদ্ধিজীবীদের নিধন অব্যাহত থাকে। দৃষ্টান্তস্বরূপ ড, মনসুর আলী (ডিসে ২১, ১৯৭১) চলচ্চিত্রকর জহির রায়হান (নিখোঁজ হন ৩০ জানু, ১৯৭২) এবং সাংবাদিক গোলাম রহমান (হত্যা জানু ১১, ১৯৭২)। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, ‘৭১ সালে বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ড শুরু হয়ে এখনো তা চলছে।”(নুরুজ্জামান মানিক, স্বাধীনতা যুদ্ধের অপর নায়কেরা, পৃষ্ঠা-৭৭, ঢাকাঃ শুদ্ধস্বর প্রকাশনী, ২০০৯)। তৎকালিন ভারত সরকার বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর বিরূদ্ধে মানবতা বিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি করে। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু তাকে ক্ষমা করে ‘বীর উত্তম’ খেতাব দেন। এভাবে স্বাধীনতা-পরবর্তী হত্যার দায়ও অন্যায়ভাবে অনুপস্থিত পাকবাহিনী ও তাদের দোসরদের ওপর বর্তায়।
অতএব স্পষ্ট হয় যে, মুক্তিযুদ্ধে দু’শ্রেণীর যুদ্ধাপরাধী ছিল। যুদ্ধের শুরুতে পাকবাহিনী এবং বিজয়ের পরে মুক্তিবাহিনী। এটাই যুদ্ধাপরাধী তত্ত্ব। কিন্তু বাংলাদেশে তা অপ্রচলিত। কারণ, বঙ্গবন্ধু নিজেই পাকি যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা করেছেন এবং বিজয়-পরবর্তী অপরাধীদের মুক্তিযোদ্ধা খেতাব দিয়েছেন। ফলে সম্পুর্ণ নিরপরাধ ও অসহায় যুদ্ধবিধ্বস্থ বাঙ্গালি নাগরিকগণ অন্যায়ভাবে যুদ্ধাপরাধী সাব্যস্ত হয়েছে। যেমন- অধ্যাপক গোলাম আজম, সাকা চৌধুরী, মাওলানা দেলোয়ার হোসেন সাঈদী ও অন্যান্য। তারা মোটেও যুদ্ধাপরাধী নয়। তারা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার স্বামী ড. এম. এ. ওয়াজেদ মিয়ার ন্যায় শুধু আত্মরক্ষার্থে যুদ্ধকালে পাকবাহিনীর বাধ্যানুগত ছিল।
বাংলাদেশে প্রচলিত মুক্তিযোদ্ধা তত্ত্ব প্রায় একই। যারা দেশের মুক্তির জন্য সংগ্রাম করেছেন, তারা মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধ শুরুর পূর্বেই বঙ্গবন্ধু মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচয় ও সংখ্যা নির্দেশ করেছেন। তিনি বলেছেন, “এদেশের সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালি তাদের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে দেশকে মুক্ত করে ছাড়বে ইনশাল্লাহ।’ বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্চের (১৯৭১) ভাষণে বলেন, ‘সাড়ে সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না।’ স্বাধীনতার পর ১০ জানুয়ারী, ১৯৭২ তারিখের ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেন, “যারা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন, যারা বর্বর বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন, তাদের আত্মার প্রতি আমি শ্রদ্ধা জানাই। লাখো মানুষের প্রাণদানের পর আজ আমার দেশ স্বাধীন হয়েছে। আজ আমার জীবনের স্বাদ পুর্ণ হয়েছে। বাংলাদেশ আজ স্বাধীন। বাংলার কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, বুদ্ধিজীবী ও পুলিশ জনতার প্রতি জানাই সালাম। তোমরা আমার সালাম নাও। আমার বাংলায় আজ এক বিরাট ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতা এসেছে। ৩০ লাখ লোক মারা গেছে। আপনারাই জীবন দিয়েছেন, কষ্ট করেছেন। এ স্বাধীনতা রক্ষার দ্বায়িত্ব আজ আপনাদেরই।”(ভিডিও দেখুন এখানে-
https://www.youtube.com/watch?v=GVSx5fbYN9M))। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু তার সকল ভাষণে ১৯৭১ এর সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালীকেই মুক্তিযোদ্ধা ঘোষণা করেছেন। এটাই মুক্তিযোদ্ধা তত্ত্ব। তিনি দেশবাসীকে মুক্তিযোদ্ধা, অমুক্তিযোদ্ধা বা শহীদ পরিবারে বিভক্ত করেননি। তার সময়ে দেশে মুক্তিযোদ্ধা কোটা ছিলনা।
বঙ্গবন্ধু প্রবর্তিত সাড়ে সাত কোটি মুক্তিযোদ্ধা তত্ত্বটি বাংলাদেশে নেই। বর্তমানে তালিকাভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা প্রায় দুই লাখ। এক লাখ তালিকা এসেছে, ভারতের লালবই থেকে। এ তালিকাভুক্তরা যুদ্ধের শুরুতে ভারতে প্রস্থান করেন এবং যুদ্ধকাল সেখানেই কাটান। যেমন মুজিব বাহিনীর সদস্য, মুজিবনগর সরকারের প্রতিনিধি ও ভারতে প্রশিক্ষণ গ্রহণকারী যোদ্ধাগণ। বাকী এক লাখ মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধকালে দেশেই ছিলেন। তারা ভিডিওতে উল্লেখিত কাদের সিদ্দিকীর বাহিনীর অনুরূপ। বিজয়ের পর তারা দেশে সন্ত্রাস ও হত্যাকান্ড শুরু করে। বঙ্গবন্ধু তাদের নির্দেশ দেন, অস্ত্র জমা দিয়ে চাকুরিতে যোগ দিতে। তারা মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়ে চাকুরিতে যোগ দেন। এদের সন্তান-সন্ততি ও নাতি-নাতনিরা আজও মুক্তিযোদ্ধা কোটাভুক্ত। এতে প্রতিয়মান হয় যে, শুধুমাত্র তালিকাভুক্ত দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধাই দেশ স্বাধীন করেছেন। অন্যরা স্বাধীনতা বিরোধী। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু ও সকল বন্দি, জাতীয় চার নেতা ও প্রায় এক কোটি শরণার্র্থী, ত্রিশ লাখ শহীদ ও দুই লাখ সম্ভ্রমহারা নারী তথা সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালী স্বাধীনতার স্বপক্ষ হয়েও মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত নয়।
অতএব, বাংলাদেশে প্রচলিত যুদ্ধাপরাধী ও মুক্তিযোদ্ধা তত্ত্ব বিকৃত। এতে প্রকৃত যোদ্ধাগণ স্বীকৃতি বঞ্চিত। আসল ঘাতক ও যুদ্ধাপরাধীরা পুরস্কৃত। এজন্য উচিত, এসব সংশোধন করে সঠিক চর্চা করা। ড. এম. এ ওয়াজেদসহ ‘৭১ এর সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালিকে মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি দিয়ে বর্তমান ষোল কোটি নাগরিককে তাদের পরিবারভুক্ত করা। প্রচলিত দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধা তালিকা ও কোটা বাতিল করা। ত্রিশ লাখ শহীদ ও দুই লাখ সম্ভ্রমহারা মা-বোনকে মুক্তিযোদ্ধা ঘোষণা করা। এদের আত্মদান ব্যতিত মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা ত্রিশ লাখ নয়, তিন কোটিরও বেশি হতো।
এ্যাডভোকেট, ঢাকা।
খবর বিভাগঃ
সম্পাদকীয়
সিরাজী এম.আর মোস্তাক এর লেখা
