শুক্রবার, জুন ০৯, ২০১৭

ভিশন মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ - সিরাজী এম আর মোস্তাক

বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলসমূহ মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদের বিষয়ে স্বার্থ হাসিলে ব্যস্ত। এ নিয়ে কারো যুগান্তকারী ভিশন নেই। বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের বুলি আছে, শুধু স্বার্থের বশে। কে কতজন মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদকে তালিকাভুক্ত করবে, কতো বাজেট-বরাদ্দ দেবে আর নিজের দল ভারি করবে, এটাই তাদের ভিশন। এতে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও চেতনার লেশমাত্র নেই।
বাঙ্গালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর সকল ভাষণে সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালিকে মুক্তিযোদ্ধা ঘোষণা করেছেন। ত্রিশ লাখ শহীদ ও দুই লাখ সম্ভ্রমহারা নারীর সংখ্যা সুনির্দিষ্ট করেছেন। মাত্র ৬৭৬ যোদ্ধাকে বিশেষ খেতাব দিয়েছেন। সাতজন শহীদকে বীরশ্রেষ্ঠ খেতাব দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু নিজেও বন্দী মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দিয়েছেন। তাই তাঁর সময়ে মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা পার্থক্য ছিলনা। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ভাতা বা কোটাসুবিধা ছিলনা। তিনি দেশের সবাইকে মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদের স্বজন ঘোষণা করেছেন। এটাই বঙ্গবন্ধুর মুক্তিযোাদ্ধা ও শহীদ ভিশন।
আজ মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদের বিষয়টি ভিন্ন। বঙ্গবন্ধু ঘোষিত সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালি মুক্তিযোদ্ধা নয়। মাত্র দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত। যেন এ দুই লাখ যোদ্ধাই দেশ স্বাধীন করেছেন। মুক্তিযুদ্ধে অন্য কারো ভূমিকা নেই। তালিকাভুক্ত যোদ্ধাগণ মোটা অংকের ভাতা পাচ্ছেন। তাদের সন্তান-সন্ততি ও নাতি-নাতনিরা মুক্তিযোদ্ধা কোটায় বিশেষ সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে। আর তালিকা-বহির্ভূত দেশের ষোল কোটি নাগরিক মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত হয়েছে। যেন তারা অমুক্তিযোদ্ধা বা যুদ্ধাপরাধী তালিকাভুক্ত। এভাবে দেশের মানুষ এখন দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধা ও ষোলকোটি অমুক্তিযোদ্ধা তালিকায় বিভক্ত। বঙ্গবন্ধু ঘোষিত ত্রিশ লাখ শহীদ ও দুই লাখ সম্ভ্রমহারা মা-বোনের সংখ্যাটি শুধু মুখে মুখে প্রচারিত। তাদেরও তালিকা বা স্বীকৃতি নেই। তারা মুক্তিযোদ্ধা নাকি অমুক্তিযোদ্ধা, তা স্পষ্ট নয়। তারা মুক্তিযোদ্ধা হলে, প্রচলিত দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধা তালিকা অবৈধ। কারণ পৃথিবীর কোথাও শহীদ, বন্দী, আহত, পঙ্গু ও গোয়েন্দা হিসেবে সহযোগীদেরকে যোদ্ধা তালিকা থেকে বাদ দেয়ার নজির নেই। শুধু বাংলাদেশেই দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধা ছাড়া ত্রিশ লাখ শহীদের স্বীকৃতি নেই। তবুও এতে রাজনৈতিক দলসমূহের ভিশন নেই।
বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও ঘোষণা অনুসারে মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ বিষয়ে ভিশন থাকা উচিত। সাতজন বীরশ্রেষ্ঠ শহীদের ন্যায়, ত্রিশ লাখ শহীদ ও দুই লাখ সম্ভ্রমহারা মা-বোনকে সর্বস্তরের মুক্তিযোদ্ধা ঘোষণা করা উচিত। বঙ্গবন্ধুর ন্যায় প্রায় পাঁচ লাখ যুদ্ধবন্দীকে মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি দেয়া উচিত। বর্তমান তালিকাভুক্ত দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধা নিয়ে বিতর্ক করা অনুচিত। অন্তত এক লাখ ভারতীয় যোদ্ধাকে মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি দেয়া উচিত। কারণ, তাদের প্রচেষ্টা ছাড়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা অসম্ভব ছিল। কমপক্ষে এ চল্লিশ লাখ মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ নিয়ে একটি ভিশন রাখা উচিত।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলসমূহের মধ্যে কারা এ ভিশন গ্রহণ করে, তা দেখার বিষয়। যারা বঙ্গবন্ধুকে মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের ঘোষক মানে, তারাই এটি গ্রহণ করবে। তারা বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা অনুসারে দেশের আপামর জনতাকে ১৯৭১ এর সাড়ে সাত কোটি মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদের সন্তান স্বীকৃতি দেবে। 
শিক্ষানবিশ আইনজীবী, ঢাকা।mrmostak786@gmail.com.


শেয়ার করুন