ছবিটি মাধবকুন্ডের এক নির্জন বনানীর ছায়াঘেরা তরুতলে তোলা। রোদ তেমন প্রখর না হলেও ফরহাদ সাহেবের কুঞ্চিত ভ্রুযুগলের কারণ ভিন্নতর। পারিবারিক এক অবকাশ যাপনের উদ্দেশ্য নিয়ে ফরহাদ সাহেব এ ভ্রমণের আয়োজন করেন। পরিবারের আকার ও আয়তন স্বাস্থবান হওয়ায় মাইক্রোবাসের পেট অনাকাঙ্খিত ভাবে ফুলে ওঠে। ছানাপোনাদের হই হট্টগোলে ফরহাদ সাহেব ত্যাক্ত বিরক্ত। যদিও এ সফরের উদ্দেশ্য ছিল বাচ্চাদের নিয়ে ঘুরে বেড়ানো, সফরের উদ্দেশ্যকে জল করে দিয়ে ছানাপোনাদের গ্যাং ফরহাদ সাহেবের রক্তচক্ষুর তোপের মুখে পড়ে দূরবর্তী নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের বড় মামাকে ফেলে রেখেই তারা নিজেদের মতো করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাই ফরহাদ সাহেবের সাথে তার একমাত্র ছবি তোলার সঙ্গী হয়ে একান্ত বাধ্যগত অবস্থায় পাশে দাঁড়ানো আমি। শিশুদের জন্য আয়োজিত ওই সফর ফরহাদ সাহেবের জন্য সত্যিই শিক্ষামূলক।
শিশুদের ব্যাপারে ফরহাদ সাহেব মনের দিক থেকে উদারপন্থী ডেমোক্রেট হলেও তার আচার আচরণে কট্টরপন্থী রিপাবলিকানদের মতো। বিশেষত শিশুদের শৃঙ্খলাবোধের বিষয়ে তিনি খুবই সচেতন। ফরহাদ সাহেবের বড় বোন তার পাঁচ বছর বয়সী শিশু কন্যাকে ভাত খায়ানোর চেষ্টা করছেন। যথারীতি মেয়ে ভাত খেতে নারাজ। মাও নাছোড়বান্দা। ফলাফল জোরাজোরি। ফরহাদ সাহেব এ অবস্থায় শিশুটিকে খাওয়ানোর দায়িত্ব নিজ হাতে তুলে নিলেন। প্রথমেই তিনি দেশের আপাময় দরিদ্র শিশুদের খেতে না পারার কষ্টটি ভাগ্নির সামনে তুলে ধরলেন। এই প্রসঙ্গে ভাগ্নিকে জয়নুল আবেদিনের দুর্ভিক্ষের ছবির করুন চিত্রের বর্ণনা দিলেন। তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন যে খাবার অতি অমূল্য। নষ্ট করার জিনিস নয়। কিন্তু এতে তেমন কোনো কাজ হলো না। ভাগ্নির মুখে ভাত তুলে দিতেই ভাগ্নি যথারীতি থু করে সে ভাত ফেলে দিলো। ফরহাদ সাহেবের ধৈর্য্যের তখন বর্ষার মুখ খোলা ফারাক্কা বাঁধের মতো অবস্থা। তিনি ভাগ্নির গালে কোষে এক চড় বসিয়ে দিলেন। ভাগ্নির চোখের জল আর কান্নার আওয়াজে প্রলয়ংকারী বন্যা বয়ে গেলো। এর সাথে বিপদ সীমার আরো উপর দিয়ে প্রবাহিত হলো শিশুর মায়ের কান্না। শিশু ও শিশুমাতার কান্নায় ফরহাদ সাহেব পুরো পরিবারের কাছে শিশু নির্যাতনের দায়ে অভিযুক্ত হয়ে গেলেন। শিশুদের খাওয়ানোর প্রচেষ্টার তার এখানেই ইস্তফা।
ঈদের দিন সকাল বেলা ভাগ্নেদেরকে সাথে নিয়ে নামাজ পড়তে গেছেন ফরহাদ সাহেব। মুষলধারে বৃষ্টি আর কাদা পানিতে ডুবে গেছে ছোট্ট মফস্বল শহরটা। বাড়ি ফিরে আসতেও তাই দেরি হয়েছে ঢের। জুবুথুবু কাঁধ ভেজা অবস্থায় ফরহাদ সাহেব শহরের জট পাকিয়ে যাওয়া পয়ঃ নিষ্কাশন ব্যবস্থার ওপর বক্তব্য রাখছেন। সেই সাথে জোরালো সমালোচনাও চলছে রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের। এমন উন্নয়নমূলক গুরু গম্ভীর কথাবার্তার মাঝে ভাগ্নেদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট জন হঠাৎ করে বলে বসলো যে, তাদের বড় মামা এতক্ষন পাশের বাড়ির আন্টিদের সাথে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করছিলেন। তাই তাদের ফিরতে দেরি হয়েছে। বৃষ্টি বেশ আগেই থেমে গিয়েছিলো। ভাগ্নের এ ধরণের হাটে হাঁড়ি ভাঙা মন্তব্যে তাদের বড় মামা দিশেহারা এবং গভীর ভাবে বিব্রত। শিশুকুলের প্রতি এরপরও তার আর কোনো সহানুভূতি থাকার প্রশ্নই ওঠে না। ফরহাদ সাহেবের উত্তপ্ত উন্নয়নমূলক সব বক্তব্যকে এক কলসী জল ঢেলে ভিজিয়ে দেয়ার জন্য অমন একখানা প্রলয়ংকারী শিশুই যথেষ্ট।
ফরহাদ সাহেব বাড়ির বাচ্চাদের জন্য কুয়ালালামপুর থেকে চকলেট কিনে নিয়ে যান। কিন্তু এ চকলেট খাবার ভয়ে বাচ্চারা দূরে দূরে পালিয়ে বেড়ায়। এর কারণ হলো- "মামা তিতা চকলেট আনে"। ফরহাদ সাহেবের ভাষায় ওগুলো- "বেস্ট কোয়ালিটির অরিজিনাল চকলেট"। কিন্তু কে শোনে কার কথা ! এ ধরণের কালো রঙের তেতো চকলেট খাওয়ানোর জন্য এদেরকে জোর করে টেনে হিঁচড়ে খাটের তোলা থেকে বের করে আনতে হয়।
এখনকার বাচ্চারা একেকজন যেন একেকটি সাজানো গোছানো শো পিস্। বাহারি জামা জুতো, কাঁধে রঙিন স্কুল ব্যাগ। এরা যাওয়া আসাও করে দামী দামী সব গাড়িতে। এদের জগতের সাথে ফরহাদ সাহেব তার নিজের শৈশবকে কোথাও মেলাতে পারেন না। ফরহাদ সাহেবের শৈশব কেটেছে গ্রামের স্কুলে। মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় এ ভাইটির বইপত্রগুলো গুছিয়ে তোলা থাকতো ছোট ভাইবোনদের পড়ার জন্য। বড় ভাইয়ের স্কুলের শার্ট তোলা থাকতো ছোট ভাইয়ের জন্য। বাবার কিনে দেয়া একটা লাটিম সময় ভাগ করে সব ভাইবোনদের হাতের পাতার ওপর ঘুরতো। ভালো একটা শার্ট, দামী এক জোড়া জুতো কিংবা সংখ্যার ছাপ ওঠা একটা ক্যাসিও ঘড়ি বাবার কাছ থেকে পাওয়ার জন্য ফরহাদ সাহেবকে বছরের পর বছর অপেক্ষা করে থাকতে হতো। বছরকার তুলে রাখা লেপের উষ্ণতায় ছোট ভাই বোনদেরকে বুকে জড়িয়ে হিমশীতল টিনের চালের ঘরে ফরহাদ সাহেবের অনেকগুলো পৌষ আর মাঘ মাস কেটে গেছে। মায়ের হাতে বোনা উলের একটা নকশী তোলা সোয়েটার ঘুরে ঘুরে সব ভাইবোনদের গায়েই চাপতো। বিদেশী চকলেট, দামী খেলনা গাড়ি, বাহারি জীবন- এ সবকিছুই ছিল ফরহাদ সাহেবের কাছে অধরা। তাই আজকালকার শিশুরা ফরহাদ সাহেবকে তেমন একটা বুঝতে পারে না। তারা বুঝতেই পারে না যে তাদের এই ঝলমলে বিলাসী পরিপাটি জীবনটা ফরহাদ সাহেবের কাছে কতটা স্বপ্নের মতো লাগে। তাদের এই হাসিখুশি মুখগুলো দেখার জন্য ফরহাদ সাহেবের মতো আরো অনেক বাবারাই জীবনের অনেকটা পথ কী কষ্ট করে পারি দিচ্ছেন। অল্প কটা টাকা বাঁচানোর জন্য দুপুরের ঝাঁঝালো রোদ মাথায় নিয়ে বাবারা কেন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যায়, বাবারা কেন কখনো মুরগির রানের টুকরাটা খেতে পছন্দ করে না, কেন বাবাদের ঈদের দিন কোনো নতুন জামা পড়া হয়না- এসব আর আজকালকার শিশুদের কখনো বোঝা হয়ে ওঠেনা।
সংসারের আঁটসাঁট বাজেটের মধ্যেও খুব কায়দা কানুন করে টাকা বাঁচিয়ে ফরহাদ সাহেব জৈষ্ঠ্য মাসের এক ঝুড়ি পাকা হিমসাগর আম কিনে ফেলেছেন। বাড়ির খুব কাছে বাজারের মোড় ঘেঁষে সারি বাঁধা বস্তি বাড়িগুলোর ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের হাতে একটা করে আম দিচ্ছেন তিনি। মধু মাসের এ মধুফল হয়তো এ বাচ্চাগুলো এখনো চেখেই দেখেনি। ফরহাদ সাহেবের কড়া ধমকের মুখে তারা লাইন করে দাঁড়িয়েছে। অনেকটা মিলিটারী কায়দায় আম হাতে নিয়ে হেঁটে চলে যাচ্ছে তারা। খালি গা, খালি পা, ধুলো ময়লা মাখা মুখখানায় চকচকে চোখদুটো আমের লোভে লোভাতুর। এদের কেউ কেউ ফরহাদ সাহেবকে আমি হাতে নিয়ে ইংরেজিতে সৌজন্যমূলক ধন্যবাদও জ্ঞাপন করে যাচ্ছে। মধুমাস এদের মুখের হাসিতে আজ সত্যিই মধুময় হয়ে ধরা দিয়েছে। ফরহাদ সাহেব কঠিন গলায় তাদের লাইন সোজা করে দিচ্ছেন। এ দৃশ্যের কোনো ছবি তিনি তুলে রাখেননি। ফরহাদ সাহেবের জলে ঝাপসা হয়ে আসা চোখ দুটোর সামনে পৃথিবীর কোনো ক্যামেরাই হয়তো ঠিকমতো কাজ করবে না।

0 coment rios:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন