শুক্রবার, জুন ০৯, ২০১৭

চার নেতার মুক্তিযোদ্ধা খেতাব দাবি - সিরাজী এম আর মোস্তাক

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে জাতীয় চার নেতা জনাব তাজউদ্দিন আহমেদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এম. মনসুর আলী এবং এ. এইচ. এম. কামরুজ্জামান সফল সংগঠক ছিলেন। তারা মুজিবনগর সরকার গঠনসহ স্বাধীনতাযুদ্ধ সার্বিক পরিচালনা করেছেন। স্বাধীনতাত্তোর দেশ গঠণেও তাদের ভূমিকা অসামান্য। ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ তারিখে এক সামরিক সন্ধিক্ষণে তারা জেলের প্রকোষ্ঠে নির্মমভাবে শহীদ হন। আজও তার বিচার সম্পন্ন হয়নি। কারা এবং কেন তাদেরকে হত্যা করেছে, তাও সুস্পষ্ট নয়। মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য তাদের কোনো স্বীকৃতি বা খেতাবও নেই। বাংলাদেশে প্রচলিত মুক্তিযোদ্ধা কোটা বা তালিকায় তাদের নাম নেই। বর্তমান প্রজন্মের কাছে মুক্তিযোদ্ধা কোটাভোগীরা যতোটা পরিচিত, চার নেতা ততোটাও পরিচিত নয়। অনেকেই তাদের নাম জানেনা। আবার অনেকে প্রশ্ন করে বসে, চার নেতা মুক্তিযোদ্ধা নাকি রাজাকার? এর কারণও স্পষ্ট। বর্তমানে বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধা কোটা বা মাত্র দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারকে যেভাবে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে, তাতে মুক্তিযুদ্ধে চার নেতার অবদান বিস্মৃতির পথে। বাংলাদেশে স্বাধীনতার কান্ডারীদের এমন বিস্মৃত পরিণতি একেবারেই অনাকাঙ্খিত।  বর্তমান প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানী বলতে শুধুমাত্র দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধা কোটাভোগী পরিবারকেই বুঝায়। শুধু তারাই দেশ স্বাধীন করেছে, অন্য কারো অবদান নেই। তাই দেশের সকল চাকুরি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি এবং বিশেষ সুযোগ-সুবিধায় তাদেরকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে। তাদের জন্য সর্বনি¤œ পচিশ হাজার টাকা ভাতা চালু হয়েছে। দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান-সন্ততি, নাতি- নাতনি থেকে চৌদ্দ গোষ্ঠি মুক্তিযুদ্ধের স্বাদ ভোগ করছে। তাতে ত্রিশ লাখ শহীদেরও কোনো অংশ নেই। তারা শুধু মুখে মুখেই। তারা মুক্তিযোদ্ধাও নয়। বাংলাদেশে ষোল কোটি নাগরিকের কেউ ত্রিশ লাখ শহীদের পরিবারভুক্ত নয়। তবে দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধা তালিকাটি ত্রিশ লাখ এক থেকে শুরু হয়েছে। অর্থাৎ বর্তমান জীবিত মুক্তিযোদ্ধাগণও ত্রিশ লাখ শহীদের অর্ন্তগত। অন্যদিকে কথিত দুই লাখ সম্ভ্রমহারা মা-বোনের কোনো অস্তিত্বও নেই। তারা মুক্তিযোদ্ধা বা শহীদ কোনো তালিকাতেই নেই। তেমনি চার নেতাও মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত নয়। তারাও ত্রিশ লাখ শহীদ ও দুই লাখ সম্ভ্রমহারা মা-বোনের মতো মুখে মুখেই রয়েছে। এক সময় এ সমস্ত মৌখিক স্বীকৃতি ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবে। তাই অতি সত্ত্বর চার নেতাকে বীর মুক্তিযোদ্ধা খেতাব প্রদান করে তাদের অবদান চিরন্তন করা উচিত।
৩ নভেম্বর. ২০১৬ তারিখ জেল হত্যা দিবসে চার নেতাকে বীর মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি প্রদানের মোক্ষম সময়। এসাথে মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি বঞ্চিত সবাইকে খেতাব দেয়া যেতে পারে। স্বাধীনতার স্থপতি বাঙ্গালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকেও মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি দেয়া যায়। তিনি মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানে বন্দী ছিলেন। তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক। বঙ্গবন্ধু তার শাসনামলে মাত্র ৬৭৬ জন যোদ্ধাকে খেতাব দিয়ে ১৯৭১ সালে দেশে অবশিষ্ট সকল নাগরিককে সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা ঘোষণা করেছিলেন। নিজেও একজন বন্দী যোদ্ধা পরিচয় দিয়েছিলেন। (১০ জানুয়ারী, ১৯৭২ তারিখে দেশে প্রত্যাবর্তন দিবসে তার মহামূল্যবান ভাষণ দ্রষ্টব্য)। বঙ্গবন্ধুর এ ত্যাগী আদর্শ সবাই গ্রহণ করেছিল। চার নেতা এবং সেনাপ্রধান এম এ জি ওসমানীসহ বহু প্রত্যক্ষ সংগ্রামী ব্যক্তিবর্গ মুক্তিযোদ্ধা খেতাব লাভ থেকে বিরত থাকেন। তারা উক্ত ৬৭৬ খেতাবধারী ছাড়া দেশের সবাইকে সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠণে প্রচেষ্টা করেন। তখন দেশে মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা বিভাজন ছিল না। খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যও কোনো কোটা ছিলনা। বঙ্গবন্ধুর সে মহান আদর্শ বাস্তবায়ন করত: জাতীয় চার নেতাকে মুক্তিযোদ্ধা খেতাব প্রদান আবশ্যক। এতে বাংলাদেশে প্রচলিত মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা বিভাজন দূর হবে। বর্তমান ষোল কোটি নাগরিক  সবাই বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার ভক্ত অনুসারী হিসেবে ১৯৭১ এর বীর মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ পরিবারভুক্ত হবে।
শিক্ষানবিশ, ঢাকা।mrmostak786@gmail.com.



শেয়ার করুন