বুধবার, জুলাই ১৩, ২০১৬

সকল হত্যা একসূত্রে গাঁথা (All killings in unique source) সিরাজী এম আর মোস্তাক

সম্প্রতি অনেকগুলো হত্যার মধ্যে সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও তথ্যসমৃদ্ধ ছিল কিশোর ফাহিম হত্যা। আদালত কর্তৃক রিমান্ড আদেশের পর আইন শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী ও সন্ত্রাসীদের মাঝে সংঘটিত ভয়াবহ বন্দুকযুদ্ধে গোলাম ফয়জুল্লাহ ফাহিম হাতকড়া পরা অবস্থায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হয়। আমাদের দক্ষ প্রতিরক্ষা বাহিনী উক্ত সন্ত্রাসীদের আটক করতে ব্যর্থ হয়। এতে প্রশাসনের ব্যর্থতা অথবা মিথ্যাচারিতা প্রকাশ পায়। জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের সক্ষমতা স্পষ্ট হয়। পুলিশ কর্তৃক গুমকৃত ঝিনাইদহে প্রকৌশলী আনিছুর, মেধাবী ছাত্র শহীদ আল মাহমুদ ও ইবনুল ইসলাম পারভেজকে একইভাবে (০১ ও ০২ জুলাই, ২০১৬) বন্দুকযুদ্ধে হত্যায় সন্ত্রাসীদের পরিচিতি আরো স্পষ্ট হয়। এদের হত্যায় প্রতিবাদ শুরু হয়। প্রতিবাদ দমনের কৌশল হিসেবে মঠ সেবায়েত সেবানন্দ দাসকে হত্যা করা হয়। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা অথবা মিথ্যাচারিতাই এহেন ঘৃণ্য হত্যাকান্ডের মূলসূত্র। সন্ত্রাসীদের সাথে কথিত বন্দুকযুদ্ধে প্রতিরক্ষা বাহিনীর ব্যর্থতা ও তাদের সগর্ব প্রচারণা মিথ্যা অজুহাত মাত্র।
প্রতিরক্ষা বাহিনী কর্তৃক আইন ও বিচারের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দেশের সবচেয়ে সুরক্ষিত স্থান তথা জেলগেট থেকে অন্যায়ভাবে আসামী আটক বা গুম করাও হতাাকান্ডের সূত্র বিশেষ। এটি সরকারের মদদ ব্যতিত সম্ভব নয়। দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর সাক্ষী সুখরঞ্জন বালীকে জেলগেট থেকে আটক ও গুমের ঘটনা এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। শফিকুর রহমান মাসুদকে আদালত কর্তৃক ‘নো এ্যারেস্ট, নো হ্যারেজ’ আদেশসহ মুক্তির পরও জেলগেট থেকে আটক করে নাম্বারপ্লেট বিহীন গাড়ীতে তুলে নেবার ঘটনাও অন্যতম।
গুলশানের ‘হলি আর্টিজান বেকারিতে’ হামলায় একই জঙ্গিগোষ্ঠি জড়িত। তা অনুমিত হয় কমান্ডো অভিযানের সময় সরাসরি সম্প্রচারে বাধা দেয়ায়। পৃথিবীর কোথাও সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে এমন নজির নেই। এতে প্রকৃত রহস্য গোপন থাকতে পারে। ধ্বজাধারি জঙ্গিগোষ্ঠি আড়ালে যেতে পারে অথবা উদোর পিন্ডি বুদোর ঘাঁড়ে চাপতে পারে। এ মর্মে উল্লেখ্য যে, মাত্র ছয় বা সাত জঙ্গির পক্ষে প্রায় চল্লিশ জনকে আহত ও নিহত করা এবং মাত্র একজন তরবারীধারীর পক্ষে বিশজনকে কুপিয়ে হত্যা করা অসম্ভব। জঙ্গিগোষ্ঠি কর্তৃক কতিপয়কে নিরাপদে ছেড়ে দেয়াও অসম্ভব। মূলত রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে এটি ঘটানো হতে পারে। দেশব্যাপী মিথ্যা অভিযোগে বিরোধী পক্ষকে দমনে হীন ক্ষেত্র প্রস্তুতেও এটি করা হতে পারে। 
বিকৃত ইতিহাস চর্চাও বাংলাদেশে সংঘটিত হত্যার সূত্র। একটি জাতির প্রকৃত বিকাশ ঘটে সত্য ও সঠিক ইতিহাস চর্চায়। বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা বিভাজনের ফলে সে র্চ্চা ব্যাহত। এদেশে মুক্তিযুদ্ধের মহান বীর ও সেনানিগণ প্রকৃত স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত। মাত্র দুই লাখ ব্যক্তি মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত। উক্ত তালিকায় বাঙ্গালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক কর্ণেল এম এ জি ওসমানী, জাতীয় চার নেতা ও লাখো শহীদের নাম অন্যুক্ত। ত্রিশ লাখ শহীদ ও দুই লাখ সম্ভ্রমহারা মা-বোনের বিপরীতে যথাক্রমে মাত্র সাতজন শহীদ ও একচল্লিশ নারী বীরাঙ্গনা হিসেবে তালিকাভুক্ত। তালিকাভুক্তদের সন্তান-সন্ততি ও নাতি-নাতনিরাও মুক্তিযোদ্ধা কোটা সুবিধার আওতাভুক্ত। এতে বঙ্গবন্ধুর ঘোষণা অনুসারে ১৯৭১ এর সাড়ে সাত মুক্তিযোদ্ধা ও ত্রিশ লাখ শহীদ তত্ত্ব মিথ্যা ও বিকৃত। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ঘাতক ও অপরাধী পাকবাহিনীর পরিবর্তে বাংলাদেশের যুদ্ধবিধ্বস্থ অসহায় নাগরিকেরা যুদ্ধাপরাধী হিসেবে অভিযুক্ত। এ মিথ্যা বিভাজন প্রচলিত হত্যাকান্ডের অন্যতম সূত্র।
বাংলাদেশে প্রচলিত হত্যাকান্ড ও তার ঘাতকদের পরিচিতি স্পষ্ট। বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডই তার মূলসূত্র। আইন শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর মিথ্যাচারিতা ও কথিত অভিযানে ব্যর্থতা অন্যতম সূত্র। অবৈধ ঘটনার পর বিচারবিভাগের নিরবতা অনাকাঙ্খিত। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অহেতুক জাতি বিভাজনও হত্যার সূত্র। অতএব উচিত, ১৯৭১ এর সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালি তাদের ত্রিশ লাখ শহীদ ও দুই লাখ সম্ভ্রমহারা নারী নির্বিশেষে সবাইকে বীর মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি দেয়া। প্রচলিত দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধা তালিকা ও কোটা বাতিল করা। সকল বিভাজন ভুলে ঐক্যবদ্ধ জাতি এবং হত্যা ও সন্ত্রাসমুক্ত রাষ্ট্র গঠন করা।
এ্যাডভোকেট, ঢাকা।


শেয়ার করুন