শুক্রবার, জুন ০৯, ২০১৭

অদ্ভুত জঙ্গি আতঙ্কে বাংলাদেশ সিরাজী এম আর মোস্তাক

জঙ্গি কি অদ্ভুত হয়? বাংলাদেশে তাই হয়েছে। দেশের সর্বত্র জঙ্গি বিরোধী কর্মসূচি পালিত হচ্ছে। যেন জঙ্গি এক মহামারি। ভারত উপ-মহাদেশের কয়েকটি দেশ ছাড়া পৃথিবীর কোথাও জঙ্গি নেই। সবাই চেনে টেরোরিষ্ট, তালেবান, আলকায়েদা, আই এস, মিলিট্যান্ট ইত্যাদি। ‘জঙ্গি’ ফারসি শব্দ। মানে যোদ্ধা। যিনি জঙ্গে লড়াই করেন, তিনি জঙ্গি। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালে এদেশ ছিল জঙ্গ বা যুদ্ধক্ষেত্র। পাক হানাদার বাহিনী এদেশের সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালিকে জঙ্গি নাম দিয়েছিল। তারা সবাইকে জঙ্গি হিসেবে সন্দেহ করতো। তা থেকে কৃষক, শ্রমিক এমনকি নারীদেরও রেহাই ছিলনা। হানাদাররা নির্মমভাবে ত্রিশ লাখ জঙ্গি হত্যা ও দুই লাখ নারীর সম্ভ্রম কেড়েছিল। বর্তমানে প্রচলিত দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধা তালিকা ও কোটায় উক্ত ত্রিশ লাখ জঙ্গি শহীদেরা নেই। তারা মুক্তিযোদ্ধা নয়। তারা ছিল অদ্ভুত জঙ্গি। স্বাধীনতার প্রায় অর্ধশত বছর পর বাংলাদেশে আবারো জঙ্গি হত্যা শুরু হয়েছে। এরা কেমন অদ্ভুত জঙ্গি, আসুন দেখা যাক।
এটি লেখার সময় ঘটল অদ্ভুত জঙ্গি ঘটনা। দৈনিক যুগান্তর ই-পত্রিকার উদ্ধৃতি দ্রষ্টব্য- “সাভার মডেল থানার সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার মাহাবুবুর রহমান বলেন, শুক্রবার গভীর রাতে যুবদল নেতা শাহা আলম নয়নকে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের নিজ বাসা থেকে আটক করে সাভার মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এস, আই) তম্ময় ও আহসান। পরে শনিবার ভোর রাতে সাভারের বিরুলিয়ায় কৃষিবিদ নার্সারির পাশে পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে আহত হন তিনি। পরে পুলিশ তাকে আশংকাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে সাভার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করলে কর্তব্যরত পুলিশ তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনাস্থল থেকে একটি অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে।” (দৈনিক যুগান্তর ই-পত্রিকা. তারিখ-০১/১০/২০১৬ইং)।
উল্লেখিত ঘটনায় স্পষ্ট হয় যে, পুলিশ আটক শাহা আলম নয়নকে নিয়ে অভিযানে গিয়ে একটি বন্দুকযুদ্ধ মোকাবেলা করেন। যাদের সাথে পুলিশের গোলাগুলি হয়, তাদের কেউই আহত, নিহত বা আটক হয়নি। উল্টো পুলিশের নিরাপত্তায় থাকা ব্যক্তিটি প্রাণ হারিয়েছে। এতে প্রমাণ হয় যে, দেশে অনেক শক্তিশালী জঙ্গি আছে। তারা পুলিশকে হটিয়ে নিরাপত্তায় থাকা ব্যক্তিকে হত্যা করতে পারে। মাদারিপুরে নিহত জঙ্গি ফাহিম ঠিক এভাবেই রিমান্ডে ও হাতকড়া পরা অবস্থায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে প্রাণ হারায়। পুলিশ বাহিনী প্রতিনিয়ত সন্ত্রাসী জঙ্গিগোষ্ঠির সাথে বন্দুকযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন আর একে একে অসংখ্য অসহায় বন্দি নাগরিকের প্রাণ হারাচ্ছেন। যেমন, দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় “আইন ও সালিশ কেন্দ্রের” প্রতিবেদনে উল্লেখ হয়েছে যে, মাত্র নয় মাসে হেফাজতে ও ক্রসফায়ারে নিহত ১৫০ জন। (দৈনিক প্রথম আলো, তারিখ-০১/১০/২০১৬ ইং, পৃষ্ঠা-৪)। আইন শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে অবশ্যই এর দায় বহন করতে হবে।
গত ১ জুলাই, ২০১৬ তারিখে গুলশান হলি আর্টিজান রেস্তোরায় একইরকম জঙ্গি হামলা হয়েছিল। তাতে দুজন পুলিশ কর্মকর্তাসহ আটাশজন নিহত ও অর্ধশত আহত হয়েছিল। নিহতদের বেশিরভাগ ছিল বিদেশি নাগরিক। তাই বিষয়টি বিশ্বব্যাপী প্রচার হয়েছিল। মাত্র ৬/৮ জঙ্গির কাছে দেশের লক্ষাধিক প্রশাসন লান্থিত হয়েছিল। ঘটনা ছিল এরকম- জঙ্গিরা আক্রমণের পরপরই পুলিশ পাল্টা অভিযান চালায়। জঙ্গিদের আক্রমণে পুলিশবাহিনী হতাহতের শিকার হয় ও পিছু হটে। পরে পুলিশ ও বিজিবি সমন্বয়ে শক্ত পাহাড়া গড়ে তোলে। তারা মিডিয়া কর্মীদেরকে তথ্য সংগ্রহে নিষেধাজ্ঞা দেয়। তারপর সম্মিলিত সামরিক অভিযানের লক্ষ্যে সকাল পর্যন্ত বিরতি ঘোষণা করে। এসময় হোটেলের ভেতরে জঙ্গিরাও অদ্ভুত নিরবতা দেখায়। তারা নিরবে বিশজনকে কুপিয়ে হত্যা করে। অবশেষে জঙ্গিরা রক্তসিক্ত মারণাস্ত্র হাতে হোটেলের রক্তাক্ত মেঝেতে লাশের বিদঘুটে গন্ধেই নিস্তব্ধ রাত কাটায়। পরদিন সকাল ৭.৪০-এ সামরিক অভিযান ‘অপারেশন থান্ডারবোল্ড’ শুরু হলে, আবারো প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ব্যাপক গোলাগুলি শেষে তারা সেনাবাহিনীর হাতে প্রাণ হারায়। সফল অপারেশন শেষে সেনাবাহিনী ছাব্বিশটি লাশ উদ্ধার করে। প্রশ্ন হচ্ছে, কথিত সম্ভ্রান্ত ঘরের জঙ্গিরা দীর্ঘ আটঘন্টা মারণাস্ত্র নিয়ে বিদঘুটে পরিবেশে চুপটি মেরে থাকলো কি করে? জঙ্গিদের এমন অদ্ভুত আচরন কিভাবে সম্ভব?
পরদিন জঙ্গিদের ছবি প্রকাশ হয়। উল্লেখ হয় যে, তারা মাদ্রাসা-মক্তব বা ইসলাম পড়–য়া নয়। তারা ইংরেজি মিডিয়াতে পড়–য়া, সম্ভ্রান্ত ঘরের সন্তান। তারা বহু আগেই পরিবার থেকে নির্খোজ ছিল। অর্থাৎ তারা কি নিহত শাহা আলম নয়নের মতো আগেই আটক হয়েছিল? উক্ত ঘটনার পর দেশের সাধারণ মানুষের মাঝে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। সবাই জঙ্গি বিরোধী সমাবেশে যোগ দেয়। এমনকি বিএনপি-জামাতও জঙ্গিবিরোধী বুলি আওড়ায়। ফলাফল শুন্যই থেকে যায়। এখনও দেশের কেউ নিরাপদ নয়। আসলে এগুলো জঙ্গিবাদ নয়, অযথা আতঙ্ক সৃষ্টি করাই এর লক্ষ্য। এজন্য দরকার-
৭১ এর লাখো শহীদের পরিবার,
গর্জে ওঠো আরেক বার।
এদেশ নয় কারো পিতার,
ষোল কোটি বাংলাদেশী সবার।
তবেই ভয়-আতঙ্ক জঙ্গিবাদ,
হবেই হবে নিপাত।
এ্যাডভোকেট, ঢাকা।mrmostak786@gmail.com.


শেয়ার করুন