শুক্রবার, জুন ০৯, ২০১৭

২৫ মার্চ, ১৯৭১ এর গণহত্যাকারী কারা? -সিরাজী এম আর মোস্তাক

১৯৭১ এর ২৫ মার্চ রাতে নিষ্ঠুর ঘাতক বাহিনী বাংলাদেশে নারকীয় গণহত্যা চালায়। সাড়ে সাত কোটি মানুষের ওপর অন্যায়ভাবে ঝাপিয়ে পড়ে। বাঙ্গালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আটক করে। সারাদেশে রক্তের বন্যা প্রবাহিত করে। তা চলে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত। তাতে প্রাণ হারায় প্রায় ত্রিশ লাখ বাঙ্গালি। সম্ভ্রম হারায় প্রায় দুই লাখ মা-বোন। বন্দি থাকে বঙ্গবন্ধুসহ প্রায় পাঁচ লাখ নিরপরাধ বাঙ্গালি। শরণার্থী হয় প্রায় এক কোটি নাগরিক। এ সকল গণহত্যা, ধর্ষণ, অত্যাচার-নিপীড়নকারীরা জঘন্য যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী অপরাধী। তবে কারা উক্ত গণহত্যাকারী, তা সুস্পষ্ট নয়। বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে একই জিজ্ঞাসা- ২৫ মার্চ, ১৯৭১ এর গণহত্যাকারী কারা? পাকিস্তানিরা নাকি বাংলাদেশিরা?
২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস। এদিন গণহত্যাকারী নরপিশাচদের ঘৃণা করা হয়। আর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয় সকল শহীদ, আত্মত্যাগী ও বীর যোদ্ধাদের। বিশ্ববাসী এতে সমর্থন জানায়। তবে এখন গণহত্যাকারী ও মানবতাবিরোধী অপরাধীদের পরিচয় বদলে গেছে। বিশ্বব্যাপী সমাদৃত আদালত তথা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সুস্পষ্ট তথ্য-প্রমাণের আলোকে বিচারে শুধু বাংলাদেশিরা তাতে অভিযুক্ত হয়েছে। তাদের ফাঁসি ও যাবজ্জীবন সাজা হয়েছে। তা বিশ্বজুড়ে প্রচার হয়েছে। এজন্য ইতিহাস গবেষণার প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশিরাই খুনি ও অপরাধী। আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে কোনো পাকিস্তানি সেনা বা নাগরিক অভিযুক্ত হয়নি। তাদের সাজা হয়নি। আদালতে তাদের বিরূদ্ধে গণহত্যার প্রমাণও মেলেনি। তাহলে বাংলাদেশিরাই কি গণহত্যাকারী?
গণহত্যার শিকার লাখো শহীদের পরিচয় বাংলাদেশে স্পষ্ট নয়। ২৫ মার্চ, ১৯৭১ থেকে ১৬ই ডিসেম্বর পর্যন্ত গণহত্যার শিকার ত্রিশ লাখ শহীদের তালিকা ও স্বীকৃতি নেই। তারা শুধু মুখে মুখেই। বাংলাদেশে তাদের বংশ ও পরিবারের অস্তিত্ব নেই। ১৯৭১ এর সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালির মধ্যে ত্রিশ লাখ শহীদ ও দুই লাখ সম্ভ্রমহারা মা-বোনের সংখ্যা বিবেচনা করলে, বর্তমান ষোল কোটি নাগরিকের কেউই শহীদ পরিবারের বাইরে থাকার কথা নয়। অথচ বাংলাদেশে মাত্র সাতজন শহীদ তালিকাভুক্ত ও বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবপ্রাপ্ত। আর মাত্র প্রায় দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত। শুধু এ তালিকাভুক্ত ও তাদের সন্তানেরাই মুক্তিযোদ্ধা কোটাসুবিধা প্রাপ্ত। অর্থাৎ শুধু তারাই দেশ স্বাধীন করেছেন। মুক্তিযুদ্ধে আর কারো ভূমিকা নেই। বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতাসহ লাখো বন্দি, আত্মত্যাগী, শরণার্থী ও যুদ্ধকালে দেশে অবস্থানকারী কোটি কোটি লড়াকু বীরগণ মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত নয়। তাই বাংলাদেশে উক্ত তালিকাভুক্ত পরিবার ছাড়া তালিকাবহির্ভূত বীরদের কোটি কোটি সন্তানেরা নিজেদেরকে মুক্তিযোদ্ধা ও বীরের জাতি পরিচয় দিতে পারেনা। তারা নিজেদেরকে গণহত্যাকারী ও যুদ্ধাপরাধীদের স্বজন মনে করে। বিশ্ববাসীও তা অবগত। ফলে আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে রায়ের পর বাংলাদেশের কোনো নাগরিক বিদেশে গেলে, প্রথমে তাকে যুদ্ধাপরাধীদের স্বজন সন্দেহ করা হয়। তাকে প্রশ্নবানে জর্জরিত করা হয়। পাকিস্তানিদের ক্ষেত্রে তা হয়না। বিশ্ববাসী আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তাই তারা পাকিস্তানিদের পরিবর্তে শুধু বাংলাদেশিদেরকেই গণহত্যাকারী ও তাদের প্রজন্ম মনে করে।
সুতরাং ঘাতকদের প্রতি ঘৃণা ও লাখো শহীদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের চেয়ে আগে গণহত্যাকারীদের প্রকৃত পরিচয় দরকার। এজন্য উচিত, গণহত্যার শিকার সকল শহীদদের মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি দেয়া। বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতাসহ তালিকা বহির্ভূত সকল বীরদের মুক্তিযোদ্ধা ঘোষণা করা। প্রচলিত মুক্তিযোদ্ধা তালিকা ও কোটা বাতিল করা। বাংলাদেশের সবাইকে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারভুক্ত করা। তবেই ঘাতকদের পরিচয় স্পষ্ট হবে। আন্তর্জাতিক আদালতে বাংলাদেশিরা নয়, আসল গণহত্যাকারীরা সাজা পাবে। ২৫ মার্চ ‘আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস‘ স্বীকৃতি পাবে। অতএব মাননীয় রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারকসহ সবার কাছে জিজ্ঞাসা- ২৫ মার্চ, ১৯৭১ এর আসল গণহত্যাকারী কারা?  শিক্ষানবিশ আইনজীবি, ঢাকা।mrmostak786@gmail.com.


শেয়ার করুন