রবিবার, আগস্ট ০৭, ২০১৬

সরকার যা করে তার সবই খারাপ!

একটি পুরানো গল্প দিয়ে শুরু করা যাক। এক ধনী লোকের ছেলে আর গরিবের ছেলে এক সঙ্গে লেখাপড়া করত। কিন্তু ধনীর ছেলেটি ঠিক মতো লেখাপড়া করত না, তাই পরীক্ষার পর দেখা গেল ধনীর ছেলে ফেল আর গরিবের ছেলে পাস।এতে ধনী লোকটির মানসম্মান থাকে না। আরেকজন এই চান্সে ধনী ব্যক্তিটিকে একটু খোঁচানোর সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইল না। সে গরীব ব্যক্তির ছেলেটির পাস করার রেফারেন্স দিয়ে বলে, শুনলাম অমুকের পোলায় বিরাট পাস দিছে। ধনী ব্যক্তিটি জবাব দেয়, পাস কইরা লাভ কী? চাকরি তো পাইব না। কিন্তু দেখা গেলো ছেলেটি ভালো একটা চাকরি পেল। এখন আবার ওই খোঁচানো স্বভাবের ব্যক্তিটি তার দৃষ্টি আকর্ষণ করলে ধনী লোকটি বলে, চাকরি পেলে লাভ হবে কি? বেতন তো পাইব না। কিন্তু দেখা গেল মাস শেষে ভালো বেতন পেল! এবার ওই ধনী ব্যক্তিটির মুখ থেকে শোনা গেল: বেতন পাইলে কী হবে? ওই টাকা কোনো কাজে লাগবে না! খবর-ইত্তেফাক

উল্লিখিত গল্পটিতে বাংলাদেশের মানুষের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে। আমাদের দেশে একশ্রেণির মানুষ আছে, যারা ভীষণ রকম সংশয়বাদী এবং যারা সব কিছুতেই একটা ‘কিন্তু’ খোঁজে। সবকিছুতে খুঁত ধরা বা সমালোচনা করাই তাদের স্বভাব।

আসলে আমরা খুবই সংশয়বাদী। অন্যের ব্যাপারে আমাদের খুব একটা আস্থা ও বিশ্বাস নেই। বিশেষ করে ‘দলীয় চেতনায় আচ্ছন্ন’ হলে তো কথাই নেই। আমাদের দেশে সংখ্যায় বিচার করলে অ্যান্টি-আওয়ামী লীগ মানুষের সংখ্যা এখনও বেশি। এই মানুষেরা সরকারের কোনো উদ্যোগকেই ভালো মনে করে না। সরকারের সব কাজেরই সমালোচনা করে। সব কাজে-সন্দেহ করে, অবিশ্বাস দেখায়! বিরোধী দল আন্দোলনের নামে লাগাতার সন্ত্রাস চালিয়ে বলেছে, ‘সরকার তাদের উপর কলঙ্ক লেপনের জন্য সন্ত্রাস সৃষ্টি করে দায় চাপাচ্ছে।’

সন্ত্রাস করতে গিয়ে হাতে-নাতে ধরা পড়লে বলে, এটা সাবোটাজ, সরকারের এজেন্টরা করেছে। সরকার যদি সন্ত্রাস এবং সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় তাহলে বলে, এটা বিরোধী দল দমন করার উদ্যোগ। সরকার চুপচাপ থাকলে বলে, সরকার সমর্থক সন্ত্রাসীরা সন্ত্রাস করছে বলে সরকার নীরব। আবার সরকার উদ্যোগী হলে বলে, এই তো বিরোধীদের শায়েস্তা করতে মাঠে নেমেছে! বিরোধী দল সমর্থক বুদ্ধিজীবীরাও তাদের হাওয়া দিয়ে যায়। বিরোধী দলের সন্ত্রাসকে তারা চোখে দেখে না। বরং সন্ত্রাসের পক্ষে সাফাই গেয়ে বলে, সরকার দমন-নির্যাতন করছে বলেই ওরা নৈরাজ্যমুখি।

এর আগে সরকার যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শুরু করেছিল, তখন তারা বিশ্বাস করেনি যে, এই বিচার শেষ পর্যন্ত হবে। তাই তখন বলেছে, বিচার করে দেখাক না! বিচার যখন হয়েছে, তখন বলেছে, রায় কার্যকর করুক, তখন দেখা যাবে। এর পর রায় কার্যকর হলে তারা সমস্বরে বলেছে: এই বিচার যথাযথ হয়নি। আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হয়নি। স্বচ্ছ হয়নি। এর পর যখন জঙ্গিদের উত্পাত শুরু হয়, তখন তারা বলেছিল-এগুলো সব বানানো ইস্যু। সরকার মূল সমস্যা থেকে জনগণের দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়ার জন্য এসব জঙ্গি-ইস্যু সৃষ্টি করেছে। গুলশানে জঙ্গিরা যখন ভয়াবহ হামলা চালাল, তখন তারা বলেছে, সরকার কেন আগে থাকতে টের পেল না। কেন জঙ্গিদের জ্যান্ত ধরতে পারল না। কেন রাতেই অভিযান পরিচালনা করা হলো না।

এরপর কল্যাণপুরে যখন নয় জঙ্গিকে খতম করা হলো, তখন বলা হলো, এরা জঙ্গি নয়। কেন তাদের হত্যা করা হলো, কেন গুলি তাদের পেছন দিক থেকে লেগেছে। কেন সরকার ‘সব দল মিলে’ জাতীয় ঐক্য করছে না।

দেখা যাচ্ছে সরকার যা কিছু করছে, তাতেই একদল মানুষ সমালোচনা করছে। সরকার কিছু না করলেও সমালোচনা করছে। সমালোচনা চলছেই। এদিকে সরকারও ‘কানে তুলো’ দেবার নীতি গ্রহণ করেছে। সরকার তাদের নিজস্ব স্বার্থ-সুবিধা আর বুঝ অনুযায়ী চলছে। কারো সমালোচনাকে তোয়াক্কা করছে না।

আমেরিকান লেখক, দার্শনিক এলবার্ট হাবার্ড-এর একটা বিখ্যাত উক্তি আছে: To avoid criticism do nothing, say nothing, be nothing. অর্থাত্, সমালোচনা এড়াতে চাইলে কিছু করো না, বলো না, হইও না। যার জীবনে কোনো অর্জন নেই, যে পৃথিবী ধ্বংস হলো কি গড়লো এটা নিয়ে মাথা ঘামায় না তাকে নিয়ে কেউ সমালোচনা করার তেমন কিছু খুঁজে পায় না। যখনি আপনি কিছু করতে যাবেন, কিছু একটা বলতে যাবেন, কিছু একটা হতে যাবেন, পৃথিবী দুইভাগ হয়ে যাবে। একদল আপনাকে প্রশংসা করবে, আপনি আরো এগিয়ে যান সেই কামনা করবে, আর আরেক দল আপনার মুণ্ডপাত করবে।

পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো মানুষটির বিরুদ্ধেও অনেক সমালোচনা হয়। অবশ্য ‘সবচেয়ে ভালো মানুষ’ বলে আদৌ কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই। আপনার কাছে যিনি অনেক ভালো মানুষ, অনেক শ্রদ্ধার পাত্র, অন্যের কাছে তিনি হয়তো ততোটাই বাজে লোক।

আমরা মানুষেরা আমাদের পরিবেশের দ্বারা তৈরি। আমরা যে পরিবেশে বড় হয়েছি, আমাদের বাবা-মা আমাদের যে শিক্ষা আর মূল্যবোধ শিখিয়েছেন, আমাদের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমরা যা শিখেছি, চারদিকের পরিচিত আত্মীয়-স্বজন-বন্ধুবান্ধব থেকে আমরা যে জ্ঞান লাভ করেছি, বই-পত্র-টেলিভিশন-সিনেমা ইত্যাদি থেকে আমরা সাংস্কৃতিক চেতনা পাচ্ছি, সে সব ব্যবহার করে আমরা আমাদের চারপাশকে বিচার করি, মূল্যায়ন করি। প্রত্যেক মানুষের বড় হয়ে ওঠা, শিক্ষার বিষয়বস্তু একে অন্যের চেয়ে ভিন্ন।

সমাজে অনেক মেধাবী এবং গুণী মানুষ আছে যারা শুধু উটকো সমালোচনার ভয়ে নিজের নিরাপদ বলয়ের বাইরে বের হন না। ‘কী দরকার ঝামেলা বাড়িয়ে, ভালোই তো আছি’-এটা হচ্ছে তাদের চিন্তা। তাদেরকে দোষ দিয়ে কোনো লাভ নেই। যোগাযোগ মাধ্যমের উন্নতির সঙ্গে-সঙ্গে আমাদের সমালোচনার বারুদও অনেক তাড়াতাড়ি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আপনি হয়তো কোনো গ্রামের ছেলেমেয়েদের জন্যে একটা স্কুল করে দিলেন। দুইটা পত্রিকায় আপনাকে নিয়ে বিশাল প্রশংসাসূচক লেখা ছাপা হতে না হতেই অন্য তিনটা পত্রিকায় আপনার নামে যাবতীয় কুত্সা ছড়ানো হবে। পুঁজিবাদী, সাম্রাজ্যবাদী, কর্পোরেট শক্তির ইন্ধনে আপনি যে স্কুলের নাম করে তলে তলে ‘বিশাল ষড়যন্ত্র’ করে বসে আছেন সেটা নিয়ে অনেক কেচ্ছা-কাহিনী ছাপানো হবে। অথচ আপনি শুধু ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার একটা ব্যবস্থা করতে চেয়েছেন, এই যা।

আমাদের দেশে এটা প্রচলিত আছে যে, এখানে একজন মানুষের ক্ষতি করা অনেক সহজ কিন্তু কারো উপকার করা অনেক ঝামেলার ব্যাপার। আমরা বাংলাদেশের মানুষেরা চারদিকের নেগেটিভ জিনিসে এতোটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি যে এখন আর মানুষের ভালোত্বে বিশ্বাস করি না সহজে। কেউ যে বিনা কারণে ভালো হতে পারে, স্বার্থহীন হতে পারে এটা বিশ্বাস করতে আমাদের কষ্ট হয়।

আমরা কেনো উন্নত হতে পারছি না? আমাদের কেনো মনে হয় চারদিকের সবাই খারাপ, সবাই ষড়যন্ত্রকারী, চক্রান্তকারী? যে সব মানুষের নিজের ওপর শ্রদ্ধা কম তারা বেশি কুসংস্কারে ভোগে। সমালোচনায় মুখর হয়। অর্থাত্ যে সব মানুষ আসলে নিজের যোগ্যতা নিয়ে খুশি নয়, নিজের উপর নিজের খুব বেশি শ্রদ্ধা নেই, আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভোগে, তারা সাধারণত মানুষকে নিয়ে বেশি নেগেটিভ কথা বলে। অন্যের ভালো কিছু দেখলে তারা সহজে খুশি হতে পারে না, তাদের প্রথম চিন্তাটি হয় নেগেটিভ। মানুষকে সহজে বিশ্বাস করতে পারে না এরা।

যারা সমালোচনার ভয়ে বসে না থেকে নিজের মনের কথা বলে ফেলে, দেশের জন্যে কিছু একটা করার চেষ্টা করে ফেলে, নিজে কিছু একটা হতে চেষ্টা করে তাদের নিয়ে প্রয়াত আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট একটা যুগান্তকারী কথা বলেছিলেন: ‘যারা সমালোচনা করছে তারা গুরুত্বপূর্ণ না। যারা আঙ্গুল উঁচু করে দেখিয়ে দিচ্ছে শক্ত মানুষটি কিভাবে হোঁচট খাচ্ছে তারাও গুরুত্বপূর্ণ না। যারা বাইরে থেকে উপদেশ দিয়ে বেড়াচ্ছে কিভাবে কাজটা আরো ভালোভাবে করা যেতো ওরাও গুরুত্বপূর্ণ না। সব কৃতিত্ব হচ্ছে তার যিনি আসলে সত্যিকার মাঠে নেমে যুদ্ধ করছেন।

যার মুখ এবং দেহ ধুলো, ঘামে এবং রক্তে রঞ্জিত। যিনি জীবন দিয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছেন। যিনি বারবার ভুল করছেন এবং জয়ের একেবারে শেষ মাথায় এসে পৌঁছাচ্ছেন। যিনি চরম উত্সাহ, আগ্রহ, সাধনা নিয়ে নিজেকে একটা অর্থপূর্ণ কাজে নিয়োজিত করেছেন। যিনি বিজয়ী হওয়ার কৃতিত্বের কথা জানেন, কিংবা যদি জয়ী হতে নাও পারেন, অন্ততপক্ষে বীরের মতো চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। অতএব, তার স্থান কখনোই সেই সব ভীরু এবং দুর্বল মানুষের সাথে হবে না যারা জয় কিংবা পরাজয় কোনোটার স্বাদ কখনো পায়নি।’

সমালোচনা আমরা অবশ্যই করব, কিন্তু শুধু শুধু সমালোচনা করে বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা করে আমরা কারও সত্ ও আন্তরিক উদ্যোগে যেন বাগড়া না দিই! নিজে কিছু করতে না পারি নাই করলাম, কিন্তু যে কিছু একটা করছে, খামোখা কেন তার পথকে কণ্টকিত করব?

লেখক :বিশ্লেষক

শেয়ার করুন