আদি বাংলার ইতিহাস
(প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্ব ১০২
৩৮১-৮৫ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে মনীষী তাও-ঙ্গানের নেতৃত্বে কাজ করে গৌতমসংঘদেব, ধর্মনন্দী, সঙ্ঘভুতি প্রভৃতি বৌদ্ধাচার্যগণ অসংখ্য ভারতীয়গ্রন্থ চৈনিক ভাষার অনুবাদ করেছিলেন।৭৮৮ খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষ এবং সপ্তম শতাব্দীর প্র মভাগে নম-রি-স্রোঙ-সন (আ ৫৭০-৬২০ খ্রিষ্টাব্দ) নামক একজন শক্তিমান রাজা তিব্বতের জনক হিসেবে ইতিহাসে স্বীকৃত। মধ্যএশিয়ায় বিজয় অভিযান চালানোর সময়ে তিনি বৌদ্ধ ভিক্ষুগণের সংস্পর্শে এসে বুদ্ধের শান্তিময় মুক্তিমার্গের বিষয় অবগত হয়ে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। কথিত আছে, তার চেষ্টায় লাসা নগরীতে দুটি বৌদ্ধ বিহার প্রতিষ্ঠিত হয়। তন্মধ্যে রা-মো-চে নামক বিহারটি অদ্যাবধি বর্তমান আছে এবং অপর বিহারটি চীনাদের দ্বারা ধ্বংস হয়েছিল। তিব্বতীয়গণ এই নরপতিকে বোধিসত্ত্ব অবলোকিতেশ্বর, তদীয় নেপালী মহিষীকে সবুজ-তারাদেবী এবং চীনা মহিষীকে শ্বেত-তারাদেবী জ্ঞানে পূজা করে থাকে।৭৮৯ ৬৩৯ খ্রিষ্টাব্দে অনূরপুত্র থোঙ-মি সম্ভোত নামক একজন প্রাজ্ঞ ব্যক্তিকে বর্ণমালার সন্ধানে কাশ্মীরদেশে প্রেরণ করা হয় এবং স্বদেশের জন্য উদ্ভাবিত বর্ণমালা সঙ্গে নিয়ে তিব্বতে ফিরে যান। তিব্বতীয় লিপি ষষ্ঠ-সপ্তম শতাব্দীতে উত্তরভারতে প্রচলিত ক্রমবিবর্তিত ব্রাহ্মীলিপি হতে সম্ভূত। এই বর্ণমালা তিব্বতীয় সভ্যতায় ভারতবর্ষের সর্বশ্রেষ্ঠ দান।৭৯০
জৈন ধর্ম
জৈন ধর্ম একসময়ে আদি ভারত উপমহাদেশে একটি উল্লেখযোগ্য ধর্ম হলেও সমস্ত বাংলাদেশে তার প্রচার ও প্রসার ছিল না। জৈন ধর্ম যমুনা পার হয়ে পূর্বাঞ্চলে এসেছিল এমন কোন হদিস পাওয়া যায় না। পশ্চিম বাংলার পশ্চিমাঞ্চল এবং উত্তরবঙ্গে এ ধর্ম সীমাবদ্ধ ছিল। তবে, পশ্চিম বাংলায় এ ধর্মের সাক্ষী হিসেবে মানভূম, সিংহভূম, বীরভূম ও বর্ধমান এ চারটি স্থানের নামই জৈন ধর্মের তীর্থাংকরদের নামের সঙ্গে জড়িত। জৈনপুরাণ মতে চব্বিশজন তীর্থাংকরের মধ্যে বিশজনেরই নির্বান স্থান হাজারীবাগ জেলার পরেশনাথ পাহাড়ে।
প্রাচীন জৈন ধর্মগ্রন্থে উলেখ আছে যে, বর্ধমান মহাবীর রাঢ় প্রদেশে ধর্মপ্রচারে এসেছিলেন, কিন্তু সেখানকার লোকেরা মহাবীর এবং তার সঙ্গী সাথীদের সাথে অসদ্ব্যবহার করেছিলেন। কোন সময়ে জৈনধর্ম বাংলায় প্রথম প্রতিষ্ঠা লাভ করে, তা সঠিক বলা না গেলেও মহাবীরের জীবদ্দশায় বা তারপর আরো দু’এক শত বছরের মধ্যে বাংলাদেশের জৈনধর্ম প্রতিষ্ঠা লাভ করে নি বলেই মনে হয়। দিব্যাবদানে অশোকের সম্বন্ধে একটি গল্প আছে। পুণ্ড্রবর্ধন নগরীর জৈনগণ মহাবীরের চরণতলে পতিত বুদ্ধদেরেব চিত্র অঙ্কিত করেছে শুনে তিনি নাকি পাটলিপুত্রের সমস্ত জৈনগণকে হত্যা করেছিলেন।৭৯১ এই গল্পটির মূলে কতটা সত্য আছে বলা কঠিন। সুতরাং অশোকের সময় পর্যন্ত উত্তরবঙ্গে জৈন-সম্প্রদায় বোধহয় ছিল না। তবে খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে বঙ্গে যে জৈনধর্ম দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রাচীন জৈনগ্রন্থ কল্পসূত্রমতে মৌর্যসম্রাট চন্দ্রগুপ্তের সমসাময়িক জৈন আচার্য ভদ্রবাহুর শিষ্য গোদাস- যে ‘গোদাসগণ’ প্রতিষ্ঠিত করেন, কালক্রমে তা চার শাখায় বিভক্ত হয়। এর তিনটির নাম তাম্রলিপ্তিক, কোটীবর্ষীয় এবং পুণ্ড্রবর্ধনীয়। এই তিনটি যে বাংলার
তিনটি সুপরিচিত নগরীর নাম হতে উদ্ভূত, তাতে কোন সন্দেহ নেই। কল্পসূত্রে উল্লিখিত, এ শাখাগুলি কাল্পনিক নয়; সত্যসত্যই ছিল। কারণ, খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীতে উৎকীর্ণ শিলালিপিতে তাদের উল্লেখ আছে। সুতরাং উত্তরবঙ্গে পুণ্ড্রবর্ধন, কোটীবর্ষ ও দক্ষিণবঙ্গে (তাম্রলিপ্তি) যে খুব প্রাচীনকাল হতেই জৈনধর্ম প্রসার লাভ করেছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায়। পাহাড়পুরে প্রাপ্ত একটি তাম্রশাসন হতে জানা যায় যে খ্রিষ্টীয় চর্তু শতাব্দীতে বা তার পূর্বে ঐ স্থান একটি জৈন বিহার ছিল।
বারানসীর পঞ্চস্তুপীয় শাখার আচার্য গৃহনন্দীর শিষ্য ও তাদের অনুচরবৃন্দ এই বিহারের অধিবাসী ও কর্মকর্তা ছিলেন। তারা প্রতিবেশী এক ব্রাহ্মণ দম্পত্তির নিকট হতে কিছু ভূমি দানস্বরূপ লাভ করেছিলেন এই বিহারের ব্যয় নির্বাহের জন্য।বিহারের ব্যয় বলতে অর্হৎদের নিত্য পূজা- সেবার ফুল, চন্দন, ধূপ ইত্যাদির ব্যয়। এর আরো দেড়শ’ত বছর পরে য়ুয়ান-চুয়াঙ বাংলায় এসে, সপ্তম শতকের দ্বিতীয়ার্ধে তিনি বৈশালী, পুণ্ড্রবর্ধন, সমতট ও কলিঙ্গে দিগম্বর নির্গ্রহ প্রচুর জৈন দেখেছিলেন বলে উলেখ করেন। সম্ভবত তিনি আজীবিক সম্প্রদায়ের লোক দেখে জৈন মনে করে থাকতে পারেন।৭৯২ কারণ তখন দেশে প্রচুর সংখ্যক আজীবিক ছিলেন; যারা আসনে-বসনে, পূজাপার্বণে জৈনদের মতই ছিল। কাজেই য়ুয়ান-চুয়াঙ-এর মত বৌদ্ধের পক্ষে পার্থক্য করা হয়ত সম্ভব ছিল না। তবে, সম্ভবত পাল-আমলের শেষদিকে বীরভূম-পুরুলিয়া অঞ্চলে কোনো কোনো জায়গায় নির্গ্রন্থ জৈনদের সমৃদ্ধ কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল। কয়েকটি জৈনমূর্তি ছাড়া উলেখ করার মতো বেশি কিছু পাওয়া যায়নি।
৬২৯-৬৪৫ সাল পর্যন্ত হিউয়েন সাঙ ভারত ভ্রমণ করেন। বাংলা-ভ্রমণ উলেখ করে তিনি বলেছেন যে, তাঁর সময়ে বাংলায় দিগম্বর জৈনের সংখ্যা খুব বেশি ছিল।৭৯৩ কিন্তু তার পরই বাংলায় জৈনধর্মের প্রভাব হ্রাস হয়। পাল ও সেনরাজগণের তাম্রশাসনে এই সম্প্রদায়ের কোন উল্লেখ নেই। তবে এটি যে একেবারে লুপ্ত হয় নি, প্রাচীন জৈনমূর্তি হতেই তা প্রমাণিত হয়।
জৈনরা এদেশ ও দেশের মানুষ সম্পর্কে অনেক বেশি খবরা-খবর রাখত এবং অত্যন্ত সতর্কভাবে ধর্মপ্রচার ও জীবনযাপন করত। জৈন ধর্মগ্রন্থ ভগবতী সূত্রে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে, আদিতে বাংলার বসবাসকারী জনমানুষের প্রতি জৈন ধর্ম প্রবর্তক মহাবীর বা তার অনুসারীদের ধারণা ভাল ছিল না- এমন কথা তারা উল্লেখ করে গেছেন।
বৈষ্ণব ধর্ম
কখন থেকে বৈষ্ণব ধর্মের প্রচার ও প্রসার আরম্ভ হয় এ সম্বন্ধে সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলা এখনও অসম্ভব। পশ্চিম বাংলার বাকুড়া জেলার শুশুনিয়া পাহাড়ের এক গুহার প্রাচীরে একটি বিষ্ণুচক্র উৎকীর্ণ পাওয়া গেছে এবং তা নিন্মে লিপিকারের পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে চক্রস্বামীর পূজক হিসেবে। বিষ্ণুই ছিলেন চক্রস্বামী হিসেবে পরিচিত এবং গুহাটি ছিল একটি বিষ্ণু মন্দির। পঞ্চম শতকের প্রথমার্ধে বগুড়া জেলার বালিগ্রামে এক গোবিন্দস্বামীর মন্দির প্রতিষ্ঠার খবর পাওয়া যায়। বিষ্ণুরই অপর নাম গোবিন্দস্বামী। কোকামুখস্বামীকে কেউ মনে করেন বিষ্ণুর অন্যতম রূপ, কেউ মনে করেন শিবের। বরাহপুরাণ মতে কোকামুখ স্থানের নাম; এর অবস্থিতি কৌশিকী ও তিস্রোতার অনতিদূরে হিমালয়ের কোন অংশে; স্থানটি বিষ্ণুর পরম প্রিয় এবং এখানকার বিষ্ণু-প্রতিমাই শ্রেষ্ঠ বলে দাবি করা হয়েছে। বিষ্ণুই কোকামুখ বিষ্ণু, কৃষ্ণ বা রক্তবরাহরূপী। সপ্তম শতকের লোকনাথ-পট্টোলীতে ত্রিপুরা-জেলায় ভগবান অনন্ত-নারায়ণের (অনন্তশয়ান বিষ্ণু) পূজার খবর পাওয়া যায়। কৈলান-পট্টোলীতে আছে, এই সপ্তম শতকেই শ্রীধারণরাত ছিলেন পরম বৈষ্ণব এবং পুরুষোত্তমের ভক্ত উপাসক; তিনি আবার পরম কারুণিকও ছিলেন এবং শাস্ত্রনিয়ম ছাড়া অযথা প্রাণীবধের বিরোধী ছিলেন। পৌরাণিক বিষ্ণুর বিভিন্ন রূপ ও ধ্যানের সঙ্গে সমসাময়িক বাঙালির পরিচয় ছিল। এই বিভিন্ন রূপের বর্ণনা শুধু সাহিত্যে নয়, সঙ্গে সঙ্গে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল হতে বিভিন্ন বৈষ্ণব-প্রতিমার সাক্ষ্যও রয়েছে। বাংলার সমসাময়িক সাহিত্যে বা পুরাণে বা অন্য কোন গ্রন্থে পৌরাণিক দেবদেবীদের তত্ত্ব ও প্রকৃতির ব্যাখ্যা বা বিবরণ জানার মত উপকরণ যেহেতু নেই তাই এসব প্রতিমা-সাক্ষ্যই বিভিন্ন ধর্ম সম্প্রদায়গত দেবদেবীদের এবং পৌরাণিক ধর্মের ধ্যান ও কল্পনার একমাত্র পরিচয়। প্রাচীন বাংলায় এ ধরনের সাক্ষ্যের অভাব নেই। অবশ্য চর্তু শতকের পূর্বের কোন নিদর্শন যেমন নেই তেমনি অষ্টম শতক পর্যন্ত বিষ্ণুর বিভিন্ন মূর্তি প্রাপ্তি প্রচুর নয়। এর প্রাচুর্য পাওয়া যায় অষ্টম শতকের পর হতে। গুপ্ত যুগে এবং পরে অন্তত কয়েকটি বৈষ্ণবপ্রতিমার কথা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। রংপুর জেলায় প্রাপ্ত একাধিক ধাতু নির্মিত বিষ্ণু-মূর্তি ও একটি অনন্ত শয়ান বিষ্ণু-মূর্তি, বরিশাল জেলার লক্ষণকাটির গরুরবাহন এবং সপরিবার বিষ্ণু, রাজশাহী জেলায় যোগীর সওয়ান নামেপ্রাপ্ত বিষ্ণু-মূর্তি, মালদহ জেলার হাঁকরাইল গ্রামে প্রাপ্ত বিষ্ণু মূর্তি ঢাকা জেলার সাভার গ্রামে প্রাপ্ত পোড়ামাটির ফলকে উৎকীর্ণ এক বিষ্ণুর প্রতিমা প্রভৃতি সমস্তই এই পর্বের।
এই প্রতিমাগুলোর রূপ-কল্পনা ও লক্ষণ আলোচনা করলে স্পষ্টই বুঝা যায় যে, বৈষ্ণব ধর্ম, গুপ্তযুগের পূর্বেই বাংলাদেশে পরিচিতি লাভ করে এবং সাদরে গৃহীত হয়। বিশেষ করে পূর্ব বাংলার রাজন্যবর্গ থেকে আরম্ভ করে শূদ্ররা পর্যন্ত এ ধর্মের ভক্ত ছিল। আজো বাংলাদেশের কৈবর্ত সম্প্রদায় ও নিন্মবর্ণেরহিন্দুদের মধ্যে বৈষ্ণব ধর্মের যথেষ্ঠ পৃষ্ঠপোষকতা ও গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।
গুপ্ত ও গুপ্তোত্তর পর্বের বাংলায় বিষ্ণুর যে কয়েকটি রূপের সঙ্গে আমাদের পরিচয় (গোবিন্দস্বামী, কোকামুখস্বামী, শ্বেতবরাহস্বামী, প্রদ্যুমেড়বশ্বর, অনন্ত-নারায়ণ, পুরুষোত্তম) তাদের মধ্যে স্থানীয় বৈশিষ্ট্য কিছু নেই। পঞ্চরাত্রীয় চতুর্ব্যুহবাদের কোন আভাসও এই পর্বের লিপিগুলোতে কোথাও নেই। চতুর্ব্যুহের প্রদ্যুমেড়বর সঙ্গে উপরোক্ত প্রদ্যুমেড়বশ্বরের কোন সম্বন্ধ আছে বলে মনে হয় না। গুপ্ত-পর্বের রাজা-মহারাজরা নিজেদের পরিচয়ে সাধারণাত ‘পরমভাগবত’ পদটি ব্যবহার করতেন; মনে হয়, তারা সকলেই ছিলেন বৈষ্ণব ভাগবদ্ধর্মে দীক্ষিত। বস্তুত, এই পর্বের ভাগবদ্ধর্ম ঋগবেদীয় বিষ্ণু, পঞ্চরাত্রীয় নারায়ণ, মথুরা অঞ্চলের সাত্বত-বৃষ্ণিদের বাসুদেব কৃষ্ণ, পশুপালক আভীর প্রভৃতি জনগোষ্ঠীর গোপাল ইত্যাদি সমন্বিত এক রূপ বলেই মনে করেন নীহাররঞ্জন রায়। এই ভাগবদ্ধর্মই গুপ্ত ও গুপ্তোত্তর পর্বে বাংলাদেশে প্রচার লাভ করে এবং পালপর্বে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। পরমভাবগত পরিচয় ছাড়া, এই পর্বের একজন রাজা- সপ্তম শতকের রাতবংশীয় সমতটেশ্বর শ্রীধারণ- আত্মপরিচয় দিচ্ছেন পুরুষোত্তমের পরমভক্ত পরম বৈষ্ণব রূপে। পুরুষোত্তম তো বিষ্ণুরই অন্যতম নাম ও রূপ।
বৈষ্ণব ধর্মের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধে যুক্ত কৃষ্ণায়ণ ও রামায়ণ-কাহিনী যে গুপ্ত ও গুপ্তোত্তর পর্বেই বাংলাদেশে প্রচার ও প্রসার লাভ করেছিল তার কিছু প্রমাণ পাওয়া যায় পাহাড়পুর মন্দিরের পোড়ামাটির ও পাথরের ফলকগুলোতে। শ্রীকৃষ্ণের গোবর্ধন ধারণ, চাণুর ও মুষ্টিকের সঙ্গে কৃষ্ণ ও বলামের মল্লযুদ্ধ, যমালার্জুন অথবা জোড়া অর্জুন বৃক্ষ উৎপাটন, কেশী রাক্ষসবধ, গোপীলীলা, কৃষ্ণকে নিয়ে বাসুদেবের গোকুল গমন, রাখাল বালকদের সঙ্গে সঙ্গে কৃষ্ণ ও বলরাম গোকুলে কৃষ্ণের বাল্য জীবনলীলা প্রভৃতি কৃষ্ণলীলার অনেক গল্প এই ফলকগুলোতে উৎকীর্ণ হয়েছে। বলরাম ও দেবী যমুনার স্বতন্ত্র প্রতিকৃতিও বিদ্যমান। একটি ফলকে প্রভামণ্ডলযুক্ত, লাস্যভঙ্গীতে দণ্ডায়মান একজোড়া মিথুনমূর্তি উৎকীর্ণ- দক্ষিণে নারীমূর্তি, বামে নরমূর্তি। এখানে কেউ কেউ নারী মূর্তিকে রাধার মূর্তি কল্পনা করলেও প্রকৃতপক্ষে রাধা কল্পনার ঐতিহ্য এত প্রাচীন নয়। হালের গাথা সপ্তশতীতে রাধার উল্লেখ আছে বটে, কিন্তু সে উল্লেখের প্রাচীনত্ব নিশ্চিত করে নির্ধারণ করা কঠিন। তবে, জয়দেবের (দ্বাদশ শতক) পূর্বেই কোনও সময়ে, এই বাংলাদেশেই রাধাতত্ত্ব ও রাধার রূপ-কল্পনা সৃষ্টিলাভ করেছিল বলে ধারণা করা হয়। বস্তুতঃ বৈষ্ণব ধর্মের রাধা শাক্তধর্মের শক্তিরই বৈষ্ণব রূপান্তর ও নামান্তর মাত্র।
শিবের মতো কৃষ্ণ বা বিষ্ণুই বৈষ্ণবধর্মে পরমপুরুষ এবং এই পুরুষের প্রকৃতি বা শক্তি হচ্ছেন রাধা। এই পৃথিবী বা প্রকৃতি যে বিষ্ণুর শক্তি বা বৈষ্ণবী, এই ধ্যান ষষ্ঠ-সপ্তম শতকেই প্রসার লাভ করেছিল। পাহাড়পুরের যুগলমূর্তি কৃষ্ণ ও রুক্সিনি বা সত্যভামার শিল্পরূপ বলেই কেউ কেউ মনে করেন। পাহাড়পুরের কৃষ্ণলীলার গল্পগুলি মন্দিরের অলংকরণের উদ্দশ্যেই উৎকীর্ণ হয়েছিল। রামায়ণের কয়েকটি গল্পের যে প্রতিকৃতি আছে (যেমন, বানরসেনা কর্তৃক সেতু নির্মাণ, বালী ও সুগ্রীবের যুদ্ধ ইত্যাদি) সে-সম্বন্ধেও এ-উক্তি প্রযোজ্য। সংশয় করা চলে না যে, গুপ্ত ও গুপ্তোত্তর যুগের লোকায়ত বাঙালি জীবনে কৃষ্ণলীলা ও রামায়ণের কাহিনী যথেষ্ঠ প্রসার ও সমাদর লাভ করেছিল এবং এই কৃষ্ণলীলা ও রামায়ণ আশ্রয় করে বৈষ্ণব ধর্মের সীমাও বিস্তৃত হয়েছিল।
বৈষ্ণব ধর্ম এবং প্রেমের ধর্ম- যা গীতা নির্ভর করেই গড়ে উঠেছে। আদিতে বিষ্ণু-প্রেম কৃষ্ণ প্রেমে রূপান্তরিত হলেও রাধার অস্তিত্ব জানা ছিল বলে ধারণা করা যায় না। কাজেই, দেবী রাধার আগমন স্বভাবতই আরো অনেক পরের ঘটনা। সম্ভবত সেন পর্বের পরেই রাধা-কৃষ্ণের লীলাভিত্তিক প্রেম নির্ভর ভক্তের ধর্ম সঞ্চারিত ও পল্লবিত হয়ে ওঠে।
৭৮৮ Dr.L.A. Waddell: Buddhism of Tibet or Lamaism.
৭৮৯ P.C. Bagchi- India and China, Calcutta.
৭৯০ Dinesh Chndra Sircar: Studies in the Society and Administration of Tibet.
৭৯১ রমেশচন্দ্র মজুমদার: বাংলাদেশের ইতিহাস (প্রাচীন যুগ)।
৭৯২ নীহাররঞ্জন রায়: বাঙালির ইতিহাস (আদিপর্ব)।
৭৯৩ S. Beal: Life of Hiuen Tsang by the Shaman Hwui Li.
———————————————————-
আগামী পর্বেঃ * বর্ণ ও শ্রেণণী বিভাজন*
(প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে ১২০৫ খ্রিষ্টাব্দ) পর্ব ১০২
৩৮১-৮৫ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে মনীষী তাও-ঙ্গানের নেতৃত্বে কাজ করে গৌতমসংঘদেব, ধর্মনন্দী, সঙ্ঘভুতি প্রভৃতি বৌদ্ধাচার্যগণ অসংখ্য ভারতীয়গ্রন্থ চৈনিক ভাষার অনুবাদ করেছিলেন।৭৮৮ খ্রিষ্টীয় ষষ্ঠ শতাব্দীর শেষ এবং সপ্তম শতাব্দীর প্র মভাগে নম-রি-স্রোঙ-সন (আ ৫৭০-৬২০ খ্রিষ্টাব্দ) নামক একজন শক্তিমান রাজা তিব্বতের জনক হিসেবে ইতিহাসে স্বীকৃত। মধ্যএশিয়ায় বিজয় অভিযান চালানোর সময়ে তিনি বৌদ্ধ ভিক্ষুগণের সংস্পর্শে এসে বুদ্ধের শান্তিময় মুক্তিমার্গের বিষয় অবগত হয়ে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। কথিত আছে, তার চেষ্টায় লাসা নগরীতে দুটি বৌদ্ধ বিহার প্রতিষ্ঠিত হয়। তন্মধ্যে রা-মো-চে নামক বিহারটি অদ্যাবধি বর্তমান আছে এবং অপর বিহারটি চীনাদের দ্বারা ধ্বংস হয়েছিল। তিব্বতীয়গণ এই নরপতিকে বোধিসত্ত্ব অবলোকিতেশ্বর, তদীয় নেপালী মহিষীকে সবুজ-তারাদেবী এবং চীনা মহিষীকে শ্বেত-তারাদেবী জ্ঞানে পূজা করে থাকে।৭৮৯ ৬৩৯ খ্রিষ্টাব্দে অনূরপুত্র থোঙ-মি সম্ভোত নামক একজন প্রাজ্ঞ ব্যক্তিকে বর্ণমালার সন্ধানে কাশ্মীরদেশে প্রেরণ করা হয় এবং স্বদেশের জন্য উদ্ভাবিত বর্ণমালা সঙ্গে নিয়ে তিব্বতে ফিরে যান। তিব্বতীয় লিপি ষষ্ঠ-সপ্তম শতাব্দীতে উত্তরভারতে প্রচলিত ক্রমবিবর্তিত ব্রাহ্মীলিপি হতে সম্ভূত। এই বর্ণমালা তিব্বতীয় সভ্যতায় ভারতবর্ষের সর্বশ্রেষ্ঠ দান।৭৯০
জৈন ধর্ম
জৈন ধর্ম একসময়ে আদি ভারত উপমহাদেশে একটি উল্লেখযোগ্য ধর্ম হলেও সমস্ত বাংলাদেশে তার প্রচার ও প্রসার ছিল না। জৈন ধর্ম যমুনা পার হয়ে পূর্বাঞ্চলে এসেছিল এমন কোন হদিস পাওয়া যায় না। পশ্চিম বাংলার পশ্চিমাঞ্চল এবং উত্তরবঙ্গে এ ধর্ম সীমাবদ্ধ ছিল। তবে, পশ্চিম বাংলায় এ ধর্মের সাক্ষী হিসেবে মানভূম, সিংহভূম, বীরভূম ও বর্ধমান এ চারটি স্থানের নামই জৈন ধর্মের তীর্থাংকরদের নামের সঙ্গে জড়িত। জৈনপুরাণ মতে চব্বিশজন তীর্থাংকরের মধ্যে বিশজনেরই নির্বান স্থান হাজারীবাগ জেলার পরেশনাথ পাহাড়ে।
প্রাচীন জৈন ধর্মগ্রন্থে উলেখ আছে যে, বর্ধমান মহাবীর রাঢ় প্রদেশে ধর্মপ্রচারে এসেছিলেন, কিন্তু সেখানকার লোকেরা মহাবীর এবং তার সঙ্গী সাথীদের সাথে অসদ্ব্যবহার করেছিলেন। কোন সময়ে জৈনধর্ম বাংলায় প্রথম প্রতিষ্ঠা লাভ করে, তা সঠিক বলা না গেলেও মহাবীরের জীবদ্দশায় বা তারপর আরো দু’এক শত বছরের মধ্যে বাংলাদেশের জৈনধর্ম প্রতিষ্ঠা লাভ করে নি বলেই মনে হয়। দিব্যাবদানে অশোকের সম্বন্ধে একটি গল্প আছে। পুণ্ড্রবর্ধন নগরীর জৈনগণ মহাবীরের চরণতলে পতিত বুদ্ধদেরেব চিত্র অঙ্কিত করেছে শুনে তিনি নাকি পাটলিপুত্রের সমস্ত জৈনগণকে হত্যা করেছিলেন।৭৯১ এই গল্পটির মূলে কতটা সত্য আছে বলা কঠিন। সুতরাং অশোকের সময় পর্যন্ত উত্তরবঙ্গে জৈন-সম্প্রদায় বোধহয় ছিল না। তবে খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে বঙ্গে যে জৈনধর্ম দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রাচীন জৈনগ্রন্থ কল্পসূত্রমতে মৌর্যসম্রাট চন্দ্রগুপ্তের সমসাময়িক জৈন আচার্য ভদ্রবাহুর শিষ্য গোদাস- যে ‘গোদাসগণ’ প্রতিষ্ঠিত করেন, কালক্রমে তা চার শাখায় বিভক্ত হয়। এর তিনটির নাম তাম্রলিপ্তিক, কোটীবর্ষীয় এবং পুণ্ড্রবর্ধনীয়। এই তিনটি যে বাংলার
তিনটি সুপরিচিত নগরীর নাম হতে উদ্ভূত, তাতে কোন সন্দেহ নেই। কল্পসূত্রে উল্লিখিত, এ শাখাগুলি কাল্পনিক নয়; সত্যসত্যই ছিল। কারণ, খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীতে উৎকীর্ণ শিলালিপিতে তাদের উল্লেখ আছে। সুতরাং উত্তরবঙ্গে পুণ্ড্রবর্ধন, কোটীবর্ষ ও দক্ষিণবঙ্গে (তাম্রলিপ্তি) যে খুব প্রাচীনকাল হতেই জৈনধর্ম প্রসার লাভ করেছিল তার প্রমাণ পাওয়া যায়। পাহাড়পুরে প্রাপ্ত একটি তাম্রশাসন হতে জানা যায় যে খ্রিষ্টীয় চর্তু শতাব্দীতে বা তার পূর্বে ঐ স্থান একটি জৈন বিহার ছিল।
বারানসীর পঞ্চস্তুপীয় শাখার আচার্য গৃহনন্দীর শিষ্য ও তাদের অনুচরবৃন্দ এই বিহারের অধিবাসী ও কর্মকর্তা ছিলেন। তারা প্রতিবেশী এক ব্রাহ্মণ দম্পত্তির নিকট হতে কিছু ভূমি দানস্বরূপ লাভ করেছিলেন এই বিহারের ব্যয় নির্বাহের জন্য।বিহারের ব্যয় বলতে অর্হৎদের নিত্য পূজা- সেবার ফুল, চন্দন, ধূপ ইত্যাদির ব্যয়। এর আরো দেড়শ’ত বছর পরে য়ুয়ান-চুয়াঙ বাংলায় এসে, সপ্তম শতকের দ্বিতীয়ার্ধে তিনি বৈশালী, পুণ্ড্রবর্ধন, সমতট ও কলিঙ্গে দিগম্বর নির্গ্রহ প্রচুর জৈন দেখেছিলেন বলে উলেখ করেন। সম্ভবত তিনি আজীবিক সম্প্রদায়ের লোক দেখে জৈন মনে করে থাকতে পারেন।৭৯২ কারণ তখন দেশে প্রচুর সংখ্যক আজীবিক ছিলেন; যারা আসনে-বসনে, পূজাপার্বণে জৈনদের মতই ছিল। কাজেই য়ুয়ান-চুয়াঙ-এর মত বৌদ্ধের পক্ষে পার্থক্য করা হয়ত সম্ভব ছিল না। তবে, সম্ভবত পাল-আমলের শেষদিকে বীরভূম-পুরুলিয়া অঞ্চলে কোনো কোনো জায়গায় নির্গ্রন্থ জৈনদের সমৃদ্ধ কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল। কয়েকটি জৈনমূর্তি ছাড়া উলেখ করার মতো বেশি কিছু পাওয়া যায়নি।
৬২৯-৬৪৫ সাল পর্যন্ত হিউয়েন সাঙ ভারত ভ্রমণ করেন। বাংলা-ভ্রমণ উলেখ করে তিনি বলেছেন যে, তাঁর সময়ে বাংলায় দিগম্বর জৈনের সংখ্যা খুব বেশি ছিল।৭৯৩ কিন্তু তার পরই বাংলায় জৈনধর্মের প্রভাব হ্রাস হয়। পাল ও সেনরাজগণের তাম্রশাসনে এই সম্প্রদায়ের কোন উল্লেখ নেই। তবে এটি যে একেবারে লুপ্ত হয় নি, প্রাচীন জৈনমূর্তি হতেই তা প্রমাণিত হয়।
জৈনরা এদেশ ও দেশের মানুষ সম্পর্কে অনেক বেশি খবরা-খবর রাখত এবং অত্যন্ত সতর্কভাবে ধর্মপ্রচার ও জীবনযাপন করত। জৈন ধর্মগ্রন্থ ভগবতী সূত্রে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। তবে, আদিতে বাংলার বসবাসকারী জনমানুষের প্রতি জৈন ধর্ম প্রবর্তক মহাবীর বা তার অনুসারীদের ধারণা ভাল ছিল না- এমন কথা তারা উল্লেখ করে গেছেন।
বৈষ্ণব ধর্ম
কখন থেকে বৈষ্ণব ধর্মের প্রচার ও প্রসার আরম্ভ হয় এ সম্বন্ধে সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলা এখনও অসম্ভব। পশ্চিম বাংলার বাকুড়া জেলার শুশুনিয়া পাহাড়ের এক গুহার প্রাচীরে একটি বিষ্ণুচক্র উৎকীর্ণ পাওয়া গেছে এবং তা নিন্মে লিপিকারের পরিচয় পাওয়া যাচ্ছে চক্রস্বামীর পূজক হিসেবে। বিষ্ণুই ছিলেন চক্রস্বামী হিসেবে পরিচিত এবং গুহাটি ছিল একটি বিষ্ণু মন্দির। পঞ্চম শতকের প্রথমার্ধে বগুড়া জেলার বালিগ্রামে এক গোবিন্দস্বামীর মন্দির প্রতিষ্ঠার খবর পাওয়া যায়। বিষ্ণুরই অপর নাম গোবিন্দস্বামী। কোকামুখস্বামীকে কেউ মনে করেন বিষ্ণুর অন্যতম রূপ, কেউ মনে করেন শিবের। বরাহপুরাণ মতে কোকামুখ স্থানের নাম; এর অবস্থিতি কৌশিকী ও তিস্রোতার অনতিদূরে হিমালয়ের কোন অংশে; স্থানটি বিষ্ণুর পরম প্রিয় এবং এখানকার বিষ্ণু-প্রতিমাই শ্রেষ্ঠ বলে দাবি করা হয়েছে। বিষ্ণুই কোকামুখ বিষ্ণু, কৃষ্ণ বা রক্তবরাহরূপী। সপ্তম শতকের লোকনাথ-পট্টোলীতে ত্রিপুরা-জেলায় ভগবান অনন্ত-নারায়ণের (অনন্তশয়ান বিষ্ণু) পূজার খবর পাওয়া যায়। কৈলান-পট্টোলীতে আছে, এই সপ্তম শতকেই শ্রীধারণরাত ছিলেন পরম বৈষ্ণব এবং পুরুষোত্তমের ভক্ত উপাসক; তিনি আবার পরম কারুণিকও ছিলেন এবং শাস্ত্রনিয়ম ছাড়া অযথা প্রাণীবধের বিরোধী ছিলেন। পৌরাণিক বিষ্ণুর বিভিন্ন রূপ ও ধ্যানের সঙ্গে সমসাময়িক বাঙালির পরিচয় ছিল। এই বিভিন্ন রূপের বর্ণনা শুধু সাহিত্যে নয়, সঙ্গে সঙ্গে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল হতে বিভিন্ন বৈষ্ণব-প্রতিমার সাক্ষ্যও রয়েছে। বাংলার সমসাময়িক সাহিত্যে বা পুরাণে বা অন্য কোন গ্রন্থে পৌরাণিক দেবদেবীদের তত্ত্ব ও প্রকৃতির ব্যাখ্যা বা বিবরণ জানার মত উপকরণ যেহেতু নেই তাই এসব প্রতিমা-সাক্ষ্যই বিভিন্ন ধর্ম সম্প্রদায়গত দেবদেবীদের এবং পৌরাণিক ধর্মের ধ্যান ও কল্পনার একমাত্র পরিচয়। প্রাচীন বাংলায় এ ধরনের সাক্ষ্যের অভাব নেই। অবশ্য চর্তু শতকের পূর্বের কোন নিদর্শন যেমন নেই তেমনি অষ্টম শতক পর্যন্ত বিষ্ণুর বিভিন্ন মূর্তি প্রাপ্তি প্রচুর নয়। এর প্রাচুর্য পাওয়া যায় অষ্টম শতকের পর হতে। গুপ্ত যুগে এবং পরে অন্তত কয়েকটি বৈষ্ণবপ্রতিমার কথা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। রংপুর জেলায় প্রাপ্ত একাধিক ধাতু নির্মিত বিষ্ণু-মূর্তি ও একটি অনন্ত শয়ান বিষ্ণু-মূর্তি, বরিশাল জেলার লক্ষণকাটির গরুরবাহন এবং সপরিবার বিষ্ণু, রাজশাহী জেলায় যোগীর সওয়ান নামেপ্রাপ্ত বিষ্ণু-মূর্তি, মালদহ জেলার হাঁকরাইল গ্রামে প্রাপ্ত বিষ্ণু মূর্তি ঢাকা জেলার সাভার গ্রামে প্রাপ্ত পোড়ামাটির ফলকে উৎকীর্ণ এক বিষ্ণুর প্রতিমা প্রভৃতি সমস্তই এই পর্বের।
এই প্রতিমাগুলোর রূপ-কল্পনা ও লক্ষণ আলোচনা করলে স্পষ্টই বুঝা যায় যে, বৈষ্ণব ধর্ম, গুপ্তযুগের পূর্বেই বাংলাদেশে পরিচিতি লাভ করে এবং সাদরে গৃহীত হয়। বিশেষ করে পূর্ব বাংলার রাজন্যবর্গ থেকে আরম্ভ করে শূদ্ররা পর্যন্ত এ ধর্মের ভক্ত ছিল। আজো বাংলাদেশের কৈবর্ত সম্প্রদায় ও নিন্মবর্ণেরহিন্দুদের মধ্যে বৈষ্ণব ধর্মের যথেষ্ঠ পৃষ্ঠপোষকতা ও গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।
গুপ্ত ও গুপ্তোত্তর পর্বের বাংলায় বিষ্ণুর যে কয়েকটি রূপের সঙ্গে আমাদের পরিচয় (গোবিন্দস্বামী, কোকামুখস্বামী, শ্বেতবরাহস্বামী, প্রদ্যুমেড়বশ্বর, অনন্ত-নারায়ণ, পুরুষোত্তম) তাদের মধ্যে স্থানীয় বৈশিষ্ট্য কিছু নেই। পঞ্চরাত্রীয় চতুর্ব্যুহবাদের কোন আভাসও এই পর্বের লিপিগুলোতে কোথাও নেই। চতুর্ব্যুহের প্রদ্যুমেড়বর সঙ্গে উপরোক্ত প্রদ্যুমেড়বশ্বরের কোন সম্বন্ধ আছে বলে মনে হয় না। গুপ্ত-পর্বের রাজা-মহারাজরা নিজেদের পরিচয়ে সাধারণাত ‘পরমভাগবত’ পদটি ব্যবহার করতেন; মনে হয়, তারা সকলেই ছিলেন বৈষ্ণব ভাগবদ্ধর্মে দীক্ষিত। বস্তুত, এই পর্বের ভাগবদ্ধর্ম ঋগবেদীয় বিষ্ণু, পঞ্চরাত্রীয় নারায়ণ, মথুরা অঞ্চলের সাত্বত-বৃষ্ণিদের বাসুদেব কৃষ্ণ, পশুপালক আভীর প্রভৃতি জনগোষ্ঠীর গোপাল ইত্যাদি সমন্বিত এক রূপ বলেই মনে করেন নীহাররঞ্জন রায়। এই ভাগবদ্ধর্মই গুপ্ত ও গুপ্তোত্তর পর্বে বাংলাদেশে প্রচার লাভ করে এবং পালপর্বে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। পরমভাবগত পরিচয় ছাড়া, এই পর্বের একজন রাজা- সপ্তম শতকের রাতবংশীয় সমতটেশ্বর শ্রীধারণ- আত্মপরিচয় দিচ্ছেন পুরুষোত্তমের পরমভক্ত পরম বৈষ্ণব রূপে। পুরুষোত্তম তো বিষ্ণুরই অন্যতম নাম ও রূপ।
বৈষ্ণব ধর্মের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্বন্ধে যুক্ত কৃষ্ণায়ণ ও রামায়ণ-কাহিনী যে গুপ্ত ও গুপ্তোত্তর পর্বেই বাংলাদেশে প্রচার ও প্রসার লাভ করেছিল তার কিছু প্রমাণ পাওয়া যায় পাহাড়পুর মন্দিরের পোড়ামাটির ও পাথরের ফলকগুলোতে। শ্রীকৃষ্ণের গোবর্ধন ধারণ, চাণুর ও মুষ্টিকের সঙ্গে কৃষ্ণ ও বলামের মল্লযুদ্ধ, যমালার্জুন অথবা জোড়া অর্জুন বৃক্ষ উৎপাটন, কেশী রাক্ষসবধ, গোপীলীলা, কৃষ্ণকে নিয়ে বাসুদেবের গোকুল গমন, রাখাল বালকদের সঙ্গে সঙ্গে কৃষ্ণ ও বলরাম গোকুলে কৃষ্ণের বাল্য জীবনলীলা প্রভৃতি কৃষ্ণলীলার অনেক গল্প এই ফলকগুলোতে উৎকীর্ণ হয়েছে। বলরাম ও দেবী যমুনার স্বতন্ত্র প্রতিকৃতিও বিদ্যমান। একটি ফলকে প্রভামণ্ডলযুক্ত, লাস্যভঙ্গীতে দণ্ডায়মান একজোড়া মিথুনমূর্তি উৎকীর্ণ- দক্ষিণে নারীমূর্তি, বামে নরমূর্তি। এখানে কেউ কেউ নারী মূর্তিকে রাধার মূর্তি কল্পনা করলেও প্রকৃতপক্ষে রাধা কল্পনার ঐতিহ্য এত প্রাচীন নয়। হালের গাথা সপ্তশতীতে রাধার উল্লেখ আছে বটে, কিন্তু সে উল্লেখের প্রাচীনত্ব নিশ্চিত করে নির্ধারণ করা কঠিন। তবে, জয়দেবের (দ্বাদশ শতক) পূর্বেই কোনও সময়ে, এই বাংলাদেশেই রাধাতত্ত্ব ও রাধার রূপ-কল্পনা সৃষ্টিলাভ করেছিল বলে ধারণা করা হয়। বস্তুতঃ বৈষ্ণব ধর্মের রাধা শাক্তধর্মের শক্তিরই বৈষ্ণব রূপান্তর ও নামান্তর মাত্র।
শিবের মতো কৃষ্ণ বা বিষ্ণুই বৈষ্ণবধর্মে পরমপুরুষ এবং এই পুরুষের প্রকৃতি বা শক্তি হচ্ছেন রাধা। এই পৃথিবী বা প্রকৃতি যে বিষ্ণুর শক্তি বা বৈষ্ণবী, এই ধ্যান ষষ্ঠ-সপ্তম শতকেই প্রসার লাভ করেছিল। পাহাড়পুরের যুগলমূর্তি কৃষ্ণ ও রুক্সিনি বা সত্যভামার শিল্পরূপ বলেই কেউ কেউ মনে করেন। পাহাড়পুরের কৃষ্ণলীলার গল্পগুলি মন্দিরের অলংকরণের উদ্দশ্যেই উৎকীর্ণ হয়েছিল। রামায়ণের কয়েকটি গল্পের যে প্রতিকৃতি আছে (যেমন, বানরসেনা কর্তৃক সেতু নির্মাণ, বালী ও সুগ্রীবের যুদ্ধ ইত্যাদি) সে-সম্বন্ধেও এ-উক্তি প্রযোজ্য। সংশয় করা চলে না যে, গুপ্ত ও গুপ্তোত্তর যুগের লোকায়ত বাঙালি জীবনে কৃষ্ণলীলা ও রামায়ণের কাহিনী যথেষ্ঠ প্রসার ও সমাদর লাভ করেছিল এবং এই কৃষ্ণলীলা ও রামায়ণ আশ্রয় করে বৈষ্ণব ধর্মের সীমাও বিস্তৃত হয়েছিল।
বৈষ্ণব ধর্ম এবং প্রেমের ধর্ম- যা গীতা নির্ভর করেই গড়ে উঠেছে। আদিতে বিষ্ণু-প্রেম কৃষ্ণ প্রেমে রূপান্তরিত হলেও রাধার অস্তিত্ব জানা ছিল বলে ধারণা করা যায় না। কাজেই, দেবী রাধার আগমন স্বভাবতই আরো অনেক পরের ঘটনা। সম্ভবত সেন পর্বের পরেই রাধা-কৃষ্ণের লীলাভিত্তিক প্রেম নির্ভর ভক্তের ধর্ম সঞ্চারিত ও পল্লবিত হয়ে ওঠে।
৭৮৮ Dr.L.A. Waddell: Buddhism of Tibet or Lamaism.
৭৮৯ P.C. Bagchi- India and China, Calcutta.
৭৯০ Dinesh Chndra Sircar: Studies in the Society and Administration of Tibet.
৭৯১ রমেশচন্দ্র মজুমদার: বাংলাদেশের ইতিহাস (প্রাচীন যুগ)।
৭৯২ নীহাররঞ্জন রায়: বাঙালির ইতিহাস (আদিপর্ব)।
৭৯৩ S. Beal: Life of Hiuen Tsang by the Shaman Hwui Li.
———————————————————-
আগামী পর্বেঃ * বর্ণ ও শ্রেণণী বিভাজন*
খবর বিভাগঃ
বাংলাদেশের ইতিহাস