বুধবার, জুন ১৫, ২০১৬

রোযা ও আধুনিক বিজ্ঞান

রোযা ও আধুনিক বিজ্ঞান
সুবহে সাদেক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও স্ত্রী সহবাস থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে এই রোযা পালিত হয়ে থাকে। এই রোযা পালন একটি ইবাদত। তবে প্রশ্ন হল, মানুষ রোযা থেকে কি উপকার লাভ করে? যে তা ছেড়ে দেয় সেইবা কতটুকু ক্ষতিগ্রস্ত হয়? তাহলে আল্লাহ কি স্বীয় বান্দাদেরকে কষ্ট দিতে ইচ্ছা করেন? অথবা আল্লাহ কি আমাদের রোযার মুখাপেক্ষী? এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন :
﴿أَنْ تَصُومُوا خَيْرٌ لَكُمْ﴾
‘‘তোমাদের রোযা তোমাদের জন্য কল্যাণকর।’’
আল্লাহ তা’আলা একমাত্র নিখুঁতভাবে অবগত আছেন যে, কোন জিনিসে মানব জাতির কল্যাণ রয়েছে এবং কোন জিনিসে অকল্যাণ রয়েছে। কোন জিনিসে তার সুস্থতা রয়েছে এবং কোন জিনিসে রয়েছে তার অসুস্থতা।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন : الصَّوْمُ جُنَّةٌ ‘‘রোযা ঢালস্বরূপ।’’
ঢাল যেমন যুদ্ধক্ষেত্রে যোদ্ধাকে সার্বিক আঘাত থেকে রক্ষা করে, রোযাও তেমনি রোযাদারকে শারীরিক ও মানসিক ব্যাধি থেকে রক্ষা করে। অজ্ঞ শ্রেণীর অনেকেই ধারণা করে যে, রোযা রেখে সারাদিন উপবাস থাকলে শরীর অতিকায় ক্ষীণ ও জীবনীশক্তি দুর্বল হয়ে যায় এবং বিভিন্ন রোগ মানুষকে আক্রমণ করে। ঘনঘন খাদ্য গ্রহণ করলে স্বাস্থ্য অটুট ও সবল থাকার ধারণাও আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের দৃষ্টিতে নিতান্ত ভুল ও অবান্তর বলে প্রমাণিত।
মানবজীবনে খাদ্য ও পানীয় বস্তু অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কেননা খাদ্য ও পানীয় শরীর গঠনের মূল বা প্রধান উপকরণ এবং বেঁচে থাকারও উপাদান।
মানুষ তার শরীর ও আত্মা নিয়ে গঠিত। পৃথিবীর যে সকল উপাদান রয়েছে (পানি, মাটি ও হাওয়া) তার পরিমাণ দিয়ে মানুষের শরীর গঠিত। আল্লাহ তা’আলা বলেন :
﴿ ۞مِنۡهَا خَلَقۡنَٰكُمۡ وَفِيهَا نُعِيدُكُمۡ وَمِنۡهَا نُخۡرِجُكُمۡ تَارَةً أُخۡرَىٰ ٥٥ ﴾ [طه: ٥٥]
‘‘আমি তোমাদেরকে এ মাটি থেকেই সৃষ্টি করেছি, এতেই তোমাদেরকে ফিরিয়ে দিব। এবং পুনরায় এ থেকেই তোমাদেরকে উত্থিত করব।’’
পক্ষন্তরে আমরা যে খাদ্য খাই তার মধ্যেও রয়েছে হাওয়া, পানি ও মাটি। বাতাসে পাওয়া যায় অক্সিজেন, নাইট্রোজেন ও কার্বন-ডাই-অক্সসাইড। পানিতে রয়েছে অক্সিজেন ও হাইড্রোজেন এবং মাটিতে পাওয়া যায় লৌহ ধাতু, দস্তা, আয়োডিন, সোডিয়াম, পটাসিয়াম, মেগনেসিয়াম, ফসফরাস, সালফার ইত্যাদি। এই সমস্ত উপাদানের পরমানু সমন্বয়ে গঠিত হচ্ছে প্রোটিন, চর্বি, ভিটামিন ইত্যাদি।
মানুষের খাদ্য তার শরীরে প্রধান দুইটি কাজ করে (১) শরীরে প্রয়োজনীয় শক্তি যোগান দেয় এবং তাপমাত্রা রক্ষা করে (২) কোষের কার্যক্রম রক্ষা করে এবং কোষ বিভাজনে সহায়তা করে। খাদ্য শরীরের মাঝে বিভিন্ন পরিবর্তনের মাধ্যমে দেহকে শক্তি যোগান দিয়ে থাকে। দেহের মধ্যে সজীব উপাদানের যে রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে তাকে বলা হয় Metabolism। এ বিপাক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যে শক্তি সঞ্চয় হয় তা কোষের কাজে ব্যবহার হয়ে থাকে এবং খাদ্য উপাদানগুলি সূক্ষ্ম পদক্ষেপ ও ধারাবাহিকভাবে উত্তাপের মাধ্যমে তৈরী হয় ভিটামিন, চর্বি ও সার্বিক শক্তি। সেখানে রয়েছে অ্যামিনো এসিড, আলোক শক্তি ও বিদ্যুৎ শক্তি। এই সমস্ত শক্তির মাধ্যমে শরীর তার বিভিন্ন যন্ত্র পরিচালনা করে যেমন হৃদপিন্ড, ফুসফুস, রক্ত পরিচালনা, পাকস্থলী ইত্যাদি। জীবন পরিচালনায় সার্বিক কাজকর্ম ও নড়াচড়ায় যথোপযোগী এই শক্তি ব্যবহার হয়ে থাকে এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত উৎপাদিত শক্তি বিশেষ ভাণ্ডারে সঞ্চিত ও সংরক্ষিত থাকে। সেখান থেকে প্রয়োজনের সময় ব্যবহার হয়ে থাকে এই সংরক্ষিত শক্তি।
মানুষ যদি খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকে তাহলে কত দিন পর্যন্ত এই সঞ্চিত শক্তি উক্ত মানুষের প্রয়োজন মিটাতে পারে? চিকিৎসা বিজ্ঞান বর্ণনা করছে : মানুষ যদি খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকে সম্পূর্ণরূপে নিজকে বিরত রাখে তা হলে তার শক্তি ভাণ্ডার থেকে তার চাহিদা ও প্রয়োজন অনুযায়ী কাজের পরিপ্রেক্ষিতে কম পক্ষে একমাস এবং উর্ধ্বে তিন মাস শক্তি সরবরাহ করতে পারে।
অথচ ইসলাম মুসলিমকে দৈনিক মাত্র ১২ থেকে ১৪ ঘন্টা পানাহার থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছে, এই সামান্য সময় পানাহার থেকে বিরত থাকা বিজ্ঞানের দৃষ্টিতেও সম্পূর্ণ নিরাপদ। তাই তার শরীরে এই রোযার মাধ্যমে কোনো ধরনের ক্ষতি হয় না, বরং এই রোযার মধ্যে রয়েছে অসংখ্য উপকার। এই ইবাদতটির মধ্যে শুধু নৈতিক উন্নতি ও গুণাবলী অর্জনের ক্ষমতাই নেই, বরং এগুলির সাথে রয়েছে মানব দেহের সুস্থতার সম্পর্ক।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে মানুষের কাছে যে বৈজ্ঞানিক তথ্য ছিল অজানা, আজ বিজ্ঞান সীয়ামের উপকারিতা বর্ণনা করে মানুষকে সীয়াম সাধনার জন্য উৎসাহিত করছে। উম্মতের বিজ্ঞান মনস্কতার উৎসাহের জন্য রোযা রাখায় উৎসাহিত করার হাদীসগুলো বিরাট ভূমিকা রাখে।
আধুনিক বিজ্ঞান বলছে : কলেস্টেরল (Cholesterol) মানব শরীরের একটি প্রয়োজনীয় লিপিড (lipid) এটি দেহ কোষের পাতলা আবরণ গঠনের ও হজমের পিত্তরসে ব্যবহৃত হয়। এটি স্নায়ু কোষকে সুস্থ ও নিরাপদ রাখতে সাহায্য করে। এ ছাড়া মানব দেহের ইষ্ট্রজেন ও এন্ড্রোজেন নামক প্রজনন হরমোন তৈরীতে এর ভূমিকা প্রধান। এটি সকল প্রকার ষ্টেরয়েড (Steroid) সংশোধনের মূখ্য ভূমিকা পালন করে। কিন্তু এর পরিমাণ প্রয়োজনের অতিরিক্ত হলে উচ্চ রক্ত চাপ ও হৃদপিণ্ড রোগ প্রভৃতি সৃষ্টি হয়ে মানুষকে মৃত্যুর কোলে ঠেলে দেয়। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান বলছে শরীরে কলেষ্টেরল মাত্রা সীমিত রাখতে রোযা ও রোযার মাসের পরিমিত খাদ্য গ্রহণ এবং অতিরিক্ত নামাজ যথেষ্ট সহায়ক।
রোযা মানুষকে ডায়াবেটিস, স্থুলকায়ত্ব ও বিভিন্ন রোগ থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। মানব দেহের অগ্নাশয়ে উৎপন্ন ইনসুলিন নামক হরমোন রক্তে মিশে রক্তের শর্করাকে জীবকোষে প্রবেশ ও কার্যকরী করতে সাহায্য করে। ইনসুলিনের অভাব হলে শরীরে শর্করা কাজে লাগতে পারে না। এর ফলে চর্বি ও প্রোটিন থেকে প্রয়োজনীয় শক্তি সংগ্রহ করে। ফলে ডায়বেটিস রোগী দুর্বল ও ক্লান্ত হয় এবং বিভিন্ন রোগ দেখা দেয়। বর্তমান বিজ্ঞান বলে যে, রমজানের একমাস রোযা পালন এবং বছরের অন্যান্য সময় অতিরিক্ত রোযা ডায়বেটিস রোগীর রোগ নিয়ন্ত্রণের জন্য অত্যন্ত ফলপ্রসু। একমাস সিয়াম সাধনার কারণে অগ্নাশয় পূর্ণ বিশ্রাম পায় এবং দিনের বেলায় অগ্নাশয় থেকে ইনসুলিন নির্গত কম হয় বিধায় তা বিশেষ উপকারিতা লাভ করে। এছাড়া স্থুলকায়ত্ব (obesity) যা মানব দেহের বিভিন্ন রোগের কারণ তা থেকে মুক্ত করতে পারে রমযানের রোযা ও বছরের অন্যান্য রোযা। এভাবেই বিজ্ঞানীরা খুজে পেয়েছেন পবিত্র কুরআন ও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণীতে আসা রোযা রাখার প্রতি উৎসাহের প্রকৃত রহস্য।
মানুষের শরীরে ক্ষতিকর বিষাক্ত উপাদানের জন্ম হয়, যার অধিকাংশ খাদ্য ও পরিবেশ দুষিত হওয়ার কারণে হয়ে থাকে। বিশেষ করে বর্তমান যুগে যন্ত্র চালিত যানবাহনের কারণে পরিবেশ দূষিত হওয়ার ফলে মানুষ বিভিন্ন ধরণের নতুন নতুন রোগে আক্রান্ত হয়। তন্মধ্যে ক্যান্সার, ব্লাড প্রেসার, ফুসফুস, হার্ট ও ব্রেন টিউমার ইত্যাদি। দার্শনিক ও চিকিৎসাবিদগণ মুক্ত কন্ঠে স্বীকার করেছেন যে, সীয়াম সাধনা শরীর ও মন উভয়ের জন্য অত্যন্ত উপকারী। প্রখ্যাত গ্রন্থ Science calls For fasting- এ বলা হয়েছে: সঠিকভাবে রোযা রাখলে মনে হবে যেন দেহ নব জন্ম লাভ করেছে (After a fast properly taken, the body is literally born afresh)। চিকিৎসা বিজ্ঞানী ম্যাক ফ্যাডেন বলেছেন : সীয়াম সাধনা করলে বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষ সাধিত হয়। (The longer one fasts the greater becomes his intellectual power and the clearer his intellectual vision).
প্রতিটি মানুষ রোযার মুখাপেক্ষী, যদি সে রুগী না হয়। কেননা খাদ্যের বিষাক্ত অংশ শরীরের মধ্যে জমা হতে থাকে এবং তাকে আস্তে আস্তে রুগী বানিয়ে দেয় এবং তার ওজন বাড়িয়ে দেয়, এর ফলে তার কাজের আগ্রহ উদ্দীপনা লোপ পায়। অতঃপর উক্ত মানুষটি যদি রোযা থাকে তাহলে এই সমস্ত বিষাক্ত উপাদান থেকে মুক্ত হয়ে আবার সে শক্তি ও উদ্দীপনা অনুভব করে। স্বাস্থ্য বিজ্ঞানী এ কে এম আবদুর রহীম লিখেছেন : সমস্ত শরীরে সারা বছর যে জৈব বিষ দেহের স্নায়ু ও অপারপর জীব কোষকে দুর্বল করে দেয় রোযা সমস্ত রক্ত প্রবাহকে পরিশোধন করে সমগ্র প্রবাহ প্রনালীকে নবরূপ দান করে। রোযা উর্ধ্ব রক্তচাপ জনিত ব্যাধিসমূহ দূর করতে সাহায্য করে।
সবার কাছে সুস্পষ্ট যে, বিভিন্ন মেশিন দীর্ঘ দিন কাজ করার ফলে তার মাঝে ময়লা জমার কারণে শক্তি কিছুটা কমে যায়। পরবর্তীতে আস্তে আস্তে বিভিন্ন অসুবিধা দেখা দেয়। তাই সার্ভিসিং এর মাধ্যমে উক্ত ময়লাগুলো পরিস্কার করলেই পূর্বের শক্তি আবার ফিরে পায়। আর যদি তা না করা হয় তাহলে পরিশেষে উক্ত মেশিনটি অকেজো হয়ে যায়। মানুষের শরীরটাও আল্লাহর সৃষ্টি এবং তাঁর হুকুমে পরিচালিত একটা অলৌকিক মেশিন। এই মেশিন যেহেতু আলাদা করে সার্ভিসিং করা যায় না, যিনি মানব জাতিকে সৃষ্টি করেছেন তিনিই ভাল জানেন যে, এই অলৌকিক মেশিনটি সুস্থ রাখতে হলে কি পদ্ধতি অবলম্বন করতে হবে। সেই সৃষ্টিকর্তা এই রোযার পদ্ধতি অবলম্বনের মাধ্যমে সার্বিক সুস্থ থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।
ডা : জুয়েলস, ডা : ডিউই, ডা : এলেক্স হিউ প্রমুখ প্রখ্যাত চিকিৎসা বিজ্ঞানীগণ স্বীকার করেছেন যে, রোযা শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। এর ফলে দেহের জীবানুবর্ধক অন্ত্রগুলি ধ্বংস হয়, ইউরিক এসিড বৃদ্ধি বাধাপ্রাপ্ত হয়। রোযা চর্মরোগ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, গ্যাষ্ট্রিক আলসার ইত্যাদির জন্য অত্যন্ত উপকারী বিবেচিত হয়েছে। মেদ ও কোলেষ্টরেল কমানোয় রোযার জুড়ি নেই। সর্বোপরি রোযা মনে শান্তি আনে, কুপ্রবৃত্তি প্রশমিত করে, দীর্ঘ জীবন দান করে। আজ উন্নত বিশ্বে বিভিন্ন জটিল রোগের প্রশমনের ব্যবস্থা পত্রে চিকিৎকগণ রোযা রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন।
চৌদ্দশত বছর আগে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের জন্য যে কি রহমত, বরকত, ফযীলাত ও মাগফিরাতের পথ দেখিয়ে গেছেন, দিন দিন আমরা তার যথার্থতার অজস্র প্রমাণ পাচ্ছি। আমাদের নিজেদের কল্যাণের জন্যই ইসলামের মধ্যেই নিহিত রয়েছে মানব জাতির সার্বিক কল্যাণ ও মুক্তি।
মুহাম্মদ শাহিদুল ইসলাম






সম্পাদনা : ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া

শেয়ার করুন