বুধবার, জুলাই ১৩, ২০১৬

আমরাও মুক্তিযোদ্ধার সন্তান(পর্ব-২) সিরাজী এম আর মোস্তাক

বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা বিভাজন কেন? ১৯৭১ এর সাড়ে সাত কোটি সংগ্রামী বাঙ্গালী থেকে মাত্র দুই লাখ ব্যক্তি মুক্তিযোদ্ধা তালিকাভুক্ত কেন? জনাব সজীব ওয়াজেদ জয় ও সায়মা ওয়াজেদ পুতুল কি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান নয়? মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার স্বামী ড. এম. এ. ওয়াজেদ মিয়া কি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না? মুক্তিযুদ্ধে আত্মত্যাগী ত্রিশ লাখ শহীদ, দুই লাখ সম্ভ্রমহারা মা-বোন, বাঙ্গালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার ন্যায় লাখ লাখ বন্দী ও শরণার্থীগণ কি মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না? শুধু তালিকাভুক্ত দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধাই কি দেশ স্বাধীন করেছেন? শুধু তাদের সন্তানরাই কি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারভুক্ত? বর্তমান মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক এম.এ.জি. ওসমানীর নাম নেই, তাই বলে তাদের সন্তানেরা কি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারভুক্ত নয়? আমরা তালিকা বহির্ভূত বাংলাদেশের ষোল কোটি নাগরিক কি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারভুক্ত নই? আমাদের প্রকৃত পরিচয় কি?
বর্তমানে শুধু দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের জন্য ৩৪৪০টি পদে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ হচ্ছে। আমরা মুক্তিযোদ্ধা তালিকা বহির্ভূত কোটি কোটি নাগরিক এ নিয়োগ থেকে বঞ্চিত। এভাবে দেশের সকল চাকরি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রে আমরা তালিকা বহির্ভূতরা মারাত্মক বৈষম্যের শিকার। এ বৈষম্য চলছে দীর্ঘদিন ধরে। বর্তমানে তা মারাত্মক রূপ নিয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত সকল ক্ষেত্রে শতকরা ত্রিশ ভাগ মুক্তিযোদ্ধা কোটা পালনে যত ঘাটতি হয়েছে, বর্তমানে তা পুরণ হচ্ছে। যেমন ধরুন, কোনো প্রতিষ্ঠানে এ যাবত এক হাজার লোক নিয়োগ হয়েছে। তাতে ত্রিশ ভাগ মুক্তিযোদ্ধা কোটায় কমপক্ষে তিনশ জন নিয়োগের কথা ছিল। হয়তো নিয়োগ হয়েছে দুইশ। অর্থাৎ ঘাটতি হয়েছে একশ। বর্তমানে খালি পদ একশ। এর ত্রিশ ভাগ মুক্তিযোদ্ধা কোটা ও আগের ঘাটতি মিলে সম্পুর্ণ নিয়োগটাই মুক্তিযোদ্ধা কোটায় পড়ে। প্রচলিত ৩৪৪০টি পদে নিয়োগ তারই অংশ। এর আগেও এভাবে শুধু মুক্তিযোদ্ধা কোটায় প্রায় ত্রিশ হাজার প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ হয়েছে। বিগত বত্রিশতম বিসিএস, ২০১৫ সালে মেডিকেল কলেজে ভর্তি এবং অন্যান্য সকল নিয়োগ ও ভর্তি ক্ষেত্রে এভাবে মুক্তিযোদ্ধা কোটা প্রয়োগ হয়েছে।
বর্তমানে বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা পরিবারের ব্যবধান অনেক বেড়েছে। তালিকাভুক্ত দুই লাখ মুক্তিযোদ্ধার নাতি-নাতনিরাও কোটা সুবিধার আওতাভুক্ত হয়েছে। দুই লাখ সম্ভ্রমহারা মা-বোন থেকে একচল্লিশ নারী বীরাঙ্গনা খেতাব পেয়েছে। ১৯৭১ এর সাড়ে সাত কোটি বীর বাঙ্গালি থেকে মাত্র দুই লাখ যোদ্ধাকে ত্রিশ ভাগ কোটা বরাদ্দই বিদ্যমান ব্যবধানের কারণ। আবার এ কোটার অতীত ঘাটতি পুরণের ফলে সে ব্যবধান নিকৃষ্ট পর্যায়ে পৌছেছে। এখন স্পষ্ট হয়েছে, মাত্র দুই লাখ তালিকাভুক্ত পরিবার ছাড়া অন্যরা মুক্তিযোদ্ধা পরিবারভুক্ত নয়। এমনকি বঙ্গবন্ধু পরিবারও নয়। মুক্তিযুদ্ধে আত্মত্যাগ স্বীকারকারী ত্রিশ লাখ শহীদ, দুই লাখ সম্ভ্রমহারা নারী, লাখ লাখ বন্দী ও শরণার্থীগণও মুক্তিযোদ্ধা তালিকা বহির্ভূত। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও তালিকা বহির্ভূত যোদ্ধা। আমরা ষোল কোটি নাগরিক এদেরই সন্তান। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গর্ব, আমাদের নয়। মুক্তিযুদ্ধে আমাদের প্রাপ্তি বলতে কিছু নেই। আমরা ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চার ন্যায়। ছাগলের দু’বাচ্চা দুধ খেয়ে লাফায়, অন্যটি না খেয়েই লাফায়। আমরাও উপযাচকের মতো মুক্তিযুদ্ধ চর্চা করি।
এখনই সময়, আমাদের প্রকৃত পরিচয় নির্ণয়ের। বাংলাদেশে প্রচলিত মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা বৈষম্য নিরসনের। জাতি ভেদাভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠনের। তা হলো- বাঙ্গালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুস্পষ্ট ঘোষণা অনুসারে ১৯৭১ এর সাড়ে সাত কোটি বাঙ্গালিই মুক্তিযোদ্ধা। সকল সংগ্রামী যোদ্ধা, শহীদ, বন্দী ও শরণার্থী একই গন্তব্যের সহযাত্রী। তাদের মাঝে নেই কোনো বিভক্তি। শুধু দুই লাখ তালিকাভুক্ত পরিবার নয়, ষোল কোটি বাংলাদেশী আমরাও মুক্তিযোদ্ধার সন্তান-সন্ততি।
এ্যাডভোকেট, ঢাকা।


শেয়ার করুন