আদি বাংলার ইতিহাস
(প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্ব ১০১
লালন-পালনের দেবতা বিষ্ণুকে প্রেমের দেবতাতে পর্যাবেশিত করেই বৈষ্ণব ধর্ম থেমে থাকেনি। পরবর্তীকালে মানবীয় আশা-আকঙ্খার প্রতিফলন ঘটিয়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে প্রেমের দেবতার সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়ে মানবীয় ব্যক্তি প্রেম ভগবত প্রেমে উত্তীর্ণ হয়েছে। বাংলার সংকর জাতি বৈদিক ধর্ম অস্বীকার না করেও নিজেদের আকাঙ্খিত ধর্মীয় মতাদর্শের প্রতিফলন ঘটিয়েছে বৈষ্ণব ধর্মের মাধ্যমে। এসময়ে বৈষ্ণব ধর্ম বৌদ্ধধর্মের অনেক কিছু গলধঃকরণ করে নতুন ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছে। বৈষ্ণব ধর্ম স্বীকার করে যে, বৌদ্ধ সম্ভবত বিশ্বের পালনকর্তা বিষ্ণুর নবম রূপ। কাজেই বৈষ্ণব ধর্ম একদিকে বৌদ্ধকে দেবতা হিসেবে যেমন স্বীকার করে। তেমনি অকারণে প্রাণী হত্যাও উৎসাহিত করে না। আবার বৈদিক বর্ণবাদের কঠোরতাকেও বিরোধিতা করে। তাই, এই বৈষ্ণব ধর্মে বৈদিক ধর্ম ও বৌদ্ধধর্মের একটি মিলিত রূপ পাওয়া যায়। এজন্যই বোধ হয় বৌদ্ধধর্মের অনেক প্রতিষ্ঠান বৈষ্ণব মন্দিরে পরিণত হয়েছিল।
প্রাচীনকালে বেদের ধর্ম এদেশে জনসাধারণের গ্রহণযোগ্য ধর্ম ছিল বলে যেমন প্রমাণ পাওয়া যায় না, তেমনি প্রাচীন মধ্যযুগেও বৌদ্ধ ধর্ম যতটা বাঙালির কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল ততটা বৈদিক ধর্মের গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া যায় না। আবার প্রাচীন যুগের শেষ দিকেও বেদের চেয়ে বেদান্তের শাখা প্রশাখা সৃষ্টি হয়ে বৈদিক ও বৌদ্ধ ধর্মের নতুন রূপায়ন দেখা যায়। এমনকি, সেনরা যখন বৈদিক ধর্মের পুনঃউত্থানের চেষ্টায় রত ছিল, তারা নিজেরাও শিব ধর্ম বা বৈষ্ণব ধর্মের
পৃষ্ঠপোষক হয়ে যায়।
বৌদ্ধ ধর্ম:
প্রাকৃত ধর্ম যা কোনো কোনো আদিবাসীদের মধ্যে এখনও বর্তমান আছে, সনাতন হিন্দু ধর্ম ও বৈদিক ধর্মের পরে আদিযুগে আরো দু’টি ধর্মের উদ্ভব হয়েছিল: জৈন ও বৌদ্ধ ধর্ম। আর্য ও ভূমিপুত্রদের মধ্যে একটি অত্যন্ত সংঘাতপূর্ণ সময়ের শেষ দিকে আর্য ধর্ম, আর্য জীবনধারা এবং তাদের চিন্তা-চেতনার বিরুদ্ধে দু’টি ধর্মীয় প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর ভারতবর্ষে অত্যন্ত উচ্চকিত হয়ে উঠে। খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে পূর্বভারতে গৌতম বুদ্ধের (আ ৫৬৬-৪৮৬ খ্রিষ্টপূর্ব) আবির্ভাব হয়েছিল। তিনি পূজা, যাগযজ্ঞ, কঠোর তপশ্চর্যা, জন্মগত জাতিভেদ প্রভৃতিতে আস্থাহীন ছিলেন না। তাঁর মতে, মানবের স্বীকৃত কর্মই তার ভবিষ্যৎ গঠন করে; নির্দিষ্ট উপায়ে সদানুষ্ঠান দ্বারা সে ক্রমশঃ উনড়বত হয়ে পরিণামে নির্বাণ লাভ করতে পারে, সেজন্য বেদে বা আত্মায় বিশ্বাস কিংবা ঈশ্বর বা দেবদেবীর উপাসনা আবশ্যক নয়। এ কারণে বৌদ্ধ ধর্ম বৈদিক ধর্মের তীব্র সমালোচনার মুখোমুখি হয় এবং ব্রাহ্মণরা বৌদ্ধকে নাস্তিক এবং ধর্ম বিনাসী বলে আখ্যায়িত করেন। T.C. Chattopadhyay বলেন, “The religion founded by him contains much advice of the highest spiritual value. He did not admit anything that was devoid of reason. No matter how ancient the customs of a jati, if stronger reasons can be presented against the traditional views, then the opinions of at least some people are likely to change”.৭৭৬
বৌদ্ধ ধর্মের তিনটি প্রধান স্তম্ভ হল- বুদ্ধ, ধর্ম ও সংঘ। আত্মার পরিত্রাণের জন্য গৌতম বৌদ্ধের দেয়া অষ্টমার্গ বা আটটি নীতি হলো: সত্য দর্শন, সত্য সংকল্প, সত্যবাক্য, সত্যক্রিয়া, সত্যজীবিকা, সত্য অনুশীলন, সত্য স্মৃতি ও সত্য ধ্যান পালনের উপদেশ দেন। সর্বজীবে দয়া ও কল্যাণ বৌদ্ধ ধর্মের মূল আহ্বান। বিদ্যার্থী সঙ্ঘে প্রবেশের পরে একমাস পর্যন্ত ‘উপাসক’ থাকতেন এবং পঞ্চশীল পালনের (জীবহত্যা, চৌর্য, মিথ্যাভাষণ, ব্যাভিচার ও মাদ্রকদ্রব্য হতে বিরত থাকা) উপদেশ দেওয়া হতো। তারপর বিদ্যার্থী ভিক্ষুর পরিচ্ছদ পরিধান করে সঙ্ঘের অন্যান্য সভ্যদের সম্মুখে উপস্থিত হতেন। বিদ্যার্থীর মস্তক মুণ্ডন করতে হত এ অনুষ্ঠানে আর কাষায় বস্ত্র পরিধান ও ভিক্ষা পাত্র গ্রহণ আবশ্যক ছিল।৭৭৭ আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর পূর্বে মানবীয় গুণের এমন পূর্ণতার কথা সমসাময়িক কেন, পরবর্তী অনেক ধর্মেও বেশি শোনা যায় নি। অবশ্য এ কথা সত্যি, শুধু গৌতম বৌদ্ধের সময় নয়, সর্বযুগে, সর্বকালে এই সৎজীবনের আহ্বান সকল মানুষের জন্য একটি আদর্শ এবং সর্বধর্মে সমাদৃত।
রবীন্দ্রনাথের মতে ভগবান বুদ্ধ জ্ঞান ও প্রেমের ধারায় বিকাশ ঘটিয়েছেন। ‘সকল প্রাণী সুখী হোক’ এই বাণীর মাধ্যমে বুদ্ধ প্রকৃত পক্ষে মানুষকে বড় করেছেন। তিনি মানুষকে বসিয়েছেন দেবতার স্থানে। বলা বাহুল্য সাথে সাথে তিনি পশুকে করেছেন আদরনীয় এবং পশুহত্যা করেছেন নিষিদ্ধ।৭৭৮
বাংলাদেশে কখন থেকে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার আরম্ভ হয় তা সঠিক করে বলা যায় না। তবে অনুমান করা যায় যে, গৌতম বৌদ্ধের সময়কাল থেকেই এদেশে বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার আরম্ভ হয়েছে। বুদ্ধদেব বাংলার পূর্বাঞ্চলে না আসলেও উত্তরাঞ্চলে এসেছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। সংযুক্তনিকায়-গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, বুদ্ধদেব একবার সুম্ভভূমি (সুহ্মভূমি) অন্তর্গত শেতক নগরে কিছুদিন বাস করেছিলেন। অঙ্গুত্তর নিকায়-গ্রন্থে বঙ্গান্তপুত্ত নামে এক বৌদ্ধ আচার্যের উল্লেখ পাওয়া যায়। বোধিসত্ত্বাবদান কল্পলতা গ্রন্থের অনাথপিণ্ডকসূতা সুমাগধার কাহিনীতে জানা যায় যে, বুদ্ধদেব স্বয়ং একবার ধর্মপ্রচারোদ্দেশে পুণ্ড্রবর্ধনে এসে ছয় মাস বাস করে গিয়াছিলেন। চীনা পরিব্রাজক ইউয়ান্-চোয়াঙ্ও বলেন, বুদ্ধদেব পুণ্ড্রবর্ধন, সমতট ও কর্ণসুবর্ণে এসে ধর্ম প্রচার করেছিলেন। আধুনিক কোনো কোনো পণ্ডিতব্যক্তি মনে করেন গঙ্গা নদীপথে বুদ্ধদেব বিহার থেকে বাংলার গৌড় অথবা মহাস্থানে এসেছিলেন। (পাটলিপুত্র এবং তার চারপাশে অনেক সংখ্যক বৌদ্ধ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বিহার স্থাপিত হয়েছিল বলে এই প্রদেশের নামই হয়ে যায় বিহার)।৭৭৯ কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে বুদ্ধের এখানে আসা সম্পর্কে কোন স্বীকৃতি নেই। তবে বুদ্ধদেবের সমসাময়িককাল থেকেই এদেশে বৌদ্ধধর্ম প্রচার হয়েছিল বলে অনুমান করা হয়। ইউয়ান্-চোয়াঙ্ বলেন, অশোকের স্মৃতিবিজড়িত অনেকগুলি স্তুপ তিনি দেখেছিলেন পুণ্ড্রবর্ধনে, সমতটে, কর্ণসুবর্ণে এবং তাম্রলিপ্তিতে। পুণ্ড্রবর্ধন বোধ হয় সুবিস্তৃত অশোক-সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্তই ছিল; অন্তত খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে পুণ্ড্রবর্ধনে বৌদ্ধধর্ম যে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল মহাস্থান-শিলাখণ্ড-লিপিতে পরোক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়। যদিও বৌদ্ধধর্ম অনুসারী সম্রাট অশোকের মত শাসকও বাংলার বৃহত্তর অঞ্চলে রাজ্য বিস্তার করেছিলেন কিন্তু এদেশে বৌদ্ধ ধর্মের তেমন প্রসার হয়নি। তবে অনুমান হয় খ্রিষ্টীয় দ্বিতীয় বা তৃতীয় শতক থেকে এদেশে বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার ও প্রসার হতে থাকে। খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে পুণ্ড্রবর্ধনে বৌদ্ধধর্ম প্রসারের একটি পরোক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায় সাঁচী স্তূপের দুটি দানলিপি হতে; এই লিপি দু’টিতে জানা যায়, পুণ্ড্রবঢন বা পুণ্ড্রবর্ধনবাসী বৌদ্ধধর্মানুরাগী দুই ব্যক্তি এর একজন মহিলা, নাম ধর্মদত্তা এবং অপরজন পুরুষ, নাম ঋষিনন্দন- সাঁচী স্তূপের বেষ্টনী ও তোরণ নির্মাণে কিছু দান করেছিলেন।
বাংলাদেশের সর্বত্র যেসব প্রত্নতত্ত্ব এ পর্যন্ত পাওয়া গেছে তাতে দেখা যায়, সারা দেশব্যাপী এককালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল প্রচুর বৌদ্ধ মঠ ও অসংখ্য বৌদ্ধ বিহার। প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল সভ্য মানুষের প্রতিশ্র“তিপূর্ণ এক সুন্দর জীবনব্যবস্থা।তারা আরো প্রতিষ্ঠা করেছিল অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় সে যুগে এক অশ্রুতপূর্ব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেখানে একসময় এ বাংলাদেশেরই এক কৃতিসন্তান আচার্য শিলভদ্র (৫৬১ অথবা ৬৩৫ খ্রিষ্টাব্দে) প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হন এবং দীর্ঘ ২০ বছর প্রধান আচার্য হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন।৭৮০ বৌদ্ধধর্মের মূল বক্তব্য গৌতম বুদ্ধের চারটি সিদ্ধান্তের উপর দন্ডায়মান। এই চারটি হল: ১) ঈশ্বরকে অস্বীকার করা ২)আত্মাকে নিত্য স্বীকার না করা ৩) কোন গ্রন্থকে অকাট্য প্রমাণ হিসেবে স্বীকার না করা এবং ৪) জীবন প্রবাহকে এ শরীরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না মানা। বুদ্ধের শিক্ষা এবং দর্শন এই চার সিদ্ধান্তের অবলম্বনের ওপরে দণ্ডায়মান। প্রথম তিনটি সিদ্ধান্ত বৌদ্ধধর্মকে অন্যান্য ধর্মথেকে পৃথক করে। উপরোক্ত তিন সিদ্ধান্ত বস্তুবাদ ও বৌদ্ধধর্মে সমভাবে বিরাজমান। কিন্তু চতুর্থ সিদ্ধান্ত অর্থাৎ জীবনপ্রবাহকে এই শরীর পর্যন্ত সীমিত না মানা, একে বস্তুবাদ থেকে পৃক করে এবং সেই সঙ্গে এই সিদ্ধান্তটি ব্যক্তির ভবিষ্যৎকে আশাপ্রদরূপে দেখাবার এক সুন্দর প্রচেষ্টা, প্রকৃতপক্ষে যা না থাকলে কোনো আদর্শবাদই কার্যকরী রূপ পেতে পারে না।৭৮১
মানব জীবনে দুঃখ নিবারন করাই প্রধান কাজ বা ধর্ম। বুদ্ধের মূল শিক্ষা এই দুঃখ নিবারন করে জীবনের নির্বান লাভ করা। বুদ্ধের মতে, জন্ম দুঃখ, বার্ধক্য দুঃখ, মৃত্যু দুঃখ, শোক, অশান্তি সবই দুঃখ।৭৮২ এ দুঃখ নিবারনের পথকেই বুদ্ধ অষ্টমার্গ বলেছেন। এই অষ্টমার্গ তিন ভাগে বিভক্ত, যা ইতিপূর্বে উলেখ করা হয়েছে। এগুলো হলো জ্ঞান, শীল ও সমাধি। অষ্টমার্গ পালন করলেই জ্ঞান, শীল ও সমাধি লাভ সম্ভব এবং এতে নির্বাণপ্রাপ্ত হয়ে দুঃখ চিরতরে দূর হবে। বৌদ্ধধর্ম প্রচার
৫২০ থেকে ৩৬০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের মধ্যে মগধ সাম্রাজ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। আনুমানিক ৫২০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে বিম্বিসার অঙ্গ রাজ্য জয় করে মগধ সাম্রাজ্যের পরিধি বিস্তৃতি করেন এবং ৩৬০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে মহাপদ্মনন্দ আর্য জনগোষ্ঠীর ক্ষমতা সমূলে ধ্বংস করে মগধের শক্তি অপ্রতিহত করে তুলেন। উক্ত সময়ে মগধে বিস্তার লাভ করে বৌদ্ধ ধর্ম। মগধ সাম্রাজ্যে, বিশেষ করে রাজধানী পাটলিপুত্রের চার পাশের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে অসংখ্য বৌদ্ধ ধর্মের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিহার, গড়ে উঠে যার জন্য আজও এ প্রদেশ বিহার নামেই পরিচিত। তবে বিহারের মতো বৌদ্ধধর্ম প্রচারের প্রথম দু’শ বছরের ভিতর ভারতের অন্যত্র এই ধর্ম এত পরিচিতি লাভ করেনি। খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে মৌর্যবংশীয় মহাপরাক্রান্ত সম্রাট আশোকের (আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ২৭২-২৩২) পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে এই নবধর্ম যেন দ্বিগ্বিজয়ে মেতে উঠল। অশোক নিজরাজ্যে এবং পাশ্ববর্তী রাজ্যসমূহে ধর্ম প্রচারের চেষ্টা করেছিলেন বলে জানা যায়। ভারতের সর্বত্র ছাড়াও সম্রাট অশোক শ্রীলঙ্কা, ব্রহ্মদেশ, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, চীন ও তিব্বত সাম্রাজ্যে ধর্মপ্রচার করতে বৌদ্ধ ভিক্ষু ও পণ্ডিতদের পাঠিয়েছিলেন। কথিত আছে যে, সম্রাট নিজ পুত্র মহেন্দ্র ও কন্যা সংখমিত্রাকে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের জন্য শ্রীলঙ্কা পাঠিয়েছিলেন। আবার পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের অনেক অংশ তৎকালে মৌর্য সাম্রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। পরবর্তীকালে কূষাণবংশীয় রাজগণের আমলে (খ্রিষ্টীয় ১ম-২য় শতাব্দীতে) ঐ অঞ্চলের নানা স্থানে বৌদ্ধগণ দীর্ঘকালস্থায়ী প্রতিপত্তি লাভ করেছিল। কারণ, কণিষ্কসহ কয়েকজন কূষাণবংশীয় সম্রাট কেবল যে বৌদ্ধমতের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন তাই নয়, তাঁদের সাম্রাজ্যও মধ্যএশিয়া ও উত্তরভারতের অধিকাংশ স্থান জুড়ে বিস্তৃত ছিল।
দ্রাবিড় প্রভাবিত দাক্ষিণাত্যে আর্যদের বিস্তার খুব মন্থর ছিল। এজন্যই বোধহয় বৌদ্ধধর্ম সহজে বিস্তার লাভ করতে পেরেছিল। বুদ্ধ নিজেও সেখানে ধর্ম প্রচারের জন্য অবস্থান করেছিলেন। কাশী-ভরদ্বাজ নামে এক ব্রাহ্মণ কৃষক সেখানে তার অন্যতম শিষ্য ছিলেন। তার অনুসারীরা বুদ্ধের মূল শিক্ষার বিষয়বস্তু পালি ভাষায় সংরক্ষণ করে গেছেন। এমনকি, সম্রাট কনিস্কের সময়ে যখন বৌদ্ধ ধর্মের ৪র্থ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, বৌদ্ধ দর্শনের মূল ধারায় বিভাজন হয়ে উত্তর ভারতের অভিজাত শ্রেণী মহাযানের পৃষ্ঠপোষক সেজে বৌদ্ধ দর্শনকে সুক্ষ্মাতিসূক্ষ্মরূপে ব্যক্ত করতে সংস্কৃত ভাষার আশ্রয় নিলেন।
এই সংস্কৃত পাণিনির ব্যাকরণ সিদ্ধ ভাষা না হলেও বুদ্ধের মূল শিক্ষা ও ভাষা থেকে সাধারণ মানুষ দূরে সরে গেল।৭৮৩ কিন্তু দক্ষিণের সাধারণ মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস হীনযান (যা অবজ্ঞা ভরে অভিজাত শ্রেণী এই নাম দিয়েছিল) ও পালি ভাষা তারা আঁকড়িয়ে ধরে রেখেছিল দীর্ঘদিন। কিন্তু ধর্ম তত্ত্ববিদ ও সে যুগের শ্রেষ্ঠ মনিষী নাগার্জুন মহাযান মতবাদকে দক্ষিণে পৌঁছে দিয়েছিলেন। আস্তে আস্তে হীনযান দাক্ষিণাত্যে সংকুচিত হয়ে যায়।
কনিষ্কের সময়ে উত্তর ভারতের শ্রেষ্ঠ বৌদ্ধধর্ম গুরু ‘মাতৃচেত’ কিন্তু মহাযানের পিষ্ঠপোষক ছিলেন না বলে জানা যায়। কথিত আছে যে, চীন সাম্রাজ্যের স্থাপয়িতা চে-হুআং-তি (খ্রিষ্টপূর্ব ২৫৫ হতে ২২১ বা ২০৬ অব্দ পর্যন্ত)পশ্চিমের দেশগুলির সংস্রবে আসতে যত্নবান হয়েছিলেন। দ্বিতীয়ত: তিনি মৌর্যবংশীয় সম্রাট অশোকের সমসাময়িক ছিলেন। ভারতীয় ভাষার চীন কথাটি কিন্তু এই প্রাচীন ছিনবংশের নামের সঙ্গে সম্পর্কিত বলেই অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন।
কারণ ভারতীয় ভাষায় শব্দটির ব্যবহার নিতান্ত আধুনিক নয়। ‘বুদ্ধবংশ’ নামক পালি বৌদ্ধগ্রন্থে, কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্র-এ এবং আন্ধ্র-প্রদেশের গুন্টূর জেলার অন্তর্গত নাগার্জুনকোন্ডতে প্রাপ্ত বীরপুরুষদত্ত নামক ইক্ষাকুবংশীয় জনৈক রাজার শিলালেখে চীন নামটির ব্যবহার দেখা যায়।৭৮৪ বুদ্ধবংশ খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীতে রচিত হয়েছিল বলে অনুমিত হয়েছে। ভারতের সঙ্গে চীনের পরিচয় ও লেনদেন বহু প্রাচীন।
খ্রিষ্টপূর্ব ২ অব্দে ঙ্গাই-তি নামক চীন সম্রাটের রাজত্বকালে এদেশ থেকে একখানি বৌদ্ধগ্রন্থ উপহার প্রাপ্ত হন। পণ্ডিতেরা মনে করেন যে, এই সর্বপ্র ম চীনসাম্রাজ্যে একখানি খাঁটি বৌদ্ধগ্রন্থ প্রবেশ করল। ক্যাশ্যপ-মাতঙ্গ এবং ধর্মরত্ন ৬৫ খ্রিষ্টাব্দে চীন-রাজধানীতে উপনীত হন; তখন সম্রাট মিঙ-তির রাজত্ব চলছিল। কথিত আছে, সম্রাট মিঙ-তি নাকি একজন সোনার মানুষ স্বপেড়ব দেখেছিলেন। এই স্বপ্নদৃষ্ট মানব (বুদ্ধ) এবং বৌদ্ধধর্মের অনুসন্ধানে তিনি চাঙ-খিএন- এবং ছিন-মিঙ নামক দুজন রাজদূতকে পশ্চিমদেশে প্রেরণ করেন। এই দুজন চীন-দূতই পূর্বোক্ত ভারতীয় বৌদ্ধ ভিক্ষুদ্বয়কে চীনদেশে নিয়ে যান। শোনা যায় যে, এই ভিক্ষুদ্বয়ই সর্বপ্রথম চীনসাম্রাজ্যে বৌদ্ধবিহার স্থাপন করেছিলেন। এই বিহারের নাম পো-মসে অর্থাৎ শ্বেতাশ্ব-সঙ্ঘারাম; এটা লো-ইয়ঙ (বর্তমান হো-নান-ফু) নামক স্থানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।৭৮৫
খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দী হতেই পূর্বদিকের স্থলপথ অর্থাৎ উত্তর-ব্রহ্ম-দেশের পথের সঙ্গে ভারতের পরিচয় ছিল, এটা চাঙখিএেনর বিবরণ হতে বুঝতে পারা যায়। খ্রিষ্টীয় প্র ম-দ্বিতীয় শতাব্দীতে এই পথে এবং আরো প্রাচীনকাল থেকে সমুদ্র পথে ভারত এবং পূর্বদেশের জনপদসমূহের মধ্যে যাতায়াত চলত বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। এই পথেই তৃতীয় ও চতুর্থ শতাব্দীর মধ্যেই ব্রহ্মদেশসহ সমস্ত পূর্বাঞ্চলে বৌদ্ধধর্ম ছড়িয়ে পড়ে।
সম্রাট মিন-তি (৩১৩-১৬ খ্রি.) রাজধানী চাঙ-ঙ্গানে (বর্তমান সি-ঙ্গান-ফুতে) থোঙ-থিউ-স্সে এবং পো-ন-সে নামক দুটি বিহার প্রতিষ্ঠান করেছিলেন। কথিত আছে যে, ছিন-বংশের এই পরবর্তী রাজগণের সময়ে কেবলমাত্র চাঙ-ঙ্গান ও নানকিঙে ১৮০টি বৌদ্ধবিহার ছিল এবং সমগ্র চীনসাম্রাজ্যে বৌদ্ধভিক্ষুর সংখ্যা ছিল তখন অনেক। তারা ৭৩ খণ্ড ভারতীয় গ্রন্থ চীনা ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন। চতুর্থ শতাব্দীর শেষদিকে চীনদেশে বৌদ্ধমন্দিরের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৬০৬৮। তখন ২৭জন আনুবাদকের দ্বারা ২৬৩ খণ্ড বৌদ্ধগ্রন্থ অনূদিত হয়েছিল। কিন্তু এই সময়ে চীনদেশে ভারতীয় ভিক্ষুর সংখ্যা কিরূপ ছিল, তা জানা যায় না। তবে শোনা যায় যে, ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষ দিকে ঐ দেশে ৩০০০ ভারতীয় বৌদ্ধভিক্ষু অবস্থান করছিলেন। ৭৮৬
চতুর্থ শতাব্দীর প্রথমদিকে চীনের উত্তরাঞ্চলের কিয়দংশ হূণজাতির দ্বারা অধিকৃত হয়। এর ফলে বৌদ্ধধর্ম বিস্তারে এক মহাসুযোগ উপস্থিত হল। বুদ্ধদান নামক মধ্য এশিয়ার কুচা-বাসী এক ভিক্ষু এই বিজাতীয় রাজগণের উপর অত্যধিক প্রতিপত্তি লাভ করেছিলেন। এই বুদ্ধদান বৌদ্ধশাস্ত্র অধ্যয়নার্থ দুবার কি-পিন (অর্থাৎ কাফিরিস্থান এবং উত্তর-পশ্চিম ভারতের কিয়দংশ) জনপদে গিয়ে বাস করেছিলেন। তাঁর সময়ে ইয়ে নামক স্থানে অর্থাৎ হোনান-প্রদেশের অন্তর্গত বর্তমান চাঙ-তোএ-ফুতে বৌদ্ধশাস্ত্রজ্ঞানের এক বিরাট কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল।৭৮৭
৩৫০ খ্রিষ্টাব্দে ফু-কিন সিংহাসন লাভ করলে বৌদ্ধধর্মের একজন প্রবল পরাক্রান্ত পৃষ্ঠপোষক জুটে গেল। ফু-কিন বুদ্ধদানের শিষ্য মহা- পণ্ডিত তাও-ঙ্গানকে চাঙ-ঙ্গানে আনয়ন করেন এবং নানা প্রকারে বৌদ্ধ-শাস্ত্রের চীনা অনুবাদে উৎসাহ দিতে থাকেন। আচার্য তাও-ঙ্গান বৌদ্ধশাস্ত্র এবং চীনাভাষায় অদ্বিতীয় পণ্ডিত ছিলেন। চীনদেশের বৌদ্ধধর্মে তিনি এক নবযুগ আনয়ন করেন। তিনি গুরুর নিকট ভারতীয় ভাব-ধারায় অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। সেই শিক্ষা অনুসারে তিনি অনুবাদসমূহ সংশোধন করে দিতে লাগলেন।
৭৭৬ T.C. Chattopadhyay: History of Ancient India (Prachin Bharater Itihas)
৭৭৭ P.S. Almond: British Discovery of Buddhism.
৭৭৮ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: বুদ্ধদেব (নিশ্বভারতী)
৭৭৯ James J. Novak- p. 63.
৭৮০ শহীদুল্লাহ মৃধা: মহাস্থবির শীলভদ্র।
৭৮১ রাহুল সাংকৃত্যায়ন- বৌদ্ধ দর্শন।
৭৮২ মহাশত্তিপট্ঠান সূত্ত- দীঘনিকায় ২/৯।
৭৮৩ দামোদর ধর্মানন্দ কোসাম্বি: ভারত ইতিহাস চর্চার ভূমিকা, পৃ- ১১৭-১৮।
৭৮৪ দীনেশ চন্দ্র সরকার: সাংস্কৃতিক ইতিহাসের প্রসঙ্গ।
৭৮৫ P.C. Bagchi: India and China.
৭৮৬ দীনেশ চন্দ্র সরকার: সাংস্কৃতিক ইতিহাসের প্রসঙ্গ।
৭৮৭ Dineshchandra Sircar: Studies in the Religious life.
চলবে————-
(প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্ব ১০১
লালন-পালনের দেবতা বিষ্ণুকে প্রেমের দেবতাতে পর্যাবেশিত করেই বৈষ্ণব ধর্ম থেমে থাকেনি। পরবর্তীকালে মানবীয় আশা-আকঙ্খার প্রতিফলন ঘটিয়ে ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে প্রেমের দেবতার সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়ে মানবীয় ব্যক্তি প্রেম ভগবত প্রেমে উত্তীর্ণ হয়েছে। বাংলার সংকর জাতি বৈদিক ধর্ম অস্বীকার না করেও নিজেদের আকাঙ্খিত ধর্মীয় মতাদর্শের প্রতিফলন ঘটিয়েছে বৈষ্ণব ধর্মের মাধ্যমে। এসময়ে বৈষ্ণব ধর্ম বৌদ্ধধর্মের অনেক কিছু গলধঃকরণ করে নতুন ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছে। বৈষ্ণব ধর্ম স্বীকার করে যে, বৌদ্ধ সম্ভবত বিশ্বের পালনকর্তা বিষ্ণুর নবম রূপ। কাজেই বৈষ্ণব ধর্ম একদিকে বৌদ্ধকে দেবতা হিসেবে যেমন স্বীকার করে। তেমনি অকারণে প্রাণী হত্যাও উৎসাহিত করে না। আবার বৈদিক বর্ণবাদের কঠোরতাকেও বিরোধিতা করে। তাই, এই বৈষ্ণব ধর্মে বৈদিক ধর্ম ও বৌদ্ধধর্মের একটি মিলিত রূপ পাওয়া যায়। এজন্যই বোধ হয় বৌদ্ধধর্মের অনেক প্রতিষ্ঠান বৈষ্ণব মন্দিরে পরিণত হয়েছিল।
প্রাচীনকালে বেদের ধর্ম এদেশে জনসাধারণের গ্রহণযোগ্য ধর্ম ছিল বলে যেমন প্রমাণ পাওয়া যায় না, তেমনি প্রাচীন মধ্যযুগেও বৌদ্ধ ধর্ম যতটা বাঙালির কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল ততটা বৈদিক ধর্মের গ্রহণযোগ্যতা পাওয়া যায় না। আবার প্রাচীন যুগের শেষ দিকেও বেদের চেয়ে বেদান্তের শাখা প্রশাখা সৃষ্টি হয়ে বৈদিক ও বৌদ্ধ ধর্মের নতুন রূপায়ন দেখা যায়। এমনকি, সেনরা যখন বৈদিক ধর্মের পুনঃউত্থানের চেষ্টায় রত ছিল, তারা নিজেরাও শিব ধর্ম বা বৈষ্ণব ধর্মের
পৃষ্ঠপোষক হয়ে যায়।
বৌদ্ধ ধর্ম:
প্রাকৃত ধর্ম যা কোনো কোনো আদিবাসীদের মধ্যে এখনও বর্তমান আছে, সনাতন হিন্দু ধর্ম ও বৈদিক ধর্মের পরে আদিযুগে আরো দু’টি ধর্মের উদ্ভব হয়েছিল: জৈন ও বৌদ্ধ ধর্ম। আর্য ও ভূমিপুত্রদের মধ্যে একটি অত্যন্ত সংঘাতপূর্ণ সময়ের শেষ দিকে আর্য ধর্ম, আর্য জীবনধারা এবং তাদের চিন্তা-চেতনার বিরুদ্ধে দু’টি ধর্মীয় প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর ভারতবর্ষে অত্যন্ত উচ্চকিত হয়ে উঠে। খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে পূর্বভারতে গৌতম বুদ্ধের (আ ৫৬৬-৪৮৬ খ্রিষ্টপূর্ব) আবির্ভাব হয়েছিল। তিনি পূজা, যাগযজ্ঞ, কঠোর তপশ্চর্যা, জন্মগত জাতিভেদ প্রভৃতিতে আস্থাহীন ছিলেন না। তাঁর মতে, মানবের স্বীকৃত কর্মই তার ভবিষ্যৎ গঠন করে; নির্দিষ্ট উপায়ে সদানুষ্ঠান দ্বারা সে ক্রমশঃ উনড়বত হয়ে পরিণামে নির্বাণ লাভ করতে পারে, সেজন্য বেদে বা আত্মায় বিশ্বাস কিংবা ঈশ্বর বা দেবদেবীর উপাসনা আবশ্যক নয়। এ কারণে বৌদ্ধ ধর্ম বৈদিক ধর্মের তীব্র সমালোচনার মুখোমুখি হয় এবং ব্রাহ্মণরা বৌদ্ধকে নাস্তিক এবং ধর্ম বিনাসী বলে আখ্যায়িত করেন। T.C. Chattopadhyay বলেন, “The religion founded by him contains much advice of the highest spiritual value. He did not admit anything that was devoid of reason. No matter how ancient the customs of a jati, if stronger reasons can be presented against the traditional views, then the opinions of at least some people are likely to change”.৭৭৬
বৌদ্ধ ধর্মের তিনটি প্রধান স্তম্ভ হল- বুদ্ধ, ধর্ম ও সংঘ। আত্মার পরিত্রাণের জন্য গৌতম বৌদ্ধের দেয়া অষ্টমার্গ বা আটটি নীতি হলো: সত্য দর্শন, সত্য সংকল্প, সত্যবাক্য, সত্যক্রিয়া, সত্যজীবিকা, সত্য অনুশীলন, সত্য স্মৃতি ও সত্য ধ্যান পালনের উপদেশ দেন। সর্বজীবে দয়া ও কল্যাণ বৌদ্ধ ধর্মের মূল আহ্বান। বিদ্যার্থী সঙ্ঘে প্রবেশের পরে একমাস পর্যন্ত ‘উপাসক’ থাকতেন এবং পঞ্চশীল পালনের (জীবহত্যা, চৌর্য, মিথ্যাভাষণ, ব্যাভিচার ও মাদ্রকদ্রব্য হতে বিরত থাকা) উপদেশ দেওয়া হতো। তারপর বিদ্যার্থী ভিক্ষুর পরিচ্ছদ পরিধান করে সঙ্ঘের অন্যান্য সভ্যদের সম্মুখে উপস্থিত হতেন। বিদ্যার্থীর মস্তক মুণ্ডন করতে হত এ অনুষ্ঠানে আর কাষায় বস্ত্র পরিধান ও ভিক্ষা পাত্র গ্রহণ আবশ্যক ছিল।৭৭৭ আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর পূর্বে মানবীয় গুণের এমন পূর্ণতার কথা সমসাময়িক কেন, পরবর্তী অনেক ধর্মেও বেশি শোনা যায় নি। অবশ্য এ কথা সত্যি, শুধু গৌতম বৌদ্ধের সময় নয়, সর্বযুগে, সর্বকালে এই সৎজীবনের আহ্বান সকল মানুষের জন্য একটি আদর্শ এবং সর্বধর্মে সমাদৃত।
রবীন্দ্রনাথের মতে ভগবান বুদ্ধ জ্ঞান ও প্রেমের ধারায় বিকাশ ঘটিয়েছেন। ‘সকল প্রাণী সুখী হোক’ এই বাণীর মাধ্যমে বুদ্ধ প্রকৃত পক্ষে মানুষকে বড় করেছেন। তিনি মানুষকে বসিয়েছেন দেবতার স্থানে। বলা বাহুল্য সাথে সাথে তিনি পশুকে করেছেন আদরনীয় এবং পশুহত্যা করেছেন নিষিদ্ধ।৭৭৮
বাংলাদেশে কখন থেকে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচার আরম্ভ হয় তা সঠিক করে বলা যায় না। তবে অনুমান করা যায় যে, গৌতম বৌদ্ধের সময়কাল থেকেই এদেশে বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার আরম্ভ হয়েছে। বুদ্ধদেব বাংলার পূর্বাঞ্চলে না আসলেও উত্তরাঞ্চলে এসেছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। সংযুক্তনিকায়-গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, বুদ্ধদেব একবার সুম্ভভূমি (সুহ্মভূমি) অন্তর্গত শেতক নগরে কিছুদিন বাস করেছিলেন। অঙ্গুত্তর নিকায়-গ্রন্থে বঙ্গান্তপুত্ত নামে এক বৌদ্ধ আচার্যের উল্লেখ পাওয়া যায়। বোধিসত্ত্বাবদান কল্পলতা গ্রন্থের অনাথপিণ্ডকসূতা সুমাগধার কাহিনীতে জানা যায় যে, বুদ্ধদেব স্বয়ং একবার ধর্মপ্রচারোদ্দেশে পুণ্ড্রবর্ধনে এসে ছয় মাস বাস করে গিয়াছিলেন। চীনা পরিব্রাজক ইউয়ান্-চোয়াঙ্ও বলেন, বুদ্ধদেব পুণ্ড্রবর্ধন, সমতট ও কর্ণসুবর্ণে এসে ধর্ম প্রচার করেছিলেন। আধুনিক কোনো কোনো পণ্ডিতব্যক্তি মনে করেন গঙ্গা নদীপথে বুদ্ধদেব বিহার থেকে বাংলার গৌড় অথবা মহাস্থানে এসেছিলেন। (পাটলিপুত্র এবং তার চারপাশে অনেক সংখ্যক বৌদ্ধ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান বিহার স্থাপিত হয়েছিল বলে এই প্রদেশের নামই হয়ে যায় বিহার)।৭৭৯ কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে বুদ্ধের এখানে আসা সম্পর্কে কোন স্বীকৃতি নেই। তবে বুদ্ধদেবের সমসাময়িককাল থেকেই এদেশে বৌদ্ধধর্ম প্রচার হয়েছিল বলে অনুমান করা হয়। ইউয়ান্-চোয়াঙ্ বলেন, অশোকের স্মৃতিবিজড়িত অনেকগুলি স্তুপ তিনি দেখেছিলেন পুণ্ড্রবর্ধনে, সমতটে, কর্ণসুবর্ণে এবং তাম্রলিপ্তিতে। পুণ্ড্রবর্ধন বোধ হয় সুবিস্তৃত অশোক-সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্তই ছিল; অন্তত খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে পুণ্ড্রবর্ধনে বৌদ্ধধর্ম যে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল মহাস্থান-শিলাখণ্ড-লিপিতে পরোক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়। যদিও বৌদ্ধধর্ম অনুসারী সম্রাট অশোকের মত শাসকও বাংলার বৃহত্তর অঞ্চলে রাজ্য বিস্তার করেছিলেন কিন্তু এদেশে বৌদ্ধ ধর্মের তেমন প্রসার হয়নি। তবে অনুমান হয় খ্রিষ্টীয় দ্বিতীয় বা তৃতীয় শতক থেকে এদেশে বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার ও প্রসার হতে থাকে। খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে পুণ্ড্রবর্ধনে বৌদ্ধধর্ম প্রসারের একটি পরোক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায় সাঁচী স্তূপের দুটি দানলিপি হতে; এই লিপি দু’টিতে জানা যায়, পুণ্ড্রবঢন বা পুণ্ড্রবর্ধনবাসী বৌদ্ধধর্মানুরাগী দুই ব্যক্তি এর একজন মহিলা, নাম ধর্মদত্তা এবং অপরজন পুরুষ, নাম ঋষিনন্দন- সাঁচী স্তূপের বেষ্টনী ও তোরণ নির্মাণে কিছু দান করেছিলেন।
বাংলাদেশের সর্বত্র যেসব প্রত্নতত্ত্ব এ পর্যন্ত পাওয়া গেছে তাতে দেখা যায়, সারা দেশব্যাপী এককালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল প্রচুর বৌদ্ধ মঠ ও অসংখ্য বৌদ্ধ বিহার। প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল সভ্য মানুষের প্রতিশ্র“তিপূর্ণ এক সুন্দর জীবনব্যবস্থা।তারা আরো প্রতিষ্ঠা করেছিল অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় সে যুগে এক অশ্রুতপূর্ব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেখানে একসময় এ বাংলাদেশেরই এক কৃতিসন্তান আচার্য শিলভদ্র (৫৬১ অথবা ৬৩৫ খ্রিষ্টাব্দে) প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হন এবং দীর্ঘ ২০ বছর প্রধান আচার্য হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন।৭৮০ বৌদ্ধধর্মের মূল বক্তব্য গৌতম বুদ্ধের চারটি সিদ্ধান্তের উপর দন্ডায়মান। এই চারটি হল: ১) ঈশ্বরকে অস্বীকার করা ২)আত্মাকে নিত্য স্বীকার না করা ৩) কোন গ্রন্থকে অকাট্য প্রমাণ হিসেবে স্বীকার না করা এবং ৪) জীবন প্রবাহকে এ শরীরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না মানা। বুদ্ধের শিক্ষা এবং দর্শন এই চার সিদ্ধান্তের অবলম্বনের ওপরে দণ্ডায়মান। প্রথম তিনটি সিদ্ধান্ত বৌদ্ধধর্মকে অন্যান্য ধর্মথেকে পৃথক করে। উপরোক্ত তিন সিদ্ধান্ত বস্তুবাদ ও বৌদ্ধধর্মে সমভাবে বিরাজমান। কিন্তু চতুর্থ সিদ্ধান্ত অর্থাৎ জীবনপ্রবাহকে এই শরীর পর্যন্ত সীমিত না মানা, একে বস্তুবাদ থেকে পৃক করে এবং সেই সঙ্গে এই সিদ্ধান্তটি ব্যক্তির ভবিষ্যৎকে আশাপ্রদরূপে দেখাবার এক সুন্দর প্রচেষ্টা, প্রকৃতপক্ষে যা না থাকলে কোনো আদর্শবাদই কার্যকরী রূপ পেতে পারে না।৭৮১
মানব জীবনে দুঃখ নিবারন করাই প্রধান কাজ বা ধর্ম। বুদ্ধের মূল শিক্ষা এই দুঃখ নিবারন করে জীবনের নির্বান লাভ করা। বুদ্ধের মতে, জন্ম দুঃখ, বার্ধক্য দুঃখ, মৃত্যু দুঃখ, শোক, অশান্তি সবই দুঃখ।৭৮২ এ দুঃখ নিবারনের পথকেই বুদ্ধ অষ্টমার্গ বলেছেন। এই অষ্টমার্গ তিন ভাগে বিভক্ত, যা ইতিপূর্বে উলেখ করা হয়েছে। এগুলো হলো জ্ঞান, শীল ও সমাধি। অষ্টমার্গ পালন করলেই জ্ঞান, শীল ও সমাধি লাভ সম্ভব এবং এতে নির্বাণপ্রাপ্ত হয়ে দুঃখ চিরতরে দূর হবে। বৌদ্ধধর্ম প্রচার
৫২০ থেকে ৩৬০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের মধ্যে মগধ সাম্রাজ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। আনুমানিক ৫২০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে বিম্বিসার অঙ্গ রাজ্য জয় করে মগধ সাম্রাজ্যের পরিধি বিস্তৃতি করেন এবং ৩৬০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে মহাপদ্মনন্দ আর্য জনগোষ্ঠীর ক্ষমতা সমূলে ধ্বংস করে মগধের শক্তি অপ্রতিহত করে তুলেন। উক্ত সময়ে মগধে বিস্তার লাভ করে বৌদ্ধ ধর্ম। মগধ সাম্রাজ্যে, বিশেষ করে রাজধানী পাটলিপুত্রের চার পাশের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে অসংখ্য বৌদ্ধ ধর্মের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বিহার, গড়ে উঠে যার জন্য আজও এ প্রদেশ বিহার নামেই পরিচিত। তবে বিহারের মতো বৌদ্ধধর্ম প্রচারের প্রথম দু’শ বছরের ভিতর ভারতের অন্যত্র এই ধর্ম এত পরিচিতি লাভ করেনি। খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে মৌর্যবংশীয় মহাপরাক্রান্ত সম্রাট আশোকের (আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব ২৭২-২৩২) পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে এই নবধর্ম যেন দ্বিগ্বিজয়ে মেতে উঠল। অশোক নিজরাজ্যে এবং পাশ্ববর্তী রাজ্যসমূহে ধর্ম প্রচারের চেষ্টা করেছিলেন বলে জানা যায়। ভারতের সর্বত্র ছাড়াও সম্রাট অশোক শ্রীলঙ্কা, ব্রহ্মদেশ, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, চীন ও তিব্বত সাম্রাজ্যে ধর্মপ্রচার করতে বৌদ্ধ ভিক্ষু ও পণ্ডিতদের পাঠিয়েছিলেন। কথিত আছে যে, সম্রাট নিজ পুত্র মহেন্দ্র ও কন্যা সংখমিত্রাকে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের জন্য শ্রীলঙ্কা পাঠিয়েছিলেন। আবার পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের অনেক অংশ তৎকালে মৌর্য সাম্রাজ্যের অন্তর্গত ছিল। পরবর্তীকালে কূষাণবংশীয় রাজগণের আমলে (খ্রিষ্টীয় ১ম-২য় শতাব্দীতে) ঐ অঞ্চলের নানা স্থানে বৌদ্ধগণ দীর্ঘকালস্থায়ী প্রতিপত্তি লাভ করেছিল। কারণ, কণিষ্কসহ কয়েকজন কূষাণবংশীয় সম্রাট কেবল যে বৌদ্ধমতের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন তাই নয়, তাঁদের সাম্রাজ্যও মধ্যএশিয়া ও উত্তরভারতের অধিকাংশ স্থান জুড়ে বিস্তৃত ছিল।
দ্রাবিড় প্রভাবিত দাক্ষিণাত্যে আর্যদের বিস্তার খুব মন্থর ছিল। এজন্যই বোধহয় বৌদ্ধধর্ম সহজে বিস্তার লাভ করতে পেরেছিল। বুদ্ধ নিজেও সেখানে ধর্ম প্রচারের জন্য অবস্থান করেছিলেন। কাশী-ভরদ্বাজ নামে এক ব্রাহ্মণ কৃষক সেখানে তার অন্যতম শিষ্য ছিলেন। তার অনুসারীরা বুদ্ধের মূল শিক্ষার বিষয়বস্তু পালি ভাষায় সংরক্ষণ করে গেছেন। এমনকি, সম্রাট কনিস্কের সময়ে যখন বৌদ্ধ ধর্মের ৪র্থ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়, বৌদ্ধ দর্শনের মূল ধারায় বিভাজন হয়ে উত্তর ভারতের অভিজাত শ্রেণী মহাযানের পৃষ্ঠপোষক সেজে বৌদ্ধ দর্শনকে সুক্ষ্মাতিসূক্ষ্মরূপে ব্যক্ত করতে সংস্কৃত ভাষার আশ্রয় নিলেন।
এই সংস্কৃত পাণিনির ব্যাকরণ সিদ্ধ ভাষা না হলেও বুদ্ধের মূল শিক্ষা ও ভাষা থেকে সাধারণ মানুষ দূরে সরে গেল।৭৮৩ কিন্তু দক্ষিণের সাধারণ মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস হীনযান (যা অবজ্ঞা ভরে অভিজাত শ্রেণী এই নাম দিয়েছিল) ও পালি ভাষা তারা আঁকড়িয়ে ধরে রেখেছিল দীর্ঘদিন। কিন্তু ধর্ম তত্ত্ববিদ ও সে যুগের শ্রেষ্ঠ মনিষী নাগার্জুন মহাযান মতবাদকে দক্ষিণে পৌঁছে দিয়েছিলেন। আস্তে আস্তে হীনযান দাক্ষিণাত্যে সংকুচিত হয়ে যায়।
কনিষ্কের সময়ে উত্তর ভারতের শ্রেষ্ঠ বৌদ্ধধর্ম গুরু ‘মাতৃচেত’ কিন্তু মহাযানের পিষ্ঠপোষক ছিলেন না বলে জানা যায়। কথিত আছে যে, চীন সাম্রাজ্যের স্থাপয়িতা চে-হুআং-তি (খ্রিষ্টপূর্ব ২৫৫ হতে ২২১ বা ২০৬ অব্দ পর্যন্ত)পশ্চিমের দেশগুলির সংস্রবে আসতে যত্নবান হয়েছিলেন। দ্বিতীয়ত: তিনি মৌর্যবংশীয় সম্রাট অশোকের সমসাময়িক ছিলেন। ভারতীয় ভাষার চীন কথাটি কিন্তু এই প্রাচীন ছিনবংশের নামের সঙ্গে সম্পর্কিত বলেই অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন।
কারণ ভারতীয় ভাষায় শব্দটির ব্যবহার নিতান্ত আধুনিক নয়। ‘বুদ্ধবংশ’ নামক পালি বৌদ্ধগ্রন্থে, কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্র-এ এবং আন্ধ্র-প্রদেশের গুন্টূর জেলার অন্তর্গত নাগার্জুনকোন্ডতে প্রাপ্ত বীরপুরুষদত্ত নামক ইক্ষাকুবংশীয় জনৈক রাজার শিলালেখে চীন নামটির ব্যবহার দেখা যায়।৭৮৪ বুদ্ধবংশ খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীতে রচিত হয়েছিল বলে অনুমিত হয়েছে। ভারতের সঙ্গে চীনের পরিচয় ও লেনদেন বহু প্রাচীন।
খ্রিষ্টপূর্ব ২ অব্দে ঙ্গাই-তি নামক চীন সম্রাটের রাজত্বকালে এদেশ থেকে একখানি বৌদ্ধগ্রন্থ উপহার প্রাপ্ত হন। পণ্ডিতেরা মনে করেন যে, এই সর্বপ্র ম চীনসাম্রাজ্যে একখানি খাঁটি বৌদ্ধগ্রন্থ প্রবেশ করল। ক্যাশ্যপ-মাতঙ্গ এবং ধর্মরত্ন ৬৫ খ্রিষ্টাব্দে চীন-রাজধানীতে উপনীত হন; তখন সম্রাট মিঙ-তির রাজত্ব চলছিল। কথিত আছে, সম্রাট মিঙ-তি নাকি একজন সোনার মানুষ স্বপেড়ব দেখেছিলেন। এই স্বপ্নদৃষ্ট মানব (বুদ্ধ) এবং বৌদ্ধধর্মের অনুসন্ধানে তিনি চাঙ-খিএন- এবং ছিন-মিঙ নামক দুজন রাজদূতকে পশ্চিমদেশে প্রেরণ করেন। এই দুজন চীন-দূতই পূর্বোক্ত ভারতীয় বৌদ্ধ ভিক্ষুদ্বয়কে চীনদেশে নিয়ে যান। শোনা যায় যে, এই ভিক্ষুদ্বয়ই সর্বপ্রথম চীনসাম্রাজ্যে বৌদ্ধবিহার স্থাপন করেছিলেন। এই বিহারের নাম পো-মসে অর্থাৎ শ্বেতাশ্ব-সঙ্ঘারাম; এটা লো-ইয়ঙ (বর্তমান হো-নান-ফু) নামক স্থানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।৭৮৫
খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দী হতেই পূর্বদিকের স্থলপথ অর্থাৎ উত্তর-ব্রহ্ম-দেশের পথের সঙ্গে ভারতের পরিচয় ছিল, এটা চাঙখিএেনর বিবরণ হতে বুঝতে পারা যায়। খ্রিষ্টীয় প্র ম-দ্বিতীয় শতাব্দীতে এই পথে এবং আরো প্রাচীনকাল থেকে সমুদ্র পথে ভারত এবং পূর্বদেশের জনপদসমূহের মধ্যে যাতায়াত চলত বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। এই পথেই তৃতীয় ও চতুর্থ শতাব্দীর মধ্যেই ব্রহ্মদেশসহ সমস্ত পূর্বাঞ্চলে বৌদ্ধধর্ম ছড়িয়ে পড়ে।
সম্রাট মিন-তি (৩১৩-১৬ খ্রি.) রাজধানী চাঙ-ঙ্গানে (বর্তমান সি-ঙ্গান-ফুতে) থোঙ-থিউ-স্সে এবং পো-ন-সে নামক দুটি বিহার প্রতিষ্ঠান করেছিলেন। কথিত আছে যে, ছিন-বংশের এই পরবর্তী রাজগণের সময়ে কেবলমাত্র চাঙ-ঙ্গান ও নানকিঙে ১৮০টি বৌদ্ধবিহার ছিল এবং সমগ্র চীনসাম্রাজ্যে বৌদ্ধভিক্ষুর সংখ্যা ছিল তখন অনেক। তারা ৭৩ খণ্ড ভারতীয় গ্রন্থ চীনা ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন। চতুর্থ শতাব্দীর শেষদিকে চীনদেশে বৌদ্ধমন্দিরের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৬০৬৮। তখন ২৭জন আনুবাদকের দ্বারা ২৬৩ খণ্ড বৌদ্ধগ্রন্থ অনূদিত হয়েছিল। কিন্তু এই সময়ে চীনদেশে ভারতীয় ভিক্ষুর সংখ্যা কিরূপ ছিল, তা জানা যায় না। তবে শোনা যায় যে, ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষ দিকে ঐ দেশে ৩০০০ ভারতীয় বৌদ্ধভিক্ষু অবস্থান করছিলেন। ৭৮৬
চতুর্থ শতাব্দীর প্রথমদিকে চীনের উত্তরাঞ্চলের কিয়দংশ হূণজাতির দ্বারা অধিকৃত হয়। এর ফলে বৌদ্ধধর্ম বিস্তারে এক মহাসুযোগ উপস্থিত হল। বুদ্ধদান নামক মধ্য এশিয়ার কুচা-বাসী এক ভিক্ষু এই বিজাতীয় রাজগণের উপর অত্যধিক প্রতিপত্তি লাভ করেছিলেন। এই বুদ্ধদান বৌদ্ধশাস্ত্র অধ্যয়নার্থ দুবার কি-পিন (অর্থাৎ কাফিরিস্থান এবং উত্তর-পশ্চিম ভারতের কিয়দংশ) জনপদে গিয়ে বাস করেছিলেন। তাঁর সময়ে ইয়ে নামক স্থানে অর্থাৎ হোনান-প্রদেশের অন্তর্গত বর্তমান চাঙ-তোএ-ফুতে বৌদ্ধশাস্ত্রজ্ঞানের এক বিরাট কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল।৭৮৭
৩৫০ খ্রিষ্টাব্দে ফু-কিন সিংহাসন লাভ করলে বৌদ্ধধর্মের একজন প্রবল পরাক্রান্ত পৃষ্ঠপোষক জুটে গেল। ফু-কিন বুদ্ধদানের শিষ্য মহা- পণ্ডিত তাও-ঙ্গানকে চাঙ-ঙ্গানে আনয়ন করেন এবং নানা প্রকারে বৌদ্ধ-শাস্ত্রের চীনা অনুবাদে উৎসাহ দিতে থাকেন। আচার্য তাও-ঙ্গান বৌদ্ধশাস্ত্র এবং চীনাভাষায় অদ্বিতীয় পণ্ডিত ছিলেন। চীনদেশের বৌদ্ধধর্মে তিনি এক নবযুগ আনয়ন করেন। তিনি গুরুর নিকট ভারতীয় ভাব-ধারায় অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। সেই শিক্ষা অনুসারে তিনি অনুবাদসমূহ সংশোধন করে দিতে লাগলেন।
৭৭৬ T.C. Chattopadhyay: History of Ancient India (Prachin Bharater Itihas)
৭৭৭ P.S. Almond: British Discovery of Buddhism.
৭৭৮ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: বুদ্ধদেব (নিশ্বভারতী)
৭৭৯ James J. Novak- p. 63.
৭৮০ শহীদুল্লাহ মৃধা: মহাস্থবির শীলভদ্র।
৭৮১ রাহুল সাংকৃত্যায়ন- বৌদ্ধ দর্শন।
৭৮২ মহাশত্তিপট্ঠান সূত্ত- দীঘনিকায় ২/৯।
৭৮৩ দামোদর ধর্মানন্দ কোসাম্বি: ভারত ইতিহাস চর্চার ভূমিকা, পৃ- ১১৭-১৮।
৭৮৪ দীনেশ চন্দ্র সরকার: সাংস্কৃতিক ইতিহাসের প্রসঙ্গ।
৭৮৫ P.C. Bagchi: India and China.
৭৮৬ দীনেশ চন্দ্র সরকার: সাংস্কৃতিক ইতিহাসের প্রসঙ্গ।
৭৮৭ Dineshchandra Sircar: Studies in the Religious life.
চলবে————-
খবর বিভাগঃ
বাংলাদেশের ইতিহাস