বুধবার, মার্চ ২৩, ২০১৬

আদি বাংলার ইতিহাস (প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্ব ১০০

আদি বাংলার ইতিহাস
(প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্ব ১০০
শিবের পরিবারে গণেশের অন্তর্ভুক্তির দ্বারা বোঝা যায় একটি স্বতন্ত্র ধর্ম বিশ্বাসের সঙ্গে সমঝোতা করা হয়েছে। একই ঘটনা পাওয়া যায় শিবের ষাঁড় নন্দীর ক্ষেত্রেও। ডি.ডি. কোসাম্বির মতে, কয়েক হাজার বছর পূর্বে (নব্যপ্রস্তর যুগে) আদিম মানুষেরা যখন শিবের নামই শুনেনি, তখনও নন্দীপূজার প্রচলন ছিল। লিঙ্গ পুরাণ থেকে জানা যায় যে, শিবের বাহন এই ষাঁড় প্রকৃত পক্ষে ছিল তাঁর টোটেম। অর্থাৎ এধরনের বিভিন্ন দেব-দেবীর উত্থান-পতন বিভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাসের সমন্বয়ের ফল; আদিবাসীদের কোনো কোনো দেব-দেবীর গায়ের লাল রং মুছে ফেললেও লাল চিহ্নি একেবারে মুছে যায়নি। কোনো কোনো মূর্তির কপালে লাল রং লাগনো হয় এবং তা বিবাহিতা নারীদেরও চিহ্ন। কালিকা পুরাণে (৫০০- ১০০০ খ্রিষ্টাব্দে রচিত, পরিচ্ছদ ৭১, পংক্তি- ১৮, ১৯, ১১৪-১৬ দ্রষ্টব্য) বর্নিত আছে যে, রক্ত উৎসর্গ করলেই দেবী তৃপ্ত হন এবং নররক্তেই দেবীর বেশি তৃপ্তি। অর্থাৎ আদিম ধর্মবিশ্বাসকে ত্যাগ না করে বৈদিক ধর্মীয় বিশ্বাসের আড়ালে অবস্থান করতে দেয়া হয়েছে। তেমনিভাবে ‘যখনই কোন অঞ্চল উৎপাদন বা বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে বিকশিত হয়েছে বা তেমন কোন কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তখনই সেই অঞ্চলের দেবতারা ব্রাহ্মণ্য দেবতাদের আত্মীয়, অনুচর, অবতার বা ভিন্নরূপ হিসেবে গৃহীত হয়েছেন।’৭৬৭ এভাবেই প্রস্তর যুগের, নবোপলীয় যুগের এবং পরবর্তীকালের আদিবাসীদের অনেক ধর্মীয় বিশ্বাস, আচার-অনুষ্ঠানে ও দেব-দেবী বৈদিক ধর্মে স্থান পেয়েছে এবং যা স্থান পায়নি বা বৈদিক ধর্মের স্বীকৃতি পায়নি তেমন অনেক অনুষ্ঠান, দেব-দেবী ও ধর্মীয় বিশ্বাস আজও বাংলাদেশে সগৌরবে বেঁচে আছে।
জাতিগত সংকরায়নের সঙ্গে সঙ্গে ধর্মীয় সংকরায়ন অনেক হয়েছে। বৈদিক ধর্মের দেবতার সঙ্গে স্থানীয় অধিবাসীদের দেবতার আপোষের মাধ্যমেই শিবকে সর্বশ্রেষ্ঠ দেবতার মর্যাদা দেয়া হয়। ভারতের সকল জনপদের সঙ্গে বাংলার অধিবাসীদের কাছে তা গ্রহণযোগ্য হলেও বাংলার মাতৃতান্ত্রিক জনগোষ্ঠী পুরোপুরি সন্তুষ্ট হতে পারেনি। তারা শিবের স্ত্রী পার্বতীকে দুর্গাতে (সংরক্ষিত শক্তির মালিক বা অধিপতি) রূপান্তরিত করে দুর্গার পুত্র গণেশকেও শিবের পরিবারভুক্ত করে নেয়া হয় যদিও গণেশ শিবের সন্তান ছিলেন না।৭৬৮ এখানে গণেশ শিব পরিবারের অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় দেবী হিসেবে মাতৃরূপিনী দুর্গার অন্তর্ভুক্তির সময়কাল নির্ণয়ে কিছুটা হলেও সহজতর হয়েছে। কারণ, যে সামাজিক পরিবেশ ও সময়কালে কুন্তি, তারা, মান্দারিনী, পুণ্যবতী নারীর মর্যাদা পেয়েছে সে সময়েই দেবী হিসেবে দুর্গার অধিষ্ঠান। কাজেই সময়কাল অনুমান করা যেতে পারে খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতক থেকে প্রথম শতকের মধ্যবর্তী সময়কালে বাংলার অধিবাসীদের কাছে শিবের মর্যাদা অতিক্রম করে দুর্গা মর্যাদা হল বাংলার সর্বশ্রেষ্ঠ দেবী ও মাতৃরাগিনী শক্তির উৎস হিসেবে আর দুর্গাপূজা হল মাতৃতান্ত্রিক জাতির শ্রেষ্ঠ উৎসব।
শিবের মূর্তি ও প্রাসঙ্গিক পূজার অনুষ্ঠানে আদিবাসীদের চরিত্র ও স্বভাব যতখানি প্রতিফলিত হয় বৈদিক ধর্মের দার্শনিক তত্ত্ব ততখানি খুঁজে পাওয়া যায় না। ডি.ডি. কোসাম্বির ভাষায়- “শিবের পূজায় উন্মত্ত আচার-পালনের প্রয়োজন- যা অনেক আদিম পূজাপদ্ধতির মধ্যে থাকলেও বৈদিক বা ব্রাহ্মণ্য পদ্ধতির মধ্যে নিশ্চিতই ছিল না। ভাগবদ্গীতার (যার রচনাকাল সম্ভবত খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতাব্দী থেকে খ্রিষ্টোত্তর ১ম শতাব্দীর মধ্যে) প্রচারক হিসেবে কৃষ্ণ পূর্ববর্তী সমস্ত ধর্মতত্ত্বের সারসংক্ষেপ করেছেন, এর সবগুলিকেই চালিত করেছেন এক অভিন্ন লক্ষ্যেঃ সর্বোত্তম দেবতা হিসাবে তাঁর ওপর বিশ্বাস রাখা। যেহেতু, তিনি ছিলেন এক মলবীর, অজস্র দেবিকার স্বামী এবং সেইসঙ্গে এক রাখাল বালক- তাই মূলত ভিন্ন ধর্মবিশ্বাসের অজস্র মানুষ তাঁর ভজনা করতে পারে এবং করেছে। শিব তখন হয়ে গেছেন বড় ভূস্বামীদের দেবতা, অন্যদিকে রাখাল বালক কৃষ্ণ রয়ে গেছেন ছোট ছোট উৎপাদকের সঙ্গে।৭৬৯ টোটেম পশুদের যারা পরিবৃত ত্রিমন্ডুক বিশিষ্ট শিব অভিজাত শ্রেণীর ব্যক্তিগত দেবতা। তাই শিবের পূজা ব্যক্তিগতভাবে সবাই করতে পারে, ব্রাহ্মণ অত্যাবশ্যক নয়। কিন্তু বাংলার সাধারণ জনসমাজে, বিশেষ করে নিন্মবর্ণের অন্তরের দেবতা এই রাখাল বালক, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। তারা শিবকে যতখানি শ্রদ্ধা করে তার চেয়ে বেশি ভালবাসে শ্রীকৃষ্ণকে। এমনকি, গীতার কৃষ্ণকেও বাংলার ভক্তরা বাংলার গণমানুষের স্বভাব চরিত্রের প্রতিফলন ঘটিয়ে অতি সাধারণ এক প্রেমিকরূপে রূপান্তরিত করেছে। দেবতাদের এই রূপান্তর চিরায়ত সত্য।
ব্রাহ্মণ্য ধর্মে চার সংখ্যার প্রাধান্যঃ
ব্রাহ্মণধর্মে চারের কয়েকটি বাধন আছে,৭৭০ যথা:
(ক) চার কাল: সত্যযুগ (১২,২৮,০০০ বছর) ক্রেতা (১২,৯৬,০০০ বছর), দ্যাপর (৮,৬৪,০০০ বছর) ও কলি (৪,৩২,০০০বছর)।
(খ) চার বেদ যথা: ঋগ্বেদ, যজু:, সাম ও অথর্ব,
(গ) চার আশ্রম যথা: ব্রহ্মচর্য্য (শিক্ষা জীবন), গার্হস্থ্য (সংসার জীবন), বাণপ্রন্থ (সংসারে থেকেও বৈরাগ্য) ও সন্যাস (গৃহত্যাগ),
(ঘ) চার বর্ণ হচ্ছে: ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ
এবং
(ঘ) চার বর্ণ যথা: ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র।৭৭১
চার বাধনের সংক্ষিপ্ত বক্তব্য হলো সমেয়র যৌক্তিকতায় বেদ্যবাক্য অনুসরনে কালোপযোগী ধর্মপালনে এবং আত্মার ক্রমোন্নতিতে নির্ধারিত কর্ম করে গেলেই আত্মার পরিত্রান। মানব জীবনের এটাই কাম্য বলে ব্রাহ্মন্য ধর্মের চার বাধনের শিক্ষা।৭৭২ অতুল সুরের মতে প্রাক-পাল যুগে (প্রাক ৭৫০ খ্রিষ্টাব্দ) বাংলার চার বর্ণের (ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্র) কোনো সমাজ ছিল না। অষ্টম শতাব্দীর পূর্বে বাংলায় ছিল কৌম (ট্রাইব) ভিত্তিক সমাজ। বাংলার জনপদগুলোও এই কৌম জাতির নামেই অভিহিত হতো। এই কৌম জাতিগুলো ছিল: পুণ্ড্র (পোদ), বঙ্গ, কর্বট (টৈকবর্ত্য), বাগদি, সদগোপ, ও মল ইত্যাদি। ৭৭৩
পালযুগের শেষে আসে সেন রাজত্ব (ত্রয়োদশ শতকে)। বলাল সেনের সমসাময়িক কালে রচিত ‘বৃহদ্ধর্মপুরাণেই’ প্রথম পাওয়া যাচ্ছে বাঙালি হিন্দুর বর্ণবিন্যাস। এই ‘বৃহদ্ধর্মপুরাণ’ দিয়ে আরম্ভ করে পরবর্তীকালে সামাজিক বিবর্তনের সাথে সাথে হিন্দুর বর্ণবিন্যাসও বারবার পরিবর্তিত হয়।
১। বৃহদ্ধর্মপুরাণের শ্রেণী বিভাগ: ‘বৃহদ্ধর্মপুরাণে’ (দ্বাদশ-এয়োদশ শতাব্দী) ব্রাহ্মণ ব্যতীত বাঙালি হিন্দুদেরকে তিনটি শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছে। এই শ্রেণী হচ্ছে: (ক) উত্তম সঙ্কর, (খ) মধ্যম সঙ্কর ও (গ) অন্ত্যজ। উপরোক্ত তিন শ্রেণীতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল:
উত্তম সঙ্কর:
শ্রেত্রীয় ব্রাহ্মণ যাদের পুরোহিত হিসেবে কাজ করত তারাই উত্তম সংকর। এদের মধ্যে আছে: (১) করণ (২) অন্বষ্ঠ (৩) উগ্র (৪) মগর (৫) গন্ধবণিক (৬) কাংস্যবর্ণি (৭) শঙ্খবনিক (৮) কুম্ভকার (৯) তন্ববায় (১০) কর্মকার (১১) সদগোপ (১২) দাস (১৩) রাজপুত্র (১৪) নাপিত (১৫) মোদক (১৬) বারুজীবী (১৭) সুত (১৮) মালাকার (১৯) তাম্বুলি ও (২০) তৈলক।
মধ্যম সঙ্কর:
১. তক্ষক ২. রজক ৩. স্বর্ণকার ৪. সুবর্ণবণিক ৫. আভীর ৬. তৈলক, ৭. ধীবর ৮. শৌন্ডিক ৯. নট ১০. শবক ১১. জালিক।
অন্তজ:
১. গৃহি ২. কুড়ব ৩. চণ্ডাল ৪. বাদুর ৫. চর্মকার ৬. ঘট্টজীবী ৭. দোলবাহী ও ৮. মল।
অবশ্য ক্রমান্বয়ে বর্ণবাদের মধ্যে অনেক শীথিলতা এসে গেছে। জাগতিক প্রয়োজন ও রক্তের মিশ্রণে এই বাঁধন প্রায় লুপ্ত হবার পথে।৭৭৪ খ্রিষ্টীয় ৯ম শতাব্দী থেকে উপমহাদেশে বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব হ্রাস পেতে আরম্ভ করলে, বৈদিক ধর্মের পুণঃজাগরণ হতে আরম্ভ করে। ১১ শতকে দক্ষিণ ভারতে বৈদিক ধর্মের উত্থান এক নতুন আন্দোলন আরম্ভ হয়। খ্রিষ্টপূর্ব ৭ম শতাব্দী থেকে খ্রিষ্টপূর্ব ২য় শতাব্দী পর্যন্ত সময়ে ভারতীয় ধর্ম, আধ্যাত্মিকতা, মনোজগত, মানসিক বিচার বিশ্লেষণ, সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে ধারণা, পরকাল, স্বর্গ-নরক, জ্ঞানের উৎস, কর্মজগত, জীবনবৃত্ত, আত্মা-পরমাত্মা, ভাল-মন্দ, চিন্তা-চেতনা, তপস্যা, সমাধি (গভীর ধ্যানে মগ্ন থাকা) প্রভৃতি সম্পর্কে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে। মানুষের চিন্তা-চেতনার, বিশেষ করে মনোজগতের এবং অতিন্দ্রীয় ধারণাপ্রসূত বিভিন্ন প্রশ্ন উত্তর দিতে বেদ আর সক্ষম ছিল না।
আর্যক্ষত্রিয়রা স্থানীয় ভূমিপুত্রদের মোকাবেলা করতে ক্রমশই অপারগ হয়ে পড়ছিল এবং বিভিন্ন স্থানে অনার্যশক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে থাকে। ব্রাহ্মণগণও বৈদিক-অবৈদিক বিভিন্ন দার্শনিকদের সদ্য উৎসারিত জ্ঞান শাখার প্রবল গতিবেগে আদি জ্ঞানের উপর নির্ভর করতে পারছিল না। ভারতীয় চিন্তা-জগতে এটা ছিল এক অস্থিরতার সময়।
এ সময়ের বিরাজমান ধর্মীয় চিন্তাজগতকে আমরা ৫ ভাগে ভাগ করতে পারি এবং প্রতিটি ভাগেই এমন কিছু মানুষের আবির্ভাব ঘটেছিল যারা তাদের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ নীতি-পদ্ধতি অনুসরণ করে তাদের নিজস্ব শাখাকে শুধু সমৃদ্ধশালী করে যাননি, তারা পৃথিবীর জ্ঞান ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধশালী করে গেছেন। প্রথমেই আসে বৈদিক ধর্ম। আদিত এই ধর্ম তখন উপবীতধারী কর্তৃক যজ্ঞ প্রধান ধর্ম ছিল। কিন্তু খ্রিষ্টপূর্ব ৭ম শতাব্দী থেকে এ ধর্মে ক্রমাগত এক রুপান্তরিত ধর্মে পর্যবেশিত হয়। এ সম্বন্ধে ইতিপূর্বে বেশ বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। তখন বৈদিক ধর্ম ব্রাহ্মণ শাসিত হলেও তা আর্যধর্ম ও স্থানীয় ভূমিপুত্রদের ধর্মের সমন্বয়ে এক নতুন ধর্মে রুপান্তরিত হয়েছে। এ সময়ে ব্রাহ্মণ সমাজ অব্রাহ্মণদের সঙ্গে আপোষ করেও রক্ষা পায়নি, ক্ষমতাশালী ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যদের চাহিদা মাফিক তাদের বর্ণান্তরিত করতে হয়েছে। পূজা পার্বণের প্রত্যেক অঙ্গনকে (জড়োপাসনাকেও) বৈদিক ধর্মের বিস্তৃতি বলে স্বীকৃতি দিতে হয়েছে। ব্রাহ্মণগণ আধ্যাত্মিক সাধনার চেয়ে অতিমাত্রায় বাহ্যিক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব দিতে হয়েছে। তাতেও সবাইকে সন্তুষ্ট করা যায়নি। এসময়ে দ্বিতীয় আর একদল প্রাতিষ্ঠানিক ধমীয় আচার-আচরণের পরিবর্তে আধ্যাত্মিক সাধনাকেই, ব্যক্তি-আত্মাকে পরমাত্মার সঙ্গে সংযুক্তির মাধ্যমে, পরিত্রাণের উপায় হিসেবে গণ্য করেছে। বাহ্যিক পূজাপার্বণ তারা মূল্যহীন গণ্য করতেন। এদলের খ্যাতিমান পুরুষ ছিলেন কৌশল রাজ্যের আলার কালাম নামে এক ক্ষত্রিয় এবং উদ্দক রামপুত ছিলেন সম্ভবত এক বৈশ্য। প্রথমজন ধ্যানের মাধ্যমে সাতটি স্তর অতিক্রম করার উল্লেখ করেছেন এবং দ্বিতীয়জন করেছেন আটটি।৭৭৫
ধ্যানের গভীরতায় চিন্তার নিবৃত্তি হবে এবং পরমইশ্বরকে উপলব্ধি করা যাবে। তৃতীয় দলে যাদের পাওয়া যায় তাদের অনেকেই খাঁটি ব্রাহ্মণ ছিলেন। তারা ধর্মের নামে ব্যবসা করা বা ধর্মের কোন সত্যকে আড়াল করে রাখা পছন্দ করতেন না। এদলের সেনাপতি ছিলেন কাশ্যপ গোত্র। বেদের যুগে তাদের প্রভাব কম হলেও খ্রিষ্টপূর্ব ৭ম শতাব্দীর ভিতর তাদের বক্তব্য সর্বস্তরে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে। তাদের যুক্তিভিত্তিক ধর্মীয় ব্যাখ্যা (বেদ ও বৌদ্ধপুঁথিগুলি) মগধ ও কোশলে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কশ্যপ গোত্রের সঙ্গে ব্রাহ্মণদের ভৃগুগোত্র একই ধর্মীয় চিন্তা-চেতনায় উদ্ভুদ্ধ ছিল। ৪র্থ ধর্মীয় দলটি হল যারা প্রাতিষ্ঠানিক পূজা-অর্চনা ও অতিমাত্রায় কৃচ্ছ সাধনা অর্থহীন মনে করে মানুষের ব্যবহারিক জীবনের উপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তারা স্বর্গ-নরক, ভগবান, পাপ-পূণ্য সবকিছু সম্পর্কেই নিরবতা পালন করে আত্মার পরিত্রাণের সহজ সরল পথ সংযম ও ব্যবহারিক কর্মদ্বারা লাভ করার কথা বলেছেন। এই দলেই ছিলেন বৌদ্ধ, জৈন ও আজীবকরা। এরা কাশ্যপদেরই চিন্তাধারার পরবর্তী স্তর। মহাবীর কাশ্যপ গোত্রের বলেই অনেকে মনে করেন। আর ৫ম দলটি ছিল সেই ব্রাহ্মণ যারা আদি বেদের বিষয়বস্তুকে আঁকড়িয়ে রেখে সর্বস্তরের মানুষের জন্য বিধান রচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করেছেন। এদের মধ্যে মনুর দল এবং চানক্য, সন্দেহ নেই, কালজয়ী দু’টি নাম। মনুর সংহিতা এবং চানক্যের অর্থশাস্ত্র।
বেদের অনুসারীদের সর্বজন মান্য বিধান গ্রন্থ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। তাদের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব, তারা ৫/৬ শত বছরের সমস্ত ধর্মীয় আন্দোলন, বিক্ষিপ্ত চিন্তা-ভাবনা, সবকিছুকে গলধঃকরণ করে সকলের চিন্তার রং এর কিছুটা হলেও প্রতিফলন ঘটিয়ে বেদের এক নতুন ধর্মীয় ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছে যা বেদে নেই আবার বেদের নামেই সব প্রচলিত হচ্ছে। গান্ধার থেকে মগধের রাজধানী পাটলিপুত্র পর্যন্ত এই ধর্মীয় সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনের ধারা প্রবাহিত হলেও বাংলায় তার প্রতিফলন কতটা হয়েছিল তা সঠিকভাবে নির্ণয় করার মতো যথেষ্ঠ প্রত্নসম্পদ বা সমকালীন বর্ণনা আমাদের হাতে নেই। তবে অনুমান করা যায় খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দী বা তার শেষ সময় পর্যন্ত বাংলাদেশে এসব ধর্ম ও দার্শনিকদের মতবাদ খুব একটা প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। অবশ্য বৈদিক ধর্ম বা বৌদ্ধধর্ম তৎকালে বাংলাদেশে অপরিচিত ছিল না, কিন্তু স্থানীয় ভূমিপুত্রদের জড়োপাসনার প্রাধান্য তখনও বর্তমান ছিল। বৈদিক ধর্ম থেকে বৌদ্ধধর্মের প্রতিই এদেশবাসী অনেক বেশি আসক্ত ছিল। ব্রাহ্মণ্য ধর্ম তখনো কেবলমাত্র রাজা-মহারাজা, অভিজাতবর্গ, দলপতি ও ধনী বণিকদের দ্বারাই শুধু পালন করা হতো, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে খুব গুরুত্ব ছিল না। বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি নিমড়ববর্ণের আদিবাসিরা যতখানি আকৃষ্ট হয়েছিল, উচ্চবর্ণের বৈদিক ধর্ম বিশ্বাসীরা, বিশেষ করে ব্রাহ্মণরা ততখানি আকৃষ্ট হয়নি। কারণ, ব্রাহ্মণ্য ধর্ম ব্রাহ্মণদেরকে শুধু ধর্মীয় উচ্চ মর্যাদাই দেয়নি, তাদেরকে জাগতিক ধন সম্পদ, প্রশাসনিক উচ্চ পদ ও ক্ষমতার অধিকারীও করেছিল যা বৌদ্ধ ধর্ম তাদেরকে দিতে পারেনি। মগধের পরবর্তী নামকরণ করা হয় বিহার। ঐতিহাসিকদের ধারণা এখানে সম্রাট অশোকের সময় থেকেই অনেক বৌদ্ধ মন্দির ও প্রতিষ্ঠান (বিহার) তৈরি হয়েছিল বলেই প্রদেশের নামই হয়ে যায় বিহার। বৈদিক ধর্মালম্বী গুপ্তদের দ্বারা নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলেও, বৌদ্ধদের প্রভাবেই এখানে শিক্ষানীতি, শিক্ষক ও পাঠ্যবস্তু নির্ধারিত হয়েছিল। কালক্রমে বৌদ্ধদের শ্রেষ্ঠ শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
বৌদ্ধধর্মের চরম উন্নতির সময়েও বৈদিক ধর্মের প্রতি সহনশীল ছিল, এ প্রমাণ পাওয়া যায়। ৩০০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১০০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত বাংলাদেশে বৌদ্ধ ধর্মই ছিল বাংলার অধিবাসীদের প্রধান ধর্ম। শুধু বাংলা নয়, এ সময়ে পশ্চিমে আফগানিস্তান থেকে পূর্বে বার্মা, থাইল্যান্ড, কম্পোডিয়া পর্যন্ত এবং উত্তরে নেপাল থেকে দক্ষিণে শ্রীলঙ্কা পর্যন্ত বিশাল ভূভাগে বৌদ্ধ ধর্মই ছিল অধিবাসীদের প্রধান ধর্ম। শুধু ধর্ম নয়, তাদের মধ্যে গড়ে উঠা সংস্কৃতি, শিক্ষা ও ব্যবসা-বাণিজ্য এই বিশাল অঞ্চলের অধিবাসীদের মধ্যে একটি সংযুক্তি এনে দেয়, গড়ে তুলে একক পরিচিতি। চিন্তা চেতনার ক্ষেত্রে এই আঞ্চলিক অখণ্ডতা বহু শতাব্দী বর্তমান ছিল এবং এর রেশ এখনও বেঁচে আছে। বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাবেই আর্য ও অনার্যদের মধ্যে সংঘাতময় সম্পর্কের কিছু না হলেও স্থিমিত হয়েছিল।
এ সময়ে বাংলাদেশে বৈদিক ধর্ম বর্তমান থাকলেও সাধারণ অধিবাসীদের পূজাপার্বণে ও কৃষ্টি সংস্কৃতিতে দেব-দেবী, পূজার আচার-ব্যবহার ধর্মীয় চিন্তা-চেতনায় বেদের সম্পূর্ণ অনুসারী ছিল না যা অন্যত্র আলোচনা করা হয়েছে। খ্রিষ্টীয় ৯ম শতাব্দী থেকেই বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব বাংলাদেশে ম্লান হতে থাকে এবং বৈদিক ধর্মের উত্থ্যান দেখা যায়। বিশেষ করে ৮/৯ শতকে দাক্ষিণাত্যে বৈদিক ধর্মের পুনঃউত্থানের আন্দোলন আরম্ভ হয়। এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন শঙ্করাচার্য। আর্য ও অনার্যের মিলিত দেবতা যথা- ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বের (শিব) এই আন্দোলনে প্রধান দেবতার আসন অলংকৃত করে। এই আন্দোলনের ঢেউ বাংলাদেশেও এসেছিল। তবে সরাসরি শঙ্করাচার্যের সঙ্গে যোগাযোগ না হলেও তার শিষ্য রামানুজন থেকে আরম্ভ করে পঞ্চম শিক্ষক রামানন্দের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে দেবতা বিষ্ণুর ভগবত তত্ত্ব বা বৈষ্ণব ধর্ম বাংলাদেশে প্রসার লাভ করেছিল। সেন বংশের শেষ রাজা লক্ষ্মণসেন নিজেও বৈষ্ণব ছিলেন।
বৈষ্ণব ধর্মের প্রভাবে বাংলার বুকে ধর্মীয় ও সামাজিক বন্ধন ও বর্ণের উন্মাষিকতা কিছুটা হলেও শিথিল হয়। সঙ্গে সঙ্গে অবনমিত নারীর সামাজিক মর্যাদা অনেকখানি উন্নতি লাভ করে। অবশ্য বৈদিক ধর্মের নারী বিদ্বেষ কোনকালেই এদেশে স্বীকৃতি পায়নি।
৭৬৭ দামোদর ধর্মানন্দ কোসাম্বি: ভারত ইতিহাস চর্চার ভূমিকা, পৃ- ৮৩।
৭৬৮ দামোদর ধর্মানন্দ কোসাম্বি কর্তৃক উদ্ধৃত গণেশ পুরাণ।
৭৬৯ দামোদর ধর্মানন্দ কোসাম্বি: ভারত ইতিহাস চর্চার ভূমিকা, পৃ- ২১৭।
৭৭০ ড: আর, এম, দেবনাথ- সিন্ধু থেকে হিন্দু
৭৭১ আর,এন, দেবনাথ- সিন্ধু থেকে হিন্দু।
৭৭২ শ্রীমদ ব্রহ্মান্দ ভারতী: সিদ্ধজীবনী।
৭৭৩ অতুল সুর: বাংলা ও বাঙালির বিবর্তন।
৭৭৪ বৃহদ্ধর্ম পুরাণের অনুবাদ।
৭৭৫ দামোদর ধর্মানন্দ কোসাম্বি: ভারত ইতিহাস চর্চার ভূমিকা, পৃ- ১৩৬।
চলবে———-

শেয়ার করুন