বুধবার, মার্চ ২৩, ২০১৬

আদি বাংলার ইতিহাস (প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্ব ৯৯

আদি বাংলার ইতিহাস
(প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্ব ৯৯
উপনিষদ
বেদের বিভিন্ন জায়গায় জ্ঞানমুলক কিছু স্তোত্র/শ্লোক/ঋক আছে। এগুলোকে একত্রে জ্ঞানকাণ্ড বা উপনিষদ বলা হয়। উপনিষদ খ্রিষ্টপূর্ব ৫ম শতক থেকে খ্রিষ্টপূর্ব ৪র্থ শতকের মধ্যে লিপিবদ্ধ বলে অনুমান করা হয়। জ্ঞানকাণ্ডের বিষয়বস্তু ছাড়া বেদের আরও দুটো কাণ্ড আছে, যথা- সংহিতা ও ব্রাহ্মণ। সংহিতা ও ব্রাহ্মণে যাগ-যজ্ঞ প্রভৃতির বর্ণনা ও প্রণালী, উদ্দেশ্য, ফলশ্র“তি ও এদের দার্শনিক ব্যাখ্যা আছে। উপনিষদে এসব কিছু নেই। এতে আছে অধ্যাত্ম জ্ঞান যার ওপর হিন্দুধর্ম ও সংস্কৃতি দাঁড়িয়ে আছে বলে দাবি করা হয়।
‘উপনিষদ’ শব্দের অর্থ নিয়ে মতভেদ আছে। বেদের প্রান্তে বেদকে আশ্রয় করে গড়ে উঠেছে বলে একে ‘উপনিষদ’ বলা হয়। কারও কারও মতে ‘উপনিষদ’ অর্থ অবশ্য রহস্যাবৃত জ্ঞান। আবার কেউ কেউ বলেন গুরুর নিকট বসে দার্শনিক বিদ্যা আয়ত্ব করা হতো বলে এর নাম ‘উপনিষদ’।৭৫৮
বেদের অঙ্গ হিসেবে গণ্য ও গণ্য হতে পারে এমন উপনিষদের সংখ্যা সর্বমোট মাত্র ১২টি। এর মধ্যে বেদের অঙ্গীভূত উপনিষদ ৮টি। ঐতিহ্য অনুসারে বেদের সাথে সংযুক্ত উপনিষদ আরও ৪টি। নিন্মে এর তালিকা দেয়া হলো: বেদেও অঙ্গীভূত- ১. ঈশ, ২. ঐতরেয়, ৩. কৌষীতকি, ৪. তৈত্তিরীয়, ৫. বৃহদারণ্যক, ৬. কেন, ৭. ছান্দোগ্য, ৮. প্রশ্ন; ঐতিহ্য অনুসারে- ১. কঠ, ২. শ্বেতাশ্বতর, ৩. মুণ্ডক, ৪. মাণ্ডক্য।
উপরোক্ত ১২টি উপনিষদের মধ্যে ছয়টি প্রাচীনতম বলে বিবেচিত। এগুলো হচ্ছে; ঐতরেয়, বৃহদারণ্যক, ছান্দোগ্য, তৈত্তিরীয়, কৌষীতকি এবং কেন। উলেখ্য, বেদান্ত দর্শনের আদিরূপ এই উপনিষদগুলোতেই পাওয়া যায়। অপরদিকে বাকি ছয়টি উপনিষদ, যথা- কঠ, শ্বেতাশ্বতর, ঈশ, মুণ্ডক, মাণ্ডক্য ও প্রশ্ন ইত্যাদিকে বেদান্তদর্শন বাদে সংখ্যা ও যোগ দর্শনের প্রভাব পরিলক্ষিত হয়।
মনুসংহিতা:
বেদ ও উপনিষদের যুগে ব্রাহ্মণ ধর্মের সর্বে সর্বা হওয়া সত্ত্বেও তাদের স্বার্থ ও মর্যাদা সংরক্ষণে কোন বিধানগ্রন্থ ছিল না। এতে সমাজে ঐশ্বর্যবান ব্রাহ্মণদের দেখা যেমন পাওয়া যায়, তেমনি নিঃস্ব হত-দরিদ্র ব্রাহ্মণের কষ্টের কথাও জানা যায়। যেমন বাসদেব ক্ষুধার জ্বালায় বলছেন, ‘ক্ষুধার চরম তাড়নায় আমি কুকুরের নাড়িভুড়ি সিদ্ধ করে খেয়েছি, দেবতাদের মধ্যে কেউ আমাকে সাহায্য করতে আসেনি, আমার স্ত্রীকে আমি পতিতা হতে দেখেছি তারপরও ইন্দ্র আমাকে উদ্ধার করেনি।’৭৫৯ এ ধরনের অনেক ব্রাহ্মণদের অনেক দুঃখ কষ্টের কথা, যেমন- কোন রাজা কর্তৃক ব্রাহ্মণের স্ত্রী হরণ, ব্রাহ্মণের শারীরিক যাতনা, প্রভৃতি ঋগে¦দে বর্ণিত আছে। এই অবস্থা থেকে সমাজ হিসেবে ব্রাহ্মণদের পরিত্রাণের জন্য অর্থাৎ ব্রাহ্মণদের অর্থনৈতিক অধিকার, সামাজিক শৃঙ্খলা, ধর্মীয় প্রশাসনকে সুসংহত করার জন্য এবং একটি বিধান গ্রন্থের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। তখন রচিত হয় ‘মনুসংহিতা’ যার রচনাকাল খ্রিষ্টপূর্ব ২ শতাব্দী। মনুসংহিতা ব্রাহ্মণ্য ধর্মের একটি বিধান গ্রন্থ। এতে সর্বমোট ২,৬৮৪টি শ্লোক আছে। এই শ্লোকগুলোতে বর্ণিত গুরুত্বপূর্ণ বিধানগুলো হচ্ছে: ক. পৃথিবীর উৎপত্তি, খ. বিভিন্ন সংস্কারের নিয়ম, গ. ব্রতাচারণ, ঘ. বিবাহের নিয়মাবলী, ঙ. অপরাধের দণ্ডবিধি, চ. শ্রাদ্ধের নিয়ম, ছ. আহার্যবিধি, জ. বিভিন্ন বর্ণের কর্তব্য, ঝ. বর্ণাশ্রমবিধি, ঞ. স্ত্রী-পুরুষের পারস্পরিক কর্তব্য, ট. সম্পত্তি বণ্টন-বিধি, ঠ. সংকর বর্ণের বিবরণ, ড. জাতিধর্ম, ঢ. কুলধর্ম, ণ. ব্রাহ্মণের অধিকার ও করণীয় এবং ত. রাজা-প্রজার পারস্পরিক কর্তব্য ইত্যাদি। মোটামুটিভাবে বলা যায় বৈদিক ধর্মাবলম্বীদের দৈনন্দিন, সামাজিক ও ধর্মীয় কর্তব্যের অলঙ্খনীয় বিধি-বিধান নিয়েই ‘মনুস্মৃতি’;
মনুর ধর্মটি চার বর্ণভিত্তিক ধর্ম। মনুর মোট ২,৬৮৪ শ্লোক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় আর্যদের দেবতা ব্রহ্মার পুত্র মনু তার ধর্মের নাম দিয়েছেন ‘সনাতম ধর্ম’।
এই ধর্মে তিনি মানুষকে চার ভাগে ভাগ করেছেন, যথা- ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র। এর প্রথম তিনটি দ্বিজ। এই কাঠামো দ্বারা তিনি ব্রাহ্মণকে প্রকৃতপক্ষে দেবতার আসনে বসিয়ে একটি স্থায়ী বৈষম্যপূর্ণ ধর্ম প্রতিষ্ঠার প্রয়াস পেয়েছেন বলে অনেকে মনে করেন।৭৬০
প্রতিটি বিধানের কেন্দ্রবিন্দুতে ব্রাহ্মণ। তার স্বার্থকে রক্ষণ, সংহতকরণ ও নিরঙ্কুশ করাই হচ্ছে মনুর একমাত্র উদ্দেশ্য। এর জন্য যত ধরনের নিষ্ঠুরতা অবলম্বন করা দরকার মনু তা অবলীলাক্রমে করেছেন।
ব্রাহ্মণগণও সুকৌশলে ধর্মের উপর নিজেদের আধিপত্য চিরস্থায়ী করার শিক্ষা ও প্রয়োগ পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন। নবশিক্ষার্থীকে বিদ্যালাভের জন্য কোন এক নির্দিষ্ট অরণ্যে কোন এক নির্দিষ্ট গুরুর কাছে যেতে হতো। বারো বছর বা তারও অধিককাল তাকে গুরুর গো-পালন, খাদ্য আহরণ ইত্যাদি কাজ করতে হতো এবং বিনিময়ে গুরু তাকে শাস্ত্র শিক্ষা দিতো। শিক্ষার প্রথম ধাপ ছিল বেদ নির্ভুল উচ্চারণে মুখস্ত করতে শিখা এবং তারপর বিস্তারিত ব্যাখ্যা জানা। স্মৃতিতে ধারণ করার জন্য শাস্ত্রটি ব্রাহ্মণের অধিকারে রয়ে গেল এবং সাধারণ মানুষ, দ্বিজ হলেও, শাস্ত্রের কিছুই জানতে পারেনি। এভাবেই ব্রাহ্মণ সাধারণের মাঝে ধর্মীয় প্রতিপত্তি অর্জন করে ক্রমে ক্রমে তারা হয়ে গেল এক অতুলনীয় সর্বোচ্চ যাজক শ্রেণী ও ক্ষমতাবান সম্প্রদায়। এ পদ্ধতিতেই তারা বহু শতাব্দী যাবত ধর্মকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। শুরুই করেছেন চার বর্ণের অলৌকিক ও অবিশ্বাস্য জন্ম কাহিনী দিয়ে। তাঁর মতে, মুখ, বাহু, উরু ও পদ থেকে যথাক্রমে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রের সৃষ্টি।
ব্রাহ্মণের উৎপত্তি
ব্রাহ্মণদের জন্মের মধ্যেই তাদের জন্মসূত্রে শেষ্ঠত্বের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু কিভাবে তাদের উৎপত্তি হলো এ বিষয়ে ইতিহাস আজও পরিষ্কার সাক্ষ্য দিতে পারেনি। কারণ, আর্যরা যখন প্র ম এদেশে আসে তখন প্রয়োজনীয় যাগযজ্ঞ সম্পাদনের দায়িত্বটা ছিল পরিবার প্রধান আর গোষ্ঠী প্রধানের দায়িত্ব ছিল জমি ও পশুপালের উর্বরতা বৃদ্ধি এবং তার অধীনস্থ গোষ্ঠীর মানুষদের কল্যাণ সাধন। প্রাপ্ত বয়স্ক প্রত্যেকটি মানুষ অগ্নিদেবতার পূজা করতো। আর্য সমাজে ধর্মীয় যাজক, যাদের বলা হতো অথর্বন, থাকলেও তাদের সাহায্য ছাড়াই তারা নিজেরাই তাদের অগ্নিবদেবতার পূজা করতে পারতো। কিন্তু এই অথর্বন শব্দের পরিবর্তে ব্রাহ্মণ শব্দ ব্যবহারের পর ব্রাহ্মণ সমাজ এক পেশাদার পুরোহিত সমাজে পরিণত হয়। ডি.ডি. কোসাম্বি মনে করেন, ব্রাহ্মণ শব্দটি ভারতীয় সৃষ্টি।৭৬১ অর্থাৎ ভারতে স্থায়ীভাবে বসবাসকারী আর্যদের থেকে তাদের স্বার্থেই এই জনগোষ্ঠী হয়তো একদিন প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। তবে শুধু আর্যগোষ্ঠী থেকেই ব্রাহ্মণ সৃষ্টি হয়েছিল, এমন নয়। অনেক অনার্য ব্রাহ্মণও ছিল। তাদের চিহ্নিত করার প্রথম ও প্রাথমিক সূত্র ছিল আর্য-ব্রাহ্মণদের নামের শেষে তাদের গোত্রের নাম থাকতো আর অনার্য ব্রাহ্মণদের নামের শেষে তাদের মায়ের নাম থাকতো। তবে আর্য ব্রাহ্মণরা পরে গোষ্ঠীর নামের পরিবর্তে গোষ্ঠীর কোন ঋষির নাম যুক্ত করে পরিচয় দিতে আরম্ভ করেন যা এখনও প্রচলিত আছে।৭৬২
ব্রাহ্মণ সম্বন্ধে মনু
ক) স্রষ্টা ব্রাহ্মণদেরকে মুখ থেকে সৃষ্টি করেছেন (৩১নং শোক)।
খ) স্থাবর জঙ্গমাদির মধ্যে প্রাণী শ্রেষ্ঠ, প্রাণীদের মধ্যে বুদ্ধিজীবীরা শ্রেষ্ঠ, বুদ্ধিমানদের মধ্যে মানুষ এবং মানুষের মধ্যে
ব্রাহ্মণ শ্রেষ্ঠ (৯৬)।
গ) জাতমাত্রই ব্রাহ্মণ পৃথিবীতে সকল লোক অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ হন এবং সকল সৃষ্ট পদার্থের ধর্মসমূহ রক্ষার জন্য তিনিই প্রভু
(৯৯)।
ঘ) পৃথিবীতে যা কিছু আছে, তার সবই ব্রাহ্মণদের সম্পত্তি। শ্রেষ্ঠত্ব ও আভিজাত্য হেতু ব্রাহ্মণ সবই পাওয়ার যোগ্য।
(১০০) এবং
ঙ) ব্রাহ্মণ নিজের অন্নই ভক্ষণ করেন, নিজের বস্ত্র পরিধান করেন এবং নিজের দ্রব্য দান করেন। অন্য লোকেরা যা ভোগ
করে তা ব্রাহ্মণের দয়া হেতু করে (১০০)।
শূদ্র সম্বন্ধে মনু:
ক) শূদ্র বা দাসদের নিজস্ব কোনো সম্পত্তি রাখার অধিকার নেই।
খ) দাস ও শূদ্রের ধন ব্রাহ্মণ অবাধে নিজের কাজে প্রয়োগ করবেন।
গ) শূদ্র অর্থ সঞ্চয় করতে পারবে না। কারণ তার সম্পদ থাকলে সে গর্বভরে ব্রাহ্মণের উপর অত্যাচার করতে পারে।
ঘ) প্রভু কর্তৃক পরিত্যাক্ত বস্ত্র, ছত্র, পাদুকা ও তোষক প্রভৃতি শূদ্র ব্যবহার করবে।
ঙ) প্রভুর উচ্ছিষ্ট তার ভক্ষ্য।
চ) দাস বৃত্তি থেকে শূদ্রের কোনো মুক্তি নেই।
ছ) যজ্ঞের কোনো দ্রব্য শূদ্র পাবে না।
জ) ব্রাহ্মণের প্রতিবাদ বা নিন্দা করলে শূদ্রের জিহ্বাছেদন বিধেয়।
ঝ) ব্রাহ্মণ শূদ্রের নিন্দা করলে যৎসামান্য জরিমানা দেয়।
ঞ) ব্রাহ্মণ কর্তৃক শূদ্র হত্যা সামান্য পাপ। এইরূপ হত্যা পেঁচা, নকুল ও বিড়াল ইত্যাদি হত্যার সমান।
ট) শূদ্র কর্তৃক ব্রাহ্মণ হত্যার বিচার মৃত্যুদণ্ড।
ঠ) শূদ্র সত্য কথা বলছে কিনা তার প্রমাণ হিসেবে তাকে দিব্যের আশ্রয় নিতে হবে। এতে তাকে জলন্ত অঙ্গারের ওপর দিয়ে হাঁটতে হয় অথবা জলে ডুবিয়ে রাখা হয়। অদগ্ধ অবস্থায় অথবা জলমগ্ন না হয়ে ফিরলে তার কথা সত্য বলে বিবেচিত হবে।
ড) দ্বিজকে (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য) প্রহার করলে শূদ্রের হাত কেটে ফেলা বিধেয়।
ঢ) ব্রাহ্মণের সঙ্গে একাসনে বসলে তার কটিদেশে তপ্তলৌহদ্বারা চিহ্ন এঁকে তাকে নির্বাসিত করা হবে অথবা তার নিতম্ব এমনভাবে ছেদন করা হবে যাতে তার মৃত্যু হয়।
ণ) দ্বিজের ন্যায় উপবীত বা অন্যান্য চিহ্ন ধারণ করলে শূদ্রের মৃত্যুদণ্ড বিধেয়।
ত) যে পথ দিয়ে উচ্চবর্ণের লোকেরা যাতায়াত করেন, সেই পথে শূদ্রের মৃতদেহও বহন করা যাবে না।
নারী সম্পর্কে মনু:
ক) স্ত্রীলোক পতিসেবা করবে। তার স্বাধীন কোনো সত্ত্বা নেই;
খ) নারীকে কুমারী অবস্থায় পিতা, যৌবনে স্বামী, বার্ধক্যে পুত্র রক্ষা করবে;
গ) স্ত্রীলোকের পৃথক কোনো যজ্ঞ, ব্রত বা উপবাসের বিধান নেই;
ঘ) স্ত্রীলোকের সাক্ষী হওয়ার বা স্বাধীনভাবে ঋণ করার অধিকার নেই;
ঙ) বিধবা সাধ্বী নারী ব্রহ্মচর্য পালন করবে;
ব্রাহ্মণের কর্তব্য সম্পর্কে মনু:
ক) ব্রাহ্মণদের কাজ অধ্যাপনা, অধ্যয়ন, যজন, যাজন, দান ও প্রতিগ্রহ;
খ) ব্রাহ্মণের নাম হবে শুভসূচক (শুভ শর্মা) ক্ষত্রিয়ের বলসূচক (বলবর্মা), বৈশ্যেও ধনসূচক (বসুভুতি) ও শূদ্রের
নিন্দাবাচক (দীনদাস);
গ) কাঠের হাতী, চামড়ার হরিণ ও বেদ না জানা ব্রাহ্মণ সমান;
ঘ) ব্রাহ্মণের গৃহে ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রকে অতিথি বলা হয় না;
ঙ) ব্রাহ্মণ দয়াপরবশ হয়ে গৃহে অতিথিরূপে উপস্থিত বৈশ্য ও শূদ্রকে ভৃত্যদের ভোজনকালে ভোজন করাবেন;
চ) ব্রাহ্মণ অনিন্দিত কর্মদ্বারা শরীরকে কষ্ট না দিয়ে শুধু প্রাণ ধারণের জন্য অর্থ সঞ্চয় করবেন;
ছ) ব্রাহ্মণ লৌকিক বিষয়ে শূদ্রকে উপদেশ, উচ্ছিষ্ট, হবির শেষ ও ধর্মোপদেশ দেবেন না। তাকে ব্রত সম্বন্ধে উপদেশ
দেবেন না;
জ) রসুন, গাঁজর, পেঁয়াজ, ছত্রাক ও অপবিত্র স্থানে উৎপন্ন দ্রব্য খাওয়া ব্রাহ্মণের জন্য নিষিদ্ধ;
ঝ) ব্রাহ্মণেরা শূদ্র রাজার রাজ্যে বাস করবেন না;৭৬৩
বিবর্তনশীল বৈদিক ধর্ম
ঈশ্বর এক তাঁর রূপ অনেক’ এই বিশ্বাসের মধ্যে ব্রাহ্মণ্যধর্মে ঈশ্বর ভাবনার একটা পরিচয় পাওয়া যায়। আবার এ বিশ্বাসেই লুক্কায়িত আছে এই ধর্মের বিবর্তনের ইতিহাসও। এ বিবর্তন বহুকাল ধরে ঘটেছে। প্র মাবস্থায় আর্যদের কল্পনায় ‘একেশ্বরের’ ধারণা ছিল। এ অঞ্চলের আদি অধিবাসীদের (ভূমিপুত্র) বিশ্বাস ছিল বহু দেব-দেবীতে। এর সাথে যোগ হয় বহিরাগত আর্যদের বেদে বর্ণিত নিজস্ব দেবতামণ্ডলী যাদের বৈশিষ্ট্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্নতর। ফলে উদ্ভূত হয় দুই শ্রেণীর দেবতামণ্ডলী। একদিকে ভূমিপুত্রদের দেব-দেবী ও অন্যদিকে আর্যদের দেবতামণ্ডলী মধ্যযুগে লোকায়ত দেব-দেবীকেও এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়।৭৬৪ এই পর্যায়ে শিব বস্তুত মহাদেব বা মহেশ্বর রূপে আবির্ভূত হন। বলা যায় মহেশ্বর রূপ একেশ্বরেরই রূপ; কিন্তু একেশ্বর ধারণার সাথে অন্যান্য দেব-দেবীকে সম্পর্কিত রাখারও প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। এরই ফলস্বরূপ পাওয়া যায় ‘ঈশ্বর এক তাঁর রূপ অনেক’ এ ধারণা।
বৈদিক ধর্মের সঙ্গে স্থানীয় অধিবাসীদের ধর্মের সমন্বয় শুধু চিন্তা-চেতনায় নয়, আচার অনুষ্ঠানগত বাহ্যিক উপকরণে ও রূপায়ণে সমন্বয় ঘটার পরিচয় পাওয়া যায়। পূর্বেই উলেখ করা হয়েছে যে, এদেশবাসীর ধর্মে নরবলি প্রথা ছিল যা আর্যদের কাছে পরিচিত ছিল না। এদেশে বৈদিক ধর্ম প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও নরবলি প্রথা ব্রাহ্মণগণ রহিত করতে পারেনি, তবে ব্রাহ্মণগণ এর পৃষ্ঠপোষক ছিল না। স্যার জে. উডরোফ এর মতে এবং তন্ত্রশাস্ত্রের ‘কালিকল্পলতা’ অনুসারে একমাত্র রাজাই পারে নরবলি দিতে (রাজা নরবলিম দাদ্যন’ ন্যান্যোপি পরামশ্বরী), অর্থাৎ কোন ব্রাহ্মণ নরবলিতে অংশগ্রহণ করবে না (ব্রাহ্মণ নরবলি দানে নাধিকারSmile। কিন্তু এদেশবাসীর কাছে শুধু নরবলি নয়, রক্তের রং পূজার নৈবধ্যে প্রাধান্য পেতো। কিন্তু ব্রাহ্মণদের কাছে নরবলি তো দূরের কথা, পূজায় লাল ফুল বা লাল রং ব্যবহার করা তাদের কাছে পছন্দনীয় ছিল না।৭৬৫ এদেশের ভূমিপুত্রদের বিশিষ্ট দেবতা গণেশের গায়ের রং ছিল লাল, কিন্তু বৈদিক ধর্মে স্বীকৃতি লাভের পর গণেশের লাল রং পরিত্যাগ করা হয়।
রজত রায়ের মতে (‘হিন্দু মুসলমান’ প্রবন্ধ; দেশ: সংখ্যা: ১১.১২.৯৯) চতুর্দশ শতাব্দীর পুর্বে হিন্দুদের ধর্মের কোনো নাম ছিল না। তখন ‘হিন্দু’ শব্দটি ছিল জাতিবাচক, ধর্মবাচক নয়। কোনো নাম না পেয়ে হিন্দুরা নিজেদেরকে ‘সনাতন’ ধর্মাবলম্বী বলে পরিচয় দিতে শুরু করে; ফারসিতে সিন্ধুর উচ্চারণ ‘হিন্দু’। ফারসি সাহিত্য ও ইতিহাসে তাই সিন্ধুনদের অববাহিকায় বসবাসকারী জনগোষ্ঠীকে ‘হিন্দু’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। ৭৬৬
সুকুমারী ভট্টচার্য হিন্দুরা দেবতামন্ডলীকে দুটো ভাগে ভাগ করেছেন। এ দুটো ভাগ হচ্ছে: (ক) শিব ও শিব সংশিষ্ট দেবতামন্ডলী এবং (খ) বিষ্ণু ও বিষ্ণু সংশিষ্ট দেবতামন্ডলী। প্রথোমোক্ত ভাগে আছেন: মাতৃদেবীগণ, যম ও যমী, কার্তিক, গণেশ, রুদ্র-শিব ও উমা-অদিতি-লক্ষী ইত্যাদি। দ্বিতীয় ভাগে আছেন: সূর্য, সাবিত্রী, মিত্র, ভগ, আশ্বিন, ইন্দ্র ও কৃষ্ণ ইত্যাদি। এই দুই শ্রেণীর দেবতামন্ডলীকে পৌরাণিক কালে (খ্রিষ্টপূর্ব ২০০ থেকে খ্রিষ্টাব্দ ৬৯০) নানা পুরাণ কাহিনীর মাধ্যমে একটি সমন্বিত রূপ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এতেই গড়ে উঠে হিন্দুর ‘ত্রি-দেবতা’ অর্থাৎ ‘ত্রিমূর্তি’ ধারণা; এই ত্রিমূর্তির তিন দেবতা হচ্ছেন-ব্রহ্ম, বিষ্ণু ও মহেশ্বর। স্পষ্টতই বোঝা যায় এই ত্রিমূর্তির মধ্যে যেমন স্থান পেয়েছে আর্যদের দেবতা ব্রহ্ম ও বিষ্ণু, তেমনি স্থান পয়েছে ভূমিপুত্রদের দেবতা শিব। এটি নিশ্চিতভাবেই একটা ধর্মীয় সমঝোতার ফল; এই ধর্মীয় সমঝোতার ক্ষেত্র অনেক প্রসারিত। যেমন গণেশপুরাণ থেকে জানা যায় যে, গণেশ দুর্গার পুত্র কিন্তু শিবের নন।
৭৫৮ ব্যাসদেব: ঋগ্বেদ, যজুর্বেদ, সামবেদ ও অথর্ববেদ (বাংলা অনুবাদ)।
৭৫৯ ঋগ্বেদ: ৪, ১৯, ১৩।
৭৬০ আর.এম. দেবনাথ- সিন্ধু থেকে হিন্দু
৭৬১ দামোদর ধর্মানন্দ কোসাম্বি: ভারত ইতিহাস চর্চার ভূমিকা, পৃ- ৮৫।
৭৬২ দামোদর ধর্মানন্দ কোসাম্বি: ভারত ইতিহাস চর্চার ভূমিকা, পৃ- ৮৩।
৭৬৩ মনুসহিতা (সুরেশ চন্দ্র বন্দোপাধ্যায় কর্তৃক অনুবাদ)।
৭৬৩ মনুসহিতা (সুরেশ চন্দ্র বন্দোপাধ্যায় কর্তৃক অনুবাদ)।
৭৬৪ অনড়বদাশঙ্কর রায়: সংস্কৃতির বিবর্তন।
৭৬৫ দামোদর ধর্মানন্দ কোসাম্বি: ভারত ইতিহাস চর্চার ভূমিকা, পৃ- ৩৫।
৭৬৬ রজত রায়: ‘দেশ’- সহস্রায়ন সংখ্যা (প্রবন্ধ)।
চলবে

শেয়ার করুন