ডলার মুনাফা অর্জনের দাবি করেছে। অথচ ২০২২ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ সিভিল এভিয়েশন অথরিটি এবং রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন পদ্মা অয়েলের কাছে বিমানের প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের বিল বকেয়া রয়েছে, যার কোনো হিসাব সেখানে ছিল না। এই অপরিশোধিত বিলগুলো হিসাব করলে বিমান বাংলাদেশ লাভের পরিবর্তে ব্যাপক লোকসানে রয়েছে।
তৃতীয়ত, বিশেষজ্ঞরা প্রশ্ন তুলেছেন এয়ারবাস কেনার সিদ্ধান্ত নিয়ে। কারণ বাংলাদেশের বহরে থাকা বেশিরভাগ বিমানই বোয়িং কোম্পানির। নতুন আরেকটি কোম্পানির বিমান চালানোর মতো যথেষ্ট প্রশিক্ষিত এবং অভিজ্ঞ পাইলট বাংলাদেশের নেই। প্রশিক্ষিত রক্ষণাবেক্ষণ কর্মীর অভাব রয়েছে। পাইলট এবং কেবিন ক্রুদের জন্য নতুন টাইপ-রেটিং সার্টিফিকেশন প্রয়োজন হবে, যা অনেক ব্যয়বহুল। সবচেয়ে হাস্যকর বিষয় হলো, এয়ারবাস থেকে দুটি ডেডিকেটেড কার্গো বিমান কেনার সিদ্ধান্ত। এয়ার অপারেটর সার্টিফিকেট (এওসি) অডিট রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২২ সালে বিমান বাংলাদেশের ৪,৯৮,০০০ টন কার্গো পরিবহনের ক্ষমতা ছিল। যেখানে পরিবহন করা হয়েছে মাত্র ২৮,০০০ টন পণ্য, যা মোট ক্ষমতার মাত্র ৬ শতাংশ। ডেডিকেটেড পণ্যবাহী উড়োজাহাজ কেন অপচয় সে বিষয়ে বাংলাদেশের ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে বিশেষজ্ঞরা তিনটি কারণ উল্লেখ করেছেন।
প্রথমত, বাংলাদেশে এয়ার কার্গোর চাহিদা অনেকটা মৌসুমী। বছরে মাত্র ৫-৬ মাস এয়ার কার্গোর চাহিদা থাকে। সুতরাং, অফ-সিজনে উড়োজাহাজগুলো অলস বসে থাকতে হবে। দ্বিতীয়ত, ৫-৬ মাস বাংলাদেশ বা এশিয়া থেকে ইউরোপ/উত্তর আমেরিকা অভিমুখে পণ্য যাবে, কিন্তু আসার সময় তাদের ফিরতে হবে খালি। সুতরাং এটা কোনোভাবেই লাভজনক হবে না। ২০২৩ সালের প্রথম ৯ মাসে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১৯ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটেছে, ডলার সংকটে জ্বালানি, সার এবং মৌলিক পণ্য আমদানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ অবস্থায়ও অপ্রয়োজনীয় বিমান ক্রয় দেশের জন্য ক্ষতিকর একটি সিদ্ধান্ত। সুতরাং ১০টি এয়ারবাস কেনার সিদ্ধান্ত কোনো প্রকার বাণিজ্যিক প্রয়োজনের পরিবর্তে রাজনৈতিক সুবিধার দ্বারাই অনুপ্রাণিত বলে মনে করা যেতে পারে।
মূল্যায়নের আগেই ক্রয়ের সিদ্ধান্ত:
কোনো টেন্ডার ছাড়াই এবং প্রযুক্তি ও আর্থিক মূল্যায়ন না করেই এয়ারবাস থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি স্বাক্ষর করেছে সরকার। ডেইলি স্টার বেশকিছু ঘটনার কথা জানিয়েছে: ৩ মে ২০১৩ তারিখে বিমানের পরিচালনা বোর্ড উড়োজাহাজের প্রয়োজনীয়তা অনুসারে ‘‘আটটি পর্যন্ত রোলস-রয়েস চালিত A350-900/1000 বিমান (‘A350 প্যাক্স এয়ারক্রাফ্ট’) বা ‘অন্য যে কোনো উপযুক্ত বিমা’ (প্রশস্ত বা সরু) ক্রয় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’’
দুই দিনের মধ্যে ৫ মে ২০২৩ তারিখে, প্রধানমন্ত্রী শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা যুক্তরাজ্যের ব্যবসা ও বাণিজ্যবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী লর্ড ডমিনিক জনসনের সঙ্গে একটি যৌথ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তি অনুসারে ‘বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স এয়ারবাস কোম্পানি থেকে 8টি রোলস-রয়েস চালিত A350-900/1000 বিমান এবং পণ্যবাহী দুটি এয়ারবাস (আরও আলোচনা সাপেক্ষে) ক্রয় করা হয়েছে।
ডেইলি স্টার বিমানের অভ্যন্তরীণ ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার নিয়েছে। যারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, বাংলাদেশ যখন এয়ারবাস কেনার ঘোষণা দেয় তখন মূল্যায়ন কমিটি মাত্র কয়েকটি নিষ্পত্তিহীন সভা করেছে এবং বিমান ‘রাষ্ট্রের কাছে কোনো প্রতিবেদন পেশ করার ধারেকাছেও ছিল না।’ ঘটনার প্রকৃতি এবং ক্রমানুযায়ী এই ইঙ্গিত দেয় যে, সরকার পরিবর্তন হলে চুক্তিটি আইনি পর্যালোচনার মুখে পড়বে।
জিয়া হাসান : বাংলাদেশি লেখক এবং অর্থনীতিবিদ। তিনি আলজাজিরা, দ্য স্ট্রেইট টাইমস, দ্য হিন্দু এবং স্ক্রল ইনসহ আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি এবং অর্থনীতির ওপর প্রবন্ধ লিখে থাকেন।
খবর বিভাগঃ
সম্পাদকীয়

0 coment rios:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন